মালফুজাতে হযরতজী – পর্ব ৬: বাণী ১০১–১২০
হযরতজী মাওলানা মুহাম্মদ ইউসুফ কান্ধলভী (রহঃ)-এর বাণী সংকলন মালফুজাতে হযরতজী মাওলানা ইউসুফ (রহঃ) বইয়ের ১০১ থেকে ১২০ নম্বর বাণী এই পর্বে দেওয়া হলো। সম্পূর্ণ সূচি ও বইয়ের ভূমিকা দেখুন।
সংকলন: মুফতি রওশন শাহ কাসেমী। অনুবাদ: ইসহাক ওবায়দী। প্রকাশক: বাড কম্প্রিন্ট এন্ড পাবলিকেশন্স, ঢাকা।
এই পর্বে যা আছে
- ১০১. মানুষের জীবন সঠিক পন্থার ওপর আসার জন্য সংক্ষিপ্ত পাঠ্যসূচী
- ১০২. মুসলমানের একরাম বা সম্মান করার গুণ সৃষ্টি করার পদ্ধতি
- ১০৩. যাদের মধ্যে মেহনত করা হচ্ছে তাদের কাছ থেকে কোন জিনিসের আকাঙ্খী না হওয়া
- ১০৪. কলেজ (ভার্সিটি)র ছাত্রদের মধ্যে কাজের পদ্ধতি
- ১০৫. তশকীল করার পদ্ধতি
- ১০৬. মহিলাদের কাজ
- ১০৭. বয়ানের মধ্যে আম্বিয়া (আঃ)-দের এবং সাহাবায়ে কেরাম (রা) দের ঘটনাবলীর উল্লেখ থাকা চাই
- ১০৮. মুসলমানদের দ্বীনের ওপর আমল না করার কারণ
- ১০৯. ঈমান কোন্ জিনিসের নাম?
- ১১০. সর্বোত্তম এবাদত
- ১১১. একটি এজতেমায় বয়ান করার সময় হজরতজীর ভিজে যাওয়া
- ১১২. হজরতজী (র)-এর বিনয়
- ১১৩. প্রত্যেক শ্রেণীতে জোড়-মিলের জন্য হুজুর (স)-এর তরীকা (কার্যকরী)
- ১১৪. কুতুব এবং আবদাল হওয়ার রাস্তা
- ১১৫. আমরা দা’য়ী তৈরী করছি
- ১১৬. হুজুর (স) ওয়ালা আমল ব্যতীত সব আসবাব বে-জান মুর্দা
- ১১৭. কোরআন-হাদীস শোনার আদবসমূহ
- ১১৮. আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করার উৎসাহ
- ১১৯. ইসলামী সমাজ ব্যবস্থা কখন বাস্তবায়িত হবে?
- ১২০. মেহনতের নকশা অস্তিত্বে এসে গেলে জাতিসমূহ ইসলামের মধ্যে প্রবেশ করে ফেলবে
১০১. মানুষের জীবন সঠিক পন্থার ওপর আসার জন্য সংক্ষিপ্ত পাঠ্যসূচী
হজরতজী বলেন— প্রতি বছর গুরুত্বের সাথে চিল্লা লাগানো চাই, সারা জীবনে কমপক্ষে তিন চিল্লা। বছরে এক চিল্লা, মাসে তিন দিন, সপ্তায় দুই গাশ্ত, দৈনিক তা’লীম, তাসবীহসমূহ, তেলাওয়াতে কোরআন এটা ন্যূনতম পাঠ্যসূচী যে, এতে আমাদের জীবন দ্বীনওয়ালা বনতে থাকবে। যদি আমরা একথা চাই যে, আমরা সমষ্টিগতভাবে পুরো মানবতার জীবন সঠিক পন্থার ওপর আসা এবং বাতেল তছনছ হয়ে যাওয়ার কারণ হই, তবে তার জন্য এই নেসাব থেকেও আগে বাড়তে হবে। আমাদের সময় এবং আমাদের কামাইয়ের অর্ধেক আল্লাহর রাস্তায় লাগতে হবে। আর অর্ধেক কাম-কাজ ঘরের প্রয়োজনাদির মধ্যে, অথবা কমপক্ষে এইটুকু যে, এক তৃতীয়াংশ সময় এবং কামাই আল্লাহর রাস্তায় আর দুই তৃতীয়াংশ নিজের কাম-কাজের মধ্যে। অর্থাৎ প্রতি বছর চার মাসের তরতীব ঠিক করে নেবে।
(সাওয়ানেহে হজরতজী-পৃঃ ৭৭২)
১০২. মুসলমানের একরাম বা সম্মান করার গুণ সৃষ্টি করার পদ্ধতি
হজরতজী বললেন— প্রতিটি মুসলমানকে রাসুল (স)-এর উম্মত হওয়ার কারণে একরাম করা চাই। প্রতিটি উম্মতের সামনে নত হয়ে যাওয়া, প্রতিটি ব্যক্তির সম্মুখে ছোট হয়ে যাওয়া, প্রতিটি ব্যক্তির হক-হুকুক আদায় করা আর নিজের হক-হুকুকের আকাংখী না হওয়া। যে মুসলমান অন্য মুসলমানের দোষকে ঢেকে চলবে, আল্লাহ জাল্লা শানুহু তার দোষ ঢেকে রাখবেন। যতোক্ষণ মানুষ নিজের মুসলমান ভাইয়ের কাজে লেগে থাকে, আল্লাহ জাল্লা শানুহু তার কাজে লেগে থাকেন। যে নিজের হক-হুকুক ক্ষমা করে দেবে, আল্লাহ জাল্লা শানুহু তাকে জান্নাতের মাঝখানে প্রাসাদ দান করবেন। যে ব্যক্তি আল্লাহর ওয়াস্তে অন্যের সামনে নিজেকে নিজে ছোট মনে করবে, আল্লাহ পাক তাকে সম্মান ও উচ্চতা দান করবেন। এর জন্য অন্যের মধ্যে উৎসাহ দেয়ার মাধ্যমে একরামে মুসলিমের আকাঙ্খা সৃষ্টি করতে হবে। মুসলমানদের মূল্য বাতানো চাই। হুজুর (স) এবং সাহাবায়ে কেরাম (রা)-এর আখলাক, হামদর্দী এবং অপরকে শ্রেষ্ঠ ভাবার ঘটনাবলী শোনাতে হবে। স্বয়ং নিজে তার মশ্ক্ বা অভ্যাস করবে, এবং কেঁদে কেঁদে আল্লাহ পাকের কাছে হুজুর (স)-এর আখলাকের তৌফিকের জন্য দোয়া করা চাই।
(সাওয়ানেহে হজরতজী-পৃঃ ৭৬৮)
১০৩. যাদের মধ্যে মেহনত করা হচ্ছে তাদের কাছ থেকে কোন জিনিসের আকাঙ্খী না হওয়া
হজরতজী বলেন— বর্তমানে উম্মতের কিছু অংশে ব্যক্তিগত আমলের রেওয়াজ আছে, তাও আবার বে-জান আমল। হুজুরে আকদাস (স)-এর নবুওয়ত খতম হওয়ার তোফায়েলে সমগ্র উম্মত দাওয়াত ওয়ালিমেহনত পেয়েছে। আল্লাহর বান্দাদের সম্পর্ক আল্লাহ জাল্লা শানুহুর সাথে কায়েম হয়ে যাক এ জন্যে নবীদের তরজ ও তরীকার ওপর নিজের জান এবং মালকে সঁপে দিতে হবে, আর যাদের মধ্যে মেহনত করা হচ্ছে তাদের কাছ থেকে কোন জিনিসের আকাংখী না হওয়া চাই।
(সাওয়ানেহে হজরতজী-পৃঃ ৭৬৯)
১০৪. কলেজ (ভার্সিটি)র ছাত্রদের মধ্যে কাজের পদ্ধতি
হজরতজী বলেন— কলেজ (ইউনিভার্সিটির) ছাত্রদের মধ্যে এই কাজকে ওঠানো চাই। হোস্টেলগুলোতে মকামী কাজের জন্য জামাত বানানো চাই। একটা গাশ্ত্ হোস্টেলবাসীরা নিজের হোস্টেলে করবে, এবং সপ্তাহিক দ্বিতীয় গাশ্ত্ বাইরে কোন মহল্লায় অথবা অন্য হোস্টেলে করবে। কাছের মহল্লার জামাত ও হোস্টেলে গিয়ে গাশ্ত্ করবে, হোস্টেলের সাথী বন্ধুরা নিজেদের দৈনন্দিন তা’লীম এবং মাসে তিন দিনের তরতীবও ঠিক রাখবে।
(সাওয়ানেহে হজরতজী-পৃঃ ৭৮১)
১০৫. তশকীল করার পদ্ধতি
হজরতজী বলেন— নাম চাওয়া এবং তশকীলের সময় মেহনত করা সমস্ত দাওয়াতের মগজ বনে, যদি নাম চাওয়ার সময় জমে থেকে মেহনত করা না হয়, তাহলে কাজের কথা থেকে যাবে, আর কোরবানী যদি অস্তিত্বে না আসে তাহলে কাজের প্রাণশক্তি বের হয়ে যাবে। দাওয়াত দেনেওয়ালাই নাম চাইবে, এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে নাম লিখবে। নাম লেখক ভিন্ন তকরীর যেনো আরম্ভ না করে দেয়। বেশী থেকে বেশী এক দুই বাক্য উৎসাহমূলক বলতে পারে। তার পর পরস্পরে একে অন্যকে প্রস্তুত করার জন্য বলা হবে। ফিকিরের সাথে নিজের কাছে বসা ব্যক্তিদেরকে প্রস্তুত করবে। ওজর-আপত্তির দিলজুয়ী এবং উৎসাহের সাথে সমাধান বলবে, নবীদের এবং সাহাবীদের ত্যাগ তিতিক্ষার ঘটনাবলীর দিকে ইশারা করবে এবং পুনরায় প্রস্তুত করবে। শেষমেশ মকামী জামাত তৈরী করে দিয়ে তাদের সাপ্তাহিক দুই গাশ্ত্, দৈনিক তালীম, তাসবীহসমূহ, মাসিক তিনদিন ইত্যাদির ব্যবস্থাপনা ঠিক করে দেবে।
(সাওয়ানেহে হজরতজী-পৃঃ ৭৭৫)
১০৬. মহিলাদের কাজ
হজরতজী বলেন— মহিলাদের মধ্যে কাজের সূক্ষ্মতা আরো বেশী, কেননা, বেপর্দা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সাধারণ এজতেমাসমূহে মহিলাদেরকে মোটেও আনা চাইনা। নিজ নিজ মহল্লায় কোন পর্দাওয়ালা বাড়ীতে কাছের বাড়ী থেকে মহিলারা কোন একদিন একত্রিত হয়ে তালীম করে নেবে। এর শুরুটা এভাবে করবে যে, পুরুষ যেসব কথাবার্তা এজতেমা, দাওয়াত, তালীম ইত্যাদি থেকে শুনে যাবে, তা নিজের ঘরে শোনাবে, এতে ইনশায়াল্লাহ অল্প সময়ে অন্তর তৈরী হতে শুরু করবে। তারপর মহল্লার মধ্যে তালীম আরম্ভ হওয়ার পর এমন হতে পারে যে, সমস্ত শহরের মহিলাদের সপ্তায় এমন এক জায়গায় জমায়েত হবে, যেখানে পর্দার গুরুত্ব থাকবে। সেখানে তালীমের পরে কোন পুরুষ পর্দার সাথে বয়ান করবে। কখনো কখনো একদিন অথবা তিনদিনের জন্য কাছাকাছির জন্য জামাত বানানো যেতে পারে। মহিলাদের জামাতের সাথে তাদের স্বামীরা উপস্থিত হওয়া চাই। অথবা প্রতিটি মেয়েলোকের সাথে তার শর’ঈ মাহ্রাম থাকা চাই। পর্দার সাথে যাবে, এবং পর্দাওয়ালা ঘরে থাকবে। পুরুষরা মসজিদে থেকে কাজ করবে।
১০৭. বয়ানের মধ্যে আম্বিয়া (আঃ)-দের এবং সাহাবায়ে কেরাম (রা) দের ঘটনাবলীর উল্লেখ থাকা চাই
হজরতজী বলেন— দাওয়াত দেয়ার সময় নবীদের সাথে এবং সাহাবায়ে কেরামদের সাথে আল্লাহ জাল্লা শানুহু যেই সাহায্য ও মদদ করেছেন তা বয়ান করবে, আর আমাদের সাথে যে সমস্ত সাহায্যের ঘটনা ঘটেছে, তা বয়ান না করা চাই। দাওয়াত দেয়ার সময় বর্তমান অবস্থার ওপর কথা না বলা চাই। উম্মতের মধ্যে ঈমান, আমল, আখলাকের দিক থেকে যে সব দুর্বলতা এসে গেছে, তাদের আলোচনা চাইতে উত্তম হবে যে, আসল খুবীগুলোর দিকে অর্থাৎ যা সৃষ্টি হওয়া বাঞ্ছনীয় তার দিকে মোতাওয়াজ্জুহ করবে।
(সাওয়ানেহে হজরতজী-পৃঃ ৭৭৫)
১০৮. মুসলমানদের দ্বীনের ওপর আমল না করার কারণ
হজরতজী বলেন— বর্তমানে দ্বীনের যে সমস্ত হুকুম আহকামের ওপর মুসলমানরা আমল করছে না, চাই ঐ আহকাম যে কোন শাখার হোকনা কেন, তার ওপর আমল করার কারণে হয়তো মুসলমানদের মালের ওপর আঘাত আসে অথবা জান ও দেহের ওপর, এইজন্য এই সমস্ত আহকামের ওপর আমল করা তাদের জন্য অত্যন্ত কঠিন মনে হচ্ছে, আর ইসলামকে মানা সত্ত্বেও তার আহকামের খেলাপ জীবন যাপন করছে।
(সাওয়ানেহে হজরতজী-পৃঃ ৭১৮)
১০৯. ঈমান কোন্ জিনিসের নাম?
হজরতজী বলেন— ঈমান প্রকাশ্য বস্তুর ওপর প্রকাশ্য ভাবে একীন করার নাম; বরং প্রকাশ্য ও প্রচলন এবং মানুষের দেখার খেলাপ আল্লাহ জাল্লা জালালুহু-র সত্তা ও গুণাবলী এবং ঐ ধরনের আমল, এবং ঐ ধরনের খবরের ওপর একীন জমিয়ে ফেলারই নাম ঈমান।
(সাওয়ানেহে হজরতজী-পৃঃ ৭২০)
১১০. সর্বোত্তম এবাদত
হজরতজী বলেন— নিশ্চয়ই আল্লাহর জিকির সর্বোত্তম এবাদত, কিন্তু যে মেহনত দ্বারা দুনিয়া যিকিরকারী হবে তা এর চেয়েও বেশী উত্তম।
(তাযকেরায়ে মাওলানা ইউসুফ-পৃঃ ৮৮)
১১১. একটি এজতেমায় বয়ান করার সময় হজরতজীর ভিজে যাওয়া
একটি এজতেমায় হজরতজী বয়ান করছিলেন, বয়ানের মাঝখানে খুব বেশী বৃষ্টি শুরু হয়ে গেলো, হজরতজী (র) এবং শ্রোতামন্ডলী ভিজতে লাগলো, হজরত মাওলানা এনামুল হাসান (র) (যিনি পরে হজরতজী হয়েছিলেন) ছাতা এনে মাথার ওপর ধরতে চাইলেন, তখন হজরতজী নিষেধ করলেন এবং বললেন— আমরা কি নিজেদের কাম-কাজের জন্য প্রতিদিন লাইনে দাঁড়িয়ে অথবা ক্ষেত-খামারে হাল জুত্তে গিয়ে ভিজিনা? নিজের জন্যতো ভিজ্ছিনা, আল্লাহর জন্য ভিজছি। আমার আজকের এই ভেজা কাল কেয়ামতের দিন কাজ দেবে। এবং শ্রোতামন্ডলীকে লক্ষ্য করে বল্লেন ঃ জমে বসে থাকুন। কাগজ তো নয় যে, গলে যাবেন, আর মাটিও নয় যে গলে যাবেন।
(সাওয়ানেহে হজরতজী-পৃঃ ৬৯২)
১১২. হজরতজী (র)-এর বিনয়
একবার মাদ্রাজের জামাত সাহারানপুর এলাকায় চিল্লা কাটিয়ে এসেছে। রাতের খানা হজরতজীর সাথে খাইয়েছেন। খাওয়ার মাঝখানে হজরতজী বলেন— তোমাদের সফর কেমন হলো? জামাত উত্তরে বললো, হজরত! খুব ভালো কেটেছে। তবে গরমের কারণে শরীরে ফোসকা পড়ে গেছে। হজরতজী (র) একটু মুচকি হেসে বললেন— তোমাদের ছ’নম্বরও কি এসে গেছে? তারা বললো, হজরত আলহামদু লিল্লাহ আমাদের সকলের ছ’নম্বর এসে গেছে। হজরতজী বললেন, তোমাদের ওপর আল্লাহপাকের বড় দয়া, আমার তো এখনো আসেনি।
(সাওয়ানেহে হজরতজী-পৃঃ ৭০০)
১১৩. প্রত্যেক শ্রেণীতে জোড়-মিলের জন্য হুজুর (স)-এর তরীকা (কার্যকরী)
হজরতজী বলেন— বর্তমানে প্রত্যেক শ্রেণীতে সব জায়গায় যে অধঃপতন চলছে এবং যোগ জিজ্ঞাসার সমস্যা (শুধু) বিগড়াচ্ছে, এর চিকিৎসা বা সমাধান শুধু হজরত মোহাম্মদ (স)-এর তরীকার মধ্যে নিহিত। যে যতোটা করবে, আল্লাহ পাকের পক্ষ থেকে অতোটুকু পাবে। আল্লাহ জাল্লাশানুহু আমাদের দুনিয়া এবং আখেরাতের সমস্ত সমস্যার সমাধান হজরত মোহাম্মদ (স)-এর তরীকায় জীবন পরিচালনার মধ্যে রেখেছেন। তাঁর তরীকা আমাদের জীবনে আসার জন্য মেহনত জরুরী।
(সাওয়ানেহে হজরতজী-পৃঃ ৭০৮)
১১৪. কুতুব এবং আবদাল হওয়ার রাস্তা
হজরতজী বলেন— আমি যখন শৈশবে “মিজান-মুনশায়াব” (একটি গ্রামারের বই) পড়তে ছিলাম, তখন হজরতজী মাওলানা ইলিয়াস (র) বলেছেন, ইউসুফ! তোমাকে কুতুব হওয়ার পথ বাতলে দেবো? আমি আরজ করলাম, হজরত বলে দিন। হজরত বললেন, ইউসুফ! যখন যেখানে হুজুরে আকরাম (স)-এর সুন্নতের খেলাপ আমল হতে দেখবে, তার বিপরীত সুন্নতকে প্রচলন করার জন্য মেহনত কোন জায়গা বা সময়ের শর্ত ছাড়াই করবে। এটা কুতুব এবং আবদাল হওয়ার রাস্তা।
(সাওয়ানেহে হজরতজী-পৃঃ ৭০৯)
১১৫. আমরা দা’য়ী তৈরী করছি
হজরতজী বলেন— হুজুরে পাক (স)-এর যমানায় এমন এক নকশা বানানো হয়েছিলো যে, দাওয়াত, তালীম, এবাদত সব কিছুর মেজাজ বনে গিয়েছিলো। এখন তো দাওয়াত দিতে হলে নেজামুদ্দীন অথবা রায়বেন্ড গিয়ে শিখে আসতে বলা হয়। যখন উম্মতের মেজাজ এমন হয়ে যাবে, তখন সবখানের মানুষ শেখানেওয়ালা হয়ে যাবে। দাওয়াতের অর্থ বর্তমানে শুধু অন্যকে সমর্থক করে নেয়া। হুজুর (স) ওয়ালা নকশায় দাওয়াতের কাজ এমন হওয়া চাই যে, যদি সে মুরতাদ হয়ে যায় তখন তাকে বুঝাতেন শুনাতেন, আর যদি না বুঝতো তখন তাকে হত্যা করে দিতেন। কিন্তু যখন হত্যা করবে, তখন যেনো কেউ হাত তুলতে না পারে (এমন অবস্থা হতে হবে) যতোক্ষণ পর্যন্ত কুফরীর ষড়যন্ত্র চলবে, ততোক্ষণ পর্যন্ত ষড়যন্ত্র চালাবে, আর যখন ষড়যন্ত্র চলবেনা, ততক্ষণ শক্তি প্রয়োগ করবে। আমরা দা’য়ী তৈরী করছি, পয়সা দিয়ে কতোদিন দাওয়াতের কাজ চালাবে? কতোদিন পয়সা দ্বারা তালীম চালাবে? ট্রেনিং ব্যতীত নিজেদেরকেই মারবে।
(মকতুবাতে আকাবেরে তাবলীগ-পৃঃ ১৫৪)
১১৬. হুজুর (স) ওয়ালা আমল ব্যতীত সব আসবাব বে-জান মুর্দা
হজরতজী বলেন— হুজুর (স) ওয়ালা আমল ব্যতীত কক্ষণো দুনিয়া ও আখেরাতে কামিয়াবী নসীব হতে পারেনা, চাই জাগতিক আসবাবপত্র যতোই হাতে আসুক না কেনো। বরং জাগতিক আসবাব রাজত্ব, ব্যবসা, ক্ষেত-খামার ইত্যাদিতে যতোক্ষণ পর্যন্ত হুজুর (স) ওয়ালা আমলের রূহ না আসবে ঐ সব আসবাব সব মুর্দা বে-জান থাকবে।
(তাযকেরায়ে হজরতজী-৫২)
১১৭. কোরআন-হাদীস শোনার আদবসমূহ
হজরতজী বলেন— যখন কোরআন শরীফ পড়তে অথবা শুনতে বসবে, তখন মনে করবে যে, আল্লাহ তায়ালা আমাকে বলছেন। আর যখন হাদীস শরীফ পড়তে অথবা শুনতে বসবে, তখন এমন মনে করবে যে, হুজুরে পাক (স) আমাকে বলছেন।
(তাযকেরায়ে হজরতজী-পৃঃ ৫৩)
১১৮. আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করার উৎসাহ
হজরতজী বলেন— শেষ দরজার হিম্মত খরচ করে আসল জিনিসের জন্য দৌড়া-দৌড়িকে চালু করার জন্য সীমাতিরিক্ত চেষ্টা-তদবীর কর, আর দরবারে এলাহীতে তার জন্য কান্নাকাটি করার পরিমাণকে অনেক বাড়িয়ে দাও। আর যতোটা সম্ভব খোদ নিজে এই মেহনতকে বাড়ানোর মাধ্যমে পূর্ণতা অর্জন করতে পার তা করার সাথে সাথে দৌড়া-দৌড়ি বেশী বেশী করার মাধ্যমে এবং চিঠি-পত্রের মাধ্যমে চেষ্টাকে পূর্ণাঙ্গ করতে থাক। ঐ আল্লাহর দরবারে যার কজায়ে কুদরতের মধ্যে সবকিছু করে দেয়ার এক সেকেন্ডের মধ্যে ক্ষমতা আছে, মাথাকে নত করে নিজের চরম পাপের স্বীকারোক্তি এবং অত্যন্ত লজ্জার সাথে দোয়া করতে থাক। আর তার কবুলিয়তের বিশ্বাস কর।
(মকতুবাতে আকাবেরে তাবলীগ-পৃঃ ১৪৪)
১১৯. ইসলামী সমাজ ব্যবস্থা কখন বাস্তবায়িত হবে?
হজরতজী বলেন— উদ্দেশ্য এই যে, হুজুর (স)-এর জীবন পদ্ধতি জীবনের প্রতিটি শাখায় জীবন্ত হোক, এবং সাধারণ মুসলমানের মধ্যে আল্লাহ তায়ালার মর্জি মোতাবেক সমাজ ব্যবস্থার বিশুদ্ধিকরণ অস্তিত্বে আসুক। আর এই ব্যবস্থা ঐ পর্যন্ত সম্ভব নয়, যতোক্ষণ না সমাজের যা ভিত্তি, তা অস্তিত্বে আসবে, অর্থাৎ কামিয়াবী আল্লাহর হাতের মধ্যে হওয়ার একীন এবং হুজুর (স)-এর তরীকার মধ্যে আল্লাহ থেকে কামিয়াবী নেয়ার সীমাবদ্ধতার একীন, আর তার শেখা-শেখানোর সাধারণ পরিবেশ যতোক্ষণ পর্যন্ত কায়েম না হবে, সমাজব্যবস্থা ঠিক হবেনা।
(মকতুবাতে আকাবেরে তাবলীগ-পৃঃ ১৫৬)
১২০. মেহনতের নকশা অস্তিত্বে এসে গেলে জাতিসমূহ ইসলামের মধ্যে প্রবেশ করে ফেলবে
হজরতজী বলেন— একটা হচ্ছে, মেহনতের নকশা, যদি নকশা অস্তিত্বে এসে যায়, তবে অন্যান্য জাতিসমূহ ইসলামের মধ্যে প্রবেশ করে যাবে। যদি ঐ নকশা অস্তিত্বে না আসে, তখন আবার মুসলমান ভিন্ন ধর্মে প্রবেশ করে ফেলবে, যদি ঐ নকশা ব্যতীত আমরা পৃথিবীর দেশে দেশে দাওয়াত দেই, তাহলে তারা ইসলামের মধ্য প্রবেশ করে ও বের হয়ে যাবে। যেভাবে হুজুর (স) নামাজ, রোজা, হজ্ব দিয়েছেন, ঐ ভাবে দ্বীনের মেহনতের পদ্ধতিও দিয়েছেন। নবীদের দাওয়াত মুসলমানরা পেয়েছে। (এখন) মুসলমান তো এই মনে করছে যে, মানুষ কামাবে, খাবে, আর নিজেদের নকশা চালাবে।
(মকতুবাতে আকাবেরে তাবলীগ-পৃঃ ১৫২)
← আগের পর্ব (বাণী ৮১–১০০) | সূচিপত্র | পরের পর্ব (বাণী ১২১–১৪০) →
মূল বই: মালফুজাতে হযরতজী মাওলানা ইউসুফ (রহঃ)। সংকলন: মুফতি রওশন শাহ কাসেমী। অনুবাদ: ইসহাক ওবায়দী। প্রকাশক: বাড কম্প্রিন্ট এন্ড পাবলিকেশন্স, ঢাকা। বইটির স্ক্যান কপি archive.org-এ পাওয়া যাবে।
