|

মালফুজাতে হযরতজী ইউসুফ (রহঃ) – পর্ব ১১: বাণী ২০১–২২০

হযরতজী মাওলানা মুহাম্মদ ইউসুফ কান্ধলভী (রহঃ)-এর বাণী সংকলন মালফুজাতে হযরতজী মাওলানা ইউসুফ (রহঃ) বইয়ের ২০১ থেকে ২২০ নম্বর বাণী এই পর্বে দেওয়া হলো। সম্পূর্ণ সূচি ও বইয়ের ভূমিকা দেখুন।

সংকলন: মুফতি রওশন শাহ কাসেমী। অনুবাদ: ইসহাক ওবায়দী। প্রকাশক: বাড কম্প্রিন্ট এন্ড পাবলিকেশন্স, ঢাকা।

এই পর্বে যা আছে


২০১. নিয়ম ঠিক ছিল এবং ফরজও আদায় হয়ে গেছে

হজরতজী বলেন— মুন্সী বশীর সাহেব! আপনার জানা আছে যে, বড় হজরতজী এন্তেকালের পর কত টাকা করজ হয়ে গিয়েছিল, সম্ভবত ঃ দশ-পনের হাজারের কম নয়, দিল্লীর একজন বড় ব্যবসায়ী (বড় হজরতজীর সাথে তার সম্পর্ক ছিল) জানতে পেরে টাকা নিয়ে আসলেন, আমি মসজিদে বসা ছিলাম, আমার কাছে এসে বললেন, “নাও নিজের করজ আদায় করে দাও।” আমি বে-পরোওয়াভাবে বললাম, আমার এ টাকার কোন প্রয়োজন নেই। যদি সময় লাগাও তবে টাকা নেয়া হবে, না হয় নেয়া হবে না। তিনি নারাজ হয়ে টাকা নিয়ে ফেরত চলে গেলেন। মুন্সীজী জানেন যে, আল্লাহ তায়ালা কিভাবে সেই করজ উত্তম পন্থায় আদায় করিয়েছেন, নিয়মও ঠিক থাকল এবং করজও আদায় হয়ে গেছে।

(তাযকেরায়ে মাওলানা ইউসুফ- পৃঃ ১১৮)

২০২. কামিয়াবী ধন-দৌলতের মধ্যে নয়

হজরতজী বলেন— কামিয়াবী ধন-দৌলতের মধ্যে নয়, যদি টাকা-পয়সার মধ্যে কামিয়াবী হতো, তাহলে কারুন কামিয়াব হতো। কামিয়াবী আল্লাহর হাতে, তিনি কামিয়াব করতে চাইলে বিনা টাকা-পয়সায়ও কামিয়াব করতে পারেন, আর যদি তিনি নাকাম করতে চান, তাহলে ধন-দৌলতের নকসার মধ্যেও নাকাম করতে পারেন।

(তাযকেরায়ে মাওঃ ইউসুফ- পৃঃ)

২০৩. আমরা তোমাদেরকে তালীম থেকে সরাতে চাই না

হজরতজী বলেন— যে সময়টা আপনারা (অর্থাৎ কলেজ-ভার্সিটির ছাত্র) অনর্থক কাজে ব্যয় করে থাকেন, তা দ্বীনের কাজে লাগিয়ে দিন। ছুটির সমস্ত সময়টা হাসি-তামাশায় অতিবাহিত হয়ে যায়, তা চিল্লার মধ্যে লাগিয়ে দিন। আমরা তোমাদেরকে শিক্ষা থেকে সরাতে চাই না।

(তাযকেরায়ে মাওঃ ইউসুফ-পৃঃ ১২৫)

২০৪. দাঙ্গা-হাঙ্গামার সময় বেশী বেশী জামাত পাঠানোর কারণ

হজরতজী বলেন— দাঙ্গার জামানায় আমি একটা জামাতের তাশকীল করেছি, হজরত হুসাইন আহমদ মাদানী (র) এবং হজরত রায়পুরী (র) বললেন, তুমি এমন সময় বাইরে জামাত কেনো পাঠাও? আমি আরজ করলাম যে, আমার একীন আছে যে, যেখানে জামাত যাবে সেখানে ফেৎনা-ফাসাদ বন্ধ হয়ে যাবে।

(তাযকেরায়ে মাওঃ ইউসুফ- পৃঃ ১২১)

২০৫. দাঙ্গা-হাঙ্গামা ও ফাসাদ ওয়ালা জায়গাতে জামাত যাওয়ার কারণে ফাসাদ বন্ধ হয়ে যাওয়া

হজরতজী বলেন— ফাসাদের জমানায়ও আমরা জামাতের নফল ও হরকত বন্ধ করিনি; বরং আমরা যখন জানতে পেরেছি যে, অমুক জায়গায় দাঙ্গামা হয়ে গেছে, অথবা এমন কিছু নমুনা মজুদ আছে যে, ঐ এলাকায় দাঙ্গা বাঁধার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, তখন আমরা জামাতের রুখ ঐ দিকেই করে দিয়েছি, যার ফল এই হয়েছে যে, ঐ সমস্ত জায়গায় দাঙ্গা-হাঙ্গামার আগুন জ্বলে ওঠেনি, আর যেখানে দাঙ্গা হয়ে গেছে সেখানে জামাতের যাওয়ার উসিলায় নিরাপত্তা আসার শুরু হয়েছে।

(তাযকেরায়ে মাওঃ ইউসুফ- পৃঃ ১২০)

২০৬. হেজাযে মোকাদ্দাস বাসীদেরকে লক্ষ্য করে বললেন

হজরতজী হেজাযে মোকাদ্দাসে তাশরীফ নিলেন এবং সেখানকার লোকদেরকে বললেন— একটা জিনিস আপনাদের এখান থেকে বলেছিল এবং আমাদের পর্যন্ত পৌঁছেছে। আপনারা তখনও এ কাজের যোগ্য ছিলেন এবং এখনও এ কাজের যোগ্য। পৃথিবী আপনাদের কাছ থেকেই দ্বীন শিখেছে আর এখনো আবার আপনাদেরকে এই কাজই করতে হবে।

(তাযকেরায়ে মাওঃ ইউসুফ- পৃঃ ১২৫)

২০৭. দ্বীনের শত্রুদের ষড়যন্ত্র

হজরতজী বলেন— উভয় জাতি (ইহুদী-খৃষ্টান) ইসলামের সব সময় শত্রু থেকেছে। তারা নিজেদের সামাজিক আচার-আচরণ ও সংস্কৃতির মাধ্যমে দ্বীনের এমন ক্ষতি করেছে, যা ঠিক করা কঠিন হয়ে পড়েছে, ভাল ভাল দ্বীনদারদের পর্যন্ত খবর নেই। ইসলামের ইতিহাস, হুজুর (স)-এর পবিত্র জীবনী এবং কোরানের অভিধানে এমন এমন পরিবর্তন করেছে, যা ভাল ভাল আলেমদের পর্যন্ত ধোঁকায় ফেলে দেয়।

(তাযকেরায়ে মাওঃ ইউসুফ- পৃঃ ১৬১)

২০৮. আল্লাহর সাথে সম্পর্ক রাখায় দুনিয়াবী উপকার

হজরতজী বলেন— মানুষ যখন নিজের ওপর নিজে মেহনত করতে করতে এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায়, যার ওপর আল্লাহ তায়ালা সন্তুষ্ট হয়ে তার শুধু হাত-পা ওঠার সাথে সাথেই ফায়সালা করে দেন। তখন দুনিয়া তার পিছে এমনভাবে আসে যেভাবে এখন আমরা দুনিয়ার দিকে দৌড়াচ্ছি, অথচ দুনিয়া ভাগছে হাতে আসছে না।

(তাযকেরায়ে মাওঃ ইউসুফ- পৃঃ ১৭১)

২০৯. আল্লাহর সিদ্ধান্তকে দুনিয়ার কোন শক্তি বাধা দিতে পারে না

হজরতজী বলেন— নমরুদের খোদায়ীর পুরাশক্তি দ্বারা এই চেষ্টায় রত ছিলো যে, আজ রাতে কোন ছেলের অস্তিত্বের ভিত্তি যেন না পড়ে, সমস্ত দেশের পুরুষ এবং মহিলাদেরকে পৃথক পৃথক করে দেয়া হয়েছিলো, পাহারাদার বসানো হয়েছিলো, কিন্তু হলো কি? আল্লাহর হুকুম মোতাবেক যে কাজ হবার ছিলো তা হয়েই গেলো, শত্রুর ঘরে হজরত ইব্রাহিম (আঃ) লালিত-পালিত হচ্ছিলো। তাই আল্লাহ তায়ালা যখন কিছু করতে চান তখন দুনিয়ার কোন শক্তি কিছুই করতে পারে না।

(তাযকেরায়ে মাওঃ ইউসুফ- পৃঃ ১৭২)

২১০. দেশীয় এবং বংশীয় জয্বা দ্বারা উম্মতের ঐক্য নষ্ট হয়

হজরতজী বলেন— হুজুরে পাক (স) কত কষ্ট এবং মুসীবত বরদাশত করে উম্মত তৈরি করেছিলেন, দেশীয় জয্বা, বংশগত দিক যখন উজ্জীবিত হয়, তখন উম্মতের ঐক্য নষ্ট হয়ে যায়।

(তাযকেরায়ে মাওঃ ইউসুফ- পৃঃ ১৭৫)

২১১. একা নিভৃতে কলেমা শরীফকে আজমতের সাথে পড়ার উপকার

হজরতজী বলেন— কলেমার প্রথমাংশ লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ কি? কলেমার উদ্দেশ্য একীনের পরিবর্তন সাধন, বস্তু থেকে একীন বের হয়ে আল্লাহ তায়ালার যাত বা সত্তার ওপর একীন এসে যায়, এটাকেই কলেমা থেকে পয়দা করতে হবে।

কলেমার দ্বিতীয় অংশ মুহাম্মদ রাসূলুল্লাহ কি? অবস্থাকে হুজুরে আকরাম (স)-এর শেখানো তরীকা মোতাবেক বানানো। যত বেশি আমরা একীনের দাওয়াত দেবো; অতটুকুই আমাদের মধ্যে একীন সৃষ্টি হবে, আর যত বেশী একা একা এই কলেমাকে আজমত ও ভক্তির সাথে এবং আল্লাহর ধ্যানের সাথে পড়তে থাকবো অতটুকুই অন্তরের মধ্যে একীন জমে বসবে।

(তাযকেরায়ে মাওঃ ইউসুফ- পৃঃ ১৯০)

২১২. নামাজ আমাদের জীবনে কখন প্রভাব বিস্তারকারী হবে?

হজরতজী বলেন— নামাজ একটা বাস্তবগত অভ্যাস, কলেমার মধ্যে সংক্ষিপ্তাকারে যে কথা স্বীকার করেছি, নামাজের মধ্যে তফ্শীলীভাবে তার মশ্ক বা অভ্যাস করানো হয়েছে, নামাজের উদ্দেশ্য, হার অবস্থায়, সব সময়, যে কোন জায়গায়, আল্লাহ তায়ালার যা হুকুম আছে, তাকে হুজুর (স) ওয়ালা তরীকা মোতাবেক করার জযবা সৃষ্টি হয়ে যাওয়া। নামাজের মধ্যে যেমন সমস্ত ওঠা-বসা আল্লাহ তায়ালার হুকুম মোতাবেক হয়, এমনিভাবে নামাজের বাইরের জিন্দেগীও আল্লাহ তায়ালার হুকুমের মোতাবেক হয়ে যায়, যত বেশী আমরা নামাজের দাওয়াত দেবো এবং নামাজকে ভালভাবে বানিয়ে নিয়ে আদায় করবো, অতটুকুই এ নামাজ আমাদের জীবনের ওপর প্রভাব সৃষ্টিকারী হবে।

(তাযকেরায়ে মাওঃ ইউসুফ- পৃঃ ১৯০)

২১৩. এলেম দ্বারা কি উদ্দেশ্য?

হজরতজী বলেন— এলেম অর্থ জানা, হার হালে, সব জায়গার হুকুম, যার অভ্যাস আমরা নামাজের মধ্যে করেছি, তাকে জানবার জযবা সৃষ্টি হয়ে যাওয়া যে, প্রত্যেকটি আমল করার আগে আমরা জেনে নেবো যে, হুজুর (স) এই আমলকে কিভাবে করেছেন? তা জানার জন্য ঘর-বাড়ি ছাড়তে হলে, জান এবং মাল কোরবানী করতে হলে, তাঁর হুকুম জানার জন্য এই সমস্ত জিনিসকে কোরবান করবো এমন অবস্থা হলে, এলেম দ্বারা তার সহীহ জযবা বা বিশুদ্ধ আবেগ সৃষ্টি হবে।

(তাযকেরায়ে মাওঃ ইউসুফ- পৃঃ ১৯১)

২১৪. একরাম কি?

হজরতজী বলেন— একরাম হচ্ছে এই যে, সমস্ত মানব জাতির হক-হকুক আদায় করা এবং তার হক থেকেও বেশী আদায় করা।

(তাযকেরায়ে মাওঃ ইউসুফ- পৃঃ ১৯১)

২১৫. এখলাসে নিয়ত

হজরতজী বলেন— নিয়তকে সহী করা, নিজের নিয়তকে ঠিক করা, আমলের শেষে নিজের নিয়তের দুর্বলতাকে বের করা।

(তাযকেরায়ে মাওঃ ইউসুফ- পৃঃ ১৯১)

২১৬. জিকিরের অর্থ—আল্লাহর ধ্যান সৃষ্টি করা

হজরতজী বলেন— জিকিরের উদ্দেশ্য ধ্যান পয়দা করা। একা একা আল্লাহ তায়ালার ধ্যান পয়দা করা আর তাঁর বড়ত্বের ধ্যানের সাথে ঐ সমস্ত তাসবীহ আদায় করা, এ ছাড়াও উঠতে-বসতে সব জায়গার সব সময়ের মসনুন দোয়াগুলো আদায় করতে থাকলে, তবে আল্লাহর ধ্যান সৃষ্টি হয়ে যাবে।

(তাযকেরায়ে মাওঃ ইউসুফ- পৃঃ ১৯০)

২১৭. সময় বের করা

হজরতজী বলেন— অন্যদেরকে আমলের দাওয়াত দিতে গিয়ে নিজেকে নিজে এই আমলের ওপর অভ্যস্ত করার চেষ্টা করা। এটা একটা ভিন্ন মেহনত। এর জন্য জীবনে প্রথম চার চারমাসের জন্য দেশ থেকে দেশান্তরে, শহর থেকে শহরে দ্বীনের চাহিদার জন্য ঘোরা, নিজের জান-মালকে আল্লাহর জন্য কোরবান করা।

(তাযকেরায়ে মাওঃ ইউসুফ- পৃঃ ১৯১)

২১৮. বেহুদা কথা ও কাজ থেকে বেঁচে থাকা

হজরতজী বলেন— যে কাজে দ্বীনের ফায়দা হয় না, দুনিয়ায় তা থেকে বেঁচে থাকা চাই।

(তাযকেরায়ে মাওঃ ইউসুফ- পৃঃ ১৯১)

২১৯. ইসলামী আমলের তরতীব কায়েম করার উপকারিতা

হজরতজী বলেন— ইসলামী আমলের তরতীব কায়েম করতে বসবে তো অন্যান্য জিনিসের তরতীব বদলে যাবে। আমলের তরতীব কায়েম করা অন্যান্য জিনিসের তরতীবকে কোরান মোতাবেক বদলানো এরই নাম ইসলাম, যে ব্যক্তি আমলের তরতীব বিগড়ে ফেলে, আল্লাহ তায়ালা তাকে অপমান করেন, এবং অন্তরে হেদায়েতের আলো সৃষ্টি হবে না, যে ব্যক্তি মোহাম্মদী আমলের তরতীব কায়েম করবে, তাকে প্রিয় ও মখলুকের কেন্দ্রবিন্দু বানানো হবে।

(তাযকেরায়ে মাওঃ ইউসুফ- পৃঃ ১৯৫)

২২০. ইসলাম দুটি হরকতের ওপর চমকায়

হজরতজী বলেন— নামাজের হাকীকত সৃষ্টি করার জন্য মেহনত কর। ইসলাম দুটি হরকতের ওপর চমকায়। একটা নামাজের মধ্যে মেহনত করার দ্বারা। দ্বিতীয়টা নামাজ ওয়ালী মেহনতের মধ্যে মেহনত করা এবং তাকে সাধারণ করা। ভেতরের আলো এই দুই হরকতের মাধ্যমে দেয়া হবে।

(তাযকেরায়ে মাওঃ ইউসুফ- পৃঃ ১৯৫)


← আগের পর্ব (বাণী ১৮১–২০০)  |  সূচিপত্র  |  পরের পর্ব (বাণী ২২১–২৩৫) →

মূল বই: মালফুজাতে হযরতজী মাওলানা ইউসুফ (রহঃ)। সংকলন: মুফতি রওশন শাহ কাসেমী। অনুবাদ: ইসহাক ওবায়দী। প্রকাশক: বাড কম্প্রিন্ট এন্ড পাবলিকেশন্স, ঢাকা। বইটির স্ক্যান কপি archive.org-এ পাওয়া যাবে।

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *