মালফুজাতে হযরতজী ইলিয়াস (রহঃ) – ষষ্ঠ কিস্তি: মলফুজ ৯৬–১১০
হযরতজী মাওলানা মুহাম্মদ ইলিয়াস কান্ধলভী (রহঃ)-এর বাণী সংকলন মালফুজাত (নীতি-কথা) – হযরতজী মাওলানা ইলিয়াস (রহঃ) বইয়ের ষষ্ঠ কিস্তি (মলফুজ ৯৬ থেকে ১১০)। সম্পূর্ণ সূচিপত্র দেখুন।
সংকলন: মাওলানা মুহাম্মদ মনজুর নোমানী। অনুবাদ: ডক্টর মোহাম্মদ ছানাউল্লাহ (ব্যারিষ্টার)। প্রকাশক: মোহাম্মদী লাইব্রেরী, চকবাজার, ঢাকা।
১৩৬৪ হিজরীর মহরম মাসের ‘আল-ফুরকানে’ প্রকাশিত
এই কিস্তিতে যা আছে
- ৯৬. কখন কখন বসিয়া ইহা চিন্তা করা চাই যে…
- ৯৭. যে সমস্ত বোজর্গ সম্বন্ধে এই ধারণা হয় যে…
- ৯৮. কোন কোন বোজর্গের আমাদের এই ঈমানের দাওয়াতের গভীরতা…
- ৯৯. আমি কোন ডাক্তার কবিরাজকে চিকিৎসার জন্য ডাকিলে প্রকৃত…
- ১০০. আমি নিজের স্বাস্থ্যের জন্য ও জীবন রক্ষার জন্য…
- ১০১. আমাদের এই তবলীগের দাওয়াতের এক জরুরী ওছুল ইহা…
- ১০২. আমার ঐ আন্দোলনের দ্বারা প্রত্যেক জায়গার ওলামা ও…
- ১০৩. আমাদের এই কাজকে বুঝিবার ও শিখিবার ছহীহ্ তরতীব…
- ১০৪. এক জরুরত ইহাও যে, এখানে তবলীগীদের এমন একটি…
- ১০৫. আমাদের এই আন্দোলনে নিয়ত ছহীহ্ করিবার বিশেষ প্রয়োজন…
- ১০৬. তবলীগী দাওয়াতের প্রথম আন্দোলনের দুইজন মুখ্লেছ (নিঃস্বার্থ) মেওয়াতী…
- ১০৭. আমাদের উপর তাঁহাদের অনেক বড় হক রহিয়াছে। আমি…
- ১০৮. দ্বীনের জন্য চেষ্টা ও কষ্ট করাতে মুখ্লেছীন ও…
- ১০৯. আজকাল দ্বীন সম্বন্ধে এক ভুল ধারণা সর্বসাধারণের মধ্যে…
- ১১০. নিশ্বয় ছায়েলের জন্য তোমার উপর হক আছে যদিও…
৯৬. কখন কখন বসিয়া ইহা চিন্তা করা চাই যে…
তিনি বলেন–
কখন কখন বসিয়া ইহা চিন্তা করা চাই যে, কোথায় কোথায় আমার প্রভাব প্রতিপত্তি ও জানা-শোনা আছে এবং কোথায় কোথায় আমার দ্বীনি কোশেশ কৃতকার্য হইতে পারে। পুনঃ ফিকির করিবে ঐ সমস্ত জায়গায় এই দ্বীনি দাওয়াত কি কি উপায়ে প্রচার করা যাইবে এবং কোন্ পথে আমাদের বাছিয়া নিতে হইবে, আর ঐ জায়গায় আমাদের কার্য প্রণালী কি হইবে, তৎপর এই সুচিন্তিত পরিকল্পনা অনুযায়ী আল্লাহর উপর ভরসা করিয়া কাজ আরম্ভ করিয়া দেওয়া উচিত।
৯৭. যে সমস্ত বোজর্গ সম্বন্ধে এই ধারণা হয় যে…
যে সমস্ত বোজর্গ সম্বন্ধে এই ধারণা হয় যে, আমরা এই কাজ তাহাদের সুদৃষ্টি করিতে পারিব না তাহা হইলে প্রথমে কিছু সময়ের জন্য তাহাদের খেদমত করিয়া তাহাদের মেজাজ বুঝা এবং তাহাদের সহিত মেলামেশা করিয়া সামঞ্জস্য সৃষ্টি করা চাই। কাজেই প্রথম শুধু খেদমত করা উচিত। কিন্তু এই খেদমতের মধ্যেও তাহাদিগকে আল্লাহর কাজে লাগাইবার নিয়ত রাখা চাই ও আশার সহিত আল্লাহর নিকট দোয়া করিতে থাকা চাই।
৯৮. কোন কোন বোজর্গের আমাদের এই ঈমানের দাওয়াতের গভীরতা…
তিনি বলেন–
কোন কোন বোজর্গের আমাদের এই ঈমানের দাওয়াতের গভীরতা জানা নাই বলিয়া ইহার সহিত মনের (টান) আকর্ষণ নাই। ইহার পরিবর্তে তাহারা দ্বীনের ঐ সমস্ত আহকাম মাছায়েল প্রচলন করাকে বেশী গুরুত্ব দিয়া থাকেন, যাহা মুসলমানেরা পুরাপুরি পালন করে না। যেমন– অমুক ছাহেব ও তাঁহার ভক্তদের দৃষ্টিতে বিশেষ করিয়া শরীয়তের অমুক অমুক খাছ আহ্কামের প্রচলন করা ও বদ্ রছমের (কু-প্রথার) সংশোধন করা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এই হযরতদের সহিত আমাদের কার্য প্রণালী এই প্রকার হওয়া চাই। তাহাদিগকে মেওয়াতে শুধু এই সমস্ত মাছায়েল জারী করিবার জন্য ও কু-প্রথা সংশোধনের জন্যই উঠাইতে হইবে। এখন পর্যন্ত মেওয়াতে মিরাছ বন্টনও ঠিকমত হয় না। শরীয়ত মত মিরাছ বন্টন করার প্রথা খুব কম প্রচলিত হইতে পারিয়াছে। এইরূপ আরও অনেক কু-প্রথা এখন পর্যন্ত প্রচলিত আছে, যেমন এখনও স্বগোত্রে বিবাহ শাদীর প্রচলন হয় নাই। সুতরাং অমুক ছাহেব ও তাহার অনুসরণকারীদের মেওয়াতে এই সমস্ত আহ্কাম প্রচারের জন্য উঠাইতে হইবে। আর তাহাদিগকে ইহাও বলিয়া দিতে হইবে যে, মেওয়াতীরা কিছু পরিমাণে এই তবলীগী দাওয়াতের অনুরক্ত হইয়াছে ও ইহাকে আপন করিয়া নিয়াছে। কাজেই আপনি তাহাদের এই তবলীগী কাজের সামান্য কিছু পৃষ্ঠপোষকতা করিলে আপনার এই বিশেষ সংশোধনের ও কু-প্রথা দূরীকরণের কাজে খোদা চাহে তো তাহাদের অনেক সাহায্য পাইবেন ও তাহাদের মধ্যস্থতায় মেওয়াতে এই সমস্ত আহকাম ও মাছায়েল সহজে প্রচার করিতে ও জাহেলিয়াতের কু-প্রথা সমূহ অনায়াসে সংশোধন করিতে পারিবেন। এইরূপে এই হজরাতদের তোমাদের তবলীগী কাজের গভীরতা ও প্রশস্ততা বুঝিবার ও ইহার কার্যকারিতা ও ফলাফল দেখিবারও সুযোগ মিলিবে। তখন খোদা চাহে তো তাহারা ঐদিকে মনোযোগ দিবেন।
৯৯. আমি কোন ডাক্তার কবিরাজকে চিকিৎসার জন্য ডাকিলে প্রকৃত…
তিনি বলেন–
আমি কোন ডাক্তার কবিরাজকে চিকিৎসার জন্য ডাকিলে প্রকৃত প্রস্তাবে তবলীগী কাজকে সামনে রাখিয়া ডাকি। তাহা দ্বারা নিজের চিকিৎসা করাকেও তাহাকে আল্লাহর কাজে লাগাইবার বাহানা করিতে চাই। এইজন্য কেবল মাত্র ঐ সমস্ত ডাক্তার কবিরাজকে ডাকিবার অনুমতি দেই যাহাদের নিকট এই দ্বীনি দাওয়াতের সম্বন্ধে কিছু কাজের আশা ভরসা রাখি।
১০০. আমি নিজের স্বাস্থ্যের জন্য ও জীবন রক্ষার জন্য…
তিনি বলেন–
আমি নিজের স্বাস্থ্যের জন্য ও জীবন রক্ষার জন্য দাঁড়াইয়া নামাজ না পড়িয়া বসিয়া নামাজ পড়াকে জায়েজ মনে করি; কিন্তু এই দ্বীনি কাজের স্থায়িত্ব ও গঠনের উপর নিজের জীবন রক্ষার খেয়ালকে স্থান দেই না।
১০১. আমাদের এই তবলীগের দাওয়াতের এক জরুরী ওছুল ইহা…
তিনি বলেন–
আমাদের এই তবলীগের দাওয়াতের এক জরুরী ওছুল ইহা যে, (আম খেতাবে) সর্বসাধারণকে সম্বোধন করিবার সময় শক্তভাবে করিতে হইবে, কিন্তু (খাছ খেতাবে) নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে সম্বোধন করিবার সময় অতি নরমভাবে করিতে হইবে। বরং যতদূর সম্ভব লোকের সংশোধনের জন্য সাধারণভাবে সকলকেই সম্বোধন করিয়া বলা উচিত। এমনকি নিজের কোন খাছ সঙ্গীর কোন ভুল দেখিলেও যথাসম্ভব তাহার সংশোধনের কথাও সকলকে লক্ষ্য করিয়াই বলা চাই। ইহাই রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তরিকা ছিল; কেননা তিনি খাছ লোকের ভুলের সংশোধন ও সতর্কী করণের জন্যও “এই সমস্ত লোকের কি হইয়াছে” এইরূপ আম (সাধারণ) কথা ব্যবহার করিতেন। যদি কোথাও খাছ খেতাবেরও জরুরত পড়ে তাহা হইলে নরমী ও মহব্বতের সঙ্গে সঙ্গে ইহার প্রতি দৃষ্টি রাখিতে হইবে যে, তাহাকে যেন তখন তাম্বিহ করা না হয়। এরূপ করিলে অধিকাংশ লোকে জওয়াব দেওয়ার জন্য ও প্রতিবাদ করিবার জন্য প্রস্তুত হইয়া যায়। কাজেই ঐ সময় কিছু না বলিয়া অন্য সময় খুলুছ ও মহব্বতের সহিত তাহার ভুলের জন্য তাহাকে সতর্ক করিয়া দেওয়া উচিত।
১০২. আমার ঐ আন্দোলনের দ্বারা প্রত্যেক জায়গার ওলামা ও…
তিনি বলেন–
আমার ঐ আন্দোলনের দ্বারা প্রত্যেক জায়গার ওলামা ও দ্বীনদার এবং দুনিয়াদারের মধ্যে মেলামেশা ও প্রেম-প্রীতি ভালবাসার মধুর সম্বন্ধ স্থাপন করিতে চাই। তদুপরি ওলামা ও দ্বীনদারের বিভিন্ন দলের মধ্যে পরস্পর সাহায্য মহব্বত ও আত্মীয়তা পয়দা করাও আমাদের দৃষ্টি-পথে আছে, বরং ইহাই আমাদের আসল উদ্দেশ্য। এই দ্বীনি দাওয়াতই খোদা চাহে তো ইহার নিমিত্ত ও অছিলা হইবে। ব্যক্তির মধ্যে ও সমষ্টির মধ্যে মতানৈক্যতা গরজের পার্থক্যতা হইতেই উৎপন্ন হয় ও বর্ধিত হইতে থাকে। আমরা মুসলমানের সমস্ত দলকে এমনভাবে দ্বীনের কাজে লাগাইবার ও দ্বীনের খেদমতকে তাহাদের সর্বোচ্চ মকছুদ বানাইবার জন্য কোশেশ করিতে চাই, যাহাতে তাহাদের মনের গতি ও কর্মপদ্ধতির মধ্যে মিলন সাধিত হয়। কেবলমাত্র ইহাই বৈরীভাবকে মিত্রতায় পরিণত করিতে পারে। দুই ব্যক্তির মধ্যে আপোষ করিয়া দেওয়ার কত বড় পুরস্কার তাহা একবার চিন্তা করিয়া দেখুন। উম্মতের বিভিন্ন শ্রেণীর ও দলের মধ্যে আপোষ করিবার কোশেশের যে পুরস্কার হইবে তাহার পরিমাণ কি কেহ নির্ণয় করিতে পারে?
১০৩. আমাদের এই কাজকে বুঝিবার ও শিখিবার ছহীহ্ তরতীব…
তিনি বলেন–
আমাদের এই কাজকে বুঝিবার ও শিখিবার ছহীহ্ তরতীব এই– প্রথমে কিছুদিন এখানে আসিয়া অবস্থান করিবে ও এখানকার বাসিন্দাদের (তবলীগের পুরাতন কর্মীদের) সহিত কথাবার্তা বলিবে। শুধু আমার সহিত দেখা করিবার ও কথা বলিবার জন্য উদ্গ্রীব হইবে না। অবশ্য যখন আমি নিজে কিছু বলি তাহাও শুনিয়া লইবে। এখানকার আশেপাশে কাজ করিবার জন্যও বাহির হইবে। অর্থাৎ দৈনিক গাশ্তে শরীক হইবে; তৎপর কিছুদিন মেওয়াত গিয়াও কাজের ‘মশক’
করিতে হইবে। ইহার পর নিজের জায়গায় কাজ করিবে।
১০৪. এক জরুরত ইহাও যে, এখানে তবলীগীদের এমন একটি…
এক জরুরত ইহাও যে, এখানে তবলীগীদের এমন একটি মিশ্রিত জমায়াত থাকা চাই যাহাতে প্রত্যেক প্রকারের লোক থাকিবে; ওলামা, আহ্লে জিকির, ইংরেজী শিক্ষিত, সওদাগর ও গরীব সাধারণ লোক সকলই থাকিবে। ইহা দ্বারা আমাদের কার্য পদ্ধতি বুঝিতে ও কার্যতঃ ইহাকে আয়ত্বে আনিতে সাহায্য পাওয়া যাইবে ও আমরা যে বিভিন্ন শ্রেণীর পরস্পরের সাহায্য ও মেলামেশা চাই খোদা চাহে তো তাহারও বুনিয়াদ গড়িয়া উঠিবে।
১০৫. আমাদের এই আন্দোলনে নিয়ত ছহীহ্ করিবার বিশেষ প্রয়োজন…
আমাদের এই আন্দোলনে নিয়ত ছহীহ্ করিবার বিশেষ প্রয়োজন আছে। আল্লাহর হুকুম পালন ও তাঁহার সন্তুষ্টি সাধনই একমাত্র লক্ষ্য হওয়া চাই। যতই এই কাজ শক্তিশালী ও খালেছ (অকৃত্রিম) হইবে ততই পুরস্কার বেশী পাওয়া যাইবে। এই জন্য ইহার সাধারণ নিয়ম এই যে, যখন দ্বীনের জন্য কোরবানী করিবার উপকারিতা ও ফায়দা প্রকাশ্যভাবে চোখের সামনে আসিয়া যায়; তখন পুরস্কার কম হইয়া যায়। কারণ মোটামুটিভাবে তখন উপকারও উদ্দেশ্যে পরিণত হইয়া যায়। দেখুন, মক্কা বিজয়ের পূর্বে জান ও মাল কোরবানী দেওয়ার যে মূল্য ছিল পরে তাহা ছিল না; কেননা মক্কা বিজয়ের পর নিশ্চিত জয় ও রাজ্য রাজত্বের ছবি চোখের সামনে ভাসিয়া উঠিয়াছিল।
لَا يَسْتَوِيْ مِنْكُمْ مَّنْ اَنْفَقَ مِنْ قَبْلِ الْفَتْحِ وَقٰتَلَ ۗ اُولٰٓئِكَ اَعْظَمُ دَرَجَةً مِّنَ الَّذِيْنَ اَنْفَقُوْا مِنْۢ بَعْدُ وَقٰتَلُوْا ۗ وَكُلًّا وَّعَدَ اللّٰهُ الْحُسْنٰى
“তোমাদের মধ্যে যাহারা জয়ের পূর্বে টাকা পয়সা খরচ করিয়াছে ও যুদ্ধ করিয়াছে তাহারা ও যাহারা জয়ের পরে টাকা পয়সা খরচ করিয়াছে ও যুদ্ধ করিয়াছে তাহারা এক সমান নহে। পূর্ববর্তীগণের দরজা বহু বেশী; আর আল্লাহ প্রত্যেককে মঙ্গলের ওয়াদা দিয়াছেন।”
১০৬. তবলীগী দাওয়াতের প্রথম আন্দোলনের দুইজন মুখ্লেছ (নিঃস্বার্থ) মেওয়াতী…
তবলীগী দাওয়াতের প্রথম আন্দোলনের দুইজন মুখ্লেছ (নিঃস্বার্থ) মেওয়াতী কর্মীর প্রতি লক্ষ্য করিয়া তিনি বলেন–
এই তবলীগী কাজের ‘নেছবত’ (সম্বন্ধ) দাওয়াতের জন্য আমার সহিত হইয়াছে। অন্যথায় প্রকৃত প্রস্তাবে ইহার কর্মী এই দুইজন। আমি চাই যে যাহারা এই কাজের জন্য আমাকে মহব্বত করে তাঁহারা যেন অনিচ্ছাসত্ত্বেও মহব্বত করে (তাহাদের প্রতিও সুদৃষ্টি দেয়, যদি ইহা করিতে তাহাদের দিলকে মজবুরও করিতে হয়)। তাহাদের সহিত মহব্বত ও তাহাদের খেদমত করা কবুলিয়াতের অছিলা (আল্লাহর নিকট গ্রহণীয় হইবার উপায়) হইবে।
১০৭. আমাদের উপর তাঁহাদের অনেক বড় হক রহিয়াছে। আমি…
এ সম্বন্ধে তিনি আরও বলেন–
আমাদের উপর তাঁহাদের অনেক বড় হক রহিয়াছে। আমি তাঁহাদের হক আদায় করিতে পারি নাই। আমাকে যাহারা মহব্বত করেন তাহারা যেন তাহাদের হক আদায় করেন।
১০৮. দ্বীনের জন্য চেষ্টা ও কষ্ট করাতে মুখ্লেছীন ও…
তিনি বলেন–
দ্বীনের জন্য চেষ্টা ও কষ্ট করাতে মুখ্লেছীন ও ছাদেকীনদের অংশ শুধু আল্লাহ ও রাসূল ও তাহাদের সন্তুষ্টি সাধনই যথেষ্ট। যখন জয় আসে ও মাল দৌলত পাওয়া যায় তখন দুর্বলদেরও যাহাদের অন্তরকে আকৃষ্ট করার জরুরত আছে তাহাদের খেয়াল প্রথমে করা উচিত। এই নীতি হিসাবে আমি বলি যে, যাহারা এখনও আমাদের কাজের হাকিকত বুঝে নাই বলিয়াই এ কাজে উৎসাহের সহিত যোগদান করে নাই, তাহাদিগকে দাওয়াত দেওয়া হইলে তাহাদের রাস্তা খরচ প্রভৃতির ফিকির করিতে হইবে ও তাহাদিগকে সাধ্যমত খেদমত ও আরাম দেওয়ার বন্দোবস্ত করিতে হইবে। আর যে সমস্ত নিঃস্বার্থ ব্যক্তি এই কাজের হাকিকত বুঝিয়া এই কাজে আত্মনিয়োগ করিয়াছেন তাঁহাদের জন্য এই সমস্ত বিষয়ের চিন্তা ভাবনার দরকার নাই।
১০৯. আজকাল দ্বীন সম্বন্ধে এক ভুল ধারণা সর্বসাধারণের মধ্যে…
তিনি বলেন–
আজকাল দ্বীন সম্বন্ধে এক ভুল ধারণা সর্বসাধারণের মধ্যে বদ্ধমূল হইয়া গিয়াছে। প্রাথমিক বিষয়সমূহকে শেষ বিষয়সমূহের ও অছিলাগুলিকে আসল উদ্দেশ্যের স্থান দেওয়া হইতেছে। গভীরভাবে চিন্তা করিলে জানিতে পারিবে যে, দ্বীনের প্রত্যেক শাখা-প্রশাখায় এই ভুল ধারণা প্রবেশ করিয়াছে ও শতসহস্র খারাবী ইহা হইতে পয়দা হইতেছে।
১১০. নিশ্বয় ছায়েলের জন্য তোমার উপর হক আছে যদিও…
তিনি বলেন–
ان للسائل عليك حقا و ان جاء على الفرس
“নিশ্বয় ছায়েলের জন্য তোমার উপর হক আছে যদিও সে ঘোড়ায় চড়িয়া আসে।”
এই হাদীছকে সাধারণতঃ ভুল বুঝা হয়। বুঝান হয় যে, ছায়েল যে প্রকারের ও যে অবস্থারই হউক না কেন সে যাহা চায় তাহাকে তাহা দেওয়া উচিত। অথচ ইহা ভুল কথা; বরং হাদীছের অর্থ মাত্র এই যে, তাহার তোমার উপর হক আছে, তাহার সহিত যতোপযুক্ত শুভাকাঙ্ক্ষী ও সহানুভূতিপূর্ণ ব্যবহার কর।
অহঙ্কার ও তুচ্ছ্য তাচ্ছিল্যের সহিত ব্যবহার করিও না। যেমন, কোরআনে আছেঃ
وَاَمَّا السَّاۤئِلَ فَلَا تَنْهَرْ
“আর ছায়েলকে বড় কথা বলিও না।”
এখন এই খায়েরখাহী (শুভাকাঙ্ক্ষী) কখন কখন এইরূপ হইবে যে, তাহার প্রার্থনার বস্তুকে দিয়া দেওয়া, আবার কখন কখন এইরূপ হইবে যে, তাহাকে ভিক্ষা করার বেইজ্জতী হইতে বাঁচিবার জন্য নছিহত করা ও জীবিকা-নির্বাহের কোন বিহিত ব্যবস্থা তাহাকে দেখাইয়া দেওয়া ও যথাসম্ভব এই বিষয়ে তাহাকে সাহায্য মদদ করা। যেমন, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন কোন ছায়েলের সহিত করিয়াছেন। এমনকি তাহার খাওয়ার পেয়ালা পর্যন্ত নীলাম করাইয়া তৎমূল্য দ্বারা কুড়াল খরিদ করাইয়া দিয়াছেন ও বলিয়াছেন, “জঙ্গল হইতে লাকড়ী কাটিয়া বিক্রি করিয়া নিজের জীবিকানির্বাহ কর।”
সুতরাং ভিক্ষুক যদি নাচার ও নিরুপায় না হয়; বরং কিছু কাজকর্ম করিয়া খাওয়ার শক্তি রাখে তাহা হইলে তাহার হক এই যে, হেকমতের সহিত তাহাকে ছওয়াল হইতে বাঁচাইয়া কোন কাজে লাগাইবার কোশেশ করা।
এই ব্যাপারে তিনি আরও বলেন– কোরআন হাদীছের অর্থ যদি রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কার্যপদ্ধতির আলোতে বুঝিবার চেষ্টা করা হয়; তাহা হইলে খোদা চাহে তো তখনও ভুল বুঝাবুঝি হইবে না।
← আগের কিস্তি (পঞ্চম কিস্তি) | সূচিপত্র | পরের কিস্তি (সপ্তম কিস্তি) →
মূল বই: মালফুজাত (নীতি-কথা) – হযরতজী মাওলানা ইলিয়াস (রহঃ)। সংকলন: মাওলানা মুহাম্মদ মনজুর নোমানী। অনুবাদ: ডক্টর মোহাম্মদ ছানাউল্লাহ (ব্যারিষ্টার)। প্রকাশক: মোহাম্মদী লাইব্রেরী, চকবাজার, ঢাকা।
