মালফুজাতে হযরতজী ইউসুফ (রহঃ) – পর্ব ৭: বাণী ১২১–১৪০
হযরতজী মাওলানা মুহাম্মদ ইউসুফ কান্ধলভী (রহঃ)-এর বাণী সংকলন মালফুজাতে হযরতজী মাওলানা ইউসুফ (রহঃ) বইয়ের ১২১ থেকে ১৪০ নম্বর বাণী এই পর্বে দেওয়া হলো। সম্পূর্ণ সূচি ও বইয়ের ভূমিকা দেখুন।
সংকলন: মুফতি রওশন শাহ কাসেমী। অনুবাদ: ইসহাক ওবায়দী। প্রকাশক: বাড কম্প্রিন্ট এন্ড পাবলিকেশন্স, ঢাকা।
এই পর্বে যা আছে
- ১২১. দাওয়াত কবুল করার নিয়ম-কানুন
- ১২২. দুনিয়ার সমস্ত শাখা-প্রশাখা সুন্নতের আকৃতিতে কখন জিন্দা হবে?
- ১২৩. সাহায্য কখন নাজিল হয়?
- ১২৪. আল্লাহর পক্ষ থেকে যা (বালা-মুসীবত) আসে, তাতে বান্দার জন্য মঙ্গল লুকায়িত থাকে
- ১২৫. দ্বীনের আমলসমূহ উম্মতের দিকে দুটি লাইনে মোতাওয়াজ্জুহ হয়
- ১২৬. আল্লাহর অস্তিত্বের সামনে প্রত্যেকটি জিনিস তুচ্ছ এবং হাকীকতবিহীন
- ১২৭. আমরা অন্ধ, হজরত মোহাম্মদ (স) দৃষ্টিমাণ
- ১২৮. হজরতজী (র)-এর আম্মাজানের শিক্ষাদান বা তরবিয়তের ঢং
- ১২৯. এই রাস্তার ওপর চলার জন্য অভ্যন্তরীণ সম্পদের প্রয়োজন
- ১৩০. দাওয়াত ওয়ালা আমলের যবরদস্ত ইতিহাস
- ১৩১. আমরা আমাদের সাথে জুড়তে চাইনা
- ১৩২. ব্যক্তিগত অবস্থা শুদ্ধ হওয়া সমষ্টিগত অবস্থা শুদ্ধ হবার ওপর মুলতবি
- ১৩৩. নিজের ব্যক্তিগত সমস্যায় লিপ্ত হওয়াই সমষ্টিগত নষ্টের কারণ
- ১৩৪. অল্প সামান্য কষ্ট সহ্য করার দ্বারা সবসময়ের কষ্ট থেকে মুক্তি
- ১৩৫. সমষ্টিগত ও ব্যক্তিগত অবস্থা কখন ঠিক হবে?
- ১৩৬. ঐ সমস্ত জিনিস থেকে আমাদের উদ্দেশ্য সমাধা হবেনা
- ১৩৭. জিহ্বা যা অন্তরে থাকে তাও বলে, আবার যা শুধু জিহ্বার মধ্যে থাকে তাও বলে
- ১৩৮. মুল্ক্ ও মালের টুকরার মধ্যে কোন কামিয়াবী নেই
- ১৩৯. আসল কামিয়াবীর যে গ্যারান্টি তা তো হুজুর (স)-এর তরীকার মধ্যে
- ১৪০. ওলি আল্লাহর উঁচু দরজা
১২১. দাওয়াত কবুল করার নিয়ম-কানুন
হজরতজী বলেন— ভেতর-বাইর যতো প্রকারেরই মেহনত করা হোক না কেনো, দাওয়াতের, তালীমের, এবাদতের, আখলাকের, তার মধ্যে নিজের জান-মাল লাগিয়ে দেয়া উদ্দেশ্য হতে হবে। শুধু এইজন্যে যে, আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জত রাজী হয়ে যান, আর উম্মতের মধ্যে আল্লাহকে রাজী করার মেহনতের এবং জান-মাল খরচ করার প্রচলন হয়ে যায়। কেননা, এখলাস ব্যতীত কোন আমলের ফলাফল কার্যকরি হয়না। সম্মানের আশা, নাম প্রচার, রিয়া (অর্থাৎ লোক দেখানো) লোভ, ইত্যাদি খারাপ ও ধ্বংসাত্মক দোষগুলো থেকে বেঁচে থাকার পুরাপুরি চেষ্টা করতে হবে। এমনকি কারো খাওয়ার দাওয়াতও যদি কবুল করা হয়, তো খাওয়ার লোভ যেনো কবুল করার কারণ না হয়; বরং কাজের জন্য উপকারী হওয়া যেনো দাওয়াত কবুল করার উদ্দেশ্য হয়।
(মকতুবাতে আকাবেরে তাবলীগ-পৃঃ ১৫১)
১২২. দুনিয়ার সমস্ত শাখা-প্রশাখা সুন্নতের আকৃতিতে কখন জিন্দা হবে?
হজরতজী বলেন— মুসলমানের জান-মালের আলোচ্য বিষয় এবং উদ্দেশ্য খাহেশাতের ওপর খরচ হওয়া নয়। বরং হজরত মোহাম্মদ (স)-এর দ্বীন জীবন্ত হওয়া তরুতাজা হওয়ার ওপর খরচ হওয়া উদ্দেশ্য। যতোটুকু আমাদের জান ও মালের খরচ দ্বীনের জীবন্ত অবস্থার দরদ এবং ফিকির এবং চেষ্টা-মেহনতের ওপর করচ হতে থাকবে, দ্বীনের সমস্ত শাখা-প্রশাখা সুন্নতের আকৃতিতে জীবন্ত হতে থাকবে।
(মকতুবাতে আকাবেরে তাবলীগ-পৃঃ ১৫১)
১২৩. সাহায্য কখন নাজিল হয়?
হজরতজী বলেন— সাহায্য ঐ সময় অবতীর্ণ হয়, যখন কোন ব্যক্তির ওপর দৃষ্টি নিক্ষেপ না করা হয়। আর আল্লাহ পাকের বাতানো আমলের মধ্যে নিজের ক্ষমতা অনুযায়ী চেষ্টা করে দোয়া করতে থাকবে।
(মকতুবাতে আকাবেরে তাবলীগ-পৃঃ ১০৭)
১২৪. আল্লাহর পক্ষ থেকে যা (বালা-মুসীবত) আসে, তাতে বান্দার জন্য মঙ্গল লুকায়িত থাকে
হজরতজী বলেন— আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে যে (সমস্ত বালা-মুসিবত) সামনে আসে, বান্দার জন্য অশেষ মঙ্গল লুকায়িত থাকে। এই শর্তে যে, আপন রবের সাথে নিজের ধারণাকে ভালো রেখে তাঁর সন্তুষ্টি হাসিল করার জন্য তাঁর দ্বীনের তরুতাজা হওয়ার ওপর নিজের জান-মাল পুরোপুরিভাবে খরচ করতে করতে নিজের অবস্থার ব্যাপার তাঁর কাছ থেকে সাহায্য চাইতে থাকবে, আর নিজের দুর্বলতা ও অপারগতার স্বীকারোক্তি অন্তর দ্বারা করতে থাকবে।
(মকতুবাতে আকাবেরে তাবলীগ-পৃঃ ২১২)
১২৫. দ্বীনের আমলসমূহ উম্মতের দিকে দুটি লাইনে মোতাওয়াজ্জুহ হয়
হজরতজী বলেন— আল্লাহর ফরজসমূহের মধ্যে যেই তরীকাই উম্মতের দিকে মোতাওয়াজ্জুহ হয়, দুই লাইনের মেহনত উম্মতের ওপর আবর্তিত হয়। একঃ এই কর্তব্যকে নিজের বিশেষত্বের সাথে নিজের শরীর দ্বারা আদায় করা। দ্বিতীয় ঃ এই কর্তব্য সহী অবস্থার সাথে কায়েম হওয়ার জন্য মেহনতের ময়দান কায়েম করা। কর্তব্যকে সহী অবস্থার সাথে আদায় করা ফলাফলের দরজা রাখে, আর ঐ মেহনত ও মোজাহাদা, যার দ্বারা কর্তব্যের সহী অবস্থা কায়েম হয়, মূল এবং ভিত্তির দরজা রাখে। যদি মূল অস্তিত্বে না আসে, ফলাফলের বন্দবস্ত হবেনা, এবং যে পরিমাণ মূলের অস্তিত্ব পাওয়া যাবে, সে পরিমাণ ফলাফল অস্তিত্বে আসবে।
(মকতুবাতে আকাবের তাবলীগ-পৃঃ ১২৫)
১২৬. আল্লাহর অস্তিত্বের সামনে প্রত্যেকটি জিনিস তুচ্ছ এবং হাকীকতবিহীন
হজরতজী বলেন— যা কিছু বনেছে তা সব মখলুক বা সৃষ্টি। আল্লাহ সবার চেয়ে বড়। আল্লাহর অস্তিত্বের সামনে প্রত্যেকটি জিনিস তুচ্ছ ও হাকিকত বিহীন। আল্লাহ সবার চেয়ে বড়। আমেরিকা-রাশিয়া এবং পৃথিবীর সমস্ত শক্তি ও রাজত্বের আল্লাহর সামনে কোন দাম নেই। আল্লাহর অস্তিত্ব সবচেয়ে বড়।
(তাযকেরায়ে হজরতজী-পৃঃ ১৩১)
১২৭. আমরা অন্ধ, হজরত মোহাম্মদ (স) দৃষ্টিমাণ
হজরতজী বলেন— “আশহাদু আন্না মোহাম্মাদার রাসুলুল্লাহ”। আল্লাহ তায়ালা যে সবচেয়ে বড় এবং যাঁর হাতে নির্মাণ এবং ধ্বংস এবং কামিয়াবী ও নাকামী, তাঁর কুদরত থেকে উপকৃত হবার পদ্ধতি আমরা নিজেরা জানিনা, আমরা এ রাস্তায় অন্ধ, এর পথপ্রদর্শক হলেন হজরত মোহাম্মদ (স), তিনি আল্লাহর রাসুল, তাঁর তরীকার ওপর চলেই আল্লাহর ফজল ও করম অর্জন করা যেতে পারে।
(তাযকেরায়ে হজরতজী-পৃঃ ১৩১)
১২৮. হজরতজী (র)-এর আম্মাজানের শিক্ষাদান বা তরবিয়তের ঢং
হজরতজী বলেন— আমার আম্মাজান আমার তরবিয়ত এভাবে করেছেন যে, কোন মহিলা মেহমান যদি মিষ্টি অথবা কলা ইত্যাদি হাদিয়া হিসাবে আনতো, আর আমি তার দিকে তাকাতাম, তখন মেহমান চলে যাওয়ার পর আম্মাজান আমাকে পিটাতেন এবং বলতেন যে, তুমি মিষ্টির দিকে মনোযোগ দিয়ে কেনো দেখলে?
(তাযকেরায়ে হজরতজী-পৃঃ ৭৭)
১২৯. এই রাস্তার ওপর চলার জন্য অভ্যন্তরীণ সম্পদের প্রয়োজন
হজরতজী বলেন— আল্লাহ তায়ালা নির্মান এবং চমকানোর সিদ্ধান্ত তখনই করবেন, যখন আমি হজরত মোহাম্মদ (স)-এর তরীকার ওপর এসে যাবো। তাই এই রাস্তায় চলার জন্য বাইরের নয়; বরং অভ্যন্তরীণ সম্পদের প্রয়োজন। আল্লাহর ওপর একীন হওয়া চাই। আল্লাহর ধ্যান হওয়া চাই। আল্লাহর ভয় থাকা চাই। হজরত মোহাম্মদ (স)-এর তরীকার ওপর আল্লাহর ভান্ডার থেকে পাওয়ার এবং নেয়ামতসমূহের দরজা খোলার একীন হতে হবে। এই সমস্ত অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনের জন্য কিছু করতে হবে। বস্তু থেকে কামিয়াবীর একীন দূর করার জন্য এবং আল্লাহ তায়ালা থেকে কামিয়াবীর একীন অর্জিত হওয়ার জন্য কিছু সময়ের জন্য বস্তুর মাঝখান থেকে বের হতে হবে।
(তাযকেরায়ে হজরতজী-পৃঃ ১৩৫)
১৩০. দাওয়াত ওয়ালা আমলের যবরদস্ত ইতিহাস
হজরতজী বলেন— আমেরিকা ওয়ালারা সবকিছু বানিয়ে ফেলেছে, কিন্তু সাদা আর কালোর মধ্যে জোড়-মিল করার ব্যাপারে বিলকুল অকৃতকার্য থেকেছে। এভাবে তারা মদ বন্ধ করার জন্য কোটি কোটি টাকা ব্যয় করেছে, এবং সমস্ত চেষ্টা তদবীর করেছে, কিন্তু কমের পরিবর্তে তার মধ্যে আরো আধিক্য হয়েছে। আলহামদু লিল্লাহ এই তাবলীগের আমলের কারণে লক্ষ লক্ষ এমন মানুষের অপরাধ ছুটে গেছে, যাদের অপরাধ ছাড়াটা অসম্ভব মনে করা হচ্ছিলো।
(তাযকেরায়ে হজরতজী পৃঃ ১৩৬)
১৩১. আমরা আমাদের সাথে জুড়তে চাইনা
হজরতজী বলেন— আলহামদু লিল্লাহ এই কাজের মধ্যে সব মহলই লাগছে। সেই মহল এর ওপর মেহনত করবে, এবং এই কথাগুলোকে নিজের মধ্যে সৃষ্টি করে নেবে, তার সাথে সব লোক জুড়ে যাবে। আমরা যদি আমাদের সাথেই জুড়তে চাইতাম, তাহলে জোড়ার এই ফর্মুলা আপনাদেরকে শিক্ষা দিতাম না। আমরা চাই যে, আপনারা সবাই এই তরীকার ওপর কিছু মেহনত করে নিন, তারপর দেখেন যে, আল্লাহ তায়ালা আপনার মাধ্যমেই কতো সহজে সব মহলকে জুড়ে দেন।
(তাযকেরায়ে হজরতজী-পৃঃ১৩৬)
১৩২. ব্যক্তিগত অবস্থা শুদ্ধ হওয়া সমষ্টিগত অবস্থা শুদ্ধ হবার ওপর মুলতবি
হজরতজী বলেন— আমাদের বদ আমলের কারণে আমাদের মন-মানসিকতা ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে গেছে, দ্বীনের ব্যাপারেও এবং দুনিয়ার ব্যাপারেও, মন-মানসিকতা এমন হয়েছে যে, শুধু ব্যক্তিকেন্দ্রিক অবস্থার মধ্যে লেগে থাকতে মন চায়, মনে করা হয় যে, এতে আপন সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে। অথচ ব্যক্তিগত অবস্থার ওপর শক্তি ব্যয় করার দ্বারা বলা-মুসিবত কম হয়না; বরং বেশীই হয়। সমষ্টিগত অবস্থাকে যতোক্ষণ পর্যন্ত ঠিক না করা হবে, ততোক্ষণ পর্যন্ত ব্যক্তিগত অবস্থা শুদ্ধ হওয়া কঠিন ব্যাপার। যদি সমষ্টিগত জীবন নষ্ট হওয়ার কারণে কোন সমষ্টিগত মুসিবত এসে পড়ে, তখন প্রত্যেক ব্যক্তির ব্যক্তিগত অবস্থাও নষ্ট হতে থাকবে।
(তাযকেরায়ে হজরতজী-পৃঃ ১৪৬)
১৩৩. নিজের ব্যক্তিগত সমস্যায় লিপ্ত হওয়াই সমষ্টিগত নষ্টের কারণ
হজরতজী বলেন— নিজের ব্যক্তিগত সমস্যায় লিপ্ত হওয়াই তো সমষ্টিগত নষ্টের কারণ। যতোটুকু নিজের ব্যক্তিগত ব্যাপারে জান খরচ করবে, ঐ পরিমাণ সমষ্টিগত অবস্থা নষ্ট হতে থাকবে। এবং এতোটুকু নষ্ট হবে যে, হাদীসে আসছে যে, মানুষ কবরের পাশ দিয়ে যেতে যেতে আফসোস করে বলবে যে, হায়! আমরাও যদি কবরবাসী হতাম। মানুষ মানুষকে হত্যা করে খেয়ে যাবে (হজম করে ফেলবে) এমন অবস্থা তখনই হবে, যখন প্রত্যেকের জয্বা জন্তুদের মতো শুধু নিজের ব্যক্তিগত ব্যাপারের জন্য হবে।
(তাযকেরায়ে হজরতজী-পৃঃ ১৪৭)
১৩৪. অল্প সামান্য কষ্ট সহ্য করার দ্বারা সবসময়ের কষ্ট থেকে মুক্তি
হজরতজী বলেন— প্রথম হুকুম এই যে, আল্লাহ পাকের ওপর একীন সৃষ্টি হয়ে যাক, আর তা সৃষ্টি করার জন্য মানুষের মধ্যে চেষ্টা করা চাই। এ ব্যাপারে যদি এখানে সামান্য ভয়-ভীতিকে সহ্য করে নেয়া যায়, তবে দায়েমী ভয়-ভীতি থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে। সামান্য ভুক-পিপাসা সহ্য করে নিতে পারলে দায়েমী ভুক থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে। সামান্য সময় বিবি-বাচ্চাদের থেকে পৃথক কাটাতে পারলে সবসময় একসাথে থাকা নসীব হয়ে যাবে।
(তাযকেরায়ে হজরতজী-পৃঃ ১৪৯)
১৩৫. সমষ্টিগত ও ব্যক্তিগত অবস্থা কখন ঠিক হবে?
হজরতজী বলেন— আল্লাহ পাকের হুকুমের ওপর মেহনত করার দ্বারা যে পরিমাণ আল্লাহর সাহায্যের একীন হবে, যে পরিমাণ গায়ব থেকে দরজা খুলতে থাকবে, যদি আল্লাহর দ্বীনের জন্য মেহনতকারীদের সংখ্যা বাড়ে এবং তার ওপর একীন হয়, তাহলে যেহেতু সমস্ত সৃষ্টিজগতের সম্পর্ক আল্লাহপাকের সত্তার সাথে সম্পর্কিত, আমাদের পছন্দ-অপছন্দ সব যখন আল্লাহর পক্ষ থেকেই হয়, তাহলে দিনের বেলায় মখলুকের মধ্যে আল্লাহপাকের একীন সৃষ্টি করার জন্য পুরোপুরি মেহনত করলে এবং রাতের বেলায় তাঁর দরবারে ভালো ভাবে কান্নাকাটি করলে, ইনশায়াল্লাহ সমষ্টিগত ও ব্যক্তিগত সব ধরনের অবস্থা ঠিক এবং মোয়াফেক হয়ে যাবে।
(তাযকেরায়ে হজরতজী-পৃঃ ১৪৯)
১৩৬. ঐ সমস্ত জিনিস থেকে আমাদের উদ্দেশ্য সমাধা হবেনা
হজরতজী বলেন— মেহনত এবং চেষ্টার আসল ময়দান কি? মানুষ একথা মনে করে যে, ক্ষেত-খামার, ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি-বাকরি ইত্যাদি মেহনতের মাঠ। এমনিভাবে সমষ্টিগত উদ্দেশ্যাবলী হাসিল করার জন্য মানুষ যে সমস্ত জিনিসের ওপর সীমাবদ্ধ থাকে তা নির্বাচন এবং প্রশাসনের ওপর প্রভাব বিস্তার করা এবং ক্ষমতাকে কজা করা দ্বিতীয় প্রচেষ্টা। কিন্তু এ সমস্ত জিনিস বৈদ্যুতিক বাল্ব এবং পাখার মতো। বাল্ব এবং পাখার ওপর মেহনত করে আমরা না এদেরকে আলোকিত করতে পারবো, আর না তাদেরকে চালাতে পারবো; বরং তার জন্য বিদ্যুতের সুইচ পর্যন্ত হাত পৌঁছাতে হবে। এমনিভাবে যদি আল্লাহর সাথে সম্পর্ক পয়দা হয়ে যায়, তাহলে সব কিছুই হতে পারে। আর যদি সম্পর্ক সৃষ্টি না হয়, তাহলে সমস্ত চেষ্টা-তদবীর করা সত্ত্বেও কোন ফলাফল অর্জন হতে পারেনা।
(তাবলীগী তাহ্রীক-পৃঃ ৪১)
১৩৭. জিহ্বা যা অন্তরে থাকে তাও বলে, আবার যা শুধু জিহ্বার মধ্যে থাকে তাও বলে
হজরতজী বলেন— এই জিহ্বা এমন মোনাফেক যে, যা অন্তরে আছে তাও বলে দেয়, আবার তার উল্টোটাও বলে দেয়। কোন ব্যক্তি এসেছে, আপনার খুব রাগ এসেছে যে, অসময়ে এসে গেছে। খানা খেয়ে শোবার কথা বিবি সাহেবকে বলে রেখেছেন। এমন সময়-অসময়ে এসে বসে পড়লো, তাই তবীয়তের মধ্যে বিস্বাদ লাগছে, অথচ মুখে বলছেন, “আপনার আসার কারণে অত্যন্ত খুশী হলাম”, যা অন্তরে আছে মুখ তা বললোনা, তার উল্টো বলেছে, বোঝা গেলো, জিহ্বা যা অন্তরে আছে তাও বলে, আবার যা অন্তরে নেই তাও বলে। কাল কেয়ামতের দিন জিহ্বা থেকে ঐ কথাই বের হবে যা অন্তরে আছে।
(হজরতজীর স্মরণীয় ভাষণ-পৃঃ ৮)
১৩৮. মুল্ক্ ও মালের টুকরার মধ্যে কোন কামিয়াবী নেই
হজরতজী বলেন— মরার আগে আগে এ কথাকে অন্তরে বসিয়ে নাও যে, হুজুর (স)-এর তরীকা মোতাবেক ব্যবহার হওয়ার মধ্যে কামিয়াবী, আর মুল্ক্ ও মালের টুকরার মধ্যে কোন রকম কামিয়াবী নেই। এই কথাকে নিজের ওপর খোলা চাই। কেননা, তোমার মৃত্যুর পরই তো কবরে যখন যাবে তখন প্রথম প্রশ্ন এই হবে যে, বল! তোমার পালনেওয়ালা কে? যদি এ কথার ওপর মেহনত করে থাক যে, দোকান থেকে লালিত-পালিত হই, নিজের মেহনত থেকে পালন হয়, টাকা-পয়সা দ্বারা পালিত হই, তখন কবরের মধ্যে একথা বলতে পারবেনা যে, আমার রব খোদা। যা অন্তরে নেই তা মুখে কিভাবে আসবে। চাই তুমি রোজানা এক কোটি বার আল্লাহু আকবর আল্লাহু আকবার পড়না কেনো।
(হজরত জীর স্মরণীয় ভাষণ-পৃঃ ১৪)
১৩৯. আসল কামিয়াবীর যে গ্যারান্টি তা তো হুজুর (স)-এর তরীকার মধ্যে
হজরতজী বলেন— কলেমা-নামাজের তরতীব হুজুরে আকরাম (স) নিজের যমানায় মসজিদের মধ্যে যেভাবে চালিয়ে ছিলেন, যদি আমরা নিজ নিজ মসজিদের মধ্যে বসে ঐ সমস্ত জিনিসগুলোকে চালাতে থাকি, আর নামাজের বাইরে যে পরিমাণ আমাদের শাখা-প্রশাখা আছে, তাও যদি হুজুর (স)-এর তরীকা মোতাবেক এসে যায়, তাহলে রাজত্ব চালিয়েও জান্নাতে যাবে। আর যদি হুজুর (স)-এর তরীকা মোতাবেক না হয়, তাহলে শাসিত হয়েও জাহান্নামে যেতে হবে। যদি আপনি হুজুর (স)-এর তরীকা মোতাবেক চলতে থাকেন, তাহলে মালদার হওয়া সত্ত্বেও জান্নাতে যাবেন। আর যদি হুজুর (স)-এর তরীকা মোতাবেক চলতে না পারেন, তাহলে দারিদ্রাবস্থায়ও জাহান্নামে যাবেন। আসল কামিয়াবীর যে গ্যারান্টি, তা হুজুর (স)-এর তরীকার মধ্যে।
(হজরতজীর স্মরণীয় ভাষণ-পৃঃ ১৭)
১৪০. ওলি আল্লাহর উঁচু দরজা
হজরতজী বলেন— ওলিআল্লাহদের অবস্থা দুই প্রকার। একটা এই যে, সবকিছু ছেড়ে-ছুড়ে দিয়ে পাহাড়ে চলে যাওয়া আর পবিত্রতা অবলম্বন করা, এবং আল্লাহ জাল্লা শানুহুর দিকে চলা। এটা ওলিআল্লাহ হওয়ার নগণ্য দরজা, আর দ্বিতীয় হলো ওলিআল্লাহ হওয়ার উচ্চতম দরজা, আর তা হচ্ছে, জীবনের প্রত্যেকটি শাখায় আল্লাহওয়ালাদের গুণাবলীর সাথে চলা। এর জন্য নিজ নিজ কাজ থেকে বের হয়ে নিজ নিজ একীন, এবাদত এবং আখলাক বানানো জরুরী। ঐ সমস্ত জিনিসকে বানিয়ে পুনরায় নিজ নিজ কাজে লাগা যেতে পারে।
(সাওয়ানেহে হজরতজী-পৃঃ ৬২৩)
← আগের পর্ব (বাণী ১০১–১২০) | সূচিপত্র | পরের পর্ব (বাণী ১৪১–১৬০) →
মূল বই: মালফুজাতে হযরতজী মাওলানা ইউসুফ (রহঃ)। সংকলন: মুফতি রওশন শাহ কাসেমী। অনুবাদ: ইসহাক ওবায়দী। প্রকাশক: বাড কম্প্রিন্ট এন্ড পাবলিকেশন্স, ঢাকা। বইটির স্ক্যান কপি archive.org-এ পাওয়া যাবে।
