|

মালফুজাতে হযরতজী ইলিয়াস (রহঃ) – প্রথম কিস্তি: মলফুজ ১–২০

হযরতজী মাওলানা মুহাম্মদ ইলিয়াস কান্ধলভী (রহঃ)-এর বাণী সংকলন মালফুজাত (নীতি-কথা) – হযরতজী মাওলানা ইলিয়াস (রহঃ) বইয়ের প্রথম কিস্তি (মলফুজ ১ থেকে ২০)। সম্পূর্ণ সূচিপত্র দেখুন।

সংকলন: মাওলানা মুহাম্মদ মনজুর নোমানী। অনুবাদ: ডক্টর মোহাম্মদ ছানাউল্লাহ (ব্যারিষ্টার)। প্রকাশক: মোহাম্মদী লাইব্রেরী, চকবাজার, ঢাকা।

এই কিস্তিতে যা আছে


১. পূর্ববর্তী পয়গম্বরগণের উম্মতদের অবস্থা সাধারণভাবে এইরূপ ছিল যে…

তিনি বলেন–

পূর্ববর্তী পয়গম্বরগণের উম্মতদের অবস্থা সাধারণভাবে এইরূপ ছিল যে, যতই নবুয়তের জমানা হইতে দূরে পড়িতেন, ততই তাহাদের ধর্মীয় ব্যাপার এবাদত ইত্যাদি স্বকীয় আসল সত্তা (হাকিকত ও রূহ) হারাইয়া কতগুলি নাম মাত্র রছমে পরিণত হইত এবং এই সমস্ত প্রাণহীন অনুষ্ঠান রছম হিসাবেই আদায় হইতে থাকিত। এই গুমরাহী ও ভুল পথ হইতে ফিরাইয়া শুদ্ধি ও সংশোধনের (এছুলাহের) জন্য পুনরায় দ্বিতীয় পয়গম্বর প্রেরিত হইতেন, যিনি এই রছমকে মিটাইয়া উম্মতকে দ্বীনের আসল হাকিকত ও শরীয়তের প্রকৃত স্বরূপ সম্বন্ধে সচেতন করিতেন। সকলের শেষে যখন রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রেরিত হন তখনও যেই সমস্ত কওম কোন আছমানী দ্বীনের সহিত সম্বন্ধ রাখিতেন তাহাদের অবস্থাও এইরূপ ছিল– তাহাদের পয়গম্বরের আনীত শরীয়তের যেই অংশটুকু তাহাদের নিকট বাকী ছিল তাহাও কতকগুলি প্রাণহীন রছমের সমষ্টিমাত্র ছিল। ঐ সমস্ত রছমকে তাহারা আসল দ্বীন ও শরীয়ত বলিয়া মনে করিত। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই সমস্ত রছমকে মিটাইবার আছলী দ্বীনি হাকিকত ও আহকামের তালীম দিয়াছিলেন। উম্মতে মুহাম্মদীও বর্তমানে এই রোগে আক্রান্ত হইয়াছে। তাহাদের এবাদতে পর্যন্ত রছমীয়াত আসিয়া পড়িয়াছে; এমনকি দ্বীনি তালীম যাহা এই সমস্ত খারাবীর সংশোধনের সহায় যন্ত্র হওয়া উচিত ছিল উহাও বহু স্থলে এক রছমে পরিণত হইয়াছে। কিন্তু বর্তমানে নবুয়ত খতম হইয়াছে এবং ঐ প্রকারের কাজের জিম্মাদারী উম্মতের ওলামাদের উপর রাখা হইয়াছে। কারণ তাঁহারাই নায়েবে নবী। সুতরাং এই বিকৃত অবস্থার প্রতিকার ও সংশোধন করার জন্য বিশেষভাবে চেষ্টা করা তাহাদের উপর ফরজ এবং ইহার সম্বল হইতেছে তছহিহ্-এ নিয়ত বা বিশুদ্ধ সঙ্কল্প। কারণ, আমলের মধ্যে যখন লিল্লাহিয়াত ও শানে আবৃদিয়াত (আল্লাহর ওয়াস্তে আল্লার বন্দিগী হিসাবে কাজ করার নিয়ত) না থাকে তখনই উহা রছমে পরিণত হয়) আবার নিয়ত ছহীহ্‌ হইলেই আমলের গতি শুদ্ধ হইয়া আল্লাহ মুখী হয় ও রছমিয়াতের স্থলে হাকিকত পয়দা হয় এবং প্রত্যেক কাজ আবদিয়াত ও খোদা পরস্তীর জজ্বায়ে (বিশেষ আকর্ষণে) হইতে থাকে। মোটকথা, বর্তমান যুগে মানুষের আমলের মধ্যে তছহীহ-এ নিয়তের সাহায্যে লিল্লাহিয়াত ও হাকিকত পয়দা করিবার জন্য চেষ্টা ও কষ্ট করা উম্মতের ওলামা ও দ্বীনের বাহকদের এক বিশেষ কর্তব্য।

২. দ্বীন জীবনযাত্রার অতি সহজ ও আছান পদ্ধতি বলিয়া…

তিনি বলেন–

দ্বীন জীবনযাত্রার অতি সহজ ও আছান পদ্ধতি বলিয়া কোরআন হাদীছে খুব জোরেসোরে প্রচার করা হইয়াছে। সুতরাং যাহা দ্বীনের মধ্যে যত জরুরী তাহা তত সহজ ও আছান হওয়া উচিত। তছহীহ্এ নিয়ত ও এখলাছ দ্বীনের অতি জরুরী অঙ্গ; বরং উহাই দ্বীনের যাবতীয় কাজের রূহ ও প্রাণ স্বরূপ; কাজেই উহাও অতি সহজ ও আছান; আবার এই এখলাছ বা বিশুদ্ধ সঙ্কল্পই সমস্ত ‘ছলুক’ (আল্লাহকে পাওয়ার পথ) ও তরিকার নির্যাস বা উপার্জিত পথ। ইহা দ্বারা জানা গেল যে, ‘ছলুক’ও অতীব সহজ ও আছান কাজ। কিন্তু মনে রাখা চাই যে, প্রত্যেক কাজ নিজের নীতি ও নিজস্ব কর্মপদ্ধতিতেই সহজ ও সরল হইয়া থাকে। গলদ তরিকা এখতিয়ার করিলে সহজ হইতে সহজ কাজও কঠিন হইয়া যায়। বর্তমান যুগে লোকের ভুল এই যে, তাহারা উছুলের (নিয়ম পদ্ধতি) অধীনে কাজ করাকেই মুশকিল মনে করিয়া উহা হইতে সরিয়া পড়ে। অথচ দুনিয়ার কোন সাধারণ হইতে সাধারণ কাজও উহার স্বকীয় উছুল ও নিজস্ব তরিকা ব্যতীত সমাধা হয় না। জাহাজ, নৌকা, রেল, মটর সমস্তই উছুল মতই চলে; এমনকি রুটি ও তরকারী পর্যন্ত উছুল মতই পাকান হয়।

৩. তরিকতের খাছ উদ্দেশ্য আল্লাহ পাকের আহকাম ও আদেশাবলী…

তিনি বলেন–

তরিকতের খাছ উদ্দেশ্য আল্লাহ পাকের আহকাম ও আদেশাবলী স্বাভাবিকভাবে পালনীয় ও নিষেধগুলি স্বাভাবিকভাবে অবাঞ্ছনীয় হইয়া যাওয়া। (অর্থাৎ এমন অবস্থায় উপনীত হওয়া যেন আল্লাহর আহকাম ও আদেশ মত চলাতে আনন্দ ও মজা পাওয়া যায়, আর নিষেধাবলীর নিকটে যাইতেও কষ্ট ও খারাপ লাগে)। ইহাই তরিকতের (আল্লাহর পথের) আসল উদ্দেশ্য; বাকী যাহা কিছু (অর্থাৎ জিকির-শোগল ও খাছ রিয়াজত ইত্যাদি) এই উদ্দেশ্য সাধনের উপায় স্বরূপ। কিন্তু বর্তমানে বহু লোক এই উপায়গুলিকেই আসল তরিকত বলিয়া মনে করিয়া থাকে; অথচ উহার কিছু কিছু তো বেদাত। সে যাহা হউক, এই সমস্ত যখন কেবলমাত্র ঔষধ স্বরূপ- আসল মকছুদ নহে- এই জন্যই অবস্থা ও সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে-সঙ্গে এই সমস্তের সংশোধন, পরিবর্ধন ও পরিবর্তনের প্রয়োজন আছে। অবশ্য শরীয়তের মধ্যে যেই সমস্ত কাজ কোরআন ও হাদীছের দ্বারা পরিষ্কারভাবে প্রমাণিত আছে ঐ সমস্ত সর্বযুগে একইভাবে করিতে হইবে।

৪. ফরজ সমূহের স্থান নফল সমূহের অনেক উপরে; বরং…

তিনি বলেন–

ফরজ সমূহের স্থান নফল সমূহের অনেক উপরে; বরং বুঝা উচিত যে, ফরজকে পরিপূর্ণ করাই নফলের একমাত্র উদ্দেশ্য। অর্থাৎ ফরজ কম হইলে নফল দ্বারা উহার ক্ষতিপূরণ করা হয় মাত্র। ফলকথা ফরজ আসল, আর নফল উহার অধীন ও আজ্ঞাবহ শাখামাত্র। কিন্তু কোন কোন লোকের অবস্থা এইরূপ যে, তাহারা ফরজ কাজে অবহেলা করে কিন্তু নফল কাজে বিশেষ তোড়জোড় করিয়া থাকে। উদাহরণ স্বরূপ, আপনারা সকলেই জানেন যে, নেকীর দিকে দাওয়াত দেওয়া, সৎকাজের আদেশ করা, অসৎকাজ হইতে বারণ করা, (অর্থাৎ তবলীগে দ্বীনের যাবতীয় শাখা প্রশাখাসমূহ) অতি দরকারী ফরজ কাজ। কিন্তু কয়জনেই বা এই ফরজ আদায় করিয়া থাকে? অপরদিকে নফল জিকির আজকারে লিপ্ত লোকের সংখ্যা তত কম নহে।

৫. কোন কোন দ্বীনদার লোক ও ওলামার ‘এস্তেগ্না’ (পরমুখাপেক্ষী…

তিনি বলেন–

কোন কোন দ্বীনদার লোক ও ওলামার ‘এস্তেগ্না’ (পরমুখাপেক্ষী না হওয়া ও স্বাধীন সন্তা বজায় রাখা) সম্বন্ধে বড়ই ভুল ধারণা আছে। তাহারা মনে করেন, কোন অবস্থাতেই ধনী লোকের নিকটেও যাইতে নাই এবং মালদার হইতে সম্পূর্ণরূপে বাঁচিয়া থাকা চাই। ‘এস্তেগ্না’র আসল উদ্দেশ্য মাত্র ইহাই যে, তাহাদের নিকট হইতে মাল ও সম্মান পাওয়ার আশায় তাহাদের নিকট না যাওয়া। তাহাদের ‘এছলাহ’ ও সংশোধনের জন্য ও দ্বীনের কাজের জন্য তাহাদের নিকট যাওয়া ‘এস্তেগ্নার খেলাফ নহে; বরং সময় বিশেষে ইহা জরুরী। অবশ্য তাহাদের সহিত মেলামেশায় যেন আমাদের মধ্যে মালের লোভ ও মহব্বত, সম্মানের নেশা ও আকাঙ্ক্ষা পয়দা না হয়- তৎপ্রতি বিশেষভাবে হুশিয়ার থাকা চাই।

৬. যখন কোন আল্লাহর বান্দা কোন নেক কাজের দিকে…

তিনি বলেন–

যখন কোন আল্লাহর বান্দা কোন নেক কাজের দিকে অগ্রসর হইতে চায় শয়তান তখন নানা প্রকারের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে ও তাহার পথ বিঘ্নসঙ্কুল ও কন্টকাকীর্ণ করিয়া তোলে। কিন্তু যখন ঐ সমস্ত প্রতিবন্ধক অকৃতকার্য হয় ও আল্লাহর বান্দা ঐ সমস্ত বাধাবিঘ্ন অতিক্রম করিয়া ঐ নেক কার্য আরম্ভ করিয়া দেয় তখন শয়তানের দ্বিতীয় কোশেশ ইহাই হয় যে, ঐ আল্লাহর বান্দার এখলাছে ও নিয়তে খারাবী ঢালিয়া অথবা অন্য কৌশলে নিজে ঐ নেক কাজে অংশীদার হইতে চায়। অর্থাৎ কখনও উহাতে ‘রিয়া’ ও ‘ছুমা’ (লোককে দেখাইবার ও শুনাইবার বাসনা) শামিল করিবার কোশেশ করিয়া উহার লিল্লাহিয়াত ও এখলাছকে বরবাদ করিতে চায়, আর ইহাতে অনেক সময় সে কৃতকার্যও হইয়া যায়। এই জন্য দ্বীনি কর্মীদের সব সময় এই বিপদ হইতে হুশিয়ার থাকা ও নিজেদের মনকে সব সময় এইরূপ ‘অছঅছা’ (খেয়াল, ধ্যান, কল্পনা) হইতে হেফাজত করা ও সব সময় নিজের নিয়তকে পরীক্ষা করিয়া দেখা উচিত। কেননা, কোন কাজে রেজায়ে এলাহী (আল্লাহর সন্তুষ্টি) ছাড়া অন্য কোন উদ্দেশ্য কোন সময় শামেল হইলেই ঐ কাজ আল্লাহ পাক কবুল করেন না।

৭. অধিকাংশ দ্বীনি মাদ্রাসার ইহা একটি বড় গাফলত ও…

তিনি বলেন–

অধিকাংশ দ্বীনি মাদ্রাসার ইহা একটি বড় গাফলত ও ত্রুটি যে, ছাত্রদিগকে পড়াইয়া তো দেওয়া হয় কিন্তু ইহার কোন বিশেষ চেষ্টা করা হয় না যে, এই পড়িবার ও পড়াইবার যাহা আসল উদ্দেশ্য (অর্থাৎ দ্বীনের খেদমত ও আল্লাহর দিকে আহ্বানের কাজ) তাহারা পড়া শেষ করিয়া সেই কাজে লাগিয়া যায়। এই অমনোযোগিতার পরিণাম ফল এই দাঁড়ায় যে, এই সমস্ত মাদ্রাসার বহু কৃতী ছাত্র পড়া শেষ করিয়া জীবিকার্জনকেই মকছুদ করিয়া হয়ত এলমে তিব্ব পড়িতে লাগিয়া যায় অথবা সরকারী ইউনিভার্সিটিতে পরীক্ষা দিয়া ইংরেজী স্কুল সমূহে মাষ্টারী পেশা এখতেয়ার করিয়া লয়; আর তাহাদের দ্বীনি শিক্ষায় যে সময়, মেহনত ও টাকা খরচ হইয়াছিল তাহার সমস্তই এই প্রকারে পরিণামে বিফলে যায়; বরং অনেক সময় তাহারা দ্বীনের দুশমনদের কাজে আসে। এই জন্য পড়ান হইতে অধিকতর আমাদিগকে কোশেশ ও ফিকির করিতে হইবে যে, যেই ছাত্র পড়া শেষ করে সে যেন দ্বীনের খেদমতে লাগে এবং এলমে দ্বীনের হক আদায় করে। নিজের ক্ষেতে কিছু ফসল পয়দা না হইলে তাহাও ক্ষতির কথা, কিন্তু ভাল ফসল পয়দা হইয়া তাহা আমাদের দুশমনের কাজে আসিলে তাহা আরও অধিকতর ক্ষতির কথা।

৮. সরকারী ইউনিভার্সিটি সমূহে মৌলভী ফাজেল প্রভৃতি যে সমস্ত…

তিনি বলেন–

সরকারী ইউনিভার্সিটি সমূহে মৌলভী ফাজেল প্রভৃতি যে সমস্ত পরীক্ষা দেওয়া হয় তাহার খারাবী ও দ্বীনি অনিষ্টের পুরাপুরি আন্দাজ ও অনুভূতি আমাদের নাই। সাধারণতঃ এই সমস্ত পরীক্ষা তো এই জন্যই দেওয়া হয় যেন ইংরেজী স্কুলে চাকুরী পাওয়া যায়। কাফেরী হুকুমত নিজের ফায়েদার জন্য ও নিজস্ব উদ্দেশ্য সাধনের জন্য যে শিক্ষা পদ্ধতি (নেজামে তালিম) প্রচলিত করিয়াছে সেই কাফেরী নেজামের সাহায্যকারী বরং তাহার বেতনভুক্ত যন্ত্র স্বরূপ ব্যবহৃত হইবার যোগ্যতা হাছিল করিবার জন্য এসব পরীক্ষা দেওয়া হয়। চিন্তা করিয়া দেখুন এল্মে দ্বীনের উপর ইহার চেয়ে বড় জুলুম ও এলমে দদ্বীনের ইহার চেয়ে অধিক অপব্যবহার আর কি হইবে যে, দদ্বীনের দুশমনদের নেজামে তালিমের খেদমত তাহা হইতে লওয়া যাইবে। এমনই বুঝিয়া নেন যে, এই সমস্ত পরীক্ষা দ্বারা এল্মে দদ্বীনের ‘নেছবত’ (সম্বন্ধ) আল্লাহ ও রাসূলের পরিবর্তে কাফের ও কাফেরদের হুকুমতের দিকে করা হয়। এই জন্য ইহা অতি সাংঘাতিক ও বিপদসঙ্কুল বিষয়।

৯. এলমের সর্বপ্রথম ও সর্বপ্রধান কর্তব্য ইহা যে, মানুষ…

তিনি বলেন–

এলমের সর্বপ্রথম ও সর্বপ্রধান কর্তব্য ইহা যে, মানুষ নিজের জীবনের হিসাব-নিকাশ নেয় ও নিজের করণীয় কার্যসমূহ ও নিজের ত্রুটি-বিচ্যুতিসমূহ হৃদয়ঙ্গম করে ও পূর্ণভাবে তাহা আদায় করিবার জন্য চিন্তায় লাগিয়া যায়। কিন্তু ইহা না করিয়া সে যদি নিজের এলমের দ্বারা অপরের কার্যাবলীর সমালোচনা ও অন্যের ত্রুটি-বিচ্যুতির হিসাব-নিকাশ করে- তাহা হইলে ইহা এলমী অহঙ্কার ও আত্মগৌরব হইবে- যাহা ওলামাদের জন্য বড়ই ধ্বংসকারী। “নিজের কাজ কর অন্যের কাজ করিও না।”

১০. মুসলমানদের কেন হুকুমত ও ক্ষমতা দেওয়া হয় না”…

“মুসলমানদের কেন হুকুমত ও ক্ষমতা দেওয়া হয় না” এই কথার আলোচনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন–

আল্লাহর হুকুম আহকাম ও বিধি-নিষেধ যখন তুমি নিজের জীবনে ও স্বকীয় পারিবারিক জীবনে পালন কর না (যাহার উপর তোমার সম্পূর্ণ কর্তৃত্ব আছে ও কোনই বাধ্যবাধকতা [মজবুরী] নাই) তখন পৃথিবীর শাসন কার্যের ভার তোমার উপর কিরূপে ন্যস্ত করা যাইবে? মু’মেনদের দুনিয়ার রাজত্ব দেওয়ার খোদায়ী উদ্দেশ্য তো ইহাই যে, তাহারা পৃথিবীতে তাঁহার সন্তোষজনক কার্যাবলী ও আদেশসমূহ জারী করিবে। তুমি যখন তোমার সীমাবদ্ধ ক্ষমতার মধ্যে ইহা করিতেছ না তখন পৃথিবীর শাসনকার্য তোমার সোপর্দ করিয়া কল্য তোমা হইতে ইহার কি আশা করা যায়?

১১. যেই সমস্ত লোক গভর্ণমেন্টের ওফাদার ও সাহায্যকারী বলিয়া…

তিনি বলেন–

যেই সমস্ত লোক গভর্ণমেন্টের ওফাদার ও সাহায্যকারী বলিয়া গণ্য হয় তাহারা প্রকৃত প্রস্তাবে কাহারও ওফাদার বা সাহায্যকারী নহে; বরং তাহারা নিজের মতলবের ওফাদার মাত্র। অবশ্য আজকাল তাহাদের ক্ষুদ্র স্বার্থ বর্তমান গভর্ণমেন্ট দ্বারা হাছিল হয় বলিয়া তাহারা উহার ওফাদার ও সাহায্যকারী সাজিয়াছে। কল্য যদি তাহাদের স্বার্থ গভর্ণমেন্টের দুশমনদের দ্বারা হাছিল হয় তাহা হইলে তাহারা ঐ পরিমাণে উহাদের ওফাদার ও সাহায্যকারী হইবে; অন্যথায় এইসব মতলববাজ ও স্বার্থপর লোক নিজের বাপেরও ওফাদার নহে। তাহাদিগকে গালাগালি দেওয়া ও গভর্ণমেন্টের বিরোধিতা করিতে প্রস্তুত করা তাহাদের সংশোধনের প্রকৃত পন্থা নহে। তাহাদের প্রকৃত রোগ স্বার্থপরতা (গরজ পরস্তী)। যতদিন পর্যন্ত ঐ ব্যাধি তাহাদের মধ্যে থাকিবে ততদিন তাহারা গভর্ণমেন্টকে সাহায্য করা ছাড়িয়া দিলেও তাহাদের নিজের উদ্দেশ্য সাধনের জন্য তাহারা এইরূপ অন্য কোন শক্তির ঐরূপ ওফাদার সাজিবে। এই জন্য তাহাদের মধ্যে গরজ পরস্তীর জায়গায় খোদা পরস্তী পয়দা করা ও তাহাদিগকে আল্লাহ ও আল্লাহর দ্বীনের সাচ্চা ওফাদার বানাইবার চেষ্টা করাই আসল করণীয় কাজ। ইহা ব্যতীত তাহাদের রোগের চিকিৎসা নাই।

১২. ইহা কায়েদায়ে কুল্লিয়া (সর্বজন স্বীকৃত কানুন) যে, প্রত্যেক…

তিনি বলেন–

ইহা কায়েদায়ে কুল্লিয়া (সর্বজন স্বীকৃত কানুন) যে, প্রত্যেক মানুষ মনের শান্তি ঐ জিনিসে পায় যাহা তাহার মনে চায়। উদাহরণ স্বরূপ এক ব্যক্তি আমিরানা জিন্দেগী (নবাবী চালচলন) ও বহু মুল্যবান খাদ্য ও পোশাক ভালবাসে। কাজেই এই সমস্ত জিনিস ব্যতীত তাহার মনের শান্তি ও আরাম হাছিল হইতে পারে না। কিন্তু অপর ব্যক্তি চাটাইতে বসিতে ও শুইতে, মোটা কাপড় পরিতে ও সাদাসিদা খানা খাইতে ভালবাসে; সুতরাং তাহার শরীরের সুখ ও মনের শান্তি এই সমস্ত জিনিসেই অধিকতর অনুভূত হইবে। কাজেই রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণে যাঁহাদের অনাড়ম্বর জীবনযাপন প্রিয় হয় ও যাঁহারা উহাতে মজা ও আরাম পান তাঁহাদের উপর আল্লাহর বড়ই রহমত ও দান। কেননা তাঁহাদের মনের শান্তি এমন সস্তা জিনিসের মধ্যে রাখিয়া দিয়াছেন যাহা হাছিল করা প্রত্যেক দ্বীন-দরিদ্রের জন্যও সহজসাধ্য। ধরিয়া লউন, যদি আমাদের মনের শান্তি ও আরাম ঐ সমস্ত বহু মূল্যবান জিনিসের মধ্যে রাখিয়া দিতেন যাহা কেবলমাত্র ধনীদের জন্যই সহজ ও সুলভ তাহা হইলে হয়ত আমরা চিরজীবন অশান্তি ও অসুখেই থাকিতাম।

১৩. আমাদিগকে হুকুম করা হইয়াছে, “তোমাদিগকে এই পৃথিবীতে যে…

তিনি বলেন–

আমাদিগকে হুকুম করা হইয়াছে, “তোমাদিগকে এই পৃথিবীতে যে মাল দেওয়া যায় তাহা ধরিয়া রাখিও না অর্থাৎ বখিলী করিও না; খরচ করিতে থাক।” কিন্তু শর্ত এই যে, অন্যায় যায়গায় ও অন্যায়ভাবে যেন খরচ না হয়।

মোটকথা আল্লাহ প্রদর্শিত পথে ও পদ্ধতিতে এবং আল্লাহর নির্দেশিত সীমার মধ্যে খরচ করিতে হইবে।

১৪. এক সময় এমন হইয়াছিল যে, সম্ভবতঃ বৃষ্টি ইত্যাদির…

এক সময় এমন হইয়াছিল যে, সম্ভবতঃ বৃষ্টি ইত্যাদির দরুন মাওলানার ঘরে গোশ্ত আনিতে পারে নাই। ঐ দিন আমার সঙ্গে মাওলানার এক বিশেষ বন্ধুও উপস্থিত ছিলেন, যাহার গোশ্ত খাওয়ার স্পৃহা মাওলানার জানা ছিল। আমি দেখিলাম যে, দস্তরখানায় গোশত না থাকায় ঐ দিন মাওলানা বিশেষভাবে বিচলিত হইয়াছেন। আমি এক প্রকার আশ্চর্যান্বিত হইলাম যে, ইহা বিচলিত হইবার কি কথা? অল্পক্ষণ পরে ইহার উপর দুঃখ ও আফছোছ করিয়া তিনি বলেন– হাদীছ শরীফে আছে-

مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللّٰهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلْيُكْرِمْ ضَيْفَهُ

“যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ও আখেরাতের উপর বিশ্বাস করে তাহার উচিত যে, তাহার মেহমানের (অতিথিকে) সম্মান করে।”

আর মেহমানের সম্মান করার মধ্যে ইহাও দাখেল যে, সম্ভব হইলে তাহার প্রিয় বস্তু তাহার জন্য প্রস্তুত করা হয়। তৎপর এক বিশেষ দরদের সহিত আরবীতে–

فكيف باضياف الله و اضياف رسوله

বলেন, যাহার সারমর্ম এই- যখন কাহারও নিকট শুধু আল্লাহ ও রাসূলের মহব্বতে, আকর্ষণে ও কাজের জন্য কোন মেহমান আসেন তাহাদের হক আরও অধিক।

১৫. বেহেশত হক সমূহের বদ্লা মাত্র অর্থাৎ নিজের হকুক…

তিনি বলেন–

বেহেশত হক সমূহের বদ্লা মাত্র অর্থাৎ নিজের হকুক, নিজের সুখ ও শান্তি আল্লাহর ওয়াস্তে কোরবানী (বিলীন করিয়া) দিয়া নিজে কষ্ট করিয়া অন্যের হুকুক আদায় করা (যাহার মধ্যে আল্লাহর হকও শামেল আছে) ইহারই পরিবর্তে বেহেশ্ত পাওয়া যাইবে। এই উপলক্ষে তিনি বলেন– হাদীছ শরীফে বলা হইয়াছে–

اِرْحَمُوْا مَنْ فِي الْأَرْضِ يَرْحَمْكُمْ مَنْ فِي السَّمَاءِ

তোমরা পৃথিবীবাসীদের প্রতি সদয় হও আকাশের আল্লাহ তোমাদের প্রতি সদয় হইবেন।

হাদীছে দুই স্ত্রীলোকের দুই ঘটনা বর্ণনা করা হইয়াছে। যাহা সর্বসাধারণের নিকট সুবিদিত ও সুপরিচিত। এক বেশ্যা এক তৃষ্ণার্ত কুকুরের প্রতি সদয় হইয়া কুয়া হইতে পানি উঠাইয়া উহাকে পান করাইয়াছিল। আল্লাহ পাক তাহার এই কাজের বদলায় তাহার জন্য বেহেশ্তের হুকুম দিয়াছিলেন। আর একজন স্ত্রীলোক (যে বদকার ছিল না) একটি বিড়ালকে ভুখা অবস্থায় ছটফট করাইয়া মারিয়াছিল। সেই জন্য তাহাকে দোজখে নিক্ষেপ করা হইয়াছিল।

১৬. জিহরতের পূর্বে মক্কা শরীফে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম…

তিনি বলেন–

জিহরতের পূর্বে মক্কা শরীফে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষের কাছে ঘুরাফিরা করিয়া নিজে গিয়া যে দাওয়াতে-হক দিতেন বাহ্যতঃ মদিনা শরীফে পৌঁছার পর তাঁহার সেই কাজ ছিল না; বরং সেখানে তিনি এক নির্দিষ্ট জায়গায় অবস্থান করিতেন। কিন্তু তিনি মক্কী দাওয়াত সুচারুরূপে ও সুন্দরভাবে দিতে পারেন এমন এক খাছ জামায়াত তৎপূর্বে তৈয়ার করিয়া দিয়াছিলেন। তখন এই কাজেরই ইহা তাকাজা ছিল যে, তিনি এক কেন্দ্রে থাকিয়াই এই দাওয়াতে-হক ও আল্লাহর রাস্তায় জেহাদের নিজামকে শক্তি ও শৃঙ্খলার সহিত পরিচালনা করেন।

১৭. হাদীছে আছে, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিদ্দিকে আকবরকে…

তিনি বলেন–

হাদীছে আছে, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিদ্দিকে আকবরকে (রাজিআল্লাহ আনহু) নামাজের শেষে আল্লাহর নিকট এইভাবে আরজ করিবার জন্য দোয়ায়ে মাছুরা শিক্ষা দিয়াছিলেনঃ–

اَللّٰهُمَّ اِنِّيْ ظَلَمْتُ نَفْسِيْ ظُلْمًا كَثِيْرًا وَّلَا يَغْفِرُ الذُّنُوْبَ اِلَّا اَنْتَ فَاغْفِرْ لِيْ مَغْفِرَةً مِّنْ عِنْدِكَ وَارْحَمْنِيْ اِنَّكَ اَنْتَ الْغَفُوْرُ الرَّحِيْمُ

“আয় আল্লাহ! আমি নিজের নফছের উপর বড়ই জুলুম করিয়াছি; আর তুমি ছাড়া কেহই গোনাহ-খাতা মাফকারী নাই; কাজেই তুমি নিজের ফজল ও করমে (যাহাতে আমার কোনও অধিকার নাই) আমাকে ক্ষমা করিয়া দাও এবং আমার উপর রহম কর। ক্ষমাকারী ও রহমকারী, একীনের সহিত বলিতেছি, কেবলমাত্র তুমিই।”

একটু চিন্তা করিয়া দেখুন, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই দোয়া হযরত আবু বকর ছিদ্দিককে (রাজিআল্লাহু আনহু) শিক্ষা দিয়াছিলেন, যিনি সমস্ত উম্মতের মধ্যে আফজাল ও আকমল (শ্রেষ্ঠতম ও দক্ষতম) ছিলেন। বিশেষ করিয়া তাঁহার নামাজ স্বয়ং রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এমন কামেল ছিল যে, তিনি নিজেই তাঁহাকে নামাজের ইমাম বানাইয়াছিলেন। এতদ্সত্ত্বেও তাঁহাকেও নামাজের শেষে আল্লাহ পাকের (নিকট) দরবারে নিজের কুতাহী ও এবাদাতের হক আদায় হইতে না পারার স্বীকারোক্তি ও কেবলমাত্র তাঁহারই ফজল ও করমের দ্বারা ক্ষমা ও দয়ার দরখাস্ত শিক্ষা দিয়াছেন। এখন বলুন তো আপনারা কোথায়?

