মালফুজাতে হযরতজী ইলিয়াস (রহঃ) – নবম কিস্তি: মলফুজ ১৩৫–১৫৯
হযরতজী মাওলানা মুহাম্মদ ইলিয়াস কান্ধলভী (রহঃ)-এর বাণী সংকলন মালফুজাত (নীতি-কথা) – হযরতজী মাওলানা ইলিয়াস (রহঃ) বইয়ের নবম কিস্তি (মলফুজ ১৩৫ থেকে ১৫৯)। সম্পূর্ণ সূচিপত্র দেখুন।
সংকলন: মাওলানা মুহাম্মদ মনজুর নোমানী। অনুবাদ: ডক্টর মোহাম্মদ ছানাউল্লাহ (ব্যারিষ্টার)। প্রকাশক: মোহাম্মদী লাইব্রেরী, চকবাজার, ঢাকা।
১৩৬৬ হিজরীর জমাদাল উলা ও জমাদাচ্ছানী
আল-ফোরকানে প্রকাশিত
এই কিস্তিতে যা আছে
- ১৩৫. আমাদের এই তবলীগী আন্দোলন দ্বীনি তা’লীম ও তরবীয়ত…
- ১৩৬. দিল্লীর এক সওদাগর এক তবলীগী জমায়াতের সহিত সিন্ধু…
- ১৩৭. আমাদের এই কাজের ছহীহ্ তরতীব তো (শ্রেণী বিভাগ)…
- ১৩৮. আমাদের এই কাজের বিস্তারের চেয়ে গভীরতা ও দক্ষতা…
- ১৩৯. এক ভক্তকে (যিনি মওলানার তবলীগী কাজও করিতেন তদুপরি…
- ১৪০. তবলীগের কাজে তিন দিন দাও, পাঁচ দিন দাও…
- ১৪১. টাকা পয়সার লোভে ইসলামের শত্রুদের (হাতের ক্রীড়নক সাজিয়া…
- ১৪২. একদিন হযরত মওলানা সম্ভবতঃ ইহা বয়ান করিবার জন্য…
- ১৪৩. স্বাধীনভাবে ও নিজের মনমত না চলা বরং নিজকে…
- ১৪৪. আকবরের গোমরাহীর বিশেষ কারণ এই ছিল যে, তিনি…
- ১৪৫. আমার এই রোগ ও দুর্বলতার কারণে ওলামা ও…
- ১৪৬. সাধারণতঃ কর্মীরা বড় লোক ও বিখ্যাত ব্যক্তিদের পিছে…
- ১৪৭. হযরত গাঙ্গুহী (রহঃ) এই যুগের কুত্বে এরসাদ ও…
- ১৪৮. দ্বীনের নেয়ামত যাঁহাদের মধ্যস্থতায় আমাদের নিকট পৌঁছিয়াছে তাঁহাদের…
- ১৪৯. আল্লাহ্ পাক নিজের যে ছিফাত (গুণ) ও আদত…
- ১৫০. হযরত গাঙ্গুহীর (আল্লাহ পাক তাঁহার কবরকে নূরান্বিত করুক)…
- ১৫১. আজ ১৩৬৩ হিজরীর ২রা জোমাদাল-উলা বুধবার রাত্রে দেওবন্দ…
- ১৫২. দেওবন্দ হইতে যেই ছাত্রের জমায়াত রাত্রে আসিয়া ছিলেন…
- ১৫৩. ঐ সমস্ত ছাত্রদিগকে সম্বোধন করিয়া তিনি বলেন
- ১৫৪. নিশ্চয়ই মুমেনগণ কৃতকার্য হইয়াছেন। কেবল তাহারাই সফলকাম।”
- ১৫৫. গায়েবী সাহায্য ও গায়েবী শক্তি যাহার নাম তাহা…
- ১৫৬. আর যাহা আমি তাহাদিগকে দিয়াছি তাহা হইতে খরচ…
- ১৫৭. সেই সকল ছাত্রদিগকেই তিনি বলেন
- ১৫৮. এক মশহুর (বিখ্যাত) দ্বীনি জমায়াতের প্রসিদ্ধ কর্মী ও…
- ১৫৯. ভারতের এক বিখ্যাত রাজনৈতিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের এক…
১৩৫. আমাদের এই তবলীগী আন্দোলন দ্বীনি তা’লীম ও তরবীয়ত…
তিনি বলেন–
আমাদের এই তবলীগী আন্দোলন দ্বীনি তা’লীম ও তরবীয়ত বিস্তার করিবার ও দ্বীনি জিন্দেগী প্রচার করিবার আন্দোলন। ইহার যে সমস্ত ওছুল আছে উহাদের যথাযথ পালনের মধ্যেই ইহার কৃতকার্যতার ভেদ (গুরুতত্ত্ব) নিহিত আছে। এই ওছুল সমূহের মধ্যে এক ওছুল এই যে, মুসলমানের মধ্যে যে শ্রেণীর যে হক আল্লাহ পাক নির্দিষ্ট করিয়া দিয়াছেন (রাখিয়াছেন) তাহা আদায় করতঃ এই দাওয়াতকে তাহাদের সামনে পেশ করিতে হইবে। মুসলমানের মধ্যে তিন শ্রেণী আছেঃ (১) অনুন্নত (দরিদ্র) (২) (উন্নত, ধনী ও) সম্মানিত (৩) ওলামায়ে দ্বীন। তাহাদের সকলের সহিত যে ব্যবহার করিতে হইবে তাহা নিম্নলিখিত হাদীছে একত্রে জমা করা হইয়াছেঃ
من لم يرحم صغيرنا و لم يوقر كبيرنا و لم يبجل علمائنا فليس منا
“যে ব্যক্তি আমাদের ছোটকে রহম (দয়া) করিল না, বড়কে সম্মান করিল না, ওলামাদের ইজ্জত করিল না; সে আমাদের (মুসলমান সম্প্রদায়ের) মধ্যে নহে।”
সুতরাং কওমের মধ্যে যাহারা ছোট তাহাদের হক রহম (দয়া) ও খেদমত (সেবা)। আর যাহারা সম্মানী ও মানী তাঁহাদের হক (সম্মান) এবং ওলামায়ে দ্বীনের হক ইজ্জত আদায় করিয়া তাহাদিগকে এই দাওয়াত দিতে হইবে–
و اتوا البيوت من ابوابها
“ঘরগুলিতে দরজাগুলি দিয়া আস”। অর্থাৎ নিয়মমত কাজ কর, অনিয়মে করিও না।
১৩৬. দিল্লীর এক সওদাগর এক তবলীগী জমায়াতের সহিত সিন্ধু…
দিল্লীর এক সওদাগর এক তবলীগী জমায়াতের সহিত সিন্ধু হইতে কাজ করিয়া ফিরিয়া আসিয়াছিলেন। সেখানকার কাজের রিপোর্ট (বিবরণ) তাহার নিকট হইতে শুনিয়া হযরত মওলানা বলিলেন– বন্ধুগণ! আমাদের এই কাজ [এছলাহী (সংশোধনী) ও তবলীগী চেষ্টা ও কষ্ট] এক প্রকার যাদু বা বশীকরণের কাজ (অর্থাৎ যে কেহ ইহাতে লাগিবে ও ইহাকে নিজের ধ্যান ধারণা করিয়া লইবে আল্লাহ পাক তাহার কাজ বানাইতে (করিতে) থাকিবেন)–
من كان لله كان الله له
“যে ব্যক্তি আল্লাহর হইবে আল্লাহ্ পাক তাহার হইবেন।”
যদি তোমরা আল্লাহর কাজে লাগ তাহা হইলে আছমান জমিন আকাশ বাতাস তোমাদের কাজ করিতে থাকিবে, তোমরা আল্লাহর কাজে ঘর বাড়ী ও কাজ কারবার ছাড়িয়া বাহির হইয়াছিলে এখন তোমাদের কারবারে কত বরকত হইতে থাকিবে– তাহা সচক্ষে দেখিয়া লও। আল্লাহর (দ্বীনের) সাহায্য করিয়া যে ব্যক্তি আল্লাহর সাহায্যের ও রহমতের আশা না রাখে সে ফাছেক ও দুর্ভাগা।
সঙ্কলনকারী বলেন– শেষ বাক্য তিনি এইরূপ জোশে বলেন যে, শ্রোতাদের দিল হেলিয়া গেল।
১৩৭. আমাদের এই কাজের ছহীহ্ তরতীব তো (শ্রেণী বিভাগ)…
তিনি বলেন–
আমাদের এই কাজের ছহীহ্ তরতীব তো (শ্রেণী বিভাগ) এই যে, প্রথম নিকটবর্তী এলাকায় যাইতে থাকিবে, নিজের আশেপাশে কাজ করিতে করিতে আগে বাড়িতে থাকিবে। যেমন, এখান হইতে জমায়াত সমূহ প্রথম কর্ণাল, পানিপথ প্রভৃতি জায়গায় যাইবে। তৎপর তথা হইতে পাঞ্জাব ও ভাওয়ালপুরের এলাকায় কাজ করিতে করিতে সিন্দু যাইবে। কিন্তু কখন কখন কর্মীদের মধ্যে দৃঢ়তা, আজম ও দক্ষতা পয়দা করিবার জন্য প্রথমেই দূরে দূরে পাঠাইতে হইবে। এই সময় সিন্দু ও বোম্বাই জমায়াত সমূহ পাঠাইবার উদ্দেশ্যও ইহাই। এই লম্বা লম্বা ছফরের দ্বারা কাজের মহব্বত ও দৃঢ়তা পয়দা হইবে।
১৩৮. আমাদের এই কাজের বিস্তারের চেয়ে গভীরতা ও দক্ষতা…
তিনি বলেন–
আমাদের এই কাজের বিস্তারের চেয়ে গভীরতা ও দক্ষতা বেশী দরকার; কিন্তু এই কাজের তরিকা (পদ্ধতি) এই প্রকার যে দক্ষতার সঙ্গে সঙ্গেই বিস্তারও হইতে থাকিবে; কেননা দক্ষতা ইহা ব্যতীত হইবে না; কাজেই শহরে শহরে ও দেশে দেশে এই দাওয়াত লইয়া ফিরিতে হইবে।
১৩৯. এক ভক্তকে (যিনি মওলানার তবলীগী কাজও করিতেন তদুপরি…
এক ভক্তকে (যিনি মওলানার তবলীগী কাজও করিতেন তদুপরি পুস্তক প্রণয়ন ও প্রবন্ধ লিখা যাহার খাছ পেশা ছিল) এক দিন তিনি বলেন–
আমি তখন পর্যন্ত তবলীগ সম্বন্ধে বেশী কিছু লিখা পড়া করা ও লিখা দ্বারা ইহার দাওয়াত দেওয়া পছন্দ করিতাম না, বরং আমি ইহা নিষেধ করিতেছিলাম; কিন্তু এখন আমি বলি, লিখা হউক, তুমিও খুব লিখ তবে এখানকার অমুক অমুক কর্মীকে আমার এই কথা পৌঁছাইয়া তাহাদেরও মত লও।
(তদনুসারে কথিত হজরাতকে হজরত মওলানার এই কথা পৌঁছাইয়া তাহাদের পরামর্শ চাওয়া হইলে তাঁহারা বলিলেন, “এ সম্বন্ধে এ পর্যন্ত যে কার্যপদ্ধতি চলিয়া আসিতেছে তাহা এখনও চলুক, আমাদের মতে ইহাই ভাল।”
হযরত মওলানাকে তাঁহাদের এই মত পৌঁছান হইলে তিনি বলেন–
প্রথম প্রথম আমরা একেবারে সহায় সম্বলহীন অবস্থায় ছিলাম, কেহই আমাদের কথা শুনিত না। আমাদের কথা কাহারও বুঝেও আসিত না। ঐ সময় ইহা জরুরী ছিল যে, আমরা নিজেরাই চলাফিরা করিয়া লোকদের মধ্যে তলব (আগ্রহ) পয়দা করি ও কার্য দ্বারা আমাদের কথাকে বুঝাই। সেই সময়ে কাগজে লিখিয়া সাধারণভাবে দাওয়াত দেওয়া হইলে লোকে উল্টাপাল্টা বুঝিত ও নিজের বুঝ মতই মত পোষণ করিত এবং কিছু অন্তরে লাগিলে নিজের বুঝ মত কিছু সিদা ও কিছু উল্টা এই কাজ করিতে আরম্ভ করিত। কিন্তু যখন পরিণাম ফল গলত্ ভুল বাহির হইত তখন আমাদের স্কীমকে (পরিকল্পনাকে) অসম্পূর্ণ বলিত। এই জন্যই আমরা লিখা দ্বারা আমাদের দাওয়াত লোকের নিকট পৌঁছান পছন্দ করিতাম না। কিন্তু আল্লাহ পাকের ফজল করম ও সাহায্যের দ্বারা এখন অবস্থার পরিবর্তন হইয়াছে। আমাদের বহু জমায়াত দেশের বিভিন্ন স্থানে বাহির হইয়া কাজের পদ্ধতি দেখাইয়া দিয়াছে। এখন লোক স্বয়ং আমাদের কাজের তালেব হইয়া আমাদের নিকট আসিতেছে। ও আল্লাহ পাক আমাদিগকে এত লোক দিয়াছেন যে, যদি বিভিন্ন জায়গায় তলব পয়দা হয় ও কাজ শিখাইবার জন্য জমায়াতের প্রয়োজন হয় তাহা হইলে জমায়াত পাঠান যাইতে পারে। এই অবস্থাও প্রাথমিক নিঃস্ব ও নিঃসহায় অবস্থার মত কার্যপদ্ধতির প্রত্যেক কথার উপর জমিয়া থাকা ঠিক নহে। এই জন্য আমি বলিতেছি যে, এখন লিখিতভাবেও দাওয়াত দেওয়া চাই।
১৪০. তবলীগের কাজে তিন দিন দাও, পাঁচ দিন দাও…
তিনি বলেন–
তবলীগের কাজে তিন দিন দাও, পাঁচ দিন দাও, সাত দিন দাও– এখন এই সব কথা বলা ত্যাগ কর; শুধু ইহাই বলিবে যে, ইহাই একমাত্র রাস্তা; যে যত করিবে সে তত পাইবে। ইহার কোন সীমা ও শেষ নাই। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাজ সমস্ত নবীগণের চেয়ে বেশী ও আগে, হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর এক রাত ও এক দিনের কাজ হযরত ওমর (রাঃ) পাইতে পারেন নাই। কাজেই চিন্তা করিয়া দেখুন, ইহার শেষই বা কোথায়? ইহা সোনা ও চান্দির খনি যতই খনন করিবে ততই পাইবে।
১৪১. টাকা পয়সার লোভে ইসলামের শত্রুদের (হাতের ক্রীড়নক সাজিয়া…
টাকা পয়সার লোভে ইসলামের শত্রুদের (হাতের ক্রীড়নক সাজিয়া তাহাদের কার্যোদ্ধারের যন্ত্ররূপে ব্যবহৃত মুসলমানদের উল্লেখ করিয়া তিনি বলেন–
তোমরা যদি তাহাদের মধ্যে পেট-পরস্তী ও গরজ-পরস্তীর পরিবর্তে খোদা-পরস্তীর প্রেরণা পয়দা করিতে পার তাহা হইলে তাহারা পেট-পরস্তী ও অন্যান্য গরজের জন্য দুশমনদের কার্যোদ্ধারের যন্ত্র কেন হইবে? মনের ভাব ও গতি পরিবর্তন ব্যতীত জীবনের গতি পরিবর্তন করাইবার কোশেশ করা ভুল। ছহীহ তরীকা একামাত্র ইহা যে, মানুষের মনের গতি আল্লাহর দিকে ফিরাইয়া দাও তাহা হইলে তাহাদের পূর্ণ জেন্দেগী আল্লাহর হুকুমের অধীন হইয়া যাইবে। লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহর ইহাই মকছুদ ও আমাদের আন্দোলনের ইহাই বুনিয়াদ।
১৪২. একদিন হযরত মওলানা সম্ভবতঃ ইহা বয়ান করিবার জন্য…
একদিন হযরত মওলানা সম্ভবতঃ ইহা বয়ান করিবার জন্য যে, আমাদের এই কাজের বুনিয়াদী উছুল এই যে, লোকের মধ্যে প্রথমে ঈমান অর্থাৎ আল্লাহ ও রাসূলের কথার উপর হাকীকী একীন ও দ্বীনের কদর পয়দা করিবার জন্য কোশেশ করা; ইহা ব্যতীত দ্বীনের তফছিলী (বিস্তারিত) আহ্কাম পেশ করা ঠিক নহে; বরং ইহা দ্বারা লোকের মধ্যে আরও হটধর্মী পয়দা হইবে।
এক তালেবে এলমের কিচ্ছা এইরূপ বয়ান করেন– কোন ছাত্রকে তাহার বুজুর্গ শিক্ষক এই কথার একীন দিয়া রাখিয়াছিলেন যে, দুনিয়ার মধ্যে সব চেয়ে বেশী দামী জিনিস এলমে দ্বীন। ইহার এক একটি মাছয়ালা হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ টাকা হইতেও বেশী মূল্যবান।
একদিন ঐ তালেবে এলমের ছেড়া জুতা মেরামত করাইবার জরুরত হইল। সে মুচির নিকট গেল। যখন মজুরীর কথাবার্তা হইল তখন ঐ ছাত্র বলিল, আমি তোমাকে দ্বীনের একটি মাছয়ালা বলিয়া দিব। মুচি প্রথমে ইহাকে কৌতুক বুঝিল। কিন্তু পরে যখন সে বুঝিতে পারিল যে, সে কৌতুক করিয়া বলিতেছে না, তখন সে ছাত্রটিকে তাহার দোকান হইতে উঠাইয়া দিল।
সে নিজের শিক্ষকের নিকট আসিয়া বলিল আপনি তো বলিতেছিলেন যে, দ্বীনের একটি মাছয়ালা হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ টাকার চেয়েও বেশী দামের হইয়া থাকে, আর মুচি তাহার পরিবর্তে জুতা মেরামত করিতেও প্রস্তুত নহে।
ঐ বুজুর্গ (যিনি ঐ শহরের বিখ্যাত পীর ও সমস্ত মানুষের নেতা ছিলেন) ঐ ছাত্রকে একটি হীরা দিয়া বলিলেন, তরকারীর বাজারে গিয়া ইহার দাম জিজ্ঞাসা কর। সে প্রথমে এক কুল বিক্রেতার নিকট গিয়া বলিল, এই পাথরটি তুমি কি মূল্যে লইবে? সে উত্তর দিল, “ইহা আমার কোন্ কাজে আসিবে? ছটাকাও তো হইবে না যে, ইহাকে ছটাকী বানাইয়া লইব? যদি তুমি অগত্যা দিতে চাও তাহা হইলে পাঁচটি কুল ইহার পরিবর্তে দিব। আমার ছেলেরা ইহা দ্বারা খেলা-ধুলা করিবে। ইহার পর অন্য একটি কুল বিক্রেতার সহিত সেই ছাত্র কথা বলিল; সেও উত্তর দিল, “ইহা আমার কোন কাজে আসিবে না।”
ছাত্রটি স্বীয় শিক্ষকের নিকট ফিরিয়া আসিয়া বলিল, সেখানে তো ইহাকে বেকার বলা হইল। এক কুল বিক্রেতা কোন প্রকারে পাঁচটি কুল দিয়া লইতে স্বীকার করিল। শিক্ষক বলিলেন, এখন ইহাকে লইয়া জওহরীর বাজারে যাও ও তথায় দাম জিজ্ঞাসা করিয়া দেখ, কিন্তু কাহাকেও দিও না।
সে চলিয়া গেল ও এক জওহরীর দোকানে গিয়া ঐ হীরা দেখাইল। দোকানদার প্রথমে ছাত্রের চেহারা দেখিয়া তাহাকে চোর বলিয়া মনে করিল। কিন্তু যখন জানিতে পারিল যে, সে অমুক বুজুর্গের প্রেরিত লোক তখন বলিল, এই হীরা আমি কিনিতে পারিব না। ইহা কোন বাদশাহ খরিদ করিতে পারেন।
সে ফিরিয়া আসিয়া স্বীয় শিক্ষককে এই খবর দিল। তিনি বলিলেন, যেই প্রকারে কুল বিক্রেতা এই হীরার মূল্য জানিত না বলিয়া এক পয়সা দ্বারাও ইহা লইতে রাজী ছিল না তেমনি ঐ মুচিও দ্বীনের মাছায়েলের কি মূল্য তাহা জানিত না। ভুল তোমারই, যে মূল্য জানে না তাহাকে মূল্য জানে বলিয়া বুঝিয়াছিলে।
তৎপর এই সম্বন্ধে দ্বীনের মূল্য জানে এমন এক বাদশার ঘটনা এইরূপে বয়ান করিলেন– এক দ্বীনদার ও দ্বীনের মূল্য জানে তেমন এক দ্বীনদার ও দ্বীনের মূল্য জানে তেমন এক বাদশাহ তাঁহার ছেলেকে এক মৌলবী ছাহেবকে সোপর্দ করিয়া বলিলেন, “ইহাকে দ্বীনের এলম শিক্ষা দেন।” কিন্তু ঐ ছেলে বড় বেশী বোকা ছিল। মৌলবী ছাহেব বার বার বাদশাহকে খবর দিলেন যে, এই ছেলে পড়ার উপযুক্ত নয়। কিন্তু বাদশাহর হুকুম এই আসিতেছিল যে, ইহার কোন পরওয়া করিবেন না। সে যদি তাহার বোকামীর দরুণ পড়া ধরিতে না পারে তাহা হইলেও পড়ার নেছাব শেষ করাইয়া দেন। কাজেই উপরিই পড়া হইতে লাগিল। যখন উপরি উপরি নেছাব পুরা হইল তখন বাদশাহ বড় ধুমধাম করিয়া খুশির আয়োজন করিলেন ও ছেলেকে বলিলেন, “দ্বীনের কোন কথা বয়ান কর।” সে বলিল, “আমার কিছুই মনে নাই।” বাদশাহ বলিলেন, “যে কোনও মাছায়েল তোমার মনে আছে তাহাই বয়ান কর।” ছেলেটি ঐ সময় হায়েজের একটি মাছায়েল বয়ান করিল। বাদশাহ সভা সমক্ষে বলিলেন, আমার সব সম্পত্তি, বাদশাহী খরচ করিয়াও যদি তোমার এই একটি মাছয়ালাই জানা হইত তাহা হইলেও লাভই লাভ ছিল।”
ভাইগণ! মানুষকে দ্বীনের কাজ করাইবার জন্য প্রথমে তাহাদের মধ্যে হাকীকী ঈমান, আখেরাতের ধ্যান ও দ্বীনের কদর পয়দা কর। আল্লাহর দান বহুত, কিন্তু তাঁহার গায়রাতও আছে, তিনি যাহারা কদর করে না তাহাদিগকে দেন না। তোমরাও দ্বীনকে তোমাদের বুজুর্গগণ হইতে কদরের সহিত লও; আর এই কদরের তাকাজা এই যে, তাঁহাদিগকে নিজের অতি বড় মুহছেন (উপকারক) বলিয়া মনে করিবে ও প্রাণপণে পূর্ণ মাত্রায় তাঁহাদের ইজ্জত ও সম্মান করিবে। ইহাই এই হাদীছের উদ্দেশ্য যাহাতে বলা হইয়াছে–
من لم يشكر الناس لم يشكر الله
“যে ব্যক্তি নিজের উপকারীদের শোকর আদায় করে না সে আল্লাহর শোকরও আদায় করে না।”
১৪৩. স্বাধীনভাবে ও নিজের মনমত না চলা বরং নিজকে…
এ সম্বন্ধে তিনি আরও বলেন–
স্বাধীনভাবে ও নিজের মনমত না চলা বরং নিজকে ঐ সমস্ত বুজুর্গদের পরামর্শের অধীন রাখা যাহাদের উপর সর্বজন মান্য ও স্বীকৃত বুজুর্গেরা আল্লাহওয়ালা বলিয়া আস্থা স্থাপন করিয়া গিয়াছেন– এই ছিলছিলার এক ওছুল। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পর ছাহাবায়ে কেরামদেরও সাধারণ মাপকাঠি ইহাই ছিল যে, তাহারা ঐ সমস্ত বড়দের উপর আস্থা স্থাপন করিতেন যাহাদের উপর হুজুর ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিশেষভাবে আস্থা রাখিতেন। তৎপর যাহাদের উপর হজরত আবু বকর ও হযরত ওমর (রাঃ) আস্থা রাখিতেন তাঁহারাই অধিকতর আস্থার যোগ্য বলিয়া বিবেচিত হইতেন। দ্বীনের কাজে আস্থা স্থাপনের জন্য সবিশেষ হুসিয়ারীর সহিত নির্বাচন করা দরকার, অন্যথায় ভীষণ ভুল পথে যাওয়ারও ভয় আছে।
১৪৪. আকবরের গোমরাহীর বিশেষ কারণ এই ছিল যে, তিনি…
তিনি বলেন–
আকবরের গোমরাহীর বিশেষ কারণ এই ছিল যে, তিনি প্রথম প্রথম ওলামার উপর অত্যধিক আস্থা স্থাপন করিয়া ছিলেন। এমন কি নিজে যাবতীয় ক্ষমতা ওলামা সভার হাতে দিয়াছিলেন; কিন্তু ওলামা নির্বাচন করিবার ক্ষমতা ও যোগ্যতা তাহার ছিল না, ফল এই দাঁড়াইল যে, দুনিয়া-প্রার্থী প্রতিযোগীদের জমঘটার আসর জমিয়াছিল। আকবর যখন তাহাদের অসদিচ্ছা; সুবিধা ও সুযোগ শিকারের ও দুনিয়া-লিপ্সার হাবভাব জানিতে পারিলেন তখন তিনি ওলামা হইতে বীতশ্রদ্ধ হইয়া গেলেন। তৎপর ঘটনা এতদূর পর্যন্ত গড়াইল যে, তিনি ওলামা হইতে একেবারেই সরিয়া পড়িলেন ও হিন্দু ধর্মের পুরুহিতগণ তাঁহার উপর পূর্ণ প্রভাব বিস্তার করিল। তৎপর ইসলামের পরিবর্তে দ্বীনে এলাহীর সূচনা হইল।
(ইমামে রব্বানী হযরত মুজাদ্দেদে আলফে ছানীও তাঁহার কোন কোন ‘পত্রে’ ঠিক এই কথাই বর্ণনা করিয়াছেন ও ওলামায়ে দুনিয়াকে তাঁহার গুমরাহীর কারণ বলিয়া বয়ান করিয়াছেন। –সঙ্কলনকারী)
১৪৫. আমার এই রোগ ও দুর্বলতার কারণে ওলামা ও…
তিনি বলেন–
