|

মালফুজাতে হযরতজী ইলিয়াস (রহঃ) – একাদশ কিস্তি: মলফুজ ১৭৫–২১৪

হযরতজী মাওলানা মুহাম্মদ ইলিয়াস কান্ধলভী (রহঃ)-এর বাণী সংকলন মালফুজাত (নীতি-কথা) – হযরতজী মাওলানা ইলিয়াস (রহঃ) বইয়ের একাদশ কিস্তি (মলফুজ ১৭৫ থেকে ২১৪)। সম্পূর্ণ সূচিপত্র দেখুন।

সংকলন: মাওলানা মুহাম্মদ মনজুর নোমানী। অনুবাদ: ডক্টর মোহাম্মদ ছানাউল্লাহ (ব্যারিষ্টার)। প্রকাশক: মোহাম্মদী লাইব্রেরী, চকবাজার, ঢাকা।

১৩৬৭ হিজরীর রমজান মাসের আলফুরকানে প্রকাশিত

এই কিস্তিতে যা আছে


১৭৫. যে সমস্ত মকামাতকে (উচ্চ স্থান, মরতবা, গৌরবের সুউচ্চ…

তিনি বলেন–

“যে সমস্ত মকামাতকে (উচ্চ স্থান, মরতবা, গৌরবের সুউচ্চ আসন) প্রাণপণ করিয়া বরং এই প্রাণ দিবার অদম্য প্রেরণা ও উৎসাহের মধ্য দিয়া হাছেল করিবার জন্য হুজুর ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলিয়াছিলেন এবং ছাহাবায়ে কেরাম দ্বীনের রাস্তায় নিজকে বিলাইয়া দিয়া হাছেল করিয়াছিলেন, তোমরা তাহা আরামে শুইয়া শুইয়া কিতাব সমূহ হইতে হাছেল করিয়া লইতে চাও?”

১৭৬. যে সমস্ত পুরুস্কার ও সুফল রক্ত দিয়া লাভ…

তিনি বলেন–

যে সমস্ত পুরুস্কার ও সুফল রক্ত দিয়া লাভ করা হইত তজ্জন্য অন্ততঃ পক্ষে ঘাম তো ফেলা চাই।

১৭৭. ওখানে তো অবস্থা এই ছিল যে, হযরত আবু…

তিনি বলেন–

ওখানে তো অবস্থা এই ছিল যে, হযরত আবু বকর ও হযরত ওমর (রাঃ)ও দ্বীনের রাস্তায় নিজকে ‘ফানা’ (বিলীন) করিয়া দেওয়া সত্ত্বেও এবং বেহেশ্তী বলিয়া হুজুর ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রকাশ্য খোলাখুলী ও একীন খোশ্খবরী সত্ত্বেও এই দুনিয়া হইতে কাঁদিতে কাঁদিতে গিয়াছেন।

১৭৮. পছন্দ করাকেই কাজ করা বলিয়া মনে করা বড়…

তিনি বলেন–

পছন্দ করাকেই কাজ করা বলিয়া মনে করা বড় ধোকা। শয়তান ইহাই করিয়া থাকে। মানুষকে পছন্দ করার উপরই সন্তুষ্ট করিয়া রাখে। (এই কথার অর্থ) এই যে, কোন কাজকে কেবলমাত্র ভাল বলিয়া বুঝিয়া নিলে ঐ কাজে অংশগ্রহণ করা হয় না; বরং উহাতে লাগিলে ও উহা করিলেই উহার হক আদায় হয়। কিন্তু অনেক লোককে শয়তান এই ধোঁকা দিয়া থাকে যে, তাহারা কাজে একমত হইয়া যাওয়াকে কাজে লাগিয়া যাওয়া ও অংশগ্রহণ করা (শরীক হওয়া) বলিয়া মনে করিয়া থাকে। ইহা শয়তানের ধোকা।

১৭৯. আমাদের এই আন্দোলন দুশমনকে খোশ করে ও দোস্তকে…

তিনি বলেন–

আমাদের এই আন্দোলন দুশমনকে খোশ করে ও দোস্তকে নাখোশ করে। যাহার মনে চায় আস।

১৮০. এই সময় কুফরী ও “এলহাদ” অতি শক্তিশালী, এই…

তিনি বলেন–

এই সময় কুফরী ও “এলহাদ” অতি শক্তিশালী, এই অবস্থায় বিশৃঙ্খল ও এলোমেলোভাবে ব্যক্তিগত সংস্কারের কোশেশের দ্বারা কাজ চলিতে পারে না। এই জন্য পূর্ণ শক্তি সহকারে সমষ্টিগতভাবে চেষ্টা ও কষ্ট করা চাই।

وَاعْتَصِمُوْا بِحَبْلِ اللّٰهِ جَمِيْعًا

“তোমরা সকলে মিলিয়া একত্রে আল্লাহর রজ্জুকে শক্ত করিয়া ধর।”

১৮১. এলম ও জিকিরকে মবজুত করিয়া ধরিবার বেশী জরুরত…

তিনি বলেন–

এলম ও জিকিরকে মবজুত করিয়া ধরিবার বেশী জরুরত আছে। কিন্তু এলম ও জিকিরের হাকিকত ভালভাবে বুঝিয়া লওয়া চাই। জিকিরের হাকিকত গাফলত না হওয়া– দ্বীনি কর্তব্য সমূহ আদায় করিতে লাগিয়া থাকা– বড় দরজার জিকির। এই জন্য দ্বীনের সাহায্য ও উহা প্রচলিত করিবার জন্য চেষ্টা ও কষ্ট করার মধ্যে মশগুল থাকা জিকিরের উচ্চ দরজা– কিন্তু শর্ত এই যে, আল্লাহর আদেশাবলী ও ওয়াদাকৃত পুরস্কার সমূহের খেয়াল রাখিতে হইবে। নফল জিকির এই জন্য যে, যেই সময় মানুষ ফরায়েজের মধ্যে মশগুল না থাকে তাহা যেন বেফায়েদা কাজের মধ্যে কাটিয়া না যায়। এবাদত করিয়া যে নূর পয়দা হয় এবং উন্নতি হয় শয়তান বেহুদা কাজে লাগাইয়া তাহা নষ্ট ও বরবাদ করিয়া দিতে চায়। কাজেই ইহা হইতে বাঁচিয়া থাকিবার জন্যই নফল জিকির।

মোটকথা, ফরায়েজ হইতে যে সময় বাঁচিয়া যায় তাহাকে নফল জিকির দ্বারা আবাদ রাখিবে, যেন শয়তান বেহুদা কাজে মশগুল করিয়া আমাদিগকে নোকছান পৌঁছাইতে না পারে। (তদুপরি নফল জিকিরের আর এক বিশেষ বড় ফায়েদা এই যে, তদ্দারা সাধারণতঃ দ্বীনি কাজে জিকিরের শান পয়দা হয় ও আল্লাহর আদেশ পালনার্থে ও তাঁহার প্রতিজ্ঞাকৃত পুরস্কারের আশায় কাজ করিবার স্বাভাবিক শক্তি (মালাকা) পয়দা হয়)।

এ সম্বন্ধে তিনি আরও বলেন–

ফরায়েজের মধ্যে লাগিয়া যাওয়া, এমন কি নামাজ পড়া পর্যন্ত যদি আল্লাহর আদেশের ও তাঁহার প্রতিজ্ঞাকৃত পুরস্কারের ধ্যানের সহিত না হয় তাহা হইলে তাহা আসল জিকির নহে; বরং অঙ্গ প্রত্যঙ্গের জিকির ও কালবের গাফলত। হাদীছ শরীফে কলব সম্বন্ধেই বলা হইয়াছে–

اَلَا اِنَّ فِي الْجَسَدِ مُضْغَةً اِذَا صَلَحَتْ صَلَحَ الْجَسَدُ كُلُّهٗ وَاِذَا فَسَدَتْ فَسَدَ الْجَسَدُ كُلُّهٗ

“মানুষের মধ্যে কলবই একমাত্র কেন্দ্র যাহা ঠিক হইলে সমস্ত ঠিক হইয়া যায়, আর যাহা খারাপ হইলে সমস্তই খারাপ হইয়া যায়।”

তাহা হইলে দেখা গেল যে, আল্লাহর আদেশ সমূহ ও পুরস্কার সমূহের ধ্যানের সহিত আল্লাহর কাজ সমূহে লাগিয়া থাকাই আমাদের নিকট জিকিরের সার। জিকির দ্বারা শুধু দ্বীনি মাছায়েল ও দ্বীনের এলম জানাই উদ্দেশ্য নহে।

দেখুন, ইহুদীরা নিজের শরীয়তের ও আছমানী এলমে কেমন আমেল ছিল। তাহারা হুজুর ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্থলাভিষিক্তদের পর্যন্ত চাল-চলন ও শরীরের গঠন, আকৃতি-প্রকৃতি এমন কি তাঁহাদের শরীরের এক একটা তিলের খবরও তাহাদের ছিল। কিন্তু এই সমস্ত কথা শুধু জানাতে তাহাদের কি কোন ফায়েদা হইয়াছিল?

১৮২. এলমের জন্য যে মুহম্মদী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তরীকা…

এ সম্বন্ধে তিনি আরও বলেন–

এলমের জন্য যে মুহম্মদী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তরীকা ছিল (অর্থাৎ তলব, আজমত ও মহব্বতের সহিত সঙ্গে থাকিয়া মিলিয়া মিশিয়া এলম হাছেল করা ও জিন্দেগী অনুসরণ করিয়া জিন্দিগী গঠন শিক্ষা করা)

তাহার বিশেষত্ব এই ছিল যে, ইহা দ্বারা যতই এলম বাড়িতে থাকিত ততই নিজের অজ্ঞতা ও নির্বুদ্ধিতার অনুভূতি বাড়িতে থাকিত।

বর্তমানে এলম হাছেল করিবার যেই তরীকা (পদ্ধতি) প্রচলিত হইয়াছে ইহার পরিণাম এই যে, এলম যত আসে তার চেয়ে বেশী আত্মম্ভরিতা (আমি কিছু জানি এইভাব) আসে। এই আত্মম্ভরিতা হইতেই অহঙ্কার ও আত্মগৌরব পয়দা হয়। অহঙ্কারী বেহেশতে যাইবে না। এতদ্ব্যতীত এলমের আত্মম্ভরিতার পর এলম হাছেল করিবার ব্যগ্রতা থাকে না, যদ্দারা জ্ঞানের উন্নতি বন্ধ হইয়া যায়।

টীকা: কোন কোন রেওয়ায়েতে আছে, ইহুদীদের কোন কোন আলেম হযরত ফারুকে আজম (রাঃ)-এর শরীরের কোন বিশেষ অংশে তিল অথবা তিলের ন্যায় কোন নিশান (চিহ্ন) দেখিয়া তাঁহার সম্বন্ধে বলিয়াছিলেন, “এই ব্যক্তি আখেরী জামানার নবীর খলিফা হইবে, তাঁহার সময় বাইতুল মোকাদ্দাস জয় হইবে।”

এই প্রকারের বিভিন্ন রেওয়ায়েত ‘ইজালাতুল খফা’ নামক কিতাবে হযরত শাহ অলিউল্লাহ (রহঃ) নকল ফরমাইয়াছেন।

১৮৩. এক ব্যক্তি নিজেকে তবলীগী জমাতের জন্য পেশ করিয়া…

এক ব্যক্তি নিজেকে তবলীগী জমাতের জন্য পেশ করিয়া হযরত মওলানার খেদমতে ১০০ টাকা পেশ করিলে তিনি উহা গ্রহণ করিয়া বলেন– আমার মন চাহে যে, যাহারা দ্বীনের জন্য শরীর ও প্রাণের অংশ দেয় না তাহাদের মাল না লইবার জন্য কছম খাইয়া বসি।

এ সম্বন্ধে তিনি আরো বলেন– মাল খরচ করা যে এবাদত ইহা আসল উদ্দেশ্য নহে; বরং ইহার ব্যবস্থা শরীয়তে এই জন্য করিয়াছে যেন মালের সহিত মহব্বত পয়দা না হয়।

১৮৪. হযরত ফারুকে আজমের জমানায় উম্মুল মুমেনিন হযরত জয়নব…

হযরত ফারুকে আজমের জমানায় উম্মুল মুমেনিন হযরত জয়নব (রাঃ)-এর ঘরে তাঁহার অংশের গনিমতের মাল (যাহা সম্ভবতঃ পরিমাণে বেশী ছিল ও উহাতে তাঁহার অন্তর আকর্ষিত হইবার সম্ভাবনা ছিল) পৌঁছে তখন তিনি ব্যাকুল হইয়া দোয়া করিয়াছিলেন। “আয় আল্লাহ! এই ঘরে যেন ইহা আর না আসে।” ঠিক তেমনই হইয়াছিল। অর্থাৎ তিনি ওফাত পাইলেন)।

১৮৫. আল্লাহ ও রাসূল যেই জিনিসের দ্বারা সুখী ও…

তিনি বলেন–

আল্লাহ ও রাসূল যেই জিনিসের দ্বারা সুখী ও সন্তুষ্ট হন বান্দাও সেই জিনিসের দ্বারা সুখী ও সন্তুষ্ট হয়। আর যেই জিনিসের দ্বারা আল্লাহ ও রাসূল নাখোশ হন ও তাহাদের কষ্ট হয় তাহা দ্বারা বান্দা নাখোশ হয় ও তাহারও কষ্ট হয়– ইহাই ঈমান। আর কষ্ট যেমন তরবারির দ্বারা হয় সেইরূপ সূচের দ্বারাও হয়। কাজে কাজেই আল্লাহ্ ও রাসূলের নাখুশী যেমন কুফরী ও শেরেকীর দ্বারা হইয়া থাকে তদ্রূপ গোনা সমূহের দ্বারাও হইয়া থাকে। সুতরাং আমাদেরও গোনাহ সমূহের দ্বারা নাখুশী ও কষ্ট হওয়া চাই।

১৮৬. একদিন এই অধম (মলফুজাতের সঙ্কলক) এমন সময় হযরত…

একদিন এই অধম (মলফুজাতের সঙ্কলক) এমন সময় হযরত মাওলানার কামরায় পৌঁছি যখন মেওয়াতী মুরীদেরা তাঁহাকে জোহরের নামাজের জন্য অজু করাইতে ছিলেন। (মওতের বিমারের শেষের দিকে দুর্বলতার দরুণ হযরত মওলানাকে শোয়াইয়া অজু করাইয়া দেওয়া হইত।)

আমি পৌঁছিলে তিনি বলেন– হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাছের এলমে দ্বীনের মধ্যে দরজা এত উচ্চ ছিল যে, হযরত ফারুকে আজম (রাঃ) তাহাকে বড় বড় ছাহাবাদের সঙ্গে বসাইতেন। আবার তিনি নিজে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অজু করিতে দেখিয়াছিলেন। ইহার পর বহু দিন ধরিয়া হযরত আবু বকর ও হযরত ওমর (রাঃ)-এর অজুও দেখিয়া থাকিবেন। এই সব সত্ত্বেও হযরত আলী (রাঃ)-কেও অজু করাইতেন এবং ইহা হইতে তাহার মকছুদ অজু শিক্ষা করাও হইত।

১৮৭. যেই সমস্ত মেওয়াতী মুরীদ এই সময় হযরত মাওলানাকে…

যেই সমস্ত মেওয়াতী মুরীদ এই সময় হযরত মাওলানাকে অজু করাইতেছিলেন তাহাদের দিকে ইশারা করিয়া পুনরায় এই দ্বীনহীনকে বলেন–

“এখনই আমি তাহাদিগকে এই কথা বলিতেছিলাম যে, তোমরা ইহা মনে কর যে, আমার নামাজ ভাল হয় এই জন্য তোমরা আমাকে অজু করাইবার সময় রুগীর খেদমতের নিয়তের সহিত ইহাও নিয়ত করিবে যে, “আয় আল্লাহ! আমরা ইহা মনে করি যে, তোমার এই বান্দার নামাজ আমাদের নামাজ হইতে সুন্দর হয়, কাজেই আমরা এই জন্য ইহাকে অজু করাইয়া থাকি যে, তাহার নামাজের ছওয়াবের মধ্যে আমাদেরও যেন অংশ হইয়া যায়।”

পুনরায় তিনি বলেন–

“আমি তাহাদিগকে বলি, কিন্তু আমি যদি নিজে ইহা মনে করিতে থাকি যে, আমার নামাজ ইহাদের নামাজ হইতে ভাল হয় তাহা হইলে আমি মরদুদ হইয়া যাইব। এই জন্য আমি আমার আল্লাহর নিকট এইরূপ দোয়া করিয়া থাকি যে, “আয় আল্লাহ! তোমার এই সরল অন্তকরণের লোকেরা আমার সম্বন্ধে এই ধারণা রাখে যে, আমার নামাজ ভাল হয়, আর এই জন্যই এই বেচারারা আমাকে অজু করাইয়া দেয়, তুমি শুধু তোমার রহমতে তাহাদের এই ধারণাকে সত্য কর ও আমার নামাজ কবুল করিয়া লও এবং ইহার ছওয়াবের মধ্যে তোমার এই বান্দাদেরও অংশ দাও।”

পুনরায় যাহারা অজু করাইতেছিল ঐ মেওয়াতীদের সম্বোধন করিয়া বলেন–

“তোমরা ঐ সমস্ত ওলামাদের খেদমত কর যাহারা এখনও তোমাদের কওমকে দ্বীন শিখাইবার দিকে মনোযোগ দেন নাই। আমার কি? আমি তো তোমাদের দেশে গিয়াই থাকি। তোমরা না ডাকিলেও যাইব। যেই সমস্ত ওলামা এখনও তোমাদের দিকে আকৃষ্ট হন নাই তাঁহাদের খেদমত করিলে তাহারাও তোমাদের কওমের দ্বীনি খেদমত করিতে লাগিয়া যাইবে।”

১৮৮. পীরের খেদমত এই জন্য এবং এই নিয়তে করা…

তিনি বলেন–

“পীরের খেদমত এই জন্য এবং এই নিয়তে করা চাই যে, ইহা দ্বারা আল্লাহর বান্দাদের খেদমত করিবার অভ্যাস হইয়া যাইবে।”

পুনরায় বলেন– নিয়তের সহিত এবাদতগুজার মুমেনদের খেদমত (আল্লাহর) আবদিয়তের সিঁড়ি (স্বরূপ)।

১৮৯. পরামর্শ করার উপর জোর দিয়া একবার তিনি বলেন

পরামর্শ করার উপর জোর দিয়া একবার তিনি বলেন–

পরামর্শ বড় জিনিস। আল্লাহ পাকের ওয়াদা আছে, যখন তোমরা পরামর্শের জন্য আল্লাহর উপর ভরসা জমিয়া বসিবে তবে উঠিবার পূর্বেই আল্লাহর মদদে সত্য পথের সন্ধান মিলিয়া যাইবে।

পুনরায় বলেন– এই বিষয়বস্তু (মজমুন) কোন হাদীছে আসিয়াছে, এখন আসল হাদীছ আমার মনে নাই।

১৯০. হযরত ফারুকে আজম ও এই রূপে অন্যান্য ছাহাবায়ে…

তিনি বলেন–

হযরত ফারুকে আজম ও এই রূপে অন্যান্য ছাহাবায়ে কেরামদের (রাঃ) আমদানী অনেক ছিল। তাহারা নিজের জন্য খুব কম খরচ করিতেন। তাহাদের খাওয়া পরা খুব সাধারণ ও সাদাসিদা ছিল; বরং তাহারা গরীবানা জীবনযাপন করিতেন; ইহা সত্ত্বেও তাঁহাদের অনেকেই দুনিয়া হইতে ঋণগ্রস্ত হইয়া চলিয়া গিয়াছেন; কেননা তাঁহাদের সমস্ত আমদানী দ্বীনের রাস্তায় খরচ করিয়া দিতেন। প্রকৃতপ্রস্তাবে মোমেনদের টাকা তো আল্লাহর কাজে লাগাইবার জন্যই।

১৯১. কামরার মধ্যে বিছান এক পালঙ্গের দিকে ইশারা করিয়া…

কামরার মধ্যে বিছান এক পালঙ্গের দিকে ইশারা করিয়া এই দ্বীনহীনকে (সঙ্কলককে) বলেন–

এই পালঙ্গ আমার আম্মাজানের দাদার। তাহা সব সময় ব্যবহারে থাকে। (পরে হিসাব করিয়া জানা গেল যে, প্রায় ৮০ বৎসর ইহার উপর অতীত হইয়া গিয়াছে।)

পুনরায় বলেন– “বরকত ইহাই যে, কোন জিনিস সাধারণতঃ যেই সময় ও যেই অবস্থায় শেষ হইয়া যাওয়া চাই তাহা না হইয়া বাকী থাকা।”

তিনি বলেন– “রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দোয়ায় কোন কোন সময় খাদ্য ইত্যাদির মধ্যে বরকতের যেই সমস্ত ঘটনা ঘটিয়াছে তাহাও এই প্রকারেরই ছিল। আছলী জিনিস শেষ হইত না।”

১৯২. প্রত্যেক দিন তিনি এক শানে (অবস্থায়) আছেন।”

তিনি বলেন–

كُلَّ يَوْمٍ هُوَ فِيْ شَاْنٍ

“প্রত্যেক দিন তিনি এক শানে (অবস্থায়) আছেন।”

এই আয়াতের মতলব এই যে, যাহা কিছুই যেই প্রকারের বড় বড় ও বুদ্ধি বিহবল কাজ আল্লাহ্ পাক প্রথমে করিয়াছেন তাহা হইতে হাজার হাজার গুণ (দরজার) বড় কাজ তিনি প্রতি মুহূর্তে করিতে পারেন এবং তাঁহার কুদরতে কালেমা সদাসর্বদা নিজের কাজ করিয়া থাকে।

১৯৩. বোম্বাইর বিখ্যাত দৈনিক পত্রিকা “আল হেলালের” সত্ত্বাধিকারী ও…

বোম্বাইর বিখ্যাত দৈনিক পত্রিকা “আল হেলালের” সত্ত্বাধিকারী ও সম্পাদক হাফেজ আলী বাহাদুর খান বি, এ, হযরত মাওলানার মওতের বিমারের সময়ই একদিন তাঁহাকে দেখিতে আসিয়াছিলেন। তিনি নিতান্ত দুর্বলতা ও অক্ষমতা সত্ত্বেও প্রায় আধ ঘন্টা কাল তাঁহার সহিত কথাবার্তা বলেন।

তিনি এই কথাবার্তায় সবিশেষ অভিভূত হন; বোম্বাই পৌঁছিয়া তিনি “আল হেলালের” কয়েক সংখ্যায় হযরত মওলানার ব্যক্তিত্ব ও দ্বীনি দাওয়াত সম্বন্ধে তাঁহার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করিয়া লিখেন। তাঁহার দাওয়াত এছলাহ্ ও তবলীগের মাহাত্ম্য, বিশেষত্ব, আবশ্যকতা ও সর্বপ্রকারের উপযোগিতার এইরূপভাবে স্বীকৃতি দেন যে, যাহার আশা আজকালকার কোন সম্পাদক বা নেতা হইতে করা যাইতে পারে না।

“আল-হেলালের” ঐ সংখ্যাগুলি এক জায়গা হইতে আমি পাইয়াছিলাম।

হাফেজ ছাহেবের এই মজমুন (বিষয়বস্তু) পড়িয়া আমি খুব খুশী হইলাম এবং হযরত মওলানাকে শুনাইবার জন্য মনস্থ করিলাম। তদনুযায়ী এই কাগজ হাতে লইয়া যথা সময়ে খেদমতে এই আশায় হাজির হইলাম যে, হযরত মাওলানা হাতে কাগজ দেখিয়া নিজেই জিজ্ঞাসা করিবেন– “হাতে কি?” তাহা হইলে কিছু বলিবার ও এই মজমুন শুনাইবার সুযোগ মিলিবে। কিন্তু আমার আশা ও আকাঙ্ক্ষার বিপরীত হযরত মওলানা কিছুই জিজ্ঞাসা করিলেন না।

বহুক্ষণ অপেক্ষা করিয়া কোন সুযোগ না পাওয়াতে আমি নিজেই বলিলাম, “হযরত! অমুক দিন বোম্বাইর হাফেজ আলী বাহাদুর খান যে আসিয়াছিলেন তিনি খোদার ফজলে খুব বেশী তাছির লইয়া গিয়াছেন ও তাঁহার কাগজে আমাদের কাজের সম্বন্ধে অনেক বিষয় লিখিয়াছেন এবং ইহার মাহাত্ম্য ও আবশ্যকতা খুব স্বীকার করিয়াছেন। মনে হয় খুব ভালভাবে বুঝিয়াছেন। হুজুরের হুকুম হইলে এক আধ মজমুন (বিষয়বস্তু) পড়িয়া শুনাইয়া দেই।”

তিনি বলেন– “মওলবী ছাহেব, যে কাজ হইয়া গিয়াছে তাহার উল্লেখ করিয়া কি লাভ? আমাদের যাহা করিবার ছিল তাহা হইতে কত রহিয়া গিয়াছে, যাহা করা হইয়াছে তাহার মধ্যে কি পরিমাণের ও কি কি প্রকারের অসম্পূর্ণতা রহিয়া গিয়াছে, এখলাছ কত কম হইয়াছে, আল্লাহর আদেশের বড়ত্বের ধ্যান কত কম হইয়াছে, কাজের আদাব অনুসন্ধানের ও নবীর নমুনা অনুসরণের কোশেশ কত কম হইয়াছে এই সমস্ত দেখ; ইহাই যথেষ্ট”।

মওলভী ছাহেব! এই সমস্ত বিষয় ছাড়া গত কার্যের আলাপ আলোচনা করা ঠিক এইরূপ যেন পথচারী পথিক পথে দাঁড়াইয়া পিছের দিকে দেখে ও খুশী হইতে থাকে। গত কাজের শুধু দোষ অনুসন্ধান কর ও তাহার সংশোধনের ও ক্ষতিপূরণের ফিকির কর। ভবিষ্যতের জন্য কি করিতে হইবে তাহা চিন্তা কর। ইহা দেখিও না যে, এক ব্যক্তি আমার কথা বুঝিয়া নিয়াছে ও মানিয়াছে বরং ইহা চিন্তা কর যে, এইরূপ কত লক্ষ ও কত কোটি লোক বাকী রহিয়াছে যাহাদের নিকট আমরা এখনও আল্লাহর কথা পৌঁছাইতেও পারি নাই। আর কত এমন আছে যে, যাহারা বুঝিবার ও মানিবার পরও আমাদের কোশেশের স্বল্পতার দরুণ কার্যক্ষেত্রে অবতীর্ণ হন নাই।

১৯৪. নামাজকে হাদীছে عماد الدين “দ্বীনের খুঁটি” বলা হইয়াছে…

তিনি বলেন–

নামাজকে হাদীছে عماد الدين “দ্বীনের খুঁটি” বলা হইয়াছে। ইহার মতলব এই যে, নামাজের উপর অবশিষ্ট দ্বীন নির্ভর করে ও নামাজ হইতেই দ্বীন পাওয়া যায়। নামাজের মধ্যে দ্বীনের বুঝও পাওয়া যায়। আমলের তওফীকও দেওয়া হয়। আবার যাহার নামাজ যেইরূপ হইবে সেইরূপ তাহার জন্য তওফীকও দেওয়া হইবে। এই জন্য নামাজের দাওয়াত দেওয়া ও অন্যের নামাজে ‘খুশুখুজু’ (নম্রতা) পয়দা করিবার জন্য কোশেশ করা পরোক্ষভাবে পূর্ণ দ্বীনের জন্য কোশেশ করা।

১৯৫. যে সমস্ত কাজ সাধারণ মোখুলেছ ভাইদের নিকট হইতে…

তিনি বলেন–

যে সমস্ত কাজ সাধারণ মোখুলেছ ভাইদের নিকট হইতে লওয়া যাইতে পারে ও তাহার দ্বারা তাহাদের মরতবা ও ছওয়াব (পারিশ্রমিক) বৃদ্ধি হইবার আশা হয়, উহা তাহাদের নিকট হইতে না লওয়া ও নিজে করা– এই সমস্ত মোখলেছ ভাইদের জন্য হাম্দর্দি নহে, বরং এক প্রকারের জুলুম ও আল্লাহর উদার আইনের الدال على الخير كفاعله (“যে ভাল কাজে সাহায্য করে সে যেন সে কাজ করে”) না-কদরী করা।

তিনি বলেন– “ভাইগণ, দ্বীনের উপর আমল করার জন্য অত্যধিক বুঝের দরকার।”

১৯৬. ইহা অতি আবশ্যকীয় উছুল যে, যাহা হক ও…

তিনি বলেন–

ইহা অতি আবশ্যকীয় উছুল যে, যাহা হক ও জরুরী বলিয়া তাহারা নিজেরাই মানে ও উহা না করাকে নিজেরাই দোষ বলিয়া মনে করে, প্রত্যেক শ্রেণীর লোককে ঐ জিনিষের দাওয়াত দিতে হইবে, যখন প্রত্যেক শ্রেণীর লোক ঐ সমস্ত কাজ করিতে থাকিবে, পরবর্তী কার্য্যের অনুভূতি খোদা চাহেত তাহাদের মধ্যে আপনা আপনিই পয়দা হইবে এবং তাহা করিবার যোগ্যতাও পয়দা হইবে।

১৯৭. যাহারা যত বেশী আহলে হক তাহাদের মধ্যে তত…

তিনি বলেন–

যাহারা যত বেশী আহলে হক তাহাদের মধ্যে তত বেশী কাজ ও কোশেশ করিতে হইবে; তাহাদের দ্বীনের জন্য উঠা অতি জরুরী। কেননা তাহারা আসল ও বুনিয়াদ হইতে পারে।

১৯৮. তবলীগের আদাবের মধ্যে ইহাও যে, কথা যেন বেশী…

তিনি বলেন–

তবলীগের আদাবের মধ্যে ইহাও যে, কথা যেন বেশী লম্বা না হয় এবং প্রথম প্রথম মানুষ হইতে মাত্র এতটুকু কাজ চাওয়া হয় যাহা তাহারা বড় মুশকিল ও ভারী না বুঝে। কখনও লম্বা কথা ও লম্বা সময় চাওয়াতে মানুষ ফিরিয়া থাকিবার কারণ হইয়া যায়।

২০০. বহু লোক ইহা মনে করে যে, পৌঁছাইয়া দেওয়ার…

তিনি বলেন–

বহু লোক ইহা মনে করে যে, পৌঁছাইয়া দেওয়ার নামই তবলীগ, ইহা মস্ত বড় ভুল। তবলীগ অর্থ ইহা যে, নিজের যোগ্যতা ও শক্তির শেষ সীমা পর্যন্ত যাইয়া লোকদিগকে দ্বীনের কথা এই প্রকারে পৌঁছাইতে হইবে, যেই প্রকারে পৌঁছাইলে তাহারা মানিয়া নিবার সম্ভাবনা হয়। নবীগণ এই তবলীগই লইয়া আসিয়াছেন। (তাঁহাদের উপর শান্তি বর্ষিত হউক।)

২০১. ফাজায়েলের মরতবা মাছায়েলের পূর্বের, ফাজায়েলের দ্বারা আমলের পুরস্কারের…

তিনি বলেন–

“ফাজায়েলের মরতবা মাছায়েলের পূর্বের, ফাজায়েলের দ্বারা আমলের পুরস্কারের উপর একীন হয়, যাহা ঈমানের স্থান। আবার ইহা দ্বারাই মানুষ কাজ করিবার জন্য প্রস্তুত হয়। মাছায়েল জানিবার আবশ্যকতা তখনই অনুভূত হইবে যখন আমল করিতে প্রস্তুত হইবে। এই জন্য আমাদের নিকট ফাজায়েলের আবশ্যকতা বেশী।”

২০২. তবলীগী জামায়াতের তালীমের নেছাবের এক আবশ্যকীয় অংশ ‘তজবীদ’…

তিনি বলেন–

তবলীগী জামায়াতের তালীমের নেছাবের এক আবশ্যকীয় অংশ ‘তজবীদ’। কোরআন শরীফ শুদ্ধভাবে পড়া অতি বড় জিনিস।

ما اذن الله لشيء ما اذن لنبي يتغنى بالقران

“আল্লাহ পাক নবীর সুমিষ্ট সুরে কোরআন পড়া যেমন কান লাগাইয়া (সন্তুষ্ট হইয়া আগ্রহের সহিত) শোনেন তেমন অন্য কোন কিছুর প্রতি কান লাগাইয়া শোনেন না।”

তজবীদ প্রকৃত প্রস্তাবে ঐরূপ শুদ্ধভাবে কোরআন শরীফ পড়া যাহা হুজুর ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হইতে নকল হইয়া আমাদের নিকট পর্যন্ত পৌঁছিয়াছে। কিন্তু তজবীদ শিক্ষার জন্য যেই সময়ের দরকার জমায়াতে সেই সময় পাওয়া যাইতে পারে না। এই জন্য এই সময় শুধু ইহার কোশেশ করিতে হইবে যেন লোকের মধ্যে ইহার আবশ্যকতার অনুভূত পয়দা হয় ও কিছু কিছু যোগ্যতা (মোনাছেবাত) পয়দা হয়, তৎপর তাহারা যেন ইহা শিখিবার জন্য পৃথক সময় খরচ করিতে প্রস্তুত হয়।

২০৩. অন্যকে দ্বীনের দাওয়াত ও তরগীব দেওয়া গুপ্ত এবাদত…

তিনি বলেন–

অন্যকে দ্বীনের দাওয়াত ও তরগীব দেওয়া গুপ্ত এবাদত। কেননা সাধারণ লোকেরা ইহাকে এবাদত বলিয়া বুঝে না। ইহার মধ্যে উচ্চ দরজার সকর্মতাও (এক এবাদতের দ্বারা বহু এবাদত হওয়ার মাদ্দা تعدد) আছে। যাহা প্রকাশ্য এবাদতের মধ্যে ভালর বিশেষ অংশ।

২০৪. বুজুর্গদের খেদমত করার আসল উদ্দেশ্য এই যে, তাঁহাদের…

তিনি বলেন–

বুজুর্গদের খেদমত করার আসল উদ্দেশ্য এই যে, তাঁহাদের যে সমস্ত সাধারণ ও সামান্য কাজ অন্য লোকেরা করিতে পারে তাহা যেন তাহারা নিজেদের জিম্মায় লইয়া উহাদের সময় ও শক্তি ঐ সমস্ত বড় কাজের জন্য ফারেগ করিয়া দেয় যাহা কেবলমাত্র ঐ সমস্ত বুজুর্গেরাই করিতে পারেন; যেমন কোন জামানার পীরের অথবা কোন আলেম ও মুফতীর সাধারণ কাজ যাহা আপনি করিতে পারেন তাহা আপনি আপনার জিম্মায় লইয়া তাহাদিগকে ফারেগ ও বেফিকির করিয়া দিলেন, তাহা হইলে ঐ সমস্ত হযরতেরা দ্বীনের যে সমস্ত বড় বড় কাজ করিয়া থাকেন (যাহা এছলাহ, এরশাদ, দরছ ও এফতাহ ইত্যাদি) তাহা অধিকতর একাগ্রচিত্ত ও নিশ্চিত মনে সম্পাদন করিতে পারিবেন; আর এই প্রকারে এই খাদেমগণ তাহাদের ঐ সমস্ত বড় কাজের পুরস্কারের অংশীদার হইয়া যাইবে। তাহা হইলে দেখা গেল যে, প্রকৃত প্রস্তাবে বুজুর্গদের খেদমত করা তাঁহাদের বড় কাজে অংশ নেওয়ার এক উপায় স্বরূপ।

২০৫. প্রকৃত প্রেম প্রেমিক ও প্রেমাম্পদের মধ্যে ধ্যান ধারণা…

তিনি বলেন–

প্রকৃত প্রেম প্রেমিক ও প্রেমাম্পদের মধ্যে ধ্যান ধারণা এমনকি বাসনা কামনার মধ্যেও পূর্ণ একত্ব পয়দা করে। আমার ভাই মওলানা মুহাম্মদ ইহ্য়াই ছাহেব (রহঃ)-এর অবস্থা এই ছিল যে, যদিও তিনি খান্কাহ হইতে দূরে থাকিতেন তথাপি অনেক বার এইরূপ হইত যে, হঠাৎ তাহার মনে খান্কায় যাওয়ার কামনা হইত তখনই তিনি খানকার দিকে রওয়ানা হইতেন এবং দরজা খোলা মাত্রই হযরত মাওলানা গাঙ্গুহী (কুদ্দেছা ছিররুহ)-কে তাহার অপেক্ষায় বসা পাইতেন।

তিনি বলেন–

আল্লাহর সহিত যখন কোন বান্দার সত্যিকার মহব্বত হয় তখন আল্লাহর সহিতও এই মোয়ামেলা হইয়া যায় অর্থাৎ আল্লাহর পছন্দকৃত জিনিস সমূহ হইয়া যায়। আর যেই সমস্ত কথায় আল্লাহ নাখোশ হন বান্দার ও তৎপ্রতি নফরত বা ঘৃণা পয়দা হয়। এই মহব্বত পয়দা করিবার পদ্ধতি বা তরীকা মুহাম্মদী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নমুনার অনুসরণ। যেমন, আল্লাহ পাক ফরমাইয়াছেন–

قُلْ اِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّوْنَ اللّٰهَ فَاتَّبِعُوْنِيْ يُحْبِبْكُمُ اللّٰهُ

“বলুন, যদি তোমরা আল্লাহর সহিত মহব্বত করিতে চাও তাহা হইলে আমার অনুসরণ কর। আল্লাহ তোমাদিগকে মহব্বত করিবেন।”

২০৬. যাহারা দ্বীনদার ও দ্বীনদান (দ্বীন সম্বন্ধে জ্ঞাত) হওয়া…

তিনি বলেন–

যাহারা দ্বীনদার ও দ্বীনদান (দ্বীন সম্বন্ধে জ্ঞাত) হওয়া সত্ত্বেও দ্বীনের প্রচার প্রচলন ও উম্মতের সংশোধনের জন্য এইরূপ চেষ্টা ও কষ্ট করেন না, যেইরূপ হুজুর ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নায়েবের হওয়া উচিত। তাঁহাদের সম্বন্ধে একদিন হযরত মওলানার মুখ দিয়া বাহির হইল, “এই সমস্ত লোকের উপর আমার রহম বা দয়া আসে।” ইহার পর অনেকক্ষণ পর্যন্ত অবিরাম এস্তেগ্ফার পড়িতে থাকেন। তৎপর এই অধমকে সম্বোধন করিয়া বলেন– “আমার তাহাদের উপর রহম আসে”। এই দাবীর বাক্য আমার মুখ দিয়া বাহির হওয়াতে আমি এই এস্তেগফার পড়িয়া তওবা করিতেছি।

২০৭. মসজিদ সমূহ মসজিদে-নববীর কন্যা স্বরূপ। এই জন্য ইহাদের…

তিনি বলেন–

মসজিদ সমূহ মসজিদে-নববীর কন্যা স্বরূপ। এই জন্য ইহাদের মধ্যে ঐ সমস্ত কার্য হওয়া চাই যাহা হুজুর ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মসজিদে হইত। হুজুর ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মসজিদে নামাজ ব্যতীত তালীম তরবীয়তের (শিক্ষা-দীক্ষার) কাজও হইত। তদুপরি দ্বীনের দাওয়াতের যাবতীয় কাজ মসজিদ হইতেই হইত। দ্বীনের তবলীগ অথবা তালীমের ওফদ (জমাত সমূহ)-ও মসজিদ হইতেই বাহির হইত। এমন কি সৈন্যদের নজম (চালনা)-ও মসজিদ হইতেই হইত। আমরা চাই যে, আমাদের মসজিদ সমূহেও এইভাবে এই সমস্ত কাজ হইতে থাকে।

২০৮. ছহীহ কাজ করিবার পদ্ধতি এই– যেই সমস্ত কাজ…

তিনি বলেন–

ছহীহ কাজ করিবার পদ্ধতি এই– যেই সমস্ত কাজ নীচ দরজার লোক হইতে লইতে পারা যায় তাহা তাহাদের দ্বারাই লইবে। যখন নীচের দরজার লোক পাওয়া যায় তখন উচ্চ দরজার লোক ঐ সমস্ত কাজে লাগা বড়ই ভুল কথা; বরং এক প্রকার নেয়ামতের নাশুকুরী ও নীচের দরজার লোকদের উপর জুলুম।

২০৯. দ্বীনের দাওয়াতের কাজ আমার নিকট বর্তমানে এত জরুরী…

তিনি বলেন–

দ্বীনের দাওয়াতের কাজ আমার নিকট বর্তমানে এত জরুরী যে, একজন লোক নামাজে মশগুল আছে আর একজন নূতন লোক আসিয়া চলিয়া যাইতে চায় ও তাহাকে পুনরায় পাওয়ার সম্ভাবনা না থাকে তাহা হইলে আমার মতে মধ্যখানে নামাজ ভাঙ্গিয়া তাহার সহিত দ্বীনি কথা বলা চাই ও তাহার সহিত কথা বলা শেষ হইলে অথবা তাহাকে বসাইয়া নিজের নামাজ পুনরায় পড়া চাই।

২১০. আমার মর্যাদা এক সাধারণ মোমেন হইতে উপরে বুঝা…

এ সম্বন্ধে তিনি আরও বলেন–

আমার মর্যাদা এক সাধারণ মোমেন হইতে উপরে বুঝা উচিত নহে। শুধু আমার কথার উপর কাজ করা বদদ্বীনি হইবে। আমি যাহা কিছু বলি উহাকে কেতাব ও ছুন্নতের উপর আরোপ করিয়া এবং নিজে চিন্তা ফিকির করতঃ নিজের জিম্মাদারীর উপর কাজ কর। আমি তো শুধু পরামর্শ দিয়া থাকি।

তিনি বলেন– হযরত ওমর (রাঃ) নিজের সাথীদের বলিতেন– “তোমরা আমার মাথার উপর বড় জিম্মাদারী ঢালিয়া দিয়াছ, তোমরা সকলে আমার কার্য সমূহ দেখা শুনা কর।” আমিও আমার বন্ধুদের সর্বদা সানুনরে এই দরখাস্ত করিয়া থাকি, তাঁহারা যেন আমার তত্ত্বাবধান করেন; যেখানে ভুল করি সেখানে বলিয়া দেন ও আমি যেন সৎপথে সততার সহিত চলিতে পারি সেজন্য চলিবার জন্য, দোয়াও করেন।

২১১. কোন কাজে মশগুল হওয়াতে অন্যান্য অনেক কাজ হইতে…

তিনি বলেন–

কোন কাজে মশগুল হওয়াতে অন্যান্য অনেক কাজ হইতে ফিরিয়া থাকিতে হয় অর্থাৎ যখন কোন জিনিসে মশগুল হইবে তখন অন্য সমস্ত জিনিস হইতে নিবৃত্ত থাকিতে হইবে; পুনরায় যেই পরিমাণে মশগুল হইবে সেই পরিমাণে অন্যান্য কাজ হইতে নিবৃত্তও হইতে হইবে। শরীয়তে যে ভাল হইতে ভাল কাজ শেষ করিয়া এস্তেগফার করিবার জন্য শিক্ষা দেওয়া হইয়াছে আমার মতে ইহার মধ্যে এক গুপ্ত রহস্য ইহাও যে, সম্ভবতঃ ঐ ভাল কাজে ব্যস্ত থাকার দরুণ অন্য কোন আদেশ পালনে শৈথিল্য হইতে পারে, বিশেষ করিয়া যখন কোন কাজের আকর্ষণ অন্তরে লাগিয়া যায় ও মানুষের মনে ও মস্তিষ্কে ঐ কাজ ব্যাপ্ত হইয়া যায় তখন উহা ব্যতীত অন্যান্য কাজে অনেক সময় ত্রুটি হইতে থাকে। এই জন্য আমাদের এই কাজে যাহারা লাগে তাহাদের বিশেষ ভাবে কাজের সময় ও কাজ শেষ করিয়া বেশীভাবে এস্তেগফার পড়া নিজের উপর বাধ্যতামূলক করিয়া লওয়া চাই।

২১২. ওলামাদের বলিতেছি যে, এই সমস্ত তবলীগী জমায়াতের গুরাফিরা…

তিনি বলেন–

ওলামাদের বলিতেছি যে, এই সমস্ত তবলীগী জমায়াতের গুরাফিরা, পরিশ্রম ও কোশেশের দ্বারা সাধারণের মধ্যে শুধুমাত্র দ্বীনের তলব ও কদর পয়দা করা যাইতে পারে ও তাহাদিগকে দ্বীন শিখিবার জন্য প্রস্তুত করা যাইতে পারে। তৎপর দ্বীনের তালীম ও তরবীয়তের (শিক্ষা-দীক্ষার) কাজ ওলামা ও ছোলাহাদের এই দিকে মনোযোগ দেওয়াতে হইতে পারে এই জন্য আপনাদের মত বুজুর্গদের দৃষ্টিপাতের খুব বেশী জরুরত আছে।

২১৩. কোন কথা প্রসঙ্গে বর্তমান জমানার এক বিখ্যাত আলেম…

কোন কথা প্রসঙ্গে বর্তমান জমানার এক বিখ্যাত আলেম ও লিখক দ্বীনের খাদেমের কথা আসিল যাহার আমলী দুর্বলতার জন্য খাছ দ্বীনদার শ্রেণীর লোকদের আপত্তি ছিল।

তিনি বলেন– আমি তো তাঁহার গুণগ্রাহী, যদিও তাঁহার মধ্যে কোন দুর্বলতা থাকে তাহা হইলে আমি ইহা জানিতেও চাই না। ইহার মোয়ামেলা আল্লাহর সহিত। সম্ভবতঃ তাঁহার নিকট ইহার কোন ওজর আছে। আমাদের উপর আম আদেশ এই যে, দোয়া কর–

لا تجعل غلا للذين امنوا

“(আয় আল্লাহ!) যাহারা ঈমান আনিয়াছে তাহাদের জন্য আমাদের কলব সমূহে (কু-ধারণা) (কিনাহ) শত্রুভাব দিও না।”

২১৪. পাঞ্জাবের এক বিখ্যাত বড় আলেম ও বুজুর্গ (যাহার…

পাঞ্জাবের এক বিখ্যাত বড় আলেম ও বুজুর্গ (যাহার সহিত এই দ্বীনহীন ‘মলফুজাতের’ সঙ্কলকেরও ভক্তির সম্বন্ধ রহিয়াছে) দিল্লী আসিয়াছিলেন। এই অধম তাঁহার খেদমতে হাজির হইয়া হযরত মওলানার দ্বীনি দাওয়াত, ইহার উছুল ও কার্য পদ্ধতি কিছু বিস্তারিতভাবে আলোচনা করি ও নিজের পুরাতন ভক্তির সম্বন্ধের দরুণ তাঁহাকে কিছু দিন এই কাজের কেন্দ্র নিজামুদ্দিনে থাকিয়া এই দ্বীনি দাওয়াত সম্বন্ধে আরও অধিক অবগত হইবার জন্য উৎসাহিত করি ও অনুরোধ জানাই। দাওয়াতের উছুল (তরিকায়ে-কায়) কার্য পদ্ধতি ও কাজের উন্নতি সম্বন্ধে আমার বক্তব্য শুনিয়া তিনি খুব ভাল ধারণা ও মন্তব্য প্রকাশ করেন এবং বলেন, “এখন তো আমি বেশী দিন থাকিতে পারিব না, মাত্র তিন চার দিনের জন্য আসিয়াছি, তদুপরি হযরত মাওলানাও বিমার, কাজেই এই সময় আমি শুধু জিয়ারতের জন্য হাজির হইব। কিন্তু আমি নিয়ত করিয়াছি যে, যখন মওলানা সুস্থ হইবেন ও কোন বিশেষ তবলীগী (দাওয়ায়) ছফরে যাইবেন তখন আমি খোদা চাহে তো সঙ্গে থাকিয়া দেখিব।”

এই অধম যখন দিল্লী শহর হইতে নিজামুদ্দিন বস্তিতে আসিয়া হযরত মাওলানাকে সম্পূর্ণ কথাবার্তা শুনাই তখন তিনি বলেন–

শয়তানের ইহা অতি বড় ধোকা ও ফেরেব যে, সে ভবিষ্যতের বড় কাজের আশা দিয়া ছোট (ভাল) কাজ হইতে বিরত রাখে, যাহা বর্তমানে করা যাইতে পারে। সে ইহা চায় যে, বান্দাহ এই সময় যেই ভাল কাজ করিতে পারে কোন হিলা-বাহানা করিয়া তাহাকে তাহা হইতে হটাইয়া দেয়; আর এই তদ্বীরে সে প্রায়ই কৃতকার্য হইয়া যায়; তৎপর ভবিষ্যতে যেই বড় কাজের জন্য বান্দা আশা করে অনেক সময় উহার সুযোগ সুবিধা ও সময়ই আসে না। বড় কাজের আশাগুলি প্রায়ই পূর্ণ হয় না। আর ইহার বিপরীতে যেই ভাল কাজ এখনই সম্ভব যদিও তাহা ক্ষুদ্রাদপিক্ষুদ্রও হয় তাহাতে লাগিয়া যাওয়া অধিকাংশ অবস্থায়ও সময় বড় বড় কাজে পৌঁছিবার উপায় স্বরূপ হয়। এই জন্য ইহাই বুদ্ধির কথা যে, যেই ভাল কাজ যেই সময় যেই পরিমাণে সহজে করা যাইতে পারে তাহা তখনই করিয়া সুযোগের নগদ ফায়েদা উঠাইয়া লয়।

সেই বুজুর্গের উচিত যে, পুনঃ করিবার জন্য না রাখিয়া বর্তমানেই যতদূর সম্ভব সময় দিয়া দেয় ও আমার বিমারের কথা একেবারে খেয়ালই না করে। অন্যেরা কি জানিবে! এই ব্যারামের সময়ই আরামের সময় হইতে অনেক গুণ বেশী কাজ হইতেছে, এখানে আসিবার ইহাই খাছ সময়।”

আল্লাহর কাজ এইরূপই হইল। ঐ বুজুর্গ ঐ সময় থাকিতে পরিলেন না এবং ভবিষ্যত সম্বন্ধে তিনি যে আশা করিয়াছিলেন তাহাও পুরা হইল না। অল্প কয়েক দিন পরেই হযরত মাওলানার মওলার সহিত মিলন (মৃত্যু) হইয়া গেল। (আল্লাহ তাঁহাকে নেককার বুজুর্গদের মত রহমত (দয়া) দান করুক)।

সমাপ্ত


← আগের কিস্তি (দশম কিস্তি)  |  সূচিপত্র

মূল বই: মালফুজাত (নীতি-কথা) – হযরতজী মাওলানা ইলিয়াস (রহঃ)। সংকলন: মাওলানা মুহাম্মদ মনজুর নোমানী। অনুবাদ: ডক্টর মোহাম্মদ ছানাউল্লাহ (ব্যারিষ্টার)। প্রকাশক: মোহাম্মদী লাইব্রেরী, চকবাজার, ঢাকা।

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *