মালফুজাতে হযরতজী ইলিয়াস (রহঃ) – দ্বিতীয় কিস্তি: মলফুজ ২১–২৩
হযরতজী মাওলানা মুহাম্মদ ইলিয়াস কান্ধলভী (রহঃ)-এর বাণী সংকলন মালফুজাত (নীতি-কথা) – হযরতজী মাওলানা ইলিয়াস (রহঃ) বইয়ের দ্বিতীয় কিস্তি (মলফুজ ২১ থেকে ২৩)। সম্পূর্ণ সূচিপত্র দেখুন।
সংকলন: মাওলানা মুহাম্মদ মনজুর নোমানী। অনুবাদ: ডক্টর মোহাম্মদ ছানাউল্লাহ (ব্যারিষ্টার)। প্রকাশক: মোহাম্মদী লাইব্রেরী, চকবাজার, ঢাকা।
এই কিস্তিতে যা আছে
- ২১. একদিন ফজরের নামাজের পর দ্বীনের সেবা ও সাহায্যের…
- ২২. মানুষ আল্লাহর গোলামী ও বন্দেগীকে মানুষের গোলামী ও…
- ২৩. একদিন কোন এক ওয়ক্তের নামাজ এক বোজর্গ পড়ান…
২১. একদিন ফজরের নামাজের পর দ্বীনের সেবা ও সাহায্যের…
একদিন ফজরের নামাজের পর দ্বীনের সেবা ও সাহায্যের উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা দিবার কথা এইভাবে আরম্ভ করেন– দেখুন, সকলেই জানে ও স্বীকার করে যে, খোদা গায়েব নহে বরং হাজের– সব সময়ই হাজের। কাজেই তাঁহার হাজের নাজের থাকাকালে বান্দাদের তাহাতে না লাগিয়া– তাহার গায়েবের মধ্যে লাগিয়া থাকা অর্থাৎ আল্লাহ হইতে মুখ ফিরাইয়া গায়রুল্লায় মশগুল হওয়া ও ডুবিয়া থাকা একবার চিন্তা করিয়া দেখুন, কেমন দুর্ভাগ্য ও কত বড় হতাশা! একবার আন্দাজ করিয়া দেখুন, কি পরিমাণে ইহা খোদাকে রাগান্বিত করে! খোদার দ্বীনের কাজ হইতে গাফেল থাকা খোদার আহকাম ও আদেশের খেয়াল বা ধ্যান না করিয়া দুনিয়াতে লাগিয়া থাকাই আল্লাহ হইতে ফিরিয়া থাকা ও মত্ত হওয়া। তদ্বিপরীত আল্লাহয় লাগিয়া থাকা এই যে, আল্লাহর দ্বীনের সাহায্যে লাগিয়া থাকা ও তাঁহার আদেশকে মানিয়া চলা। কিন্তু ইহা মনে রাখিতে হইবে যে, যে কাজ যত আহাম (গুরু) ও জরুরী তৎপ্রতি তত মনোযোগ দিতে হইবে। আর ইহা রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনের সুন্দর নমুনা হইতে জানা যাইবে। ইহাও জানা কথা যে, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে কাজের জন্য সবচেয়ে বেশী মেহনত করিয়াছেন ও কষ্ট উঠাইয়াছেন তাহা হইতেছে কলেমার প্রচার ও প্রসার অর্থাৎ আল্লাহর বান্দাকে আল্লাহর বন্দিগীর জন্য তৈয়ার করা ও আল্লাহর রাস্তায় লাগাইয়া দেওয়া। এই কাজই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ, ইহাতে লাগিয়া থাকাই উচ্চতম দরজায় খোদাতে লাগিয়া থাকা।
২২. মানুষ আল্লাহর গোলামী ও বন্দেগীকে মানুষের গোলামী ও…
এক বৈঠকে তিনি বলেন–
মানুষ আল্লাহর গোলামী ও বন্দেগীকে মানুষের গোলামী ও চাকুরী হইতেও কম দরজা (গুরুত্ব) দিয়া রাখিয়াছে। গোলাম ও চাকরের সাধারণ অবস্থা এই যে, তাহারা সব সময় মুনিবের কাজে লাগিয়া থাকাকেই নিজের কর্তব্য মনে করে, ইহার ফাঁকে ফাঁকে দৌড়া-দৌড়ির মধ্যে যাহা কিছু পায় তাহাই পান করে ও খায়। কিন্তু আল্লাহ পাকের সহিত বর্তমানে বান্দাদের মোয়ামেলা (ব্যবহার) এই দাঁড়াইয়াছে যে, তাহারা স্বাধীনভাবে নিজের কর্মে একান্তভাবে স্বকীয় কাজে নিজস্ব উপভোগ্য বস্তু ও মজার সামগ্রীতে নিজেরই জন্য মত্ত থাকে। আর কখন কখন স্বকীয় কাজ-কারবার ও ভোগবিলাস হইতে কিছু সময় বাহির করিয়া খোদার কিছু কাজও করিয়া থাকে। যেমন, নামাজ পড়িয়া লয় অথবা কোন ভাল কাজে কিছু চাঁদা দিয়া থাকে এবং মনে করিয়া থাকে যে, খোদার ও দ্বীনের হক আদায় হইল; অথচ বন্দেগীর হক ইহা যে, স্বাধীনভাবে ও সামগ্রিকভাবে প্রথমতঃ ও প্রধানতঃ দ্বীনের কাজ করা; আর অধীনভাবে ও আনুসঙ্গিকভাবে খাওয়া পরা ও তাহার ছামান যোগাড় করা। (এ কথার উদ্দেশ্য এই নহে যে, সমস্ত লোক আপন আপন কাজ-কারবার ও জীবিকা-নির্বাহের উপায় ছাড়িয়া বসুক। তাহা কখনও নহে- বরং মতলব শুধুমাত্র এই যে, যাহাকিছু করা হয় সমস্তই যেন বন্দেগীর অধীনে হয় ও দ্বীনের খেদমত ও নছরত (সেবা ও সাহায্য) সব বিষয়ে সব সময়ই দৃষ্টিপথে থাকে এবং নিজের খাওয়া পরা প্রভৃতি আনুসঙ্গিকভাবেই হয়; যেমন, একজন গোলাম নিজের মুনিবের কাজ-কারবার করিয়া থাকে)।
২৩. একদিন কোন এক ওয়ক্তের নামাজ এক বোজর্গ পড়ান…
একদিন কোন এক ওয়ক্তের নামাজ এক বোজর্গ পড়ান ও এই দোয়াও করেন। (যাহা হযরত মাওলানাও অধিকাংশ সময় করিয়া থাকেন)ঃ–
اَللّٰهُمَّ انْصُرْ مَنْ نَصَرَ دِيْنَ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللّٰهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَاخْذُلْ مَنْ خَذَلَ دِيْنَ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللّٰهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
“আয় আল্লাহ! যাহারা (হযরত মুহাম্মাদের (দঃ) দ্বীনের সাহায্য করে তুমি তাহাদের সাহায্য কর; আর যাহারা মুহাম্মদের (দঃ) দ্বীনের সাহায্য করে না তুমিও তাহাদের সাহায্য করিও না।”
হযরত মাওলানা তখন তিনবার উচ্চৈঃস্বরে এক খাছ দরদের সহিত বলেন,
اَللّٰهُمَّ لَا تَجْعَلْنَا مِنْهُمْ
“আয় আল্লাহ! আমাদিগকে তাহাদের দলভুক্ত করিও না!”
সমাগতদের সম্বোধন করিয়া তিনি বলেন– ভ্রাতৃবৃন্দ! এই দোয়া অনুধাবন করুন ও ইহার গুরুত্ব বুঝুন। ইহা দোয়া ও বদ্দোয়া যাহা প্রায় সকল সময় আল্লাহর খাছ বান্দাগণ করিয়াছেন। ইহা অতি ভারী দোয়া। ইহাতে আল্লাহর দ্বীনের সাহায্যকারীদের জন্য ও এই রাস্তায় মেহনত ও পরিশ্রমকারীদের জন্য রহমত ও নছরতের দোয়া আছে। কিন্তু যাহারা দ্বীনের সাহায্য করে না তাহাদের জন্য বড় সাংঘাতিক বদদোয়া আছে। “খোদা যেন নিজের রহমত ও নছরত হইতে তাহাদিগকে মাহরুম করিয়া দেন।”
এখন প্রত্যেকেই এই দোয়াকে নিজের উপর আরোপ করিয়া দেখুন যে, সে বদ্দোয়ার ভাগী, না নেক দোয়ার নিশানা। ইহাও মনে রাখিবেন যে, নিজ নিজ নামাজ পড়া ও রোজা রাখা যদিও বড় এবাদত কিন্তু ইহা দ্বীনের সাহায্যের কাজ নহে। দ্বীনের নছরত তো উহা যাহা আল্লাহ ও রাসূল নছরত বলিয়াছেন। আর ইহার আছলী ও মকবুল তরিকাও উহা যাহা তিনি নিজে প্রচলিত করিয়াছেন। বর্তমান সময়ে এই তরিকা ও এই রেওয়াজকে সজীব করা ও পুনরায় জারী করিবার জন্য কোশেশ করা দ্বীনের সবচেয়ে বড় নছরত বা সাহায্য। আল্লাহ পাক আমাদের সকলকে ইহার তওফীক দেউক। আমীন!
← আগের কিস্তি (প্রথম কিস্তি) | সূচিপত্র | পরের কিস্তি (তৃতীয় কিস্তি) →
মূল বই: মালফুজাত (নীতি-কথা) – হযরতজী মাওলানা ইলিয়াস (রহঃ)। সংকলন: মাওলানা মুহাম্মদ মনজুর নোমানী। অনুবাদ: ডক্টর মোহাম্মদ ছানাউল্লাহ (ব্যারিষ্টার)। প্রকাশক: মোহাম্মদী লাইব্রেরী, চকবাজার, ঢাকা।
