|

মালফুজাতে হযরতজী ইউসুফ (রহঃ) – পর্ব ১২: বাণী ২২১–২৩৫

হযরতজী মাওলানা মুহাম্মদ ইউসুফ কান্ধলভী (রহঃ)-এর বাণী সংকলন মালফুজাতে হযরতজী মাওলানা ইউসুফ (রহঃ) বইয়ের ২২১ থেকে ২৩৫ নম্বর বাণী এই পর্বে দেওয়া হলো। সম্পূর্ণ সূচি ও বইয়ের ভূমিকা দেখুন।

সংকলন: মুফতি রওশন শাহ কাসেমী। অনুবাদ: ইসহাক ওবায়দী। প্রকাশক: বাড কম্প্রিন্ট এন্ড পাবলিকেশন্স, ঢাকা।

এই পর্বে যা আছে


২২১. দোয়া কখন কবুল হয়?

হজরতজী বলেন— দোয়া তখন কবুল হবে, যখন হারাম খাবার থেকে বাঁচবে। আরো বেশী কবুল হবে যদি মকরূহ থেকে বাঁচতে পার।

২২২. চাওয়া এবং মনের চাওয়া থেকে বাঁচার পদ্ধতি

হজরতজী বলেন— মানুষের কাছে হাত পাতা হারাম, আর এশরাফ (অর্থাৎ ভেতরে ভেতরে সৃষ্টির কাছে হাত পাতা এবং সৃষ্টির কাছে পাওয়ার আশা করা) মকরুহ। মুখে চেয়েছো তো সুয়াল হলো। আর ভেতরে ভেতরে অন্য থেকে বিনিময় চাওয়ার জযবা বাকী থাকে তো এশরাফ। আল্লাহ তায়ালার জানার হিসাবে তো উভয়ই একই প্রকার। মখলুক থেকে চেয়ে যে বস্তু খাবে তা হারাম হবে, এশরাফের মাধ্যমে যা আসবে তা খাওয়া মকরূহ। মখলুক থেকে চেয়ে খাবে তো অপমানিত হয়ে যাবে। চাই ভদ্রভাবে চাও, চাও হাসি-মজাক করে চাও, এটা চাওয়ার বিভিন্ন পদ্ধতি মাত্র। তাদের মূল সুয়ালই। এই উভয়-রকমের সুয়াল থেকে বেঁচে থাকা জরুরী এবং দুটি জিনিসের ওপর মেহনত করা জরুরী।

১। এশরাফ থেকে বাঁচার ওপর মেহনত করা। ২। দোয়া চাওয়ার ওপর মেহনত করা। মখলুক থেকে চাওয়া সুয়াল, আর আল্লাহ থেকে চাওয়া, চাই অন্তরে হোক, চাই মুখ থেকে তা দোয়া, আর আসল দোয়া অন্তরে হয়। শয়তান এশরাফের ওপর ফেলবে, তুমি দোয়াতে লেগে যাও। এটাই এর চিকিৎসা। দ্বীন-দুনিয়ার যেখানেই কোন সমস্যা আসবে, তুমি দোয়াতে লেগে যাও, তাহলে এশরাফ থেকে বেঁচে যাবে। যখন এশরাফ থেকে বেঁচে গেছো, তখন সুয়াল থেকেও বেঁচে যাবে। যদি এশরাফের মূল না কাট তাহলে একদিন না একদিন সুয়ালের অভিশাপে ফেঁসে যাবে।

(তাযকেরায়ে মাওঃ ইউসুফ- পৃঃ ১৯৫)

২২৩. হুজুর (স)-এর সামাজিক জীবন ও কেয়ামত পর্যন্তের জন্য এসেছে

হজরতজী বলেন— বন্ধুরা! হুজুর (স)-এর নবুওয়াত যেমন কেয়ামত পর্যন্তের জন্য, এমনিভাবে হুজুরের সামাজিক আচার আচরণ ও কেয়ামত পর্যন্তের জন্য।

(তাযকেরায়ে মাওঃ ইউসুফ- পৃঃ ২০৫)

২২৪. সৃষ্টির স্রষ্টা আল্লাহ, আর হুজুর (স)-এর অস্তিত্ব সৃষ্টির মূল

হজরতজী বলেন— সৃষ্টির স্রষ্টা আল্লাহ। আর হুজুর (স)-এর মোবারক অস্তিত্ব সৃষ্টির মূল। অতএব যে ব্যক্তি সৃষ্টিবস্তু ব্যবহার করবে, অথচ এই খেয়াল করবে না যে, আল্লাহ এবং রাসূল (স) বৈধ করেছেন কি করেননি, সে চোর। কেননা, বৈধ হওয়া ব্যবহারের জন্য অনুমতি স্বরূপ, আর অবৈধ হওয়া নিষেধ স্বরূপ।

(তাযকেরায়ে মাওঃ ইউসুফ- পৃঃ ২০৬)

২২৫. আল্লাহর প্রশংসা দ্বারা কি পালা যায় না?

হজরতজী বলেন— যখন তুমি সরকারের কাজে নিয়োজিত হবে, তখন সরকার কি তোমার খরচ বহন করবে না? যদি মন্ত্রীদের প্রশংসা করে পালা যেতে পারে, তাহলে কি আল্লাহর প্রশংসা পালা যাবে না।

(তাযকেরায়ে মাওঃ ইউসুফ- পৃঃ ১৯২)

২২৬. পরহেজগারীর বরকতে আল্লাহ পাক মানুষের অন্তরকে পাল্টে দেন

হজরতজী বলেন— হজরত দাউদ তায়ী (র) একজন বুজর্গ ব্যক্তি ছিলেন। যখন তিনি দেখলেন যে, মানুষের কামাই-রুজি সঠিক থাকেনি, তখন মানুষের হাদিয়া-তোহফা লওয়া বাদ দিলেন এবং বাইরে বের হওয়াও ছেড়ে দিলেন। ভেতরে ভেতরেই আল্লাহর জিকির করতে থাকলেন, যখন তাঁর বাবার এন্তেকাল হয়েছিল, তখন অনেক কম টাকা-পয়সা রেখে গিয়েছিলেন। যার ওপর তিনি ত্রিশ বছর কেটে ছিলেন। যখন এটাও খতম হয়ে গেল, তখন ঘরের ইট এবং ছাদের কাঠ বিক্রি করে দিন গুজরান করলেন। তবুও মানুষ থেকে নেননি। যখন তাঁর এন্তেকাল হয়েছে, সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত লাশ চলতে চলতে কোন মতে গিয়ে কবরস্থানে পৌঁছেছে। মানুষের ভীড়ের কারণে বহনকারী খাটিয়ার চৌদ্দটি পায়া ভেঙ্গেছে। আর ঐ দিন তাঁর বরকতে ছয় লক্ষ ইহুদী মুসলমান হয়েছে।

(তাযকেরায়ে মাওঃ ইউসুফ- পৃঃ ১৯৭)

২২৭. মৃত্যু সত্য, আর জীবন ধোঁকা

হজরতজী বলেন— প্রকৃত ঘটনার বিপরীতকে ধোঁকা বলে। আল্লাহ তায়ালা এবং জনাব রাসূলুল্লাহ (স) যে সমস্ত আসল সত্য বলেছেন, এটা দেখ যে, আমাদের মেহনত তার মোতাবেক আছে, না তা থেকে সরে পড়েছে? যারা আসল সত্য তালাশ করে না, আর তা ছাড়াই মেহনত করে, তারা ধোঁকার ওপর মেহনত করছে, অথচ মনে করছে যে, আসল-সত্য এটাই। অথচ তা ধোঁকা। এ সমস্ত লোক নিজেদেরকে সফল মনে করছে, অথচ আসলে তারা নাকাম। যখন আসলের মধ্যে জীবন অতিবাহিত করার জন্য নিজেকে নিজে কষ্ট-মোজাহাদায় অভ্যস্ত করবে না, তখন ধোঁকার মধ্যেই পড়ে থাকবে।

আমাদের এই এজতেমায় একত্রিত হওয়ার উদ্দেশ্য এটাই যে, আমরা কি আমানতের ওপর মেহনত করছি, না কি ধোঁকার ওপর? এ কথার ওপর চিন্তা-ফিকির করি। সবচেয়ে প্রথম কথা এই যে, মৃত্যু সত্য, আর জীবন ধোঁকা। জীবন শেষ হয়ে যাওয়ার মত একটি সময়, যার সম্পর্কে এ কথাও জানা নেই যে, কখন শেষ হয়ে যাবে? মানুষ মৃত্যুর দিকে পীঠ ফিরিয়ে আছে, আর জীবনের দিকে মুখ করে আছে। জীবনের তো ছোট ছোট বস্তুও দেখা হচ্ছে, আর মৃত্যুর এত বড় বড় সমস্যাকেও দেখা হচ্ছে না। যেখানে হাজার হাজার বছর থাকতে হবে। এটা ধোঁকা নয় আর কি? এরা ধোঁকা ওয়ালা মানুষ, যারা মৃত্যুর আগের জীবনের গুরুত্ব দেয়, অথচ মরার পরের জীবনকে ভুলে বসে। এমন ধরনের মানুষ দোজখে যাবে।

(তাযকেরায়ে মাওঃ ইউসুফ- পৃঃ ১৯৮)

২২৮. বস্তুর চিন্তা করা আর আমলের চিন্তা না করা অত্যন্ত বড় ধোঁকা

হজরতজী বলেন— মানুষ বস্তুর লাইনে তো একেক জাররা পর্যন্ত এখানেই রেখে চলে যাবে আর আমলের লাইনে ছোট ছোট আমল পর্যন্ত সাথে করে নিয়ে যায়। যদি আমরা বস্তুর চিন্তা করি আর আমলের চিন্তা না করি, তবে এটা মস্ত বড় ধোঁকা হবে। জমিন থেকে যে সমস্ত জিনিস বের হচ্ছে, তাতো ধ্বংস হয়ে যাবে, আর ঐ সমস্ত আমল যা শরীর থেকে বের হচ্ছে, তা সব সময় থাকবে। চাই খারাপ হোক কিংবা ভালো। বস্তু থেকে তো এক ব্যক্তিও এই পৃথিবী থেকে কোন একটি বস্তুও সাথে নিয়ে যেতে পারবে না। এমনকি হাশরের মাঠে লোকদেরকে উলঙ্গ অবস্থায় ওঠানো হবে।

(তাযকেরায়ে মাওঃ ইউসুফ- পৃঃ ১৯৯)

২২৯. তোমার মেহনত আসল, সৃষ্টি জগত আসল নয়

হজরতজী বলেন— আসল হলো মানুষ, সৃষ্টিজগত আসল নয়, যদি আসলকে না বানানো হয় এবং আসলের মধ্যে গন্ডগোল সৃষ্টি হয়ে যায়, তাহলে সমস্ত সৃষ্টি জগতের মধ্যে গন্ডগোল সৃষ্টি হবে। যে সমস্ত জিনিসের মধ্যে উপকার দৃষ্টি গোচর হচ্ছে, তাদের কাছ থেকে ক্ষতি পৌঁছবে, যার মধ্যে ইজ্জত আছে বলে মনে হচ্ছে, তার মধ্যে বে-ইজ্জতি এসে যাবে। মোটকথা, যদি মানুষের সহী ব্যবহার হয়, তাহলে সৃষ্টিজগতও সহীভাবে ব্যবহৃত হবে। তোমার মেহনত আসল, সৃষ্টিজগত আসল নয়। যদি আমরা মেহনত করে নিজেদের আমল ঠিক করে ফেলি এবং ভাল আমল আসমানে পাঠাই, তাহলে সেখান থেকে ভালোর ফায়সালা হয়ে আসবে। আর যদি বিগড়ে যাওয়া আমল আসমানে যায়, তাহলে ধ্বংস, জুলুম বরবাদী, ফেৎনা-ফাসাদ ও মোনাফেকীর ফায়সালা হবে।

(তাযকেরায়ে মাওঃ ইউসুফ- পৃঃ ২০২)

২৩০. উদ্দেশ্য প্রণোদিত সেবা করা অনেক সহজ

হজরতজী বলেন— গরীব-দুঃখীদের সেবা দ্বারা আল্লাহকে পাওয়া যায়, অহংকার নষ্ট হয়, বিনয় সৃষ্টি হয়। উদ্দেশ্য-প্রণোদিত সেবা দ্বারা আল্লাহকে পাওয়া যায় না। ক্ষমতাশীল, আমলা, এবং পীর-মাশায়েখ ও আলেমদের খেদমত তো উদ্দেশ্য হাসিল, সম্মানের পূজা ও প্রসিদ্ধি লাভের কারণেও করা হয়। তার দ্বারা আল্লাহকে পাওয়া যাবে না। যাকে দেখলে ঘেন্না হয়, তাচ্ছিল্য আসে, তাদের খেদমতের দ্বারা অন্তরকে টানে, যখন তার মধ্যেও কোন উদ্দেশ্য সামেল না হবে। পীর-মাশায়েখদের যে সকল খাদেম সম্পর্কে আমরা শুনতে পাই যে, তাঁরা বুজর্গ হয়ে গেছেন, তাঁরা ঐ সমস্ত খাদেম ছিলেন, যাঁরা খানকায়-আগত মেহমানদের খেদমত করেছিলেন। এমনকি তাদের পায়খানাও ফেলে দিতেন। উদ্দেশ্য-প্রণোদিত খেদমত করা অনেক সহজ। মানুষ পীরদের খেদমত করে, যাতে করে তাদের দোয়ায় আমাদের অমুক কাজ হয়ে যায়, আমাদের সম্পর্কে সুপারিশ করে দেবে। আবার ঐ সমস্ত বুজর্গদের খেদমত দ্বারা নফসের জন্য বিনা মূল্যে খ্যাতি পেয়ে যাওয়ার কারণে মজা আসে। এগুলো সব উদ্দেশ্য। এ থেকে পবিত্র হয়ে খেদমত কর।

(তাযকেরায়ে মাওঃ ইউসুফ- পৃঃ ১৯৬)

২৩১. জিনিসের ওপর ভরসা করবে না, জিনিসকে মাবুদ বানাবে না

হজরতজী বলেন— জিনিসকে মাবুদ বানাবে না, জিনিসের ওপর ভরসা করবে না, আকৃতির ওপর আকৃষ্ট হবে না, তাদের দ্বারা কিছুই হবে না। আসবাবের কোনই হাকীকত নেই। তাদের দ্বারা কিছুই হয় না, যা কিছু হয় আমল দ্বারা হয়। গুণাবলী দ্বারা হয়, আর যা কিছু হয়, জিনিসের প্রভু এবং আকৃতির প্রভু থেকে হয়। তাঁকেই জান, তাঁকেই চেন, তাঁকেই মান।

(তাযকেরায়ে মাওঃ ইউসুফ- পৃঃ ২০২)

২৩২. জগদ্বাসীর অবস্থা ঠিক হবার উসিলা

হজরতজী বলেন— ঈমানে কষ্ট-মেহনতের জন্য দিনের বেলায় হোঁচট খাওয়া এবং রাতের অন্ধকারে কান্নাকাটি করা জগতের অবস্থা ঠিক হওয়ার উসিলা।

(তাযকেরায়ে হজরতজী- পৃঃ ১০৭)

২৩৩. মানুষ চারটি মূল পদার্থের সমষ্টি

হজরতজী বলেন— মানুষ চারটি মূল পদার্থের সমষ্টি, প্রত্যেক পদার্থের সুবিশেষ প্রভাব আছে। তার অনুপযোগী প্রভাব থেকে নিরাপদ থাকার জন্য প্রথমে আজানের মধ্যে চারবার তকবীর বলানো হয়েছে।

(তাযকেরায়ে মাওঃ ইউসুফ- পৃঃ ২০৫)

২৩৪. হুজুর (স)-এর আচার-আচরণ থেকে আল্লাহ পাওয়া যাবে, অবস্থা ঠিক হবে

হজরতজী বলেন— একীন কর যে হুজুর (স)-এর আচার-আচরণের দ্বারা আল্লাহকে পাওয়া যাবে, অবস্থা ঠিক হবে। আর যদি ইহুদী-খৃষ্টানের রাস্তায় আচার-আচরণ বানাও, তাহলে অবস্থা খারাপ থেকে আরো খারাপ হতে থাকবে।

(তাযকেরায়ে মাওঃ ইউসুফ- পৃঃ ২০৪)

২৩৫. হজরতজীর আশা ও আরজু

হজরতজী বলেন— আমি চাই যে, প্রত্যেকটা ঘর সাহাবায়ে কেরাম (রা)-এর ঘরের নমুনা মোতাবেক হোক। প্রত্যেক ব্যক্তির সময়ের এক-তৃতীয়াংশ মদীনার সাহাবীদের নকশা মোতাবেক অতিবাহিত হোক।

(সাওয়ানেহে হজরতজী- পৃঃ ৬২১)


← আগের পর্ব (বাণী ২০১–২২০)  |  সূচিপত্র

মূল বই: মালফুজাতে হযরতজী মাওলানা ইউসুফ (রহঃ)। সংকলন: মুফতি রওশন শাহ কাসেমী। অনুবাদ: ইসহাক ওবায়দী। প্রকাশক: বাড কম্প্রিন্ট এন্ড পাবলিকেশন্স, ঢাকা। বইটির স্ক্যান কপি archive.org-এ পাওয়া যাবে।

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *