মালফুজাতে হযরতজী ইলিয়াস (রহঃ) – চতুর্থ কিস্তি: মলফুজ ৩৬–৬৫
হযরতজী মাওলানা মুহাম্মদ ইলিয়াস কান্ধলভী (রহঃ)-এর বাণী সংকলন মালফুজাত (নীতি-কথা) – হযরতজী মাওলানা ইলিয়াস (রহঃ) বইয়ের চতুর্থ কিস্তি (মলফুজ ৩৬ থেকে ৬৫)। সম্পূর্ণ সূচিপত্র দেখুন।
সংকলন: মাওলানা মুহাম্মদ মনজুর নোমানী। অনুবাদ: ডক্টর মোহাম্মদ ছানাউল্লাহ (ব্যারিষ্টার)। প্রকাশক: মোহাম্মদী লাইব্রেরী, চকবাজার, ঢাকা।
এই কিস্তির মলফুজাতগুলি হযরত মাওলানা জাফর আহমদ ওছমানী থানবী ছাহেব মাদ্দাজিলুহুম লিখিয়াছেন।
এই কিস্তিতে যা আছে
- ৩৬. হযরত মাওলানা জাফর আহমদ ছাহেব বলেন যে, শেষবার…
- ৩৭. এক বৈঠকে তিনি বলেন– হাদীছে আছেঃ
- ৩৮. মানুষ আমার তবলীগের বরকত দেখিয়া মনে করে যে…
- ৩৯. একদিন জুমার পূর্বে দিল্লীর এসেম্বলী মসজিদে আমার বয়ান…
- ৪০. আমাদের তবলীগের আসল উদ্দেশ্য শয়তান হইতে সরাইয়া আল্লাহর…
- ৪১. মাওলানা! আমাদের তবলীগে এলম ও জিকিরকে বিশেষ গুরুত্ব…
- ৪২. মওলানা ছৈয়দ আবুল হাছান আলী নদবীর এক চিঠিতে…
- ৪৩. মাওলানা! আমাদের তবলীগের সার এই যে, সাধারণ দ্বীনদার…
- ৪৪. একবার তিনি বলেন– হাদীছে আছেঃ
- ৪৫. মওলানা! আল্লাহর আহকামের অনুসন্ধান করা আবশ্যক। সব সময়…
- ৪৬. নামাজের পূর্বে কিছুক্ষণ নামাজের মোরাকাবা করা উচিত। যে…
- ৪৭. তবলীগী কর্মীদের নিজের অন্তরে (কলবে) প্রশস্ততা পয়দা করা…
- ৪৮. আমাদের ছরদার রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইসলামের প্রাথমিক…
- ৪৯. একবার তিনি বলেন– আমি প্রথমে এইরূপে জিকিরের তালিম…
- ৫০. স্বপ্ন নবুয়তের ৪৬ অংশের এক অংশ। কোন কোন…
- ৫১. জাকাতের দরজা হাদিয়া হইতে নিম্নে। এই জন্যই রাসূলুল্লাহ…
- ৫২. মুসলমানদের চার নিয়তে ওলামাদের খেদমত করা উচিতঃ
- ৫৩. মুসলমানগণ দোয়া হইতে বহুত গাফেল। আবার যাহারা দোয়া…
- ৫৪. যে সমস্ত জমায়াত দেওবন্দ, ছাহারানপূর প্রভৃতি জায়গায় যাইতেছে…
- ৫৫. একদিন আমি আগন্তুক মেহমানদের সহিত কথাবার্তায় বেশী ব্যস্ত…
- ৫৬. হযরত মওলানা থানভী রহমাতুল্লাহি আলাইহি অনেক বড় কাজ…
- ৫৭. হযরত মাওলানা থানবী (রহঃ)-এর মুরিদান আমার নিকট অতি…
- ৫৮. তবলীগের কাজের জন্য ছৈয়দদের বিশেষ কোশেশ করিয়া উঠাইতে…
- ৫৯. যদি কোন মুসলমানের কাহারও সহিত আল্লাহর ওয়াস্তে মহব্বত…
- ৬০. মাওলানা! ওলামাগণ এদিকে আসেন না, আমি কি করিব?…
- ৬১. ইসলামে এক প্রশস্ততার দরজা আছে, ইহা এতই প্রশস্ত…
- ৬২. দুইটি জিনিসের জন্য আমি বড়ই চিন্তিত। এই দুইটির…
- ৬৩. এলম হইতে আমল ও আমল হইতে জিকির পয়দা…
- ৬৪. লোকদিগকে হাদিয়া, ছদকা ও করজ দেওয়ার ফজিলত সমূহ…
- ৬৫. আমার মনে আমার উপর ‘ইস্তিদ্রাজের’ (আজাব বা শাস্তি…
৩৬. হযরত মাওলানা জাফর আহমদ ছাহেব বলেন যে, শেষবার…
হযরত মাওলানা জাফর আহমদ ছাহেব বলেন যে, শেষবার যখন আমি জুনের মধ্যভাগে খেদমতে হাজির হইয়াছিলাম, আমাকে দেখিয়াই তিনি বলিয়া উঠিলেন–
به لبم رسیده جانم تو بیا که زنده مانم / پس ازان که من نه مانم بچه کار خواهی آمد
জীবনের শেষ আজি সায়াহ্ন সময়!
এস প্রিয়ে, বেঁচে থাকি দিন কতিপয়।
আমার মরণ পরে তব আগমন
বিপল হইবে ফল পাবে না কখন।
ইহা আমার উপর এত প্রভাব বিস্তার করিল যে, চক্ষু দুইটি অশ্রুসিক্ত হইল। পুনরায় বলিলেন, “ওয়াদা মনে আছে কি?”
(আমি ওয়াদা করিয়াছিলাম যে, কিছুদিন তবলীগে সময় দিব।) আরজ করিলাম, ইয়াদ আছে, কিন্তু বর্তমানে দিল্লীতে গরম খুব বেশী, রমজানের বন্ধ হইবে, রমজানের পর কিছু সময় দিব।
তিনি বলিলেন, “তুমি রমজানের কথা বলিতেছ? এদিকে তো শাবানেরই আশা নাই।”
(বাস্তবিক শাবান আসিবার আগেই ১৩৬৩ হিজরীর ২১শে রজব সকালে মাওলানা জান্নাতবাসী হইলেন। আল্লাহ পাক তাঁহাকে নেককার বোজর্গদের মত রহম করুন।) আমি বলিলাম, “বহুত আচ্ছা, আমি রহিয়া গেলাম; আপনি পেরেশান হইবেন না। আমি এখন হইতে তবলীগে সময় দিব।
হাসি শুনিয়া চেহারা আনন্দে উৎফুল্ল হইল। আমার গলায় বাহু রাখিয়া কপালে চুমু দিলেন। বহুক্ষণ বক্ষে ধারণ করিলেন। অনেক দোয়া করিলেন। পুনরায় বলিলেন, “তুমি তো আমার দিকে ফিরিয়াছ, বহু ওলামা শুধু দূর দূর হইতেই আমার উদ্দেশ্য বুঝিতে চায়।”
তৎপর এক বড় আলেমের নাম লইলেন, যিনি তখন তবলীগে খুব বেশী অংশ লইতেছিলেন, কিন্তু তিনি তাহার আসল উদ্দেশ্য বুঝিতে পারেন নাই। কেননা তিনি তখন পর্যন্ত মাওলানার সঙ্গে সাক্ষাতভাবে কথা বলেন নাই। “কাহারও মাধ্যমে কথা বলিয়াছেন মাত্র। আমি অন্যের মারফতে নিজের উদ্দেশ্য কি করে বুঝাইব? বিশেষতঃ যখন মধ্যস্থ ব্যক্তিও নাকেছ বা অপরিপক্ক। এইজন্য আমি চাই যে, তুমি কিছুদিন আমার নিকট থাক; তাহা হইলে আমার উদ্দেশ্য বুঝিতে পারিবে, দূরে থাকিয়া বুঝিতে পারিবে না। ইহাও আমি জানি যে, তুমি তবলীগে অংশগ্রহণ কর, সভায় বক্তৃতাও কর, তোমার তকরীর দ্বারা উপকারও হয়; কিন্তু এই তবলীগ উহা নহে যাহা আমি চাই।
৩৭. এক বৈঠকে তিনি বলেন– হাদীছে আছেঃ
এক বৈঠকে তিনি বলেন– হাদীছে আছেঃ
اَلدُّنْيَا سِجْنُ الْمُؤْمِنِ وَجَنَّةُ الْكَافِرِ
“দুনিয়া মুমিনের কয়েদখানা ও কাফেরের বেহেশত।”
ইহার মতলব এই যে, আমাদিগকে বড় রিপুর (খাহেশাতে নফছানীর) দাস হইয়া ইচ্ছামত চলিবার জন্য এই দুনিয়াতে পাঠান হয় নাই। যদ্দারা এই দুনিয়া যেন বেহেশত মনে হয়, বরং আমাদিগকে ইচ্ছার বিরুদ্ধে খোদার হুকুম মানিয়া চলিবার জন্যই পাঠান হইয়াছে, যদ্দারা এই দুনিয়া মোমেনের জন্য জেল খানা মনে হয়। কাজেই আমরা যদি নফছকে মদদ করিয়াও মনের মত চলিয়া দুনিয়াকে নিজের জন্য বেহেশ্ত বানাই তাহা হইলে আমরা কাফেরের বেহেশতের জবর (গাছের) দখলকার হইব। এই অবস্থায় খোদার সাহায্য (মদদ) গাছেব মুসলমানের সঙ্গে থাকিবে না, বরং মগছুব ও মজলুম কাফিরের সঙ্গে থাকিবে। তিনি বলেন, ইহা ভাল করিয়া চিন্তা করিয়া দেখ।
৩৮. মানুষ আমার তবলীগের বরকত দেখিয়া মনে করে যে…
তিনি বলেন–
মানুষ আমার তবলীগের বরকত দেখিয়া মনে করে যে, কাজ হইতেছে, অথচ কাজ এক জিনিস আর বরকত অন্য জিনিস। দেখুন রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুবারক জন্ম হইতেই বরকত প্রকাশ পাইতে থাকে, কিন্তু কাজ অনেক পরে আরম্ভ হয়। এইরূপভাবে ইহাও বুঝিয়া লও, আমি ঠিক সত্য বলিতেছি, এখনও আসল কাজ শুরু হয় নাই। যেদিন প্রকৃত কাজ শুরু হইয়া যাইবে মুসলমান সাত শত বৎসর পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়া যাইবে। আর যদি কাজ শুরু না হয় বরং বর্তমানে যেই অবস্থা আছে সেই অবস্থায় থাকে, লোকেরা ইহাকেও অন্যান্য আন্দোলনের মত এক আন্দোলন বলিয়া মনে করে ও কর্মীরা ভুল ভ্রান্ত পথে চলে তাহা হইলে যেই ফেৎনা ফাছাদ শত শত বৎসর পরে আসিত তাহা কয়েক মাসের মধ্যে আসিয়া পড়িবে। এই জন্য ইহাকে বুঝিবার জরুরত আছে।
৩৯. একদিন জুমার পূর্বে দিল্লীর এসেম্বলী মসজিদে আমার বয়ান…
একদিন জুমার পূর্বে দিল্লীর এসেম্বলী মসজিদে আমার বয়ান হইয়াছিল। মাওলানাই প্রস্তাব করিয়াছিলেন যে, এখানে বয়ান হওয়া উচিত। নামাজের পর নিজামুদ্দিন বস্তি না আসিয়া বন্ধুদের সাথে রাত্রিযাপন করি। পরদিন নিজামুদ্দিন আসিয়া ওজর পেশ করি যে, বন্ধুবান্ধবদের বিশেষ অনুরোধে রাত্রিতে দিল্লীতে ছিলাম। মওলানা বলেন, “এই ওজরের প্রয়োজন নাই। কর্মীদের এইরূপ হইয়াই থাকে।”
এখন বলুন দেখি; এসেম্বলী মসজিদে ওয়াজ হইয়াছিল কি? আরজ করিলাম, জিহা, হইয়াছিল। খুব খুশী হইলেন ও বলিলেন, দেখুন; এই সমস্ত লোক আমাদিগকে নিজে আগ্রহ করিয়া ডাকে না। ইহাদের দুনিয়াদারী হইতেই অবসর নাই। ইহাদের নিকট আমাদিগকে অযাচিতভাবে যাইয়া তবলীগ করা চাই। পুনরায় জিজ্ঞাসা করিলেন, “কি বয়ান হইয়াছিল?” আরজ করিলাম, এই আয়াত–
اِنَّ فِيْ خَلْقِ السَّمٰوٰتِ وَالْاَرْضِ وَاخْتِلَافِ الَّيْلِ وَالنَّهَارِ لَاٰيٰتٍ لِّاُولِي الْاَلْبَابِ الَّذِيْنَ يَذْكُرُوْنَ اللّٰهَ قِيٰمًا وَّقُعُوْدًا وَّعَلٰى جُنُوْبِهِمْ
“নিশ্চয় সৌরমণ্ডল ও পৃথিবীর সৃষ্টির মধ্যে, দিবানিশির পরিবর্তনের মধ্যে ঐ সমস্ত বুদ্ধিমানের জন্য (আল্লাহর একত্বের) চিহ্ন সমূহ রহিয়াছে, যাহারা (সকল অবস্থায়) দাঁড়াইয়া, বসিয়া ও শুইয়া আল্লাহকে স্মরণ করে।”
ইহা দ্বারা প্রমাণ করিলাম যে, বুদ্ধিমান ঐ সমস্ত লোক যাহারা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের (জগতের) শৃঙ্খলার মধ্যে চিন্তা করিয়া সৃষ্টিকর্তাকে চিনিয়া লয় ও তাঁহার ইয়াদে (স্মরণে) মত্ত থাকে, উহারা নহে– যাহারা শুধু সূর্য ও পৃথিবীর চক্রের মধ্যে আটকাইয়া থাকে, স্রষ্টা পর্যন্ত পৌঁছে না। আল্লাহর জিকিরের হাকীকত ও জরুরত ভাল করিয়া বুঝাইয়া দিলাম। অতঃপর তবলীগের জরুরতের উপর জোর দিয়াছিলাম।
তিনি বলিলেন– এই বিষয় (মজমুন) অতি উচ্চ ধরনের, কাজেই এই মজলিছের যোগ্য ছিল না। এই বিষয়ের যোগ্য লোক এখানে জমা আছে, ইহা কোন সময় এখানে বয়ান করা চাই। ঐ মজলিছের মুনাছেব (যোগ্য) অন্য আয়াত ছিল। তাহা এইঃ
وَالَّذِيْنَ اجْتَنَبُوا الطَّاغُوْتَ اَنْ يَّعْبُدُوْهَا وَاَنَابُوْا اِلَى اللّٰهِ لَهُمُ الْبُشْرٰى ۚ فَبَشِّرْ عِبَادِ الَّذِيْنَ يَسْتَمِعُوْنَ الْقَوْلَ فَيَتَّبِعُوْنَ اَحْسَنَهٗ ۚ اُولٰٓئِكَ الَّذِيْنَ هَدٰىهُمُ اللّٰهُ وَاُولٰٓئِكَ هُمْ اُولُو الْاَلْبَابِ
“আর যাহারা শয়তানের কথা মত না চলিয়া আল্লাহর দিকে ফিরিয়া আসে তাঁহাদের জন্য খোশখবরী– সুতরাং খোশ খবরী দাও আমার ঐ সমস্ত বান্দাদের যাঁহারা কথা শুনে ও ভাল কথা মানে– তাহাদিগকে আল্লাহ হেদায়েত দান করিয়াছেন; আর ঐ সমস্তই বুদ্ধিমান ব্যক্তি।”
তিনি বলেন, এই শ্রেণীর লোক নীচের দরজার; ইহা “আল্লাহ হেদায়েত দিয়াছেন” হইতে বুঝা যায়। আরজ করিলাম, “সত্যই ঠিক কথা। অন্য সময় সুযোগ হইলে ঐ জায়গায় এই আয়াতই বয়ান করিব।”
৪০. আমাদের তবলীগের আসল উদ্দেশ্য শয়তান হইতে সরাইয়া আল্লাহর…
এক বৈঠকে তিনি বলেন–
আমাদের তবলীগের আসল উদ্দেশ্য শয়তান হইতে সরাইয়া আল্লাহর দিকে ফিরাইয়া আনা। ইহা কোরবানী ব্যতীত হইতে পারে না। দ্বীনের মধ্যে জানের কোরবানীও আছে, মালের কোরবানীও আছে।
তবলীগে জানের কোরবানী– আল্লাহর ওয়াস্তে ঘরবাড়ী ও দেশ ছাড়িয়া আল্লাহর কলেমা প্রসার করা, আল্লাহর দ্বীনের প্রচার করা।
মালের কোরবানী– তবলীগী ছফরের খরচ নিজে বহন করা। যদি কেহ কোন সময় কোন কারণে বাধ্য হইয়া নিজে বাহির হইতে না পারেন তিনি যেন বিশেষভাবে সেই সময় অন্যকে তবলীগে বাহির হইবার জন্য অনুপ্রাণিত ও উৎসাহিত করেন। অন্যকে বাহির করিবার জন্য কোশেশ করেন। এইরূপে–
اَلدَّالُّ عَلَى الْخَيْرِ كَفَاعِلِهٖ
“নেক কাজ যে করায় সে নেক কাজকারীর মতই ছওয়াব পায়।”
হাদীছের মর্মানুসারে যত লোককে পাঠাইবেন তাহাদের সকলের কোশেশের ছওয়াব তিনি পাইবেন আর যদি তাহাদিগকে আর্থিক সাহায্যও করেন তাহা হইলে মালের কোরবানীর ছওয়াবও পাইবেন। এতদ্সত্ত্বেও যাহারা বাহির হইয়া যাইবেন তাহাদিগকে নিজের উপকারী বলিয়া মনে করা উচিত। কেননা, আমাদের অবশ্য করণীয় ফরজ কার্য্য যাহা আপাততঃ কোন ওজরের জন্য আমরা করিতে অক্ষম তাহা আমাদের পক্ষে তাহারা আদায় করিতেছেন। ইহাই দ্বীন যে ওজরওয়ালারা বাড়ীতে বসিয়া মোজাহেদীনকে (পরিশ্রমকারীদের) নিজের মুহছীন বা উপকারী বলিয়া মনে করিবে।
৪১. মাওলানা! আমাদের তবলীগে এলম ও জিকিরকে বিশেষ গুরুত্ব…
একবার তিনি বলেন–
মাওলানা! আমাদের তবলীগে এলম ও জিকিরকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। এলম ব্যতীত আমলও হইতে পারে না এবং আমলের জ্ঞান বা পরিচয়ও হইতে পারে না। আবার জিকির ব্যতীত আমল অন্ধকারই অন্ধকার, ইহাতে নূর আসিতে পারে না। কিন্তু আমাদের কর্মীদের মধ্যে ইহার অভাব।
আমি আরজ করিলাম, তবলীগ নিজেই অতি বড় ফরিজা; এই জন্য ইহাতে জিকিরের কমি বা স্বল্পতা এইরূপ যেমন, মরহুম হযরত সৈয়দ ছাহেব ব্রেলভী যখন জেহাদের প্রস্তুতির সময় নিজের মুরিদদের জিকির শোগলের পরিবর্তে তীরান্দাজী ও ঘোড় সওয়ারীতে মশগুল করিয়া দিয়াছিলেন। তখন কেহ কেহ এইরূপ শেকায়েত করিয়াছিলেন যে, বর্তমানে পূর্বের মত নূর নাই। হযরত সৈয়দ ছাহেব বলিয়াছিলেন, হাঁ; বর্তমানে জিকিরের নূর নাই বটে, কিন্তু জেহাদের নূর আছে, যাহা এই সময়ে বিশেষ প্রয়োজন।
মওলানা বলিলেন, কিন্তু আমি এলম ও জিকিরের স্বল্পতায় অস্বস্থি অনুভব করি। আর এই স্বল্পতাও এই জন্য যে, আহলে এলম ও আহলে জিকির এই কাজে লাগেন নাই। যদি এই হযরতেরা আসিয়া এই কাজ হাতে লন তাহা হইলে এই অভাবও পূরণ হইয়া যাইবে। কিন্তু ওলামা ও পীরেরাও এই কাজে এখন পর্যন্ত খুব কমই আসিয়াছেন।
এখন পর্যন্ত যেই সমস্ত তবলীগী জমায়াত বাহির (রওয়ানা) করা হয় তাহাতে আলেম ও পীরের সংখ্যা নগণ্য। যার জন্য হযরতজীর মনে অশান্তি ছিল। আহা! আলেম ও পীরগণ যদি এই জমায়াতে শামিল হইয়া কাজ করিতেন তাহা হইলে কতই ভাল হইত, সঙ্গে সঙ্গে অভাবও দূর হইত। আলহামদুলিল্লাহ (আল্লাহরই সমস্ত প্রশংসা) তবলীগের কেন্দ্রে আহ্লে এলম ও আহ্লে নেছবত (আলেম ও পীর) আছেন; কিন্তু তাহাদের সংখ্যা অতি অল্প; তাহারা প্রত্যেক জমাতের সহিত বাহির হইলে কেন্দ্রের কাজ কে করিবে।
৪২. মওলানা ছৈয়দ আবুল হাছান আলী নদবীর এক চিঠিতে…
মওলানা ছৈয়দ আবুল হাছান আলী নদবীর এক চিঠিতে এই বাক্য ছিল, “মুসলমান মাত্র দুই শ্রেণীর হইতে পারে; তৃতীয় শ্রেণী নাই। হয়তঃ আল্লাহর রাস্তায় নিজে বাহির হইবে অথবা যাঁহারা বাহির হইয়াছে তাঁহাদের সাহায্য করিয়া মদদগার হইবে।”
তিনি বলেন– “খুব ভাল বুঝিয়াছেন।” অতঃপর বলিলেন, “লোককে বাহির হইবার জন্য তৈয়ার করাও তাহাদের সাহায্যের মধ্যে শামিল। তাহাদিগকে বলিবে, “তোমরা বাহির হইলে অমুক আলেমের বোখারী শরীফ ও অমুখ আলেমের কোরআন শরীফ শিক্ষাদানের ব্যাঘাত হইবে না; তাহা হইলে তোমরাও উহাদের পড়াইবার ছওয়াব পাইবে।” এই প্রকারের নিয়তের কথা বলিয়া লোকদিগকে ছওয়াবের রাস্তা দেখাইয়া দেওয়া উচিত।”
৪৩. মাওলানা! আমাদের তবলীগের সার এই যে, সাধারণ দ্বীনদার…
তিনি বলেন–
মাওলানা! আমাদের তবলীগের সার এই যে, সাধারণ দ্বীনদার মুসলমান তাহাদের উপরস্থ হইতে দ্বীন লইয়া অধীনস্থকে দ্বীন বিতরণ করে। কিন্তু অধীনস্তদিগকে নিজের ‘মুহছেন’ (উপকারী) বলিয়া মনে করিতে হইবে। কেননা আমরা যতই কলেমা পৌঁছাইতে ও প্রচার করিতে থাকি ততই আমাদের নিজের কলেমাও পূর্ণ ও উজ্জ্বল হইবে। আমরা যতই বেশী নামাজী বানাইব তত আমাদের নিজের নামাজও পূর্ণতা লাভ করিবে। (তবলীগের ইহা বড় গুঢ়তত্ত্ব (ভেদের কথা) যে, ইহা দ্বারা মুবাল্লেগের (প্রচারকের) নিজের পূর্ণতা লাভই আসল উদ্দেশ্য। অপরের জন্য নিজেকে পথপ্রদর্শক (হাদী) বলিয়া মনে করিতে নাই। কারণ আল্লাহ ব্যতীত হাদী কেহই নাই।)
৪৪. একবার তিনি বলেন– হাদীছে আছেঃ
একবার তিনি বলেন– হাদীছে আছেঃ
من لا يرحم لا يرحم ارحموا من في الارض يرحمكم من في السماء
“যে দয়া করে না তাহাকে দয়া করা হয় না, জমিনের জীবকে (মানুষকে) রহম কর, আসমানের (আকাশের) আল্লাহ তোমাদিগকে রহম করিবেন।” কিন্তু বড়ই পরিতাপের বিষয় যে, মানুষেরা (লোকেরা) এই হাদীছকে শুধু অনাহারী ও অনশন ক্লিষ্টদের সহিতই সীমাবদ্ধ করিয়াছে, এই জন্য ইহাদের ঐ ব্যক্তির উপর রহম আসে যে ক্ষুধার্ত, তৃষ্ণার্ত ও নগ্ন। অথচ মুসলমান দ্বীনদারী হইতে মাহরূম (বঞ্চিত) হইলে তাহাদের রহম আসে না। যেন দুনিয়ার ক্ষতিকে ক্ষতি বলিয়া মনে করা হয়, দ্বীনের ক্ষতিকে ক্ষতি বলিয়া বুঝা যায় না। মুসলমানের দ্বীনের অবস্থা খারাপ দেখিলে আমাদের দয়া হয় না। তাহা হইলে আকাশের আল্লাহ কেন আমাদিগকে রহম করিবেন?
তিনি বলেন– আমাদের তবলীগের বুনিয়াদ এই রহম বা দয়ার উপর। এই জন্য এই কাজ স্নেহ মমতা ও সহানুভূতির সহিত হওয়া উচিত। যদি মুবাল্লেগ নিজের ভাইদের দ্বীনি অবস্থা দেখিয়া দুঃখিত ও ব্যথিত হয় তাহা হইলে নিশ্চয়ই স্নেহ ও সহানুভূতির সহিত নিজের কর্তব্য আদায় করিবে। কিন্তু ইহা ব্যতীত অন্য উদ্দেশ্য বা মতলব থাকিলে অহঙ্কার ও আত্মম্ভরিতায় মত্ত হইবে, যদ্দারা লাভের (উপকারের) আশা নাই। তদুপরি যেই ব্যক্তি এই হাদীছ সামনে রাখিয়া তবলীগ করিবে তাহার মধ্যে এখলাছ পয়দা হইবে। তাহার নজর তাহার নিজের দোষের উপর পড়িবে; অপরের দোষ দেখার সঙ্গে সঙ্গে তাহার ইসলামী গুণের দিকেও দৃষ্টিপাত করিবে। এই ব্যক্তি কখনও নিজের নফছের তরফদারী করিবে না। বরং নিজের সমালোচনা করিবে। এই তবলীগের সারও ইহাই যে, সব সময় নিজের গুণ না দেখিয়া নিজের দোষ দেখার ছবক শিখিবে।
৪৫. মওলানা! আল্লাহর আহকামের অনুসন্ধান করা আবশ্যক। সব সময়…
একবার তিনি বলেন–
মওলানা! আল্লাহর আহকামের অনুসন্ধান করা আবশ্যক। সব সময় এই অনুসন্ধানে লাগিয়া থাকা চাই। যেমন কোন কাজ আরম্ভ করিবার পূর্বে চিন্তা করা উচিত যে, কোন বিষয়ে মশগুল হইতে দুইটা কাজ আবশ্যক। একটা হইল, যে কাজে মশগুল হইতে চায় তাহার প্রতি মনোযোগ দেওয়া, অপরটি অন্যান্য সমস্ত কাজ হইতে ঐ সময় অমনযোগী থাকা। এখন ভাবিয়া দেখা উচিত যে, যেই সমস্ত কাজ হইতে এই সময় অমনযোগী থাকিবে তন্মধ্যে এমন কোন কাজ আছে কিনা যাহা যেই কাজ করিতে যাইতেছি সেই কাজ হইতে অধিকতর দরকারী। ইহা অনুসন্ধান ব্যতীত সম্ভব হয় না।
৪৬. নামাজের পূর্বে কিছুক্ষণ নামাজের মোরাকাবা করা উচিত। যে…
একবার তিনি বলেন–
নামাজের পূর্বে কিছুক্ষণ নামাজের মোরাকাবা করা উচিত। যে নামাজ কিছু অপেক্ষা না করিয়া পড়া হয় তাহা উপরি উপরি নামাজ মাত্র। কাজেই নামাজের পূর্বে নামাজের ধ্যান করা চাই। শরিয়তে এই জন্যই ফরজ নামাজের পূর্বে ছুন্নত, নফল ও একামত ইত্যাদির ব্যবস্থা করিয়াছে, যেন নামাজের পূর্বে ভালমতে নামাজের মোরাকাবা হইয়া যায়। তৎপর ফরজ আদায় করা হয়। আমরা কিন্তু ছুন্নত, নফল ও একামত ইত্যাদির এই সমস্ত ফায়েদা ও উপকারিতা বুঝি না, ইহা হইতে ফায়েদাও উঠাই না। এই জন্য আমাদের ফরজও অসম্পূর্ণভাবে আদায় হইয়া থাকে।
اللهم اني اسألك تمام الوضوء و تمام الصلوة و تمام رضوانك ۔ امين
“আয় আল্লাহ! আমি তোমার নিকট সম্পূর্ণ অজু, সম্পূর্ণ নামাজ ও সম্পূর্ণ সন্তুষ্টি বা রেজা চাই। আমীন!”
৪৭. তবলীগী কর্মীদের নিজের অন্তরে (কলবে) প্রশস্ততা পয়দা করা…
একবার তিনি বলেন–
তবলীগী কর্মীদের নিজের অন্তরে (কলবে) প্রশস্ততা পয়দা করা উচিত, যাহা আল্লাহর রহমতের প্রশস্ততার উপর নজর করিলে পয়দা হইবে, ইহার পর তরবীয়তের চেষ্টা করা উচিত।
৪৮. আমাদের ছরদার রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইসলামের প্রাথমিক…
একবার তিনি বলেন–
আমাদের ছরদার রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইসলামের প্রাথমিক যুগে (যখন দ্বীন দুর্বল ছিল ও দুনিয়া প্রবল ছিল) অযাচিতভাবে গাফেল মানুষের ঘরে ঘরে ও সভা সমিতিতে যাইয়া দ্বীনের দাওয়াত দিতেন। ডাকিবার জন্য অপেক্ষা করিতেন না। কোন কোন সময় নিজে ছাহাবায়ে কেরামদের কোন নির্দিষ্ট জায়গায় তবলীগ করিতে পাঠাইয়া দিতেন যে, অমুক অমুক স্থানে গিয়া তবলীগ কর। এখনও সেই দুর্বলতার যুগ। কাজেই অযাচিতভাবে গাফেল লোকদের নিকট আমাদেরও যাওয়া উচিত। মুলহীদ (ধর্মদ্রোহী) ও কাফেরদের সভা সমিতিতে যাইতে হইবে। কলমায়ে-হক বুলন্দ করিতে হইবে, সত্যকে সুপ্রতিষ্ঠিত করিতে হইবে।
(তখন তিনি খুস্কী বেশী হওয়াতে, মুখের পানি শুকাইয়া যাওয়াতে কথা বলিতে পারিলেন না।) অতঃপর বলিলেন, মওলানা! তুমি আমার নিকট অনেক দেরীতে আসিয়াছ, আমি এখন বিস্তারিতভাবে কিছু বলিতে পারিতেছি না, যাহা কিছু বলিয়াছি তাহা গভীরভাবে চিন্তা কর।
৪৯. একবার তিনি বলেন– আমি প্রথমে এইরূপে জিকিরের তালিম…
একবার তিনি বলেন– আমি প্রথমে এইরূপে জিকিরের তালিম দিয়া থাকিঃ– প্রত্যেক নামাজের পর তছবিহে ফাতিমী ও তৃতীয় কলেমা–
سبحان الله و الحمد لله و لا اله الا الله و الله اكبر و لا حول و لا قوة الا بالله
(ছুবহানাল্লাহে ওয়ালহামদু লিল্লাহে, ওয়ালা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার। ওয়ালা হাওলা ওয়ালা কুওতা ইল্লা বিল্লাহ।)
আল্লাহ পাকের পবিত্রতা বয়ান করিতেছি, আল্লাহরই সমস্ত প্রশংসা, আল্লাহ ব্যতীত কোন মান্য ও উপাস্য নাই ও আল্লাহ সকলের চেয়ে বড়। ভাল কাজে শক্তি দেওয়া ও খারাপ কাজ হইতে ফিরাইবার শক্তিও শুধু আল্লাহরই।
সন্ধ্যা ও সকাল একশত বার করিয়া দরুদ শরীফ ও এস্তেগফার, কেরাত ছহীহ করিয়া কোরআন পড়া, নফলের মধ্যে তাহাজ্জোদে শরীক ও আহলে জিকিরের খেদমতে যাওয়ার তাকিদ করিয়া থাকি। জিকির ছাড়া ইলম অন্ধকার। আর এলম ছাড়া জিকির বহু ফেৎনার দরজা মাত্র।
৫০. স্বপ্ন নবুয়তের ৪৬ অংশের এক অংশ। কোন কোন…
একবার তিনি বলেন–
স্বপ্ন নবুয়তের ৪৬ অংশের এক অংশ। কোন কোন লোকের স্বপ্নের মধ্যে এত আধ্যাত্মিক উন্নতি হয় যে যাহা রিয়াজাত মুজাহাদার দ্বারাও হয় না। কেননা স্বপ্নে সত্যিকার এলম যাহা নবুয়তের অংশ, তাহা তাহাদের অন্তরে ঢালিয়া দেওয়া হয়; উন্নতি হইবে না কেন? (এলমের দ্বারা মারফত বৃদ্ধি পায়। মারেফাতের দ্বারা আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ হয়।) এইজন্য আল্লাহ ফরমাইয়াছেন–
قُلْ رَّبِّ زِدْنِيْ عِلْمًا
“বল আয় আল্লাহ! আমার এলম বাড়াইয়া দেন।”
তৎপর বলেন, আজকাল স্বপ্নে আমার উপর সত্যিকার এলম ‘এলকা’ করা হয় (ঢালিয়া দেওয়া হয়)। এই জন্য কোশেশ কর যেন আমার ঘুম বেশী হয়।
(খুসকীর জন্য ঘুম কম হইতেছিল। অতঃপর আমি হেকিম ও ডাক্তারের পরামর্শ মত মাথায় তৈল মালিশ করাতে ঘুম বেশী হইতেছিল।) তিনি বলেন– এই তবলীগের তরিকাও স্বপ্নেই আমার উপর উদ্ঘাটিতে ‘কশফ’ হইয়াছিল।
আল্লাহ পাকের এরশাদঃ
كُنْتُمْ خَيْرَ اُمَّةٍ اُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَاْمُرُوْنَ بِالْمَعْرُوْفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَتُؤْمِنُوْنَ بِاللّٰهِ
“তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মত, যাহাদিগকে মানুষের উপকারের জন্য বাহির করা হইয়াছে, তোমরা সৎকাজের আদেশ কর ও অসৎ কাজে নিষেধ কর ও আল্লাহ পাকের উপর ঈমান আন।”
এই আয়াতের তফছীর ও খাবে এইরূপ এলকা হইয়াছে যে, তোমরা নবীদের মত মানুষের উপকারের জন্য প্রেরিত হইয়াছ। (এই মতলবকে اُخْرِجَتْ বাহির করা হইয়াছে শব্দ দ্বারা প্রকাশ করিয়া এই দিকেও ইশারা করা হইয়াছে যে, এক জায়গায় জমিয়া বসিলে কাজ হইবে না। বরং দ্বারে দ্বারে বাহির হইতে হইবে।)
“তোমাদের সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজ হইতে নিষেধ করা” ইহার পর “আল্লাহর উপর ঈমান আন” বলিয়া ইহা বুঝানো হইয়াছে যে, এই সৎকাজের আদেশ হইতে তোমাদের নিজের ঈমানের উন্নতি হইবে। (অন্যথায় ‘শুধু ঈমান’ তো শ্রেষ্ঠ উম্মত হইতেই বুঝা যায়।) কাজেই অন্যকে হেদায়েত করিবার নিয়ত করিও না। নিজের উপকারের নিয়ত করিও।
“লোকের উপকারের জন্য বাহির করা হইয়াছে” এর মধ্যে ‘লোক’ দ্বারা ‘আজম’ অর্থাৎ আরব ব্যতীত অন্যান্য লোক বুঝান হইয়াছে। কারণ আরবের জন্য তো “তুমি তাহাদের দারোগা নও।” “তুমি তাহাদের কার্যকারক নও” বলিয়া বুঝান হইয়াছে যে, তাহাদের হেদায়েতের ইচ্ছা আল্লাহ পাক করিয়াছেন; আপনি তাহাদের জন্য বেশী ফিকির করিবেন না। অবশ্য ‘তোমরা সর্বশ্রেষ্ঠ উম্মত’ বলিয়া আরবকেই বলা হইয়াছে। কেননা তৎপর “আর যদি কিতাবী লোক ঈমান আনিত “তাহাদের মঙ্গল হইত!” ইহার সঙ্কেত চিহ্ন। ইহাতে ‘তাহাদের জন্য মঙ্গল’ বলা হইয়াছে। ‘তোমাদের জন্য মঙ্গল’ বলা হয় নাই। যেহেতু মোবাল্লেগের তবলীগের দ্বারাই নিজের ঈমান পূর্ণ হইয়া নিজের উপকার হয়; যাহাদিগকে তবলীগ করা হয় তাহারা কবুল করুক বা করুক তাহার কিছু আসে যায় না। যদি তাহারা ঈমান আনে তাহা হইলে তাহাদের নিজের উপকার হইবে। মুবাল্লেগের ফায়েদা তাহার উপর নির্ভর করে না।
৫১. জাকাতের দরজা হাদিয়া হইতে নিম্নে। এই জন্যই রাসূলুল্লাহ…
একবার তিনি বলেন–
জাকাতের দরজা হাদিয়া হইতে নিম্নে। এই জন্যই রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য ছদকা হারাম ছিল, হাদিয়া হারাম ছিল না। যদিও জাকাত ফরজ ও হাদিয়া মুস্তাহাব। তথাপি কোন কোন জায়গায় মুস্তাহাবের মর্তবা ফরজ হইতে বাড়িয়া যায়। যেমন, প্রথমে ছালাম করা ছুন্নত, কিন্তু ছালামের জওয়াব দেওয়া ওয়াজিব। তবুও প্রথমে ছালাম করা জওয়াব দেওয়া হইতে উত্তম। এইরূপ যদিও জাকাত ফরজ কিন্তু তাহার উদ্দেশ্য মালকে পাক করা। অন্যদিকে যদিও হাদিয়া মুস্তাহাব ইহার উদ্দেশ্য মুসলমানের মনকে খুশী করা। কাজেই ফলের দিক দিয়া দেখিতে গেলে হাদিয়াই উত্তম। কেননা মালকে পাক করা হইতে মুসলমানের মনকে খুশী করার দরজা অনেক উপরে। যদিও জাকাতের দ্বারাও অভাবগ্রস্ত মুসলমানের দিল খুশী হয় বটে, কিন্তু মুখ্যভাবে নহে, গৌণভাবে মাত্র। হাদিয়ার মুখ্য উদ্দেশ্যই মুসলমানের মনকে খুশী করা।
অতঃপর বলিলেন– নামাজীর জন্য যেমন পাক পানি তালাশ করা ফরজ, জাকাতদাতার জন্য তদ্রূপ প্রকৃত গ্রহীতা তালাশ করাও ফরজ। জাকাতের ছহীহ গ্রহীতা ঐ সমস্ত লোক যাহারা জাকাতের টাকা পাইলে নিজের মধ্যে মালের লোভ পয়দা হয় না। শরীয়তের জাকাত ফরজ করার উদ্দেশ্যে ইহা কখনই নহে যে, দরিদ্র মুসলমানের মধ্যে মালের লোভ ও লালসা পয়দা হউক এবং তাহারা লোকের খায়রাত জাকাত পাইবার অপেক্ষায় বসিয়া থাকুক। কাজেই যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর যেই পরিমাণ ভরসা করিয়া ছবর করে ঠিক সেই পরিমাণে তাহার সাহায্য করা মালদারদের অবশ্য কর্তব্য। যেমন, আল্লাহ পাক এরশাদ ফরমাইয়াছেনঃ
لِلْفُقَرَاءِ الَّذِيْنَ اُحْصِرُوْا فِيْ سَبِيْلِ اللّٰهِ لَا يَسْتَطِيْعُوْنَ ضَرْبًا فِي الْاَرْضِ يَحْسَبُهُمُ الْجَاهِلُ اَغْنِيَاءَ مِنَ التَّعَفُّفِ
“জাকাত ঐ সমস্ত লোকদের জন্য যাহাদিগকে কেবল মাত্র আল্লাহর রাস্তায় অর্থাৎ তবলীগ ও দাওয়াতের কাজে নিযুক্ত করা হইয়াছে, অর্থাৎ বন্দীর মত বেষ্টনীর মধ্যে রাখা হইয়াছে ও পৃথিবীতে ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য ঘুরাফিরা করিতে পারে না ও যাহাদিগকে জাহেল লোক ছওয়াল হইতেও বাঁচিয়া থাকার কারণে মালদার বলিয়া মনে করে।”
সুতরাং জানা গেল যে, জাকাত দান করিবার জায়গা ঐ সমস্ত লোক যাহারা আল্লাহর কাজে লাগিয়া আছে, ছবর করিয়া আল্লাহর উপর ভরসা করিয়াছে। কাহারও নিকট ছওয়াল করে না ও লোভ লালসা রাখে না। কিন্তু আজকাল মালদার লোক পেশাদার ভিক্ষুকদের জাকাত দিয়া মনে করিয়া থাকে যে, জাকাত আদায় হইয়া গেল। অথচ তাহারা তো প্রথমে জাকাতকেও নষ্ট করিয়া বসিল। এই কারণেই আজকাল জাকাত দেওয়ার পরও মালে বরাকাত হয় না, অথচ নিশ্চিত ওয়াদা আছে, জাকাত দিলে মালে বরাকাত হয়, সুতরাং যাহারা জাকাত দিলে মালে বরাকাত দেখে না তাহাদের বুঝিয়া নেওয়া উচিত যে, জাকাত যোগ্য ব্যক্তিকে দেওয়া হয় নাই ও তাহারা জাকাত দিবার প্রকৃত জায়গার অনুসন্ধান করে নাই।
৫২. মুসলমানদের চার নিয়তে ওলামাদের খেদমত করা উচিতঃ
একবার তিনি বলেন–
মুসলমানদের চার নিয়তে ওলামাদের খেদমত করা উচিতঃ
(১) ইসলামের জন্য; কেননা কোন মুসলমান যদি শুধু ইসলামের খাতিরে অর্থাৎ কেবল আল্লাহর ওয়াস্তে, ছওয়াবের জন্য মুসলমানের সহিত সাক্ষাত করে তাহা হইলে সত্তর হাজার ফেরেশ্তা তাহার পায়ের নীচে তাহাদের পাখা ও পালক (বাজু) বিছাইয়া দেয়। যখন প্রত্যেক মুসলমানের সহিত সাক্ষাতে এই ফজিলত পাওয়া যায় তখন ওলামাদের জিয়ারতেও এই ফজিলত নিশ্চয়ই পাওয়া যাইবে।
(২) এই জন্য যে, তাহাদের শরীর ও মন এলমে নববীর বাহক ও ধারক। এই দিক দিয়াও তাহারা খেদমত ও তাজীমের যোগ্য।
(৩) এই জন্য যে, তাহারা আমাদের দ্বীনী কাজের তত্ত্বাবধায়ক।
(৪) তাহাদের জরুরিয়াত ও অভাব অভিযোগের অনুসন্ধান করিবার জন্য সক্ষম ধনী লোকেরা যদি তাহাদের জরুরিয়াত জানিয়া লইয়া তাহা পূরণ করিয়া দেন; তাহা হইলে তাহারা যেই সময় এই সমস্ত জরুরিয়াতের জন্য খরচ করিতেন তাহা বাঁচাইয়া এলমে দ্বীনের খেদমতে খরচ করিবেন এবং মালদারেরা তাহাদের এই সমস্ত কাজের ছওয়াব পাইবেন। কিন্তু বিশ্বস্ত ওলামাদের তরবিয়ত ও তত্ত্বাবধানে থাকিয়া সাধারণ মুসলমানদের এই খেদমত (ফরিজা) আদায় করা উচিত। কেননা কোন্ ব্যক্তি বেশী সাহায্যের যোগ্য ও কোন্ ব্যক্তি কম সাহায্যের যোগ্য তাহা তাহারা না-ও জানিতে পারেন। (আর যদি কাহারও নিজের অনুসন্ধানে তাহা জানা সম্ভব হয় তা হইলে তিনি নিজেই অনুসন্ধান করিবেন।)
৫৩. মুসলমানগণ দোয়া হইতে বহুত গাফেল। আবার যাহারা দোয়া…
তিনি বলেন–
মুসলমানগণ দোয়া হইতে বহুত গাফেল। আবার যাহারা দোয়া করিয়াও থাকেন তাহাদের দোয়ার হাকিকত জানা নাই। মুসলমানদের সামনে দোয়ার হাকিকত পরিষ্কারভাবে খুলিয়া বলা উচিত। দোয়ার হাকিকত নিজের জরুরতগুলি (আল্লাহর) সুউচ্চ দরবারে পেশ করা; সুতরাং সেই দরবার যত উচ্চ ও মহান ততই দোয়ার সময় একাগ্রচিত্তে মনোযোগ দেওয়া ও দোয়ার শব্দগুলি বিনম্রভাবে কান্নাকাটি করিয়া আদায় করা উচিত। এইরূপ একীন ও বিশ্বাসের সহিত দোয়া করা উচিত যে, দোয়া নিশ্চয় কবুল হইবে। কেননা যাহার নিকট দোয়া করা হইতেছে তিনি অতি বড় দাতা ও দানশীল, নিজের বান্দাদের উপর দয়ালু ও মেহেরবান। আসমান জমিনের সমস্ত ধনসম্পদ একমাত্র তাঁহারই শক্তির অধীন।
৫৪. যে সমস্ত জমায়াত দেওবন্দ, ছাহারানপূর প্রভৃতি জায়গায় যাইতেছে…
একবার তিনি বলেন–
যে সমস্ত জমায়াত দেওবন্দ, ছাহারানপূর প্রভৃতি জায়গায় যাইতেছে তাহাদের সঙ্গে দিল্লীর ছওদাগরদের চিঠি এই মর্মে নম্র সুরে বিনয়ভাবে লিখিয়া দেওয়া হউক যে, ইহারা আওয়ামের মধ্যে তবলীগ করিবার জন্য যাইতেছে। আপনাদের সময় অতি মূল্যবান, যদি কিছু সময় এই জামায়াতের সহিত দিয়া ইহাদের পৃষ্ঠপোষকতা করিতে পারেন যাহাতে আপনাদের ও তালেব এলমদের কোন অসুবিধা না হয়; তাহা হইলে তাহাদের ছেরপরস্তী করিবেন ও তালেবে এলমদের এই কাজে আপনাদের নিজের তত্ত্বাবধানে সঙ্গে লইবেন। তালেবে এলমদের নিজ নিজ ওস্তাদের তত্ত্বাবধান ছাড়া এ কাজে অংশ নেওয়া উচিত নহে।
তবলীগী জামায়াতকেও অছিয়াত করা হইক যে, যদি ওলামারা কম মনযোগ দেন তাহাদের মনে যেন কোন খারাপ ধারণা না আসে, বরং ইহা বুঝা উচিত যে, ওলামা হযরত আমাদের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যস্ত আছেন। অন্যেরা যখন রাত্রে সুখে নিদ্রা যায় তখনও তাহারা এলমের খেদমতে মশগুল থাকেন। তাহাদের অমনোযোগিতাকে নিজের অক্ষমতা ও দোষ বলিয়া মনে করিবে যে, আমরা তাহাদের নিকট আসা-যাওয়া কম করিয়াছি। এ জন্য তাহারা আমাদিগ হইতে ঐ সমস্ত লোকের দিকে বেশী মনোযোগ দেন যাহারা বৎসরের পর বৎসর ধরিয়া তাহাদের কাছে পড়িয়া আছে।
পুনরায় বলেন– এক সাধারণ মুসলমানের বিরুদ্ধে বিনা কারণে বদগুমানি (খারাব ধারণা) রাখা ও পোষণ করা মানুষকে ধ্বংসের পথে নেয়; ওলামার বিরুদ্ধে কথা বলা আরও কত বড় সঙ্গীন ব্যাপার।
পুনরায় বলেন– আমাদের তবলীগের তরিকা মুসলমানের ইজ্জত ও ওলামার হুরমত এক বুনিয়াদী জিনিস। প্রত্যেক মুসলমানকে ইসলামের খাতিরে এবং ওলামাদের দ্বীনি এলমের খাতিরে সম্মান করা চাই।
পুনরায় বলেন– এলম ও জিকিরের কাজ এখন পর্যন্ত আমাদের মুবাল্লেগদের আয়ত্বে আসে নাই। ইহার জন্য আমি বড়ই চিন্তিত। ইহার তরিকা এই যে, তাহাদিগকে আহলে এলম ও আহলে জিকিরের নিকট পাঠাইয়া দেন, যেন তাহাদের তত্ত্বাবধানে থাকিয়া তবলীগের কাজও করে এবং তাহাদের এলম ও ছুহবত হইতেও ফায়দা উঠায়।
৫৫. একদিন আমি আগন্তুক মেহমানদের সহিত কথাবার্তায় বেশী ব্যস্ত…
একদিন আমি আগন্তুক মেহমানদের সহিত কথাবার্তায় বেশী ব্যস্ত ছিলাম; মওলানার নিকট বেশীক্ষণ বসি নাই। জোহরের পর খেদমতে হাজির হইলে; তিনি বলিলেন, তোমার বেশীক্ষণ আমার নিকট থাকা চাই। আরজ করিলাম, আজ আগন্তুকদের বড় ভিড় ছিল; তাহাদিগকে আমার নিকট রাখিয়া তবলীগ সম্বন্ধে কথাবার্তা বলিতেছিলাম, যেন আপনার কাছে বেশী ভিড় না জমে ও আপনাকে বেশী কথা বলিতে না হয়।
তিনি বলেন– ইহারও এই ছুরত (পদ্ধতি) ছিল যে, তুমি আমার নিকট থাকিতে, আমি তোমার নিকট মনের কথা বলিতাম, আর তুমি অন্যদের নিকট পৌঁছাইয়া দিতে। এইরূপে আমার মনের কাঁটা বাহির হইয়া যাইত। তুমি আমার নিকট থাকিয়া আমার কথা শুনিতে থাক ও অন্যকে পৌঁছাও, যেন আমাকে কাহাকেও বলিতে না হয়।
কেহ কেহ আমাকে বলেন, আপনাকে কথা বলিতে দিব না, কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত আমার দিলের কাঁটা বাহির হইয়া না যায় ততক্ষণ পর্যন্ত আমি কিরূপে চুপ থাকিব? আমি কখনও চুপ থাকিব না যদিও মরিয়া যাই।
৫৬. হযরত মওলানা থানভী রহমাতুল্লাহি আলাইহি অনেক বড় কাজ…
একবার তিনি বলেন–
হযরত মওলানা থানভী রহমাতুল্লাহি আলাইহি অনেক বড় কাজ করিয়াছেন। আমার দিল (মন) চাহে যে, আমার তবলীগের তরিকামতে তাহার তালীম আম হইয়া যাক (সর্বসাধারনের মধ্যে প্রচার হইয়া যাক)।
পুনরায় বলেন– ওয়াজের মধ্যে শরীয়তের আহ্কামের কারণ ও উপকারিতা বয়ান করিও না। মাত্র তিনটি জিনিস সামনে রাখিবার জন্য লোককে উপদেশ দিও।
(১) প্রত্যেক কাজে খোদাকে সন্তুষ্ট করিবার জন্য নিয়ত করিবে।
(২) আখেরাতের উপর পূর্ণ ঈমান রাখিবে, যে-কোন কাজই কর না কেন তাহা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আখেরাতের পূর্ণ ঈমানের সহিত হওয়া চাই– ইহা আখেরাতে ফায়দা দিবে ও সেখানে ইহার ছওয়াব মিলিবে অথবা আজাব দূর করিবে।
(৩) ইহার সহিত এমন কোন ফায়দার নিয়ত না হয় যাহা মৃত্যুর পূর্বে দুনিয়াতে পাওয়া যায়। ইহা তো তোলা হিসাবে আপনা আপনিই আসিবে। তাহা কখনও উদ্দেশ্য নহে, যদিও ইহা পাওয়া সুনিশ্চিত এবং ইহার একীন রাখাও দরকার। কিন্তু কাজের মধ্যে যেন ইহার নিয়ত করা না হয়।
পুনরায় বলেন– হাঁ, যেখানে ইহার উপকারিতা ও কারণ বয়ানের জরুরত হইবে সেখানে বলিলেও কোন দোষ নাই। কিন্তু যেখানে সেখানে বলিতে নাই।
৫৭. হযরত মাওলানা থানবী (রহঃ)-এর মুরিদান আমার নিকট অতি…
একবার তিনি বলেন–
হযরত মাওলানা থানবী (রহঃ)-এর মুরিদান আমার নিকট অতি মূল্যবান। তাহারা সমসাময়িক হওয়াতে আমার কথা সহজে বুঝে। কেননা, তাহারা মাওলানার কথা শুনিয়াছে; অদূরেই শুনিয়াছে।
পুনরায় বলিলেন– তোমাদের দ্বারা আমার কাজে অনেক বরকত হইয়াছে, আমার মন খুব খুশী হইয়াছে। তৎপর অনেক দোয়া করিলেন ও বলিলেন, তোমরাও নিজে কাঁদিয়া কাঁদিয়া এই নেয়ামতের শোকরিয়া আদায় করঃ
اللهم ما اصبحت بي او امسيت بي من نعمة او باحد من خلقك فمنك وحدك لا شريك لك فلك الحمد و لك الشكر
“আয় খোদা! সকালে সন্ধ্যায় সর্বসময়ে আমার উপর অথবা তোমার সৃষ্টির মধ্যে অন্য কাহারও উপর যে সমস্ত নেয়ামত বর্ষিত হয় তাহা এককভাবে তোমারই, তোমার অন্য কোন শরীক নাই। তোমারই জন্য সমস্ত প্রশংসা ও শোকরিয়া।”
৫৮. তবলীগের কাজের জন্য ছৈয়দদের বিশেষ কোশেশ করিয়া উঠাইতে…
তিনি বলেন–
তবলীগের কাজের জন্য ছৈয়দদের বিশেষ কোশেশ করিয়া উঠাইতে হইবে এবং তাহাদিগকে অগ্রবর্তী করিতে হইবে। কেননা হাদীছ শরীফে আছে–
تركت فيكم الثقلين كتاب الله و عترتي اهل بيتي
“তোমাদের মধ্যে আমি খুব ভারী দুইটি জিনিস রাখিয়া যাইতেছি– আল্লাহর কিতাব ও আমার বংশধর– আমার আহ্লে বায়েত।”
এই হাদীছের তাকাজাও ইহাই অর্থাৎ এই হাদীছ ইহাই চায়। এই মহাত্মাদের দ্বারা পূর্বেও অনেক কাজ হইয়াছে, ভবিষ্যতেও তাহাদের নিকট হইতে অনেক কিছু আশা করা যায়।
৫৯. যদি কোন মুসলমানের কাহারও সহিত আল্লাহর ওয়াস্তে মহব্বত…
একদিন তিনি বলেন–
যদি কোন মুসলমানের কাহারও সহিত আল্লাহর ওয়াস্তে মহব্বত হয় অথবা তাহার সহিত কোন মুসলমানের আল্লাহর ওয়াস্তে সত্যিকার মহব্বত হয় তাহা হইলে এই মহব্বত ও সদিচ্ছাই আখেরাতের জন্য যথেষ্ট সম্বল। মুসলমানদের আমার সহিত যে মহব্বত আছে তাহাতে কিছু আশা হয় যে, খোদা চাহে তো পরকালেও পর্দাপুশী হইয়া যাইবে অর্থাৎ গোনাহ মাফ হইবে।
পুনরায় বলেন– নিজের খালী হাত হওয়ার উপর একীন হওয়াই কৃতকার্যতা, কেহই নিজের কাজের দ্বারা কামিয়াব (কৃতকার্য) হইবে না। কেবলমাত্র আল্লাহর ফজল দ্বারাই কৃতকার্য হইবে।
রাসুলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফরমাইয়াছেনঃ
لن يدخل الجنة احد بعمله قالوا و لا انت يا رسول الله قال و لا انا الا ان يتغمدني الله
“কেহই নিজের আমলের (কার্যের) দ্বারা বেহেশ্তে যাইবে না। তাহারা (ছাহাবায়ে কেরাম) বলিলেন, আয় আল্লাহর রাসূল! আপনিও কি নহে? রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফরমাইলেন, যদি আল্লাহর রহমত আমাকে ঢাকিয়া না লয় আমিও নহে।”
এই হাদীছ পড়িয়া মওলানা নিজেও কাঁদিলেন, অন্যকেও কাঁদাইলেন।
৬০. মাওলানা! ওলামাগণ এদিকে আসেন না, আমি কি করিব?…
একবার তিনি বলেন–
মাওলানা! ওলামাগণ এদিকে আসেন না, আমি কি করিব? হায় আল্লাহ! আমি কি করিব? আমি আরজ করিলাম, আপনি দোয়া করুন, সকলেই আসিয়া যাইবে।
তিনি বলেন– আমি তো দোয়াও করিতে পারি না, তোমরাই দোয়া কর। তৎপর এই পদ্য পড়িলেনঃ
استغفر الله من قول بلا عمل / لقد نسبت به نسلا لذي عقم / ظلمت سنة من احيى الظلام الى / ان اشتكت قدماه الضر من ورم
ক্ষমা চাই খোদার কাছে শুধু কথা হতে,
হয়ে গেছে ধ্বংস বহু বংশ এই পথে,
যে জন ফুলায়েছে পা নামাজে নিশাতে
করেছি জুলুম আমি তাঁহার ছুন্নতে।
ইহার পর কাঁদিয়া বলিলেন, “কাছিদায়ে বোরদা” আমাদের এখানে ওলামাদের নেছাবে দাখেল আছে। কিন্তু আদব (সাহিত্য) হিসাবে নহে– দিল নরম করিবার জন্য ও নবীর মহব্বত বৃদ্ধি করিবার জন্য।
৬১. ইসলামে এক প্রশস্ততার দরজা আছে, ইহা এতই প্রশস্ত…
তিনি বলেন–
ইসলামে এক প্রশস্ততার দরজা আছে, ইহা এতই প্রশস্ত যে মুসলমানের ঘরে জন্ম হওয়া, দারুল ইসলামে পয়দা হওয়া, ভাল পিতা-মাতার অনুগামী হওয়া পর্যন্ত মুসলমান বলিয়া গণ্য হইবার জন্য যথেষ্ট। আবার এই প্রশস্ততার সহিত বান্দাদের ইহার মধ্যে দালেখ করার পর যথাসম্ভব ইহা হইতে বাহির হইতেও দেয় না। যদি কাহারও কোন কথায় ৯৯ ভাগ কুফরী ও এক ভাগ ইসলাম পাওয়া যায় তাহাকেও মুসলমান বলা হইবে। কিন্তু ইহা হাকিকী (প্রকৃত) ইসলাম নহে, বরং রছমী বা নামের ইসলাম। প্রকৃত ইসলাম এই যে, মুসলমানের মধ্যে ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’র হাকিকত পাওয়া চাই। আর ইহার হাকিকত এই যে, ইহা বিশ্বাস করিবার পর আল্লাহ পাকের বন্দেগীর জন্য দৃঢ় সঙ্কল্প ও ইচ্ছা মনের মধ্যে পয়দা হওয়া, মাবুদকে রাজি করিবার ফিকির দিলের মধ্যে আনা। সব সময় এই ধ্যান ধারণা থাকা যে, “হায়! মাবুদ আমার উপর রাজি আছে কিনা?”
৬২. দুইটি জিনিসের জন্য আমি বড়ই চিন্তিত। এই দুইটির…
তিনি বলেন–
দুইটি জিনিসের জন্য আমি বড়ই চিন্তিত। এই দুইটির প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া দরকার। এক জিকির, ইহার অভাব আমাদের জামায়াতে অনুভূত হইতেছে। তাহাদিগকে জিকির শিক্ষা দিতে হইবে। অপরটি মালদারদিগকে জাকাতের ‘মাছরাফ’ বা খরচ করিবার জায়গা বুঝাইয়া দিতে হইবে। তাহাদের অধিকাংশ জাকাত বরবাদ যাইতেছে। উপযুক্ত স্থানে খরচ হইতেছে না। আমি এইরূপ ৪০ জন লোকের নাম লিখাইয়া দিয়াছি যাহাদের লোভ-লালসা নাই, তাহাদিগকে জাকাত দিলে তাহাদের মধ্যে লোভ লালসা হইবে না। (কামনা বাসনা বাড়িয়া যাইবে না।) তাহারা আল্লাহর উপর ভরসা করিয়া তবলীগী কাজে লাগিয়া আছে, তাহাদের সাহায্য করা অত্যধিক প্রয়োজন। কাহার কত জরুরত আছে তাহার অনুসন্ধান মালদারের করা দরকার। তাহারা যে পেশাদার ভিক্ষুক ও আম চাঁদা আদায়কারীদের জাকাত দিয়া থাকেন অনেক সময় উহা দ্বারা তাহাদের জাকাত ‘মাছরাফে’ (উপযুক্ত স্থানে) খরচ হয় না।
৬৩. এলম হইতে আমল ও আমল হইতে জিকির পয়দা…
তিনি বলেন–
এলম হইতে আমল ও আমল হইতে জিকির পয়দা হওয়া উচিত। তাহা হইলেই এলম প্রকৃত এলম ও আমল খাঁটি আমল হইবে। যদি এলম হইতে আমল পয়দা না হয় তাহা হইলে উহা জুলমাত বা অন্ধকারই অন্ধকার। আমল হইতে মনে আল্লাহর জিকির বা ইয়াদ না আসিলে তাহা কেবল মাত্র ফুস্ফুসী (উপরি উপরি কাজ)। আবার এলম ব্যতীত জিকিরও ফেৎনা।
৬৪. লোকদিগকে হাদিয়া, ছদকা ও করজ দেওয়ার ফজিলত সমূহ…
তিনি বলেন–
লোকদিগকে হাদিয়া, ছদকা ও করজ দেওয়ার ফজিলত সমূহ (ফাজায়েল) ছাহাবায়ে কেরামের জীবনের ঘটনাবলী হইতে শিক্ষা দেওয়া চাই। ছাহাবাগণ মজুরী করিয়াও ছদকা করিতেন; তাঁহাদের শুধু ধনীরাই ছদকা করিতেন না, গরীবেরাও কুলী মজুরী করিয়া কিছু কিছু ছদকা করিতেন, কেননা ছদকার ফাজায়েল তাঁহাদের চক্ষুর সম্মুখে ছিল; যখন ছদকারই এই দরজা তখন হাদিয়া তো আরও অধিকতর শ্রেষ্ঠ। এইরূপ কর্জ দেওয়ারও বহু ফজিলত আছে; উদাহরণ স্বরূপ যখন কর্জের মেয়াদ পূর্ণ হইয়া যায় তৎপর গরীব কর্জদারদের আরও সময় দিয়া কর্জের টাকা না চাহিলে প্রত্যেক দিন ছদকার ছওয়াব পাওয়া যায়।
৬৫. আমার মনে আমার উপর ‘ইস্তিদ্রাজের’ (আজাব বা শাস্তি…
তিনি বলেন–
আমার মনে আমার উপর ‘ইস্তিদ্রাজের’ (আজাব বা শাস্তি দেওয়ার জন্য নেয়ামত ও সময় দেওয়ার) আশঙ্কা ও ভয় হয়। আমি আরজ করিলাম, এই ভয়ই প্রকৃত ঈমান বা ঈমানের চিহ্ন। (ইমাম হাছান বছরী বলিয়াছেন, “নিজের উপর ‘নেফাকের’ (বাহিরে ইসলাম ও ভিতরে কুফরের) ভয় বা আশঙ্কা কেবলমাত্র মুমিনেরই হইয়া থাকে।”) কিন্তু যৌবনকালে ভয় বেশী থাকা ও বৃদ্ধ বয়সে আল্লাহর প্রতি ভাল ধারণা, (হুছনে জন) আশা বেশী থাকা ভাল। তিনি বলিলেন– “হাঁ, ঠিক বলিয়াছেন।”
← আগের কিস্তি (তৃতীয় কিস্তি) | সূচিপত্র | পরের কিস্তি (পঞ্চম কিস্তি) →
মূল বই: মালফুজাত (নীতি-কথা) – হযরতজী মাওলানা ইলিয়াস (রহঃ)। সংকলন: মাওলানা মুহাম্মদ মনজুর নোমানী। অনুবাদ: ডক্টর মোহাম্মদ ছানাউল্লাহ (ব্যারিষ্টার)। প্রকাশক: মোহাম্মদী লাইব্রেরী, চকবাজার, ঢাকা।
