|

মালফুজাতে হযরতজী – পর্ব ৫: বাণী ৮১–১০০

হযরতজী মাওলানা মুহাম্মদ ইউসুফ কান্ধলভী (রহঃ)-এর বাণী সংকলন মালফুজাতে হযরতজী মাওলানা ইউসুফ (রহঃ) বইয়ের ৮১ থেকে ১০০ নম্বর বাণী এই পর্বে দেওয়া হলো। সম্পূর্ণ সূচি ও বইয়ের ভূমিকা দেখুন।

সংকলন: মুফতি রওশন শাহ কাসেমী। অনুবাদ: ইসহাক ওবায়দী। প্রকাশক: বাড কম্প্রিন্ট এন্ড পাবলিকেশন্স, ঢাকা।

এই পর্বে যা আছে


৮১. ইসলামী মেজাজ বানানোর পদ্ধতি

হজরতজী বলেন— সবার আগে কাজ এই যে, নিজের মেজাজকে ইসলামের মোতাবেক বানিয়ে নেয়া চাই। আর এটা তখন হবে, যখন এ কথার একীন সৃষ্টি হয়ে যাবে যে, কোন মাখলুক থেকে কিছু হয়না, (যা হয়) সব আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়। আর অবস্থার ভালো-মন্দ এবং নির্মাণ ও ধ্বংস এবং কামিয়াবী ও নাকাম হওয়া বা কৃতকার্য ও অকৃতকার্য হওয়া বস্তুর হওয়া না হওয়ার দ্বারা হয় না; বরং আল্লাহ তায়ালার সিদ্ধান্তে হয়। আর আল্লাহ তায়ালা বানানোর এবং চমকানোর ফয়সালা তখন করবেন যখন আমি হুজুর (স)-এর তরীকার ওপর এসে যাবো। অতএব এই রাস্তায় চলার জন্য বাইরের কোন জিনিস নয় বরং আভ্যন্তরীণ জিনিসের প্রয়োজন। আল্লাহর একীন প্রয়োজন, আল্লাহর ধ্যান প্রয়োজন, আল্লাহর ভয় প্রয়োজন। হুজুর (স)-এর তরীকায় আল্লাহর ভান্ডারসমূহ পাওয়ার এবং নেয়ামতসমূহের দুয়ার খোলার একীন হতে হবে।

(সাওয়ানেহে হজরতজী-পৃঃ ৭১৯)

৮২. এই কাজের সাথে জুড়তে থাক, আমার দেহ তো অস্থায়ী

মেওয়াতীদেরকে হজরতজী বলেন— তোমাদের মধ্যে অনেকে শুধু আমার সাথে সাক্ষাৎ এবং মোসাফাহার নিয়তে আসে এবং চলে যায়। আমি বলি, এই কাজের আজমত বুঝ, যার কারণে আল্লাহ তায়ালা তোমাদের অন্তরে আমার মহব্বত এবং ভক্তি ঢেলে দিয়েছেন, এই কাজের মধ্যে নিজের সময়, জান এবং মাল লাগাও এবং এই কাজের সাথে প্রেম সৃষ্টি কর। আমার দেহ তো অস্থায়ী।

(তাযকেরায়ে মাওলানা ইউসুফ (রহঃ)-পৃঃ ১৯৩)

৮৩. তাকওয়া সৃষ্টি করে আল্লাহ থেকে লওয়াই সঠিক রাস্তা

হজরতজী বলেন— বর্তমানে দুনিয়াতে শুধু বস্তু এবং বস্তুবাদী জিনিসের

ওপর মেহনত করার প্রচলন আছে। তাকওয়া সৃষ্টি করে এবং আল্লাহ তায়ালার সাথে বিশুদ্ধ সম্পর্ক কায়েম করে আল্লাহ তায়ালার ফজল ও করম থেকে লওয়ার রাস্তা মানুষ ভুলে গেছে। অথচ এটাই রাস্তা, যার দোয়া প্রতিটি নামাজে, প্রতিটি রাকাতে করা হয়। আল্লাহর সমস্ত নবী, রাসূল এবং তাঁর রাস্তায় চলনেওয়ালা সমস্ত মকবুল বান্দাদের রাস্তা এটাই। আর এর উল্টো যে সমস্ত লোক আল্লাহর হেদায়েত থেকে বঞ্চিত, এবং যাদের ওপর আল্লাহর গজব আছে, তাদের রাস্তা এই যে, তারা আল্লাহর সত্তা ও গুণাবলীর একীন এবং এবাদত ও সাহায্য চাওয়া থেকে সম্পূর্ণ বেপরোয়া ও বে ফিকির হয়ে শুধু বস্তুবাদী লাইনের ওপর মেহনত করে।

(সাওয়ানেহে হজরতজী-পৃঃ ৭৪৩)

৮৪. যাদের মধ্যে নেয়ার মন-মানসিকতা, তাদের মধ্যে দেয়ার পদ্ধতি কিভাবে চলবে?

হজরতজী বলেন— এখন বলা হয় যে, বর্তমান সময়ে ইসলাম চলতে পারে না, কথা তো সত্য, লওয়ার মন-মানসিকতা যাদের, তাদের মধ্যে দেয়ার পদ্ধতি কিভাবে চলবে? ইসলামকে নিজের মন চাহি মতে এবং নিজের অবস্থা অনুযায়ী বানিয়ে চালাতে চাইলে তো তা ইসলাম থাকবেনা, তা তো তোমাদের বানানো একটা নতুন জিনিস হয়ে যাবে।

কেউ শরীরের মধ্যে নকশা আঁকিয়ে ব্যক্তির কাছে বাঘের ছবি নিজের শরীরের ওপর আঁকাতে চেয়েছে, যখন সে সূঁই দিয়ে শরীরে আঁকা শুরু করলো, এবং ব্যথা লাগলো, তখন আঁকিয়েকে বললো যে, কি বানাতে আছো? সে বললো, “প্রথমে বাঘের লেজ বানাচ্ছি”। ঐ ব্যক্তি বললো, “লেজ থাক, লেজ ছাড়াও বাঘের ছবি হতে পারে।” সে লেজ বাদ দিলো এবং অন্য দিক থেকে আঁকা শুরু করলো, এখন সে বললো, এখন কি বানাচ্ছো? যা বললো, “কান বানাচ্ছি” সে বললো, “কান ছাড়াও বাঘের ছবি বানাতে পারে, তুমি কান বাদ দাও, কান ছাড়া বাঘের ছবি বানিয়ে দাও।” তো ভাই বন্ধুরা! এ অবস্থাই ইসলামের সাথে হচ্ছে। নিজের মেজাজ পরিবর্তন হয়ে যাওয়ার কারণে ইসলামের ওপর চলা কষ্টকর হচ্ছে, তাই ইসলামের লেজ কাটা হচ্ছে এবং তাকে নিজের খাহেশ মোতাবেক বানানো হচ্ছে।

(সাওয়ানেহে হজরতজী (রহঃ)-পৃঃ ৭১৮)

৮৫. তর্ক-বিতর্ক এবং মতভেদওয়ালা মাস্লা-মাসায়েল থেকে বাঁচা চাই

হজরতজী বলেন— এই দাওয়াতওয়ালা কাজ উম্মতের প্রতিটি ব্যক্তির জন্য নিজের জান-মাল খরচ করার একটা বিশেষ পদ্ধতির অভ্যাস করা। এই জন্য এমন সব অবস্থা থেকে বাঁচা চাই, যা এই অভ্যাসের মধ্যে জান-মাল খরচে কমতি হওয়ার কারণ হয়। অথবা নাম ফোটানো এবং প্রসিদ্ধি লাভ ও সম্মানের দিকে অভ্যাসকারীদেরকে টানে যে এমন হয়।

দৃষ্টান্ত স্বরূপ, সফর আপন আপন খরচের ওপর করাতে হবে, অন্যের খরচের ওপর নয়। এবং পত্র-পত্রিকা ও এন্তেহার এবং প্রত্যেক প্রচলিত প্রপাগান্ডা থেকে বাঁচাতে হবে। এবং তর্ক-বিতর্ক থেকে আর মতভেদ ওয়ালা মাস্লা-মাসায়েল থেকে এবং সময়ের মতভেদ সৃষ্টিকারী অবস্থাগুলো থেকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। আর যত্দূর সম্ভব সহনশীলতা, সরলতা, বিনয়, বশ্যতা, এবং অস্থায়ী খাহেশের কোরবানীর সাথে এই অভ্যাসকে বাড়াতে হবে, এবং ছড়াতে হবে, এটাই এই কাজের মেজাজ, যার কারণে এ কাজের প্রভাব আল্লাহর ফজল ও করমে বাড়তে আছে। কেননা, এর মধ্যে হুজুর (স) এবং তাঁর মোবারক সাহাবায়ে কেরামের (রা) মেহনতের পদ্ধতি ও রীতিকে সামনে রাখা হয়েছে। এখন যতোটা তাঁদের মতো করে করার মধ্যে পা বাড়বে, অতোটুকুই তার প্রভাব বিস্তার লাভ করবে। আর যতোটুকু তার মধ্যে কমতি আসবে, প্রভাবও ততোটা কমে যাবে।

(মকতুবাতে আকাবেরে তাবলীগ-পৃঃ ১৫১)

৮৬. মৌলিক বিষয় এবং শাখা প্রশাখা উভয়ের শিক্ষাদান

হজরতজী বলেন— হুজুর (স)-এর শিক্ষাদানকারী বস্তুসমূহ নিজের মধ্যে শেষ দরজার শিক্ষা দেয়ার শান রাখে। এবং তার মধ্যে যবরদস্ত শক্তি বিদ্যমান আছে। মৌলিক ও শাখা প্রশাখা উভয় বিষয়ে সে শিক্ষা দেয়। যদি তোমাদের অভিপ্রায় শাখা প্রশাখা এবং দরবারে এলাহীর নিচুমানের বস্তুদের দিকে হয়, তাহলে তারাও শক্তি পাবে এবং তাদের শিক্ষা-দীক্ষাও হবে। এটাও হুজুর (স)-এরই জিনিস। জানিনা, আল্লাহ পাকের দরবার থেকে কি না কি দেয়া হবে। কিন্তু এ সত্ত্বেও আসল জিনিসের শিক্ষা এবং তার উন্নতি ও পুরস্কার থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণ হয়ে না জানি কতো মখলুকের কতো বড়সড় উন্নতি ধ্বংস হয়ে তাঁর পক্ষ থেকে পুরস্কার ও বিনিময় থেকে বঞ্চিত হয়ে আল্লাহ না করুক কোথাও ধরা খাওয়ার কারণ না হয়ে যায়। আমি নিজের বন্ধুদের জন্য এর বড় আশংকা অনুভব করছি।

(মকতুবাতে আকাবেরে তাবলীগ- পৃঃ ১৪৪)

৮৭. এই দ্বীনি কাজের উদ্দেশ্য

হজরতজী বলেন— আংশিক বা ক্ষুদ্র আমলকে প্রসারিত করা উদ্দেশ্য নয়; বরং সৃষ্টির ওপর শক্তিসমূহের অনবরত খরচ হওয়ার কারণে যেই মানবিক বিশ্বাস ও একীনের ওপর সৃষ্টিজগতওয়ালা ধুলা-বালি পড়ে যাতে বারিতায়ালা থেকে উপকৃত হওয়ার মতো যোগ্যতা ও গুণাবলী এবং অবস্থাসমূহ বন্ধ হয়ে গেছে, সেই একীন ও বিশ্বাসকে যাতে বারি তায়ালার সাথে সম্পর্কিত করার জন্য ঈমান ও একীনের জন্য জানসমূহ ব্যবহার করার এবং হুকুমসমূহ পালন করার জন্য ঘর থেকে বের হয়ে এই রাস্তার আঘাত খেতে খেতে এবং অন্যদেরকে এই সমস্ত আদেশ পালনার্থে যাতে বারি তায়ালা থেকে উপকৃত হওয়ার ওপর উদ্বুদ্ধ করে এই রাস্তার হোঁচট খাওয়ার জন্য বের করতে করতে জান ব্যবহারকারীদের নিজেদের জান ব্যবহার করার মধ্যে আল্লাহ তায়ালার সাথে ঐ একীন ও ভরসা, দাওয়াত ও সময় লাগানো এবং কান্না-কাটি উদ্দেশ্য। যার দ্বারা তিনি অন্তরসমূহকে পরিবর্তন করে সাধারণ অবস্থাকে ঠিক করে মানবতার নিজ গুণাবলী ও যোগ্যতাওয়ালা উন্নতির দুয়ারকে সমস্ত জগতবাসীর জন্য প্রশস্ত করবে।

(মকতুবাতে আকাবেরে তাবলীগ-৬৯)

৮৮. মেশিন প্রস্তুতকারীই তার ব্যবহার বা চালানোর পদ্ধতি বলে দেয়

হজরতজী বলেন— যে ব্যক্তি মেশিন বানায়, সেইই তার চালানোর পদ্ধতি এবং ভালো-মন্দের কথাও জানে। যেভাবে মেশিনপত্র বাইরে থেকে আমদানী করা হয়, তাদের সাথে প্রস্তুতকারীদের পক্ষ থেকে চালানোর পদ্ধতি সম্পর্কে নির্দেশাবলীও সাথে আসে।

মানুষকে আল্লাহ তায়ালা আপন কুদরত দ্বারা বানিয়েছেন। মায়ের পেটে রেখে বানিয়েছেন, যেখানে অন্য কারো হাতও লাগতে পারেনা; বরং দৃষ্টিও যেতে পারেনা, সেই আল্লাহই জানেন যে মানুষের এই মেশিন কিভাবে ব্যবহার হওয়ার মধ্যে তার ভালো এবং উন্নতি। আর কিভাবে ব্যবহার হওয়ার মধ্যে তার মন্দ ও ধ্বংস। তিনি নবীদেরকে একথাই বলার জন্য পাঠিয়েছেন এবং সবার শেষে হজরত মোহাম্মদ (স)-কে পাঠিয়েছেন। এখন যেব্যক্তি হুজুর (স)-এর তরীকা মোতাবেক নিজেকে ব্যবহার করবে সে কামিয়াব হবে। আর যে তাঁর তরীকার খেলাপ নিজেকে ব্যবহার করবে, সে অকৃতকার্য হবে। আর তার অকৃতকার্যতা পুরোপুরি ভাবে আখেরাতে প্রকাশ পাবে।

(তাযকেরায়ে হজরতজী-পৃঃ ১৩২)

৮৯. যদি নেয়ার মনোভাব হয়, তাহলে নষ্টই নষ্ট হবে

হজরতজী বলেন— যদি নেয়ার মনোভাব হয় তাহলে নষ্টই নষ্ট হবে। এবং মানুষের নিয়তসমূহ নষ্ট হয়ে যাবে, তখন এই হবে যে, পঞ্চাশ লক্ষ টাকার ঠিকাদারী বিলের ওপর শুধু দশ লক্ষ টাকার লাগিত লাগানো হবে। যার কারণে পুল দুর্বল হবে। কোন রাস্তা ঠিক হবেনা। কোন কাজই ঠিক হবে না। খুব ভালো করে বুঝে নাও। নেয়ার চিন্তা থেকে কোন নির্মাণ হয় না। নির্মাণ ও উপকার পৌঁছানো অন্যকে দেয়ার তরীকায় হতে পারে। আর উপকার পৌঁছানোর মন-মানসিকতা তখনই হতে পারে এবং নিজের কাছে থাকা জিনিস অন্যের ওপর লাগানোর পদ্ধতি তখনই চালু হতে পারে, যখন এই একীন অন্তরে বসে যায় যে, দেনেওয়ালা তো শুধু আল্লাহ তায়ালা, বস্তু থেকে কিছুই হয়না। আল্লাহর করার দ্বারা হয়, আর যখন আমি তাঁর সন্তুষ্টি মোতাবেক ব্যবহার হবো, তখন আল্লাহ আমার সমস্ত কাজ ঠিক করে দেবেন এবং নেয়ামতের দরজাসমূহ খুলে দেবেন।

(তাযকেরায়ে হজরতজী-পৃঃ ১৩৪)

৯০. জুমার নামাজ না পড়ার ওপরও এতোটা ধর-পাকাড় হবেনা, যতোটা উম্মতের ঐক্য ভাঙ্গার ওপর হবে

হজরতজী বলেন— এই উম্মত হুজুর (স)-এর মোবারক রক্ত এবং অভুক্ত থাকার মাধ্যমে গড়েছে। আর এখন আমরা নিজেদের সামান্য সামান্য কথার ওপর উম্মতকে ভেঙ্গে ফেলছি। স্মরণ রাখো! জুমার নামাজ ছাড়ার দ্বারাও এতো ধর-পাকাড় হবেনা, যতোটা উম্মতকে ভাঙ্গার দ্বারা হবে।

যদি মুসলমানদের মধ্যে উম্মতের ঐক্য এসে যায়, তাহলে তাঁরা পৃথিবীতে কক্ষনো অপমান এবং বেইজ্জত হবেনা। আমেরিকা-রাশিয়ার শক্তিও তাদের সামনে নত হয়ে যাবে। আর উম্মতের ঐক্য তখনই আসবে, যখন “أذلة على المؤمنين”-এর ওপর (অর্থাৎ মোমেনদের ওপর নম্র থাকা) মুসলমানদের আমল হবে। অর্থাৎ প্রতিটি মুসলমান অন্য মুসলমানের মোকাবেলায় নিজে ছোট হয়ে যাবে, এবং অপমান ও বিনয় অবলম্বন করাকে আপন করে নেবে। তাবলীগের মধ্যে এরই মশ্ক্ বা অভ্যাস করা হয়। যখন মুসলমানদের মধ্যে “أذلة على المؤمنين” ওয়ালা সিফত বা গুণ এসে যাবে, তখন তারা পৃথিবীতে “أعزة على الكافرين” অর্থাৎ কাফেরের মোকাবেলায় যবরদস্ত এবং বিজয়ী অবশ্যই হবে। চাই সে কাফের ইউরোপের হোক বা এশিয়ারই হোক।

(তাযকেরায়ে হজরতজী-পৃঃ ১৫৭)

৯১. উম্মত কোন একটা গোষ্ঠি এবং এলাকার বাসিন্দাদের নাম নয়

হজরতজী বলেন— উম্মত কোন একটি গোষ্ঠি এবং এলাকার বাসিন্দাদের নাম নয়। বরং হাজার হাজার গোষ্ঠি এবং এলাকাকে জুড়ে উম্মত গঠিত হয়, যে ব্যক্তি কোন এক গোষ্ঠি অথবা এলাকাকে আপন মনে করে, আর অন্যদেরকে পর মনে করে, সে উম্মতকে জবাই করে এবং তাকে টুকরো টুকরো করে এবং হুজুর (স) ও সাহাবায়ে কেরাম (রা)-এর মেহনতের ওপর পানি ঢেলে দেয়।

টুকরো টুকরো হয়ে উম্মতকে প্রথমে স্বয়ং আমরা জবাই করেছি; ইহুদি-নাসারারা তো এরপর কয়েকবার উম্মতকে কেটেছে। যদি মুসলমান এখন আবার উম্মত হয়ে যায়, তাহলে পৃথিবীর সমস্ত শক্তি একত্র হয়ে তাঁদের চুলও বাঁকা করতে পারবেনা। এটম বোম আর রকেট তাদেরকে শেষ করতে পারবেনা। কিন্তু যদি তারা গোষ্ঠিগত এবং আঞ্চলিক তরফদারীর কারণে পরস্পর উম্মতকে টুকরো করতে থাকে, তাহলে খোদার কসম তোমাদের অস্ত্র এবং তোমাদের সেনাবাহিনী তোমাদেরকে বাঁচাতে পারবেনা।

(তাযকেরায়ে হজরতজী-পৃঃ ১৫১)

৯২. যা কুদরত দ্বারা গঠিত হয়েছে তা কুদরতের অধীন

হজরতজী বলেন— আল্লাহ তায়ালা মানুষের সমস্ত কামিয়াবীর শর্ত মানুষের অভ্যন্তরের পুঁজির ওপর রেখেছেন। সফলতা এবং অসফলতা মানুষের ভেতরকার অবস্থার নাম।

আল্লাহ জাল্লা শানুহু মুল্ক ও মালের সাথে মানুষকে বেইজ্জত করে দেখিয়ে দিয়েছেন। আর অভাব-অনটন ও দারিদ্রের নকশার মধ্যে ইজ্জত দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন। মানুষের ভেতরকার একীন এবং ভেতর থেকে বের হওয়া আমল যদি ঠিক হয়ে যায়, তাহলে আল্লাহ জাল্লা শানুহু কামিয়াবীর অবস্থা সৃষ্টি করে দেবেন। চাই বস্তুর নকশা যতোই নিচুমানের হোকনা কেনো। যা কিছু কুদরত দ্বারা গঠিত হয়, তা কুদরতের অধীন। প্রতিটা আকৃতির ওপর চাই মুলকের হোক বা মালের হোক, বিদ্যুতের হোক বা গ্যাসের হোক, তাঁরই কুদরতের কজা এবং তাতে তাঁরই জোর খাটে। যেখান থেকে মানুষের নির্মাণ নজরে আসে, সেখান থেকে ধ্বংস এনে দেখিয়ে দেন। আর যেখান থেকে ধ্বংস নজরে আসে সেখান থেকে নির্মান এনে দেখিয়েছেন।

(তাবলীগি তাহরীক-পৃঃ ৪০)

৯৩. আল্লাহর কুদরত দ্বারা সরাসরি উপকৃত হওয়ার পদ্ধতি

হজরতজী বলেন— আল্লাহ জাল্লা শানুহুর মহান সত্তার সাথে সম্পর্ক সৃষ্টি হয়ে যাক, এবং তাঁর কুদরত দ্বারা সরাসরি উপকৃত হোক। এর জন্য হুজুর (স) আল্লাহর পক্ষ থেকে পদ্ধতি নিয়ে এসেছেন। যখন তাঁর তরীকা জীবনসমূহে এসে যাবে, তখন আল্লাহ জাল্লা শানুহু প্রতিটি নকশায় কামিয়াবী দিয়ে দেখিয়ে দেবেন।

(তাবলীগি তাহরীক-পৃঃ ৪০)

৯৪. অমুসলিমদের মধ্যে দাওয়াতের কাজ শুরু না করার কারণ

হজরতজী বলেন— প্রথমে নিজেদের অপরাধের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাও। তার পর ভবিষ্যতের তৌফীক এবং উম্মতের জন্য অনেক বেশী বেশী কোরবানী দেয়াকে এবং উম্মতের হেদায়েতকে আল্লাহর কাছে চাও। ধুলা-বালি উম্মতের মহব্বতের স্ফুলিঙ্গকে দাবিয়ে রেখেছে। আল্লাহর কাছে চাও যে, তিনি যেনো এই ধুলা-বালিকে সরিয়ে দেন এবং স্ফুলিঙ্গকে বাড়িয়ে দেন। কাফেররাও উম্মতে দাওয়াত, তাদের জন্যও দোয়া করা চাই। যদিও নিজেদের মুসলমান ভাইদের বেদ্বীনির কারণে আমরা তাদের মধ্যে এখন পর্যন্ত দাওয়াতের কাজ শুরু করতে পারিনি, কিন্তু আমাদের ওপর তাদের হক আছে। তাদের হেদায়েতের জন্যও দোয়া কর। সাথে সাথে ঐ সমস্ত কাফের যারা বদতর, এবং খারাবির গলিপথ, যাদের অন্তরের ওপর আল্লাহ সীল মেরে দিয়েছেন, তাদের ধ্বংসের দোয়াও কর।

(তাবলীগি তাহরীক-পৃঃ ৮৪)

৯৫. হুজুর (স)-এর মেহনতের ময়দান কেয়ামত পর্যন্ত আগমনকারী সমস্ত জাতিসমূহ

হজরতজী বলেন— মেহনতের মাঠ যতোটা প্রশস্ত হবে, অতোটুকুই নূর বেশী ভাগ্যে জুটবে। আমাদের তোমাদের এবং সকলের সর্দার হজরত মোহাম্মদ (স)-এর দাওয়াত এবং মেহনত জগতব্যাপী ছিলো। অন্যান্য নবীদের মেহনত আঞ্চলিক এবং বিশেষ জাতি-গোষ্ঠি পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিলো। হুজুরে পাক (স)-এর মেহনতের ময়দান সমস্ত জগত এবং কেয়ামত পর্যন্ত আগত সমস্ত জাতি-গোষ্ঠি।

(তাযকেরায়ে মাওলানা ইউসুফ-পৃঃ ১৯৬)

৯৬. হুজুর (স)-এর তরীকা ও পদ্ধতির কারণে তোমাদের এই ঝুপড়িগুলো মূল্যবান হয়েছে

হজরতজী বলেন— যদি তোমরা নিজের দোকানে, নিজের কাম-কাজের মধ্যে এবং নিজের চাল-চলনের মধ্যে হুজুর (স)-এর চাল-চলনকে প্রবেশ করিয়ে নাও, এবং সব কিছু হুজুরে পাক (স)-এর তরীকায় কর, তাহলে এই তরীকায় বানানো ঝুপড়ি কাফের-মুশরেকদের লক্ষ লক্ষ টাকায় বানানো অট্টালিকা থেকে মূল্যবান। আর যদি তোমরা নিজেদের ঘরের নকশায় হুজুর (স)-এর তরীকার ওপর আমল কর, তবে তোমাদের ঝুপড়িকে রকেট ভাংতে পারবেনা। হুজুর (স)-এর চাল-চলনের কারণে তোমাদের এই সমস্ত ঝুপড়ি মূল্যবান, যা তোমরা মূল্যহীন মাটি দিয়ে বানিয়েছো। মূল্য তো হুজুর (স)-এর তরীকার। যদি সাত আসমান ও সাত তবক জমিন প্রাসাদ হয়, আর সব স্বর্ণ দ্বারা পূর্ণ করা হয়, তবে তা হুজুর (স)-এর তরীকায় বানানো আশ্রয়স্থল এবং পায়খানার জায়গারও সমান নয়। এবং বিশ্বাস কর যে, হুজুর (স)-এর জীবন ব্যবস্থার দ্বারা আল্লাহকে পাওয়া যাবে, অবস্থা ঠিক হয়ে যাবে, আর যদি ইহুদ-নাসারাদের রাস্তায় জীবন-যাপন কর, তবে অবস্থা ধ্বংস থেকে ধ্বংসের দিকে চলে যাবে।

(হজরতজী কি এয়াদগার তাকরীরেঁ-পৃঃ ৬৩)

৯৭. আমাদের একীনের অবস্থা

হজরতজী বলেন— যদি কোন ফাসেক এবং মিথ্যুক ব্যক্তি তোমাদের কাছে এ ধরনের খবর দেয় যে, কোন গোষ্ঠী অথবা ব্যক্তি তোমাদের জান-মালের ব্যাপারে খারাপ ইচ্ছা পোষণ করছে, তখন এই ব্যক্তির মিথ্যুক হওয়াটা তোমাদের কাছে স্বীকৃত হওয়া সত্ত্বেও তোমরা নিজেদের জান-মালের চিন্তা করতে থাকবে, কিন্তু যেই আল্লাহর নবীর ওপর আমাদের ঈমান যে, তিনি সত্য নবী, যদি এই ঈমানের মধ্যে একটুখানি কমতি হয় তাহলে আমরা মুসলমানই নয়। তিনি বলছেন ঃ হে লোকসকল! এই দুনিয়ার মূলতত্ত্ব বা হাকীকত কিছুই না, আল্লাহর কাছে তার মূল্য মশার ডানা বরাবরও নয়, মরা ছাগলের বাচ্চার সমানও নয়, যা কিছুই আছে, তা আখেরাতের জিন্দেগী, তার জন্য কিছু করে নাও, না হয় সেই শেষ না হওয়া জীবনে অস্থির হয়ে যাবে। কিন্তু আমাদের বিশ্বাস হয়না, কেনো? এই জন্যে যে, এই পৃথিবীর মাল এবং সন্তান আমাদের চোখের সামনে আছে, আর আখেরাতের জীবন অদৃশ্য অবস্থায়, শুধু এরই নাম ঈমান বিল গাইব। যখন দেখে ফেলবে তখন গাইব কোথায় থাকলো।

(সাওয়ানেহে হজরতজী-পৃঃ ৬২৮)

৯৮. কামিয়াব হওয়ার নিয়ম-কানুন সবার জন্য সমান

হজরতজী বলেন— আল্লাহ পাক কামিয়াবীর শর্তসমূহ লাগিয়ে দিয়েছেন। তা বাদশাহ, কমান্ডার, কোটিপতি, গরীব-ফকির, সবার জন্য সমান, যেমন সবাইকে প্রথমে পুরুষের পেশাবের রাস্তা দিয়ে বের করেছেন, তারপর মেয়েলোকের পেশাবের রাস্তা দিয়ে বের করেছেন, আর সবাই মাটির নিচে গিয়ে পোকা-মাকড় ও দুর্গন্ধের মধ্যে হবে, এমনিভাবে সৃষ্টিও মৃত্যুর মাঝখানের নিয়ম-কানুন ও বরাবর, তা হচ্ছে একীন এবং আমল।

(হজরতজীর মলফুজাতের খাতা- পৃঃ ৫)

৯৯. নিজেদের চাল-চলনকে নবীদের চাল-চলনের সাথে বদলে ফেল

হজরতজী বলেন— যদি আজ আমাদের ফয়সালা আল্লাহর সন্তুষ্টি মোতাবেক হয়ে যায়, নবীদের তরীকার ওপর হয়ে যায়, তাহলে কাম বনে গেছে। হে মুসলমানেরা! নিজেদের চাল-চলনকে বদলাও, নিজেদের চাল-চলনকে নবীদের চাল-চলন দ্বারা পাল্টে দাও, নিজেদের নকশাকে নবীদের নকশা দ্বারা বদলে ফেল। নিজেদের মেহনতকে নবীদের মেহনত দ্বারা বদলে ফেল। হজরত ইব্রাহীম (আঃ)-এর কাজ দুনিয়াতে চালু করার জন্য বের হও। গতি সৃষ্টি কর। মেহনতের সীমানা ভেঙ্গে চলো, এলেম, আমল, কোরআন এবং দ্বীনের জন্য ঘোরো। কামাই রুজি অর্ধেক, দ্বীন অর্ধেক এই ভিত্তির ওপর মেহনত কর। উম্মতকে ওঠাও। যদি আপনারা মসজিদ ওয়ালি জিন্দেগীর ওপর এসে যান তবে নকশা বদলে যাবে। সমস্ত জগতের মধ্যে দ্বীনের আওয়াজ বুলন্দ হবে। সমস্ত উম্মতের আশা-আকাংখার নকশা বদলে যাবে।

(সাওয়ানেহে হজরতজী-পৃঃ ৬০৮)

১০০. তাবলীগের মধ্যে বয়ান কেমন হবে? বা কেমন হওয়া চাই

হজরতজী বলেন— যে সাথীর ব্যাপারে পরামর্শ হয়ে যাবে, সে দাওয়াত দেবে। এ কথা বোঝাবে যে, আল্লাহ জাল্লা শানুহুর মহান সত্তার সাথে সম্পর্ক কায়েম হলে দুনিয়া ও আখেরাতে কি উপকার হবে। আর আল্লাহ জাল্লা শানুহুর মহান সত্তার সাথে সম্পর্ক কায়েম না করলে দুনিয়া ও আখেরাতে কি ক্ষতি হবে। ছ’ নম্বরের উদ্দেশ্য, তার লাভ এবং মূল্য এবং তা অর্জন করার পদ্ধতি বাতলিয়ে দেয়া চাই। সাদা-সিদা ঢং-এর বয়ান হওয়া চাই। এতে ইনশায়াল্লাহ উপস্থিত লোকদের বুঝের মধ্যে কাজ হবে এবং এর প্রয়োজনও অনুভব করবে এবং বুঝবে যে, আমরাও শিখতে পারবো। আমাদের সাথীরাও দাওয়াত দেয়ার সময় গুরুত্বের সাথে জমে বসবে। মোতাওয়াজ্জুহ হয়ে এবং মুখাপেক্ষী হয়ে শুনবে। যে কথা বলা হচ্ছে, আমরা আপন অন্তরের মধ্যে বলবো যে, “সত্যকথা” এর দ্বারা অন্তরে ঈমানের ঢেউ উঠবে এবং আমলের জয্বা সৃষ্টি হবে। তিন চিল্লার কথা জমে বলা চাই। নগদ নাম নেয়া চাই, এরপর চিল্লার জন্য সময় লেখানো চাই, অতঃপর সে যতো সময়ের জন্য প্রস্তুত হবে তা কবুল করে নেয়া চাই।

(সাওয়ানেহে হজরতজী-পৃঃ ৭৭৪)


← আগের পর্ব (বাণী ৬১–৮০)  |  সূচিপত্র  |  পরের পর্ব (বাণী ১০১–১২০) →

মূল বই: মালফুজাতে হযরতজী মাওলানা ইউসুফ (রহঃ)। সংকলন: মুফতি রওশন শাহ কাসেমী। অনুবাদ: ইসহাক ওবায়দী। প্রকাশক: বাড কম্প্রিন্ট এন্ড পাবলিকেশন্স, ঢাকা। বইটির স্ক্যান কপি archive.org-এ পাওয়া যাবে।

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *