মালফুজাতে হযরতজী – পর্ব ১: বাণী ১–২০
হযরতজী মাওলানা মুহাম্মদ ইউসুফ কান্ধলভী (রহঃ)-এর বাণী সংকলন মালফুজাতে হযরতজী মাওলানা ইউসুফ (রহঃ) বইয়ের ১ থেকে ২০ নম্বর বাণী এই পর্বে দেওয়া হলো। সম্পূর্ণ সূচি ও বইয়ের ভূমিকা দেখুন।
সংকলন: মুফতি রওশন শাহ কাসেমী। অনুবাদ: ইসহাক ওবায়দী। প্রকাশক: বাড কম্প্রিন্ট এন্ড পাবলিকেশন্স, ঢাকা।
এই পর্বে যা আছে
- ১. আল্লাহ থেকে হওয়ার একীন নিজের মধ্যে সৃষ্টি করার পদ্ধতি
- ২. প্রতিটি বস্তুকে আল্লাহ পাক আপন কুদরত দ্বারা বানিয়েছেন
- ৩. আল্লাহর কুদরত থেকে ফায়দা হাসিলের পদ্ধতি
- ৪. আমাদের দুনিয়া ও আখেরাতের সমস্ত প্রয়োজনাদির মীমাংসার তরীকা
- ৫. এখলাস সৃষ্টি করার তরীকা
- ৬. তাবলীগ কি?
- ৭. গোনাহ থেকে বাঁচার নুসখা (ফর্মুলা)
- ৮. আল্লাহর বানানোর দ্বারা জীবন গড়ে
- ৯. বস্তুসমূহ অস্থায়ী, আর আল্লাহর কুদরত স্থায়ী
- ১০. লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লার উদ্দেশ্য বা মর্ম কি?
- ১১. আল্লাহ একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী, যে কোন বস্তুর মাধ্যমে যে কোন ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করতে পারেন
- ১২. আল্লাহর কাছে বড় শক্তিসমূহের অবস্থান
- ১৩. এটম বোম দ্বারা ওটাই হবে যা আল্লাহ চাইবেন
- ১৪. আল্লাহ চাইলে ধ্বংস ও অপমানের বস্তুকে লালন-পালন ও সম্মানের বস্তুতে পরিণত করতে পারেন
- ১৫. ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত অবস্থা বিশুদ্ধ হবার একক ভিত্তি
- ১৬. নিজের মধ্যে সূর্যের গুণাবলী সৃষ্টি করো
- ১৭. দ্বীন একমাত্র দাওয়াতের রাস্তায় ত্যাগ ও কোরবানী দ্বারা এবং দোয়ার মাধ্যমে চমকাবে
- ১৮. এটা মুল্ক্ ও মালওয়ালা রাস্তা নয়
- ১৯. এই খেয়াল ভুল যে, মুলক ও মাল হাতে আসলে পর ইসলাম চমকাবে
- ২০. বস্তুর পরিবর্তে নিজের শরীরের ওপর মেহনত করবে
১. আল্লাহ থেকে হওয়ার একীন নিজের মধ্যে সৃষ্টি করার পদ্ধতি
হজরতজী বলেন— ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’-এর মধ্যে নিজের একীন ও বিশ্বাস এবং নিজের এবাদত ও পদ্ধতিকে পরিবর্তন করার দাবী বিদ্যমান রয়েছে। শুধু একীন পরিবর্তনের কারণেই আল্লাহ পাক এই আসমান-জমিন থেকে কয়েকগুণ বড় জান্নাত দান করবেন। যে সমস্ত বস্তু থেকে একীন বের হয়ে আল্লাহ পাকের সত্তায় আবদ্ধ হবে, ঐ সমস্ত বস্তুকে আল্লাহ পাক তাঁর অধীনস্থ করে দেবেন। এই একীনকে নিজের মধ্যে সৃষ্টি করার জন্য প্রথমতঃ এই একীনের দাওয়াত দিতে হবে। আল্লাহর বড়ত্বকে বোঝাতে হবে। তাঁর প্রতিপালনকে বোঝাতে হবে। তাঁর কুদরত ও ক্ষমতাকে বোঝাতে হবে। আম্বিয়া (আ) ও সাহাবী (রা) দের ঘটনাবলী শোনাতে হবে। নিজে একাএকা বসে চিন্তা ফিকির করতে হবে। অন্তরে এই একীন বসাতে হবে যে, যার দাওয়াত জনসমক্ষে দেয়া হলো, এটাই হক ও সত্য। এবং কেঁদে কেঁদে দোয়া করতে হবে যে, আয় আল্লাহ! এই একীনের হাকীকত আমাদের দান করুন।
(হজরতজীর জীবনী ৭৬৭ পৃঃ)
২. প্রতিটি বস্তুকে আল্লাহ পাক আপন কুদরত দ্বারা বানিয়েছেন
হজরতজী বলেন— আল্লাহ জাল্লাশানুহু সমস্ত সৃষ্টিকুলের প্রতিটি কণা কণার এবং প্রতিটি ব্যক্তির খালেক ও মালেক। প্রতিটি বস্তুকে আপন কুদরত দ্বারা সৃষ্টি করেছেন, সবকিছুই তাঁর সৃষ্টির কারণে সৃষ্টি হয়েছে। তিনি বানানেওয়ালা। নিজে নিজে কিছু সৃষ্টি হয়নি। আর যে নিজে নিজে সৃষ্টি হয়, তার থেকে অন্য কিছু সৃষ্ট হয় না। যা কিছু কুদরত দ্বারা সৃষ্টি হয়েছে তা কুদরতেরই অধীন। প্রতিটি বস্তুর ওপর তাঁর অধিকার আছে। তিনিই প্রতিটি বস্তুকে ব্যবহার করেন। তিনি আপন কুদরত দ্বারা ঐ সমস্ত বস্তুর আকৃতিও পরিবর্তন করতে পারেন। আবার আকৃতিকে বহাল রেখে তার গুণাবলীকেও পরিবর্তন করতে পারেন। লাঠিকে সাপ বানাতে পারেন, আবার সাপকে লাঠি বানাতে পারেন। এভাবে প্রতিটি নকসার ওপর চাই মুলুক হোক বা মাল হোক, বিদ্যুৎ হোক বা বাষ্প হোক তাঁরই অধিকার প্রতিষ্ঠিত। এবং তিনিই জোর খাটাতে পারেন। যেখান থেকে মানুষের নির্মাণ নজরে আসে, সেখান থেকে তিনি বরবাদী এনে দেখাতে পারেন। আর যেখান থেকে বরবাদী নজরে আসে, সেখান থেকে তিনি নির্মাণ এনে দেখাতে পারেন। লালন-পালনের ব্যবস্থাপনা তিনিই চালান। কোন বস্তু ছাড়া বালুরাশির ওপরও পালতে পারেন, আবার সমস্ত সরঞ্জামাদির মধ্যে রেখেও প্রতিপালনের ব্যবস্থা বিগড়ে দিতে পারেন।
(হজরতজীর জীবনী ৭৬৬ পৃঃ)
৩. আল্লাহর কুদরত থেকে ফায়দা হাসিলের পদ্ধতি
হজরতজী বলেন— আল্লাহ তায়ালার পবিত্র জাতের সাথে সম্পর্ক হওয়া চাই, এবং তাঁর কুদরতের মাধ্যমে সরাসরি ফায়দা হাসিল করা চাই। এর জন্যে হজরত মুহাম্মদ (স) আল্লাহ পাকের পক্ষ থেকে এক পদ্ধতি নিয়ে এসেছেন। যখন তাঁর তরীকা জীবনে বাস্তবায়িত হবে, তখন আল্লাহ জাল্লাশানুহু প্রতি নকসার মধ্যে কামিয়াবী দিয়ে দেখিয়ে দেবেন।
৪. আমাদের দুনিয়া ও আখেরাতের সমস্ত প্রয়োজনাদির মীমাংসার তরীকা
হজরতজী বলেন— আল্লাহ জাল্লা শানুহু আমাদের দুনিয়া ও আখেরাতের সমস্ত প্রয়োজনের মীমাংসা হজরত মুহাম্মদ (স)-এর তরীকায় জীবন অতিবাহিত করার মধ্যে রেখেছেন। তাঁর তরীকা আমাদের জীবনে এসে যাওয়া চাই। আর তার জন্য প্রয়োজন এক মেহনতের, ঐ মেহনতের ওপর বস্তীওয়ালাদেরকে (মহল্লাবাসীদেরকে) উদ্বুদ্ধ করার জন্য গাশ্তের জন্য মসজিদে একত্রিত করা চাই। নামাজের পরে এলান করে লোকদেরকে বসার জন্য বলা চাই। মহল্লার কোন গণ্যমান্য ব্যক্তি বা ইমাম সাহেব এলান করলে সবচেয়ে ভালো হয়। আর যদি তিনি আমাদেরকে করতে বলেন, তাহলে আমাদের কোন সাথী এলান করবে।
(হজরতজীর জীবনী পৃঃ ৭৭৩)
৫. এখলাস সৃষ্টি করার তরীকা
হজরতজী বলেন— প্রত্যেকটি আমলে আল্লাহ জাল্লা শানুহু-এর রেজামন্দির আবেগ হওয়া চাই। কোন আমল দ্বারা দুনিয়া তলব অথবা নিজের পজিশন বানানো উদ্দেশ্য না হওয়া চাই। আল্লাহর রেজামন্দির জয্বা নিয়ে অল্প আমলেও অনেক পুরস্কার দেওয়া হবে। পক্ষান্তরে এখলাস ব্যতীত বড় বড় আমলও পাকড়াও হওয়ার কারণ হবে। নিজের নিয়তকে ঠিক করার জন্য অন্যদের মধ্যে দাওয়াতের মাধ্যমে নিয়তকে সঠিক করার চিন্তা ফিকির ও উৎসাহ উদ্দীপনা সৃষ্টি করা চাই। আমলের পূর্বে নিজের ওপর এবং প্রত্যেকটি আমলের মাঝখানে নিয়তকে ঠিক করার মশ্ক্ বা অভ্যাস করা চাই যে, আমি আল্লাহকে রাজী খুশী করার জন্য এই আমল করছি এবং আমল পূর্ণ হবার পর নিজের নিয়তকে ত্রুটিযুক্ত মনে করে তৌবা ও এন্তেগফার করা চাই। এবং কেঁদে কেঁদে আল্লাহ জাল্লাশানুহুর কাছে এখলাস সৃষ্টি হবার জন্য দোয়া করা চাই।
(হজরতজীর জীবনী পৃঃ ৭৬৯)
৬. তাবলীগ কি?
হজরতজী বলেন— হুজুর পাক (স) যে সমস্ত গুণাবলীর সাথে জীবন অতিবাহিত করতেন এবং যে সব গুণাবলীর সাথে দ্বীনের কাজ করতেন ঐ সব গুণাবলীর নাম তাবলীগ। প্রথম দরজার কথা হলো, শক্তি অন্য কিছুর ওপর খরচ হতে পারবেনা, শুধু আল্লাহর ওপর খরচ হবে। এই গুণ যতোখানি অর্জন হবে তাই দ্বীন হবে। (এটা হলো সংক্ষেপে) আর তার ব্যাখ্যা হচ্ছে এই যে, এভাবে খরচ হবে (অর্থাৎ আদেশ) আর ওভাবে খরচ হবেনা (অর্থাৎ নিষেধ)।
(মকতুবাতে আকাবেরে তাবলীগ পৃঃ ১৫)
৭. গোনাহ থেকে বাঁচার নুসখা (ফর্মুলা)
হজরতজী বলেন— নেক কাজসমূহকে গুনাহ মনে করে কান্না আরম্ভ করে দাও, গোনাহর দরজা বন্ধ হয়ে যাবে। সমস্ত এবাদতের সংক্ষিপ্তসার হলো, দোয়ার মধ্যে শক্তি সৃষ্টি করে নেয়া। তাবলীগের উদ্দেশ্য কি? তাবলীগ হচ্ছে, কাজ করনেওয়ালার গুণ। অর্থাৎ সকল আমলকে তাবলীগের গুণে করা।
(মকতুবাতে আকাবেরে তাবলীগ পৃঃ ১৫)
৮. আল্লাহর বানানোর দ্বারা জীবন গড়ে
হজরতজী বলেন— মানুষ মনে করে যে, ক্ষেত-খামার ও বাগ-বাগিচা দ্বারা জীবন গড়ে, অথচ আল্লাহ পাক সাবা কাওমকে ক্ষেত-খামার ও বাগ-বাগিচা থাকা সত্ত্বেও ধ্বংস করে দিয়েছেন, আর হজরত ইসমাইল (আ)-কে এমন অনাবাদ জায়গায় যেখানে ক্ষেত-খামার ও বাগ-বাগিচার চিহ্নও ছিলোনা পালন করে দেখিয়ে দিয়েছেন। বর্তমানে মানুষের একীন সেনাবাহিনীর ওপর, অথচ আল্লাহ তায়ালা আব্রাহা বাদশার সেনাবাহিনীকে ক্ষুদ্র ও তুচ্ছ পাখী দ্বারা ধ্বংস করে এই একীনকে ভুল প্রমাণিত করেছেন।
(হজরতজীর জীবনী পৃঃ ১২৯)
৯. বস্তুসমূহ অস্থায়ী, আর আল্লাহর কুদরত স্থায়ী
হজরতজী বলেন— দুনিয়ার সমস্ত জিনিস এবং সমস্ত আকার-আকৃতি এবং ঘাসের খড়কুটা থেকে শুরু করে এটম বোমা এবং রকেট পর্যন্ত, এবং এভাবে সমস্ত শক্তি ও সমস্ত রাষ্ট্রক্ষমতা আল্লাহ পাকের কুদরতের অধীন। এ সমস্ত জিনিস নিজে কুদরত নয় ; বরং কুদরত তাদের ওপর জোর-জবরদস্তি খাটায়। এসব জিনিস অস্থায়ী, আর কুদরত অপরিবর্তনশীল ও স্থায়ী। আল্লাহ তায়ালা বস্তুর মাধ্যমে জীবনকে গড়েন ও আবার নষ্টও করেন। সফলকামও করেন, আবার অকৃতকার্যও করেন। মোট কথা যা কিছু হয় বস্তু থেকে হয়না বরং আল্লাহর হুকুম এবং তাঁর কুদরতের দ্বারা হয়।
(হজরতজীর জীবনী পৃঃ ১৩০)
১০. লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লার উদ্দেশ্য বা মর্ম কি?
হজরতজী বলেন— লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহর মর্মার্থ এই যে, আল্লাহ ব্যতীত কারো কাছ থেকে কিছু হবেনা এবং কিছু পাওয়া যাবেনা। শুধু আল্লাহ পাকের করার দ্বারাই হবে এবং পাওয়া যাবে। আর তাঁর ফজল ও করম তখনই হবে, যখন আমাদের জীবন এবং বস্তুর মধ্যে আমাদের লেগে মোহাম্মদ (স)-এর তরীকার ওপর হবে।
(হজরতজীর জীবনী পৃঃ ১৩০)
১১. আল্লাহ একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী, যে কোন বস্তুর মাধ্যমে যে কোন ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করতে পারেন
হজরতজী বলেন— আল্লাহ তায়ালা কুদরতওয়ালা, যে কোন আকৃতি থেকে যে কোন বস্তু বানাতে পারেন, অথবা কোন আকার-আকৃতি ছাড়া শুধু আপন কুদরত ও হুকুম দ্বারাই বস্তু বানাতে পারেন। এভাবে তিনি এ কথারও কুদরত রাখেন যে, যে কোন বস্তু থেকে যে কোন ক্রিয়া বা প্রভাব চান প্রকাশ করে দিতে পারেন। পানি দ্বারা চাইলে ডোবাতেও পারেন, আবার চাইলে ভাসাতেও পারেন। আগুন দিয়ে চাইলে জ্বালাতেও পারেন, আবার চাইলে নাও জ্বালাতে পারেন। খাদ্য দ্বারা চাইলে পেট ভরাতে পারেন, আবার চাইলে নাও ভরাতে পারেন। মৃত্যুর জায়গা থেকে চাইলে জীবন দান করতে পারেন, আর জীবনের উপকরণ থেকে চাইলে মারতেও পারেন।
(হজরতজীর জীবনী পৃঃ ১২৯)
১২. আল্লাহর কাছে বড় শক্তিসমূহের অবস্থান
হজরতজী বলেন— তোমরা হুজুরে পাক (স)-এর নমুনার ওপর জীবনকে গড়তে শুরু কর, যতোটা গড়ার গড়ে যাবে, আর যারা গড়ার মতো নয়, এবং জীবন গঠনকারীদের জন্য বাধা হয়ে দাঁড়াবে, আল্লাহ পাক তাদেরকে এমনভাবে তছনছ করে দেবেন যেমনিভাবে ডিমের ছিলকাকে ভেঙ্গে ফেলা হয়। তোমরা যাকে বড়শক্তি মনে কর, আল্লাহর কাছে তার অবস্থান মাকড়সার জালের সমানও নয়। পৃথিবীতে পবিত্র মানুষের অনস্তিত্বের কারণে মাকড়সার বড় বড় জাল ছেয়ে গিয়েছিলো। যখন হুজুরে আকরাম (স)-এর মেহনত দ্বারা পবিত্র মানুষ তৈরী হয়ে গেলো, তখন আল্লাহ পাক আজাবের ঝাড়ু দ্বারা রোমান সাম্রাজ্য ও পারস্য সাম্রাজ্যের সমস্ত জাল পরিষ্কার করে দিয়েছিলেন।
অবিকল এ অবস্থাই বর্তমান রাশিয়া ও আমেরিকার হবে।
(হজরতজীর জীবনী পৃঃ ৫০)
১৩. এটম বোম দ্বারা ওটাই হবে যা আল্লাহ চাইবেন
হজরতজী বলেন— এটম বোমকে ভয় পাওয়া এমন, যেমন কাফের মুশরেকরা পাথরের মূর্তিকে ভয় পেতো এবং তাদের কাছ থেকে কিছু পাওয়ার আশাও করতো। এটম বোম এবং এটম বোমের অধিকারীদের ঘাড়সমূহ কুদরতের হাতে অবনত। এটম থেকে ওটাই হবে যা আল্লাহ চাইবেন। ফেরাউন ও “এ সমস্ত নদী আমার অধীনে প্রবাহিত হয়” বলতো, কিন্তু আল্লাহ পাক ঐ পানিকেই তার ডোবার কারণ ও ধ্বংসের বস্তুতে পরিণত করেছেন।
(হজরতজীর জীবনী পৃঃ ৫০)
১৪. আল্লাহ চাইলে ধ্বংস ও অপমানের বস্তুকে লালন-পালন ও সম্মানের বস্তুতে পরিণত করতে পারেন
হজরতজী বলেন— যখন কিছুই ছিলোনা, আল্লাহ পাক সমস্ত কিছু বানিয়ে দিয়েছেন। এবং শেষ পর্যন্ত কিছুই থাকবেনা আল্লাহ পাক আবার সবকিছু বানাবেন। তিনি সৃষ্টি করার ব্যাপারে মা-বাপের মুখাপেক্ষী নন। হজরত আদম (আ) হাওয়া (আ) এবং ঈসা (আ)-এর সৃষ্টি তার প্রমাণ। তেমনিভাবে কেয়ামতের দিন বৃষ্টি হবে আর মানুষ জমিন থেকে আঙ্গুর ফলের মতো বের হতে থাকবে। তিনি চাইলে ধ্বংস ও অপমানের বস্তুকেই লালন-পালন ও সম্মানের বস্তুতে পরিণত করতে পারেন।
ইব্রাহীম (আ)-এর জন্য আগুনকে, ইউনুস (আ)-এর জন্য মাছের পেটকে, ইসমাঈল (আ)-এর জন্য জীবন ধারণের সমূহ উপকরণ থেকে শূন্য বিজন প্রান্তর ও মরুভূমিকে, ইউসুফ (আ)-এর জন্য জেলখানাকে এবং হুজুরে আকদাস (স)-এর জন্য গারে ছাওরকে হেফাজত, সম্মান ও লালন-পালনের সামান বানিয়ে দিয়েছিলেন।
(হজরতজীর জীবনী পৃঃ ৫১)
১৫. ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত অবস্থা বিশুদ্ধ হবার একক ভিত্তি
হজরতজী বলেন— আমি পৃথিবীকে দারুল আস্বাব বা উপকরণ বিশিষ্ট বলে মনে করি, কিন্তু মানুষের ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত সফলতা, প্রশান্তি, অধিকার, প্রিয় হওয়া, কেন্দ্রিকতা, শক্তি এবং সমস্ত ভালো অবস্থার একক ভিত্তি হুজুরে পাক (স)-এর আগমনের পর হুজুর (স)-এর করা আমলসমূহ। যখন কোন ব্যক্তি, গোষ্ঠী, খান্দান, দল, জাতি অথবা দেশে হুজুরওয়ালা আমল এসে যাবে, আল্লাহ পাক তাদেরকে উভয় জাহানে সফল করবেন। চাই তাদের কাছে দুনিয়াবী আসবাব থাকুক বা নাইই থাকুক।
(হজরতজীর জীবনী পৃঃ ৫১)
১৬. নিজের মধ্যে সূর্যের গুণাবলী সৃষ্টি করো
হজরতজী বলেন— তোমরা যদি পৃথিবীতে সূর্যের মতো আলো নিয়ে ঘুরাফেরা কর, তাহলে তোমাদের কাছ থেকে আলো প্রসারিত হবে। আর তোমাদের আলো আসবে ঈমানের দ্বারা, এবং হজরত মোহাম্মদ (স)-এর আনীত আমল ও আখলাক দ্বারা এবং খাঁটি নিয়তে দ্বীনের দাওয়াত দেয়ার দ্বারা। সূর্যের মধ্যে তিনটি জিনিস আছে, একটা এই যে, সে আলো নিয়ে ঘোরে ফেরে। দ্বিতীয় এই যে, অনবরত ঘোরে। তৃতীয় এই যে, যাদেরকে আলো দেয়, তাদের কাছ থেকে কোন রকম বিনিময় নেয়না। তোমাদের অবস্থাও এটাই হওয়া চাই। আলো নিয়ে ঘোরো, এবং অনবরত ঘোরো। আর “তোমাদের কাছে এর কোন বিনিময় চাই না।” এ কথাকে নিজেদের মূলনীতি বা উসূল বানাও। দাওয়াতের আমল দ্বারা কোন রকম উপকার হাসিল করোনা।
(হজরতজীর জীবনী পৃঃ ১৬১)
১৭. দ্বীন একমাত্র দাওয়াতের রাস্তায় ত্যাগ ও কোরবানী দ্বারা এবং দোয়ার মাধ্যমে চমকাবে
হজরতজী বলেন— এ ধরনের মানুষের প্রয়োজন, যারা আমেরিকা ও রাশিয়ার বস্তুবাদী পরিবেশেও এই একীন ও বিশ্বাসের ওপরই জমে থাকবে যে, দ্বীন শুধু দাওয়াতের রাস্তায় কোরবানী দ্বারা আর কোরবানীর পর দোয়ার মাধ্যমেই চমকাবে। আর একীনের সাথে দাওয়াতের রাস্তায় কোরবানী দিতে থাকবে এবং আল্লাহ তায়ালার প্রভাবশালী কুদরত ও কুন-ফায়াকুনী শানের ওপর নজর রেখে আশা ও বিশ্বাসের সাথে হেদায়েতের দোয়া আর যাদের অন্তরে কুফুরীর সীল লেগে গেছে এবং তাদের কারণে হেদায়েতের রাস্তা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, তাদের জন্য ধ্বংসের দোয়া করবে। তখন হয়তো হেদায়েতের দরজা খুলে যাবে, নতুবা তাই হবে, যা শাদ্দাদ ও নমরুদ এবং ফেরাউন ও হামানের সাথে হয়েছিলো।
১৮. এটা মুল্ক্ ও মালওয়ালা রাস্তা নয়
হজরতজী বলেন— যারা এখলাসের সাথে কোরবানী দিতে থাকবে, তাদের দিকে মুল্ক্ ও মালওয়ালারা একদিন খোদ ঝুঁকে পড়বে। ঐ সময়টা অত্যন্ত পরীক্ষার হবে। যদি তাদের দৃষ্টি ক্ষমতাও মালের ওপর হয়, এবং এ কথা মনে করা হয় যে, এখন তাদের মাল ও ক্ষমতা দ্বারা দ্বীনের কাজ চলবে, তাহলে সব করা কাজ নষ্ট হয়ে যাবে। আর যদি তাদের মুল্ক্ ও মাল থেকে দৃষ্টি হটিয়ে তাদেরকেও কোরবানীর রাস্তায় লাগানো হয়, তখন আবার তাদের চেয়েও আরো বড়রা আসবে, ওদের সাথেও এই ব্যবহারই করতে হবে। এমনকি সরকার প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত আসবে, তাদেরকেও এই রাস্তায়ই লাগাতে হবে। হজরত মুহাম্মদ (স)-এর রাস্তা দাওয়াত এবং ত্যাগ-তিতিক্ষার রাস্তা, মুল্ক্ ও মালের রাস্তা নয়।
(হজরতজীর জীবনী পৃঃ ১৬১)
১৯. এই খেয়াল ভুল যে, মুলক ও মাল হাতে আসলে পর ইসলাম চমকাবে
হজরতজী বলেন— এই খেয়াল ভুল যে মুলক ও মাল হাতে আসলে পর ইসলাম চমকাবে। মুল্ক্ ওয়ালারাতো ইসলামকে জীবন্ত কবর দিচ্ছে। বর্তমানে যাদের হাতে ক্ষমতা এবং তার কোষাগার, তারা হজরত আবুবকর ও ওমর (রা)-এর প্রতিনিধি নয়; বরং কায়সার ও কেস্রা এবং শাদ্দাদ-কারুনের প্রতিনিধি। তাদের মাধ্যমে ইসলামের জীবন্ত হওয়ার আশা করা বিলকুল গলত। তাদেরকে দেখেতো অন্তর বলে যে, “أنى يحيي هذه الله بعد موتها” অর্থাৎ আল্লাহ এই মৃতদের মধ্যে এখন কিভাবে প্রাণ দেবেন?
ইসলাম যখনই চমকেছে ত্যাগ-তিতিক্ষার মাধ্যমে চমকেছে। এখনো কোরবানীর মাধ্যমে চমকাবে। ইসলামের জন্য যদি কোরবানী হয়, তখন তা শত্রুর বেষ্টনীর মধ্যেও চমকিতে থাকে। আর যখন কোরবানী হয়না, তখন নিজের বাদশাহী থাকা সত্ত্বেও ইসলাম মুছে যায়।
(হজরতজীর জীবনী পৃঃ ১৬০)
২০. বস্তুর পরিবর্তে নিজের শরীরের ওপর মেহনত করবে
হজরতজী বলেন— মানুষ পৃথিবীতে দু’টি বস্তুর ওপর মেহনত করে। প্রথম, এই পৃথিবীর বস্তুর ওপর, দ্বিতীয়, নিজের শরীরের ওপর। দুনিয়ার বস্তুসমূহের ওপর যেমন ঘর-বাড়ী, জমি-জমা, ব্যবসা-বাণিজ্য, কারখানা ও চাকরি বাকরি। আর মানুষ যে জিনিসের ওপর মেহনত করে, পুরো মনোযোগ সে দিকে থাকে। অন্তর ঐ সমস্ত জিনিসের মধ্যে আটকা পড়ে থাকে। ফলাফল এই দাঁড়ায় যে, নিজের শরীরের পূর্ণতা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। মরার পর এ সমস্ত জিনিসের ওপর কৃত মেহনত সমস্ত বেকার সাব্যস্ত হবে। মানুষ এই পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ খালি চলে যাবে। আর হাশর মাঠে যখন নিজের শরীরের ওপর মেহনতকারীদের দেখবে, তখন নিজের ওপর শুধু কাঁদবে, এতো কাঁদবে যে, অশ্রুর সাগর বয়ে যাবে।
(হজরতজীর জীবনী পৃঃ ৬২৫)
সূচিপত্র | পরের পর্ব (বাণী ২১–৪০) →
মূল বই: মালফুজাতে হযরতজী মাওলানা ইউসুফ (রহঃ)। সংকলন: মুফতি রওশন শাহ কাসেমী। অনুবাদ: ইসহাক ওবায়দী। প্রকাশক: বাড কম্প্রিন্ট এন্ড পাবলিকেশন্স, ঢাকা। বইটির স্ক্যান কপি archive.org-এ পাওয়া যাবে।
