মালফুযাত – প্রফেসর মুশফিক আহমদ (রহঃ) – পর্ব ৮: ১৪১–১৬০
প্রফেসর মুশফিক আহমদ (রহঃ)-এর বয়ান, পরামর্শ, আমল ও দাওয়াতি জীবনের মালফুযাত, ১৪১ থেকে ১৬০ নম্বর। সম্পূর্ণ সূচিপত্র দেখুন।
সংগ্রহ ও সংকলন: মুশফিক আহমদ (রহঃ)-এর মালফুযাত সংকলন।
এই পর্বে যা আছে
- ১৪১. স্যারের জীবনের শেষ দিকে স্যার যখন পড়চা (রোখ) ছাড়া…
- ১৪২. এক মুজাকারায় স্যার বললেন, “ইতাআত” অর্থাৎ মুরুব্বীদের মানা, উনাদের…
- ১৪৩. স্যার একবার আরব জামাত নিয়ে চট্টগ্রামের এক গ্রাম এলাকায়…
- ১৪৪. এক ভাই স্যারকে জানালেন যে তিনি বিয়ের জন্য একটি…
- ১৪৫. এক ভাই তার বিয়ের ব্যাপারে এলাকার একটি প্রস্তাব নিয়ে…
- ১৪৬. এক ভাই বিয়ের একটি প্রস্তাব নিয়ে স্যারের সাথে পরামর্শ…
- ১৪৭. স্যার সোবহানবাগ বা ধানমন্ডীতে থাকাকালীন ঢাকায় অবস্থান করলে কাকরাইলে…
- ১৪৮. চাপাইনবাবগঞ্জ সোনামসজিদ বর্ডার দিয়ে একবার স্যার ভারতের সফরের উদ্দেশ্যে…
- ১৪৯. মাশোয়ারার শুদ্ধতার জন্য এবং কাকরাইলের বিভিন্ন হালতের কারণে নব্বইয়ের…
- ১৫০. এস্তেমার পর হজরতজ্বী এনামুল হাসান রহমতুল্লাহি আলাইহি যখন কাকরাইলে…
- ১৫১. একবার এক প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে স্যার বলেছিলেন, “অতি…
- ১৫২. রংপুরের জিম্মাদার ইউনূস ভাইয়ের সাথে স্যারের গভীর মহব্বতের সম্পর্ক…
- ১৫৩. রুয়েটের কিছু ছাত্র স্যারের সাথে সম্পর্ক রাখত এবং রাজশাহী…
- ১৫৪. রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজলা গেট মসজিদের ইমাম সাহেব হুজুরের বাসা…
- ১৫৫. দ্বীনের চেয়ে রাজনীতিকে প্রাধান্য দেয়, দ্বীনের বিধান প্রতিষ্ঠার নামে…
- ১৫৬. ঢাকা আশুলিয়ায় জামাত চলছিল, ফজরের নামাজের পর স্যার বাসায়…
- ১৫৭. এক সফরে স্যারকে এক ভাই বাসায় দাওয়াত করেন। দাওয়াতে…
- ১৫৮. রাজশাহীতে তখন মার্কাজ মসজিদ ছিল ষষ্ঠীতলায় (সম্ভবত রাজশাহীর প্রথম…
- ১৫৯. একবার এক প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে স্যার বলেন, আল্লাহওয়ালারা…
- ১৬০. মদীনা হারাম শরিফে স্যার রমজানে ইতেকাফে ছিলেন। কিছু ফ্রেঞ্চ…
১৪১. স্যারের জীবনের শেষ দিকে স্যার যখন পড়চা (রোখ) ছাড়া…
স্যারের জীবনের শেষ দিকে স্যার যখন পড়চা (রোখ) ছাড়া জামাতে সফর করছিলেন (২০১৫ সালের আগস্ট মাস), পড়চা না থাকার কারণে প্রায়ই বিভিন্ন মসজিদ থেকে স্থানীয় সাথীরা জামাতের সাথে খারাপ আচরণ করে মসজিদ থেকে বের করে দিচ্ছিলেন। অন্ধ অনুকরণ এবং দ্বীনি আহকামের চেয়ে উসূলকে প্রাধান্য দেওয়ার কুফলের ব্যাপারে সতর্ক করার উদ্দেশ্যে স্যারের এই সফরকে (রোখছাড়া) তাবলীগের মুরব্বীরা সেই সময় ফিতনা হিসেবে অভিহিত করেন যার ফলে সাধারণ সাথীদের মধ্যে স্যারের জামাতের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়ে যায়। এমনকি, কিছু এলাকায় স্থানীয় সাথীদের অত্যাচার এতটাই খারাপ পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, এমন ব্যক্তিরাও, যারা কখনো তাবলীগের কাজে সময় দেননি, তারা এসব আচরণ দেখে বিস্মিত হয়েছিলেন। পরপর তিনটি মসজিদ থেকে জামাতকে বের করে দেওয়ার পর পুরান ঢাকার খাজে দেওয়ান মসজিদে স্যার জামাতসহ থাকতে সক্ষম হন। পরদিন স্যার এই মসজিদে মুজাকারায় বলেন, জালিমের ব্যাপারেও শুভকামী হওয়া উচিত, খায়ের খাঁ হওয়া উচিত। প্রতিশোধ নেওয়ার চিন্তা যে করে, সে শুভকামী নয়, তার অমঙ্গল কামনা করে এবং তার অমঙ্গল দেখলে আনন্দিত হয়। যদি আমাকে কেউ মসজিদ থেকে গালাগালি করে, লাথি মেরে বের করে দেয়, এবং পরে আমি খবর পাই যে সেই ব্যক্তি রাস্তায় দুর্ঘটনায় পড়ে তার পা ভেঙে ফেলেছে, তখন আমার কী করা উচিত? যদি মনে মনে বলি ‘আলহামদুলিল্লাহ, বেশ হয়েছে’, এটি আল্লাহওয়ালাদের বৈশিষ্ট্য নয়। তাহলে তো আমরা একই জমির ফসলের মতো হলাম (একই রকম চাহিদা), সে ঐদিক থেকে মারছে আর আমি এই দিক থেকে মারছি (সে তার এক চাহিদাকে সামনে রেখে আচরণ একভাবে প্রকাশ করেছে, আর আমি ঐ একই চাহিদাকে সামনে রেখে আমার আচরণ আরেকভাবে প্রকাশ করছি, তার অমঙ্গল দেখে আনন্দিত হচ্ছি), আমাদের মধ্যে পার্থক্য কোথায়? তার এই পা ভাঙ্গার কথা শুনে, বিপদ দেখে আমার মনে দুঃখ হয়, তার প্রতি সহানুভূতি জন্মায়, তার জন্য চিন্তাফিকির করি, দু’আ করি তাহলেতো ঠিক আছে (রহমতুল্লিল আ’লামীন এর কাম করনেওয়ালার লক্ষ্য হবেতো ঐ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সিফাত অর্জন করা যা বন্ধু ও শত্রু সবার প্রতি রহমত ও দরদের চিন্তা জাগাবে। নবীওয়ালা কাম করনেওয়ালা ব্যক্তির অন্তরে এমন দয়া ও মমত্ববোধ থাকবে, যা শত্রুর জন্যও কল্যাণ কামনা করতে উদ্বুদ্ধ করবে, তার লক্ষ্য হবে মানুষের হিদায়াত ও মঙ্গল নিশ্চিত করা, প্রতিহিংসা বা বিদ্বেষ না। বন্ধুর প্রতি ভালোবাসা যেমন স্বাভাবিক, তেমনই শত্রুর প্রতি রহম ও কল্যাণের দোয়া করাও একজন দায়ী’র পরিচয়)।
১৪২. এক মুজাকারায় স্যার বললেন, “ইতাআত” অর্থাৎ মুরুব্বীদের মানা, উনাদের…
এক মুজাকারায় স্যার বললেন, “ইতাআত” অর্থাৎ মুরুব্বীদের মানা, উনাদের সম্মান করা এবং শ্রদ্ধা করা এমন হওয়া উচিত যেন তা শরীয়তের মাপকাঠিতে গ্রহণযোগ্য হয় (অন্ধ অনুকরণ, যা বললো তাই মানলাম এরকম না হয়)। নমশূদ্ররা যেমন ব্রাহ্মণদের অন্ধভাবে মেনে চলে, আমাদের মানা তেমন হওয়া উচিত নয়। কারণ, যদি শুধুমাত্র মানার মাধ্যমে জান্নাত পাওয়া যেত, তাহলে নমশূদ্ররা প্রথমেই জান্নাতে প্রবেশ করত। কেননা, পৃথিবীর ইতিহাসে তাদের মতো এরকম ইতাআতের উদাহরণ আর কোথাও নেই। কিন্তু সেই মানা তাদের জান্নাতের বদলে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার একটি জামাত পাঠিয়েছিলেন। সেই সফরের সময় জামাতের আমীর একটি কুন্ডলিতে আগুন জ্বালিয়ে জামাতের মামুরদের নির্দেশ দেন সেই আগুনে ঝাঁপ দিতে। কিন্তু মামুররা কেউই সেই নির্দেশ মানেননি। সফর শেষে উনারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এই ঘটনা জানালে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যদি তোমরা সেই আগুনে ঝাঁপ দিতে, তাহলে সেখান থেকে আর কোনোদিন বের হতে পারতে না। অর্থাৎ, সেই আগুন তাদের জন্য জাহান্নামের আগুনে পরিণত হতো। এই ঘটনায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আগে থেকে মামুরদের সাবধান করেননি যে এই আমীর হয়তো একটু ‘পাগলা’ হতে পারেন, এরকম কোন সাবধান করেননি। বরং আমীরের পদ এবং তাকে মানার নির্দেশ ঠিক সেভাবেই ছিল যেভাবে ইতাআতের নিয়ম বলা হয়েছে। আমীরকে মানার সীমানা কোথায় শেষ, সেটি শিক্ষা দেওয়ার জন্য আল্লাহ তা’আলা এই ঘটনার ব্যবস্থা করেছিলেন। স্যার বলেন, আমরা সাধারণ মানুষ হলে হয়তো বলতাম, এই আমীরকে নির্বাচন করাটাই ভুল হয়েছে। কিন্তু যেহেতু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই এই আমীরকে নির্বাচন করেছিলেন, তাই এটি শিক্ষা দেওয়ার জন্য আল্লাহ তা’আলার পক্ষ থেকে একটি বিশেষ উদাহরণ ছিল। এর মাধ্যমে এই উম্মতকে শেখানো হয়েছে যে, শুধু মানার শিক্ষা নয়, বরং কোথায়, কতটুকু এবং কীভাবে মানা, এবং কোথায় মানা উচিত নয়, কোথায় ইতায়াত করা যাবে না, সেটিও শেখা জরুরি।
১৪৩. স্যার একবার আরব জামাত নিয়ে চট্টগ্রামের এক গ্রাম এলাকায়…
স্যার একবার আরব জামাত নিয়ে চট্টগ্রামের এক গ্রাম এলাকায় সফরে ছিলেন। সেখানে এক গরিব সাথী জামাতের সাথে সময় দিচ্ছিলেন এবং নুসরত করছিলেন। তার মহল্লায় যখন জামাত পৌঁছাল, তিনি জামাতকে মেহমানদারির জন্য দাওয়াত দিলেন। স্যার তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি দাওয়াত দিচ্ছো কিভাবে? সাথী উত্তর দিলেন, এটা আমার দাওয়াত নয়, এটা চেয়ারম্যান সাহেবের দাওয়াত। চেয়ারম্যান হলেন এলাকার একজন ধনী ব্যক্তি। স্যার আবার প্রশ্ন করলেন, তিনি কোথায়? সাথী জানালেন, তিনি আসেননি, শুধু আমাকে তার পক্ষ থেকে বলতে বলেছেন। পরে স্যার জানলেন, স্থানীয় সাথীরা চেয়ারম্যানকে গিয়ে ধরেছেন, উনাকে বুঝিয়ে দাওয়াত দিতে রাজি করিয়েছেন (বিদেশী জামাত, আরব জামাত, ভাল মেহমানদারী করা দরকার)। তখন স্যার ঐ সাথীকে বললেন, এই দাওয়াত আমরা খাব না। এরপর স্যার তাকে বললেন, তুমি নিজের দাওয়াত দাও, আমরা তোমার দাওয়াত গ্রহণ করব। আমরা চিনি ও সূজি কিনে দেব, তুমি চিনি দিয়ে সূজি পাক করে দিবে, আর তুমি আটার ব্যবস্থা করে রুটি বানিয়ে দিবে। তার নিজের জন্য এতটুকুর এন্তেজাম কঠিন হয় নাই, সে খুব সাদরে রুটি নিয়ে এলো, মাত্র বিশটি রুটি দিয়ে সাথীর মেহমানদারিও হয়ে গেল। সেই একই জামাতে, আরেক এলাকায় এক গরিব সাথী খুব ইচ্ছা করলেন জামাতকে দাওয়াত খাওয়ানোর। স্যার তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি নিজে কতটুকু করতে পারবে? সাথী উত্তর দিলেন, আমি একটি মুরগি কিনতে পারব। স্যার বললেন, ঠিক আছে, তুমি মুরগি কিনে রান্না করো, আমরা চাল ডাল পাকাবো। স্যার এই কথা বলার সময় কেঁদে ফেললেন, সাথী যখন মুরগি রান্না করে নিয়ে এলেন, তখন হয়তো ছয় মাস পর তার বাসায় একটি মুরগি রান্না হলো। স্যার বললেন, তোমার দাওয়াত আমরা গ্রহণ করেছি, খাবার প্লেট প্রস্তুত করার সময় সেই মুরগির তরকারি থেকে প্রথমে কিছু গোশত ও ঝোল সাথীর বাসায় পাঠিয়ে দেওয়া হলো, যেন তার পরিবারও সেই খাবার খেতে পারে। স্যার এই ঘটনাটি বলার সময় বলেছিলেন, মেহমানদারি করা খুব সহজ, মেহমানদারি হবে ব্যক্তিগত, কোনো চান্দাবাজি করে বা অন্যের ওপর চাপিয়ে মেহমানদারি হয়না।
১৪৪. এক ভাই স্যারকে জানালেন যে তিনি বিয়ের জন্য একটি…
এক ভাই স্যারকে জানালেন যে তিনি বিয়ের জন্য একটি মেয়ে দেখতে যাবেন কিনা তা নিয়ে দ্বিধায় আছেন। তিনি জানালেন যে মেয়ের ভাইয়ের সাথে তার দীর্ঘদিনের পরিচয় আছে। ভাইটি খুবই আদবওয়ালা, ভালো আখলাকের অধিকারী এবং তাবলিগের সাথী। মেয়ের মামা ও আত্মীয়দের মধ্যে অনেকেই তাবলিগের ভালো মুবাল্লিগ। মেয়ের পরিবারের পরিবেশও দ্বীনি। তাদের বাড়িতে তালিম হয়, মহল্লার মাসতুরাতের তালিমে মেয়ের মা এবং মেয়েও অংশগ্রহণ করেন। বাড়িতে পর্দার চর্চা রয়েছে এবং সুন্নতের আমল অনুসরণ করা হয়। মেয়ের বাবা একজন সুন্নতের উপর আমলকারী ব্যক্তি এবং একটি ব্যাংকের স্থানীয় শাখার ম্যানেজার। পাত্রী দেখার আগে তিনি সবদিক থেকে খোঁজখবর নিয়েছেন এবং যতটুকু জেনেছেন, তা তার পছন্দ হয়েছে। এখন মেয়ে দেখা হলে এবং পছন্দ হলে বিয়ে চূড়ান্ত করার ইচ্ছা রয়েছে। মেয়ে পক্ষ থেকেও ইতিবাচক আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে। যাবতীয় পরিস্থিতি শুনে স্যার কিছুক্ষণ (২০-২৫ সেকেন্ড) নীরব থাকলেন। এরপর আস্তে শব্দে, একটি ছোট্ট বাক্যে উত্তর দিলেন, “এটা থাক।” (সম্ভবত স্যার ওই ভাইয়ের জন্য ব্যাংকার পরিবারের সম্বন্ধকে পছন্দ করেননি)। এ প্রসঙ্গে এক ভাই তার অভিজ্ঞতা এরকম জানিয়েছেন, “আমার নিজের জানা আছে ব্যাংকার বাবার মেয়েকে স্যার বিয়ে করার পরামর্শ দিয়েছেন, নিজে বিয়ে পড়িয়েছেন, ব্যাংকার পরিচিত ব্যক্তির কাছে গাশতে গেছেন। তবে কিছু খেতে দেখিনি।”
১৪৫. এক ভাই তার বিয়ের ব্যাপারে এলাকার একটি প্রস্তাব নিয়ে…
এক ভাই তার বিয়ের ব্যাপারে এলাকার একটি প্রস্তাব নিয়ে স্যারের সাথে পরামর্শ করতে এসেছিলেন। ভাইটি জানান, তার মহল্লার এক সাথী একটি প্রস্তাব দিয়েছেন। মেয়েটির বাড়ি পার্শ্ববর্তী মহল্লায়। যদিও মেয়েটির বাসায় তেমন দ্বীনি পরিবেশ নেই, তবে মেয়েটি বড় আমলের পাবন্দ। মহল্লার মাসতুরাতের তালিমে অংশগ্রহণ করে ধীরে ধীরে তার মধ্যে পরিবর্তন এসেছে। এখন সে পরিবারিক আধুনিকতা ছেড়ে দিয়ে খাস পর্দার আমল করে। এমনকি হাত ও পায়ে মুজা পড়ে এবং তাহাজ্জুদ নামাজ নিয়মিত আদায় করে। মেয়েটির বাসায় বেশ কিছু ভালো প্রস্তাব এসেছে, যার মধ্যে ছেলেদের অবস্থান আর্থিকভাবে মজবুত। তবে মেয়েটি প্রত্যেকটি প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছে। তার শর্ত হলো, ছেলে যদি সুন্নতের উপর আমলকারী না হয় এবং তিন চিল্লাওয়ালা না হয়, তাহলে সে বিয়েতে সম্মতি দেবে না। এই বিষয়টি নিয়ে তার পিতা-মাতা (যারা দ্বীন সম্পর্কে অতটা সচেতন নন) বেশ পেরেশান। তারা মনে করছেন মেয়ে ভালো ভালো প্রস্তাব নাকচ করে দিচ্ছে। মাসতুরাত মহলে এই ভাইয়ের সম্পর্কে মেয়ের সঙ্গে কথা হয়েছে, এবং মেয়েটি এই প্রস্তাবে সম্মতি জানিয়েছে। মেয়েটি ভাই-বোনদের মধ্যে সবচেয়ে ছোট, বাকিদের বিয়ে হয়ে গেছে। তার পিতা একজন অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা এবং থানার সাবেক ওসি। যদিও পরিবারে দ্বীনি পরিবেশ নেই, তবে মেয়ের দ্বীনদারী এবং আমল সম্পর্কে জানা তথ্যে কোনো সমস্যা পাওয়া যায়নি। ভাইটি স্যারের কাছে জানতে চান, মেয়েটিকে দেখতে তিনি যাবেন কিনা। স্যার সবকিছু শুনে সরাসরি কোনো উত্তর না দিয়ে বললেন, অনেক সময় পিতা-মাতার বা অভিভাবকের উপার্জন, খারাপ আমল, খারাপ অভ্যাস, কিংবা জুলুম ইত্যাদি ভবিষ্যৎ বংশধরদের ওপর খারাপ প্রভাব ফেলে। (সম্ভবত স্যার এই মন্তব্যের মাধ্যমে পুলিশ পরিবারের এই প্রস্তাবটি এড়ানোর জন্য ঐ ভাইকে পরোক্ষভাবে নির্দেশ দিয়েছিলেন)।
১৪৬. এক ভাই বিয়ের একটি প্রস্তাব নিয়ে স্যারের সাথে পরামর্শ…
এক ভাই বিয়ের একটি প্রস্তাব নিয়ে স্যারের সাথে পরামর্শ করতে এসেছিলেন। তিনি জানালেন, প্রস্তাবটি মেয়ের পক্ষ থেকেই এসেছে, এবং সব দিক থেকেই তা তার পছন্দ হয়েছে। মেয়ের পরিবারে দ্বীনি পরিবেশসহ অন্য কোনো ক্ষেত্রেই কোনো কমতি নেই। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তিনি তিনদিন এস্তেখারা করেছেন। তার ধারণা, স্বপ্নে যা দেখেছেন তা এই প্রস্তাবে অগ্রসর হওয়ার অনুকূল ইঙ্গিত দেয়। তিনি তার স্বপ্নের বর্ণনা দিয়ে স্যারকে বিস্তারিত জানান। স্বপ্নে তিনি মেয়ের বাসায় গেছেন। বাস্তবে মেয়েদের বাসা যেমন, স্বপ্নে তা আরও বড় এবং উন্নত দেখেছেন। বাস্তবে মেয়ের বাসার উপরে টিনের চালা থাকলেও, স্বপ্নে বাসাটি ছিল ছাদ ঢালাই করা এবং বাস্তবের তুলনায় অনেক বেশি সাজানো-গোছানো ও পরিপাটি। স্বপ্নে তিনি দেখেছেন, মেয়ের পিতা তাকে অনেক সম্মান ও আপ্যায়ন করছেন এবং বিভিন্ন রকম খাবারের ব্যবস্থা করেছেন। তবে স্বপ্নে মেয়ের পিতার মুখে দাড়ি ছিল না, যেখানে বাস্তবে তার মুখে লম্বা দাড়ি রয়েছে। এই স্বপ্ন দেখে তিনি মনে করেছেন এটি একটি ভালো ইঙ্গিত, এবং স্যারের চূড়ান্ত মতামত পাওয়ার জন্য তিনি এসেছেন। স্যার তার স্বপ্নের বর্ণনা শুনে সরাসরি হ্যাঁ বা না বলেননি। বরং তিনি এইভাবে নিজের নেতিবাচক মতামত প্রকাশ করলেন, “এই প্রস্তাব ছাড়া এই মুহূর্তে তোমার সামনে কি আর কোনো বিকল্প প্রস্তাব আছে, যেটি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা যায়?”
১৪৭. স্যার সোবহানবাগ বা ধানমন্ডীতে থাকাকালীন ঢাকায় অবস্থান করলে কাকরাইলে…
স্যার সোবহানবাগ বা ধানমন্ডীতে থাকাকালীন ঢাকায় অবস্থান করলে কাকরাইলে নিয়মিত যাতায়াত করতেন। কাকরাইল মসজিদে শবগুজারীতে অংশগ্রহণ করতেন এবং একসময় প্রতি বৃহস্পতিবার এশার নামাজের পর ছাত্রদের সাথে বসার একটি বিশেষ পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। কাকরাইল মসজিদের দ্বিতীয় তলার উত্তর পার্শ্বে ছাত্রদের খোঁজখবর নিতেন, কথা বলতেন এবং তাদের দ্বীনি বিষয়ে উৎসাহ দিতেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ, বুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা পড়াশোনা শেষে অনেকে শবগুজারীর জন্য কাকরাইলে এসে এশা পড়তো এবং এশার পর স্যারের এই বৈঠকে অংশ নিত। এই বৈঠক দিন দিন জনপ্রিয় হতে থাকে, এবং ছাত্রদের ভিড় বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে মুরব্বীদের পক্ষ থেকে স্যারকে এ ধরনের বৈঠক না করার ব্যাপারে তাকিদ দেওয়া হয়। তবুও স্যার কাকরাইলের সাথে তার সম্পর্ক বজায় রাখতেন। ঈদের নামাজ কাকরাইলে পড়তেন, রমজানের তারাবীহ নামাজ কাকরাইলে পড়তেন। ঢাকায় পৌঁছে তিনি কোনো রকম ব্যাগটা রেখেই সরাসরি কাকরাইলে চলে যেতেন। কখনও কখনও ধানমন্ডি থেকে হেঁটে ফজরের নামাজ পড়তে কাকরাইলে যেতেন, আবার কখনও এলাকায় ফজরের নামাজ শেষ করে কাকরাইলে সকাল ৮টার মাশওয়ারায় অংশ নিতে হেঁটে যেতেন। স্যারের কাকরাইলের সাথে এই গভীর সম্পর্ক অনেকের জন্য ঐসময় দৃষ্টান্ত হয়ে ছিল। এক প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে স্যার একবার বলেছিলেন, “একটা সময় কাকরাইলের (মুরব্বীদের) সাথে গভীর সম্পর্ক ছিল, যেটা এখন আর নেই।” তিনি একটি উদাহরণও দেন। স্যার বলেছিলেন, মেয়ের আক্বীকার জন্য তিনি কাকরাইলের মুরব্বীদের জানিয়েছিলেন যে আক্বীকা কাকরাইলে দেওয়ার ইচ্ছা। কিন্তু মুরব্বীদের পক্ষ থেকে তাকে পরামর্শ দেওয়া হয়, “তুমি বাসায় আক্বীকা দাও, নিজের লোকদের মধ্যে আক্বীকা করো।” বাসায় ফিরে স্যার বলেছিলেন যে তিনি আক্বীকা বাসাতেই করবেন। তখন বাসা থেকে প্রশ্ন করা হয়, “তুমি তো বলেছিলে কাকরাইলে আক্বীকা দিবে, কেন বাসায় করছ?” স্যার জবাবে বলেন, “কাকরাইল থেকে বলেছে, আপন লোকদের সাথে আক্বীকা দিতে।” তখন বাসা থেকে বলা হয়, “তোমার আপন তো কাকরাইলই, কাকরাইলেই আক্বীকা দাও।” সেই সময় স্যার কাকরাইলের সাথে এতটাই গভীর সম্পর্ক রাখতেন যে পরিবারও কাকরাইলকে তার আপনজন বলে মনে করত।
১৪৮. চাপাইনবাবগঞ্জ সোনামসজিদ বর্ডার দিয়ে একবার স্যার ভারতের সফরের উদ্দেশ্যে…
চাপাইনবাবগঞ্জ সোনামসজিদ বর্ডার দিয়ে একবার স্যার ভারতের সফরের উদ্দেশ্যে (১৯৯৪/৯৫) রওনা হন। তবে, বাংলাদেশের ইমিগ্রেশন স্যারকে আটকে দেয়, ফলে ফিরে আসতে হয়। সোনামসজিদ চেকপয়েন্টে মসজিদে বসে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করা হয়েছিল এই আশায় যে স্যারের পাসপোর্টটি ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ ছেড়ে দেবে। সেই সময় অপেক্ষারত অবস্থায় মসজিদে বিভিন্ন কথাবার্তার মাঝে মাহফুজ ভাই স্যারকে জিজ্ঞেস করেন, “স্যার, হজরতজ্বী নাকি বিশ্ব এস্তেমা বন্ধ করতে চাচ্ছেন?” স্যার সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দেন, “আমি জানি না।” কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর স্যার বললেন, “আমি হজরতজ্বীকে যতটুকু জানি, এই লেভেলে উনি আসবেন না (উনার পক্ষ থেকে এই ধরনের কোনো কথা বলা হবে না)।” মাহফুজ ভাই তখন প্রশ্ন করেন, “কেন?” স্যার বলেন, “এই এস্তেমা চালু করা, বন্ধ করা, এস্তেমার এন্তেজামি সিদ্ধান্ত নেওয়া এগুলো হজরতজ্বীর কাজ নয়।” এরপর মাহফুজ ভাই আবার প্রশ্ন করেন, “হজরতজ্বী তো গোটা দুনিয়ার আমীর, এগুলো উনার কাজ না হলে উনার কাজটা কী?” তখন স্যার খুব দৃঢ়তার সাথে উত্তর দেন, “উনি একজন দায়ী, উনি দাওয়াত দেবেন, এক মহান দায়ী, দাওয়াত দেওয়াই উনার কাজ (এই ধরনের বন্ধ করা বা চালু করা, এই লেভেলের কাজে উনারা থাকেন না, এস্তেমার মধ্যে একজন দায়ীর কাজ সীমিত নয়। দায়ীর কাছে এস্তেমা হওয়া বা না হওয়া তেমন বড় গুরুত্ব বহন করে না, তার মূল দৃষ্টি ও মনোযোগ দাওয়াতের ওপর। দায়ীর মূল কাজ দাওয়াতই এবং এটাই তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব)।”
১৪৯. মাশোয়ারার শুদ্ধতার জন্য এবং কাকরাইলের বিভিন্ন হালতের কারণে নব্বইয়ের…
মাশোয়ারার শুদ্ধতার জন্য এবং কাকরাইলের বিভিন্ন হালতের কারণে নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকে স্যার সতর্কতামূলক কিছু বলাবলি শুরু করেন এবং শুদ্ধতার মেহনত শুরু করেন। তখন থেকেই তিনি তার প্রত্যেকটি পদক্ষেপের বিষয়ে—কি করছেন, কীভাবে করছেন, করার পর কী প্রতিক্রিয়া এসেছে এবং এরপর করণীয় কী—এসব বিষয় হযরতজ্বী এনামুল হাসান রহমতুল্লাহি আলাইহিকে জানাতেন। হযরতজ্বী রহমতুল্লাহি আলাইহির সঙ্গে স্যারের এতটাই গভীর সম্পর্ক ছিল যে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বিভিন্ন বিষয়েও তিনি হযরতজ্বীকে জানাতেন। একইভাবে, কাকরাইলের বিভিন্ন হালত এবং সেখানে তিনি কী করছেন তাও জানাতেন। ঐ সময় স্যার এমন কোনো কাজ করেননি যার বিষয়ে তিনি নিযামুদ্দিনে (হযরতজ্বীকে) অবগত করেননি। একবার নিযামুদ্দিন থেকে ক্বারী জহির সাহেব কাকরাইলে এসেছিলেন। সেখান থেকে তাকে মাদ্রাসায় পাঠানো হয় বয়ানের জন্য। কিন্তু সেই সময় মাদ্রাসায় পরীক্ষা চলছিল, ক্বারী সাহেব এতে কিছুটা বিরক্ত হন। (তিনি অল্প সময়ের জন্য বাংলাদেশে এসেছিলেন, তার সময়ের সর্বোত্তম ব্যবহার করা যেতো এবং উপযুক্ত মজমায় তাকে কাজে লাগানো যেতো। উপযুক্ত মজমায় ব্যবহার না করে মাদ্রাসার অনেক তাকাজা বুঝিয়ে উনাকে কাকরাইলের বাহিরে পাঠানো হয় ঐ সময় যখন মাদ্রাসাগুলোতে পরীক্ষা চলছিল)। পরে, কয়েকজনের মধ্যে ক্বারী সাহেব স্যারের প্রসঙ্গে খুব খুশি হয়ে বলেছিলেন, “এই সুন্দর চেহারার ছেলেটি এসে সবকিছু লিখে হযরতজ্বীকে জানিয়ে দিয়েছে।”
১৫০. এস্তেমার পর হজরতজ্বী এনামুল হাসান রহমতুল্লাহি আলাইহি যখন কাকরাইলে…
এস্তেমার পর হজরতজ্বী এনামুল হাসান রহমতুল্লাহি আলাইহি যখন কাকরাইলে অবস্থান করতেন, তখন তিনি সাধারণত কাকরাইলের উত্তর প্রান্তে খানার কামরায় আছর থেকে মাগরিব পর্যন্ত বসতেন। এ সময় বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকার জিম্মাদার সাথীরা কাকরাইলে এসে থাকতেন এবং আছরের পর হজরতজ্বীর সামনে বসার সৌভাগ্য লাভ করতেন। উনার সামনে বসে থাকাটাও সাথীরা একটি আমল হিসেবে বিবেচনা করতেন। স্যার তখন কাকরাইলের বিভিন্ন হালতের শুদ্ধতা নিয়ে মেহনত করছিলেন। এই প্রচেষ্টার কারণে সারা দেশেই স্যারের কাজ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছিল। এমন একদিনের ঘটনা, আছরের পর পুরো কাকরাইলের মজমা ছিল কানায় কানায় পূর্ণ। লোকজন ভরপুর সেই মজমার পেছন দিক দিয়ে স্যার হেঁটে হজরতজ্বীর কাছে গেলেন। গিয়ে হজরতজ্বীর হাতে একটি চিঠি দিলেন। তখনই মজমায় গুঞ্জন শুরু হয়ে যায়। এত লোকের ফিসফিসানিতে শব্দের প্রতিধ্বনি যেন কান তালা লাগিয়ে দেওয়ার মতো হয়ে উঠেছিল। মাগরিবের পর সবুজ ভাই (শাহারুল হুদা) স্যারকে জিজ্ঞেস করলেন, “স্যার, মজমায় এত গুঞ্জন শুরু হলো আপনার আচরণ দেখে। আপনি হজরতজ্বীর কাছে কী দিলেন? সবার ধারণা, আপনি হয়তো নতুন কোনো নালিশ করতে গেছেন।” স্যার হালকা হেসে বললেন, “না, না, এটা আমার আহলিয়ার নালিশ। কয়েক বছর আগে সে হজরতজ্বীকে চিঠি লিখেছিলো যেন আমি বাসায় যথেষ্ট সময় দিই। হজরতজ্বী তখন বলেছিলেন, ভাই মুসফিক, তোমার আহলিয়াকে সময় দেওয়া দরকার। তবে আমি সেভাবে সময় দিতে পারিনি। এবার সে আবার হজরতজ্বীর কাছে অভিযোগ করেছে যে, আপনি সময় দিতে বলেছিলেন, কিন্তু উনি এখনও আমাকে যথেষ্ট সময় দেন না।” এই কথা শুনে ঐসময় সেখানে উপস্থিত সবাই হাসতে শুরু করেন। এরপর সবুজ ভাই স্যারকে জিজ্ঞেস করলেন, “স্যার, আপনি কাকরাইলে যে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছেন, যার কারণে হাজী সাহেব (আব্দুল মুকিত সাহেব) এর সঙ্গে মতবিরোধ হচ্ছে, এসব কি আপনি হজরতজ্বীকে জানিয়েছেন?” স্যার উত্তর দিলেন, “আমি প্রত্যেকটা পদক্ষেপ চিঠি দিয়ে হজরতজ্বীকে জানিয়েছি।” তখন সবুজ ভাই আবার জানতে চাইলেন, “হজরতজ্বী কী জবাব দিতেন?” স্যার বললেন, “এটা একটি উসূল, যদি মুরিদ কোনো সমস্যার কথা, হালতের কথা, পীরকে জানান বা পরামর্শ চান, আর পীর সাহেব যদি সম্মত হন, তাহলে সাধারণত কোনো জবাব দেন না। তবে যদি বিপরিত কিছু বলার থাকে, তিনি জানান। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হজরতজ্বী চুপ থাকতেন, যা আমার পদক্ষেপের প্রতি উনার সমর্থন বুঝতাম। আমি চিঠি পাঠানোর এবং তার উত্তর আসার জন্য যে সময় লাগত, সেই সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতাম এবং প্রতিটি পদক্ষেপ হজরতজ্বীকে জানাতাম। কি করছি এবং পরবতীর্তে কি করতে যাচ্ছি সব কিছুই হজরতজ্বীকে জানায়েছি।” স্যার এবং হজরতজ্বীর সম্পর্ক এতটাই গভীর ছিল যে পারিবারিক ও তুচ্ছ বিষয়েও স্যার উনাকে জানাতেন। এমনকি স্যারের আহলিয়া নিজের অভিযোগ স্যারের হাতেই হজরতজ্বীর কাছে পাঠাতেন, কারণ উনাদেরও দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে এটি যথাযথভাবে পৌঁছাবে এবং এর কোনো খেয়ানত হবে না। আর স্যার এমন কোনো কাজ ঐসময় করেননি, যার বিষয়ে নিযামুদ্দিনে হজরতজ্বীকে জানাননি।
১৫১. একবার এক প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে স্যার বলেছিলেন, “অতি…
একবার এক প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে স্যার বলেছিলেন, “অতি আনুষ্ঠানিকতা ও উদ্দেশ্যমূলক খাতির-যত্ন, যেখানে কোনো সৎ উদ্দেশ্য নেই, সেটি দ্বীনের চেতনাবিরোধী এবং পরিত্যাজ্য। অনেকের মধ্যে মুরব্বীদের প্রতি অতি মেহমানদারীর প্রবণতা দেখা যায়, অথচ নিকট আত্মীয়দের খোঁজখবর নেয় না, গরীব প্রতিবেশীদের কখনও কিছু খাওয়ায় না, কিন্তু মুরব্বীরা এলে জান-প্রাণ উজাড় করে তাদের খাওয়ায়। এটি অত্যন্ত গর্হিত কাজ। এমন আচরণ এক ধরনের ঘুষের মতো, যেখানে কোনো দ্বীনি উদ্দেশ্য থাকে না, বরং অন্য কোনো স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে এটি করা হয়।” স্যার আরও বলেন, “অনেকে মুরব্বীর সাথে মুসাফাহ করার জন্য লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকে, মুরব্বীর খেদমতে চাকরি বা ব্যবসা ফেলে ছুটে আসে। অথচ তাদেরই ঘনিষ্ঠ আত্মীয় কেউ হয়তো দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ অবস্থায় বিছানায় পড়ে আছে, তাকে দেখার জন্য একবার যাওয়ার সময় পর্যন্ত তারা বের করতে পারে না। এই ধরনের আচরণের মাকসাদ আসলে কী? দ্বীনের নামে প্রদর্শনমূলক কাজ, প্রকৃত দীনদারিত্ব ও প্রকৃত দায়িত্ববোধের পরিচয় না।”
১৫২. রংপুরের জিম্মাদার ইউনূস ভাইয়ের সাথে স্যারের গভীর মহব্বতের সম্পর্ক…
রংপুরের জিম্মাদার ইউনূস ভাইয়ের সাথে স্যারের গভীর মহব্বতের সম্পর্ক ছিল। ইউনূস ভাইয়ের এন্তেকালের পর উনার ছেলে উনার ফাইলপত্রের মধ্যে স্যারের লেখা একটি দীর্ঘ চিঠি খুঁজে পান। এটি ৮০’র দশকের শেষের দিকে লেখা হয়েছিল। চিঠিতে কাকরাইলের বিভিন্ন হালতের বিস্তারিত বিবরণ ছিল এবং যেসব বিষয় সংশোধন করা প্রয়োজন, সেগুলো উল্লেখ করা হয়েছিল। স্যার দীর্ঘদিন ধরেই গোপনে বিভিন্ন জিম্মাদার ও দায়িত্বশীল সাথীদের কাছে কাকরাইলের বিভিন্ন হালত তুলে ধরতেন। উদ্দেশ্য ছিল, নিজেদের মধ্য থেকেই এসব সমস্যার সমাধানের প্রয়াস চালানো, তিনি চেয়েছিলেন, সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা যেন দায়িত্বশীল সাথীদের ভিতর থেকেই অনুভূত হয় এবং তারাই উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে আসেন।
১৫৩. রুয়েটের কিছু ছাত্র স্যারের সাথে সম্পর্ক রাখত এবং রাজশাহী…
রুয়েটের কিছু ছাত্র স্যারের সাথে সম্পর্ক রাখত এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ও বিভিন্ন মজমায় স্যারের বয়ান শুনতে আসত। কিন্তু সেখানকার কিছু শিক্ষক, যারা রাজশাহী মারকাজের মুরব্বী ছিলেন, এ বিষয়টি পছন্দ করতেন না। তারা স্যারের সাথে সম্পর্ক রাখার জন্য ওই ছাত্রদের প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ আচরণ করতেন। এমনকি পরীক্ষায় তাদের কম নম্বর দেওয়া, এবং আলাদাভাবে ডেকে ভয় দেখিয়ে নম্বর কমিয়ে দেওয়ার হুমকি দিতেন। এর ফলে কিছু মেধাবী ছাত্রও ভালো পরীক্ষা দেওয়ার পরেও খারাপ রেজাল্ট পেয়েছিল। একদিন রুয়েট ক্যাম্পাসে হাঁটার সময় এ প্রসঙ্গ উঠলে স্যার খুবই খারাপ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেন। স্যার বলেন, দাওয়াতের মতো একটি মহান কাজকে এরা কোথায় নামিয়ে নিয়েছে, কোথায় ব্যবহার করছে। চূড়ান্ত প্রকার নারাজীর সাথে বলেন, কোথাকার কাজ এরা কোথায় নামিয়ে নিয়েছে, পবিত্র এই কাজকে ব্যক্তিগত বিদ্বেষে ব্যবহার করছে, কতবড় লজ্জাজনক। দাওয়াতের পবিত্র কাজকে এভাবে অপব্যবহার করা স্যারের কথায় এতটাই গর্হিত মনে হচ্ছিল যে তিনি হয়তো কখনো কল্পনাও করেননি যে কেউ এ পর্যায়েও নামতে পারে। দাওয়াতের কাজের নাম নিয়ে এতোটাই নিচে নামা যায়। স্যারের চেহারায় ঐসময় প্রচণ্ড বিরক্তি এবং হতাশার ছাপ স্পষ্ট ছিল।
১৫৪. রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজলা গেট মসজিদের ইমাম সাহেব হুজুরের বাসা…
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজলা গেট মসজিদের ইমাম সাহেব হুজুরের বাসা অনেক দূরে থাকায় ফজরের নামাজে বেশীরভাগ সময় আসতে পারতেন না, মসজিদের মুয়াজ্জেম হাফেজ আব্দুল আজিজ ভাই হুজুরের অনুপস্থিতিতে নামাজ পড়াতেন (গেটের পূর্ব পার্শ্বে টিন শেড মসজিদ থাকাকালীন)। আব্দুল আজিজ ভাই জানান, ফজরের নামাজের পর তিনি সূরা হাসরের শেষ আয়াতগুলি মুসল্লিদের নিয়ে মসকের মতো করে পড়তেন—তিনি পড়তেন, তারপর মুসল্লিরা পড়তেন। একদিন নামাজের পর স্যার উঠে এসে উনার পাশে বসে খুব বিনয়ীভাবে আস্তে স্বরে বলেন, আব্দুল আজিজ, আমল হিসেবে এভাবে দৈনিক এটা না করলেই ভাল হয়, নিয়মিত এভাবে আমালে বিদআত হবার শংকা থাকে, শিখানোর জন্য কয়েকদিন করা যেতে পারে, তবে নিয়মিতভাবে এটি আমল হিসেবে চালু না করাই ভালো (স্যার তখন কাজল ভাইয়ের সাথে জুবেরী ভবনে থাকতেন ও ফজরের নামাজ কাজলা গেট মসজিদে পড়তেন)।
১৫৫. দ্বীনের চেয়ে রাজনীতিকে প্রাধান্য দেয়, দ্বীনের বিধান প্রতিষ্ঠার নামে…
দ্বীনের চেয়ে রাজনীতিকে প্রাধান্য দেয়, দ্বীনের বিধান প্রতিষ্ঠার নামে নিজেদের স্বার্থকে আগে রাখে, ইসলামের নামে এরকম কিছু রাজনৈতিক প্রচেষ্টা আছে, যাদের মূল লক্ষ্য দ্বীন কায়েমের নামে ক্ষমতা দখল। প্রাসঙ্গিক কথাবার্তা চা খেতে খেতে আলোচনা হচ্ছিল, সেইসব রাজনৈতিক গোষ্ঠীর মানসিকতা তুলে ধরে স্যার এক উদাহরণ দেন। স্যার বলেন, একজন গাজাখোর টয়লেটে গেল, গিয়ে দেখল, টয়লেটের মাঝের মল বের হবার (নির্গমনের) ছিদ্রটি ফাঁটা, আবার বদনার নিচেও ফুটো, পানি ধীরে ধীরে বেরিয়ে যাচ্ছে। সে ভাবল, যদি আগে টয়লেট সেরে নেয়, তাহলে ততক্ষণে বদনার ফুটো দিয়ে পানি শেষ হয়ে যাবে, পরে আর পানি পাওয়া যাবে না। তাই সে সিদ্ধান্ত নিল—আগে পানির কাজটা (সৌচকার্য) সেড়ে নেই, পরে টয়লেট সারব। পানিও নষ্ট হলো না, পানির ব্যবহার হয়ে গেলো আর পরে তো টয়লেট সেরেও নিবো! দ্বীনের শিক্ষা হলো, আগে ব্যক্তিগতভাবে দ্বীন মেনে চলতে হবে, নামাজ-রোজা, আখলাক ও তাকওয়ার চর্চা বাড়াতে হবে। দ্বীন কায়েমের নামে ক্ষমতা দখলকে মুখ্য লক্ষ্য বানালে, প্রকৃতপক্ষে তা দ্বীন প্রতিষ্ঠা নয়, বরং রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ পূরণে পরিণত হয় (আগে ক্ষমতা নিশ্চিত করি, পরে দ্বীন কায়েম হবে; আগে শাসনক্ষমতা হাতে নেই, পরে ইসলামী বিধান বাস্তবায়ন করব; আগে কোরআনের আইন চাই বলে জনসমর্থন আদায় করি, আক্বীদা আমল শুদ্ধ করার চিন্তা পরে করা যাবে; আগে রাজনৈতিক কর্তৃত্ব নিশ্চিত করি, দ্বীনদারীর ব্যাপারে পরে চিন্তা করা যাবে; ক্ষমতার মোহে পড়ে এরকম মানসিকতা নিয়ে দ্বীনকে পেছনে ঠেলে দিলে প্রকৃতপক্ষে তা দ্বীন কায়েমের নয়, বরং ব্যক্তিস্বার্থের প্রচেষ্টা হয়ে দাঁড়ায়; চরিত্র ও আমলের সংশোধন ছাড়া ইসলামের নামে ক্ষমতা দখলের প্রচেষ্টা, ইসলামী মূল চেতনার পরিপন্থী)।
১৫৬. ঢাকা আশুলিয়ায় জামাত চলছিল, ফজরের নামাজের পর স্যার বাসায়…
ঢাকা আশুলিয়ায় জামাত চলছিল, ফজরের নামাজের পর স্যার বাসায় যাবেন, স্যারকে এগিয়ে দেওয়ার জন্য স্যারের সাথে বের হয়ে পথিমধ্যে আমাদের এক ভাই, যার ছোট বোন মেধাবী এবং একটি ভালো প্রতিষ্ঠানে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেয়েছে, স্যারের কাছে তার বোনের জন্য দোয়া চান, এভাবে বলেন, “স্যার, আমার বোনের জন্য একটু হেদায়েতের দোয়া করবেন।” স্যার তার কথা শুনে সঙ্গে সঙ্গে কোনো উত্তর দিলেন না, কিছুক্ষণ চুপ থেকে কয়েক সেকেন্ড অপেক্ষা করলেন। এরপর স্যার বললেন, “পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের প্রতি যত্নবান হতে বলো, তিন কুলের আমল (তিন কুল পড়ে হাতে ফুঁ দিয়ে শরীরে মাসেহ করা) সকাল—বিকাল করতে বলো। যখন নামাজ থাকবে না, তখন বেশি বেশি দরূদ শরীফ ও ইস্তিগফার পড়তে বলো।”
১৫৭. এক সফরে স্যারকে এক ভাই বাসায় দাওয়াত করেন। দাওয়াতে…
এক সফরে স্যারকে এক ভাই বাসায় দাওয়াত করেন। দাওয়াতে স্যারের সঙ্গে প্লেটে কাজল ভাইও শরিক ছিলেন। সেই সময় স্যার অসুস্থ ছিলেন। কিছুদিন পূর্বেই তিনি হার্টের অসুস্থতা নিয়ে রিয়াদে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন এবং স্থানীয় আরব সাথীরা স্যারকে রিয়াদের হাসপাতালে ভর্তিও করিয়েছিলেন। স্যারের খাওয়া—দাওয়ার ব্যাপারে অনেক বিধিনিষেধ ছিল, যা বিস্তারিতভাবে কাজল ভাই জানতেন। রাজশাহীতে একসঙ্গে থাকার সুবাদে কাজল ভাই স্যারের সুবিধার দিকে বিশেষভাবে নজর রাখতেন। খাবার পরিবেশনের সময় মেজবান স্যারের দিকে ডিম দিলে, কাজল ভাই স্যারের ডিম না খাওয়ার বিধি জানার কারণে তা স্যারের দিক থেকে সরিয়ে নেন। স্যার তখন কাজল ভাইকে জিজ্ঞেস করলেন, “কেন উঠিয়ে নিলে?” কাজল ভাই বললেন, “স্যার, আপনার ডিম খাওয়া যাবে না, আপনার নিষেধ আছে।” স্যার তখন বললেন, “আল্লাহ আমাকে ডিম খাওয়াতে চান, আর তুমি আমার রিজিক নিয়ে টানাটানি কর!” যদিও স্যার তখন আর ডিম খাননি, তবে তিনি খুব পরিষ্কারভাবে একথা বলেছিলেন। আরেকবার, কোনো এক বাসায় স্যার দাওয়াত খেতে গিয়েছিলেন। মেজবান পোলাও রান্না করেছিলেন, আবার মেহমানদের সুবিধার কথা (অনেকে তেলের কারণে পোলাও খেতে চান না) চিন্তা করে ভাতও রেখেছিলেন। খাবার পরিবেশনের সময় পরিবেশনকারী স্যারকে জিজ্ঞেস করলেন, “স্যার, পোলাও দেবো নাকি ভাত দেবো?” স্যার তখন বললেন, “আল্লাহ পোলাও খাওয়াতে চান, আর তুমি ভাত দিতে চাও!” সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশনকারী সেই ভাই স্যারের প্লেটে পোলাও দেন এবং স্যার পোলাওই খান।
১৫৮. রাজশাহীতে তখন মার্কাজ মসজিদ ছিল ষষ্ঠীতলায় (সম্ভবত রাজশাহীর প্রথম…
রাজশাহীতে তখন মার্কাজ মসজিদ ছিল ষষ্ঠীতলায় (সম্ভবত রাজশাহীর প্রথম মার্কাজ)। বৃহস্পতিবার শবগুজারিতে স্যার মার্কাজে ছিলেন, এবং শুক্রবার সকালে স্যারের চাঁপাইনবাবগঞ্জে যাওয়ার ফয়সালা ছিল। চার জেলার জোড়সহ তিন দিনের প্রোগ্রাম ছিল। সকালে চাঁপাইনবাবগঞ্জে যাওয়ার জন্য মার্কাজ থেকে বের হওয়ার মুহূর্তে স্যার দেখেন, স্যারের আহলিয়া স্যারের শিশু বাচ্চা (বড় মেয়ে) এবং একটি সুটকেস নিয়ে মার্কাজে হাজির। (স্যার তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ব পাড়ায় ফ্যামিলি কোয়ার্টারে থাকতেন)। স্যারের আহলিয়া বলেন, “তুমি তাবলিগে (শবগুজারির জন্য বাসার বাইরে থাকার পর আবারও তিন দিনের জন্য) যেতে চাও, যাও, কিন্তু বাচ্চাকে নিয়ে যাও। এর দায়িত্ব তোমার।” স্যার যখন একথা শুনাচ্ছিলেন তখন বলেন, “এ কথা ওর ভালোভাবে জানা ছিল যে সন্তানের নফকার দায়িত্ব পিতার, আমিও জানি।” কথা না বাড়িয়ে (আল্লাহর রাস্তায় সময় ব্যয় করার ব্যাপারে পরিবারের সাথে কোনো আপস না করে) স্যার তৎক্ষণাৎ বাচ্চাকে কোলে নিয়ে নেন, এবং সঙ্গে আনা সুটকেসটিও নিয়ে নেন। বাচ্চাকে নিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জে উপস্থিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এলাকায় হৈচৈ পড়ে যায়—”শিশু বাচ্চাকে নিয়ে তাবলিগে এসেছেন!” পরিস্থিতি এমন হয় যে, কে বাচ্চাকে নেবে, তা নিয়ে প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়! কেউ হাফ বেলা, কারো বাসায় এক বেলা, এভাবে তিন দিন ধরে বিভিন্ন বাসায় বাচ্চা থাকলো, আর স্যার তিন দিনের আমল সম্পন্ন করলেন। স্যার বলেন, “আমি যখন ফিরে আসি, তখন আমারও তিন দিন হলো, বাচ্চারও তিন দিন হলো!
১৫৯. একবার এক প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে স্যার বলেন, আল্লাহওয়ালারা…
একবার এক প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে স্যার বলেন, আল্লাহওয়ালারা মাঝে মাঝে যে দুনিয়াবি কাজ করে থাকেন, তা আসলে প্রয়োজনের কারণে করছেন তা না। অনেক সময় পারিপার্শ্বিক লোকজনের কথাকে এড়ানোর জন্য কিছু কাজ করেন (কিছু কাজের শেকল ধরে থাকেন)। আবার, অনেক সময় মানুষ ভুল ধারণা করে বসে যে সে কেবল হাদিয়ার ওপর চলে বা তার হাদিয়া ছাড়া চলবে না। তাই ঠেকায় পড়ে (এরকম কথাকে ঢাকার জন্য) কিছু দুনিয়াবি ব্যস্ততা ধরে রাখেন। নিজের চাহিদা বা প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও, সমাজের কারণে কেউ কেউ কথনও কখনও কাজ (চাকরি ব্যবসা ইত্যাদি) ধরে রাখেন।
১৬০. মদীনা হারাম শরিফে স্যার রমজানে ইতেকাফে ছিলেন। কিছু ফ্রেঞ্চ…
মদীনা হারাম শরিফে স্যার রমজানে ইতেকাফে ছিলেন। কিছু ফ্রেঞ্চ আরব সাথী স্যারকে দেখে তাদের জামাতে (মসজিদের বাইরে হোটেলে) কিছু মুযাকারা করার জন্য দাওয়াত দেন। রাতে তারাবির পর খাবার-দাবারের পর মাঝরাতে ১টায় সবাই হোটেলে ফিরবে জানিয়ে সেই সময়ে স্যারকে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। দিনে রোজা, জোহরের পর বাইরে আরেক আরব জামাতে যাওয়া হয়েছিল, তেমন বিশ্রাম নেওয়া হয়নি, রাতে লম্বা তারাবি, তারপর আবার বাইরে হচ্ছিল বৃষ্টি। শরীরও ক্লান্ত ছিল, বিশ্রামের প্রয়োজন ছিল। বাইরে বৃষ্টির কারণে হাঁটতে হাঁটতে ওই ফ্রেঞ্চ আরবদের জামাতে এত রাতে যেতে কোনোভাবেই মন চাইছিল না। স্যারের সাথে শাহ আলম ভাই (সিলেট), ডা. ওবায়দুল্লাহ (নাটোর) সহ আরও কয়েকজন ভাই ছিলেন। তারাবির পর যখন স্যার ওই ফ্রেঞ্চ জামাতে যাওয়ার জন্য দাঁড়ালেন, তখন আমাদের এক সাথী ক্লান্ত শরীরে তারাবির নামাজরত অবস্থায় ঘুমের ঘোরে দেখা তার স্বপ্নের কথা বললেন। তিনি দেখেন, আমাদের কিছু সাথীসহ আরও কিছু লোক সম্পূর্ণ সবুজ রঙের পাগড়ি, জুব্বা, পায়জামা পরিহিত অবস্থায় মসজিদের ভেতর দাঁড়িয়ে আছেন, একজন আরেকজনের সাথে কথা বলছেন। এই স্বপ্নের কথা স্যারকে বলার পর স্যার মুচকি হাসলেন এবং বললেন, শবে কদর হবার লক্ষণ। বলেই হাঁটা শুরু করলেন। ভাবলাম, হয়তো স্যার মসজিদের কোনো এক কোণে নামাজে দাঁড়াবেন। কিন্তু শবে কদরের রাত বলে, নামাজ, জিকির, তেলাওয়াতে মশগুল না হয়ে, বরং স্যার মসজিদ থেকে বের হয়ে ওই জামাতের উদ্দেশ্যে বৃষ্টির মধ্যেই হাঁটা শুরু করলেন। ক্লান্তির কারণে আবার বৃষ্টিতে ভিজে যেতে মন চাইছিল না, আবার শবে কদরের কথা শুনে মনে হচ্ছিল কিছু নামাজ ও তেলাওয়াত করি। কিন্তু স্যারের বের হয়ে হাঁটা শুরু করার কারণে আমাদের বেশিরভাগ সাথিই স্যারের সাথে রওনা দিলেন। ওই জামাতে স্যার দীর্ঘ সময় মুযাকারা করেন। ২০-২২ জন ফ্রেঞ্চ সাথী ছিলেন। বয়ানের পর স্যার তাশকিল করেন। সাথীরা আল্লাহর রাস্তায় সময় দেওয়ার জন্য নিয়ত করেন। লম্বা সময় সেখানে লেগে যাবার কারণে মসজিদে ফিরে আসতে আসতে কিয়ামুল লাইলের জামাত প্রায় শেষের দিকে চলে গিয়েছিল। স্যারের সাথে মসজিদে ফেরার সময় মনে হচ্ছিল—আমরা নামাজ, তেলাওয়াত, জিকির ইত্যাদিকে আমল মনে করি। কিন্তু স্যার শবে কদরের লক্ষণ নিশ্চিত হয়েই দেখালেন—দাওয়াতের কাজ, অন্যের কল্যাণের জন্য চিন্তা করা, মানুষকে দ্বীনের কথা বলা—এগুলোও বড় আমল, অনেক বড় ইবাদত, এগুলো আমলের বাইরে নয়।
← আগের পর্ব (১২১–১৪০) | সূচিপত্র | পরের পর্ব (১৬১–১৮০) →
সংগ্রহ ও সংকলন: মুশফিক আহমদ (রহঃ)-এর মালফুযাত সংকলন।
