|

মালফুযাত – প্রফেসর মুশফিক আহমদ (রহঃ) – পর্ব ২: ২১–৪০

প্রফেসর মুশফিক আহমদ (রহঃ)-এর বয়ান, পরামর্শ, আমল ও দাওয়াতি জীবনের মালফুযাত, ২১ থেকে ৪০ নম্বর। সম্পূর্ণ সূচিপত্র দেখুন।

সংগ্রহ ও সংকলন: মুশফিক আহমদ (রহঃ)-এর মালফুযাত সংকলন।

এই পর্বে যা আছে


২১. স্যারের জীবনের শেষ সময়ের আন্দোলনের শুরুতে একজন আলেম স্যারকে…

স্যারের জীবনের শেষ সময়ের আন্দোলনের শুরুতে একজন আলেম স্যারকে একসময় জিজ্ঞেস করলেন, এই যে লিফলেট, চিঠি পত্র বিলি করা হচ্ছে, তাবলীগের মুরব্বীদের দোষ ত্রুটি সাধারণ লোকদের সামনে আসছে, এরদ্বারা তো এই মেহনতের ক্ষতি হচ্ছে, মেহনত সম্পর্কে সাধারণ মানুষের খারাপ ধারণা পয়দা হচ্ছে, এর দ্বারা আপনি কি চাচ্ছেন? স্যার তখন ইউসূফ রহমাতুল্লাহি আলাইহির কথা উল্লেখ করে বললেন, উনাকে কেউ একজন একসময় জিজ্ঞেস করেছিল, আপনি এই যে বিদেশে জামাত পাঠাচ্ছেন, এতো এতো টাকা পয়সা খরচ করে জামাত বিদেশে সফর করছে, কিন্তু বাস্তবে যা দেখা যাচ্ছে যে জামাতগুলো গুটিকয়েক মুসলমানের সাথে দেখা সাক্ষাৎ করে চলে আসছে, চিল্লা তিন চিল্লা সময় ব্যয় করে চলে আসছে। এর মাধ্যেমে বাস্তব কি ফায়দা আপনি দেখছেন? এসবের দ্বারা আপনি কি চাচ্ছেন? এর উত্তরে ইউসূফ রহমাতুল্লাহি আলাইহি বললেন, এই সমস্ত সফরের দ্বারা একজন মানুষও যে দাঁড়িয়ে পেশাব করে সে যদি আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নতের অনুসরণে বসে পেশাব করা শিখে নেয়, তো তাদের এই এতো এতো পয়সা খরচ উসূল হয়ে যাবে। ঐ এক সুন্নত এক মানুষের মধ্যে জিন্দা হওয়ার মোকাবেলায় এতো এতো সময় ব্যয় এতো টাকা পয়সা খরচ, কোন খরচ না। এই কথার ভূমিকা ধরে স্যার তখন বললেন, আজকে সারা দুনিয়াতে তাবলীগের এই হক্ক মেহনত চলছে, এর মধ্যে এই যে লিফলেট বিলি করা হচ্ছে, এর দ্বারা সাময়িক কিছু ক্ষতি হচ্ছে, কিন্তু এর চেয়ে অনেক বেশী মারাত্মক হলো আকীদাগত ক্ষতি। আমভাবে মানুষ মনে করে, তাবলীগের সাথীরা মনে করে যে মুরব্বীদের ব্যাপারে কথা বলা যাবে না এবং মুরব্বীদের ভূল ধরা যাবে না। এরকম আকীদা তো নবীদের শানে প্রযোজ্য, নবীরা মাসুম ছিলেন। নিজের অজান্তেই মুরব্বীদেরকে নবীদের পর্যায়ে বিবেচনা করা হচ্ছে, যা বিরাট আকীদাগত সমস্যা। তাবলীগের মধ্যে বিরাট এই মজমার এই যে আকীদাগত ক্ষতি, তার মোকাবেলায় এই লিফলেট বিলি করার যে ক্ষতি তা ক্ষতিই না। যদি আমাদের এই চিঠিপত্র ও লিফলেট বিলির দ্বারা সাময়িক কিছু ক্ষতি হয়েও যায়, আর এর মাধ্যেমে একজন মানুষও তার আক্বীদার ব্যাপারে সচেতন হয়, তো আমাদের পোষায় যাবে, পয়সা উসূল হয়ে যাবে (ইউসূফ রহমাতুল্লাহি আলাইহির কথার সাথে মিল রেখে বললেন)।

২২. একবার স্যার বলেন, বাংলাদেশের তবলীগের কাজটা মাথার মতো। তাবলীগের…

একবার স্যার বলেন, বাংলাদেশের তবলীগের কাজটা মাথার মতো। তাবলীগের পপুলেশনের প্রায় এক তৃতিয়াংশ বাংলাদেশের, সারা দুনিয়াতে দুই তৃতিয়াংশ। তারপর এখানে বিশ্ব এস্তেমা হয়, সমস্ত দুনিয়া থেকে খুব সহজে এখানে একত্রিত হতে পারা যায়। সংখ্যার দিক থেকে বিশ্ব এস্তোমার কারনে বাংলাদেশের তবলীগের কাজটা এখন মাথার পর্যায়ে, ইন্ডিয়া পাকিস্থানের কাজ দুই হাতের মতো। মাথা যদি নষ্ট হয়ে যায় তো কাজ নষ্ট হয়ে যাবে।

২৩. সায়ীদ আবুবকর ভাই বলেন, আমার মার্স্টাস পরীক্ষা শেষ হলে…

সায়ীদ আবুবকর ভাই বলেন, আমার মার্স্টাস পরীক্ষা শেষ হলে একদিন স্যার ও উপশহরের কর্ণেল আনোয়ারুল আলম সাহেব আমার সাথে দেখা করতে আসেন। স্যার কর্ণেল সাহেবকে বলেন ওর পরীক্ষা শেষ, আল্লাহর রাস্তায় বের হতে পারে। কর্ণেল সাহেব আমাকে বিভিন্ন কথা বলে বের হবার জন্য বেশ তশকীল করলেন। আমি বললাম আমি একটা কলেজে কেবল যোগদান করেছি, ক্লাস শুরু করেছি, এই মুহুর্তে যাওয়াতো মুশকীল হবে। উনি বললেন কলেজের চাকরী ছেড়ে দিয়ে যাও, ছাত্র জীবন শেষ করলে এখন আগে ৩ চিল্লা দাও, আল্লাহ চাহে তো এর চেয়ে বড় চাকরীও আল্লাহ দিতে পারে। তো আমি চাকরী ছেড়ে বের হবার নিয়ত করলে উনি বলেন মুসফিক সাহেবতো ঢাকায় যাবেই, তুমি উনার সাথেই কাকরাইলে চলে যাও।

২৪. সায়ীদ আবুবকর ভাই বলেন, মার্স্টাস পরীক্ষা শেষে ৩ চিল্লার…

সায়ীদ আবুবকর ভাই বলেন, মার্স্টাস পরীক্ষা শেষে ৩ চিল্লার জন্য কাকরাইলে যাবার সময় স্যারের সাথেই ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেই। ১৯৯৮ সালের জানুয়ারী মাসের কথা। ঐ সময় সরাসরি রাজশাহী থেকে ঢাকা ট্রেন যোগাযোগ ছিল না, রাজশাহী থেকে সিরাজগঞ্জ এবং সিরাজগঞ্জঘাট থেকে রেলের ফেরীতে নদী পার হয়ে ওপারে সংযোগ ট্রেনে উঠে ঢাকা যেতে হতো। ট্রেনের ঐ যাত্রাপথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের এক ছাত্রের সাথে পরিচয় হলো, একসাথে পাশে বসে যেতে যেতে কথাবার্তায় স্যার ওর সাথে বেশ খাতির করে ফেললো। আমের মৌসুম ছিল, ওর লাগেজসহ সাথে আরো তিনটা বড় বড় ফজলি আমের কার্টুন ছিল। যেগুলোর একটা ছিল বেশ বড়, ১মন বা এর বেশী ওজন হবে আর অন্য ২টা কার্টুন ২০ কেজি বা তার বেশী ছিল। ছেলেটা তার আত্মীয় স্বজন ও বন্ধুদের জন্য আমগুলো নিয়ে যাচ্ছিল। ট্রেন সিরাজগঞ্জ ঘাটে এলে ওর ঐ কার্টুনগলো ট্রেন থেকে নামানো হলো। যেগুলো নিয়ে ঘাট পর্যন্ত বেশ রাস্তা হেটে ফেরীতে উঠাতে হবে। ছেলেটা বহনের জন্য কুলি খুঁজতে লাগলো। সুবিধামতো কুলি না পেয়ে বেশ পেরেশান ছিল কেননা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যাত্রীরা ফেরীতে উঠে গেলে ফেরী ছেড়ে দিবে। তখন স্যার আমাকে বললো যে আমার ব্যাগটা নাও, আমার এক হাতে আমার নিজের ছামানার ব্যাগ ছিল, অন্য হাতে স্যারের ব্যাগটা নিলাম। ঐ ছেলের আমের বড় কার্টুনটার কাছে গিয়ে স্যার হঠাৎ করে তাকে বললো “ধরো”। ও কিছু না বুঝেই ধরলো ও স্যার সেটা মাথায় নিয়ে হাটা শুরু করলেন। বাকী ২টা ছোট কার্টুন ঐ ছেলেটা দুই হাতে নিয়ে ফেরীতে উঠলো। ফেরী থেকে নামা ও ওপারে সংযোগ ট্রেনে উঠার সময়ও একই ঘটনা। সায়ীদ ভাই বলেন আমার এখনো চোখে ভাসে স্যার যখন ঐ বিশাল আমের কার্টুন মাথায় নিয়ে হেটে চলছিল মাঝে মাঝে স্যারের মাজা বেঁকে যাচ্ছিল ওজনের ভাড়ে।

২৫. কল্যাণপুরের মুরাদ ভাই বলেন, কল্যাণপুর হাউজিং সোসাইটি জামে মসজিদে…

কল্যাণপুরের মুরাদ ভাই বলেন, কল্যাণপুর হাউজিং সোসাইটি জামে মসজিদে আমরা বেশ কিছু নওজোয়ান মহল্লায় মেহনত করতাম। ৯১/৯২ সালের কথা, সোসাইটির কমিটি তাবলীগের মেহনতের খুব বিরোধী ছিল। মহল্লায় জামাত নিয়ে আসা ও গাসতের নিষেধাজ্ঞা ছিল, খুব মোজাহাদার মধ্যে আমাদের মেহনত করতে হতো। মহল্লার ঐ বিরূপ পরিবেশে মেহনতকারী নওজোয়ানদের উৎসাহ দেবার জন্য আমার বড় ভাই ডাক্তার মোয়াজ্জেম হোসেন একবার স্যারকে মহল্লায় নিয়ে আসেন। স্যার মহল্লায় সব সাথীদের নিয়ে বসেছেন, সবাই রায় দিচ্ছে, কাজ নিয়ে সাথীরা কিভাবে আগে বাড়তে পারে, এরপর স্যার কিছু কথা বলবেন। ঐ সময় আমার একটা রায় ছিল এরকম যে পরিবেশটা মোখালেফ, আমাদের চলতে ফিরতে উঠতে বসতে সামান্য ভূল হলে সোসাইটি এটাকে বড় একটা ইস্যু বানিয়ে ফেলবে। তাই আমার রায়ে আমি বললাম যে সাথীরা আমরা যারা মহল্লায় আছি খুব সমঝদারীর সাথে সতর্কতার সাথে চলা দরকার, প্রত্যেক সাথীর তার নিজের চলা ফেরা উঠা বসায় ভাবগাম্ভীর্য থাকবে যেটার দ্বারা কমিটি বা সোসাইটির উপর একটা ভাল তাছির (প্রভাব) পড়তে পারে। আমার কথা শেষ না হতেই স্যার আমার রায় ধরেই বললেন, তুমি কি সাথীদেরকে মুখোশ পড়িয়ে মহনত করাতে চাও? যার বয়স কম, যার চলাফেরার মধ্যে কোন ভাব নাই, তাকে কোথা থেকে তুমি ভাবগাম্ভীর্য আনবে? নওযোয়ান ছেলে, তার চলা ফেরা উঠা বসার মধ্যে নওজোয়ান, এরই প্রকাশ পাবে সেটাই স্বাভাবিক, তাকে ভাবগাম্ভীর্যের অভিনয় বা মুখোশ পড়িয়ে তো কোন লাভ নাই, ঐটার দ্বারা কোন ভাল তাছির হবে না।

২৬. কিছু সাথি কথা বলার এক পর্যায়ে একজন সাউথ আফ্রিকার…

কিছু সাথি কথা বলার এক পর্যায়ে একজন সাউথ আফ্রিকার জামাত সম্পর্কে তার অভিজ্ঞতা বলতে যেয়ে বলেন যে এরা সারা দিন খালি খেতেই থাকে। পাশে থেকে স্যার এই কথাটা শুনছিলেন। কিছুক্ষন পর যখন স্যার আমাদের সাথে মোজাকারায় বসলেন তখন স্যার বললেন, কোন বাক্তির সম্পরকে তার অগোচরে গীবত করা বা তার বদনাম করা যেমন খারাপ অনুরুপভাবে কোন জাতির বা কোন এলাকার বদনাম বা গীবত করাও খারাপ।

২৭. স্যার এক বয়ানে বলছিলেন, প্রত্যেক জমানায় ওলীআল্লাহ দের জীবন…

স্যার এক বয়ানে বলছিলেন, প্রত্যেক জমানায় ওলীআল্লাহ দের জীবন যদি দেখা যায়, কোন ওলীআল্লাহকে জীবনে একটাবার পেরেশান পাওয়া মুশকিল। খুব তাড়াহুড়া করে, দৌড়ের মধ্যে আছেন, এমন। বড় ব্যস্ত, ব্যবসায়ীদের মধ্যে যেরকম থাকে। বড় নেতা, এখনই দৌড়, যেতে হবে, ‘ভাই এক্ষনি মিটিং আছে যেতে হবে’। সব সময়, সকালে আর বিকালে, রাতে হোক আর দিনের বেলা হোক, ব্যস্ত। সারা জীবন ব্যস্ত থেকে কি করলো? মরবার সময় দেখা যায় যে কিছু নাই! সারা জীবন বকবক করলো, মরার পরে যদি উনার আপন লোককে বা পরিবারের কাউকে জিজ্ঞেস করা হয় যে উনার জীবনে বলেছেন কিছু মূল্যবান কথা আমাকে শোনাও। ছোট বেলা থেকে ৬০-৭০ বছর বয়স পর্যন্ত অনর্গল বকেছে, জীবন শেষ হয়েছে, একটা মূল্যবান কথা শোনাও। তো নিজের ছেলেও একটা মূল্যবান কথা বাপের পক্ষ থেকে বলতে পারে না যে আমার বাপ এই কথা বলে গেছেন। বকবক করলো সারা জীবন, ভাল একটা কথা বলতে পারলো না। ব্যস্ত থাকলো সারা জীবন, কিছু করে গেল না। আর এর মোকাবেলায় আল্লাহওয়ালারা জীবনে কখনো ব্যস্ত পাওয়া যায়নি, আর করে গেছেন বহুত কিছু। কখনো বকবক করেননি, কিন্তু জীবনের শেষে মূল্যবান কথার ভাণ্ডার পাওয়া যায়।

২৮. এক মোজাকারায় স্যার বলছিলেন বর্তমান সভ্যতার উন্নতির অন্যতম মাপকাঠি…

এক মোজাকারায় স্যার বলছিলেন বর্তমান সভ্যতার উন্নতির অন্যতম মাপকাঠি হলো বিলাসিতা। আর এর শেষ পর্যায় হলো আত্মহত্যা। নিজের জীবনের মূল্য না জেনে আজ পুরা দুনিয়ার মানুষ নিজের জীবনকে অতি সচেতনভাবে শেষ করে ফেলছে। পৃথিবীতে আত্মহত্যার সংখ্যা কম নয়। আবার এক অংশ আত্মহত্যা না করলেও নেশা অবস্থায় পাঁচ থেকে ছয় ঘন্টার জন্য নিজেকে আত্মহত্যা করে রাখে। আবার একাংশ পেপার পড়া, নাটক পড়া, টিভি, বিনোদনের মধ্যে লেগে থাকা, নিজের জীবনের ডাইরি লেখা ইত্যাদিভাবে সে তার জীবনকে আত্মহত্যা (জীবনের মূল্যবান সময়কে হত্যা) করে থাকে অর্থাৎ নষ্ট করে থাকে। প্রতিটি মুহূর্ত এভাবে নষ্ট না করে, জীবনের মূল্য দেওয়া শিখে, নেক আমলের দ্বারা নিজের জীবনকে আত্মহত্যা করা থেকে রক্ষা করা এবং পুরা দুনিয়ার মানুষকে রক্ষা করা।

২৯. কিছু সাথি কথা বলার এক পর্যায়ে একজন সাউথ আফ্রিকার…

কিছু সাথি কথা বলার এক পর্যায়ে একজন সাউথ আফ্রিকার জামাত সম্পর্কে তার অভিজ্ঞতা বলতে যেয়ে বলেন যে এরা সারা দিন খালি খেতেই থাকে। পাশে থেকে স্যার এই কথাটা শুনছিলেন। কিছুক্ষন পর যখন স্যার আমাদের সাথে মোজাকারায় বসলেন তখন স্যার বললেন, কোন বাক্তির সম্পরকে তার অগোচরে গীবত করা বা তার বদনাম করা যেমন খারাপ অনুরুপভাবে কোন জাতির বা কোন এলাকার বদনাম বা গীবত করাও খারাপ। [২৬ আর ২৯ রিপিট হয়ে গেছে]

৩০. প্লেনে একবার আসার সময় শীত লাগলে প্লেনের কম্বল গায়ে…

প্লেনে একবার আসার সময় শীত লাগলে প্লেনের কম্বল গায়ে দেই, রঙিন কম্বল দেখতে হয়তো ভালো লাগছিলো। প্লেন নামার আগদিয়ে একজন বিমান বালা কম্বল নিতে আসলে পাশে থাকা মাহফুজ ভাই বললেন কম্বলটা ওকে দিয়ে দেন, ওকে সুন্দর দেখা যাচ্ছে, কম্বল ওর কাছে থাক। সেতো কম্বল নিয়ে চলে গেলো, কিন্তু চলে যাওয়ার পর স্যার একটু রাগের সাথে বললেন মেয়েদের সাথে যেখানে কথাবলাতেই সতর্কতা, সেখানে রসিকতা করলে?

৩১. চিটাগাং ইউনিভার্সিটিতে কোন এক ডিপার্টমেন্ট থেকে মসজিদে আসার সময়…

চিটাগাং ইউনিভার্সিটিতে কোন এক ডিপার্টমেন্ট থেকে মসজিদে আসার সময় সেখানে মসজিদে যাবার দুটো রাস্তা, একটা একটু সর্টকাট আরেকটা একটু লম্বা রাস্তা। মাহফুজ ভাই বললেন স্যার এই রাস্তা দিয়ে চলেন, ছোট রাস্তা। স্যার বললেন না ঐ (তুলনামূলক বড়) রাস্তা দিয়ে যাবো। মাহফুজ ভাই জিজ্ঞেস করলেন স্যার এই ছোট রাস্তায় না গিয়ে ঐ রাস্তায় কেনো যাবেন, এদিক দিয়ে তারাতারি যাওয়া যাবে। স্যার বললেন এই রাস্তায় মেয়েরা আছে। মাহফুজ ভাই বললেন স্যার ঐ রাস্তায়ও তো মেয়েরা আছে, ইউনিভার্সিটির কোন রাস্তা মেয়ে থেকে খালি থাকবে। স্যার বললেন ঐ রাস্তায় কম মেয়ে আছে। তখন স্যার ‘ওয়াত্তাকুল্লাহা ওয়াসতা তা’তুম’ বলে বললেন জীবনের প্রত্যেকটা ক্ষেত্রে এটা দরকার যে যেই রাস্তায় তুলনামূলক সমস্যা কম সেই রাস্তা এখতিয়ার করা।

৩২. ধানমন্ডির কফিল উদ্দিন মাহমুদ সাহেবের কথা বলতে গিয়ে স্যার…

ধানমন্ডির কফিল উদ্দিন মাহমুদ সাহেবের কথা বলতে গিয়ে স্যার একবার বলেছিলেন উনি চিল্লায় বের হবার পূর্বে আমি উনার বাসায় ৬০ বারের ও বেশী বার বার গিয়েছি। অনেক বড় অফিসার কিন্তু বড় আখলাক ওয়ালা মানুষ ছিলেন, স্যারকে মহব্বতও করতেন। স্যার উনার বাসায় গেলে বাসা থেকে বের হবার সময় উনি উনার ড্রাইভারকে বলতেন উনাকে (স্যারকে) রেখে আসো। উনার ড্রাইভার একবার বলেন এইটুকু রাস্তা উনাকে গাড়ীতে রেখে লাভ কি, উনাকে তো সবসময় হাঁটতেই দেখি, এই ধানমন্ডির এমন কোন রাস্তা নেই যেখানে আমি উনাকে হাটতে দেখি নাই।

৩৩. স্যার একবার বলছিলেন, আল্লাহ তায়ালা যে নেয়ামত দেন সেটা…

স্যার একবার বলছিলেন, আল্লাহ তায়ালা যে নেয়ামত দেন সেটা ফিরিয়ে নেন না। কালামে পাকের আয়াতের কথা উল্লেখ করে বলছিলেন, আমি ততক্ষণ পর্যন্ত আযাব দেবো না যতক্ষণ পর্যন্ত নবী তাদের মধ্যে আছেন এবং যতক্ষণ পর্যন্ত তারা এস্তেগফার করবে। এস্তেগফার হলো নবীর বদল, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থাকা অবস্থায় আযাব দেবেন না, কিন্ত এখন রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামতো নাই। নবী নাই এখন আমরা কি করবো, আমরা এস্তেগফার করবো। এস্তেগফারের দ্বারা আযাব বন্ধ হয়ে যাবে, এস্তেগফার হলো নবীর বদল।

৩৪. পুরানাদের মজমায় বহুবার স্যারকে বলতে শুনেছি, অনেককে পরামর্শ দিতে…

পুরানাদের মজমায় বহুবার স্যারকে বলতে শুনেছি, অনেককে পরামর্শ দিতে শুনেছি যে (১) দ্বীনি দাওয়াত (ইলিয়াস র: এর), (২) মলফুযাত (ইলিয়াস র: এর), এবং (৩) হিসনে হাসিন কিতাবগুলো যেনো বার বার পড়া হয়। এই বইগুলোর ব্যাপারে স্যারের তাকীদ দেখে মনে হয় এই বইগুলো স্যার আমাদের জন্য নেসাবভূক্ত করে দিয়েছেন। স্যার বলতেন এই কেতাবগুলো যেনো আমাদের সামনে থাকে, কারণে অকারণে প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে এই বইগুলোর পাতা যেনো আমরা উল্টাতে থাকি।

৩৫. স্যারের পৈত্রিক বাড়ী বিক্রির ১০ লাখ টাকা পেয়েছিলেন। এটা…

স্যারের পৈত্রিক বাড়ী বিক্রির ১০ লাখ টাকা পেয়েছিলেন। এটা এসেছিল স্যারের অংশে, বোনেরা ৫ লাখ করে, ভাইয়েরা ১০ লাখ করে। স্যারের টাকা ভাবী নিয়ে ল্যান্ড ডেভেলপারকে দিয়েছিলেন যা কোন খারাপ ব্যাক্তির হাতে পড়েছিল। সেই টাকাও ফেরত পাননি, জমিও পাননি। রাজশাহী থেকে ঢাকা আসার পথে এই কথা কোন এক কথা প্রসঙ্গে স্যার বলছিলেন। একথা শুনে মাহফুজ ভাই বললেন, স্যার এতোগুলো টাকা, ১০ লাখ টাকা খোয়া গেল আপনি খোজ নেননি, কোন খোজঁখবর করেন নাই? তখন স্যার হেসে দিয়ে বললেন, টাকা গেছে ঐটাই ভাল, তখন আবার শ্রমও যাবে।

৩৬. স্যার একবার বলেন, একহাজার বিঘা জমির মধ্যে আমার ৯৯৯…

স্যার একবার বলেন, একহাজার বিঘা জমির মধ্যে আমার ৯৯৯ বিঘা জমি উর্বর জমি, আর এক বিঘা জমি খুবই শক্ত। আমি চাষ কোনটা করবো? ৯৯৯ বিঘা চাষ করতে যাবো নাকি এক বিঘার পেছনে লেগে যাবো? আমার হাজার মানুষ আছে কথা নেওয়ার জন্যে, ২/৪ জন যারা কথা নিবে না, লিডার, এরা আমার কথা নিবে না, আরো বড় বড় মুরব্বীর কথা নেয় নাই, তার পেছনে তার সংশোধনের পেছনে পড়ার দরকার কি? এর বাইরে অনেক বড় মজমা আছে যাদের কাছে আমি আমার কথা চালাতে পারবো, যারা কথা নিবে, সেখানে যাই।

৩৭. একবার স্যার কাউকে উসূল করতে গেছেন, রাত্রে বেলা এশার…

একবার স্যার কাউকে উসূল করতে গেছেন, রাত্রে বেলা এশার পড়ে গেছেন উসূল করতে। কিন্তু ঐ ব্যক্তি স্যারকে বলে যে স্যার আপনি দাঁড়ান, আমি ভেতর থেকে আসি। তো ঐ ব্যাক্তি বাড়ির ভেতরে যে গেছে আর বের হয়নি, স্যারও আর তাকে ডাকে নাই। স্যার সারা রাতই ঐ ব্যাক্তির বাড়ির সামনে অপেক্ষায় থাকলেন। যখন ফজরের আযান হলো, তখন ঐ ব্যাক্তি, যেহেতু আর কেউ তাকে ডাকাডাকি করে নাই, সেতো ভেবেছে যে স্যারতো চলে গেছে। কিন্তু ফজরের নামাজ পড়তে যাবার জন্য যখন দরজা খুলে দেখে যে স্যার দাঁড়িয়ে, তো স্যারকে বললেন যে আপনি এতো সকালে? তখন স্যার উনাকে বললেন যে আপনে রাতে আমাকে বললেন যে একটু দাঁড়ান, আমি আসছি। সেজন্য আমি দাঁড়িয়ে আছি। তখন উনি আর কোন কথাবার্তা না বলে উনার ছামানা নিয়ে স্যারের সাথে সোজা মসজিদে চলে আসে।

৩৮. একবার স্যার বলেন, ইসলাম কোন ব্র্যান্ডের নাম না, দ্বীন…

একবার স্যার বলেন, ইসলাম কোন ব্র্যান্ডের নাম না, দ্বীন কোন কোন ব্র্যান্ডের নাম না। যেমন বিভিন্ন পন্যের বিভিন্ন ব্র্যান্ড থাকে, তিব্বত সাবান, মাম ওয়াটার ইত্যাদি। মাম ওয়াটারের বোতলে যদি মাছি পাওয়া যায়, তবে তার ব্র্যান্ড ভ্যালু কমে যাবে, পণ্যের মূল্য কমে যাবে, মানুষ ওইটা কিনবে না। ইসলাম, সামগ্রীক ইসলাম, বা তার কোন অংশ যেমন জিকির, তেলাওয়াত, হজ্জ্ব, তাবলীগ, এসব কোন ব্র্যান্ডের নাম না। ইসলামের ভেতরের মানুষ যদি ইসলাম না মানে, মুসলমান যদি কোন অন্যায় করে তো ইসলামের ভ্যালু কমবে না। জাকের জিকির না করলে, তেলাওয়াত না করলে, জিকিরের দাম কমবে না, কোরআন শরীফের দামও কমবে না। জাকের অন্যায় করলে, আলেম অন্যায় করলে তার ভ্যালু কমবে, কমতে পারে, কিন্তু তাদের অন্যায়ের কারনে জিকিরের দাম, এলমের দাম কমবে না, দ্বীনের দাম কমবে না। অনুরূপ তাবলীগওয়ালারা যদি সব মুরতাদ হয়ে যায়, তো তবলীগের দাম কমবে না। এমনকি কিতাবের মধ্যে আছে যে দুনিয়ার সমস্ত মানুষ যদি ঐ দ্বীলওয়ালা ব্যাক্তির মতো হয়ে যায়, যার দ্বীল সবচেয়ে সুন্দর তো আল্লাহ তায়ালার রাজত্যের মর্যাদা একটুকুও বাড়বে না। ঐ রকম তবলীগওয়ালারা যদি তবলীগ ছেড়ে দেয় বা অন্যায় করে তো তাবলীগের দাম কমবে না।

৩৯. বগুড়া জামিল মাদ্রাসার এক মুহাদ্দিস সাহেব একবার স্যারের সাথে…

বগুড়া জামিল মাদ্রাসার এক মুহাদ্দিস সাহেব একবার স্যারের সাথে খুব বদআখলাকি করেছিলেন। স্যার জামিল মাদ্রাসায় অনেকবার গিয়েছেন, মাদ্রাসায় থেকেছেন, এতেকাফ করেছেন, ৭ নম্বর হুজুরের সাথে খুব মহব্বতের সম্পর্ক ছিল। কিন্তু উল্লিখিত মুহাদ্দিস সাহেবের আচরণ বরাবরই ভাল ছিল না। তবে এবারের বদআখলাকি টা মাত্রাতিরিক্ত ছিল। সাথীরা যারা সেখানে নিয়ে গিয়েছিলো, তারাও একটু বিব্রত হলো। ফিরে আসার সময় স্যার যখন বাসে উঠছিলেন তখন ওজর হিসাবে এক সাথী বলছিলো, ডাক্তার … … … (তথাকথিত তাবলীগি এক ডাক্তার, মাদ্রাসার প্রতিবেশী) মাওলানা … … … কে অনেক কিছু বুঝিয়েছে। তার এই কথা শুনে স্যার অত্যন্ত রাগান্বিত হয়ে বললেন (স্যারকে এতো রাগান্বিত হতে স্বাভাবিকভাবে দেখা যেতো না, এবং রাগান্বিত হয়ে কোন খারাপ শব্দ বলা স্যারের আচরনের খেলাফ ছিল), মাওলানা … … … কি … … … রের (ঐ ডাক্তার) পোষা কুকুর, যা বলবে তাই শুনবে, যা শুনবে তাই বিশ্বাস করবে (তার এলম, তার শিক্ষা কোথায় গেলো)?

৪০. নূর মোহাম্মদ ভাই শূরা হবার পরে মাহফুজ ভাই একবার…

নূর মোহাম্মদ ভাই শূরা হবার পরে মাহফুজ ভাই একবার কথাপ্রসঙ্গে স্যারকে বলছিলেন, উনি শূরা হলো ভালোই হলো, আপনি তার সাথে সংশোধনের এতো মেহনত করলেন, এখন উনি ভেতর থেকে সংশোধনের ফিকির করতে পারবেন। তখন স্যার হালকা হাসতে হাসতে বললেন, যে সংশোধন করতে চায় আল্লাহ তার দ্বারা একাজ নেয় না। মাহফুজ ভাই স্যারকে বললেন উনাদের (কাকরাইলের মুরব্বীদের) এই অবস্থায় আপনি বাইরে কেনো, আরেকটু কাছে থাকলে ভাল হতো। তখন স্যার বুকের সাথে হাত লাগিয়ে বললেন, এখান থেকে তোমাকে যদি ঘুসি দেই তো অতো লাগবে না, দূর থেকে দিলে লাগবে, দূর থেকে কাজ করাও সহজ, দূর থেকে হিট করাও সহজ। মাহফুজ ভাই আবার বললেন স্যার বর্তমানের কাকরাইলের (আমাদের মুরব্বীদের, কাজের তরতীবের, এতো এতো হালাত, এতো অনিয়ম বিশৃংখলা, এতো স্বেচ্ছাচারিতা) এই অবস্থায় আমাদের কি হবে, কিভাবে এর উত্তরন সম্ভব? তখন স্যার খুব দৃঢ়তার সাথে বললেন, আল্লাহ অক্ষম হয়ে পড়েননি।


← আগের পর্ব (১–২০)  |  সূচিপত্র  |  পরের পর্ব (৪১–৬০) →

সংগ্রহ ও সংকলন: মুশফিক আহমদ (রহঃ)-এর মালফুযাত সংকলন।

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *