মালফুজাতে হযরতজী ইলিয়াস (রহঃ) – অষ্টম কিস্তি: মলফুজ ১২৪–১৩৪
হযরতজী মাওলানা মুহাম্মদ ইলিয়াস কান্ধলভী (রহঃ)-এর বাণী সংকলন মালফুজাত (নীতি-কথা) – হযরতজী মাওলানা ইলিয়াস (রহঃ) বইয়ের অষ্টম কিস্তি (মলফুজ ১২৪ থেকে ১৩৪)। সম্পূর্ণ সূচিপত্র দেখুন।
সংকলন: মাওলানা মুহাম্মদ মনজুর নোমানী। অনুবাদ: ডক্টর মোহাম্মদ ছানাউল্লাহ (ব্যারিষ্টার)। প্রকাশক: মোহাম্মদী লাইব্রেরী, চকবাজার, ঢাকা।
আল্-ফোরকানের ১৩৬৫ হিঃ জোমাদাল-উলা ও ছানী
এই কিস্তিতে যা আছে
- ১২৪. যে সমস্ত লোক ব্যক্তিগত মোয়ামেলায় বা সমষ্টিগত জীবনে…
- ১২৫. আমরা যে দ্বীনি কাজের দাওয়াত দিতেছি বাহ্যতঃ তাহা…
- ১২৬. আমি চাই যে, এখন মেওয়াতে ফরায়েজ (অর্থাৎ মৃত…
- ১২৭. আমল কম হইলে চিরকাল দোজখে থাকিতে হইবে না…
- ১২৮. প্রত্যেক কাজের শেষ অংশ নিজের কছুরী স্বীকার ও…
- ১২৯. এ’তেকাদাত (বিশ্বাস সমূহ) সম্বন্ধেও উছুল (মূলনীতি) এই যে…
- ১৩০. এক দ্বীনি মাদ্রাসার এক বিখ্যাত ওস্তাদের উল্লেখ করিয়া…
- ১৩১. আমার নিকট হাকীকী (প্রকৃত) দ্বীন এই বিশ্বজগতের আছবাবকে…
- ১৩২. পাঞ্জাবের এক দ্বীনদার মুসলমানের উল্লেখ করিয়া তিনি বলেন…
- ১৩৩. আমার নিকট সংশোধনের তরতীব এইরূপঃ (কলেমায়ে তৈয়েবার দ্বারা…
- ১৩৪. আমাদের এই দ্বীনি দাওয়াতের সমস্ত কর্মীদেরকে ভাল করিয়া…
১২৪. যে সমস্ত লোক ব্যক্তিগত মোয়ামেলায় বা সমষ্টিগত জীবনে…
যে সমস্ত লোক ব্যক্তিগত মোয়ামেলায় বা সমষ্টিগত জীবনে ইউরোপের খৃষ্টান কওমদের আচার পদ্ধতির অনুসরণ করিতেছে ও ইহাকে এই যুগে ছহীহ কার্য পদ্ধতি বলিয়া মনে করিতেছে। উহাদের চালচলনের প্রতি দুঃখ ও আফছোছ প্রকাশ করিয়া তিনি এক বৈঠকে বলেন–
“একটু চিন্তা করিয়া দেখুন, যেই কওমের আসমানী ওলুমের (অর্থাৎ হজরত মছিহ্র আনীত ওলূম) চেরাগ ওলুমে মুহাম্মদীর (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) (কুরআন ও ছুন্নার) সামনে নিভিয়া গেল; বরং আল্লাহর তরফ হইতে ‘মনছুখ’ বলিয়া সাব্যস্ত হইল ও প্রত্যক্ষভাবে তাহা হইতে আলো সংগ্রহ করা পরিষ্কারভাবে নিষিদ্ধ করিয়া দেওয়া গেল সেই কওমের মনগড়া আজে-বাজে কথা সমূহকে (অর্থাৎ ঐ সমস্ত ইউরোপিয়ান খৃষ্টান কওমের মনগড়া কথাকে) কুরআন ও ছুন্নার বাহক এই উম্মতে মুহাম্মদীয়ার (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) পছন্দ করিয়া লওয়া ও উহাকে ছহীহ্ কার্যপদ্ধতি বলিয়া মনে করা আল্লাহর নিকট কত দূর খারাপ ও কি পরিমাণ গজব আনয়নকারী হইবে? আকলের দিক হইতে দেখিতে গেলেও মুহম্মদী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) অহী (ঐশীবাণী) সংরক্ষিত থাকা সত্ত্বেও (যাহাতে জীবনে যাবতীয় ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত শাখা সমূহ সম্বন্ধে বিস্তারিত বিধি নিষেধ বিদ্যমান আছে) খৃষ্টান কওমদের আচারপদ্ধতির অনুসরণ করিতে যাওয়া কত বড় ভুল কথা। ইহা কি মুহাম্মদী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ওলুমের মস্ত বড় বে-কদরী নহে?
১২৫. আমরা যে দ্বীনি কাজের দাওয়াত দিতেছি বাহ্যতঃ তাহা…
তিনি বলেন–
আমরা যে দ্বীনি কাজের দাওয়াত দিতেছি বাহ্যতঃ তাহা অতি সাদাসিদা কাজ কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে ইহা অতি সূক্ষ্ম কাজ; কেননা এখানে শুধু করা ও করানই নহে; বরং নিজের সাধ্যমত করিয়া স্বকীয় শক্তিহীনতার একীন ও আল্লাহ পাকের শক্তি ও সাহায্যের উপর ভরসা পয়দা করা। আল্লাহর আদত এই যে, যদি আল্লাহর সাহায্যের উপর ভরসা করিয়া আমরা আমাদের সাধ্যমত কোশেশ করি তাহা হইলে আল্লাহ পাক আমাদের কোশেশ ও নড়াচড়ার মধ্যে নিজের সাহায্যকে শামিল করিয়া দেন।
وَيَزِدْكُمْ قُوَّةً اِلٰى قُوَّتِكُمْ
“আর তিনি তোমাদের মধ্যে (তাঁহার) শক্তি যোগ করিয়া দেন।”
কোরআন মজিদের এই আয়াতে এদিকে ইশারা করা হইয়াছে। নিজকে একেবারে বেকার মনে করিয়া বসিয়া থাকা ‘জবরিয়াত’ আর শুধু নিজের শক্তির উপর ভরসা করা ‘কাদরিয়াত’ (এই দুইটিই ভুল পথ)। প্রকৃত ইসলাম এই দুইয়ের মধ্যখানে অর্থাৎ চেষ্টা ও কোশেশ করিবার আল্লাহ পাক যে সামান্য শক্তি ও যোগ্যতা আমাদিগকে দান করিয়াছেন উহাকে পূর্ণভাবে আল্লাহর আদেশ পালনার্থে আমরা লাগাইয়া দেই ও উহাতে কোন কর্মী (শিথিলতা ও অলসতা) না করি; কিন্তু ফলাফল পয়দা করিতে নিজকে একেবারে শক্তি সামর্থহীন বলিয়া একীন করি ও কেবলমাত্র আল্লাহ পাকের সাহায্যের উপর ভরসা করি ও শুধুমাত্র ইহাই কার্যকারক বলিয়া বুঝিয়া লই।
তিনি বলেন– “নবী আলাইহিস্ সালামের দৃষ্টান্ত হইতে ইহার পূর্ণ বিবরণ জানিতে পারা যায়, মুসলমানদিগকে আমার দাওয়াতও শুধু ইহাই।”
১২৬. আমি চাই যে, এখন মেওয়াতে ফরায়েজ (অর্থাৎ মৃত…
তিনি বলেন–
আমি চাই যে, এখন মেওয়াতে ফরায়েজ (অর্থাৎ মৃত ব্যক্তির পরিত্যক্ত সম্পত্তি ভাগ করিবার শরয়ী পদ্ধতি) জীবিত ও প্রচলিত করিবার প্রতি সবিশেষ মনোযোগ দেওয়া হউক। এখন যে সমস্ত তবলীগী জমায়াত মেওয়াতে যাইবে তাহারা যেন ফরায়েজের পরিচ্ছেদের পুরস্কার (ওয়াদা) ও তিরস্কারগুলি (অয়ীদ) খুব ভাল করিয়া ইয়াদ করিয়া যান।”
১২৭. আমল কম হইলে চিরকাল দোজখে থাকিতে হইবে না…
এ সম্বন্ধে তিনি বলেন–
আমল কম হইলে চিরকাল দোজখে থাকিতে হইবে না; বরং একীন না থাকিলে ও মিথ্যা জানিলে চিরস্থায়ী দোজখী হইবে।
১২৮. প্রত্যেক কাজের শেষ অংশ নিজের কছুরী স্বীকার ও…
তিনি বলেন–
প্রত্যেক কাজের শেষ অংশ নিজের কছুরী স্বীকার ও কাজ কবুল না হওয়ার ভয় হওয়া চাই। (অর্থাৎ প্রত্যেক নেক কাজকে নিজের দিক হইতে উত্তম হইতে উত্তম রূপে আদায় করিবার কোশেশ করিবে, কিন্তু তৎসত্ত্বেও উহা শেষ করিবার সময় এই অনুভূতি হওয়া চাই যে, যেই রূপ আল্লাহ পাকের হক ছিল ও যেরূপ করা উচিত ছিল সেইরূপ হইতে পারে নাই। এজন্য অন্তরে এই ভয় ও সংশয় হওয়া চাই যে, আমার এই আমল নাকেছ (অসম্পূর্ণ) ও খারাপ হওয়ার দরুণ অগ্রাহ্য হইয়া কেয়ামতের দিন আমার মুখের উপর নিক্ষিপ্ত হইতে পারে। তৎপর এই অনুভূতি, ভয় ও সংশয়ের কারণে আল্লাহর সামনে কাঁদিবে ও বার বার ক্ষমা চাহিবে।
১২৯. এ’তেকাদাত (বিশ্বাস সমূহ) সম্বন্ধেও উছুল (মূলনীতি) এই যে…
তিনি বলেন–
এ’তেকাদাত (বিশ্বাস সমূহ) সম্বন্ধেও উছুল (মূলনীতি) এই যে, নিজের তরফ হইতে এ’তেকাদকে শক্ত ও মজবুতভাবে রাখিবার পূর্ণ কোশেশ করিবে। আর ইহার বিপরীত খেয়ালও অন্তরে আসিতে দিবে না; কিন্তু তৎসত্ত্বেও ভয় করিতে থাকিবে, যথাযোগ্য একীন আমার হাছিল আছে কিনা?
তিনি বলেন– ছহীহ বোখারী শরীফে এবনে-আবি-মলিকা তাবেয়ী হইতে যে হাদীছ নকল করা হইয়াছে–
لقيت ثلاثين من اصحاب النبي صلى الله عليه وسلم كلهم يخشى على نفسه النفاق
“আমি নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ৩০ জন ছাহাবীর সহিত সাক্ষাত করিয়াছি, তাঁহাদের প্রত্যেকেই নিজের উপর নেফাকের ভয় করিতেন।” উহার সারমর্মও ইহাই।
তিনি বলেন– এ’তেকাদ ও একীনের জরুরত এই জন্যও আছে যে, আল্লাহ ও রাসূল যাহা কিছু ফরমাইয়াছেন অন্তরের অন্তস্থল হইতে ভয়, ভীতি সম্মান সম্প্রীতির সহিত তাহা কবুল করিবে। এই অবস্থায় আমলও হইবে, আমলের মধ্যে প্রাণও হইবে।
১৩০. এক দ্বীনি মাদ্রাসার এক বিখ্যাত ওস্তাদের উল্লেখ করিয়া…
এক দ্বীনি মাদ্রাসার এক বিখ্যাত ওস্তাদের উল্লেখ করিয়া তিনি বলেন–
আমি তাহাকে বলিলাম, “আল্লাহর দৃষ্টি হইতে আপনাদের পড়িয়া যাওয়ার ও ইহার ফল স্বরূপ দুনিয়াদারদের দৃষ্টি হইতেও পড়িয়া যাওয়ার এক বিশেষ কারণ ইহা যে, আল্লাহ ও রাসূলের মধ্যস্থতায় যে সম্বন্ধ আছে তাহার সম্মান আপনাদের নিকট বাকী নাই; দুনিয়াদারী ও জরবাদী সম্বন্ধের চাপ আপনারা বেশী কবুল করেন। দেখুন, আমার ও আপনার সম্বন্ধে শুধু আল্লাহ ও রাসূলের জন্য; আমি আপনাকে দাওয়াত দিয়াছি, কিন্তু আপনি আসেন নাই। কিন্তু অমুকের এক চিঠি আপনার নিকট যাওয়াতে আসিয়াছেন, (অথচ তাহার মধ্যে মাত্র ইহা বেশী যে, তিনি ধনী, তাহার নিকট হইতে ও তাহার প্রভাব প্রতিপত্তি দ্বারা চাঁদা বেশী পাওয়ার আশা আছে)। আমাদের বুনিয়াদী বিমার আল্লাহ্ ও রাসূলের সম্বন্ধে তাহাদের তরফ হইতে কথা বলিলে তাহা না শুনা ও না মানা।
এ সম্বন্ধে আরও বলেন– আমি এখন মেওয়াতে এই কথা পয়দা করিতে চাই যে, তাহারা যেন নিজেদের ঝগড়া বিবাদের মীমাংসা আল্লাহ ও রাসূলের সম্বন্ধ সম্পন্ন লোকের দ্বারা শরীয়াত মত করে; আর তাহাদের অনুভূতি ও আকর্ষণ ইহা হয় যে, আল্লাহ ও রাসূলের সহিত সম্পর্কিত লোকের মীমাংসা দ্বারা অর্ধেক পাইলেও তাহাতে আগাগোড়া রহমত ও বরকত আছে; আর শরীয়ত বিরোধী মীমাংসাকারী পুরা দিয়া দিলেও তাহাতে আগাগোড়া আপদ ও বে-বরকত।
তিনি বলেন– কোরআন মজীদের এই আয়াত–
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُوْنَ حَتّٰى يُحَكِّمُوْكَ فِيْمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوْا فِيْٓ اَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوْا تَسْلِيْمًا
“কাজেই না, খোদার কসম কখনই ঈমানদার হইবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত তাহাদের ঝগড়া বিবাদে তোমাকে হাকিম না করে, তৎপর তুমি যাহা মীমাংসা করিবে তাহাতে তাহাদের মনে কোন সঙ্কীর্ণতা না পায় ও বিনা বাক্যে মানিয়া নেয়।”
আয়াতের দাবীও ইহাই। কিন্তু ইহা এক দিনে পয়দা হইতে পারে না; বরং ইহার ছুরত এই যে, প্রথম উহাদের মধ্যে আল্লাহ ও রাসূলের হুকুম মানিবার ও শরীয়তের আদেশাবলীর অনুসরণ করিবার বাসনা পয়দা করিতে হইবে ও তাহাদের স্বভাবের উপর ইহাকে জয়ী করিতে হইবে। তৎপর হেকমতের সহিত আস্তে আস্তে ইহা তাহাদের মধ্যে পয়দা করিতে হইবে যে, আল্লাহ ও রাসূলকে মানিবার কার্যকরী ছুরত ইহাই যে, আল্লাহ ও রাসূলের সহিত ছহীহ্ভাবে সম্পর্কিত লোকেরা দ্বীনের যেই সমস্ত কথা বলিবে তাহা গাম্ভীর্যপূর্ণভাবে সম্মানের সহিত মানিবে ও স্ফূর্তির সহিত তন্মধ্যে আমল করিবে। ইহাই জিন্দেগীর দিক পরিবর্তন করিয়া দিবে।
১৩১. আমার নিকট হাকীকী (প্রকৃত) দ্বীন এই বিশ্বজগতের আছবাবকে…
তিনি বলেন–
আমার নিকট হাকীকী (প্রকৃত) দ্বীন এই বিশ্বজগতের আছবাবকে আল্লাহ পাকের গুপ্ত আদেশের পর্দা বলিয়া মনে করা এবং ইহার একিন করা যে, এই পর্দার আড়ালে আসল কর্মকর্তা আর কেহ আছেন এবং তাহারই কর্ম ও আদেশই হাকীকী ছবব (কারণ) যেন বাহিরের আছবাবের (স্থলে) পরিবর্তে আল্লাহ পাকের গায়েবী (অদৃশ্য) আদেশকেই আসল ছবব বলিয়া মনে করা হয়। (তৎপর জাহেরী আছবাবে কোশেশ করা হইতে বেশী কোশেশ আল্লাহকে রাজী করিবার জন্য করতঃ তাহা দ্বারা পূর্ণ করাইয়া লওয়া হয়।)
তিনি বলেন– কোরআন মজীদেরঃ
وَمَنْ يَّتَّقِ اللّٰهَ يَجْعَلْ لَّهٗ مَخْرَجًا ۙ وَّيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ
“যে আল্লাহকে ভয় করে আল্লাহ তাহার জন্য (যে, কোন মুশকিল হইতে বাহির হইবার) রাস্তা করিয়া দেন; আর তাহার ধারণা ও কল্পনার অতীত রাস্তা দিয়া তাহাকে রিজিক দিয়া থাকেন।” এই আয়াতে গভীরভাবে চিন্তা কর।
১৩২. পাঞ্জাবের এক দ্বীনদার মুসলমানের উল্লেখ করিয়া তিনি বলেন…
পাঞ্জাবের এক দ্বীনদার মুসলমানের উল্লেখ করিয়া তিনি বলেন– তিনি যখন সর্বপ্রথম এখানে আসেন তখন ঘটনাচক্রে আমি এব্নে মাজা শরীফের ছবক পড়াইতেছিলাম। তিনি ছালাম করিলেন, কিন্তু আমি হাদিছের দরছে ব্যস্ত থাকায় ছালামের জওয়াবও দিলাম না। তৎপর তিনি তথায় বসিয়া পড়িলেন। কিছুক্ষণ পর (ছবকের মধ্যেই) তিনি বলিলেন, “আমি অমুক জায়গা হইতে আসিয়াছি।” আমি ইহার কোন উত্তর দিলাম না। অল্পক্ষণ পরে তিনি উঠিয়া চলিয়া যাইতে লাগিলেন, তখন আমি তাহার নিকট জিজ্ঞাসা করিলাম, “আপনি কেন আসিয়াছিলেন?” তিনি উত্তর দিলেন, “জেয়ারতের জন্য।” আমি বলিলাম, “যেই জেয়ারতের জন্য হাদীছ সমূহে উৎসাহিত করা হইয়াছে ও ফজিলত আসিয়াছে উহা কেবল কাহারও চেহারা দেখা নহে; ইহা তো কাহারও ফটো দেখার মত হইল; শরয়ী জেয়ারতের অর্থ এই যে, তাহার নিকট কথা জিজ্ঞাসা করা ও শুনা। আপনি তো আপনার কথাও কিছু বলিলেন না আর আমার কথাও কিছু শুনিলেন না।” তিনি বলিলেন, “আমি কি থাকিয়া যাইব?” আমি বলিলাম, “নিশ্চয়।” কাজেই তিনি থাকিয়া গেলেন।
তৎপর তিনি যখন আমার কথা কিছু শুনিলেন ও বুঝিলেন এবং এখানকার কাজকর্ম দেখিলেন তখন তাহার বড় ভাইকে ডাকাইলেন। যদি আমি ঐ সময় ঐভাবে তাহার সহিত কিছু কথাবার্তা বলিতাম তাহা হইলে যাহাকিছু পরে হইল তাহার কিছুই হইত না। আর তিনি শুধুমাত্র জেয়ারত করিয়াই চলিয়া যাইতেন।
তিনি বলেন– সময়ের পরিবর্তে দ্বীনি পরিভাষাও পরিবর্তিত হইয়াছে।
উহার রূহ বাহির হইয়া গিয়াছে। মুসলমানের সহিত মুসলমানের মিলনের ফজিলত মিলনে দ্বীনের কথাবার্তা হয় বলিয়াই হইয়াছে; যেই মিলনে দ্বীনের জিকির ফিকির হয় না তাহা প্রাণহীন।
১৩৩. আমার নিকট সংশোধনের তরতীব এইরূপঃ (কলেমায়ে তৈয়েবার দ্বারা…
তিনি বলেন–
আমার নিকট সংশোধনের তরতীব এইরূপঃ (কলেমায়ে তৈয়েবার দ্বারা ঈমানী অঙ্গিকার তাজা করিবার পর) সর্বাগ্রে নামাজ ঠিক ও পরিপূর্ণ করার ফিকির করা চাই। নামাজের বরকতেই বাকী পূর্ণ জিন্দেগীকে ঠিক হওয়ার চিরস্থায়ী ফোয়ারা– নামাজ ছহীহ ও পরিপূর্ণ হইলেই অবশিষ্ট জীবনে যোগ্যতা ও পরিপূর্ণতা (কামাল) আপন হইতেই আসিবে। (এই বিষয়ে বিস্তারিত জানিবার জন্য মাওলানা মনজুর নো’মানীর ‘নামাজ’ নামক রেছালা দেখুন)।
১৩৪. আমাদের এই দ্বীনি দাওয়াতের সমস্ত কর্মীদেরকে ভাল করিয়া…
তিনি বলেন–
আমাদের এই দ্বীনি দাওয়াতের সমস্ত কর্মীদেরকে ভাল করিয়া বুঝাইয়া দেওয়া চাই যে, তবলীগী জময়াতগুলি বাহির হইবার উদ্দেশ্য শুধু অন্যকে পৌঁছাইয়া দেওয়া ও হেদায়েত করা নহে; বরং এই উপায়ে নিজের (এছলাহ) সংশোধন ও শিক্ষা তালীম তরবিয়তও উদ্দেশ্য বটে। কাজেই বাহিরে থাকা কালে এলম ও জিকিরে মশগুল থাকার বিশেষ ব্যবস্থা করিতে হইবে। দ্বীনের এলম ও জিকিরের বিশেষ ব্যবস্থা ব্যতীত বাহির হওয়ার কোনই মূল্য নাই। ইহাও জরুরী যে, এই এলম ও জিকিরে মশগুল থাকাও এই পথের বুজুর্গদের সহিত সম্বন্ধ রাখিয়া তাঁহাদের নির্দেশাবলী মানিয়া ও তাঁহাদের তত্ত্বাবধানে হইতে হইবে। পয়গাম্বরদের (তাঁহাদের উপর শান্তি বর্ষিত হউক) তত্ত্বাবধানে এলম ও জিকির আল্লাহর নির্দেশ মত ছিল। ছাহাবায়ে কেরাম (রাঃ) হুজুর ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হইতে এলম ও জিকিরের তালিম পাইতেন ও হুজুর ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পুরাপুরিভাবে তাঁহাদের তত্ত্বাবধান করিতেন। এইভাবে প্রত্যেক যুগের লোকেরা নিজেদের বুজুর্গদের নিকট হইতে এলম ও জিকিরের তালিম পাইতেন ও তাঁহাদের তত্ত্বাবধানে ও নেতৃত্বে পূর্ণ করিতেন। এইরূপে আজও আমরা আমাদের বুজুর্গদের তত্ত্বাবধানের মুখাপেক্ষী (মোহ্তাজ)। অন্যথায় শয়তানের জালে আটকাইয়া যাইবার বড়ই সম্ভাবনা আছে।
← আগের কিস্তি (সপ্তম কিস্তি) | সূচিপত্র | পরের কিস্তি (নবম কিস্তি) →
মূল বই: মালফুজাত (নীতি-কথা) – হযরতজী মাওলানা ইলিয়াস (রহঃ)। সংকলন: মাওলানা মুহাম্মদ মনজুর নোমানী। অনুবাদ: ডক্টর মোহাম্মদ ছানাউল্লাহ (ব্যারিষ্টার)। প্রকাশক: মোহাম্মদী লাইব্রেরী, চকবাজার, ঢাকা।
