|

মালফুজাতে হযরতজী – পর্ব ৪: বাণী ৬১–৮০

হযরতজী মাওলানা মুহাম্মদ ইউসুফ কান্ধলভী (রহঃ)-এর বাণী সংকলন মালফুজাতে হযরতজী মাওলানা ইউসুফ (রহঃ) বইয়ের ৬১ থেকে ৮০ নম্বর বাণী এই পর্বে দেওয়া হলো। সম্পূর্ণ সূচি ও বইয়ের ভূমিকা দেখুন।

সংকলন: মুফতি রওশন শাহ কাসেমী। অনুবাদ: ইসহাক ওবায়দী। প্রকাশক: বাড কম্প্রিন্ট এন্ড পাবলিকেশন্স, ঢাকা।

এই পর্বে যা আছে


৬১. ইউরোপ-আমেরিকা ইত্যাদি দেশে মেহনত করার জন্য কেমন ব্যক্তির প্রয়োজন?

হজরতজী বলেন— ইউরোপ-আমেরিকার বস্তুবাদী দেশে গিয়ে দ্বীনের দাওয়াতের কাজ করনেওয়ালারা এমন একীনওয়ালা আল্লাহর বান্দা হওয়া প্রয়োজন, যারা ঐ সমস্ত দেশের জাঁকজমক ও পুরো আকর্ষণীয় জীবন এবং সমাজব্যবস্থাকে দেখে নিজের লালা না ফেলে। বরং ইসলামী জীবনব্যবস্থার খেলাপ এবং রাসুলে খোদা (স)-এর আনীত আমলের খেলাপ দেখে যেনো

নিজের চোখের পানি ফেলে।

(সাওয়ানেহে হজরতজী- পৃঃ ৫১৭)

৬২. দ্বীনের নকশা এই সমস্ত জিনিসের ওপর আমল করার দ্বারা অস্তিত্বে আসবে

হজরতজী বলেন— পাঁচটি জিনিসের ওপর যখন আমল এসে যাবে, তখন দ্বীনের নকশা অস্তিত্ব লাভ করবে। (১) একীনের বিশেষত্ব, (২) এলেমের আকৃতি, (৩) আল্লাহর ধ্যান, (৪) আল্লাহর সন্তুষ্টির জয্বা, (৫) নফসের মোজাহাদা।

প্রাথমিক স্তরে এবাদতসমূহ বাঞ্ছিত। দ্বিতীয় স্তরে আখলাক, তৃতীয় স্তরে মুআ’শারাহ্ বা লেনদেন, এখন এই এবাদতসমূহকে এই পাঁচ জিনিসের ওপর ফিট্ করার জন্য সবচেয়ে আগে মেহনত করা দরকার এবং এই পাঁচ কথাকে এবাদতের মধ্যে জীবিত করতে হবে। এবাদত এই পাঁচ জিনিস দ্বারা জিন্দা হবে। বাকী শাখাগুলোতে এই পাঁচ জিনিস চলতে থাকবে। আর যখন জীবনের শাখাগুলো এই পাঁচ জিনিসের সাথে চলতে থাকবে, তখন এবাদতের মতো বাকী শাখাগুলোও আল্লাহর সাহায্য অবতরণ করার কারণ হবে। বস্, তাবলীগের কাজের পদ্ধতি নিজের এই এবাদতসমূহকে এই পাঁচ জিনিসের মোতাবেক হওয়ার মেহনত করতে করতে অন্যদেরকে এই পাঁচ কথার সাথে এবাদত করার অভ্যাসের দিকে টানা।

(মকতুবাতে আকাবেরে তাবলীগ- পৃঃ ১৪৯)

৬৩. একীন তো প্রতিটি ওয়াদার ওপরই কর, কিন্তু উদ্দেশ্য বানাবেনা

হজরতজী বলেন— ইসলাম কি? জান-মালকে আল্লাহর ওপর খরচ করা। এবাদত কি? নির্জনতার সাথে আল্লাহর আমল। নামাজ কি? আল্লাহ থেকে নেয়া। দাওয়াত কি? সৃষ্টি জগতকে দেয়া। একীন তো প্রতিটি ওয়াদার ওপরই করবে, কিন্তু উদ্দেশ্য বানাবেনা। আমলের কারণ ওয়াদা যেনো না হয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ যেনো হয়।

(মকতুবাতে আকাবেরে তাবলীগ- পৃঃ ১৫৮)

৬৪. এজতেমাসমূহে লোকদেরকে কোন্ ভিত্তির ওপর আনা হবে?

হজরতজী বলেন— এজতেমাসমূহে লোকদেরকে শুধু আমার সাথে সাক্ষাৎ অথবা দোয়ার জন্য আনবেনা; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি, দাওয়াতের আজমত এবং আখেরাতের বিনিময় ও সাওয়াবের ভিত্তির ওপর প্রস্তুত করে আনবে।

(তাযকেরায়ে মাওলানা ইউসুফ-১৯২)

৬৫. সফলতার বাধ্যবাধকতা কিসের ওপর?

হজরতজী বলেন— নামাজ শুধু নববী আমলের সংক্ষিপ্তসার। তা সমস্ত জাগতিক আমলকে ছেড়ে, বরং তা থেকে দূরে অবস্থান করে মসজিদে গিয়ে আদায় করার হুকুম। এবং নামাজের মধ্যে জাগতিক আমল ব্যবসা ইত্যাদিকে শুধু ছাড়ার হুকুমই নেই; বরং নামাজের মধ্যে তার খেয়াল করাকেও নিষেধ করা হয়েছে, এবং পুরাজগত থেকে এক ধ্যানওয়ালা আমলের দিকে “حي على الفلاح”-এর মাধ্যমে ডাকা হয়েছে। এই আমল যেনো এই একীনের লাগাতার অভ্যাস করাচ্ছে যে, সফলতার বাধ্যবাধকতা শুধু নববী আমলের ওপর রাখা হয়েছে।

(সাওয়ানেহে হজরতজী- পৃঃ ৭৩২)

৬৬. নামাজকে জানদার করার পদ্ধতি

হজরতজী বলেন— আল্লাহ জাল্লা শানুহুর কুদরত দ্বারা সরাসরি উপকৃত হওয়ার জন্য নামাজের আমল দেয়া হয়েছে। মাথা থেকে পা পর্যন্ত আল্লাহর সন্তুষ্টিওয়ালা বিশেষ এক পদ্ধতির ওপর পাবন্দির সাথে নিজেকে ব্যবহার কর। চোখের ব্যবহার, কানের ব্যবহার, হাতের ব্যবহার, জিহ্বা এবং পায়ের ব্যবহার যেনো ঠিক হয়। অন্তরে আল্লাহর ধ্যান হবে, আল্লাহর ভয় হবে। এই একীন যেনো হয় যে, নামাজের মধ্যে আল্লাহর হুকুম মোতাবেক আমার প্রতিটি ব্যবহার, তাকবীর, তাসবীহ্, রুকু-সেজ্দা সমস্ত জগত থেকেও বেশী পুরস্কার দেনেওয়ালা। এই ধরনের একীনের সাথে নামাজ পড়ে হাত তুলে যদি দোয়া করা হয়, তাহলে আল্লাহ জাল্লা শানুহু নিজের কুদরত দ্বারা প্রতিটি প্রয়োজনকে পুরা করে দেবেন। এই ধরনের নামাজের ওপর আল্লাহ পাক গোনাহসমুহকে মাফও করে দেবেন। রিযিকের মধ্যে বরকতও দেবেন। এবাদতের তৌফীকও পাওয়া যাবে। এমন নামাজ শেখার জন্য অন্যদেরকে ধ্যান-খেয়ালওয়ালা নামাজের উৎসাহ ও দাওয়াত দিতে হবে। এর ওপর দুনিয়া ও আখেরাতের উপকার রাখা হয়েছে যে, একথা বোঝাতে হবে। হুজুর (স) এবং সাহাবায়ে-কেরাম (রা)-এর নামাজ কেমন ছিলো তা শোনাতে হবে। নিজেকেও নামাজ ভালো করার অভ্যাস করতে হবে। এহতেমামের সাথে অজু করতে হবে, ধ্যান জমাতে হবে। দাঁড়ানো অবস্থায়, বসা অবস্থায়, রুকুতে, এবং সেজ্দাতেও ধ্যান কমপক্ষে তিনবার জমাতে হবে যে, আল্লাহ আমাকে দেখছেন। নামাজের পরে চিন্তা করবে যে, আল্লাহর শান মোতাবেক নামাজ হয়নি। এজন্য কাঁদতে হবে এবং বলতে হবে যে, আয়