আমার এই রোগ ও দুর্বলতার কারণে ওলামা ও চিকিৎসকদের স্বাধীন ও স্বতন্ত্র অভিমত এই যে, আমি কথাবার্তা একেবারে বন্ধ করিয়া দেই; এমনকি ছালাম ও মুছাফাহ্ পর্যন্ত না করি; কিন্তু আমি এই সর্বসম্মত ফায়ছেলাকে শুধু এই দ্বীনি ফরিজা (এছলাহ ও তবলীগ সংস্কার ও প্রচার) জিন্দা করিবার জন্য অমান্য করিয়া থাকি; কারণ আমি ইহা জানি যে, আমি যদি ইহা না করি তাহা হইলে এই ফরিজা এখন জিন্দা হইতে পারিবে না। ছুরায়ে তওবার এই আয়াত হইতে আমি ইহা বুঝিয়াছি–
مَا كَانَ لِاَهْلِ الْمَدِيْنَةِ وَمَنْ حَوْلَهُمْ مِّنَ الْاَعْرَابِ اَنْ يَّتَخَلَّفُوْا عَنْ رَّسُوْلِ اللّٰهِ وَلَا يَرْغَبُوْا بِاَنْفُسِهِمْ
“মদীনাবাসী ও আশেপাশের বেদুঈনদের জন্য রাসূলুল্লাহর (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের) পশ্চাতে ঘরে বসিয়া থাকা ও তাহার জীবনকে ছাড়িয়া নিজের জীবন বাঁচান উচিত নহে।”
এই আয়াত হইতে বুঝা যায় যে, যদি কোন সময় দ্বীনের কাজ কতক লোকের উপর নির্ভর করে তাহা হইলে তাহাদের প্রাণের পরওয়া করা জায়েজ নহে।
১৪৬. সাধারণতঃ কর্মীরা বড় লোক ও বিখ্যাত ব্যক্তিদের পিছে…
সাধারণতঃ কর্মীরা বড় লোক ও বিখ্যাত ব্যক্তিদের পিছে পড়িয়া থাকে। আল্লাহর গরীব ও নিঃসহায় লোকেরা নিজে নিজে আসিলেও তাহাদের প্রতি মনোযোগ দেয় না। ইহা মাল ও ক্ষমতার পূজা। ভাল করিয়া বুঝিয়া লও; যাহারা নিজে নিজে আসিয়াছে তাহারা আল্লাহর দান ও তাহারাই প্রেরিত; আর যাহাদের পিছে পড়িয়া তুমি তাহাদিগকে আনিয়াছ তাহারা তোমার উপার্জিত। যাহা আল্লাহর খালেছ দান তাহার কদর নিজের উপার্জিত হইতে বেশী হওয়া চাই। যেই সমস্ত দুরবস্থাপন্ন গরীব মেওয়াতী এখানে পড়িয়া থাকে তাহাদের কদর কর।
একবার চিন্তা করিয়া দেখ, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দোয়া করিয়াছিলেন–
اَللّٰهُمَّ اَحْيِنِيْ مِسْكِيْنًا وَّاَمِتْنِيْ مِسْكِيْنًا وَّاحْشُرْنِيْ فِيْ زُمْرَةِ الْمَسَاكِيْنِ
“আয় আল্লাহ! আমাকে মিছকিনী অবস্থায় জীবিত রাখ, মিছকিনী অবস্থায় মৃত্যু দাও এবং মিছকিনদের জমায়াতের মধ্যে আমাকে উঠাও।”
১৪৭. হযরত গাঙ্গুহী (রহঃ) এই যুগের কুত্বে এরসাদ ও…
তিনি বলেন–
হযরত গাঙ্গুহী (রহঃ) এই যুগের কুত্বে এরসাদ ও মুজাদ্দেদ ছিলেন। কিন্তু মুজাদ্দেদের জন্য ইহা জরুরী নহে যে, তাজদিদের সমস্ত কাজ তাহার হাতে জাহের হয়, এবং তাঁহার লোকের দ্বারা যে সমস্ত কাজ হয় তাহাও গৌণভাবে তাহারই কাজ। যেমন– খুলাফায়ে রাশেদিনের বিশেষ করিয়া শেখাইনের কাজ। প্রকৃত প্রস্তাবে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাজ।
১৪৮. দ্বীনের নেয়ামত যাঁহাদের মধ্যস্থতায় আমাদের নিকট পৌঁছিয়াছে তাঁহাদের…
তিনি বলেন–
দ্বীনের নেয়ামত যাঁহাদের মধ্যস্থতায় আমাদের নিকট পৌঁছিয়াছে তাঁহাদের শোকরিয়া আদায় না করা, তাঁহাদের বুজুর্গী স্বীকার না করা ও তাঁহাদের মহব্বত না করা মাহ্রূমী বা বঞ্চিত থাকার কারণ। যে বান্দার শোকর আদায় করে না সে আল্লাহর শোকরও আদায় করে না। তদ্বিপরীত তাঁহাদিগকে আল্লাহর স্থানে বসাইয়া দেওয়াও শেরক্ ও মরদৃদ হইবার কারণ। উহা তফ্রীত (ব্যতিক্রম) ও ইফ্রাত (অতিক্রম), ছিরাতুল মুস্তাকিম (মধ্যমস্থা) এই দুইয়ের মধ্যে।
১৪৯. আল্লাহ্ পাক নিজের যে ছিফাত (গুণ) ও আদত…
তিনি বলেন–
আল্লাহ্ পাক নিজের যে ছিফাত (গুণ) ও আদত (অভ্যাস) কোরআন পাকে বয়ান করিয়াছেন তাহার উপর সেইভাবে ঈমান রাখা চাই, অন্য কাহারও বয়ান আল্লাহর নিজের বয়ানের সীমায় পৌঁছিতে পারে না। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বয়ং বলিতেছেনঃ–
اللهم لا نحصى ثناء عليك انت كما اثنيت على نفسك
“আয় আল্লাহ! আমরা তোমার প্রশংসা গণনা করিতে পারি না, তুমি ঐরূপ যেইরূপ তুমি নিজকে নিজে প্রশংসা করিয়াছ।”
১৫০. হযরত গাঙ্গুহীর (আল্লাহ পাক তাঁহার কবরকে নূরান্বিত করুক)…
হযরত গাঙ্গুহীর (আল্লাহ পাক তাঁহার কবরকে নূরান্বিত করুক) পৌত্র হযরত হাফেজ মুহাম্মদ ইয়াকুব ছাহেব গাঙ্গুহী জিয়ারত ও ইয়াদত (রোগের সময় দেখা) করিবার জন্য আসিয়াছিলেন। তাঁহার সঙ্গে তাঁহার পরিবারের এক স্ত্রীলোকও ছিলেন। (খুব সম্ভব তাঁহার মেয়েই ছিলেন) যিনি হযরত মাওলানার বিমার পুরছির জন্য আসিয়াছিলেন। হযরত মওলানা তাহাকে পর্দার পিছে কামরার মধ্যে ডাকাইয়া লইলেন। তাঁহাকে সম্বোধন করিয়া ঐ সময় হযরত মওলানা যাহা কিছু বলিয়াছিলেন তাহার কয়েকটা বাক্য লিখিয়া লওয়া হইয়াছিল, যাহা নিম্নে দেওয়া গেল।
তিনি বলেন–
“যে মানুষের শোকরিয়া আদায় করে না সে আল্লাহর শোকরিয়াও আদায় করে না।” আপনাদের পরিবার হইতেই আমি দ্বীনের নেয়ামত পাইয়াছি। আমি আপনাদের ঘরের গোলাম। গোলামের নিকট যদি কোন ভাল জিনিস আসিয়া যায় তাহার উচিত তাহার মুনীবকে উপহার স্বরূপ তাহা পেশ করিয়া দেওয়া। আমি গোলামের নিকট আপনাদেরই ঘর হইতে সংগৃহীত নবুয়তের মিরাছের সওগাত আছে। ইহা ব্যতীতও ইহা হইতে উত্তম অন্য কোন উপহার আমার নিকট নাই, যাহা আমি পেশ করিতে পারি। দ্বীন কি? প্রত্যেক অবস্থাই আল্লাহর আদেশ তালাস করতঃ উহার ধ্যান করিয়া নিজের নফছের তাকাজার সংমিশ্রণ হইতে বাঁচিয়া তাহা আদায় করিতে লাগিয়া থাকা। আল্লাহর হুকুম তালাস না করিয়া ও উহার ধ্যান না করিয়া, কোন কাজে লিপ্ত হওয়াই দুনিয়া। এই তরীকায় কয়েকদিনের মধ্যে ঐ জিনিস হাছিল হইবে যাহা অন্য তরীকায় পঁচিশ বৎসরেও হাছিল হয় না। আমি মেয়েলোকদিগকে বলি– তোমরা দ্বীনের কাজে নিজের পরিবারের লোকদের সাহায্যকারিণী হও। তাহাদিগকে নিশ্চিন্তে দ্বীনের কাজে লাগিতে সুযোগ দাও। পারিবারিক কাজের বোঝা তাহাদের উপর হইতে হালকা করিয়া দাও; তাহারা যেন বে-ফিকির হইয়া দ্বীনের কাজ করিতে পারে। যদি মেয়েলোকেরা এইরূপ না করে তাহা হইলে তাহারা حبالة الشيطان “শয়তানের জাল হইয়া যাইবে।” (অর্থাৎ শয়তানের জাল ও ফান্দ হইয়া মানুষকে তথায় আটকাইয়া দ্বীনের কাজ হইতে ফিরাইয়া রাখিবে। ইহা হাদীছের বিষয়বস্তু)
নিজের কামনা ও বাসনাকে আল্লাহর আদেশাবলীর অধীন করাই দ্বীনের হাকীকত। কেবলমাত্র দ্বীনি মাছায়েল জানার নাম দ্বীন নহে। ইহুদীদের ওলামা দ্বীনের কথা ও শরীয়তের মাছায়েল খুব বেশী জানিত, কিন্তু তাহারা নিজের কামনা ও বাসনাকে আল্লাহর আদেশের অধীন করে নাই, এই জন্য অভিশপ্ত ও বিতাড়িত হইয়াছিল।
এই কথাবার্তার মধ্যে কোন বিশেষ বিষয়ের জন্য হযরতের নিকট দোয়ার দরখাস্ত করা হইলে তিনি বলেন– যে কেহ আল্লাহর তাকওয়া (ভয়) এখ্তিয়ার করে অর্থাৎ নিজের কামনা ও বাসনাকে আল্লাহর হুকুমের অধীন করিয়া দেয় তাহার যাবতীয় মুশকিলাত (সমস্যা) আল্লাহ পাক গায়েবের পর্দা হইতে সমাধান করিয়া দেন। আর এমন রাস্তা দিয়া তাহার সাহায্য করিয়া থাকেন যাহা তাহার খেয়াল ও কল্পনায়ও আসে নাঃ–
و من يتق الله يجعل له مخرجا و يرزقه من حيث لا يحتسب
“যে আল্লাহকে ভয় করে আল্লাহ যাবতীয় সংকট হইতে বাহির হইবার জন্য তাহাকে রাস্তা করিয়া দেন ও ধারণার অতীত উপায়ে তাহাকে রিজিক দিয়া থাকেন।”
আল্লাহর খাছ মদদ হাছিল করিবার নিশ্চিত ও শর্ত-সাপেক্ষ তদ্বীর তাঁহার দ্বীনের সাহায্য করাঃ–
ان تنصر الله ينصركم
“যদি তোমরা আল্লাহর দ্বীনের সাহায্য কর আল্লাহ পাক তোমাদের সাহায্য করিবেন।”
যদি তোমরা আল্লাহর দ্বীনের সাহায্য কর তাহা হইলে ধ্বংসকর বস্তু যাহা তাহাই তোমাদের জন্য জীবনের সুখপ্রদ সামগ্রী হইবে। হযরত ইবরাহীম (আঃ) জান প্রাণ দিয়া আল্লাহর দ্বীনের সাহায্য করিয়াছিলেন, আল্লাহ পাক আগুনকে তাঁহার জন্য ফুলের বাগান করিয়াছিলেন। এইরূপভাবে হযরত মুছা (আঃ) ও তাঁহার কওমকে যে দরিয়ার স্বভাব ডুবাইয়া দেওয়া সেই দরিয়াই নিরাপদে তীরে পৌঁছাইয়া দিয়াছিল।
১৫১. আজ ১৩৬৩ হিজরীর ২রা জোমাদাল-উলা বুধবার রাত্রে দেওবন্দ…
আজ ১৩৬৩ হিজরীর ২রা জোমাদাল-উলা বুধবার রাত্রে দেওবন্দ হইতে তালেবে এলমের এক জমায়াত আসিয়াছে। রাত্রে এশার সময় হযরত মাওলানা জোলাপ লওয়াতে বিশেষ দুর্বল হইয়া পড়েন, কথা বলার শক্তি ছিল না। ফজরের নামাজের পর অধীনকে (সংগ্রাহক) ডাকাইয়া বলেন– কান আমার ঠোঁটের সঙ্গে একেবারে লাগাইয়া দাও এবং শুন; “এই ছাত্রগণ আল্লাহর আমানত ও তাঁহার দান। তাঁহাদের কদর ও এই নেয়ামতের শোকর এই যে, তাহাদের সময় তাহাদের যোগ্যতানুসারে পূর্ণভাবে কাজে লাগান, মুহূর্তকালও যেন নষ্ট না হয়। তাঁহারা অতি অল্প সময় নিয়া আসিয়াছেন। সর্বপ্রথম আমার এই দুই তিন কথা তাহাদিগকে পৌঁছাইয়া দাওঃ
(১) নিজেদের সমস্ত ওস্তাদের ইজ্জত সম্মান ও আদাব করা আপনাদের খাছ ও বিশেষ ফরিজা। আপনারা তাঁহাদিগকে এমন সম্মান করিবেন যেমন দ্বীনের ইমামদের সম্মান করা হয়, তাঁহারা আপনাদের জন্য নবীর এলম হাছেল করিবার উপায় স্বরূপ। যিনি কাহাকেও দ্বীনের একটি কথাও বলিয়াছেন তিনি তাহার মওলা হইয়া গিয়াছেন। এখন দ্বীনের এলমের খাছ উস্তাদদের যে হক আছে তাহা সহজই বুঝা যাইতে পারে; বরং তাঁহাদের মধ্যে কোন ঝগড়া বিবাদ হইলেও সকলের সঙ্গে আদাব ও সম্মানের সম্বন্ধ এক সমান থাকা চাই; যদিও মহব্বত ও আকিদত কাহারও সহিত বেশী ও কাহারও সহিত কম হয়; কিন্তু আজমতের মধ্যে পার্থক্য না হওয়া চাই ও অন্তরে তাহাদের সম্বন্ধে খারাপ ধারণা না আনা চাই। কোরআন মজীদে প্রত্যেক মুমিনের জন্য এই হক নির্ধারিত করা হইয়াছে যে, তাহাদের সম্বন্ধে যেন অন্তরে কোন খারাপ ধারণা না আসে, তাহাদের জন্য যেন আল্লাহর নিকট দোয়া করা হয়। যেমন আল্লাহ পাক ফরমাইয়াছেন–
وَلَا تَجْعَلْ فِيْ قُلُوْبِنَا غِلًّا لِّلَّذِيْنَ اٰمَنُوْا
“আর আমাদের অন্তর সমূহে মুমিনদের জন্য কু-ভাব (কীনা) রাখিও না।”
রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফরমাইতেনঃ
لا يبلغني احد شيئا فاني احب ان اخرج اليكم و انا سليم الصدر
“তোমাদের মধ্য হইতে কেহ যেন একে অন্যের কথা আমার নিকট না পৌঁছায়; আমি চাই যে, যখন আমি তোমাদের নিকট আসি তখন যেন আমার অন্তর সকলের জন্যই পরিষ্কার থাকে।”
কোন কোন রেওয়ায়েত হইতে জানা যায় যে, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের ওফাতের দোয়া ঐ সময় করিয়াছিলেন যখন উম্মত বহুত বিস্তার লাভ করিতেছিল ও রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই আশঙ্কা হইতেছিল যে, কাহারও অন্তরে আমার জন্য কুভাব আসে, আর খোদা না করুক সে বরবাদ (ধ্বংস) হইয়া যায়।
এ সম্বন্ধে তিনি আরও বলেন–
এই সমস্ত বিষয়ের ছওয়াব অর্থাৎ বড় ছোটর অধিকার সমূহ (যাহার সমষ্টিগত নাম এছলাহে-জাতুলবাই (পরস্পরের মধ্যে সদ্ভাব রাখা) আদায়ের ছওয়াব আরকান– নামাজ রোজা প্রভৃতি এবাদত হইতে কম নহে; বরং বেশী। (আবু দাউদ শরীফে কিতাবুল আদাবে এ বিষয়ে এক প্রকাশ্য হাদীছ বর্ণিত আছে যে, এছলাহে জাতুলবাইনের দরজা (মরতবা) নামাজ রোজা প্রভৃতি এবাদত হইতে বেশী। আরকানের রুকুনিয়াতের অর্থ এই যে, আল্লাহ পাক যে জেন্দেগী আমাদের নিকট চান তাহা এই আরকান হইতে পয়দা হইতে পারে। অধিকন্তু এই এছলাহে-জাতুলবাইনের সম্বন্ধ বান্দার হকের সহিত, আর আল্লাহ পাক নিজের বান্দাদের জন্য সহানুভূতিশীল, স্নেহশীল ও দয়ালু; তাঁহার দানশীলতা হইতে তো ক্ষমার আশাই বেশী করা যায়; কিন্তু বান্দা তো তোমারই ন্যায়– তুমি যেমন তেমনই; এই জন্য তাহাদের হক আদায়ের ব্যাপারে অত্যধিক জরুরী ও কঠিন। আবার এই লাইনে দ্বীনি এলমের শিক্ষকদের মোয়ামেলা আরও অধিক নাজুক (সূক্ষ্ম ও দরকারী)। এখন এই ছাত্রদের আমার এক বাণী এই পৌঁছাও যে, নিজের জীবনের এই দিকের এছলাহের যেন বিশেষ ফিকির করেন।
(২) দ্বিতীয় কথা এই যে, তাহারা সদাসর্বদা এই ফিকিরে লাগিয়া থাকেন ও এই ফিকিরের বোঝার সহিত জীবন-যাপন করেন যে, যাহা কিছু পড়িয়াছেন ও যাহা কিছু পড়িবেন তদনুযায়ী যেন চলেন। এলমে দ্বীনের ইহা প্রথম জরুরী হক। দ্বীন কোন ফলছফা বা ফন নহে, বরং জীবন যাপনের ঐ তরীকা বা পদ্ধতি যাহা আম্বিয়া (আঃ) নিয়া আসিয়াছিলেন। আল্লাহর রাসূল যে এলম ফায়েদা দেয় না (অর্থাৎ ঐ এলম যাহা আমল করায় না) সেই এলম হইতে পানাহ (আশ্রয়) চাহিয়াছেন। এতদব্যতীত যেই সমস্ত শাস্তির ভয় আলেমে বে-আমলের জন্য কোরআন হাদীছে আসিয়াছে তাহা আপনাদের জানা আছে। ইহাও বুঝিয়া লওয়া চাই যে, আলেমের বে-আমালী, নামাজ না পড়া, রোজা না রাখা, শরাব পান করা বা জেনা করা নহে, ইহা তো অজ্ঞ-লোকদের সাধারণ গোনাহ; আলেমের গোনাহ এলম মতে আমল না করা ও ইহার হক আদায় না করা।
قریباں را بیش بود حیرانی
নিকটবর্তীদের হয়রানী বেশী।
কোরআন মজীদে আহলে কিতাবদের ওলামা সম্বন্ধে বলা হইয়াছে–
فَبِمَا نَقْضِهِمْ مِّيْثَاقَهُمْ لَعَنّٰهُمْ وَجَعَلْنَا قُلُوْبَهُمْ قٰسِيَةً
“সুতরাং তাহাদের প্রতিজ্ঞা ভঙ্গের দরুণ আমি তাহাদের উপর লা’নত করিয়াছি ও তাহাদের দিলকে শক্ত করিয়া দিয়াছি।”
(৩) তৃতীয় কথা এইঃ– ছাত্রদের ইহা বলিয়া দেওয়া হউক যে, তাহাদের সময় অতি মূল্যবান ও তাঁহারা অতি স্বল্প সময় নিয়া আসিয়াছেন, এই জন্য এক মুহূর্তও যেন এখানে নষ্ট না করেন, বরং এখানকার উছুল মতে তালীম ও মুজাফারার কাজে লাগিয়া থাকেন; পুরাতনদের সঙ্গে কথাবার্তা বলেন, তাঁহাদের সঙ্গে থাকেন ও তাঁহাদের সহিত দিল্লী শহরের আরবী মাদ্রাছা সমূহে গিয়া কাজ করেন।
১৫২. দেওবন্দ হইতে যেই ছাত্রের জমায়াত রাত্রে আসিয়া ছিলেন…
দেওবন্দ হইতে যেই ছাত্রের জমায়াত রাত্রে আসিয়া ছিলেন, প্রথমে তাহাদিগকে উপরের লিখিত বাণী দিয়া ছিলেন, তৎপর চা পান করিবার জন্য মেহমানেরা যখন দস্তুরমত হযরত মওলানার কাছে আসিয়া বসিলেন তখন তিনি ছাত্রদের সঙ্গে নিজেই কথা বলিতে চাহিলেন ও খুব ছোট আওয়াজে বলিলেন– “আপনারা এখানে কেন আসিয়াছেন? দেওবন্দের মত বড় মাদ্রাসার মেহেরবান ওস্তাদগণ, সুন্দর ও শানদার অট্টালিকার ছাত্রাবাস সমূহ ও নিজেদের প্রিয় পারিপার্শ্বিকতা ছাড়িয়া আপনারা এখানে কিসের জন্য আসিয়াছেন? (আবার নিজেই নিজের এই প্রশ্নের এই উত্তর দিলেন) আল্লাহর আদেশাবলী প্রচলিত করিবার কোশেশের মধ্যে প্রাণ দিবার প্রেরণাকে সজীব করিবার জন্য ও উহার তরীকা (পদ্ধতি) শিখিবার জন্য এবং উহার উপর আল্লাহ পাকের তরফ হইতে যেই সমস্ত ওয়াদা আছে একীনের সহিত তাহার আশা বুকে লইয়া তদব্যতীত অন্যের উপর কোন ভরসা না করিয়া বরং অপর হইতে সমস্ত আশা ভরসা নির্মূল করতঃ কাজ করা শিখিবার জন্য–
وَجَاهِدُوْا فِي اللّٰهِ حَقَّ جِهَادِهٖ ۗ هُوَ اجْتَبٰىكُمْ وَمَا جَعَلَ عَلَيْكُمْ فِي الدِّيْنِ مِنْ حَرَجٍ
“আল্লাহর (দ্বীনের) জন্য যেইরূপ চেষ্টা ও কষ্ট করা উচিত সেইরূপ চেষ্টা ও কষ্ট কর, তিনি তোমাদিগকে (এই কাজের জন্য) মনোনীত করিয়াছেন ও দ্বীনের মধ্যে তোমাদের জন্য কোন সঙ্কীর্ণতা রাখেন নাই।”
তৎপর এ সম্বন্ধে তিনি বলেন– আল্লাহর উপর আশা ভরসা রাখার যত জরুরত আছে ততই জরুরত গাইলুল্লাহ হইতে আশা ভরসা না রাখার জন্য কোশেশ করার আছে; বরং গাইলুল্লাহ হইতে দৃষ্টি একেবারে হটাইয়া কাজ করিবার মশক (অভ্যাস) করা চাই।
اِنْ اَجْرِيَ اِلَّا عَلَى اللّٰهِ
“আমার পারিশ্রমিক একমাত্র আল্লাহর উপর।”
হাদীছে আছে– “যে সমস্ত লোকেরা অন্যের উপর আশা ভরসা রাখিয়া ভাল কাজ করিবে কেয়ামতের দিন তাহাদিগকে বলিয়া দেওয়া হইবে– যাও উহাদের নিকট গিয়া তোমাদের নিজের পারিশ্রমিক লও।”
১৫৩. ঐ সমস্ত ছাত্রদিগকে সম্বোধন করিয়া তিনি বলেন
ঐ সমস্ত ছাত্রদিগকে সম্বোধন করিয়া তিনি বলেন–
নামাজ কায়েম করা সমস্ত জেন্দেগী দুরস্তকারী কাজ। কিন্তু তখনই নামাজ কায়েম করা পূর্ণ হইবে যখন নামাজ সম্বন্ধে যে সব গুণের কথা কোরআন হাদীছে বলা হইয়াছে নামাজীর মধ্যে তাহা পয়দা হইবে।
যেমন বলা হইয়াছে–
قَدْ اَفْلَحَ الْمُؤْمِنُوْنَ ۙ الَّذِيْنَ هُمْ فِيْ صَلَاتِهِمْ خٰشِعُوْنَ
“নিশ্চয়ই ঐ সমস্ত মুমেন কৃতকার্য হইয়াছে, যাঁহারা (তাঁহাদের) নামাজের মধ্যে বিনম্র (খুশখুজু) এখ্তিয়ার করে)।”
ছুরাবাকার প্রথম রুকুতে আছে–
هُدًى لِّلْمُتَّقِيْنَ ۙ الَّذِيْنَ يُؤْمِنُوْنَ بِالْغَيْبِ وَيُقِيْمُوْنَ الصَّلٰوةَ
“(কোরআন শরীফ) ঐ সমস্ত লোকের জন্য হেদায়াত যাহারা গায়েবের (অদৃশ্যের) উপর ঈমান আনে ও নামাজ কায়েম করে।”
এই আয়াতের পর বলা হইয়াছে–
اُولٰٓئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُوْنَ
“কেবলমাত্র তাহারাই কৃতকার্য।”
এই দুইটি আয়াতকে একত্রে মিলাইলে পরিষ্কারভাবে জানা যায় যে, নামাজের মধ্যে নম্রতা ও (খুশুখুজু) একামতে ছালাত অর্থাৎ নামাজ কায়েম করার মধ্যে দাখিল আছে। আর যাহারা নম্রতা ব্যতীত নামাজ পড়ে, তাহারা নামাজ কায়েমকারীদের দলভুক্ত নহে। নামাজে নম্রতা পয়দা করিবার তদবীর ও তরকীবের প্রতি অন্য আয়াতে ইশারা করা হইয়াছে যে, আল্লাহর সামনে হাজিরীর একীনকে বেশী হইতে বেশীভাবে বৃদ্ধি করিতে হইবে–
وَاِنَّهَا لَكَبِيْرَةٌ اِلَّا عَلَى الْخٰشِعِيْنَ ۙ الَّذِيْنَ يَظُنُّوْنَ اَنَّهُمْ مُّلٰقُوْا رَبِّهِمْ وَاَنَّهُمْ اِلَيْهِ رٰجِعُوْنَ
“আর নিশ্চয়ই নামাজ ভারী, কিন্তু ঐ সমস্ত লোকের জন্য ভারী নহে যাহারা বিশ্বাস করেন যে, তাঁহারা তাঁহাদের প্রতিপালকের সহিত সাক্ষাতকারী ও তাঁহারা তাঁহারই নিকট প্রত্যাবর্তনকারী।”
তিনি বলেন– مُلٰقُوْا رَبِّهِمْ (প্রতিপালকের সাক্ষাৎকারীকে) আখেরাতের সহিত নির্দিষ্ট করিবার কোন কারণ নাই; নামাজের অবস্থায় যে আল্লাহর বান্দাদের হুজুরী নছিব হয় তাহাও ইহার অন্যতম।
১৫৪. নিশ্চয়ই মুমেনগণ কৃতকার্য হইয়াছেন। কেবল তাহারাই সফলকাম।”
এই প্রসঙ্গেই তিনি বলেন–
قَدْ اَفْلَحَ الْمُؤْمِنُوْنَ ۞ وَاُولٰٓئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُوْنَ
“নিশ্চয়ই মুমেনগণ কৃতকার্য হইয়াছেন। কেবল তাহারাই সফলকাম।”
এই দুই আয়াতের মধ্যে যে সফলতা ও কৃতকার্যতার ওয়াদা আছে উহাকে কেবল পরকালের সফলতার মধ্যে সীমাবদ্ধ করিবার কোন কারণ নাই; বরং দুনিয়ার কৃতকার্যতাও ইহার মধ্যে দালেখ আছে। ইহার মতলব এই যে, যে সমস্ত লোকের মধ্যে এইরূপ ঈমানী গুণ হইবে দুনিয়াতেও তাহাদের পথ পরিষ্কার করিবার ও কৃতকার্যতা ও সফলতা পর্যন্ত তাহাদিগকে পৌঁছাইবার আমার গায়বী মদদ (সাহায্য) জিম্মাদার।
১৫৫. গায়েবী সাহায্য ও গায়েবী শক্তি যাহার নাম তাহা…
এ সম্বন্ধে তিনি বলেন–
গায়েবী সাহায্য ও গায়েবী শক্তি যাহার নাম তাহা প্রথম হইতেই সোপর্দ করিয়া দেওয়া হয় না, বরং ঠিক সময়ে সাথে করিয়া দেওয়া হয়; যেন আল্লাহর খাজানায় (ভাণ্ডারে) শর্ত এই যে, নিজের উপার্জিত শক্তি হইতে ইহার উপর ভরসা বেশী হওয়া চাই।
১৫৬. আর যাহা আমি তাহাদিগকে দিয়াছি তাহা হইতে খরচ…
এই প্রসঙ্গেই তিনি বলেন–
وَمِمَّا رَزَقْنٰهُمْ يُنْفِقُوْنَ
“আর যাহা আমি তাহাদিগকে দিয়াছি তাহা হইতে খরচ করিয়া থাকে।”
এই আয়াত শুধু মাল ও দৌলতের জন্য খাছ করিবার কোন কারণ নাই, বরং আল্লাহ পাক যে সমস্ত (বাহ্যিক ও আভ্যন্তরিণ) শক্তি আমাদিগকে দিয়াছেন যেমন– ফিকির ও মত, হাত ও পা এই সমস্ত আল্লাহ পাকের দান; আল্লাহর কাজে ও তাঁহার দ্বীনের জন্য এই সমস্তকে ব্যবহার করাও উক্ত আয়াত (আমি যাহা দিয়াছি তাহা হইতে খরচ করে) শামেল আছে।
১৫৭. সেই সকল ছাত্রদিগকেই তিনি বলেন
সেই সকল ছাত্রদিগকেই তিনি বলেন–
আপনারা নিজেদের কদর ও মূল্য বুঝুন; দুনিয়ার যাবতীয় ধন ভাণ্ডারও আপনাদের মূল্য হইতে পারে না। আল্লাহ পাক ব্যতীত কেহই আপনাদিগকে খরিদ করিতে পারিবে না। আপনারা পয়গাম্বর (আঃ)-এর নায়েব, যাহারা সারা জগদ্বাসীকে বলিয়া দিয়াছেন–
اِنْ اَجْرِيَ اِلَّا عَلَى اللّٰهِ
“আমার পারিশ্রমিক একমাত্র আল্লাহর উপর।”
অর্থাৎ আল্লাহ পাকই আমাকে পারিশ্রমিক দিবেন; আমি আর কাহারও নিকট পারিশ্রমিক চাই না। আপনাদের কাজ এই যে, সকলের নিকট হইতে আশা ভরসা ত্যাগ করিয়া কেবল প্রতিদানের প্রতিই একীন ও দৃঢ় বিশ্বাস পয়দা করিয়া নম্রতার সহিত মোমেনদের খেদমত করুন। ইহা দ্বারা আবদিয়াত (বন্দেগী) পূর্ণত্ব ও সৌন্দর্য বিকাশ হইবে।
১৫৮. এক মশহুর (বিখ্যাত) দ্বীনি জমায়াতের প্রসিদ্ধ কর্মী ও…
এক মশহুর (বিখ্যাত) দ্বীনি জমায়াতের প্রসিদ্ধ কর্মী ও নেতা বিমারের সময় হযরত মওলানাকে দেখিবার জন্য আসেন। হযরত তাঁহার সহিত কথাবার্তার মধ্যে বলেন–
আমাদের এখানে হিসাব কিতাব রাখা হয় না। দ্বীনি কর্মীদেরও হিসাব কিতাবের এই জন্য জরুরত হইয়াছে যে, ঐ বিশ্বাস ও ভরসা বাকী নাই, যাহার পর হিসাব কিতাবের জরুরত থাকে না। যদি নিজের কার্যপদ্ধতি দ্বারা পুনরায় সেই বিশ্বাস পয়দা করা যায় তাহা হইলে হিসাব কিতাবের মধ্যে যে সময় নষ্ট হয় তাহা খালেছ দ্বীনি কাজের জন্য বাঁচিয়া যায়।
১৫৯. ভারতের এক বিখ্যাত রাজনৈতিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের এক…
ভারতের এক বিখ্যাত রাজনৈতিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের এক বড় নেতা (যিনি ভারতের খুব বড় ও যাদু-গুণ বিশিষ্ট বক্তাও বটে) জেয়ারত ও বিমারের সময় দেখা ও দর্শন লাভের জন্য আসেন। দুই দিন পূর্বে হযরত মওলানার অবস্থা খুব খারাপ ছিল। সেই জন্য দুর্বলতা এত বাড়িয়া গিয়াছিল যে, অধিকাংশ সময় ঠোঁটের উপর কান রাখিলে কথা শুনা যাইত। যখন তাঁহার আগমনের সংবাদ দেওয়া হইল তখন এই অধীনকে (মলফুজাতের সংকলককে)
ডাকাইয়া বলিলেন– তাঁহার সহিত কথা বলা আমার জন্য জরুরী, কিন্তু ছুরত এই হইবে যে, তোমার কান আমার মুখের নিকটবর্তী রাখ; আমি যাহা বলি তাহা তাঁহাকে বলিয়া যাও।
এইরূপে যখন তিনি ভিতরে আসিলেন, তখন কথা তো আমার মধ্যস্থতায়ই শুরু করিলেন; কিন্তু দুই তিন মিনিট পর আল্লাহ পাক এত শক্তি দিলেন যে, প্রায় আধ ঘন্টা পর্যন্ত ক্রমাগত কথা বলিতে থাকেন। এই বৈঠকের যে সমস্ত কথা লিপিবদ্ধ করা হইয়াছিল তাহা নিম্নে উদ্ধৃত হইল।
তিনি বলেন–
মুসলমানে মুসলমানে মিলন শুধু দ্বীনের উন্নতির জন্য, অন্যথায় মুসলমানদের ও অমুসলমানদের মিলনের মধ্যে পার্থক্য কোথায়? আপনি এখানে কিছু দিন থাকিয়া আমাদের কাজ দেখুন, ইহা ব্যতীত আমার কথা বুঝে আসা ও আমার উদ্দেশ্যে পৌঁছা মুশকিল (অতীব কঠিন)। আসল কথা এই যে, হযরত ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সহিত আমাদের সম্বন্ধ মরিয়া গিয়াছে। ইহাকে জীবিত করিতে হইবে। এই কোশেশের মধ্যে মরিতে হইবে।
আমি প্রথমে মাদ্রাসায় পড়াইয়াছি (অর্থাৎ মাদ্রাসায় দরছ দিয়াছি)। তথায় তালেবে এলমদের ভীড় জমিয়াছিল। অনেক ভাল ভাল উপযুক্ত ছাত্র বেশী সংখ্যায় আসিতে লাগিল। আমি চিন্তা করিলাম, ইহাদের সহিত আমার মেহনতের ফল ইহা ব্যতীত কি হইবে যে, যাহারা শুধু আলেম হইবার জন্য মাদ্রাসা সমূহে আসিয়া থাকে আমার নিকট পড়িবার পরও তাহারা আলেম হইয়া যাইবে ও তাহাদের ব্যবসায়ও উহাই হইবে যাহা আজকাল সাধারণতঃ লোকে পছন্দ করিয়া থাকে। কেহ হেকীমী পড়িয়া দাওয়াখানা করিবে, কেহ বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দিয়া স্কুল কলেজে চাকুরী করিবে, কেহ মাদ্রাসায় বসিয়া পড়াইতেই থাকিবে। ইহা হইতে বেশী কিছু আর হইবে না। ইহা চিন্তা করিয়া মাদ্রাসায় পড়ান হইতে আমার মন ফিরিয়া গেল।
ইহার পর এক সময় আসিল যখন আমার পীর ছাহেব আমাকে (মুরীদ করিবার) এজাজত (খেলাফত) দিয়া দিলেন, তখন আমি মুরীদদের জিকির শোগল শিখান শুরু করিলাম। এদিকে আমার মনোযোগ বেশী হইল। আল্লাহই সব করিলেন, আগমনকারীদের মধ্যে এত শীঘ্র কইফিয়াৎ আহওয়াল অবতীর্ণ ও অবস্থার উন্নতি হওয়া আরম্ভ হইল যে, আমি নিজেই বিস্মিত হইলাম। তখন আমি ভাবিতে লাগিলাম, ইহা কি হইতেছে এবং এই কাজে লাগিয়া থাকিলে কি ফল বাহির হইবে? বেশী হইতে বেশী হইলে এই হইবে যে, কতকগুলি ছাহেবে হাল জাকের শাগেল লোক পয়দা হইবে। তখন লোকদের মধ্যে তাহাদের কথা প্রচারিত হইয়া পড়িলে কেহ মোকদ্দমায় জিতিবার জন্য দোয়া করাইতে আসিবে, কেহ ছেলেমেয়েদের জন্য তাবীজ চাহিবে, কেহ সওদাগরী ও ব্যবসা বাণিজ্যের জন্য দোয়া করাইবে। বেশী হইতে বেশী হইলে ইহাদের দ্বারা ভবিষ্যতে আরও কয়েকজন মুরীদের মধ্যে জিকির ও তালকীনের ছিলছিলা চলিবে। ইহা চিন্তা করিয়া এই দিক হইতেও আমার মন ফিরিয়া গেল এবং আমি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হইলাম যে, আল্লাহ পাক যে আভ্যন্তরিণ ও বাহ্যিক শক্তি দান করিয়াছেন তাহা খরচ করিবার ছহীহ জায়গা ঐ কাজ যাহাতে হুজুর ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের শক্তি সামর্থ খরচ করিয়া গিয়াছেন, আর ঐ কাজ আল্লাহর বান্দাদিগকে বিশেষ করিয়া গাফেল ও বে-তলবদিগকে আল্লাহর দিকে নিয়া আসা ও আল্লাহর কথাগুলিকে প্রচলিত করিবার জন্য (জীবনকে) জানকে বে-কিমত করার প্রথা জারী করা।
বছ ইহাই আমাদের আন্দোলন। আর ইহাই আমরা সকলকে বলিয়া থাকি। এই কাজ হইতে থাকিলে বর্তমান সময় হইতে হাজার গুণ বেশী মাদ্রাসা সশরীরে এক একখানা মাদ্রাসা ও খানকাহ হইয়া যাইবে। [হুজুর ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনীত নেয়ামত এমন বিস্তৃতভাবে বিতরিত হইতে থাকিবে যাহা ইহার শানের যোগ্য।]
হযরত! আল্লাহ তাআলা আপনাকে এক শক্তি দিয়াছেন, ইহা দ্বারা আমার উদ্দেশ্য কথা বলিবার ও বক্তৃতা দিবার শক্তি নহে, বরং আমার মকছুদ এই যে, আপনি এক জমায়াতের গণ্যমান্য নেতা। হাজারে হাজারে মানুষ আপনার কথা মানে, আপনি আল্লাহ-প্রদত্ত এই নেয়ামতের কদর করুন; ইহাকে আল্লাহর কাজের জন্য তাঁহার আদেশাবলী প্রচলিত করিবার জন্য ব্যবহার করুন।
ইহার ছুরত (প্রণালী) এই যে, যাহারা আপনার কথা মানে তাহাদিগকে আমাদের লোকের সঙ্গে কিছুদিন থাকিয়া আমাদের কাজ বুঝিবার ও শিখিবার জন্য অনুপ্রাণিত করুন। তৎপর নিজের কেন্দ্রের মধ্যে নির্দেশ কাজ করিতেন। ইহা দ্বারা খোদা চাহেত তাহারা অনেক কাজের লোক হইয়া যাইবে।
হযরত, ঈমানের দুইটি বাহু আছে; একটি আল্লাহ ও রাসূলের দুশমনদের প্রতি শক্ত ও কটু ব্যবহার। অপরটি আল্লাহ ও রাসূলের অনুগামী ও প্রেমিকদের প্রতি নরম সদয় ব্যবহার। তাহাদের সামনে নিজকে বিনয়ী ও অবনমিত করা।
اَذِلَّةٍ عَلَى الْمُؤْمِنِيْنَ اَعِزَّةٍ عَلَى الْكٰفِرِيْنَ
“মুমিনদের প্রতি অবনমিত ও কাফেরদের প্রতি শক্ত ও কুপিত।”
اَشِدَّآءُ عَلَى الْكُفَّارِ رُحَمَآءُ بَيْنَهُمْ
“কাফেরদের উপর পরাক্রমশালী, মুমিনদের উপর দয়াশীল।”
মুমেনদের উন্নতির জন্য এই দুই বাহুরই প্রয়োজন আছে। এক ডানা দ্বারা কোন পক্ষীই উড়িতে পারে না। ঐ বুজুর্গ হজরতের ভক্ত ও বিশ্বাসী ছিলেন। হজরতের কথা শুনিয়া আরজ করিলেন– “নিজের যৌবন ও শক্তি অন্য কাজে ব্যয়িত হইয়াছে, ঐ সময় কোন বুজুর্গ টানিয়া নিলেন না, এখন আমি বুড়া হইয়াছি, কোন নূতন কাজের সাহস ও শক্তি নাই। এখন হযরত আমা হইতে নিজের কাজ নিতে চাহিতেছেন; এখন আমি কোন কাজের উপযুক্ত নহি।”
হযরত মওলানা বলেন–
যদি প্রকৃত প্রস্তাবে পূর্বে আপনি নিজের মধ্যে কোন শক্তি সামর্থ আছে ও আপনি কিছু করিতে পারেন বলিয়া মনে করিতে ছিলেন তাহা হইলে তখন আপনি আল্লাহর কাজের যোগ্য ছিলেন না। এখন যদি আপনার ইহাই একীন হইয়া থাকে যে, আপনার মধ্যে কোন শক্তি সামর্থ্য নাই ও আপনি কিছুই করিতে পারেন না তাহা হইলে বর্তমানেই আপনি আল্লাহর কাজের যোগ্য হইয়াছেন। আল্লাহর কাজ করিবার জন্য ও আল্লাহর সাহায্য পাওয়ার যোগ্য হওয়ার জন্য শর্ত এই যে, মানুষ নিজকে শক্তিহীন ও নিরুপায় মনে করে ও শুধুমাত্র আল্লাহকেই কার্যকারক বলিয়া একীন করে; ইহা ব্যতীত গায়েবী সাহায্য হয় না। হাদীছে কুদছীতে আছে–
انا عند المنكسرة قلوبهم
“আমি তাহাদের সহিত আছি, যাহাদের দিল (অন্তর) ভাঙ্গিয়া গিয়াছে।”
তিনি বলেন–
আমি রাজনৈতিক কর্মীদের নিকটও কৃতজ্ঞ। তাহারা গভর্ণমেন্টকে তাহাদের প্রতি আকৃষ্ট করিয়া রাখিয়াছে। সেজন্য আমি নিশ্চিন্তে এতদিন নিজের কাজ করিতে পারিয়াছি।
বিদায়ের সময় ঐ বুজুর্গ দোয়ার দরখাস্ত করিলে তিনি বলেন– হযরত! প্রত্যেক মুসলমানের জন্য তাহার অসাক্ষাতে দোয়া করা প্রকৃতপক্ষে নিজের জন্যই দোয়া করা। হাদীছে আছে, যখন কোন মুসলমান নিজের কোন মুসলমান ভাইয়ের জন্য মঙ্গল ও কৃতকার্যতার কোন দোয়া করে তখন আল্লাহর ফেরেশতাগণ বলেন– “তোমার জন্যও ঐরূপ।” অর্থাৎ হে আল্লাহর বান্দা! আল্লাহ (যেন) ঐ জিনিস তোমাকেও দেয়। সুতরাং প্রত্যেক মুসলমানের জন্য কোন মঙ্গলের দোয়া করা প্রকৃত প্রস্তাবে নিজের জন্য ফেরেশ্তা দ্বারা দোয়া করাইবার এক একীনী তদ্বীর বা উপায়।
← আগের কিস্তি (অষ্টম কিস্তি) | সূচিপত্র | পরের কিস্তি (দশম কিস্তি) →
মূল বই: মালফুজাত (নীতি-কথা) – হযরতজী মাওলানা ইলিয়াস (রহঃ)। সংকলন: মাওলানা মুহাম্মদ মনজুর নোমানী। অনুবাদ: ডক্টর মোহাম্মদ ছানাউল্লাহ (ব্যারিষ্টার)। প্রকাশক: মোহাম্মদী লাইব্রেরী, চকবাজার, ঢাকা।
