মালফুজাতে হযরতজী – পর্ব ২: বাণী ২১–৪০
হযরতজী মাওলানা মুহাম্মদ ইউসুফ কান্ধলভী (রহঃ)-এর বাণী সংকলন মালফুজাতে হযরতজী মাওলানা ইউসুফ (রহঃ) বইয়ের ২১ থেকে ৪০ নম্বর বাণী এই পর্বে দেওয়া হলো। সম্পূর্ণ সূচি ও বইয়ের ভূমিকা দেখুন।
সংকলন: মুফতি রওশন শাহ কাসেমী। অনুবাদ: ইসহাক ওবায়দী। প্রকাশক: বাড কম্প্রিন্ট এন্ড পাবলিকেশন্স, ঢাকা।
এই পর্বে যা আছে
- ২১. নিজের শরীরের ওপর মেহনত করার উপকারিতা
- ২২. আল্লাহর ওয়াস্তে একত্রিত হওয়ার উপকারিতা
- ২৩. আমলের আগে দেখা উচিত যে, এই আমল হুজুর (স)-এর দরবারে কিভাবে ছিলো
- ২৪. সৃষ্টিজগত প্রতিটি অবস্থায় স্রষ্টার মোহতাজ
- ২৫. আল্লাহর জন্য কোন কাজ কঠিন নয়
- ২৬. যতোক্ষণ পর্যন্ত আমাদের মধ্যে আখলাক আসবেনা, ততোক্ষণ পর্যন্ত অন্যদের মধ্যে দ্বীন প্রসার লাভ করবেনা
- ২৭. দরিদ্র লোকেরা এই আমলের শক্তি ও প্রাণ
- ২৮. আমরা প্রচলিত নিয়মের কোন ভিন্ন দল তৈরী করিনি
- ২৯. যা কিছু বস্তু থেকে হয় বলে দৃশ্যমান হয়, তা আল্লাহর হুকুমে হয়
- ৩০. আল্লাহর আত্মীয়তা কারো সাথে নেই, তাঁর ওখানে কিছু নিয়ম কানুন শুধু আছে
- ৩১. পরস্পরে ভাঙ্গন সৃষ্টিকারী বস্তুসমূহ
- ৩২. দাওয়াতের কাজের দাবী আদায় করলে এক যবরদস্ত বিপ্লব দেখা দেবে
- ৩৩. সাথীদের খুবীগুলোর প্রতি আমাদের দৃষ্টি থাকা চাই
- ৩৪. হুজুর (স)- এর তরীকা ব্যতীত মাল-দৌলত তো পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু প্রশান্তি কখনো পাওয়া যাবেনা।
- ৩৫. চোখ শুধু প্রত্যেক বস্তুর কায়া দেখে, আসলকে দেখেনা
- ৩৬. আসল জিনিস আল্লাহর সিদ্ধান্ত এবং তাঁর সাহায্য
- ৩৭. আল্লাহ তায়ালার সাহায্য কখন আসে?
- ৩৮. তাবলীগের উদ্দেশ্য
- ৩৯. আমাদের সমস্যা কখন ঠিক হবে?
- ৪০. সর্বাবস্থায় আল্লাহর সাথেই সম্পর্ক কায়েম করা চাই
২১. নিজের শরীরের ওপর মেহনত করার উপকারিতা
হজরতজী বলেন— নিজের শরীরের ওপর মেহনত করা অর্থাৎ নিজের জিহ্বার ওপর মেহনত, নিজের কানের ওপর মেহনত, নিজের চোখের ওপর মেহনত, নিজের অন্তরের ওপর মেহনত, মোট কথা শরীরের প্রতিটি অঙ্গের ওপর মেহনত করার দ্বারা এমন এক মরতবা পর্যন্ত পৌঁছে যাবে যে, শুধু একটিমাত্র পলকে এই পুরো সৃষ্টিজগত থেকে কোটিগুণ বেশী দামী বেহেশত দান করা হবে। আপনি কোথাও যাচ্ছেন, সামনে কোন পরনারীর ওপর দৃষ্টি পড়লো, অন্তর বললো, এখন যদি চোখ নিক্ষেপ কর, তাহলে বরবাদ হয়ে যাবে, চোখ তখন ভিন্ন দিকে ফিরে গেলো। চোখকে এই একটি বার ফিরিয়ে রাখার জন্য আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জত এমন কিছু দান করবেন, যা চিন্তা করাও সম্ভব নয়। ঐ দান করা বস্তু থেকে যদি কোন একটিও এই পৃথিবীতে এসে পড়ে, তাহলে সমস্ত পৃথিবী জুড়ে তা অর্জন করার জন্য যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে।
(হজরতজীর জীবনী পৃঃ ৬২৫)
২২. আল্লাহর ওয়াস্তে একত্রিত হওয়ার উপকারিতা
হজরতজী বলেন— শুধু আল্লাহর ওয়াস্তে এভাবে একত্রিত হওয়া ব্যক্তিদের ওপর আল্লাহর ফেরেশতারা আসমান থেকে জমিন পর্যন্ত বেষ্টনী দিয়ে রাখে এবং নিরাপত্তা ও শান্তি বর্ষণ করে থাকে। আল্লাহ করুক, বর্তমানে পৃথিবীতে শুধু আল্লাহর ওয়াস্তেই যেনো মানুষ একত্রিত হতে থাকে। যদ্বারা আল্লাহর রহমত এই জমিনের ওপর অবতীর্ণ হয় এবং মানুষ অন্তরের প্রশান্তিকে আলিঙ্গন করতে পারে।
২৩. আমলের আগে দেখা উচিত যে, এই আমল হুজুর (স)-এর দরবারে কিভাবে ছিলো
হজরতজী বলেন— প্রতিটি আমলে এই নিয়তে শরীক হওয়া যে, এ আমলটি দরবারে নববীতে কিভাবে ছিলো? যে আমল করছি তার মধ্যে ছ’ নম্বর জুড়ে দাও। কলেমাওয়ালা অন্তর, নামাজের পদ্ধতি, এলেমের তালাশ, যিকিরের অবস্থা, অন্যের মধ্যে চেষ্টা-তদবীর, আল্লাহর সন্তুষ্টি।
(মকতুবাতে আকাবেরে তাবলীগ পৃঃ ১৫৭)
২৪. সৃষ্টিজগত প্রতিটি অবস্থায় স্রষ্টার মোহতাজ
হজরতজী বলেন— হুজুরে আকরাম (স) একটি প্রশ্নের উত্তরে এতোটুকু বলেছেন যে, আগামীকাল বলবো, এর ওপর ওহী নাজিল হলো, যার অর্থ এই যে, কোন বিষয়ে আপনি ইনশায়াল্লাহ বলা ব্যতীত আগামীকাল করবো, এভাবে বলবেন না। অথচ তোমাদের মুখে সবসময় এটাই থাকে যে, আমরা এই করেছি, আমরা এই করছি এবং আমরা এই করে ফেলবো ঐ করে ফেলবো। অথচ ঘটনা এই যে, তোমরা যদি নিজের ইচ্ছামাফিক মরতেও চাও, তাও পারবেনা। সৃষ্টি করার গুণ শুধু স্রষ্টার মধ্যেই আছে। সমস্ত সৃষ্টিজগত আপন জন্ম, শৃঙ্খলা বিন্যাস ও স্থায়িত্বের মধ্যে প্রতিটি অবস্থায় স্রষ্টার মুখাপেক্ষী।
(হজরতজীর জীবনী পৃঃ ৫০)
২৫. আল্লাহর জন্য কোন কাজ কঠিন নয়
হজরতজী বলেন— হজরতজীর ভাষণের পর এক ব্যক্তি বলে উঠলো, হজরত! এই কাজতো ভালো, কিন্তু পৃথিবী ভরা দ্বন্দ্ব ও অনৈক্য এর দ্বারা কিভাবে ঠিক হবে? উত্তরে হজরতজী বললেন, যদি আমার অথবা আপনার কিংবা তাবলীগ জামাতের করার ওপর হতো, তাহলে ভাবনার বিষয় ছিলো, আমিতো আল্লাহর করার দ্বারা হবে বলে বলছি, তাহলে আর কি প্রশ্ন থাকতে পারে? একথাও কি বলা যাবে যে, এই কাজ আল্লাহ কিভাবে করবেন?
(হজরতজীর জীবনী পৃঃ ৫০)
২৬. যতোক্ষণ পর্যন্ত আমাদের মধ্যে আখলাক আসবেনা, ততোক্ষণ পর্যন্ত অন্যদের মধ্যে দ্বীন প্রসার লাভ করবেনা
হজরতজী বলেন— যতোক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহর অস্তিত্বের একীন এবং নবুওয়াতি এলেম মোতাবেক এবাদত ঠিক হবেনা, ততোক্ষণ পর্যন্ত আখলাক আসেনা, আর যতোক্ষণ পর্যন্ত আমাদের মধ্যে আখলাক আসবেনা, ততোক্ষণ পর্যন্ত ভিন্নধর্মীদের মধ্যে দ্বীন ছড়াবেনা। কোন মতলবে কারো সাথে ভালো ব্যবহার করা আখলাক নয়। বরং কোন কাজই যতোক্ষণ পর্যন্ত তার মধ্যে এখলাস হবেনা, নিশ্চিত তার কোন মূল্য হবেনা। একদিন এক মজলিস থেকে উঠেছেন এবং হজরত মুফতি যয়নুল আবেদীন সাহেবের কাঁধের ওপর হাত রেখে বললেন ঃ ‘মুফতি সাহেব! এখলাস ব্যতীত আমল মুরদারই তো বটে। আর দেখ! ঘরে-বাইরে, বাজারে-অফিসে, এমনকি মাদ্রাসা ও মসজিদসমূহেও এ ধরনের মুরদারের স্তুপ পড়ে আছে।
(হজরতজীর জীবনী পৃঃ ৫৩)
২৭. দরিদ্র লোকেরা এই আমলের শক্তি ও প্রাণ
হজরতজী বলেন— গরীবরা এই আমলের শক্তি ও প্রাণ। গরীবদের মধ্যে যতোটুকু এই আমলের অধিকতর ব্যস্ততা বাড়বে, ততোটুকুই আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জতের রহমত মোতাওয়াজ্জুহ বা মনোযোগী হবে। এবং গায়েবী শক্তি দ্বীনের আধিক্য ও তরতাযা হওয়ার দিকে মোতাওয়াজ্জুহ হবে।
(মকতুবাতে আকাবেরে তাবলীগ পৃঃ ১০৪)
২৮. আমরা প্রচলিত নিয়মের কোন ভিন্ন দল তৈরী করিনি
হজরতজী বলেন— আমরা এই কাজের জন্য কোন মিলনায়তন তৈরী করিনি। না তার কোন অফিস আছে, না রেজিষ্ট্রীখাতা, না কোন ফান্ড আছে। এটা সম্পূর্ণই সকল মুসলমানের কাজ। আমরা প্রচলিত নিয়মের কোন ভিন্ন দলও তৈরী করিনি। যেভাবে নামাজ পড়ার জন্য বিভিন্ন তবকা ও পেশার মুসলমানরা এসে জুড়ে যায়, এবং নামাজ থেকে অবসর হয়ে নিজ নিজ ঘরে ও পেশায় চলে যায়, এভাবেই আমরা আপনাদের সবাইকে বলছি যে, কিছু সময়ের জন্য নিজ নিজ ঘর এবং কাজ থেকে বের হয়ে এই মেহনত ও অভ্যাস করে নিন। অতঃপর আপন ঘর এবং কাজে ফিরে এসে ঐ সমস্ত নিয়ম বা উসূল অনুযায়ী কাজে লেগে যান। আপনারা যদি এই কাজ মেহনতকরে অর্জন করে ফেলেন, তাহলে পৃথিবীর সমস্ত বিজ্ঞানীরা আপনাদের কাছ থেকে এই কাজ বা পদ্ধতি শেখার জন্য
আসবে। আর আল্লাহ চাইলে আপনারা পৃথিবীর নেতা হবেন।
(সাওয়ানেহে হজরতজী পৃঃ ৭৫০)
২৯. যা কিছু বস্তু থেকে হয় বলে দৃশ্যমান হয়, তা আল্লাহর হুকুমে হয়
হজরতজী বলেন— যা কিছু বস্তু থেকে হয়েছে বলে এবং প্রকাশ হয়েছে বলে নজরে আসে, এ সব বস্তু থেকে হয়না; বরং আল্লাহ তায়ালার হুকুমে হয়। যদি এই তত্ত্ব অন্তরের মধ্যে পুরোপুরিভাবে বসে যায়, তাহলে বাজারের নকসা থেকে জীবনের ভিত্তি হটে গিয়ে দোয়ার ওপর এসে যায়। এবং বড় থেকে বড় এবং কঠিন থেকে কঠিন ঘাঁটি আল্লাহ পাকের কুদরতে কামেলায় সহজ থেকে
সহজতর হয়ে যায়।
(তাবলীগি তাহ্রীক পৃঃ ৪১)
৩০. আল্লাহর আত্মীয়তা কারো সাথে নেই, তাঁর ওখানে কিছু নিয়ম কানুন শুধু আছে
হজরতজী বলেন— নিজের নফ্স্ এবং নিজের শরীরকে কোরবান করা হবে তো উম্মত বনবে, আর উম্মত বনে গেলে সম্মান পাওয়া যাবে। মান-অপমান আমেরিকা-রাশিয়ার নকসায় নেই; বরং আল্লাহর হাতের মধ্যে, আর তাঁর ওখানে কিছু নিয়ম-কানুন আছে। যেই ব্যক্তি অথবা গোষ্ঠী কিংবা বংশ অথবা তবকা চমকাবার নিয়ম-কানুন এবং আমল অবলম্বন করবে, তাদেরকে চমকিয়ে দেবেন। আর যারা ধ্বংসের নিয়ম-কানুন এবং আমল অবলম্বন করবে তাদেরকে ধ্বংস করে দেবেন। ইহুদীরা নবীদের বংশধর, নিয়ম-কানুন লংঘন করেছে, তখন আল্লাহ তায়ালা হোচট দিয়ে তাদেরকে ভেঙ্গে দিয়েছেন। সাহাবায়ে কেরাম (রা) মূর্তিপূজকদের সন্তান ছিলেন, তাঁরা চমকাবার মতো নিয়ম-কানুন ও আমল অবলম্বন করেছেন, তখন আল্লাহ তায়ালা তাঁদেরকে চমকিয়ে দিয়েছেন। আল্লাহর আত্মীয়তা কারো সাথে নেই, তাঁর ওখানে কিছু নিয়ম-কানুন শুধু আছে।
(তাযকেরায়ে হজরতজী পৃঃ ১৫৯)
৩১. পরস্পরে ভাঙ্গন সৃষ্টিকারী বস্তুসমূহ
হজরতজী বলেন— এই অবজ্ঞা ও ঠাট্টামশ্কারী এবং দোষ তালাশ ও গীবত শেকায়েত, সব ঐ সমস্ত বস্তু, যা পরস্পরে মতভেদ সৃষ্টি করে উম্মতের ঐক্য নষ্ট করে। এই সমস্ত জিনিস কে হারাম করা হয়েছে। আর একে অপরের একরাম ও সম্মান করা যা দ্বারা উম্মত জুড়ে এবং ঐক্য হয়, তার তাকিদ করা হয়েছে। এবং অন্যের কাছ থেকে নিজের সম্মান চাওয়া কে নিষেধ করা হয়েছে। কেননা, এ থেকে উম্মত বনেনা বরং বিভক্ত হয়। উম্মত তখনই বনবে, যখন উম্মতের প্রতিটি ব্যক্তি এই সিদ্ধান্ত করে নেবে যে, আমি সম্মানের যোগ্য নই, তাই আমাকে ইজ্জত পেতে হবেনা; বরং অন্যকে ইজ্জত করতে হবে। অন্য সবাই ইজ্জতের যোগ্য, তাই তাদের ইজ্জত আমাকে করতে হবে, তাদের একরাম আমি করবো।
(তাযকেরায়ে হজরতজী পৃঃ ১৫৮)
৩২. দাওয়াতের কাজের দাবী আদায় করলে এক যবরদস্ত বিপ্লব দেখা দেবে
হজরতজী বলেন— হাইড্রোজেন বোম এবং এটম বোম কে ভয় পাওয়া এমনই, যেমন মূর্তিপূজকরা তাদের মূর্তিকে ভয় পায়। যদি তোমরা এই দাওয়াতওয়ালা কাজে লেগে থাকার হক আদায় কর, তাহলে এটম বোম এবং হাইড্রোজেন বোমওয়ালারা নিজেদের মালপত্র ও উপকরণসহ তোমাদের গোলাম হয়ে যাবে।
(তাযকেরায়ে মাওলানা ইউসুফ পৃঃ ১৯৩)
৩৩. সাথীদের খুবীগুলোর প্রতি আমাদের দৃষ্টি থাকা চাই
হজরতজী বলেন— খারাপ এবং দুর্বলতা থেকে কেউই মুক্ত নয়। যদি আল্লাহর ওলিকেও দেখ, তখন কোন না কোন দুর্বলতা তাঁর মধ্যেও পাওয়া যাবে, যার কারণে তাঁর সম্পর্কে ঘৃণার উদ্রেক হয়। তাই শুধু (পরের) খুবী দেখ, কারো গোপন জীবনের প্রতি নজর দিওনা, তার তত্ত্ব-তালাশে পড়বেনা।
(তাবলীগ কা মাকামী কাম পৃঃ ৩২)
৩৪. হুজুর (স)- এর তরীকা ব্যতীত মাল-দৌলত তো পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু প্রশান্তি কখনো পাওয়া যাবেনা।
হজরতজী বলেন— যে ব্যক্তি জগতের স্রষ্টা ও জগতের আলমূল হুজুর (স)-কে জানা এবং মানা ব্যতীত জগতের বস্তুসমূহে প্রবেশ করে, তার অবস্থা চোর এবং ডাকাতদের মতো, তাদের মাল-দৌলত তো অর্জন হয়ে যেতে পারে, তবে প্রশান্তি ও প্রিয়তা কক্ষণো পাওয়া যেতে পারেনা, আর একথাও বলতেন যে, স্বয়ং জগতের স্থায়ীত্ব শুধু ঐ সময় পর্যন্তই আছে, যতোক্ষণ তার মধ্যে হুজুর (স)-এর আমল মজুদ থাকবে। যখন তার আমল সমূহ থেকে একটা আমলও বাকী থাকবেনা, তখন ঐ মরা লাশকে দাফন করে দেয়া হবে। إذا السماء انفطرت – الآية
(তাযকেরায়ে হজরতজী পৃঃ ৫১)
৩৫. চোখ শুধু প্রত্যেক বস্তুর কায়া দেখে, আসলকে দেখেনা
হজরতজী বলেন— মেহনতের দু’টি ক্ষেত্র, একটা জমিন এবং জমিন থেকে উৎপাদিত বস্তুসমূহ। আর অন্যটি ঈমান এবং ঈমানওয়ালা আমল। প্রথম মেহনতের বিনিময় পৃথিবীতে পাওয়া যায়, কিন্তু এমন পাওয়া যায়না যে, মেহনতকারী তার ওপর সন্তুষ্ট এবং শান্ত।
দ্বিতীয় মেহনতের বিনিময় দুনিয়া ও আখেরাতে আল্লাহ তায়ালা পুরো পুরো দেবেন, এখানে যা কিছু দৃষ্টিগোচর হয় তা অনেক অসম্পূর্ণ।
বেচারা চোখের অবস্থা এই যে, সে প্রত্যেক জিনিসের শুধু কায়াকে দেখে, আসলকে দেখেনা। কোন শরীরবিশিষ্ট বস্তুর শুধু ওপর থেকে দৃষ্টিগোচর হওয়া অংশ এবং আকৃতিকেই দেখা যেতে পারে, তার অন্তরকে দেখা সম্ভব হয়না। সীমাতো এই যে, খোদ নিজেকে দেখাও সম্ভব হয়না। আল্লাহ তায়ালার গায়বী ব্যবস্থাপনা যা নজরে আসেনা, তা লক্ষ্য কোটি গুণ বেশী প্রশস্ত।
আবার চোখ কোন বস্তুর না প্রথম দেখে না শেষ, শুধু তার অবস্থা দেখে। প্রত্যেক বস্তু প্রথম দিকে মাটি ছিলো, শেষেও আবার মাটি হয়ে যাবে। চোখ না ঐ সময়কে দেখেছে, যখন সে প্রথমে মাটি ছিলো, না সে ঐ সময়কে দেখতে পাচ্ছে, যখন সে আবার মাটি হয়ে যাবে। বরং শুধু তাকে বর্তমান আকৃতিতে দেখছে। যখন কোন বস্তুকে দেখ, তখন ভাব যে, কিছুনা, এটা প্রথমে মাটি ছিলো, আল্লাহর কুদরতে তার এই আকৃতি ধারণ করেছে, এবং আবার একদিন তাকে মাটি হয়ে যেতে হবে। নিজের সম্পর্কেও এটাই ভাববে। কোরআন শরীফে বলা হয়েছে—
منها خلقنكم وفيها نعيدكم ومنها نخرجكم تارة أخرى
অর্থাৎ তোমাদেরকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছি, এবং মাটিতে আবার ফিরিয়ে দেবো, এবং মাটি থেকে আবার দ্বিতীয় বার বের করবো।
নামাজের প্রতি রাকাতে দু’টি সেজদা রাখা হয়েছে, তার এটাও একটা হেকমত যে, যখন প্রথম সেজদায় যাবে, তখন স্মরণ করবে যে, আমাকে জমিনের মাটি থেকে বানানো হয়েছে, আবার দ্বিতীয় সেজদায় স্মরণ করবে যে, জীবনের মেয়াদ শেষ করে আবার এই জমিনে সংযোজিত হয়ে যেতে হবে। এবং আবার তা থেকে উঠে আল্লাহর দরবারে হাজেরী দিতে হবে। এবং নিজের জীবনের হিসাব দিতে হবে।
৩৬. আসল জিনিস আল্লাহর সিদ্ধান্ত এবং তাঁর সাহায্য
হজরতজী বলেন— নবীদের বার্তা ও অভিজ্ঞতা এই যে, সমস্যার সমাধান এবং সফলতা নামাজের মধ্যে আছে, না রাজত্বের মধ্যে, আর না সংখ্যাগরিষ্ঠতার মধ্যে; বরং আল্লাহর হুকুমের সাথে সম্পর্কিত হয়ে যাওয়ার মধ্যে এবং তাঁর রাস্তায় মেহনত মোজাহাদা করার মধ্যে।
কোরআন শরীফে আম্বিয়া (আ)-এর যেসব ঘটনাবলী বর্ণনা করা হয়েছে, তার সবের সংক্ষেপ ও সারসংক্ষেপ এটাই। হজরত নূহ (আ) ও তাঁর জাতির ঘটনা, হজরত ইব্রাহীম (আ) ও তাঁর জাতি এবং নমরুদের ঘটনা, এভাবে হজরত মূসা (আ) এবং ফেরাউন ও কারুনের ঘটনা কোরআন শরীফে পড়ুন এবং চিন্তা-ফিকির করুন। ঐ সব ঘটনার মজ্জা কথা এটাই যে, সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং মাল-দৌলত ও রাজত্ব কিছুই না, আসল বস্তু আল্লাহর সিদ্ধান্ত এবং তাঁর সাহায্য। আর তা ঐ সমস্ত বান্দাদের সাথে আছে যারা তাঁর হয়ে যাবে, এবং তাঁর রাস্তায় ত্যাগ তিতিক্ষা করতে থাকবে।
(তাযকেরায়ে হজরতজী পৃঃ ১৭০)
৩৭. আল্লাহ তায়ালার সাহায্য কখন আসে?
হজরতজী বলেন— আল্লাহ তায়ালার সাহায্য ব্যক্তি ও ব্যক্তিত্বের কারণে আসেনা বরং তাদের আমল ও আখলাক এবং গুণাবলীর কারণে আসে। আল্লাহ তায়ালা রাসুল (স) কে যে সাহায্য করেছিলেন, এভাবে তাঁর সাহাবায়ে কেরাম (রা) এবং পরে আওলিয়ায়ে কেরাম (রহঃ)-এর ওপর আল্লাহর যে সমস্ত পুরস্কার বর্ষিত হয়েছে, এবং তাঁদেরকে যে সাহায্য করা হয়েছে, তা তাঁদের ব্যক্তিত্বের কারণে নয়; বরং তাঁদের আমল এবং বিশেষভাবে আল্লাহর জন্য তাঁদের কোরবানীসমূহ এবং দ্বীনের রাস্তায় তাঁদের মেহনতের কারণে করা হয়েছে। এখনো যে কেউ আল্লাহর ঐ সাহায্য চাইবে, সে তাঁদের মতো ঐ আমল এবং তাঁদের মতো ঐ কোরবানী এবং মেহনতের রাস্তায় উঠতে হবে, তখন সে আল্লাহর সাহায্যকে আসা অবস্থায় স্বয়ং নিজ চোখ দ্বারা দেখে নেবে।
আল্লাহর সাহায্য এবং গায়বী মদদের যোগ্যতা ঐ সময় পর্যন্ত থাকে, যতোক্ষণ দৃষ্টি শুধু আল্লাহর ওপর থাকবে, এবং একীন করবে যে, আমাদের মাধ্যমে অথবা অন্য কারো মাধ্যমে কিছুই হতে পারেনা, যা কিছু হবে, শুধু আল্লাহর সাহায্য এবং তাঁর ফজল ও করমেই হবে।
বদরের যুদ্ধ এবং খন্দকের যুদ্ধে মুসলমানদের অবস্থা এই ছিলো যে, আল্লাহ ছাড়া কোন নির্ভর ও আশ্রয়ের জায়গা তাঁদের সামনে ছিলোনা, নিজেদের কোন বস্তুর ওপর একটুও ভরসা ছিলোনা, এজন্য দৃষ্টি শুধু আল্লাহর দয়া এবং তাঁর সাহায্যের ওপর ছিলো। ফলে পুরো সাহায্য এবং পুরো মদদ পাওয়া গেছে। আর তার বিপরীতে ওহুদের যুদ্ধ এবং হুনায়নের যুদ্ধে যখন নিজেদের সংখ্যা এবং প্রস্তুতির ওপরও কিছুটা ভরসা সৃষ্টি হয়ে গেছে, তখন আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে সাহায্যের হাত তুলে নেয়া হয়েছে।
(তাযকেরায়ে হজরতজী পৃঃ ১৭০)
৩৮. তাবলীগের উদ্দেশ্য
হজরতজী বলেন— মুসলমানদের মধ্যে দ্বীনের রীতিনীতি ও আকৃতি শুধু বর্তমান আছে। এই তাবলীগি চেষ্টা-মেহনতের উদ্দেশ্য এই যে, তাদের মধ্যে দ্বীনের রূহ ও মূলতত্ত্ব যেনো এসে যায়। তাদের মধ্যে দ্বীনের বিক্ষিপ্ত অঙ্গ মজুদ আছে, তাবলীগের উদ্দেশ্য এই যে, তাদের মধ্যে পুরো দ্বীন তার বিশুদ্ধ শৃঙ্খলার সাথে যেনো এসে যায়। এই ছ’ নম্বর, যার ওপর তাবলীগের মধ্যে জোর দেয়া হয় এবং যার অভ্যাস করানো হয়, তার উদ্দেশ্য এই যে, মুসলমান বিশুদ্ধ শৃঙ্খলার সাথে দ্বীনের ওপর এসে যায় এবং আল্লাহ তায়ালার হুকুম-আহকাম এবং আখেরাতের সাওয়াব ও আজাবের প্রতি নজর রেখে জীবন অতিবাহিত করা যেনো স্বভাবে পরিণত হয়।
(তাযকেরায়ে হজরতজী -পৃঃ ১৭১)
৩৯. আমাদের সমস্যা কখন ঠিক হবে?
হজরতজী বলেন— যে সমস্ত জিনিসের ওপর আল্লাহপাক শক্তি ব্যয় করাকে পছন্দ করেন, তার মধ্যে লেগে থাকার মাধ্যমে তো সমস্যা ঠিক হয়। আর যে সমস্ত সৃষ্টির ওপর মানুষ নিজে থেকে শক্তি খরচ করে, তার দ্বারা সমস্যা বিপথগামী হয়। ব্যক্তিগতভাবেও নষ্ট হয় এবং সমষ্টিগত ভাবেও। শক্তি যখন সৃষ্টির ওপর খরচ হতে থাকে, তখন আল্লাহ তায়ালার গজব নাজিল হয় এবং ফলাফল এই দাঁড়ায় যে, যেখানে একে অন্যের ব্যাপারে সহানুভূতিশীল হয়, সেখানে একে অপরের জানে খতম করার শত্রুতে পরিণত হয়।
(সাওয়ানেহে হজরতজী-পৃঃ ৭৪০)
৪০. সর্বাবস্থায় আল্লাহর সাথেই সম্পর্ক কায়েম করা চাই
হজরতজী বলেন— আসমান থেকে জমিন পর্যন্ত যা কিছুই আছে এবং যা বর্তমানে মজুদ আছে, আর যা ভবিষ্যতে আসবে, সমস্ত জিনিসই আল্লাহর সৃষ্টি এবং সমস্ত অবস্থাও তাঁর সৃষ্টি, তাহলে কিছু নিতে হলে তাকে নেয়ার জন্য আল্লাহরই ওপর শক্তিকে ব্যয় করা উচিত। যদি ভয়ের চিন্তা হয়, তখনো আল্লাহর সাথেই সম্পর্ক করা চাই। যে ভয়-ভীতিকে আল্লাহ পাকের মাধ্যমে হটাবে, তা সব সময়ের জন্য দূর হয়ে যাবে। যদি সৃষ্টির ওপর শক্তি ব্যয় করে কোন বস্তু অর্জন করা যায়, তাহলে তারও অস্তিত্ব আল্লাহ তায়ালার সৃষ্টি করার দ্বারাই হবে। পক্ষান্তরে সৃষ্টির মাধ্যমে অর্জিত অবস্থায় তা অস্থায়ী হবে। যে ব্যক্তি আল্লাহর কাছ থেকে নেবেনা; বরং সৃষ্টি থেকে নেবে তাকে তো অনেক অনুতাপ করতে হবে।
(সাওয়ানেহে হজরতজী-পৃঃ ৭৪০)
← আগের পর্ব (বাণী ১–২০) | সূচিপত্র | পরের পর্ব (বাণী ৪১–৬০) →
মূল বই: মালফুজাতে হযরতজী মাওলানা ইউসুফ (রহঃ)। সংকলন: মুফতি রওশন শাহ কাসেমী। অনুবাদ: ইসহাক ওবায়দী। প্রকাশক: বাড কম্প্রিন্ট এন্ড পাবলিকেশন্স, ঢাকা। বইটির স্ক্যান কপি archive.org-এ পাওয়া যাবে।