আল্লাহ! আমাদের নামাজের মধ্যে যথার্থতা সৃষ্টি করে দিন।

(সাওয়ানেহে হজরতজী- পৃঃ ৭৬৭)

৬৭. এলেম ও জিকিরের গুণ নিজের মধ্যে সৃষ্টি করার পদ্ধতি

হজরতজী বলেন— এলেমের উদ্দেশ্য এই যে, আমাদের মধ্যে যেনো খোঁজ-খবর নেয়ার জয্বা সৃষ্টি হয় আমার আল্লাহ আমার কাছ থেকে এই অবস্থায় কি চান? এরপর আল্লাহর ধ্যানের সাথে নিজেকে নিজে ঐ আমলের মধ্যে লাগিয়ে দেয়া। এই ধ্যানটা আবার যিকির। যে ব্যক্তি দ্বীন শেখার জন্য সফর করে, তার এই সফর এবাদতের মধ্যে গণ্য করা হয়। এই উদ্দেশ্যে সফরকারীদের পায়ের নিচে সত্তর হাজার ফেরেশ্তা তাদের নিজেদের পর বিছিয়ে দেয়। আসমান-জমিনের সমস্ত সৃষ্টিজগত তাদের জন্য গোনাহ মাফের দোয়া করে। শয়তানের ওপর একজন আলেম এক হাজার আবেদের চেয়েও ভারী। অন্যদের মধ্যে এলেমের উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি করার চেষ্টা করা চাই। এলেম শেখার লাভসমূহের কথা শোনানো চাই। নিজে তালীমের হালকায় বসা চাই। আলেমদের খেদমতে উপস্থিত হওয়া চাই। এ কাজকেও এবাদত বলে একীন করা চাই। আর কেঁদে কেঁদে দোয়া করা চাই যে, আল্লাহ জাল্লা শানুহু যেনো এলেমের মূলতত্ত্ব দান করেন।

আর জিকির হলো, প্রতিটি আমলের মধ্যে আল্লাহ পাকের ধ্যান-খেয়াল সৃষ্টি করা। যে ব্যক্তি আল্লাহ পাককে স্মরণ করে আল্লাহপাকও তাকে স্মরণ করেন। যতোক্ষণ পর্যন্ত মানুষের ঠোঁট আল্লাহর জিকিরে নড়াচড়া করতে থাকে, ততোক্ষণ আল্লাহ তার সাথে থাকেন। জিকিরকারীকে আল্লাহপাক নিজের ভালোবাসা ও পরিচিতি বা মারেফাত দান করেন। আল্লাহর জিকির শয়তান থেকে হেফাজতের কিল্লা। স্বয়ং নিজের মধ্যে আল্লাহ জাল্লা শানুহুর ধ্যান সৃষ্টি করার জন্য অন্যদেরকে আল্লাহর জিকিরের প্রতি প্রস্তুত করা চাই। উৎসাহ দেয়া চাই। নিজে ধ্যান জমিয়ে যে, আমার আল্লাহ আমাকে দেখছেন, জিকির করা চাই। এবং কেঁদে কেঁদে দোয়া করা যে, আয় আল্লাহ! আমাকে জিকিরের মূলতত্ত্ব দান করুন।

(সাওয়ানেহে হজরতজী- পৃঃ ৭৬৮)

৬৮. এলেমের ব্যবহার যদি সহী না হয়, তাহলে ক্ষতি আছে

হজরতজী বলেন— একটা হচ্ছে, এলেম সহী বা সঠিক হওয়া, আর একটা হচ্ছে, সঠিক এলেমের ব্যবহার সঠিক হওয়া। যদি এলেম সঠিক হয় আর তার ব্যবহার সঠিক না হয় তাহলে এটা বরবাদীর কথা।

(তাযকেরায়ে হজরতজী- পৃঃ ৪৫)

৬৯. বোখারী শরীফের খতমের সময় হজরতজী-র বয়ান

ব্রাহ্মণবাড়িয়া মাদ্রাসার বোখারী শরীফের খতমের জলসায় হজরতজী বলেন— ভাইয়েরা আমার! আপনারা বোখারী শরীফ শেষ করেছেন, এলেম হাসিল হয়েছে, এখন এই এলেমের ওপর তিনটি উদ্দেশ্যের জন্য মেহনত করা জরুরী। এই এলেম মোতাবেক নিজের মধ্যে একীন হওয়া। এই এলেম মোতাবেক আমল সৃষ্টি হওয়া। এবং তৃতীয় হলো, এই একীন ও আমলকে জগতে ছড়িয়ে দেয়া।

হুজুর (স)-কর্তৃক আনীত এলেমের ওপর এই তিন শাখায় প্রথম দিকে মেহনত করা হয়েছে, যার ফলে ঐ সময়কার জাগতিক মতাদর্শের ওপর পরিচালিত বাতেল রোমান সাম্রাজ্য ও পারস্য সাম্রাজ্য টুকরা টুকরা হয়ে গেছে। এবং কেয়ামতের আগে দাজ্জাল নিজের পক্ষ থেকে এতো বড় শক্তির প্রদর্শনী করবে যে, তার মোকাবেলায় বর্তমান শক্তিসমূহ কিছুই না, তখন হজরত মাহদী (আ) জমিন থেকে এবং হজরত ঈসা (আ) আকাশ থেকে আসবেন এবং পুরোপুরিভাবে হুজুর (স)-এর তরীকা মোতাবেক এই এলেমের ওপর মেহনত করবেন। ঐ মেহনতের ফলে আল্লাহ জানলা জালালুহু এ দাজ্জালী শক্তিকে ধ্বংস করে দেবেন। আর যখন আগে একবার এটা হয়েছে এবং শেষেও একবার এটা হবে, তাহলে এই ধারণা কেনো হবে যে, মাঝখানে কিভাবে হবে?

বর্তমানেও ঐ সবকিছুই হতে পারে। তবে এই শর্তে যে, একটা বিশেষ সংখ্যার তবকা এই এলেমের ওপর হুজুর (স) ও সাহাবা (রা)-এর মতো মেহনত করে ফেলতে হবে। হুজুর (স) থেকে প্রকাশিত আমলকে আল্লাহ তায়ালা এটম বোম থেকে বেশী শক্তিশালী বানিয়েছেন; এবং এক একটি আমলকে জগতের মধ্যে পরিবর্তন সাধনের উপায়-অছিলা বানিয়েছেন। এস্তেস্কার নামাজ জমিনের অবস্থার মধ্যে পরিবর্তন সাধনের অছিলা। কসুফের নামাজ এবং খসুফের নামাজ চন্দ্র এবং সূর্যের অবস্থা বদলানোর জন্য। দোয়া এবং সালাতুল হাজত প্রতিটি ব্যক্তিগত এবং সমষ্টিগত অনোপযোগী অবস্থাকে বদলানোর জন্য। হুজুর (স)-এর আঙ্গুলের ইশারায় চাঁদকে দুই টুকরা করিয়ে এটাই প্রকাশ করা হয়েছে যে, হুজুর (স) থেকে প্রকাশিত আমল এতোই শক্তিশালী। আর এই ইশারা হুজুর (স)-এর আধ্যাত্মিক বা সৃষ্টিগত আমল ছিলো। শরীয়তগত আমল এর চাইতেও শক্তিশালী। বর্তমানে বিভিন্ন মতাদর্শের ক্ষমতাধররা মিনতি ও তোষামোদ করছে যে, আমাদের এলেম চালিয়ে দাও। আমি তো বলি, কোরআন-হাদীস তাদেরকে মিনতি বা তোষামোদ করার জন্য আসেনি। কোরআন তো এসেছে এ মতাদর্শওয়ালাদের অস্তিত্-অনস্তিত্ব এবং মান-অপমানের সিদ্ধান্ত করার জন্য।

(তাযকেরায়ে হজরতজী-পৃঃ ৫১)

৭০. উমুমী গাশ্ত্ করার পদ্ধতি

হজরতজী বলেন— গাশ্তের গুরুত্ব, প্রয়োজন এবং মূল্য বাতানো চাই। তার জন্য প্রস্তুত করা চাই। যারা প্রস্তুত হবে তাদেরকে ভালো ভাবে গাশ্তের আদবসমূহ বুঝিয়ে দেবে। আল্লাহর জিকির করতে করতে চলা চাই। দৃষ্টি অবনত অবস্থায় নিচের দিকে হওয়া চাই। আমাদের সমস্ত প্রয়োজন ও সমস্যাবলীর সম্পর্ক আল্লাহ জাল্লা শানুহুর সত্তার সাথে, এ সমস্ত বাজারে ছড়ানো ছিটানো বস্তুর সাথে কোন প্রয়োজন বা সমস্যার সম্পর্ক নেই। জিনিসের ওপর নজর না পড়া চাই। ধ্যানও যেনো না হয়। যদি নজর পড়ে যায়, তাহলে মাটির ঢিলা মনে করবে। আমাদের অন্তর যদি এই সমস্ত জিনিসের দিকে ফিরে যায়, তাহলে আমরা যাদের কাছে যাচ্ছি তাদের অন্তর ঐ সমস্ত জিনিস থেকে আল্লাহর দিকে কিভাবে ফিরবে? কবরে প্রবেশের কথা সম্মুখে থাকবে, এই জমিনের নিচেই যেতে হবে, একথা ভাবব। মিলেঝুলে চলবে। এক ব্যক্তি কথা বলবে, ঐ কথা বলনেওয়ালা কামিয়াব যে সংক্ষিপ্ত কথা বলে মানুষকে মসজিদে পাঠিয়ে দেবে।

কথা এভাবে বলবে, ভাই! আমরা মুসলমান, আমরা সবাই কলেমা লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ পড়েছি। আমাদের বিশ্বাস যে, আল্লাহপাকই পালনেওয়ালা। লাভ-ক্ষতি, মান-অপমান আল্লাহ তায়ালার হাতে। যদি আমরা আল্লাহর হুকুমের ওপর, হুজুর (স)-এর তরীকা মতে জীবন-যাপন করি, তাহলে আল্লাহ রাজী হয়ে আমাদের জীবনকে গড়ে দেবেন। আমাদের সকলের জীবন যেনো আল্লাহ জাল্লা শানুহুর হুকুম মোতাবেক হুজুর (স)-এর তরীকার ওপর এসে যায়, এ ব্যাপারে ভাই মসজিদে কিছু ফিকিরের কথাবার্তা হচ্ছে, নামাজ পড়ে ফেললে তবুও তাকে উঠিয়ে মসজিদে পাঠিয়ে দেবে। প্রয়োজন মনে করলে একজন আগেভাগে মসজিদে যাওয়ার ভাণ করবে।

আল্লাহর সবচেয়ে বড় হুকুম নামাজ। নামাজ পড়লে আল্লাহ রুজিতে বরকত দেবেন, গোনাহসমূহ মাফ করে দেবেন। দোয়াসমূহ কবুল করবেন। সুখবরগুলো শোনাবে। ধমকির কথা নয়। নামাজের সময় যাচ্ছে (অথবা আসছে) মসজিদে চলুন। আমীরের আনুগত্য করা চাই। ফেরার সময় এন্তেগফার করতে করতে আসবে।

(সাওয়ানেহে হজরতজী-পৃঃ ৭৭৩)

৭১. গাশ্তের আদবসমূহ

হজরতজী বলেন— গাশ্তের আদবের মুযাকেরা করার পর দোয়া করে বেরিয়ে পড়বে। গাশ্তের মধ্যে দশ ব্যক্তি যাবে। মসজিদের নিকটবর্তী ঘরগুলোতে গাশ্ত্ করে নেবে। ঘর না থাকলে বাজারে গাশ্ত্ করে নেবে।

দলের মধ্যে কিছু বেশী লোক এমন যেনো থাকে যারা গাশ্তের মধ্যে উসুলের পাবন্দি করতে পারে। মসজিদে দুই-তিন জন লোক রেখে আসবে। নতুন মানুষ বেশী এসে গেলে তাহলে তাদেরকেও বুঝিয়ে বুঝিয়ে মসজিদে মশগুল রাখবে। নতুন মানুষ তিনজন, চারজন বা সাতজন হলেও। মসজিদে এক সাথী আল্লাহ জাল্লা শানুহুর দিকে মোতাওয়াজ্জুহ হয়ে জিকির ও দোয়ার মধ্যে মশগুল থাকবে। এক সাথী আগমনকারীদের এস্তেকবাল করবে। প্রয়োজনবোধে অজু করিয়ে নামাজ পড়িয়ে দেবে। আর এক সাথী নামাজ পর্যন্ত আগমনকারীদেরকে নামাজ পর্যন্ত মশগুল রাখবে। নিজেদের জীবনের উদ্দেশ্য বোঝাবে। পৌনে এক ঘন্টা (অর্থাৎ ৪৫ মিনিট) গাশ্ত্ হওয়া চাই। নামাজের সাত-আট মিনিট আগে গাশ্ত্ শেষ করে ফেলবে। সবাই তাকবীরে উলার সাথে নামাজে শরীক হবে।

(সাওয়ানেহে হজরতজী-পৃঃ ৭৭৪)

৭২. খুসুসী গাশ্তের পদ্ধতি

হজরতজী বলেন— খুসুসী গাশ্তের মধ্যে যদি দেখা যায় যে, ঐ ব্যক্তি যার সাথে আপনি দেখা করতে গেছেন, এই সময় মনোযোগের সাথে কথা শোনার জন্য প্রস্তুত নয়, তাহলে উপযুক্ত পদ্ধতিতে তাড়াতাড়ি কথা শেষ করে তার কাছ থেকে উঠে আসা চাই, এবং তার জন্য দোয়া করা চাই। আর যদি দেখা যায় যে, সে ব্যক্তি মনোযোগী, তাহলে পুরা কথা তার সামনে রাখা চাই।

খুসূসী গাশ্তে যখন দ্বীনের দিক দিয়ে কোন বড় ব্যক্তির কাছে যাওয়া হবে, তখন তাঁর কাছে শুধু দোয়ার দরখাস্ত করা উচিত, আর যদি তাঁর মনোযোগ দেখা যায়, তবে কাজের অবস্থা কিছু বলে দেয়া যেতে পারে।

(তাবলীগি তাহরীক-পৃঃ ৪৫)

৭৩. ইসলামী সমাজ বানানোর পদ্ধতি

হজরতজী বলেন— উদ্দেশ্য এই যে, মেহনতের মধ্যে হুজুর (স)-এর তরীকা যেনো জিন্দা হয়। এবং জীবনের শাখা-প্রশাখাতে হুজুর (স)-এর তরীকা যেনো চালু হয়ে যায়। যার পদ্ধতি হলো, একীনসমূহ (অর্থাৎ বিশ্বাস করার দিকগুলো)কে জিন্দা করা এবং এবাদতকে সঠিক পদ্ধতির ওপর কায়েম করা এবং হুজুর (স)-এর আখলাকের অভ্যাস করা, আর এ সমস্ত জিনিস অস্তিত্বে আসার জন্য এলেম ও জিকিরের সাধারণ পরিবেশ কায়েম করা।

যার পদ্ধতি এই যে, ঐ সমস্ত আমল যার মধ্যে প্রকাশ্যে ইহকালীন কামিয়াবী পাওয়া যাচ্ছে বলে দেখা যায়না, অথচ আল্লাহ এবং আল্লাহর রাসুল তাদের মধ্যে কামিয়াবী আছে বলে বলেছেন, যেমন এবাদতসমূহ ও আখলাক, এই সমস্তকে তাদের মূলতত্ত্বের ওপর আনার জন্য মেহনত করা। এই একীনের অভ্যাসের সাথে যে, যদি আমাদের এ সমস্ত এবাদত হুজুর (স) ওয়ালা পাবন্দির সাথে আমাদের মধ্যে জিন্দা হয়ে যায়, তাহলে আল্লাহ পাক নিজের কুদরত দ্বারা আমাদেরকে কামিয়াব করে দেবেন। এবং আল্লাহর নেক বান্দাদের সাথে যদি তাঁদের তরীকার ওপর পাবন্দির সাথে আমাদের চলা এসে যায়, তখন আল্লাহ তায়ালার মদদ ও সাহায্য মোতাওয়াজ্জুহ হবে। যতোটুকু এই সমস্ত এবাদত এবং আখলাকের গূঢ় তত্ত্বের ওপর আসার জন্য তাদের ওয়াদা ও ধমকের এলেম অর্জন করে– তার ওপর এই একীনের সাথে এবাদত এবং আখলাক গ্রহণ করা হবে, অতোটুকুই জীবনের সমস্ত শাখা-প্রশাখায় একীনের ঝলক সৃষ্টি হবে। তারপর এই সমস্ত এবাদত এবং আখলাকের যে পদ্ধতি বাতানো হয়েছে, তা শেখার, শেখানোর আকৃতি গ্রহণ করে তাদের প্রকাশ্য আকৃতিকে যতোটা বানানো যাবে, আর আল্লাহর জিকিরের মাধ্যমে ঐ সমস্ত এবাদতের মধ্যে ধ্যান-খেয়ালের যতোটা অভ্যাস করা হবে, এবং যতোটুকু এই সমস্ত এবাদতকে আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জতকে রাজী-খুশী করার জয্বায় করা হবে, অতোটুকুই এই সমস্ত এবাদতওয়ালা ওয়াদা অস্তিত্বে আসবে এবং এই সমস্ত ভিত্তির ওপরই চারিত্রিক বৈশিষ্ট মণ্ডিত জীবন অস্তিত্বে আসবে এবং পুরো সমাজ এইসব ভিত্তির ওপর, দ্বীনের পদ্ধতির ওপর জিন্দা হয়ে উভয় জাহানে পুরস্কার ও রহমত এবং উপকারী বস্তু অর্জিত হবার অছিলা বনবে।

(মকতুবাতে আকাবেরে তাবলীগ-পৃঃ ১৪৭)

৭৪. সত্য অভাব-অনটন ও দারিদ্রের কষ্টসমূহের মধ্যে চমকায়

হজরতজী বলেন— সমস্ত নবীরা নিজ নিজ জমানায় কোন না কোন নকশা বা মতাদর্শের মোকাবেলায় এসেছেন এবং বলেছেন যে, এই মতাদর্শের সাথে সফলতার মোটেও সম্পর্ক নেই। সফলতার সম্পর্ক সরাসরি আল্লাহ জাল্লা শানুহুর সুউচ্চ সত্তা মোবারকের সাথে। যদি আমল সঠিক হয়, আল্লাহ পাক ছোট আকৃতি বা নকশার মধ্যেও কামিয়াব করে দেবেন। আর যদি আমল নষ্ট হয়, আল্লাহ পাক বড় থেকে বড় নকশাও ভেঙ্গে হতাশ করে দেখিয়ে দেবেন। সফল হওয়ার জন্য এই নকশাতে আমল ঠিক কর। প্রত্যেক নবী নিজের সময়কার চালু নকশার মোকাবেলার ওপর মেহনত করেছেন। আর হজরত মোহাম্মদ (স) সমস্ত গণতন্ত্র, শাসনক্ষমতা, মাল, ক্ষেতি-ফসল ও কারীগরী নকশার মোকাবেলার ওপর তাশরীফ এনেছেন। হুজুর (স)-এর মেহনত ঐ সমস্ত নকশার দ্বারা চলেনি, তাঁর মেহনত ত্যাগ তিতিক্ষা ও মোজাহাদার ওপর চলেছে। বাতেল আরাম-আয়েশের উপকরণের নকশার মাধ্যমে ছড়ায়, আর সত্য কষ্ট-ক্লেশ সহ্য করার মাধ্যমে ছড়ায়। বাতেল মুল্ক ও মালের দ্বারা চমকায়, আর সত্য অভাব-অনটন ও দারিদ্রের কষ্টের মধ্যে চমকায়। যতো ফেতনা মুল্ক ও মাল এবং আরাম-আয়েশের উপকরণের ভিত্তির ওপর আমদানী করা হচ্ছে, তাদের ধ্বংস সত্যের জন্য অভাব-অনটন ও দারিদ্র এবং কষ্ট-ক্লেশ সহ্য করার মধ্যে। এখন এই কাজের মাধ্যমে উম্মতের মধ্যে ত্যাগ তিতিক্ষা ও মোজাহাদার যোগ্যতা সৃষ্টি করতে হবে। এই কাজের জন্য বহুত বড় আশংকা এই যে, তাকে নকশাসমুহের ওপর সীমাবদ্ধ করা। এর দ্বারা কাজের রূহ বের হয়ে যাবে। এই কাজের হেফাজত এর মধ্যে যে, কাজ করনেওয়ালারা এইকাজের জন্য সমস্ত সহজ নকশা গুলোকেও কোরবান করে মোজাহাদা ওয়ালা অবস্থা কায়েম রাখবে। আর কোন অবস্থাতে মোজাহাদাওয়ালা নকশাকে শেষ হতে দেবেনা। গরীবদের মধ্যে নিজেদের মেহনতকে বাড়াতে হবে। পায়দল জামাত চালাতে থাকবে। মানুষ আসবে এবং বলবে যে, নিন! আমাদের এই টাকা দ্বীনের কাজে খরচ করুন। তখন নকশার কোরবানী দেয়া লাগবে। তখন বলে দিন যে, জনাব! এখানে এই কাজের মধ্যে খরচ করার সঠিক এবং পবিত্র পদ্ধতি ও জয্বা শেখানো হয়। তারপর আপনি নিজেই পাত্র তালাশ করে খরচ করতে পারবেন। এখানে শুধু এই পদ্ধতি শিখে নিন।

এই কাজের বহুল প্রচারের জন্য প্রচলিত পদ্ধতি, পত্র-পত্রিকা, এস্তেহার, প্রেস মিডিয়া ইত্যাদি এবং প্রচলিত শব্দাবলী থেকেও বেঁচে থাকা জরুরী। এই কাজ পুরা অপ্রচলিত। প্রচলিত পদ্ধতিতে প্রচলনের সাহায্য হয়, এই কাজের নয়।

আসল কাজের আকৃতি দাওয়াত, গাশ্ত্, তালীম, তাশকীল ইত্যাদি। পরামর্শের দরকার হলে, উপযুক্ত বন্ধুদেরকে পৃথক করে পরামর্শ করে নেয়া চাই। এমন না হয় যেন পরামর্শকারীদের কোন সময় উমুমী আমল থেকে অর্থাৎ সমষ্টিগত কাজের সাথে জোড় না থাকে।

(সাওয়ানেহে হজরতজী-পৃঃ ৭৮০)

৭৫. তালীমের আদবসমূহ এবং তার পদ্ধতি

হজরতজী বলেন— তালীমের মধ্যে ধ্যান, আযমত, মহব্বত, আদব এবং মনোযোগের সাথে বসার অভ্যাস করা চাই। টেক লাগিয়ে না বসা চাই, অজুর সাথে বসার চেষ্টা হওয়া চাই। তবীয়তের বিভিন্ন বাহানার কারণে তালীমের মাঝখানে না ওঠা চাই। কথা না বলা চাই। যদি এ ভাবে বসা হয়, তাহলে ফেরেশতারা ঐ মজলিসকে ঘিরে রাখবে। মজলিসে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে জানার যোগ্যতা সৃষ্টি হবে। আয্মতের অভ্যাস দ্বারা হাদীস শরীফে উল্লেখিত ঐ নূর অন্তরে আসবে, যার দ্বারা আমলের রাস্তা পাওয়া যায়। বসার প্রাক্কালেই আদব এবং উদ্দেশ্যের প্রতি মোতাওয়াজ্জুহ্ করা চাই। উদ্দেশ্য এই যে, আমাদের মধ্যে দ্বীনের চাহিদা সৃষ্টি হয়ে যায়। ফাজায়েলে কোরআন পড়ে কিছুক্ষণ কোরআন শরীফের ঐ সমস্ত সূরার তাজ্বীদের মোশ্ক্ বা অভ্যাস করা চাই, যা সাধারণতঃ নামাজের মধ্যে পড়া হয়। আত্তাহিইয়াত, দোয়ায়ে কুনুত ইত্যাদির মোযাকেরা এবং বিশুদ্ধকরণ এজতেমায়ী তালীমে না হওয়া চাই। ব্যক্তিগতভাবে শেখা-শেখানোর মধ্যে তা শুদ্ধ করে নেবে। আল্লাহ তৌফীক দিলে প্রত্যেক কিতাব থেকে তিন-চার পৃষ্ঠা পড়া চাই। তালীমের মধ্যে নিজের পক্ষ থেকে যেনো কোন বয়ান না হয়। হাদীস শরীফ পড়ার পর দুই-তিনটি বাক্য এমন বলে দেয়া চাই যে, ঐ আমলের জয্বা এবং উৎসাহ উত্থিত হয়ে পড়ে। হজরত শায়খুল হাদীস মাওলানা মোহাম্মদ যাকারিয়া (রহঃ) কর্তৃক প্রণীত ফাজায়েলে কোরআন মজীদ, ফাজায়েলে নামাজ, ফাজায়েলে তাবলীগ, ফাজায়েলে জিকির, ফাজায়েলে সাদাকাত প্রথম খণ্ড দ্বিতীয় খণ্ড, ফাজায়েলে রমজান, ফাজায়েলে হজ্ব (হজ্ব এবং রমজান মাসে) এবং মাওলানা এহতেশামুল হাসান (রহঃ) কর্তৃক প্রণীত “মুসলমানোঁ কি মৌজুদা পস্তি কা ওয়াহেদ এলাজ” শুধু এই কিতাবগুলোই যা এজতেমায়ী বা সমষ্টিগত তালীমের মধ্যে পড়া এবং শোনা চাই। এবং একা বসেও এগুলো পড়া চাই। কিতাবি তালীমের পর ছ’ নম্বরের মোযাকারা হওয়া চাই। সাথীদের কাছ থেকে নম্বর বর্ণনা করানো চাই। যখন তালীম শুরু করা হবে, তখন নিজেদের মধ্য থেকে দুইজন সাথীকে তালীমের গাশ্তের জন্য পাঠিয়ে দেয়া চাই। পনের-বিশ মিনিট পর ঐ সাথীরা এসে গেলে অন্য দুই সাথীর চলে যাওয়া উচিত। এভাবে মহল্লাবাসীদেরকে তালীমের মধ্যে শরীক করার চেষ্টা চলতে থাকবে। বাইরে তাবলীগে বের হবার যমানায় প্রতিদিন সকাল এবং বাদ জোহর উভয় সময়ে তালীম দুই/তিন ঘন্টা করা চাই। আর নিজের ঘরে প্রতিদিন এই নিয়মে এক ঘন্টা যেনো তালীম হয়, অথবা শুরু শুরুতে যতোক্ষণ পর্যন্ত সাথীরা জুড়তে পারে।

(সাওয়ানেহে হজরতজী-পৃঃ ৭৭৬)

৭৬. হুজুরে পাক (স)-এর দাওয়াত

হজরতজী বলেন— হুজুর (স)-এর যেই দাওয়াত, একেতো তার মধ্যে নকল ও হরকত আছে, আর নকল ও হরকত ও সমষ্টিগত ভাবে। প্রত্যেকে নিজের পয়সা খরচ করছে, এবং শেষমেশ খায়রখাহী হলো উদ্দেশ্য। রাজত্ব এবং ক্ষমতা উদ্দেশ্য নয়। শুধু এই জয্বা যে, আল্লাহ তাঁদের ওপর রাজী হয়ে যান। তোমাদের রাজত্ব ও মালের জন্য আসিনি; বরং এ জন্য এসেছি যে, যখন তোমরা এই সমস্ত জিনিসের ওপর এসে যাবে, তখন আল্লাহ তোমাদেরকে চমকিয়ে দেবেন, তার পর তারা তোমাদের সমষ্টিগত জীবন, সাম্য, সমাজ এবং মহব্বতের জীবন দেখলে তারা তখন মুসলমান হয়ে যাবে, একটা অস্থায়ীভাবে জামাত দেখে মুসলমান হয়ে গেছে, কিন্তু তারা স্থানীয় মানুষের সাথে লেগে গেছে। হুজুর (স)-এর যমানায় যারা মুসলমান হতো, তাঁরা মদীনা শরীফে আসতো, তখন মদীনার মুসলমানরা তাদেরকে দ্বীন শেখাতো, খানা খাওয়াতো, হাদিয়া-তোহ্ফাও দিতো, যখন তাঁরা ফেরত যেতো, তখন তাঁদের জাতি-গোষ্ঠিরা দেখতো যে, মদীনা শরীফ থেকে যেসব লোক দ্বীন শিখে এসছে, তাঁরা খোশ হাল হয়ে এসেছে, পরস্পরের মধ্যে সাহায্য-সহযোগিতা করা শিখে এসছে। এদেরকে দেখে পুরা গোষ্ঠি মুসলমান হয়ে যেতো। (সাওয়ানেহে হজরতজী-পৃঃ ৭৭৬) এখন কথা এই যে, যখন দাওয়াত দেয়া হয়, এবং মানুষ মুসলমান হয়ে যায়, যখন ঐ মোতাবেক নিজেদের এখানে অন্যদের জীবনকে দেখেনা, তখন তারা মজবুত থাকেনা। তাই এখন যদি আমরা ইসলামের দাওয়াত পৃথিবীতে ওঠাতে চাই, তাহলে মুসলমানদেরকে দা’য়ী বানাতে হবে। খানা খাওয়ায় এমন মুসলমান বানাতে হবে। তখন গিয়ে ভিন্নধর্মীরা আমাদের জীবন দেখে মুসলমান হবে। আমরা অমুসলিমদেরকে দাওয়াত দিলে আমাদের ওপর তাদের দায়িত্ব এসে পড়বে। তাদেরকেও দ্বীন শেখাতে হবে, খানা খাওয়াতে হবে। যাকাত আদায় করতে হবে, গরীবদের ওপর খরচ করা আমাদের ওপর কর্তব্য হয়ে দাঁড়াবে। যদি আমাদের এমন পরিবেশ না হয়, তাহলে শতকরা একটা মুসলমান যদি হয়েও যায়, কিন্তু আমাদের জীবনব্যবস্থা দেখে সে নিজের ধর্মে ফেরত চলে যাবে।

বর্তমানে শ্রমজীবী শ্রমের অনুপাতেই কথা বলে, পরস্পরের মধ্যে মুসলিম-অমুসলিমের পার্থক্য ছাড়া তাদের মধ্যে ইউনিয়ন আছে। কৃষক ইউনিয়ন, শ্রমিক ইউনিয়ন, ব্যবসায়ী ইউনিয়ন, এখন অমুসলিমদের কাজ করার সুযোগ বা পদ্ধতি এসে গেছে। এমতাবস্থায় কমিউনিস্টরা যদি কোন আন্দোলন শুরু করে, তখন ইউনিয়নের লোকেরা তাদের কথায় উঠবে এবং সবাই তাদের দিকে হয়ে যাবে। এভাবে পুঁজিপতির গায়ে যদি গুলি লাগে, তখন যে তার সাহায্যে এগিয়ে আসবে সে তার কথা শুনবে। এভাবে একথা বোঝা যাবে যে, পুঁজিবাদ বা আমেরিকার সাথে কতো সাথী আছে, আর সমাজতন্ত্র বা রাশিয়ার

সাথে কতো সাথী আছে।

(মকতুবাতে আকাবেরে তাবলীগ-১৫২)

৭৭. ইসলামের মধ্যে যে সমস্ত আমলের হুকুম দেয়া হয়েছে তা চার রকম

হজরতজী বলেন— ইসলামের মধ্যে যে সমস্ত আমলের হুকুম দেয়া হয়েছে এবং যার বিনিময় সওয়াব এবং জান্নাতের ওয়াদা করা হয়েছে, তা চার প্রকার। এক– ঐ সমস্ত আমল, যার মধ্যে আল্লাহ পাকের নায়েব হিসাবে কাজ করতে হয়। যেমন দয়ার হুকুম আছে, এহ্সান করার হুকুম আছে, দানশীলতা ও দান-দক্ষিণার হুকুম আছে, ন্যায় ও ইনসাফের হুকুম আছে, অপরাধীদের শাস্তি দেয়ার হুকুম আছে, এই সমস্ত আমল ও আখলাকের অবস্থান এই যে, আসলে এগুলো আল্লাহ তায়ালার গুণাবলী এবং তাঁর কাজ। আর বান্দাদেরকে হুকুম করা হয়েছে যে, তারা যেনো তাদের অবস্থান অনুযায়ী এ সমস্ত আমল করে, এবং এ সমস্ত গুণাবলী বর্ষণ করে (تخلقوا بأخلاق الله)

দ্বিতীয় প্রকারে ঐ সমস্ত আমল, যা আসলে নবীদের করণীয় আর উম্মত তা নবীদের নায়েব হিসাবে করে। যেমন, দ্বীনের দাওয়াত, তাবলীগ, তালিম-তাবিহবয়ত, সৎকাজে আদেশ-অসৎ কাজে নিষেধ, এ’লায়ে কলেমাতুল্লাহ (অর্থাৎ আল্লাহর কলেমাকে সুউচ্চ করার) চেষ্টা এবং তাঁর রাস্তায় ত্যাগ তিতিক্ষা ইত্যাদি ইত্যাদি। এই সব আসলে নবীদের আমল। আর নবীদেরকে এ সমস্ত কাজের জন্যই পাঠানো হয়। উম্মত এ সকল কাজ করে নবীদের উদ্দেশ্যের খেদমত করে থাকে এবং তাঁদের সাহায্য এবং প্রতিনিধিত্ব হিসাবে এই সমস্ত রাস্তায় মেহনত করে।

তৃতীয় প্রকার, ঐ সব আমল, যা আল্লাহ তায়ালার দরবারে নিজের আব্দিয়ত বা দাসত্ব এবং বন্দেগী প্রকাশ করার জন্য এবং তার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ ও তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন করার জন্য করা হয়। এটা এবাদতের শান, নামাজ, রোজা, হজ্ব, কোরবানী, জিকির এবং তেলাওয়াত ইত্যাদি এবাদত এই প্রকারের আমল।

চতুর্থ প্রকার, ঐ সমস্ত আমল; যা আসলে নিজের চাহিদা এবং মানবিক চাহিদার জন্য করা হয়, কিন্তু ঐ সবের ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা কিছু হুকুম-আহকাম দিয়েছেন যে, এভাবে কর। এজন্য এসবও দ্বীনি আমল হয়ে গেছে। যেমন, বিয়ে করা, বিবি-বাচ্চাদের খাওয়ানো-পরানো, কাপড় পরিধান করানো, তাদেরকে আদর করা, অথবা বেচা-কেনা করা, এভাবে কৃষি কাজ অথবা কারখানা বানানো, অথবা মেহনত-মজুরী। এইসব ঐ সমস্ত জিনিস, যার সম্পর্ক আসলে আমাদের খাহেশ বা চাহিদা এবং মানবিক প্রয়োজনাদির সাথে। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা এ সব বিষয়ে হুকুম আহকাম দিয়েছেন যে, এই সব এভাবে করতে হবে, এবং তাতেও সওয়াব রেখে দিয়েছেন। এখন এ সবও দ্বীনি আমল হয়ে গেছে, কিন্তু তা দ্বীনি আমল এবং সওয়াবের যোগ্য হওয়ার জন্য একটা শর্ত এই যে, এইসব যেনো আল্লাহর দেয়া হুকুম এবং তাঁর নির্দিষ্ট করা নিয়ম-কানুন মোতাবেক হয়, আর দ্বিতীয় শর্ত এই যে, তাদের কারণে যেনো ঐ সমস্ত আমল নষ্ট না হয়, যা তারও আগে করণীয় এবং বেশী গুরুত্বপূর্ণ। এখন যদি এক ব্যক্তি নিজের কাম-কাজের মধ্যে এবং বিবি-বাচ্চাদের মধ্যে এভাবে মশগুল হয় যে, ঐ ব্যস্ততার কারণে দ্বীন শেখার জন্য এবং ঈমান-একীন অর্জন করার জন্য, এবং নিজের নামাজকে আসল নামাজ বানানোর জন্য, এবং আল্লাহর সাথে নিজের সম্পর্ক সঠিক করার জন্য সময় বের করতে পারেনা, তাহলে তার বিবি-বাচ্চা পালা, এবং কাম-কাজে ব্যস্ত থাকা কক্ষণো দ্বীনি আমল হবে না, বরং সম্পূর্ণ শাস্তি বা ফেতনা। এবং “إنما أموالكم وأولادكم فتنة”-এর সাক্ষ্য বহন করবে।

(তাযকেরায়ে হজরতজী-পৃঃ ১৭২)

৭৮. দুনিয়ার উন্নতি বস্তুর ওপর মেহনতের ফল

হজরতজী বলেন— বর্তমানে দুনিয়াতে যা কিছু হচ্ছে, এবং যে উন্নতি দেখা যাচ্ছে, তা বস্তুর ওপর মেহনতের ফল। নবীদের রাস্তা রূহের ওপর মেহনত এবং রূহানী উন্নতি সাধনের রাস্তা ছিলো। তাঁরা আল্লাহর সন্তুষ্টিওয়ালা আমলের ওপর মেহনত করে এবং কোরবানী দিয়ে আল্লাহ তায়ালার শক্তি দ্বারা নিজেদের সমস্যার সমাধান করতেন।

ফেরাউনের কাছে সৈন্য ছিলো, সেনাবাহিনী ছিলো এবং প্রত্যেক প্রকারের বস্তুবাদী শক্তি ছিলো, হজরত মূসা (আ) বনী ইসরাঈলকে শুধু রুহের উন্নতিওয়ালা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টিওয়ালা আমলের জন্য প্রস্তুত করেন। তাদেরকে বললেন যে, হে আমার জাতি! তোমরা যদি ঈমানওয়ালা রাস্তা অবলম্বন কর, তাহলে আল্লাহর ওপর ভরসা কর এবং পূর্ণাঙ্গ ঈমান একীন ও ভরসার সাথে তাঁর কাছে সাহায্য চাও।

يقوم إن كنتم آمنتم بالله فعليه توكلوا إن كنتم مسلمين

জাতি উত্তর দিলো, আপনার কথা মেনে নিলাম, এবং আল্লাহর ওপর একীন ও ভরসার রাস্তা অবলম্বন করলাম। এবং আমরা আমাদের আল্লাহর কাছে দোয়া করছি যে, তিনি যেনো ফেরাউন এবং ফেরাউনী শাসনের জুলুম-অত্যাচার থেকে আমাদেরকে হেফাজত করেন এবং এই কাফের গোষ্ঠির দাসত্বের মুসিবত থেকে যেনো মুক্তি দেন।

ربنا لا تجعلنا فتنة للقوم الظلمين ونجنا برحمتك من القوم الكفرين এর পর কোরআন শরীফে আছে যে, আল্লাহ তায়ালা হজরত মূসা (আ) ও হজরত হারুন (আ)-কে আদেশ দিলেন, যে, নিজের জাতির ঈমানী শিক্ষার জন্য মিসরে বিশেষ কেন্দ্র এবং এবাদতখানা কায়েম কর, এবং নামাজ কায়েম করার মাধ্যমে আল্লাহর সাথে তাদের সম্পর্ক জুড়ে দাও এবং তাদের জীবনকে আল্লাহর আনুগত্যকারী জীবনে পরিণত কর। এবং একই সাথে বলেছেন যে, যখন এই সমস্ত কাজ আমলে পরিণত হয়ে যাবে, তখন জাতিকে সুসংবাদ শুনিয়ে দাও যে, আল্লাহ তায়ালা তাদের দোয়া কবুল করে নিয়েছেন এবং আল্লাহর সিদ্ধান্ত তাদের ব্যাপারে হয়ে গেছে।

وأوحينا إلى موسى وأخيه أن تبوءا لقومكما بمصر بيوتا واجعلوا بيوتكم قبلة وأقيموا الصلوة وبشر المؤمنين

হজরত মূসা (আ) ও হারুন (আ) আল্লাহর হুকুম মোতাবেক বনী ইসরাঈলের শিক্ষা-দীক্ষার কাজে নিয়োজিত হলেন। এবং বনী ইসরাঈল আল্লাহ তায়ালার হুকুম অনুযায়ী নামাজ কায়েম করার আমল এবং পরিবর্তনের মেহনত আরম্ভ করে দিলো, তখন হজরত মূসা (আ) ও হজরত হারুন (আ) দোয়া করলেন যে, আয় আল্লাহ! তুমি ফেরাউন এবং ফেরাউনীদেরকে দুনিয়ার যে নাজ-নেয়ামত দান করে রেখেছো, তারা তার মাধ্যমে তোমার বান্দাদেরকে পথভ্রষ্ট করছে। আয় মালেক! তুমি তাদের মাল-দৌলতকে বিধ্বস্ত করে দাও, এবং ঝাড়ু মেরে দাও।

وقال موسى ربنا إنك آتيت فرعون وملأه زينة وأموالا في الحيوة الدنيا ربنا ليضلوا عن سبيلك ربنا اطمس على أموالهم واشدد على قلوبهم فلا يؤمنوا حتى يروا العذاب الأليم

আল্লাহ তায়ালা হজরত মূসা (আ) এবং হারুন (আ)-এর দোয়া কবুল করলেন, তাঁদেরকে হুকুম করা হলো যে, বনী ইসরাঈলদেরকে নিয়ে মিসর থেকে বেরিয়ে যাও। তারা বেরিয়ে পড়লেন, আল্লাহ তায়ালা তাঁদের জন্য সাগরের মধ্যে রাস্তা বানিয়ে দিলেন, যদ্বারা তাঁরা সহী-সালামতে সাগর পার হয়ে গেলেন। ফেরাউন তার পুরা লায়লস্কর নিয়ে তাঁদেরকে পিছু ধাওয়া করলো, আর তাদেরকে পুরা সৈন্য-সামন্তসহ ডুবিয়ে দেয়া হলো। এই সব যা কিছু হলো, সরাসরি শক্তিশালী কুদরতওয়ালা আল্লাহর শক্তিতে হলো।

আম্বিয়া (আ)-দের রাস্তা এটাই। তাঁরা নিজেকে এবং নিজের সঙ্গী-সাথীদেরকে শুধু আল্লাহর হুকুমের ওপর ঢেলে দেন, আর আল্লাহর রাস্তার কষ্টসমূহ উঠাতে থাকেন, কোরবানী দেন, আর আল্লাহ তায়ালা নিজের কুদরত ও শক্তি দ্বারা তাদের সমস্যা সমাধান করে দেন।

কোরআন শরীফে এটাকে “সুন্নাতুল্লাহ” বা আল্লাহর সুন্নত বলা হয়েছে, এবং বলা হয়েছে যে, আল্লাহ তায়ালার এটা আদি ও দায়েমী কানুন।

فلن تجد لسنة الله تبديلا ولن تجد لسنة الله تحويلا

(অর্থাৎ আল্লাহর সুন্নতকে কখনো পরিবর্তনশীল পাবেনা এবং আল্লাহর সুন্নতকে কখনো অদল বদল পাবেনা।)

(তাযকেরায়ে হজরতজী-১৬২)

৭৯. উম্মতের মধ্যে অনৈক্য সৃষ্টিকারী জিনিস

হজরতজী বলেন— স্মরণ রাখো! আমার জাতি এবং আমার এলাকা এবং আমার ভ্রাতৃত্ব এইসব শব্দ উম্মতকে বিভক্তকারী কথাবার্তা। আর আল্লাহর কাছে এ সমস্ত কথা এতো অপছন্দ যে হজরত সাদ ইবনে উবাদাহ (রা)-এর মতো বড় সাহাবী থেকে এই ব্যাপারে যে ভুল হয়ে গেছে, তার ফল হিসাবে তাঁকে দুনিয়াতেই প্রতিদান পেয়ে ভুগতে হয়েছে।

হাদীস শরীফে আছে যে, তাঁকে জ্বিনেরা হত্যা করে ফেলেছিলো এবং মদীনাতে এই আওয়াজ শোনা গিয়েছিলো, আর আওয়াজকারীকে দেখা যায়নি। “আমরা খায্রাজ গোত্রের সর্দার সাদ ইবনে উবাদাহা (রা)-কে ধ্বংস করে দিয়েছি, আমরা তাঁকে তীরের লক্ষস্থল বানিয়েছি যা সোজা তাঁর বুকে গিয়ে লেগেছে।” এই ঘটনা দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে এবং শিক্ষা দিয়েছে যে, ভালো থেকে ভালো মানুষ যদি গোষ্ঠিগত অথবা আঞ্চলিকতার ভিত্তির ওপর উম্মতের ঐক্যকে ভাঙ্গে, তখন আল্লাহ তায়ালা তাকেও ভেঙ্গে রেখে দেবেন।

এইজন্য আমি বলি যে, শুধু কলেমা এবং তসবীহ দ্বারা উম্মতের ঐক্য বা উম্মাহ বনবেনা। উম্মত লেনদেন এবং সামাজিক আচার-ব্যবহারের বিশুদ্ধিকরণের দ্বারা এবং সকলের ন্যায্য পাওনা আদায় করা এবং সকলকে একরাম করার মাধ্যমে বনবে। বরং তখন বনবে, যখন অন্যের জন্য নিজের হক বা পাওনা এবং নিজের লাভ বা সুবিধাকে কোরবান করা হবে। হুজুরে পাক (স) এবং হজরত আবুবকর (রা) ও হজরত ওমর (রা) নিজেদের সব কিছুকে কোরবান করে এবং নিজেদের ওপর কষ্টসমূহকে সহ্য করে এই উম্মতকে উম্মাহ বানিয়েছিলেন।

(তাযকেরায়ে হজরতজী-পৃঃ ১৫৩)

৮০. আমাদের পূর্বসূরীদের এখানে পরিচিতির পদ্ধতি

হজরতজী মাওলানা ইউসুফ সাহেব (রহঃ) পাকিস্তানে তশরীফ নিয়েছিলেন। ওখানে তাবলীগের কাজ করনেওয়ালা পুরোনো সাথীরা শাসনক্ষমতার ওপরস্থ পদে যারা আসীন ছিলো, তাদের একটা বিশেষ এজতেমা করলো। আর তার মধ্যে মন্ত্রী-মিনিস্টার, সরকারের ওপরস্থ অফিসার এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিদেরকে সেখানে একত্রিত করা হলো। হজরত বয়ান করার জন্য যখন তাঁদের মধ্যে আগমন করলেন, তখন সকলের পরিচিতি দেয়া হলো যে, ইনি মন্ত্রী সাহেব, আর উনি অমুক দপ্তরের সেক্রেটারী, ইনি অমুক দপ্তরের পরিচালক ইত্যাদি। যখন পরিচিতি পর্ব শেষ হলো, তখন হজরতজী (রহঃ) বয়ান এভাবে আরম্ভ করেন— ভাইয়েরা! এইমাত্র আপনারা অজানা কতো কতো পদাধিকারীকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। এর পর হজরতজী কিছু জন্তুর নাম নিয়ে বল্লেন, হাঁ, যদি আপনারা এভাবে পরিচয় করাতেন, তাহলে হয়তো আমি বেশী বুঝতে পারতাম।

যেসব ভাইয়েরা এদেরকে একত্রিত করেছেন তাদের মাথা শরম এবং ভয়ে ঝুঁকে ছিলো যে, জানিনা একথার এখন কি প্রভাব হয়। হজরতজী আশ্চর্যজনক মর্মস্পর্শী এবং হৃদয়গ্রাহী ঢং-এ বয়ান শুরু করলেন যে,

হে আমার ভাইয়েরা! মন্ত্রীতো মুসলমানও হয় এবং অমুসলিমও হয়। ডাক্তার মুসলমানও হয় এবং অমুসলিমও হয়। এমনিভাবে সমস্ত পদাধিকারীদের পদই এমন। এর মধ্যে আমাদের এবং আপনাদের কোন বিশেষত্ব নেই। আমাদের পূর্বসূরীদেরকে যখনই পরিচয় করিয়ে দেয়া হতো, তখন একথা বলা হতো না যে, ইনি এতোটা ফ্যাক্টরীর মালিক এবং এতোখানা অট্টালিকার মালিক এবং এতোটা গাড়ীর মালিক; বরং পরিচিতি এভাবে করা হতো যে, ইনি বদরী সাহাবী, আর উনি ওহুদের যুদ্ধে শরীক ছিলেন, ঐ ভাই অমুক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করছেন এবং ইনি অমুক যুদ্ধে শরীক হয়েছিলেন। এবং উনি দ্বীনের জন্য এই এই কোরবানী পেশ করেছেন। এটা পরিচিতি দানের পদ্ধতি ছিলো।

(হজরতজী কি এয়াদগার তকরীরেঁ-পৃঃ ৭৩)


← আগের পর্ব (বাণী ৪১–৬০)  |  সূচিপত্র  |  পরের পর্ব (বাণী ৮১–১০০) →

মূল বই: মালফুজাতে হযরতজী মাওলানা ইউসুফ (রহঃ)। সংকলন: মুফতি রওশন শাহ কাসেমী। অনুবাদ: ইসহাক ওবায়দী। প্রকাশক: বাড কম্প্রিন্ট এন্ড পাবলিকেশন্স, ঢাকা। বইটির স্ক্যান কপি archive.org-এ পাওয়া যাবে।

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *