মালফুজাতে হযরতজী ইলিয়াস (রহঃ) – তৃতীয় কিস্তি: মলফুজ ২৪–৩৫
হযরতজী মাওলানা মুহাম্মদ ইলিয়াস কান্ধলভী (রহঃ)-এর বাণী সংকলন মালফুজাত (নীতি-কথা) – হযরতজী মাওলানা ইলিয়াস (রহঃ) বইয়ের তৃতীয় কিস্তি (মলফুজ ২৪ থেকে ৩৫)। সম্পূর্ণ সূচিপত্র দেখুন।
সংকলন: মাওলানা মুহাম্মদ মনজুর নোমানী। অনুবাদ: ডক্টর মোহাম্মদ ছানাউল্লাহ (ব্যারিষ্টার)। প্রকাশক: মোহাম্মদী লাইব্রেরী, চকবাজার, ঢাকা।
[এই বারের সমস্ত মলফুজাত ঐ দ্বীনি আন্দোলন ও দাওয়াত সম্বন্ধে– যাহার জন্য হযরত মাওলানা নিজেকে বিলীন করিয়া দিয়াছিলেন, কাজেই তাহা এই দাওয়াতের কর্মীদের মনেযোগ সহকারে পড়া উচিত।]
এই কিস্তিতে যা আছে
- ২৪. আমাদের এই আন্দোলনের আসল মকছুদ বা উদ্দেশ্য মুসলমানকে…
- ২৫. আমাদের কর্মীদের এই কথা খুব দৃঢ়ভাবে মনে রাখিতে…
- ২৬. সমস্ত কর্মীদের বুঝাইয়া লও যে, এই পথে যেন…
- ২৭. তাবলীগ ও দাওয়াতের সময় বিশেষ করিয়া নিজের অন্তর্দৃষ্টি…
- ২৮. কেমন ভুল প্রথা প্রচলিত হইয়াছে। অন্য লোকে আমাদের…
- ২৯. আমাদের সাধারণ কর্মীরা যেখানেই যাউক না কেন সেখানকার…
- ৩০. যদি কোথাও দেখা যায় যে, ঐ জায়গার ওলামা…
- ৩১. তবলীগী উছুলের মধ্যে ইহাও একটি যে, আম খেতাবে…
- ৩২. কথার দ্বারা খোশ হওয়া আমাদের অভ্যাস হইয়া গিয়াছে…
- ৩৩. সময়– চলন্ত রেলগাড়ী; ঘন্টা, মিনিট ও সেকেণ্ড উহার…
- ৩৪. যতই উত্তম হইতে উত্তম কাজ করিবার তওফিক (সম্বল…
- ৩৫. একদিন ফজরের নামাজের পর নিজামুদ্দিনের মসজিদে বহু তবলীগী…
২৪. আমাদের এই আন্দোলনের আসল মকছুদ বা উদ্দেশ্য মুসলমানকে…
এক বৈঠকে তিনি বলেন–
আমাদের এই আন্দোলনের আসল মকছুদ বা উদ্দেশ্য মুসলমানকে ঐ সমস্ত জিনিস শিক্ষা দেওয়া যাহা রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিয়া আসিয়াছিলেন। অর্থাৎ ইসলামের পূর্ণ এলমী ও আমলী নিজাম উম্মতের মধ্যে পুনর্জীবিত করা। ইহা তো আমাদের আসল উদ্দেশ্য; বাকী রহিল তবলীগী কাফেলার ঘুরাফেরা ও ‘গাশ্ত’ করা, ইহা ঐ উদ্দেশ্য সাধনের প্রাথমিক উপায়। কলেমা, নামাজের তালীম ও তলকীন আমাদের পূর্ণ পাঠ্য-তালিকার ক, খ, গ মাত্র।
ইহাও প্রকাশ্য কথা যে, আমাদের কাফেলা সম্পূর্ণ কাজ করিতে পারিবে না। তাহারা শুধু মাত্র নিম্নলিখিত কাজ পপ্রত্যেক জায়গায় পৌঁছাইয়া নিজের চেষ্টা ও কষ্ট দ্বারা এক আলোড়ন ও চেতনা সঞ্চার করিতে পারে মাত্র। গাফেলদিগকে স্থানীয় দ্বীনদারদের সঙ্গে মিলাইয়া দিবার ও দ্বীনের দরদী চিন্তানায়কদের বেচারা আওয়ামদের সংশোধনের কাজে লাগাইয়া দিবার কোশেশ করিতে পারে। প্রত্যেক জায়গায় আছলী কাজ তো স্থানীয় কর্মীরাই করিতে পারে। আওয়ামদের বেশী ফায়দা নিজ জায়গার দ্বীনদারদের নিকট হইতেই পৌঁছিতে পারে; অবশ্য ইহার তরীকা আমাদের ঐ সমস্ত লোক হইতে শিক্ষা করা যায় যাহারা বহুদিন হইতে এই তরীকার ফায়দা দেওয়া নেওয়া ও শিক্ষা দেওয়া নেওয়ার কাজ সাফল্যের সহিত করিয়াছে ও বহুলাংশে ইহাকে নিজের আয়ত্বে আনিয়াছে।
২৫. আমাদের কর্মীদের এই কথা খুব দৃঢ়ভাবে মনে রাখিতে…
এক বৈঠকে তিনি বলেন–
আমাদের কর্মীদের এই কথা খুব দৃঢ়ভাবে মনে রাখিতে হইবে যে, যদি কোথাও দাওয়াত ও তবলীগ কবুল করা না হয়; বরং উল্টাদিকে তাহাদিগকে গালিগালাজ করা হয় ও নানাপ্রকারের এলজাম দেওয়া হয় তাহা হইলে তাহারা যেন নিরাশ ও পেরেশান না হয়। এইরূপ স্থলে তাহাদের স্মরণ করা উচিত যে, ইহা পয়গাস্বরদের বিশেষতঃ পয়গাম্বরদের ছরদারের খাছ সুন্নত ও ওরাছাত (উত্তারাধিকারী সূত্রে প্রাপ্ত সাধের সামগ্রী)। আল্লাহর রাস্তায় বে-ইজ্জত হওয়া কয়জনের ভাগ্যে জুটে? আবার যে জায়গায় তাহাদের সসম্মানে সাদর সম্ভাষণ জানানো হয়, তাহাদের দাওয়াত ও তবলীগের কদর করা হয়, আগ্রহের সহিত তাহাদের কথা শুনা হয় ও মানা হয় তাহা কেবলমাত্র আল্লাহ পাকের নেয়ামত ও দান বলিয়া মনে করিবে ও কোন অবস্থায়ই না-কদরী করিবে না। এই সমস্ত দ্বীনের তালেবদের খেদমত ও শিক্ষাকে আল্লাহর এই এহছানের খাছ শুকরিয়া হিসাবে আদায় করিবে– যদিও তাহারা অতি নিম্ন শ্রেণীর লোকও হয়।
عَبَسَ وَتَوَلّٰى اَنْ جَاءَهُ الْاَعْمٰى
“একজন অন্ধ তাহার নিকট আসিল বলিয়া সে ভ্রূকুটী করিল ও চলিয়া গেল।”
কোরআন পাকের এই আয়াতে আমাদিগকে এই শিক্ষা দিয়াছে। হাঁ, অবশ্য এই অবস্থায় নিজের নফছের ফেরেব হইতেও ডরাইতে থাকিবে, নফছ যেন ইহাকে (সাদর সম্ভাষণ ও গ্রহণকে) নিজের কামাল বলিয়া না বুঝে, তদুপরি এই অবস্থায় ‘পীর পরস্তীর ফেৎনার’ ও অত্যধিক সম্ভাবনা আছে। এই জন্য ইহা হইতে বিশেষভাবে খবরদার থাকিবে।
২৬. সমস্ত কর্মীদের বুঝাইয়া লও যে, এই পথে যেন…
এক বৈঠকে তিনি বলেন–
সমস্ত কর্মীদের বুঝাইয়া লও যে, এই পথে যেন বালা মছিবত খোদা হইতে কখনও না চাহে। (বান্দাকে সকল সময়ই আল্লাহর নিকট হইতে সুখ স্বাচ্ছন্দ চাওয়া উচিত।) কিন্তু আল্লাহ পাক যদি এই রাস্তায় বালা মুছিবত পাঠাইয়া দেন তাহা হইলে উহাকে আল্লাহর রহমত ও গোনাহ মাফের ও দরজা বোলন্দের অছিলা (হিসাবে গ্রহণ করিবে) বলিয়া মনে করিবে। আল্লাহর রাস্তায় এই প্রকারের আপদ-বিপদ তো নবী, ছিদ্দিক ও আল্লাহর সান্নিধ্য-প্রাপ্তদের খাছ খাদ্য।
২৭. তাবলীগ ও দাওয়াতের সময় বিশেষ করিয়া নিজের অন্তর্দৃষ্টি…
এক বৈঠকে তিনি বলেন–
তাবলীগ ও দাওয়াতের সময় বিশেষ করিয়া নিজের অন্তর্দৃষ্টি শ্রোতাদের প্রতি না রাখিয়া আল্লাহ পাকের দিকে নিবন্ধ রাখা উচিত। মনে করিবে যে, ঐ সময় আমাদের ধ্যান ধারণা এইরূপ হওয়া চাই যে, আমরা নিজের ইচ্ছামত নিজের কোন কাজের জন্য বাহির হই নাই; বরং আল্লাহর আদেশে আল্লাহর কাজের জন্য বাহির হইয়াছি। শ্রোতাদের (শুনার ও আমলের) তওফীকও ঐ আল্লাহরই হাতে। যখন এই সময় এইরূপ ধ্যান হইবে তখন খোদা চাহে তো শ্রোতাদের অন্যায় ব্যবহারে রাগও আসিবে না, সাহসও হারাইবে না।
২৮. কেমন ভুল প্রথা প্রচলিত হইয়াছে। অন্য লোকে আমাদের…
তিনি বলেন–
কেমন ভুল প্রথা প্রচলিত হইয়াছে। অন্য লোকে আমাদের কথা মানিয়া লইলে আমরা উহাকে আমাদের নিজের কৃতকার্যতা বলিয়া মনে করি। আর না মানিলে তাহা আমাদের অকৃতকার্যতা বলিয়া বুঝি। অথচ এই পথে এইরূপ খেয়াল করা একেবারেই ভুল। অন্যের মানা না মানা তো উহাদের কার্য। উহাদের কোন কার্য দ্বারা আমরা কেন কৃতকার্য বা অকৃতকার্য বলিয়া অভিহিত হইব? আমাদের কৃতকার্যতা ইহাই যে, আমরা নিজের কাজ পুরাপুরি করিয়া দেই, অন্যেরা না মানিলে তাহা তাহাদের অকৃতকার্যতা। উহারা না মানিলে আমরা কেন অকৃতকার্য হইব? মানুষ ভুলিয়া গিয়াছে, তাহারা মানাইয়া দেওয়াকে (যাহা প্রকৃত প্রস্তাবে খোদার কাজ) নিজের কাজ ও নিজের জিম্মাদারী বলিয়া বুঝিয়া নিয়াছে; অথচ আমাদের জিম্মাদারী সুন্দরভাবে শক্তি প্রয়োগ করা। মানাইয়া দেওয়ার কাজ তো পয়গম্বরদেরও সোপর্দ করা হয় নাই। অবশ্য না মানিলে এই শিক্ষা লইতে হইবে যে, সম্ভবতঃ আমাদের কোশেশে শিথিলতা রহিয়া গিয়াছে, আমরা হক আদায় করিতে পারি নাই, যার জন্য আল্লাহ পাক এই কুফল আমাদিগকে দেখাইলেন। তৎপর নিজের কোশেশের দোয়া ও আল্লাহর সাহায্য মদদ চাওয়ার পরিমাণ ও কইফিয়ৎ আরও বাড়াইয়া দেওয়ার নিয়ম করিয়া লওয়া চাই।
২৯. আমাদের সাধারণ কর্মীরা যেখানেই যাউক না কেন সেখানকার…
তিনি বলেন–
আমাদের সাধারণ কর্মীরা যেখানেই যাউক না কেন সেখানকার হাক্কানী ওলামা ও দ্বীনদারদের খেদমতে হাজির হইবার কোশেশ করিবে। কিন্তু ইহা শুধু ফায়দা নেওয়ার নিয়তে হইবে। এই সমস্ত বোজর্গদের সোজাসোজি এই কাজের দাওয়াত দিতে নাই। ইহারা যেই সমস্ত দ্বীনি কাজে লাগিয়া আছেন ঐ সমস্তকে তাহারা খুব ভাল করিয়া জানেন এবং ঐ সমস্তের উপকারিতারও তাহাদের অভিজ্ঞতা আছে। তোমরা এই কাজ ভালমতে তাহাদিগকে বুঝাইতে পারিবে না। অর্থাৎ তোমরা নিজের কথার দ্বারা ইহাদিগের একীন জন্মাইতে পারিবে না যে, এই কাজ তাহাদের অন্যান্য দ্বীনি কাজ হইতে দ্বীনের জন্য বেশী উপকারী ও ফলপ্রসূ।
ফল এই দাঁড়াইবে যে, তাহারা তোমাদের কথা মানিবে না, আর একবার ‘না’ হইয়া গেলে তাহা পরে ‘হাঁ’-এ পরিবর্তিত হওয়া কঠিন হইয়া দাঁড়াইবে। তখন ইহার এক মন্দ ফল এই হইবে যে, তাঁহাদের অধীনস্থ আওয়ামও তোমাদের কথা শুনিবে না। আবার ইহাও সম্ভব যে, তোমাদের নিজের মধ্যেই সন্দেহের সঞ্চার হইয়া যাইবে। এইজন্য তাহাদের নিকট শুধু ফায়দা নেওয়ার জন্য যাওয়া চাই। কিন্তু তাহাদের চতুরপার্শ্বে খুব পরিশ্রম করিয়া কাজ করিতে হইবে ও অত্যাধিকভাবে উছুলসমূহ মানিয়া চলিবার চেষ্টা করিতে হইবে।
এইরূপে আশা করা যায় যে, তোমাদের কাজের ও তাহার ফলের খবর তাহাদের নিকট আপনা আপনি পৌঁছিতে থাকিবে। আর এই সমস্ত ফল তাহাদের জন্য (দাওয়াতকারীও) আহবায়ক ও দৃষ্টি আকর্ষক হইবে। ইহার পর তাহারা নিজেরাই আপনা হইতে যখন তোমাদের প্রতি ও তোমাদের কাজের প্রতি আকৃষ্ট হইবেন তখন তাহাদিগকে তত্ত্বাবধায়ক ও পৃষ্ঠপোষক হওয়ার জন্য অনুরোধ করিবে ও তাহাদের দ্বীনি ইজ্জত সম্মান বজায় রাখিয়া তোমাদের নিজের কথা তাহাদিগকে বলিবে।
৩০. যদি কোথাও দেখা যায় যে, ঐ জায়গার ওলামা…
তিনি বলেন–
যদি কোথাও দেখা যায় যে, ঐ জায়গার ওলামা ও দ্বীনদার লোক সহানুভূতির সহিত এই কাজে শামিল হয় না তখন তাহাদের প্রতি খারাপ ধারণা পোষণ করিও না; বরং ইহা বুঝিয়া লইবে যে, এই বোজর্গদের নিকট এখনও এই কাজের পূর্ণ ‘হাকিকত’ (প্রকৃত স্বরূপ) উদঘাটিত হয় নাই। ইহাও বুঝিয়া লইবে যে, তাঁহারা দ্বীনের খাছ খাদেম বলিয়া শয়তান তাঁহাদের বড় দুশমন (চোর মালদারের কাছেই তো আসে)। এতদ্ব্যতীত ইহাই বুঝিবার কথা যে নগণ্য ও হীন দুনিয়ার মত্ত দুনিয়াদারেরা যখন তাহাদের দুনিয়ার কাজ কারবারের উপর এই কাজে স্থান দিতে পারে না ও তাহাদের ব্যবসা-বাণিজ্য ছাড়িয়া এই কাজে লাগিতে পারে না তখন দ্বীনদার লোকেরা তাহাদের উঁচু দরের সর্বশ্রেষ্ঠ দ্বীনি কাজ সমূহ এই কাজের জন্য এত সহজে কিরূপে ছাড়িতে পারেন। আরেফগণ (সূক্ষ্মদর্শীরা) বলিয়াছেন, “জুলমানী পর্দা সমূহ নূরাণী পর্দাগুলি (আঁধারের পর্দা আলোর পর্দা) হইতে বেশী শক্ত ও মজবুত হইয়া থাকে।”
৩১. তবলীগী উছুলের মধ্যে ইহাও একটি যে, আম খেতাবে…
এক বৈঠকে তিনি বলেন–
তবলীগী উছুলের মধ্যে ইহাও একটি যে, আম খেতাবে (সভায়) সর্বসাধারণকে লক্ষ্য করিয়া কথা বলিবার সময় শক্তভাবে বলিবে। আর খাছ খেতাব বিশেষ লোককে লক্ষ্য করিয়া কথা বলিবার সময় নরমভাবে বলিবে; বরং (খাছ) নির্দিষ্ট ব্যক্তির সংশোধনের জন্যও যথাসম্ভব সর্বসাধারণকে লক্ষ্য করিয়া কথা বলিবে। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তির অপরাধের সংশোধনের ও শাস্তির জন্যও প্রায় “ঐ সমস্ত লোকের কি হইয়াছে যে ……” বলিয়া অনির্দিষ্টভাবে কথা বলিতেন।
৩২. কথার দ্বারা খোশ হওয়া আমাদের অভ্যাস হইয়া গিয়াছে…
এক বৈঠকে তিনি বলেন–
কথার দ্বারা খোশ হওয়া আমাদের অভ্যাস হইয়া গিয়াছে। ভাল কাজের কথা বলাকে আমরা ভাল কাজ করার স্থান দিয়া থাকি। এই অভ্যাসকে ছাড়, কাজ কর, কাজ কর।
কাজ কর কথা ছাড় কথা নহে সার।
ইহ-পরকালে কাজ হইবে সুসার।
৩৩. সময়– চলন্ত রেলগাড়ী; ঘন্টা, মিনিট ও সেকেণ্ড উহার…
এক বৈঠকে তিনি বলেন–
সময়– চলন্ত রেলগাড়ী; ঘন্টা, মিনিট ও সেকেণ্ড উহার কামরা। আমাদের কাজ-কর্ম উহাতে বসিবার প্যাসিঞ্জার স্বরূপ। আমাদের দুনিয়ার বস্তুবাহী হীন কাজ-কর্ম আমাদের জীবনের রেলগাড়ীর ঐ সমস্ত কামরাগুলির উপর এমন জবর দখল করিয়াছে যে, আখেরাতের শরীফ (ভদ্র) কাজ-কর্মকে আসিতে দেয় না। আমাদের কাজ ইহা যে, দৃঢ়তার সহিত ঐ সমস্ত অভদ্র ও হীন কাজ-কর্মের জায়গায় শরীফ ও ভদ্র কাজ কর্মের স্থান করিয়া দেই যাহাতে খোদা রাজী হইবেন ও আখেরাতে উপকার হইবে। যাহারা খোদাকে রাজী করিবে ও আমাদের আখেরাত বানাইবে (আখেরাতে উপকারে আসিবে)।
৩৪. যতই উত্তম হইতে উত্তম কাজ করিবার তওফিক (সম্বল…
এক বৈঠকে তিনি বলেন–
যতই উত্তম হইতে উত্তম কাজ করিবার তওফিক (সম্বল সামর্থ) আল্লাহ পাক দেউক না কেন সদাসর্বদা উহার পরিসমাপ্তি (খাতেমা) এস্তেগফারের (খোদার নিকট ক্ষমা চাওয়ার) উপরই করিবে।
ফলকথা, আমাদের প্রত্যেক কাজের শেষ অংশ এস্তেগফার (ক্ষমা চাওয়া) হওয়া চাই। অর্থাৎ এই কাজ করিতে নিশ্চয় কোন খাতা (কছুর) হইয়াছে এই চিন্তা করিয়া সেই খাতা (কছুরের) মাফীর জন্য আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাহিবে। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাজ শেষ করিয়াও আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাহিতেন। সুতরাং তবলীগের প্রত্যেক কাজ সর্বদা এস্তেগফারের (ক্ষমা চাওয়ার) উপর খতম (শেষ) করিতে হইবে। বান্দা দ্বারা কিছুতেই আল্লাহর কাজের হক আদায় হইতে পারে না। তদুপরি এক কাজ করিতে থাকিলে আরও অনেক কাজে ব্যাঘাত ঘটিয়া থাকে। সুতরাং সেই সমস্ত কাজের ক্ষতিপূরণের জন্য প্রত্যেক নেক (ভাল) কাজ শেষ করিয়া এস্তেগ্ফার করা (ক্ষমা চাওয়া) উচিত।
৩৫. একদিন ফজরের নামাজের পর নিজামুদ্দিনের মসজিদে বহু তবলীগী…
একদিন ফজরের নামাজের পর নিজামুদ্দিনের মসজিদে বহু তবলীগী কর্মীদের সমাগম হইয়াছিল। কিন্তু হযরত মাওলানার দুর্বলতা এত বেশী হইয়াছিল যে, বিছানার উপর শুইয়া শুইয়াও উচ্চৈঃস্বরে দুই চার কথা বলিবার শক্তি ছিল না। এক খাছ খাদেমকে বিশেষভাবে ডাকাইয়া তাহার মধ্যস্থতায় সকলকে বলিয়াছিলেন–
“আপনারা যদি তবলীগী কাজের সহিত দ্বীনের এল্ম ও আল্লাহর জিকিরের প্রতি বিশেষ মনোযোগ না দেন তাহা হইলে আপনাদের ঘুরাফিরা, চেষ্টা চরিত ও কষ্ট মেহনত সমস্তই বেকার হইবে। ধরিয়া লউন যে, এই এল্ম ও জিকির দুই বাহু যাহা ব্যতীত তবলীগী আকাশে কেহ উড়িতে পারিবে না; বরং বিশেষ ভয় ও সংশয়ের কথা যে, এল্ম ও জিকির হইতে গাফেল হইলে এই চেষ্টা চরিত ও কষ্ট মেহনত, ফেৎনা ও গোমরাহীর এক নূতন দরওয়াজায় পরিণত হইবে। দ্বীনের এলম না হইলে ইসলাম ও ঈমান শুধুমাত্র নাম রছমে পর্যবসিত হইবে। আবার আল্লাহর জিকির ব্যতীত এলম হইলেও তাহা কেবল অন্ধকার (জুলমত) হইবে। তদ্রুপ আবার এলমে দ্বীন ব্যতীত আল্লাহর জিকির বেশী হইলেও তাহাতেও বড় বিপদ আছে। মোটের উপর এলমের মধ্যে জিকির হইতে নূর আসে, আবার দ্বীনের এলম ব্যতীত জিকিরের প্রকৃত সুফল ও বারাকাত পাওয়া যায় না; বরং অনেক সময় এইরূপ মুর্খ ছুফীদিগকে শয়তান নিজের কুকাজে যন্ত্র হিসাবে ব্যবহার করে। কাজেই এই তবলীগী কাজের মধ্যে কোন অবস্থাতেই এলম ও জিকিরকে ভুলিলে চলিবে না, বরং সদাসর্বদাই ইহার জন্য বিশেষ মনোযোগ দিতে হইবে ও যত্ন নিতে হইবে। অন্যথায় আপনাদের এই তবলীগী আন্দোলনও এক ভূয়া ও ভ্রান্ত আন্দোলনে পর্যবসিত হইবে। আর খোদা না করুন আপনারা অতি বড় ক্ষতিগ্রস্ত হইবেন।”
হযরত মাওলানার মতল্ব এই হেদায়েত (উপদেশ) হইতে ইহা ছিল যে, তবলীগী কর্মীরা যেন তবলীগ ও দাওয়াত সম্পর্কিত কষ্ট মেহনত, ছফর ও হিজরত, কুরবানী ও ইছারকেই আসল কাজ বলিয়া মনে না করে; যেমন আজকাল সাধারণতঃ লোকেরা বুঝিয়া থাকে; বরং দ্বীন শিক্ষা দেওয়া ও শিক্ষা করা এবং আল্লাহর জিকিরকে অভ্যাসে পরিণত করা ও এই সমস্তকে নিজের কর্তব্য করিয়া লওয়াকে আপনার প্রয়োজনীয় ফরিজা (কর্তব্য) বলিয়া মনে করে, অন্য কথায় তাহাদিগকে শুধু সিপাহী ও স্বেচ্ছাসেবক হইলে চলিবে না, এলমে দ্বীনের তালেব ও আল্লাহর ইয়াদকারী বান্দাও হইতে হইবে।
← আগের কিস্তি (দ্বিতীয় কিস্তি) | সূচিপত্র | পরের কিস্তি (চতুর্থ কিস্তি) →
মূল বই: মালফুজাত (নীতি-কথা) – হযরতজী মাওলানা ইলিয়াস (রহঃ)। সংকলন: মাওলানা মুহাম্মদ মনজুর নোমানী। অনুবাদ: ডক্টর মোহাম্মদ ছানাউল্লাহ (ব্যারিষ্টার)। প্রকাশক: মোহাম্মদী লাইব্রেরী, চকবাজার, ঢাকা।