১৮. মানুষের জমিনের উপর অবস্থান (হায়াত) অতি কম। (অর্থাৎ…

তিনি বলেন–

মানুষের জমিনের উপর অবস্থান (হায়াত) অতি কম। (অর্থাৎ অত্যাধিক হইলেও মাত্র এই নশ্বর জীবনের হায়াতের পরিমাণ)। আর জমিনের নীচে তাহাকে অনন্ত অসীম কাল অবস্থান করিতে হইবে। অথবা এমনই বুঝ যে, দুনিয়াতে তোমার অবস্থান অতি অল্প সময়ের জন্য, আর ইহার পর যে সকল জায়গায় অবস্থান করিতে হইবে যেমন, মরণের পর শিঙ্গার প্রথম ফুৎকার পর্যন্ত, তৎপর দ্বিতীয় ফুৎকার পর্যন্ত এমন অবস্থায় যাহা আল্লাহই জানেন, (এই সময়ও বহু হাজার বৎসর হইবে) তৎপর হাজার হাজার বৎসর হাশরের ময়দানে, তৎপর আখেরাতে যেই ঠিকানার হুকুম হয় সেই ঠিকানায়।

ফলকথা, এই পৃথিবী হইতে চলিয়া যাইবার পর প্রত্যেক জায়গার অবস্থান এই দুনিয়া হইতে অসংখ্য গুণ বেশী হইবে। মানুষ কেমন গাফেল যে, দুনিয়ার কয়েক দিনের অবস্থানের জন্য যাহা কিছু করে অনন্ত অসীমকাল যথায় থাকিতে হইবে সেই সমস্ত জায়গার জন্য সেই পরিমাণও করে না।

১৯. হাকিকী জিকরুল্লাহ’ প্রকৃত আল্লাহর জিকির ইহা যে, মানুষ…

তিনি বলেন–

‘হাকিকী জিকরুল্লাহ’ প্রকৃত আল্লাহর জিকির ইহা যে, মানুষ যে স্থলে, যে অবস্থায়, যে কার্যে থাকে উহা সম্বন্ধে আল্লাহর যে আহ্‌কাম ও আদেশসমূহ আছে তাহা বিশেষ লক্ষ্য রাখিয়া পালন করে। আমি আমার দোস্তদিগকেও এই ‘জিকিরের’ বেশী তাকিদ করিয়া থাকি।

২০. মানুষের অন্যান্য সৃষ্ট জগতের উপর যে বিশেষত্ব ও…

তিনি বলেন–

মানুষের অন্যান্য সৃষ্ট জগতের উপর যে বিশেষত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব আছে, তাহাতে তাহার জবানের (জিহ্বার) বিশেষ দখল বা অধিকার আছে। কাজেই মানুষ যদি তাহার রসনার দ্বারা ভাল কথা বলিয়া থাকে এবং ভাল কাজে উহাকে ব্যবহার করে তাহা হইলে তাহার এই বিশেষত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব ভালর মধ্যে হইবে। আর যদি জিহবাকে সে খারাপের যন্ত্র হিসাবে ব্যবহার করে যেমন মন্দ কথা বলে, অন্যায়ভাবে লোককে কষ্ট দেয় তাহা হইলে এই জবানের দ্বারাই খারাপের মধ্যে তাহার বিশেষত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব হইবে। এমনকি কোন কোন সময় এই জিহবাই মানুষকে কুকুর ও শুকুর হইতেও অধম করিয়া দিবে। হাদীছ শরীফে আছে–

و هل يكب الناس في النار على مناخرهم الا حصائد السنتهم

“মানুষকে তাহার জিহ্বাই (আজেবাজে কথাই) অধোমুখে দোজখে ঢালিবে।” আয় আল্লাহ! আমাদিগকে হেফাজত কর!!


সূচিপত্র  |  পরের কিস্তি (দ্বিতীয় কিস্তি) →

মূল বই: মালফুজাত (নীতি-কথা) – হযরতজী মাওলানা ইলিয়াস (রহঃ)। সংকলন: মাওলানা মুহাম্মদ মনজুর নোমানী। অনুবাদ: ডক্টর মোহাম্মদ ছানাউল্লাহ (ব্যারিষ্টার)। প্রকাশক: মোহাম্মদী লাইব্রেরী, চকবাজার, ঢাকা।

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *