|

মালফুজাতে হযরতজী ইলিয়াস (রহঃ) – দশম কিস্তি: মলফুজ ১৬০–১৭৪

হযরতজী মাওলানা মুহাম্মদ ইলিয়াস কান্ধলভী (রহঃ)-এর বাণী সংকলন মালফুজাত (নীতি-কথা) – হযরতজী মাওলানা ইলিয়াস (রহঃ) বইয়ের দশম কিস্তি (মলফুজ ১৬০ থেকে ১৭৪)। সম্পূর্ণ সূচিপত্র দেখুন।

সংকলন: মাওলানা মুহাম্মদ মনজুর নোমানী। অনুবাদ: ডক্টর মোহাম্মদ ছানাউল্লাহ (ব্যারিষ্টার)। প্রকাশক: মোহাম্মদী লাইব্রেরী, চকবাজার, ঢাকা।

১৩৬৬ হিজরীর রবিউল আউয়াল ও রবিউছ্ছানীর

আল-ফোরকানে প্রকাশিত

এই কিস্তিতে যা আছে


১৬০. এই দ্বীনি দাওয়াতের জন্য প্রত্যেক শ্রেণীর মুসলমানের সহিত…

তিনি বলেন–

এই দ্বীনি দাওয়াতের জন্য প্রত্যেক শ্রেণীর মুসলমানের সহিত মিলামিশা করা ও তাহাদের সকলকে এ দিকে আনিবার কোশেশ করা জরুরী। আমি নিজের এক ঘটনা শুনাইতেছি– (তৎপর হজরত মওলানা এক দ্বীনের আলেম সম্বন্ধে, যিনি এ যুগের বড় আলেম ও শায়খুল হিন্দ হযরত মওলানা মাহমুদুল হাছান (রহঃ)-র নামকরা শিষ্যদের অন্যতম– বর্ণনা করেন–)

একবার তিনি প্রকাশ্যে হযরত মওলানা (আল্লাহ তাঁহার কবরকে নুরান্বিত করুক) সম্বন্ধে খুব বেশী খারাপ ও একেবারে গলত কয়েকটি কথা বলেন, যাহা দ্বারা আমি যারপর নাই মনোকষ্ট পাই। আমার অবস্থা এইরূপ হইল যে, আমি তাঁহার চেহারাও দেখিতে চাহিতাম না। কিছুদিন পর যখন আমি এই কাজে লাগি তখন একদিন আমার মনে আসিল যে, ঐ বুজুর্গের সহিত আমার এই ব্যবহার ঠিক নয়।

যাহাই হউক না কেন, তিনি একজন মুমেন ও মুসলমান। হযরত শাইখুল হিন্দ (রহঃ)-এর ফয়েজ নিশ্চয়ই তাঁহার মধ্যে আছে, কোরআন শরীফের এলমের নূরও তাঁহার (মধ্যে) আছে। যে ব্যক্তির মধ্যে ভালর এতদিক আছে তাঁহার নিকট হইতে এতদূরে থাকা নিজের অনিষ্ট করা মাত্র। কাজেই আমি নিজে গিয়া তাঁহার জিয়ারত করা ও তাঁহার এই সমস্ত দ্বীনি কালামের (পূর্ণতার) জন্য তাঁহার সম্মান করা উচিত। আর তাঁহার যেই কথার দ্বারা আমার মনোকষ্ট হইয়াছে তাহাতে ইহারও সম্ভবনা আছে যে, এই সমস্ত তাঁহার নিকট অন্য কেহ এইভাবে বলিয়াছে, তাঁহার গলত (ভুল) শুধু এতটুকু যে, তিনি সত্য মনে করিয়া ঐ প্রকাশ্য সভায় তাহা উদ্ধৃত করিয়াছেন অথবা এই প্রকারের অন্য কোন এজতেহাদী গলতী (ভুল ধারণা) এই ব্যাপারে তাঁহার হইয়াছে। তাহা যে প্রকারেই হউক ইহা এমন গলতী নয় যে, যাহার জন্য তাঁহাকে এইভাবে ত্যাগ করা আমার জন্য দুরস্ত হইতে পারে।”

তিনি বলেন–

এই সমস্ত কথা আমি একাকী বসিয়া নফছকে বুঝাইলাম। ইহার উত্তরে আমার নফছ যে সমস্ত দলীল পেশ করিল তাহার সমস্তই আমি দলীল দ্বারা রদ করিলাম। জিয়ারতে মুসলিম ও একরামে মুসলিমের যে সমস্ত ছওয়াবের খোশখবরী কোরআন হাদীছে আসিয়াছে তাহা আমি ইয়াদ করিলাম ও নিজের নফছকে ইয়াদ করাইয়া দিলাম। তৎপর আমি কি এই সময় শুধু জিয়ারত করিবার নিয়তে তাঁহার নিকট যাইব, না আমার নিজের দাওয়াত পেশ করিবার নিয়তে যাইব এই দুইয়ের মধ্যে (অর্থাৎ এই দুইয়ের মধ্যে কোন্টি আল্লাহর নিকট বেশী বড় ও প্রিয় এই বিষয়ে) আমার তরদ্দোদ হইল। শেষে আমি সিদ্ধান্ত করিলাম, জিয়ারত ও দাওয়াত দুইটির পৃথক পৃথক নিয়ত করিয়া তাঁহার খেদমতে যাওয়া চাই। ইহাতে খোদা চাহে তো দুই বিষয়ের ছওয়াবই পুরাপুরা মিলিবে। কাজেই আমি এইরূপই করিলাম। পরে এই মিলন বহু বরাকাত ও ফায়েদার (জরিয়া) ওছিলা হইল।

১৬১. এই সম্বন্ধে তিনি আরও বলেন

এই সম্বন্ধে তিনি আরও বলেন–

আমাদের কোন কোন খাছ বুজুর্গ আমার এই রীতির জন্য আমার উপর নারাজ যে, আমি এই দ্বীনি কাজের জন্য প্রত্যেক প্রকারের ও আচারের লোকের সহিত ও মুসলমানের প্রত্যেক সম্প্রদায়ের লোকের সহিত মিলিয়া থাকি ও মিলিতে চাই ও নিজের লোকদিগকেও ইহাদের সহিত মিলামিশা করিতে বলিয়া থাকি। কিন্তু আমি নিজের বুজুর্গদের এই নারাজীকে সহ্য করা ও ইঁহাদিগকে মাজুর মনে করতঃ ইঁহাদিগকেও এই দিকে আনিবার জন্য পুরা কোশেশ করিতে থাকাকে আমার করণীয় আল্লাহর শোকরের এক অংশ বলিয়া মনে করিঃ

چون بر تو باشد تو بر خلق باش

“হক যখন তোমার দিকে তুমি সহিষ্ণু হও।”

এই বুজুর্গদের ধারণা যে, এই কার্যপদ্ধতি আমাদের হজরত পীর ছাহেবের (আল্লাহ তাঁহার কবরকে নূরান্বিত করুক) পদ্ধতির ও প্রবৃত্তির বিপরীত। কিন্তু আমি বলি, যেই জিনিস দ্বীনের জন্য উপকারী ও অতি লাভজনক হওয়া দলীল ও অভিজ্ঞতা দ্বারা জানা গিয়াছে ইহাকে শুধু এই জন্য গ্রহণ না করা যে, আমাদের পীর ছাহেব উহা করেন নাই, বড়ই ভুল। পীর তো পীরই, খোদা তো নহেন?

১৬২. এই দ্বীনি কাজের তবলীগে দ্বীন ও এছলাহে উম্মতের…

তিনি বলেন–

এই দ্বীনি কাজের তবলীগে দ্বীন ও এছলাহে উম্মতের (দ্বীন প্রচার ও উম্মতের সংশোধনের সাধারণ আন্দোলনের) দিকে আমাকে আকৃষ্ট করা আল্লাহ পাকের এক বিশেষ মদদ। খোদার ফজল ও করমে আমার এমন কতকগুলি বিশেষ গুণ (বৈশিষ্ট্য) ছিল যদ্দারা কোন কোন বুজুর্গের আমার এই কাজ সম্বন্ধে পূর্ণ অবগতি না হওয়ার দরুন কখনও সন্দেহ সংশয় হইলেও আমার খাতিরে চুপ করিয়া ছিলেন ও নিজের মতানৈক্যতা প্রকাশ করেন নাই। ঐ সমস্ত বিশেষ গুণ এইঃ প্রথমতঃ আমার নিয়াজমন্দীর সম্বন্ধ নিজ জমানার সমস্ত বুজুর্গের সহিতই ছিল। আলহামদুলিল্লাহ! সকলের ফয়েজ ও বরকত ও বিশ্বাস আমার হাছিল ছিল। দ্বিতীয়তঃ আমার পিতা একজন সর্ববাদীসম্মত উচ্চস্তরের বুজুর্গ ছিলেন। নিজেদের মধ্যে বিভিন্ন মতের বিভিন্ন শ্রেণীর দ্বীনদার লোক তাঁহার উপর একমত ছিলেন। তৃতীয়তঃ আমার খানদার (বংশ) এক খাছ ইজ্জত, সম্মান ও প্রতিপত্তি সম্পন্ন খান্দান ছিল।

১৬৩. হাক্কানী ওলামাদেরকে আমার এই বাণী সসম্মানে ও আদবের…

তিনি বলেন–

হাক্কানী ওলামাদেরকে আমার এই বাণী সসম্মানে ও আদবের সহিত পৌঁছাইয়া দাও যে, আমার এই আন্দোলন সম্বন্ধে আপনাদের যাহা কিছু ভাল অভিমত ও সুদৃষ্টি হইয়াছে তাহা ঐ সমস্ত বেচারা অশিক্ষিত মেওয়াতীদের বর্ণনা দ্বারা অথবা তাহাদের মধ্যে কিছু সংশোধন পরিবর্তন দেখার দ্বারা হইয়াছে যাহারা পূর্বে গোবর পর্যন্ত পূজা করিত; এই জন্য তাহারা পুরাকালের মুশরেক হইতেও নিম্নস্তরের ছিল। (কেননা তাহারা তো সুন্দর সুন্দর মূর্তি ও চমকদার পাথরের পূজা করিত।) তাহা হইলে দেখুন তো, এইরূপ নিম্নলোকের সংবাদ দেওয়ার দ্বারা ও তাহাদের মধ্যে পরিবর্তন দেখার দ্বারা কাজের ছহীহ পরিমাপ কিভাবে হইতে পারে! আপনাদের মত বুজুর্গেরা আমার সহিত প্রত্যক্ষভাবে মিলিয়া এই কাজ বুঝিলেই আসল কদর ও কীমত জানা যাইবে।

১৬৪. আমাদের এই আন্দোলনের খাছ মকছুদ ইহা যে, মুসলমানের…

আমাদের এই আন্দোলনের খাছ মকছুদ ইহা যে, মুসলমানের সমস্ত আকর্ষণের উপর দ্বীনের আকর্ষণকে জয়ী করা এবং এই পথে উদ্দেশ্যের একতা পয়দা করিয়া ও একরামে মুসলিমের উছুলকে প্রচলিত করিয়া পুরা কওমকে নিম্নলিখিত হাদীছের উদাহরণ করাঃ

اَلْمُسْلِمُوْنَ كَجَسَدٍ وَّاحِدٍ

“সমস্ত মুসলমান এক শরীরের মত।”

১৬৫. আমাদের এই কাজে এখলাছ ও সততার সহিত সমষ্টিগতভাবে…

আমাদের এই কাজে এখলাছ ও সততার সহিত সমষ্টিগতভাবে পরস্পর পরামর্শ করিয়া (অর্থাৎ মিলিয়া মিশিয়া ও পরস্পর পরামর্শ করিয়া) কাজ করিবার বিশেষ প্রয়োজন আছে। ইহা ব্যতীত বড় বিপদ।

১৬৬. কোন কোন মুরিদকে সম্বোধন করিয়া তিনি বলেন

কোন কোন মুরিদকে সম্বোধন করিয়া তিনি বলেন–

হযরত ফারুক আজম (রাঃ) হযরত আবু ওবায়দা ও হযরত আবু জরকে (রাঃ) বলিতেন, আমি তোমাদের তত্ত্বাবধানের মুখাপেক্ষী (ঊর্ধ্বে নহি)। আমিও তোমাদিগকে ইহাই বলিতেছি যে, আমার অবস্থার প্রতি দৃষ্টি রাখিও যাহা সংশোধনের দরকার তাহা সংশোধন করিও।

১৬৭. হযরত ফারুকে আজম (রাঃ) যখন তাঁহার গভর্ণরদের নিকট…

তিনি বলেন–

হযরত ফারুকে আজম (রাঃ) যখন তাঁহার গভর্ণরদের নিকট হইতে সংবাদ লইয়া লোক আসিত তাহাদের নিকট হইতে গভর্ণরদের খাইরিয়াত ও হাল অবস্থা জিজ্ঞাসা করিতেন, কিন্তু ইহা দ্বীনি হাল অবস্থা ও দ্বীনের খাইরিয়াত জানিবার জন্য করিতেন। আজকালকার রছমী মেজাজ-পুরছী ছিল না। কোন একজন গভর্ণরের নিকট হইতে একজন বার্তাবাহক আসিলে তাহাকে গভর্ণরের খাইরিয়াত জিজ্ঞাসা করা হইলে উত্তরে বলে– “সেখানে খাইরিয়াত কোথায়? আমি তো তাহার দস্তরখানায় দুই দুই তরকারী একত্রিত দেখিয়াছি।” মনে হয় যে অবস্থায় হুজুর ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছাহাবায়ে কেরামদের (রাঃ) রাখিয়া গিয়াছিলেন সেই অবস্থার উপর কায়েম থাকাই ঐ হযরতদের নিকট খাইরিয়াতের (মঙ্গলের) মানদণ্ড ছিল।

১৬৮. আল্লাহ পাক হইতে তাঁহার ফজল ও রিজিক ইত্যাদি…

তিনি বলেন–

আল্লাহ পাক হইতে তাঁহার ফজল ও রিজিক ইত্যাদি চাওয়া তো ফরজ; কিন্তু নিজের খেদমত ও এবাদতের প্রতিদান বা পারিশ্রমিক দুনিয়াতেই চাওয়া হারাম।

১৬৯. কোন মুসলমানকে তাহার ভুল পথে চলার দরুন নিশ্চিন্তভাবে…

তিনি বলেন–

কোন মুসলমানকে তাহার ভুল পথে চলার দরুন নিশ্চিন্তভাবে কাফের বলা ও চিরস্থায়ী দোজখী বলিয়া ফতওয়া দেওয়া অতি ভারী কাজ। অবশ্য “কুফরীর নীচে কুফুরীর” উছুল ঠিক আছে, কারণ সমস্ত গোনাহই কুফরী বা না-ফরমানীর শাখা প্রশাখা। এইরূপে সমস্ত নেক কাজ ঈমানের সন্তান। সুতরাং আমাদের এই আন্দোলন প্রকৃত প্রস্তাবে ঈমানকে সজীব ও পূর্ণ করার আন্দোলন।

১৭০. তাহারা তাহাদের দ্বীনকে খেলা ও ক্রীড়ানক করিয়াছিল।”

তিনি বলেন–

اِتَّخَذُوْا دِيْنَهُمْ لَعِبًا وَّلَهْوًا

“তাহারা তাহাদের দ্বীনকে খেলা ও ক্রীড়ানক করিয়াছিল।”

দ্বীনি কাজকে উদ্দেশ্যহীনভাবে অথবা আল্লাহর আদেশ পালন করা ও খোদাকে রাজী করিবার ও পরকালে ছওয়াব পাইবার আশা ব্যতীত অন্যান্য উদ্দেশ্যে করাও দ্বীনকে খেলা ও ক্রীড়ানকে পরিণত করাই।

১৭১. মুমিনদের সম্বন্ধে ভাল ধারণা রাখ, নিশ্চয় ভাল ধারণা…

তিনি বলেন–

ظُنُّوا الْمُؤْمِنِيْنَ خَيْرًا اِنَّ حُسْنَ الظَّنِّ مِنَ الْعِبَادَةِ

“মুমিনদের সম্বন্ধে ভাল ধারণা রাখ, নিশ্চয় ভাল ধারণা এবাদতের মধ্যে গণ্য।”

এই দুইটির হুকুম ঐ অবস্থায় যখন কোন মোয়ামেলা করিতে না হয়, তখন শুধু ভাল ধারণা হইতেই কাজ লওয়া চাই। আবার যখন মোয়মেলা করিতে হইবে সেই সময়ের জন্য

الحزم سوء الظن

“বিপদ হইতে বাঁচিয়া থাকা খারাপ ধারণা করার মধ্যে”

এই হুকুম মতে চলিতে হইবে। স্থান কাল পাত্রের পার্থক্য না বুঝাতে কোরআন হাদীছে অনেক ভুল বুঝাবুঝি হইয়া থাকে।

১৭২. আমাদের সমস্ত কর্মীদের ভালভাবে বুঝিয়া নেওয়া চাই যে…

তিনি বলেন–

আমাদের সমস্ত কর্মীদের ভালভাবে বুঝিয়া নেওয়া চাই যে, তবলীগের জন্য বাহিরে থাকিবার সময় এলম ও জিকিরের প্রতি বিশেষভাবে মনোযোগ দিতে হইবে। এলম ও জিকিরে উন্নতি ব্যতীত দ্বীনি উন্নতি অসম্ভব। সঙ্গে সঙ্গে এলম ও জিকির হাছেল করা ও পূর্ণ করা এই পথের বুজুর্গদের সহিত সম্বন্ধ রাখিয়া তাঁহাদের পরিচালনায় ও তত্ত্বাবধানে হইতে হইবে। আম্বিয়া (আঃ)-দের এলম ও জিকির আল্লাহ পাকের পরিচালনায় ও তত্ত্বাবধানে হইতে। হজরতের ছাহাবায়ে কেরামের এলম ও জিকির হুজুর ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অধীনে পরিচালনায় ও তত্ত্বাবধানে হইত; তৎপর প্রত্যেক যুগের আহলে এলম ও আহলে জিকির ঐ যুগের লোকের জন্য হুজুর ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যেন স্থলাভিষিক্ত (প্রতিনিধি)। এইজন্য এলম ও জিকিরের জন্য বুজুর্গদের তত্ত্বাবধানের মুখাপেক্ষী হইতে হইবে। ইহা জরুরী যে, বিশেষভাবে বাহিরে থাকিবার সময় নিজেদের বিশেষ কাজেই মশগুল থাকা চাই। অন্যান্য সমস্ত কাজ হইতে বিরত থাকিতে হইবে। তার ঐ বিশেষ কাজ এই–

(১) তবলীগী গাশত।

(২) এলম।

(৩) জিকির।

(৪) দ্বীনের জন্য ঘর ছাড়িয়া যাহারা বাহির হইয়াছে বিশেষভাবে সেই সকল সাথীদের এবং সাধারণভাবে সমস্ত সৃষ্টিজীবের খেদমত করার মশক (অনুশীলন) করা।

(৫) তছহীহ নিয়ত ও এখলাছ ও এহতেছাবে নফছ (নফছ হইতে হিসাব নিকাশ লওয়া) এর প্রতি বিশেষ লক্ষ্য রাখা এবং নিজের নফছকে খারাপ জানিয়া বারবার এই এখলাছ ও এহতেছাবে নফছকে (নফছের হিসাব নিকাশ লওয়াকে) নুতন করিয়া লওয়া অর্থাৎ এই কাজের জন্য বাহির হইবার সময়ও ইহার কল্পনা করা এবং ছফরের মধ্যেও বারবার এই কল্পনাকে সজীব করিতে থাকা যে, আমার এই বাহির হওয়া শুধু আল্লাহর জন্য এবং পরকালের নেয়ামতের আশায় যাহা দ্বীনের খেদমত ও নছরতের (সাহায্য ও সেবার) জন্য ও এই পথের কষ্ট উঠাইবার জন্য ওয়াদা করা হইয়াছে। অর্থাৎ, বারবার মনের মধ্যে এই ধ্যান জমাইতে হইবে যে, যদি আমার এই বাহির হওয়া খালেছ হয় ও আল্লাহ পাক ইহাকে কবুল করেন তাহা হইলে আল্লাহ পাকের তরফ হইতে ঐ সমস্ত নেয়ামত নিশ্চয় মিলিবে যাহার ওয়াদা এই কাজের জন্য কোরআন পাক ও হাদীছ সমূহে করা হইয়াছে। আর তাহা অমুক অমুক হইবে। সে যাহা হউক, সকল অবস্থায়ই এই খোদায়ী ওয়াদার প্রতি একীন ও উহার আশার ধ্যানকে বারবার সজীব করিতে হইবে ও নিজের সমস্ত আমল এই একীন ও ধ্যানের সহিত বাঁধিতে হইবে। ইহারই নাম ঈমান ও এহতেছাব। বছ! ইহাই আমাদের যাবতীয় আমলের রূহ।

১৭৩. হায়! হায়!! আল্লাহর ওয়াদার প্রতি ঈমান নাই! আল্লাহর…

তিনি বলেন–

হায়! হায়!! আল্লাহর ওয়াদার প্রতি ঈমান নাই! আল্লাহর ওয়াদার প্রতি একীন ও ভরসা পয়দা কর। তৎপর এই একীন ও ভরসার বুনিয়াদের প্রতি কাজ করিবার মশ্ক কর। আল্লাহর ওয়াদার অর্থও নিজে করিও না; তোমার জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অত্যন্ত সীমাবদ্ধ। তাঁহার ওয়াদার অর্থ তাঁহার শানের উপযুক্ত বলিয়া বুঝ ও তাঁহার নিকট এইরূপভাবে চাও–

“আয় আল্লাহ! তোমার শান ও কুদরত মত এই সমস্ত ওয়াদা পূর্ণ কর।”

পরকালের নেয়ামত সমূহের সত্ত্বা ও আসল হাকীকত তোমরা এই দুনিয়ায় কি বুঝিতে পারিবে? আর কিরূপেই বা সেই পরিমাণ ছহীহ হইতে পারে? যখন হাদীছে কুদছীতে ঐ সমস্ত নেয়ামতের বর্ণনা এইভাবে দেওয়া হইয়াছেঃ–

مَا لَا عَيْنٌ رَاَتْ وَلَا اُذُنٌ سَمِعَتْ وَلَا خَطَرَ عَلٰى قَلْبِ بَشَرٍ

অর্থাৎ “বেহেশতে এমন নেয়ামত আছে যাহা কোন চক্ষু দেখে নাই, কোন কর্ণ শুনে নাই, কোনও মানুষের মনে কখনও তাহার কল্পনাও আসে না।” আফছোছ, পরিতাপের বিষয় আমরা তাহার ওয়াদাকৃত নেয়ামত সমূহকে আমরা নিজের জ্ঞান ও বুঝ এবং ইহকালের দৃশ্যও অভিজ্ঞতানুসারে মনে করিয়া ও উহার আশা করিয়া অনেক ক্ষতিতে পরিয়াছি।

لقد حجرتم واسعا

“তোমরা প্রশস্তকে সঙ্কীর্ণ করিয়াছ।”

তাঁহার দান ও বখশীশ তো তাঁহারই যোগ্য ও উপযুক্ত হইবে।

১৭৪. আমি মানব-দানবকে শুধুমাত্র আমার এবাদত করিবার জন্যই (অর্থাৎ…

তিনি বলেন– তোমরা যে পরিমাণে–

مَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْاِنْسَ اِلَّا لِيَعْبُدُوْنِ

“আমি মানব-দানবকে শুধুমাত্র আমার এবাদত করিবার জন্যই (অর্থাৎ আমার হুকুম মতে যাবতীয় কাজ করিবার জন্যই) সৃষ্টি করিয়াছি” এই আয়াতের মর্ম হইতে বিচ্যুত হইয়াছ সেই পরিমাণেইঃ

خَلَقْنَا لَكُمْ مَّا فِي السَّمٰوٰتِ وَالْاَرْضِ

“তোমাদের উপকারের জন্যই আছমান সমূহের ও জমিনের মধ্যের সমস্ত জিনিস সৃষ্টি করিয়াছি।”

এই আয়াতের মর্মের প্রকাশ পাওয়া কমিয়া গিয়াছে। অর্থাৎ যেই অনুপাতে তোমাদের আবদিয়াত (হুকুম মতে চলা) কমিয়া গিয়াছে ঠিক সেই অনুপাতে আছমান, জমিনের সৃষ্ট জিনিস হইতে তোমাদের উপকার পাওয়াও কমিয়া গিয়াছে। সৃষ্টিকে তোমাদের খাদেম এই জন্য করা হইয়াছিল যে, তোমরা আল্লাহ পাকের কাজ করিবে– তাঁহার বাধ্য থাকিবে ও বন্দেগী করিবে, তাঁহার প্রিয় জিনিস সমূহ প্রচলিত করিতে লাগিয়া থাকিবে। যখন তোমরা তোমাদের এই কর্তব্য ছাড়িয়া দিয়াছ তখন আছমান জমিনও তোমাদিগ হইতে মুখ ফিরাইয়াছে।


← আগের কিস্তি (নবম কিস্তি)  |  সূচিপত্র  |  পরের কিস্তি (একাদশ কিস্তি) →

মূল বই: মালফুজাত (নীতি-কথা) – হযরতজী মাওলানা ইলিয়াস (রহঃ)। সংকলন: মাওলানা মুহাম্মদ মনজুর নোমানী। অনুবাদ: ডক্টর মোহাম্মদ ছানাউল্লাহ (ব্যারিষ্টার)। প্রকাশক: মোহাম্মদী লাইব্রেরী, চকবাজার, ঢাকা।

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *