মালফুযাত – প্রফেসর মুশফিক আহমদ (রহঃ) – পর্ব ১৫: ২৮১–৩০০
প্রফেসর মুশফিক আহমদ (রহঃ)-এর বয়ান, পরামর্শ, আমল ও দাওয়াতি জীবনের মালফুযাত, ২৮১ থেকে ৩০০ নম্বর। সম্পূর্ণ সূচিপত্র দেখুন।
সংগ্রহ ও সংকলন: মুশফিক আহমদ (রহঃ)-এর মালফুযাত সংকলন।
এই পর্বে যা আছে
- ২৮১. এক বয়ানে স্যার বলেন, এই দুনিয়াতে আত্মহত্যা করে শুধু…
- ২৮২. স্যার একবার বলেন, মানুষ সাধারণত অন্যের ওপর জুলুমকে খুব…
- ২৮৩. একদিন রাজশাহী মারকাজে দেখা গেল, এক ভাইয়ের চুল বেশ…
- ২৮৪. স্যার এক মোজাকেরায় বলেন, আল্লাহওয়ালারা দোয়া করে কী পাচ্ছে…
- ২৮৫. একদিন স্যারকে এক ভাইয়ের ঘটনা বলা হলো, তার স্ত্রী…
- ২৮৬. এক বৈঠকে স্যার বলেন, নিজের ভেতরের অঙ্গীকার ঠিক থাকলে…
- ২৮৭. মৌলভীবাজার চিল্লার জামাতে থাকার সময় রংপুরের এক ভাই স্যারকে…
- ২৮৮. ছোট ছোট বিভিন্ন ঘটনার ভেতর দিয়ে স্যার শিখিয়েছেন- জীবনে…
- ২৮৯. গ্রীষ্মের ছুটিতে সাধারণত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের থেকে চিল্লার জামাত বেশি…
- ২৯০. মুসলমান”- আল্লাহ পাকের বান্দা ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া…
- ২৯১. একবার স্যার বলেন, আমাদের তাবলীগের মেহনতে একটা কথা মাঝে…
- ২৯২. একবার ফিজিক্স ল্যাবে এক ছাত্র স্যারকে জিজ্ঞেস করছিল প্র্যাকটিক্যাল…
- ২৯৩. স্যার বলতেন, পরামর্শ করে চলা অর্থ এই নয় যে…
- ২৯৪. এক জামাতে ছয় নম্বরের মুজাকারা চলছিল। ‘একরামুল মুসলিমীন’ পয়েন্টের…
- ২৯৫. একবার এক আলোচনায় মাহফুজ ভাই স্যারকে জিজ্ঞেস করলেন, “স্যার…
- ২৯৬. একবার স্যার বলেন, দ্বীনের ময়দানে কামাল বা পূর্ণতা হলো…
- ২৯৭. স্যার একবার বলেন, সব অযোগ্যতা আসলে অযোগ্যতা নয়; কখনো…
- ২৯৮. পড়াশোনা শেষ করার পর ভাই আব্দুল কাইয়ুম স্যারকে জিজ্ঞাসা…
- ২৯৯. ভাই সাজ্জাদ বলেন, স্যারের সাথে আমার প্রথম দেখা রাজশাহী…
- ৩০০. এলেম ও জিকির সম্পর্কে স্যার একবার বলেন, সব নেক…
২৮১. এক বয়ানে স্যার বলেন, এই দুনিয়াতে আত্মহত্যা করে শুধু…
এক বয়ানে স্যার বলেন, এই দুনিয়াতে আত্মহত্যা করে শুধু মানুষ। গরু, ছাগল, বাঘ বা অন্য কোনো প্রাণী আত্মহত্যা করে না। কারণ তাদের মনের এমন চাহিদা নেই, যা অপূর্ণ হলে তারা নিজে থেকে মৃত্যু কামনা করবে। ক্ষুধার কারণে বাঘ হোক বা গরু হোক, খেতে না পেলে তারা দুর্বল হতে হতে মারা যায়। কিন্তু তারা কখনোই মনের কষ্টে বসে বসে নিজেকে শেষ করার সিদ্ধান্ত নেয় না। প্রত্যেক সৃষ্টি তার নিজ নিজ জ্ঞান, বুদ্ধি ও স্বভাব অনুযায়ী নিজের প্রয়োজন পূরণের চেষ্টা করে। মানুষও করে, জীবজন্তুও করে। তবে এখানে মৌলিক যে পার্থক্য, জীবজন্তুর প্রয়োজন সীমাবদ্ধ থাকে শুধু শরীরের চাহিদা পর্যন্ত-খাদ্য, পানি ও বিশ্রাম। এসব না পেলে তারা ধীরে ধীরে দুর্বল হয় এবং একসময় মৃত্যু বরণ করে। এর বাইরে তাদের আর কোনো অতিরিক্ত প্রয়োজন নেই। কিন্তু মানুষ ভিন্ন, মানুষের যেমন শরীর আছে, তেমনি আছে মন। আর এই মনও শরীরের মতোই প্রয়োজন দাবি করে, বরং অনেক সময় তার দাবি আরও গভীর ও সূক্ষ্ম। শরীরের প্রয়োজন পূরণ না হলে মানুষ বাঁচতে পারে না, খেতে না পেলে, পানি না পেলে, বিশ্রাম না পেলে মানুষ উপবাস ও পিপাসায় মারা যাবে। এই দিক থেকে মানুষ ও জীবজন্তু সমান। কিন্তু মনের প্রয়োজন পূরণ না হলে যা ঘটে, তা শুধু মানুষের ক্ষেত্রেই দেখা যায়। মনের শান্তি, ভালোবাসা, মর্যাদা, উদ্দেশ্য ও আশার অভাব মানুষকে ধীরে ধীরে ভেতর থেকে ভেঙে দেয়। তখন সে শুধু কষ্ট পায় না, অনেক সময় বাঁচতেই চায় না।
২৮২. স্যার একবার বলেন, মানুষ সাধারণত অন্যের ওপর জুলুমকে খুব…
স্যার একবার বলেন, মানুষ সাধারণত অন্যের ওপর জুলুমকে খুব সহজে জুলুম হিসেবে চিনতে পারে। কারো হক নষ্ট করা, কারো সম্পদ আত্মসাৎ করা, কারো সঙ্গে প্রতারণা করা, পাওনাদারকে বঞ্চিত করা, এসবকে মানুষ স্পষ্টভাবে জুলুম বলে বুঝে। অনেক সময় এমন জুলুম করলে নিজের ভেতর অনুশোচনাও আসে, মনে হয় আমি অন্যায় করেছি। সমাজেও এগুলোকে অপরাধ হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, মানুষ নিজের ওপর যে জুলুম করে, সেটাকে অধিকাংশ সময় জুলুম বলেই মনে করে না। নামাজ ছেড়ে দেওয়া, জামাতে অবহেলা করা, গুনাহকে হালকা মনে করা, হারাম উপার্জন করা, মিথ্যায় অভ্যস্ত হওয়া, সময় নষ্ট করা, বিনোদনে ডুবে থাকা- এসবকে খুব সাধারণ ব্যাপার মনে করে। অথচ নিজের ওপর এমন বড় বড় জুলুম, যা প্রতিনিয়তই নিজের আখিরাতকে ভয়ঙ্কর করে তুলছে। মানুষের ধ্বংসের কারণ, জাহান্নামে যাওয়ার কারণ, আল্লাহ নন, আল্লাহর জুলুম নয়। মানুষ নিজেই নিজের ওপর জুলুম করে, নিজে নিজের আখিরাত ধ্বংস করে। স্যার তুলে ধরেন যে জুলুমের অর্থ কোনো জিনিসকে তার সঠিক জায়গা বা ব্যবহার থেকে সরিয়ে দেওয়া, যা উনাকে বোঝালেও বুঝতে চায় না, নিজে থেকেও অনুভব করে না। ইবাদতের জায়গায় গুনাহ, আনুগত্যের জায়গায় অবাধ্যতা, আল্লাহর হক নষ্ট করা- বড় বড় জুলুম করছে কোনো অনুভূতি নাই। স্যার খুব জোর দিয়ে বলেন, অন্যের ওপর জুলুম এই ধারণাতো মানুষের আছে, কিন্তু মানুষ নিজের ওপর জুলুম করে, নিজের ওপর জুলুম এই কনসেপ্টই মানুষের নাই।
২৮৩. একদিন রাজশাহী মারকাজে দেখা গেল, এক ভাইয়ের চুল বেশ…
একদিন রাজশাহী মারকাজে দেখা গেল, এক ভাইয়ের চুল বেশ অগোছালো। বহুদিন ধরে তেল বা চিরুনি ব্যবহারের কোনো চিহ্ন নেই। দেখে আরেক ভাই তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “ভাই, চুল আঁচড়ান না কেন?” তিনি উত্তর দিলেন, “এই উম্মতের ফিকির, দ্বীনের তাকাজা, দাওয়াতের ব্যস্ততা- কখন চুল আঁচড়াবো?” এই কথা যখন স্যারের কাছে পৌঁছাল, স্যার গভীরভাবে বললেন, বড় ফিকির চোখে দেখা যায় না। প্রসঙ্গ আলোচনায় স্যার বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর জীবনই উত্তম ফিকিরের সবচেয়ে বড় প্রমাণ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, যিনি রহমতুল্লিল আলামিন, সবচেয়ে বড় ফিকিরওয়ালা, সবচেয়ে বেশি উম্মতের দরদি, সবচেয়ে বেশি আল্লাহভীরু, তবুও তিনি থাকতেন পরিচ্ছন্ন, পরিপাটি, সুগন্ধি ব্যবহারকারী, চুল ও দাড়ির যত্নশীল। উনার চিন্তার গভীরতা, দাওয়াতের ব্যাপ্তি, উম্মতের জন্য কান্না- এর তুলনা করা যায় না। তবুও তিনি নিজের চুল আঁচড়াতেন, দাড়ি পরিপাটি রাখতেন, পোশাক পরিস্কার করতেন, কখনো আয়নায় বা পানিতে নিজের চেহারা দেখতেন, কখনো মাথার চুল মাঝখান দিয়ে সিঁথি করতেন। ফিকির হলো উম্মতের জন্য অন্তরের এক দরদ, আল্লাহর দ্বীনের জন্য ব্যাকুলতা, নিজের আমল ও পরকালের হিসাব নিয়ে চিন্তা, মানুষের হেদায়েতের জন্য ভেতরের কষ্ট। দিলের এই ফিকির সম্পর্কে আল্লাহ অবগত। এটা এমন এক জিনিস, যেটা মুখে বলা যায় না, চেহারায় সবসময় ধরা পড়ে এমনও নয়; কিন্তু আল্লাহর কাছে গোপন নয়, আল্লাহ ভালোভাবেই জানেন, আল্লাহ পাকের কাছে যা একেবারেই স্পষ্ট।
২৮৪. স্যার এক মোজাকেরায় বলেন, আল্লাহওয়ালারা দোয়া করে কী পাচ্ছে…
স্যার এক মোজাকেরায় বলেন, আল্লাহওয়ালারা দোয়া করে কী পাচ্ছে, সেটা তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। তাদের কাছে দোয়া করাটাই একটি আনন্দ, দোয়া করতে পারাটাই তাদের কাছে সবচেয়ে বড় পাওয়া। স্যার বলেন, আল্লাহওয়ালারা ফলের চেয়ে সম্পর্ককে বেশি গুরুত্ব দেন। সাধারণ মানুষ দোয়া করে ফল পাওয়ার জন্য, আর আল্লাহওয়ালারা দোয়া করেন আল্লাহর জন্য। তাদের কাছে দোয়া কবুল হলো কি না, এটা মুখ্য বিষয় নয়; বরং দোয়া করতে পারাটাকেই তারা বড় নেয়ামত মনে করেন, কারণ এটাকেই তারা আল্লাহর পক্ষ থেকে ডাকার আলামত হিসেবে দেখেন, আল্লাহর সাথে সম্পর্ক অনুভব করেন। দোয়াকে তারা আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর সুযোগ, নিজের অসহায়ত্ব স্বীকার করার মাধ্যম এবং আল্লাহর সাথে কথা বলার মুহূর্ত হিসেবে দেখেন। দোয়ার সুযোগটাই তাদের কাছে আনন্দ, এই অনুভূতিটাই তাদের কাছে এক প্রশান্তি। ঠিক যেমন প্রিয় মানুষের সঙ্গে কথা বলতে পারলেই মন ভরে যায়, ফল কী হলো সেটা তখন গৌণ হয়ে যায়। স্যার বলেন, এই জায়গাটাই সাধারণ মানুষের সঙ্গে আল্লাহওয়ালাদের মূল পার্থক্য। সাধারণ মানুষ দোয়ার ফল দেখে, আর আল্লাহওয়ালারা দোয়ার মধ্যে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক অনুভব করেন।
২৮৫. একদিন স্যারকে এক ভাইয়ের ঘটনা বলা হলো, তার স্ত্রী…
একদিন স্যারকে এক ভাইয়ের ঘটনা বলা হলো, তার স্ত্রী ছোট ছোট অবুঝ সন্তান ও স্বামীকে রেখে অন্য এক ছেলের হাত ধরে সংসার ছেড়ে চলে গিয়েছিল। কিছুদিন পর তাকে উদ্ধার করে ফিরিয়ে নিয়ে আসা হয়, আর সেই ভাই আবার তাকে (ঐ পালানো স্ত্রীকে) নিয়েই সংসার করছিলেন। তার বিস্তারিত শুনে স্যার বললেন, “যে ছেলের এই রুচি, তার সাথে কোনো রুচিসম্পন্ন মেয়ে তো সংসার করতে চাইবে না।” যে মানুষ খারাপ সম্পর্কের মাধ্যমে ঘর ভাঙার কাজে জড়ায়, সে আসলে নিজের চরিত্রের দুর্বলতাই প্রকাশ করে। এমন দুর্বল মানসিকতার মানুষের ওপর ভর করে শান্ত, নিরাপদ ও সম্মানজনক সংসার গড়া যায়-এই বিশ্বাস রাখা কঠিন। রুচিসম্পন্ন মানুষ সাধারণত এমন কাউকে জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নিতে চায়, যার মধ্যে উন্নত রুচিবোধ রয়েছে, যার ভেতরে আমানতদারি আছে, নৈতিকতা আছে, দায়িত্ববোধ ও সংযম আছে। একজন সত্যিকারের শক্তিশালী মানুষের নিজের চরিত্র শক্ত থাকবে, যেখানে উন্নত “রুচি” থাকবে; নৈতিকতা, মূল্যবোধ, দায়িত্ববোধ ও চরিত্রের মান-এসবের গুরুত্ব তার কাছে থাকবে। এখানেই একজন পুরুষের আসল মর্যাদা, আর এখানেই একটি শান্ত ও স্থিতিশীল সংসারের ভিত্তি। একজন স্ত্রী যেমন চায় তার স্বামী পরিশ্রম করতে পারুক, পরিবারকে আগলে রাখতে পারুক, তেমনি সে চায় তার স্বামী মানসিকভাবে দৃঢ় হোক-রাগ, লোভ, পরিবেশের টান ও এমন কঠিন পরিস্থিতির সামনে যেন ভেঙে না পড়ে। এরপর স্যার বললেন, একজন নারী চায় তার স্বামী শারীরিক ও মানসিক-উভয় দিক থেকেই শক্তিশালী হোক। শক্তিশালী হওয়া মানে শুধু শরীরের জোর থাকা নয়; শক্তিশালী হওয়া মানে চরিত্রে দৃঢ় হওয়া, নৈতিকতায় স্থির থাকা। যে মেয়ের সংসার ভাঙতে দ্বিধা নেই, যে বউ এমন সম্পর্কে যায় যেখানে নিজের স্বামী-সন্তান ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যার কারণে আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও সমাজে লজ্জিত হতে হয়-এমন চরিত্রের মেয়ে সম্পর্কে সাধারণভাবে ধারণা হয় যে তার নৈতিক বোধ দুর্বল, সে নিজের দায়িত্বের তোয়াক্কা করে না। সে যে ভবিষ্যতে বিশ্বাসযোগ্য সঙ্গী হবে, তা সন্দেহের মধ্যে পড়ে। এমন মেয়ের ওপর ভরসা করে জীবনসঙ্গী হিসেবে নিয়ে সংসার করা পুরুষের দুর্বল রুচিবোধের প্রমাণ। ভালো সংসারের জন্য শুধু শরীরের জোর নয়, চরিত্র, দায়িত্ববোধ, নৈতিকতার সাথে মানসিক দৃঢ়তাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। যার আত্মসম্মানবোধ নেই, দুর্বল রুচিসম্পন্ন, সামাজিক মূল্যবোধের গুরুত্ব নেই-এমন পুরুষের সাথে কোনো আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন মেয়ে সাধারণত জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নিয়ে শান্তি পাবে না-এই কথাটাই স্যার বোঝাতে চেয়েছেন। এই কথাগুলো দিয়ে স্যার কোনো গালি বা হেয় করেননি; বরং চরিত্রের মান (“রুচি” / “আত্মসম্মানবোধ”) নিয়ে একটি সামাজিক বাস্তবতা তুলে ধরেছেন।
২৮৬. এক বৈঠকে স্যার বলেন, নিজের ভেতরের অঙ্গীকার ঠিক থাকলে…
এক বৈঠকে স্যার বলেন, নিজের ভেতরের অঙ্গীকার ঠিক থাকলে বাইরের পরিস্থিতি দ্বীনি কাজের পথে বড় বাধা হয় না। প্রাসঙ্গিক কথাবার্তায় স্যার বলেন, বিয়ের পর হজরত মাওলানা আবুল ফাত্তাহ সাহেব রহমতুল্লাহি আলাইহি (যিনি স্যারের বিয়ের বিস্তারিত ব্যাপারে অবগত ছিলেন) স্যারকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “এখন তো বিয়ে করেছ, তাহলে তবলীগের (দ্বীনি মেহনতের) কী হবে, আগের মতো দৌড়ঝাঁপ কি থাকবে?” স্যার বলেছিলেন, “আমার নেসাবের (চিল্লার) খুরুজ যদি ঠিক থাকে, তাহলে বউ আমাকে আটকাতে পারবে না (আল্লাহর রাস্তায় বের হওয়ার ব্যাপারে যদি আমি নিজেই পাকা থাকি, তাহলে সংসার বা পারিবারিক ব্যস্ততা দ্বীনি কাজের পথে বাধা হবে না)।” এখানে স্যার পরিবার বা পারিপার্শ্বিক ব্যস্ততাকে দোষ না দিয়ে নিজের দায়বদ্ধতা ও দৃঢ়তার প্রয়োজনীয়তার কথাই বোঝান। স্যার বলেন, নিজের ভেতরের সিদ্ধান্ত যদি শক্ত হয়, তাহলে পরিবার, কাজকর্ম বা নানা ব্যস্ততা- এগুলো দ্বীনি দায়িত্ব পালনের পথে অজুহাত হয়ে দাঁড়ায় না। আমরা অনেক সময় দ্বীনি কাজের ধারাবাহিকতায় যে দুর্বলতা দেখা দেয়, তা বাইরের লোক বা পরিস্থিতির ওপর চাপিয়ে দিই; কিন্তু আসল দেখার বিষয় হলো, আমি নিজে কতটা সিরিয়াস এবং কতটা পাবন্দ। নেসাবকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে নেওয়ার ব্যাপারে স্যার এভাবে বুঝান যে, বাৎসরিক চিল্লা শুধু একটি সফর নয়; বরং এটা নিজের ভেতরে একটি দৃঢ় কমিটমেন্ট (নিয়ত/অঙ্গীকার) তৈরি করে। এই কমিটমেন্ট ঠিক থাকলে জীবনের অন্যান্য দায়িত্বের মাঝেও দ্বীনি কাজ চালিয়ে নেওয়া সহজ হয়। স্যার আরও উল্লেখ করেন, সংসার মানেই বাধা নয়। বিয়ে বা পরিবার হওয়া মানেই দ্বীনি কাজ বন্ধ হয়ে যাবে, এমন ধারণা ঠিক নয়। আমরা অনেক সময় বলি, “সময় নেই”, “পরিস্থিতি ভালো না”, “এখন সংসার আছে” ইত্যাদি। কিন্তু নিজের ভেতর থেকে অঙ্গীকার মজবুত হলে এই বাহ্যিক হালত বা প্রতিকূলতা অজুহাত হয়ে দাঁড়ায় না। দ্বীনি দায়িত্ব পালনের পথে যদি নিজের ভেতরের দৃঢ়তাকে মূল মাপকাঠি বানানো যায়, তাহলে বাইরের অবস্থা গৌণ হয়ে যায়।
২৮৭. মৌলভীবাজার চিল্লার জামাতে থাকার সময় রংপুরের এক ভাই স্যারকে…
মৌলভীবাজার চিল্লার জামাতে থাকার সময় রংপুরের এক ভাই স্যারকে বলেছিলেন, “স্যার, আমাকে কিছু নসীহত করেন।” সাধারণত এমন সময়ে আমরা আশা করি, হয়তো অনেকগুলো উপদেশ, লম্বা কথা বা আলাদা আলাদা আমলের তালিকা শোনা যাবে। কিন্তু স্যার খুব সংক্ষেপে বললেন, দ্বীনের মেহনত করো- এটাই নসীহত। দ্বীনের মেহনতের ভেতরেই সব নসীহত অন্তর্ভুক্ত আছে। ওই ভাই বলেন, স্যারের কথা খুব ছোট ছিল, কিন্তু অর্থ ছিল অনেক বড়। যেন তিনি বলতে চাচ্ছিলেন, “তুমি যদি সত্যিই উপকার চাও, তাহলে দ্বীনের কাজে লেগে থাকো। বাকিটা আপনাআপনি ঠিক হতে থাকবে।” অন্য এক সময় স্যার প্রসঙ্গক্রমে বলেন, শুধু উপদেশ শুনলে অনেক সময় তার প্রভাব অল্প থাকে; কিন্তু দ্বীনের কাজে যুক্ত থাকলে সেই কাজই মানুষকে গড়ে তোলে। দ্বীনের কাজে নিজেকে লাগিয়ে দিলে ঈমান, আমল, আখলাক, ইখলাস, সব কিছুরই চর্চা হয়ে যায়। নিজের সংশোধন, সবর, ত্যাগ, আল্লাহর ওপর ভরসা, এসব গুণ বাস্তবে আমলে আসে। দ্বীনের মেহনত করতে থাকলে মানুষ নিজেই বদলাতে শুরু করে, নিজের ভুল ধরতে শেখে, আর ধীরে ধীরে নিজের আমল ও চরিত্র সংশোধন হয়। আমরা অনেক সময় নতুন নতুন নসীহত খুঁজি, অথচ দ্বীনের মেহনতের ভেতরেই মানুষের জন্য বড় নসীহত এবং কার্যকর আত্মগঠন লুকিয়ে আছে। স্যার আরো বলেন, কাজের মধ্য দিয়েই প্রকৃত তারবিয়াত ও পরিবর্তন আসে। তাই আসল নসীহত হলো নিয়মিত দ্বীনি আমল ও মেহনতের সঙ্গে লেগে থাকা, শুধু কথা শুনে আত্মতৃপ্ত হয়ে থাকা নয়।
২৮৮. ছোট ছোট বিভিন্ন ঘটনার ভেতর দিয়ে স্যার শিখিয়েছেন- জীবনে…
ছোট ছোট বিভিন্ন ঘটনার ভেতর দিয়ে স্যার শিখিয়েছেন- জীবনে যতটা দরকার, ততটাই রাখা; অভ্যাসের দাস না হয়ে প্রয়োজনকেই সামনে রাখা। খাওয়া, পরা, ব্যবহার সব কিছুর ক্ষেত্রেই সংযম আর সরলতা মানুষকে হালকা রাখে, খরচ কমায়, স্বাধীন করে, আর আল্লাহর ওপর ভরসা করতে শেখায়, স্যারের ব্যক্তিগত জীবন ছিল এই শিক্ষারই জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। স্যার দীর্ঘদিন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে খুব সাধারণ জীবনযাপন করতেন। অনেক সময় ৫–৭ টাকার স্পঞ্জের স্যান্ডেল পায়ে দিয়েই ক্লাস নিতেন। একদিন স্যারের পায়ে বাটার স্যান্ডেল দেখে মাহফুজ ভাই জিজ্ঞেস করলে স্যার মুচকি হেসে বললেন, “ও বোধহয় মনে করেছে ওই স্পঞ্জের স্যান্ডেল আমার শানের খেলাফ, তাই এইটা কিনে দিয়েছে।” একবার আলীগড় ইউনিভার্সিটিতে সেমিনারে গিয়ে ফিরে আসার পর দেখা গেল, স্যারের পায়ে চকচকে এক জোড়া চামড়ার জুতা। জুতার কথা জিজ্ঞেস করতেই স্যার বললেন, “সানাউল্লাহ আমার আগের স্যান্ডেলগুলো ফেলে দিয়েছে। বলেছে, এইটা পরে সেমিনারে যাওয়া যায় না। তারপর দোকানে নিয়ে গিয়ে ১৫০ রুপি দিয়ে এইটা কিনে দিল।” কথাটার ভেতরে কোনো আক্ষেপ ছিল না; ছিল এক গভীর বন্ধুত্বের প্রকাশ আর বাস্তবতাকে সহজভাবে মেনে নেওয়ার মনোভাব। আরেকবার স্যার টায়ারের স্যান্ডেল কিনেছিলেন। কিছুদিন পর সেটা আর দেখা যাচ্ছিল না। জিজ্ঞেস করলে স্যার হেসে বললেন, “ওটা আসলে স্যান্ডেলের কাজ করে না। পায়ের তলায় কালি ধরে যায়, মেঝে নষ্ট হয়।” এই কথাটা বলতে গিয়ে স্যার দু’টা ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করে বলেন “purpose serve” করে না। স্যারের দৈনন্দিন জীবনে এই বিলাসিতাবিমুখ সাদাসিধে ভাবটা গভীরভাবে ধরা পড়ত। লুঙ্গির ছেঁড়া অংশ তিনি গামছা বা তোয়ালের মতো ব্যবহার করতেন। টাকা দিয়ে আলাদা গামছা কেনার নজির স্যারের জীবনে প্রায় দেখা যায়নি। অনেক সফরে সঙ্গে গামছাও থাকত না। গরমের দিনে শুক্রবারে গায়ের গেঞ্জি ধুয়ে, সেটাই দিয়ে শরীর মুছতেন, তারপর সেই ভেজা গেঞ্জিটাই পানি চিপে আবার পরে নিতেন। প্রয়োজনই ছিল স্যারের জীবনের মানদণ্ড; বাহুল্যের প্রতি কোনো টান উনার মধ্যে কখনোই দেখা যায়নি। একবার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্ট্রাল মসজিদে পুরোনো ছাত্রদের সঙ্গে মুযাকারায় স্যার বিকেলের নাস্তা না করার ব্যাপারে তাগিদ দিলেন। আব্দুল ওয়াহাব ভাইয়ের কথা উদ্ধৃত করে বললেন, “সকালের নাশতাটাই আসলে ফালতু, দুই বেলা খাওয়াই যথেষ্ট। সকালে যদি নাশতা করোই, তাহলে চতুর্থ বেলা খাওয়ার আয়োজন করো না, বিকেলের নাস্তা বাদ দাও।” এরপর সেই গভীর কথাটা বললেন, “যে ঘুমের সময় বালিশ চায়, তার ঘুম এখনো আসে নি। আর যে রুটির সঙ্গে তরকারি চায়, তার ক্ষুধা এখনো লাগে নি। সে আসলে ক্ষুধার খানা খাচ্ছে না, খাচ্ছে অভ্যাসের খানা।” এভাবেই স্যার ছাত্রদের তাসকিল করতেন জীবনের খরচ কমিয়ে, প্রয়োজনের মধ্যে থাকার দিকে। তিনি বলতেন, “তিন সেটের বেশি কাপড় রাখবে না। দুই সেটেই হয়ে যায়, খুব বেশি হলে তিন সেট।” কাপড় ইস্ত্রি বা “ক্যালেন্ডার” করানো নিয়েও স্যার নিরুৎসাহ দিতেন, কারণ এতে অকারণে টাকা খরচ হয়, যা ছাত্রদের জন্য বাড়তি বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। এই জীবনধারাই ছিল স্যারের নীরব আরেক দাওয়াত- কমে তৃপ্ত থাকা, অপ্রয়োজনীয় ভার ঝেড়ে ফেলে হালকা হয়ে চলা। স্যারের সঙ্গে সফর করেছেন এমন সবাই উনার এই সাদাসিধে আমলের সাক্ষী এবং এই জীবনধারা সম্পর্কে সম্যকভাবে অবগত।
২৮৯. গ্রীষ্মের ছুটিতে সাধারণত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের থেকে চিল্লার জামাত বেশি…
গ্রীষ্মের ছুটিতে সাধারণত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের থেকে চিল্লার জামাত বেশি বের হতো। এ কারণেই ছুটির আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্ট্রাল মসজিদে ছাত্রদের জোর রাখা হতো। ভাই ফারুক বলেন, এমনি একবার চিল্লা থেকে ফিরে আসার পরও সেই বছর চিল্লার জামাতগুলোর কারগুজারি সামনে রেখে আবার ছাত্রদের জোর রাখা হয়। কারগুজারির আলোচনায় সফরের আমাল, খুরুজ ইত্যাদি কথা উঠছিল, ঠিক সেই ফাঁকে স্যার আমাদের জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের এমন কোনো জামাত ছিল কি, যারা খেদমত ও আনুষঙ্গিক ব্যস্ততায় সময় বাঁচানোর জন্য তিন বেলার খানা দুই বেলা করেছে। স্যার জিজ্ঞেস করলেন, “তিন বেলার খানা দুই বেলা কারা কারা করেছো?” ভাই বলেন, এই প্রশ্ন শুনে আমরা একটু অবাকই হয়ে গেলাম। কারণ এমন কথা সাধারণত ওয়াপসি হেদায়াতে বা মুযাকারায় তেমন শোনা যায় না। কেউ সাধারণত এটা জানতে চায় না। কিন্তু স্যার আমাদের দৃষ্টি ফেরালেন একেবারে মূল জায়গায়- দাওয়াতের কাজে সহজতা আনা, খরচ কমানো, আর নিজের নফসের আরাম কমিয়ে কাজকে প্রাধান্য দেওয়া। সফরের আগে থেকেই স্যার পায়ে দল চলার ব্যাপারে খুব তাগিদ দিতেন। চিল্লার শেষে এই যে মজমা হলো, সেখানেও স্যার আবার পায়ে চলার কথা জিজ্ঞেস করলেন। তখন এক জামাত তাদের কারগুজারিতে বলল, তাদের সফরে এমনও হয়েছে যে তারা রাত আড়াইটা থেকে দুপুর এগারোটা পর্যন্ত একটানা পায়ে হেঁটেছে। এমনকি তাদের মধ্যে এক সাথী ছিলেন, যিনি খোঁড়া ছিলেন। তবুও তিনি খোঁড়াতে খোঁড়াতে হেঁটেই পুরো পথ পায়ে চলেছেন। স্যার বলতেন, খাওয়া কমানো, খরচ কমানো, বাহন ছেড়ে পায়ে চলা- এসব শুধু বাহ্যিক আমল নয়; এগুলো নফস ভাঙার, ইখলাস বাড়ানোর, আর আল্লাহর ওপর ভরসা বাড়ানোর শক্ত প্রশিক্ষণও। স্যার চাইতেন, আমরা যেন কাজকে সহজ করার জন্য নিজের ওপর সহজতা না খুঁজি, বরং কোরবানীর সাথে (নিজের আরাম ছেড়ে) দ্বীনের কাজকে এগিয়ে নেই।
২৯০. মুসলমান”- আল্লাহ পাকের বান্দা ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া…
“মুসলমান”- আল্লাহ পাকের বান্দা ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এর উম্মত- এই পরিচয়ের বাইরে যে লেবেলগুলো আমরা একে অপরের গায়ে লাগাই, স্যারের এজাতীয় পরিচয় ও শব্দ ব্যবহারের ব্যাপারে ছিল কঠোর আপত্তি। আমাদের মধ্যে দ্বীনি পরিভাষা হিসেবে বহুল ব্যবহৃত কিছু শব্দ আক্ষরিক অর্থে নিরীহই মনে হয়। কিন্তু স্যার বলতেন, এগুলো ধীরে ধীরে মানুষের ভেতরে ভেতরে দেয়াল তৈরি করে। তাবলিগি ভাই, পীর ভাই, আরাফাতি ভাই, সাংগঠনিক ভাই- এই ধরনের শব্দের ব্যবহারকে তিনি “দ্বীনি লেবেল দিয়ে বিভাজন” বলেই মনে করতেন। একবার কথার ফাঁকে এক ভাই “আরাফাতি ভাই” বলে সম্বোধন করলে স্যার সঙ্গে সঙ্গে বললেন, “মুসলমান ভাই কোথায় গেল? তুমি কেন ‘আরাফাতি ভাই’ বলে আলাদা করছো?” আমরা অনেক সময় নেক নিয়তে এমন শব্দ ব্যবহার করি- আরাফাতি ভাই, পীর ভাই (একই পীরের মুরীদ বলে), তাবলিগি ভাই ইত্যাদি। কিন্তু স্যার বলতেন, “সবাই মুসলমান ভাই। তুমি এই তাবলিগি ভাই, এই পীর ভাই- এইভাবে বলেই তো মুসলমানদের মধ্যে ভাগ তৈরি করছো।” সাধারণ দৃষ্টিতে এই শব্দগুলো অনেক সময় কেবল আক্ষরিক অর্থেই বলা হয়, বাস্তব কোনো শত্রুতা বোঝাতে নয়। তবুও স্যার এগুলোকে শুধু অপছন্দই করতেন না, বরং খুবই গর্হিত মনে করতেন। প্রাসঙ্গিক আলোচনায় স্যার একবার বলেন, وَأَطِيعُوا اللّٰهَ وَرَسُولَهُ وَلَا تَنَازَعُوا فَتَفْشَلُوا وَتَذْهَبَ رِيحُكُمْ وَاصْبِرُوا ۚ إِنَّ اللّٰهَ مَعَ الصَّابِرِينَ “তোমরা যখন বিভক্ত হয়ে যাবে, তখন তোমাদের বাতাস বের হয়ে যাবে।” স্যার বলেন, বিভক্তি মানুষকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দেয়। বাহ্যিকভাবে লোকসংখ্যা বা সামর্থ্য থাকলেও, যদি ঐক্য না থাকে, তাহলে সেই শক্তির “হাওয়া” আর কাজ করে না। তিনি আরও বলতেন, নিজেদের মধ্যে দ্বীনি লেবেল ব্যবহার করে যদি আমরা আলাদা আলাদা পরিচয় দাঁড় করাই, তাহলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিটা আমাদেরই হয়। পরস্পর দ্বীনের নাম ব্যবহার করে গ্রুপ বানিয়ে বিভক্ত হলে মুসলমানদের শক্তি, প্রভাব ও মর্যাদা দীল থেকে ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যায়।
২৯১. একবার স্যার বলেন, আমাদের তাবলীগের মেহনতে একটা কথা মাঝে…
একবার স্যার বলেন, আমাদের তাবলীগের মেহনতে একটা কথা মাঝে মাঝে শোনা যায়- “জিজ্ঞেস করে করে চলি ভাই।” কথাটা শুনতে খুব দ্বীনি, খুব নিরাপদ মনে হয়। আসলেই, পরামর্শ করা সুন্নাত। একা একা সিদ্ধান্ত না নিয়ে অভিজ্ঞদের জিজ্ঞেস করা ভালো। এতে ভুল কম হয়, বরকত হয়, আর কাজেও শৃঙ্খলা থাকে। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন এই কথাটাকে আমরা ঢাল বানিয়ে ফেলি নিজের চিন্তা থেকে পালানোর জন্য। তখন “জিজ্ঞেস করে চলা” আর পরামর্শ নেওয়া থাকে না, বরং হয়ে যায়-“আমাকে বলা না হলে আমি নড়ব না।” চারপাশের অবস্থা দেখেও সে চিন্তা করবে না, দায়িত্বটা বুঝেও এগোবে না, শুধু অপেক্ষা করবে- কখন ওপর থেকে নির্দেশ আসবে। স্যার বলেন, এতে করে মানুষের ভেতরের ফিকির আর দায়িত্ববোধ ধীরে ধীরে মরে যায়। দ্বীনি কাজেও আমরা যদি শুধু “বলা হয়েছে কি না” এই হিসাব করি, তাহলে কাজ তো হবে, কিন্তু নিজের ভেতর থেকে যে দায়বোধ, দরদ, চিন্তা-ওগুলো তৈরি হবে না। অথচ একজন মুমিনের কাজ শুধু আদেশ পালন করা না, বরং নিজের পরিবার, নিজের প্রতিবেশী, নিজের সমাজ নিয়ে ভাবা, কোথায় কী দরকার সেটা বুঝে এগিয়ে আসা। স্যার বলেন, “জিজ্ঞেস করে চলা” ভালো, কিন্তু “ভাবা (নিজে থেকে চিন্তা করা) বন্ধ করে দেওয়া” ভালো না। পরামর্শ হবে পথ দেখানোর জন্য, দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার অজুহাত হওয়ার জন্য না। এই আলোচনায় স্যার আরও উল্লেখ করেন, অনেক সময় “জিজ্ঞেস করে করে চলি ভাই” কথাটা শুধু সরলতা বা শৃঙ্খলার জন্য বলা হয় না; অজান্তেই এটা একটা কন্ট্রোলের কালচার তৈরি করে ফেলে। মানে, যারা উপরে আছে তারা চায় নিচের মানুষগুলো বেশি না ভাবুক, বেশি প্রশ্ন না করুক, নিজের বিবেক বা বুদ্ধি না খাটাক-শুধু বলা হলেই যেন কাজ করে। এভাবে ধীরে ধীরে একটা মানসিকতা তৈরি হয়: আমি “আদেশ দেবো”, আর বাকিরা হবে “আদেশ পালনকারী”। ভাবা, বিচার করা, দায়িত্ব বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়া-এই জিনিসগুলো যেন তাদের কাজ না। স্যারের কথার ভেতরের সতর্কবার্তাটা এখানেই। ইসলাম কখনোই এমন অন্ধ আনুগত্য শেখায় না, যেখানে মানুষ চিন্তা করা ছেড়ে দেয়। সাহাবারা পর্যন্ত প্রশ্ন করতেন: “এটা কি আল্লাহর হুকুম, না আপনার মত?” কারণ তারা বুঝতেন, ঈমান মানে শুধু মানা না, বুঝে মানা। যখন কাউকে সব সময় বলা হয়, “তীর হয়ে চলো, চুপ করে মেনে চলো, জিজ্ঞেস করে করে চল,” তখন সে ধীরে ধীরে নিজের দায়িত্ববোধ হারায়। এতে করে মানুষ চিন্তাশীল বান্দা না হয়ে যান্ত্রিক কর্মী হয়ে যায়। অথচ দ্বীন চায়, প্রতিটা মানুষ নিজের জায়গা থেকে ফিকির করবে, দায় নেবে, দায়িত্ব অনুভব করবে। স্যার বলেন, “জিজ্ঞেস করে চলা” যদি হয় শেখার জন্য, শুদ্ধ পথে থাকার জন্য-তাহলে ভালো। কিন্তু যদি এটা হয় মানুষকে চিন্তাহীন, প্রশ্নহীন, শুধু আদেশ পালনকারী বানানোর জন্য-তাহলে সেটা এক ধরনের ক্ষতিকর অভ্যাস, যা দ্বীনি মেহনতের প্রাণটাই দুর্বল করে দেয়।
২৯২. একবার ফিজিক্স ল্যাবে এক ছাত্র স্যারকে জিজ্ঞেস করছিল প্র্যাকটিক্যাল…
একবার ফিজিক্স ল্যাবে এক ছাত্র স্যারকে জিজ্ঞেস করছিল প্র্যাকটিক্যাল ক্লাসের একটি সহজ বিষয় নিয়ে। কাজ ছিল- একটি বয়ামে রাখা চিনির ওজন বের করা। নিয়মটা খুব সাধারণ: আগে চিনিসহ বয়াম ওজন করতে হবে, তারপর খালি বয়াম ওজন করতে হবে, এরপর দুইটার পার্থক্য নিলেই চিনির ওজন পাওয়া যাবে। ঐ ছাত্রের খুব সিরিয়াস মুখে জিজ্ঞেস ছিল- খালি বয়ামের ওজনটা মাইনাস করলে চিনির ওজনতো পাওয়া যাবে, কিন্তু স্যার, বয়ামের ঢাকনাটা কী করব? এখন বয়ামের মুখ বা খাপটির (Cork) ওজন সে কী করবে? ছেলেটার প্রশ্ন শুনে স্যার একটু বিস্মিত হলেন। এটা ধরব, নাকি ধরব না (খাপটির ওজন)? স্যার অবাক হয়ে গেলেন। এই ছেলে মেট্রিক-ইন্টারমিডিয়েট পাস করেছে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টে পড়ছে, বেশ কিছু ফিজিক্সও ইতিমধ্যে পড়ে ফেলেছে-তবু এমন বেসিক ব্যাপারে এমন প্রশ্ন! তার তো এতটুকু সাধারণ জ্ঞান থাকার কথা যে, ওজন করার সময় ঢাকনাটি হয় উভয় ক্ষেত্রেই রাখতে হবে, অথবা উভয় ক্ষেত্র থেকেই বাদ দিতে হবে। এত সহজ একটা ব্যাপার সে কেনো বুঝতে পারছে না, ছেলেটা কি বোকা! স্যার বলেন, আসলে ছেলেটা মেধাহীন নয়, বোকা না; সে মোটেও বোকা ছিল না। সমস্যা তার বুদ্ধির না, সমস্যা হলো- তাকে এমনভাবে অভ্যস্ত করে তোলা হয়েছে যে সে নিজে ভেবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। প্রাইভেট কোচিং আর মুখস্থনির্ভর পড়াশোনা তাকে ভাবতে শেখায়নি। সে শিখেছে ধাপে ধাপে ”কি করতে হবে” সেটা, কিন্তু ”কেন করতে হবে” বা ”নিজে ভেবে সমাধান কীভাবে বের করতে হয়”- এই জায়গাটা তার গড়ে ওঠেনি। আমাদের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা এবং প্রাইভেট কোচিংয়ের ’শিখিয়ে দেওয়া’ ছক তাকে এমন এক জায়গায় নিয়ে ঠেকিয়েছে যেখানে সে নিজের বিবেক বা কাণ্ডজ্ঞান ব্যবহার করতে ভুলে গেছে। সে শুধু জানে ’আদেশ’ বা ’নিয়ম’ পালন করতে, কিন্তু সেই নিয়মের পেছনের যুক্তি বা ’ফিকির’ নিয়ে তার কোনো ভাবনা নেই। স্যার বলেন, আমাদের দ্বীনি জীবনে বা তাবলীগের কাজেও আমাদের মধ্যে অনেক সময় এই একই মানসিকতা চলে আসে। আমরা এমনভাবে অভ্যস্ত হয়ে যাই যে, সব কিছুতেই ”জিজ্ঞেস করে করে চলি”- নিজে ভেবে, নিজের দায়িত্ব বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভ্যাস কমে যায়।
২৯৩. স্যার বলতেন, পরামর্শ করে চলা অর্থ এই নয় যে…
স্যার বলতেন, পরামর্শ করে চলা অর্থ এই নয় যে মানুষ তার নিজস্ব কাণ্ডজ্ঞান বা সহজাত দায়িত্ববোধ বিসর্জন দেবে। স্যার উদাহরণ দিয়ে একবার বলেন, ধরা যাক কারও ভাইয়ের বা ভাতিজার বা প্রতিবেশীর মেট্রিক পরীক্ষা শেষ হয়েছে। এখন তার নিজের ফিকির থেকেই তো আসা উচিত যে, ভাইকে, ভাতিজাকে বা প্রতিবেশীকে কীভাবে আল্লাহর রাস্তায় বের করা যায়। এটা তার নিজের তাকাজা, নিজের দায়িত্ববোধ থেকেই হওয়া উচিত। এখন কীভাবে তাকে আল্লাহর রাস্তায় বের হওয়ার জন্য উৎসাহিত করা যায়, কীভাবে তার ঈমান-আমলের চিন্তা করা যায়। এটা তো তার ঘরের মানুষ, তার আশপাশের মানুষ। এই দায়বোধ তার নিজের ভেতর থেকেই আসা উচিত, স্বাভাবিকভাবে তার নিজের ফিকির হওয়া উচিত ছিল। কাকরাইল থেকে তাকাজা বা নির্দেশ এলো ভাই এসএসসি পরিক্ষার্থীদের পেছনে মেহনত করি, জামাত বানিয়ে মার্কাজে পাঠাই। মার্কাজ থেকে সে এই তাকাজা পেলো তো তবেই সে নড়েচড়ে বসে। নিজের ভেতর থেকে যে ফিকির, যে দরদ, যে দায়বদ্ধতা- সেটা জাগে না। যেন সে শুধু আদেশ পালন করছে, চিন্তা করছে না। যেখানে এমন তাকাজা তার নিজের ভেতরকার ’ফিকির’ বা দরদ থেকে আসার কথা। আমাকে বলা হয়েছে, তাই আমি করছি, মারকাজ থেকে ’তাকাজা’ বা নির্দেশনা আসবে; তো আমি করবো; নির্দেশ আসছে তখন সেটাকে একটি যান্ত্রিক আদেশ হিসেবে পালন ও করছি। ব্রাহ্মণ আর নমঃশূদ্র এর উদাহরণ দিয়ে স্যার ঐ চিন্তা ও দাসের মনস্তত্ত্ব (আদিষ্ট হওয়া বনাম সহজাত ফিকির) ব্যাখ্যা করতেন। নিজের ভাই, প্রতিবেশী বা আত্মীয়ের দ্বীনি ফিকির যদি নিজের ভেতর থেকে না আসে, তবে বুঝতে হবে আমরা আদিষ্ট হয়ে কাজ করতে করতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। এই মনস্তত্ত্ব অনেকটা প্রাচীন ব্রাহ্মণ সমাজব্যবস্থার ’আদেশ পালনকারী’ নমঃশূদ্র শ্রেণির মতো, যারা নিজেরা চিন্তা করে না, শুধু ওপরের নির্দেশ পালন করে। স্যার বলতেন, এই অভ্যাসটা খুব ক্ষতিকর যাতে মানুষ দায়িত্বশীল চিন্তাশীল বান্দা না হয়ে শুধু ”নির্দেশ মানা কর্মী” হয়ে যায়, এই অবস্থায় ধীরে ধীরে চিন্তা-ফিকির করার শক্তি হারিয়ে ফেলে। ইসলাম আমাদের ’আবদ’ বা দাস হতে বলেছে আল্লাহর, কিন্তু চিন্তার ক্ষেত্রে আমাদের দিয়েছে এক বিশাল সাম্রাজ্য।
২৯৪. এক জামাতে ছয় নম্বরের মুজাকারা চলছিল। ‘একরামুল মুসলিমীন’ পয়েন্টের…
এক জামাতে ছয় নম্বরের মুজাকারা চলছিল। ‘একরামুল মুসলিমীন’ পয়েন্টের আলোচনায় একজন সাথী বলছিলেন, “…..সবচেয়ে বড় একরাম হলো একজন আল্লাহভোলা বান্দাকে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক করে দেওয়া, আল্লাহর সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া।….” মুজাকারার শেষ দিকে স্যার কিছু কথা বলেন। স্যার বলেন, আমরা সাধারণত “একরামুল মুসলিমীন” শব্দটি ব্যবহার করি। কিন্তু বিষয়টি একবচনে ধরলে- “একরামুল মুসলিম” বা “একরামে মুসলিম”- অর্থটি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একরাম শুরু হয় একেকজন মুসলিমকে কেন্দ্র করে; এক একজন বান্দার সম্মান ও প্রয়োজনের খেয়াল রাখার মাধ্যমেই এর বাস্তব রূপ প্রকাশ পায়। স্যার বলেন, একজন আল্লাহভোলা মানুষকে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক করে দেওয়া অবশ্যই বড় একরাম। কিন্তু সেটা এত উচ্চস্তরের কাজ যে, তার জন্য আলাদা একটি বিষয় রয়েছে- “দাওয়াত ও তাবলীগ।” আল্লাহর পথে ডাকা, জান-মাল-সময় কোরবানি করে মানুষকে আল্লাহর সাথে পরিচিত করানো- এটা দাওয়াতের কাজ। তাই এই অংশটি দাওয়াতের পয়েন্টের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু “একরামে মুসলিম” বিষয়ে যে একরামের কথা বলা হয়েছে, তা মূলত মুসলিম ভাইয়ের পার্থিব প্রয়োজন পূরণ করা, তার উপকার করা, তার সম্মান রক্ষা করা- এই দুনিয়াবী দায়িত্বের কথা। স্যার বোঝান, একরাম মানে কেবল কিছু আদর্শিক কথা নয়; বরং ক্ষুধার্তকে খাওয়ানো, তৃষ্ণার্তকে পানি পান করানো, অসহায়কে আশ্রয় দেওয়া, ঋণগ্রস্তকে সাহায্য করা, রোগীর সেবা করা, হক অনুযায়ী তার সম্মান করা, অন্যের পার্থিব প্রয়োজন সামনে রেখে সঠিক পরামর্শ দেওয়া- এসবই একরামের বাস্তব রূপ। স্যার বলেন, শরীয়তে এই একরামের ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর তাকিদ রয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা শরীফে নিজের সম্পদ অসহায়, এতিম ও অভাবীদের পেছনে ব্যয় করেছেন। প্রথম যখন উনার উপর ওহী নাযিল হলো এবং তিনি ভীত হলেন, তখন হযরত খাদিজা রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা উনাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলেন: আপনি আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করেন, অক্ষমের বোঝা বহন করেন, অভাবগ্রস্তকে সহায়তা করেন, মেহমানকে আপ্যায়ন করেন এবং সত্যের কাজে সাহায্য করেন- আল্লাহ আপনাকে কখনো অপমানিত করবেন না। এই কথাগুলো একরামেরই উজ্জ্বল উদাহরণ। স্যার বোঝাতে চেয়েছেন, আল্লাহভোলা বান্দাকে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক করে দেওয়া নিঃসন্দেহে মহত্তম কাজ- কিন্তু সেটা দাওয়াতের পয়েন্ট। আর একরামুল মুসলিমীন পয়েন্টে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে মুসলিম ভাইয়ের পার্থিব প্রয়োজন পূরণ, তার কষ্ট লাঘব, তার সম্মান রক্ষা এবং তার পাশে দাঁড়ানোর বিষয়ে। স্যার বলেন, দাওয়াত মানুষের আখিরাতের মুক্তির পথ খুলে দেয়- এটি সর্বোচ্চ স্তরের কাজ। আর একরাম মানুষের দুনিয়াবী কষ্ট দূর করে, তার হৃদয়ে ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্ব সৃষ্টি করে। এই দুই কাজের প্রত্যেকটির নিজস্ব স্থান ও গুরুত্ব রয়েছে; একটিকে আরেকটির সাথে গুলিয়ে ফেললে বিষয়টি অস্পষ্ট হয়ে যায় এবং বিষয়টির মূল মাকসাদ হারিয়ে যায়।
২৯৫. একবার এক আলোচনায় মাহফুজ ভাই স্যারকে জিজ্ঞেস করলেন, “স্যার…
একবার এক আলোচনায় মাহফুজ ভাই স্যারকে জিজ্ঞেস করলেন, “স্যার, বলা হয় দোয়ার চেয়ে সম্মানিত জিনিস আর নেই। দোয়া এত সম্মানিত কিভাবে?” স্যার উত্তরে একটি উদাহরণ দিলেন। বললেন, “ধরো, তুমি দেখলে তোমার এক বন্ধু বাজারে মানুষের কাছে হাত পেতে চাইছে। তার সম্পর্কে তোমার ধারণা কী হবে? আর যদি দেখো, সেই মানুষটিই মসজিদে এসে দুই হাত তুলে আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করে দোয়া করছে- তখন তার সম্পর্কে তোমার ধারণা কী হবে?” স্যার বললেন, মানুষের কাছে চাইলে মানুষ ছোট হয়ে যায়। আত্মসম্মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু আল্লাহর কাছে চাইলে মানুষ সম্মানিত হয়। সামান্য ভিক্ষার কারণে, চাওয়ার কারণেই তার অবস্থান ছোট হয়ে যেতে পারে; তার কদর ও সম্মান কমে যেতে পারে। মানুষ যখন মানুষের কাছে মুখাপেক্ষী হয়, তখন তার মর্যাদা হ্রাস পায়। স্যার বলেন, “ঠিক এর বিপরীত হলো আল্লাহর কাছে চাওয়া। আল্লাহর কাছে সওয়াল করা মানুষের মর্যাদা কমায় না; বরং বাড়ায়। কেউ যদি আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করে, দুই হাত তুলে দোয়া করে- তাকে দেখে মানুষের অন্তরে তার প্রতি ভালোবাসা জন্মায়। কারণ সে মানুষের কাছে নয়, আল্লাহর কাছে মুখাপেক্ষী হয়েছে।” স্যার বোঝান, মানুষের কাছে চাওয়ার মধ্যে অপমান আছে; আর আল্লাহর কাছে চাওয়ার মধ্যে সম্মান, এই কারণেই দোয়া একটি সম্মানিত আমল। মানুষ যখন আল্লাহর দরবারে নিজেকে অসহায় বানায়, তখনই সে প্রকৃত মর্যাদা লাভ করে। বান্দার সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ অবস্থাই হলো আল্লাহর সামনে নিজেকে ফকির বানানো- নিজের মালিকের দরবারে নিজের অসহায়ত্ব ও প্রয়োজন প্রকাশ করা।
২৯৬. একবার স্যার বলেন, দ্বীনের ময়দানে কামাল বা পূর্ণতা হলো…
একবার স্যার বলেন, দ্বীনের ময়দানে কামাল বা পূর্ণতা হলো নকলের মধ্যে; আর দুনিয়ার ময়দানে কামাল হলো আবিষ্কারের মধ্যে । স্যার বলেন, দুনিয়ার জগতে মানুষ নিজের সৃষ্টিশীলতা, নতুন আবিষ্কার, নতুন তত্ত্ব ও নতুন চিন্তার মাধ্যমে বড় হয়। কেউ যদি নিজে একটি কবিতা লেখে, নতুন থিওরি দেয় বা নতুন কিছু উদ্ভাবন করে- সেটাই তার কৃতিত্ব। সেখানে অন্যের লেখা আবৃত্তি করলে বিশেষ কৃতিত্ব ধরা হয় না। দুনিয়ার ময়দানে “আমি কী করলাম”- সেটাই মূল্যায়নের বিষয়। কিন্তু দ্বীনের ময়দান ভিন্ন। এখানে পূর্ণতা আসে নিজের নতুন কথা বলায় নয়; বরং যত বেশি কুরআন, হাদিস ও পূর্বসূরি আলেমদের বক্তব্যের ওপর নির্ভর করা যায়, তত বেশি গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে। এখানে “আমি বললাম” দিয়ে কথা শুরু হলে তার ওজন কমে যায়; আর “আল্লাহ বলেছেন”, “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন”, “ফুকাহারা বলেছেন”- এভাবে কথা প্রতিষ্ঠিত হলে তার মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। এই রেফারেন্সসমৃদ্ধ ধারাবাহিকতাই দ্বীনের ময়দানে গ্রহণযোগ্যতা ও গুরুত্ব সৃষ্টি করে। স্যার বলেন, দ্বীনের জগতে মৌলিকত্ব মানে নতুন কিছু উদ্ভাবন নয়; বরং বিশুদ্ধ উৎসের সাথে সংযুক্ত থাকা। যত গভীর রেফারেন্স, যত নির্ভরযোগ্য সূত্র- তত বেশি গ্রহণযোগ্যতা। এখানে কামাল নিজের আবিষ্কারে নয়; বরং আমানতদারিত্বের সাথে নকল ও সঠিকভাবে পরিবেশনের মধ্যে। স্যার আরও তুলে ধরেন, এর অর্থ এই নয় যে চিন্তা বা ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই। বরং চিন্তা হবে উৎসের আলোকে; নিজেকে সামনে না এনে উৎসকে সামনে রেখে । দ্বীনের ময়দানে বড় হওয়া মানে নিজের নাম উঁচু করা নয়- বরং নিজেকে আড়াল করে কুরআন ও সুন্নাহকে সামনে আনা।
২৯৭. স্যার একবার বলেন, সব অযোগ্যতা আসলে অযোগ্যতা নয়; কখনো…
স্যার একবার বলেন, সব অযোগ্যতা আসলে অযোগ্যতা নয়; কখনো তা ভিন্ন স্তরের সামর্থ্যের ইঙ্গিত। আমরা হযরত উমর রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু সম্পর্কে একটি প্রচলিত কথা বলে থাকি- তিনি জীবনের এক সময় বকরি চরাতেন, এমনকি কয়টি নিয়ে গেলেন আর কয়টি ফেরত আনলেন- সেটাও ঠিকভাবে হিসাব রাখতে পারতেন না; অথচ পরবর্তীতে অর্ধ জাহানের খলিফা হলেন। স্যার এই কথাটিকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করতেন। তিনি বলেন, কখনো কখনো যে ব্যক্তি বড় দায়িত্বের উপযুক্ত, তার স্বভাব ও সামর্থ্য ছোট গণ্ডির কাজে প্রত্যাশিত ফল দেয় না। এটা অযোগ্যতা নয়; বরং ভিন্ন স্তরের যোগ্যতারই ইঙ্গিত। স্যার এক উদাহরণ দেন- একজন শিল্পপতি, যিনি বহু কারখানা পরিচালনা করেন, তিনি হয়তো একটি ছোট মুদির দোকানে বসে খুচরা বিক্রি করতে পারবেন না। এতে তার অযোগ্যতা প্রমাণ হয় না; বরং তার কাজের পরিসর ভিন্ন স্তরের। একটি বিশাল জাহাজ ছোট খালে চলতে পারে না- তাই বলে জাহাজ অক্ষম নয়। একজন বড় প্রফেসর, বড় গবেষক পিএইচডি থিসিস মূল্যায়ন করতে পারেন; কিন্তু কিন্ডারগার্টেনে A,B,C,D শেখাতে গেলে শিশুরা তার তার ক্লাসে আনন্দ পায় না; বা তার কাছে পড়ে সেইভাবে উপকৃত নাও হতে পারে। সেটি তার দুর্বলতা নয়; বরং তার দক্ষতার ক্ষেত্র আলাদা। স্যার ব্যবসার উদাহরণ দেন। ধরো, কারও পুঁজি ১০০ টাকা, সে সেই পুঁজিতে বাদাম কিনে ভেজে বিক্রি করবে; ট্রেনে বাদাম বিক্রি করবে, মোড়ে পান বিক্রি করবে, তো ওই পুজির ব্যবসা ভালভাবে চলবে লাভও হবে। কিন্তু যদি তার পুঁজি ১ লাখ হয়, তবে একই ছোট মোড়ে বসে ওই পানের ব্যবসা করলে তা টিকবে না। পুঁজি যত বাড়ে, ব্যবসার ক্ষেত্রও তত বড় করতে হয়। ১ কোটি টাকার পুঁজি নিয়ে ছোট হাটে বসলে ব্যবসা হবে না; ১০০ কোটির পুঁজি নিয়ে এই ছোট শহরে সীমাবদ্ধ থাকলে ব্যবসা জমবে না, বড় বাজারে ঢুকতে হবে। সামর্থ্য নিজেই মানুষকে বড় পরিসরের দিকে ঠেলে দেয়। স্যার বলেন, কখনো কখনো মানুষ নিজেকে ছোট কাজে মাপতে গিয়ে ভুল করে, অথচ আল্লাহ তাকে বড় দায়িত্বের জন্য প্রস্তুত করে রেখেছেন। স্যার বলতেন, যোগ্যতার পরিসর ভিন্ন ভিন্ন। বড় সামর্থ্যকে ছোট গণ্ডিতে আটকে রাখা যায় না, এমনি বিশেষ সামর্থ্যকে সীমিত পরিসরে ব্যবহার করলে তার প্রকৃত মূল্যায়ন হয় না।
২৯৮. পড়াশোনা শেষ করার পর ভাই আব্দুল কাইয়ুম স্যারকে জিজ্ঞাসা…
পড়াশোনা শেষ করার পর ভাই আব্দুল কাইয়ুম স্যারকে জিজ্ঞাসা করেন, “স্যার, চাকরির ব্যাপারে কী করব? অনেক জায়গায় শুনছি চাকরি পেতে হলে টাকা-পয়সা দিতে হয়। কেউ বলে এত টাকা লাগবে, কেউ বলে অমুকের সাথে দেখা করলে কাজ হবে। এ অবস্থায় কী করা উচিত?” ভাই বলেন, সে সময় আমার চাকরির খুব প্রয়োজন ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে সার্কুলার হয়েছিল, আবার বিভিন্ন জায়গায়ও আবেদন করেছিলাম। চারদিক থেকে নানা ধরনের পরামর্শ আসছিল। কেউ বলছিল- অমুকের সাথে দেখা করো, তমুকের কাছে যাও, এত টাকা দিলে চাকরি হয়ে যাবে। এসব কথা শুনে আমি দ্বিধায় পড়ে স্যারকে জিজ্ঞাসা করলাম। স্যার উত্তরে সংক্ষিপ্ত কথা বলেন। স্যার বলেন: “যারা টাকা চায়, আসলে তাদের চাকরি দেওয়ার ক্ষমতা নেই বলেই টাকা চায়।” স্যার বোঝান, অনেক সময় টাকা দাবি করা অক্ষমতারই লক্ষণ। এরপর তিনি বলেন, কেউ যদি পরামর্শ দেয় যে অমুকের সাথে দেখা করো বা তমুকের কাছে যাও, তাহলে দেখা করা যেতে পারে। মানুষের সাথে পরিচয় করা বা কথা বলা দোষের নয়; তবে টাকা দিয়ে চাকরি নেওয়া নয়। তিনি বলেন, “কেউ যদি কোথাও দেখা করার পরামর্শ দেয়, তাহলে যাও। সবার সাথে দেখা করো। সালাম দিয়ে বলো, আমি একজন প্রার্থী, আপনার সাথে দেখা করতে এসেছি। বাস এতটুকুই; কিন্তু টাকা দিয়ে না।” শেষে স্যার বলেন, “তকদিরে থাকলে চাকরি হবে। আর তকদিরে না থাকলে টাকা দিলেও হবে না।”
২৯৯. ভাই সাজ্জাদ বলেন, স্যারের সাথে আমার প্রথম দেখা রাজশাহী…
ভাই সাজ্জাদ বলেন, স্যারের সাথে আমার প্রথম দেখা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে। সে সময় আমি আরেক ভাইয়ের সাথে স্যারের কাছে বসেছিলাম। ওই ভাই স্যারের সাথে নামাজের কিছু মাসআলা নিয়ে আলোচনা করছিলেন, বিশেষ করে বিমানযাত্রার সময় নামাজ আদায়ের বিষয়ে। এই প্রসঙ্গেই কথাবার্তা চলছিল। হঠাৎ স্যার আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি সাধারণত রাত কয়টার দিকে ঘুমাও?” আমি বললাম, “স্যার, শুতে শুতে তো প্রায় রাত একটা বেজে যায়।” আমার কথা শুনে স্যার বললেন, “এটা তো ইহুদিদের তরিকা।” (মুসলমানের জীবনযাত্রা এমন হওয়া উচিত যে, রাতের সময় অকারণে জাগ্রত না থেকে যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি বিশ্রাম নেওয়া যায় এবং ভোরবেলা ইবাদতের জন্য প্রস্তুত থাকা যায়।) স্যার সম্ভবত নসিহত হিসেবে বোঝাতে চেয়েছিলেন, মুসলমানের জীবনযাত্রা হবে সুসংগঠিত। রাত গভীর পর্যন্ত জেগে থাকা মানুষের মধ্যে অলসতা সৃষ্টি করে এবং অনেক সময় ফজরের নামাজ ও সকালবেলার বরকত থেকে মানুষ বঞ্চিত হয়ে যায়।
৩০০. এলেম ও জিকির সম্পর্কে স্যার একবার বলেন, সব নেক…
এলেম ও জিকির সম্পর্কে স্যার একবার বলেন, সব নেক কাজ সব সময় একই স্তরের হয় না; সময়ভেদে অগ্রাধিকার বদলায়। এলেম মানুষকে সঠিক আমল চিনতে সাহায্য করে, আর জিকির হলো সেই সঠিক আমলে পূর্ণ একাগ্রতার সাথে নিজেকে নিয়োজিত করা। একজন মানুষ চাইলে এই মুহূর্তেই শত শত ভালো কাজের তালিকা করতে পারে, আবার শত শত খারাপ কাজের তালিকাও করতে পারে। যেমন কেউ জিকির করতে পারে, কুরআন তিলাওয়াত করতে পারে, মানুষকে দাওয়াত দিতে পারে, অসহায়কে সাহায্য করতে পারে, রোগী দেখতে যেতে পারে, এভাবে অনেক ভালো কাজের কথা বলা যায়। ঠিক তেমনি অনেক খারাপ কাজের তালিকাও করা সম্ভব। স্যার বলেন, শয়তানের প্রথম চেষ্টা থাকে মানুষকে খারাপ কাজে জড়ানো। বড় খারাপ কাজে যদি সে সফল না হয়, তাহলে অন্তত ছোট কোনো খারাপ কাজে মানুষকে ব্যস্ত রাখতে চায়। আর যদি খারাপ কাজে জড়াতে না পারে, তখন সে অন্য কৌশল নেয়, ভালো কাজগুলোর মধ্যেই মানুষকে এমন কাজে ব্যস্ত রাখে, যা তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ; অথচ সেই মুহূর্তে যে কাজটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সেখান থেকে তাকে সরিয়ে দেয়। স্যার বলেন, শয়তান মানুষকে নেক কাজেই ব্যস্ত রাখবে, কিন্তু সেই কাজটি যেন ওই মুহূর্তের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় বা আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয় কাজ না হয়, সেটাই তার চেষ্টা। সে নেক কাজতো করছে, কিন্তু সেই মুহূর্তে আল্লাহ তার কাছ থেকে যে কাজটি চান, সেটি করছে না। স্যার বলেন, আমরা হালের তাকাযা যে বলি, এই প্রত্যেকটা মুহূর্তে আল্লাহ পাক আমার নিকট থেকে কি চাইছেন, ওই মুহূর্তের তাকাযাকে বুঝা- এইটা হচ্ছে এলেম। স্যার উদাহরণ দিয়ে বলেন, ধরো মাগরিবের আজান হয়ে গেছে। এখন আমার জন্য সবচেয়ে উত্তম আমল কী? আবার হঠাৎ করে মা অসুস্থ হয়ে গেলেন, তখন সেই মুহূর্তে আল্লাহ আমার কাছে কী চান? ঐ মুহুর্তের হাজারো করনীয় নেক আমল থেকে আল্লাহর চাহিদার অগ্রাধিকার কোথায়? স্যার বলেন, এই মুহূর্তে আল্লাহ আমার কাছে কী চান- এটি বুঝতে পারার নামই হলো এলেম। আর সেই করণীয় আমলটি বুঝে নেওয়ার পর এমনভাবে তাতে আত্মনিয়োগ করা, যাতে অন্য অনেক নেক আমল আর তখন মনে না থাকে- এই একাগ্রতাকেই বলা হয় জিকির। স্যার বলেন, শরীয়তের একটি উসূল আছে: “اشتغال عن كل شيء” – সবকিছু থেকে মন সরিয়ে একটি কাজে সম্পূর্ণ মনোযোগ দেওয়া। তিনি বোঝান, যে মুহূর্তে যে আমল করণীয়, সেই আমলে এমনভাবে ডুবে যাওয়া যে অন্য সব সম্ভাব্য নেক আমল তখন মনে না থাকে, এটাই প্রকৃত জিকির। স্যার বলেন, শয়তান এই একাগ্রতা তৈরি হতে দেবে না। তালিমের সময় সে জিকিরের কথা মনে করাবে, জিকিরের সময় অন্য কাজের কথা মনে করাবে, দাওয়াতের সময় তিলাওয়াতের কথা মনে করাবে, আবার খেদমতের সময় দাওয়াতের কথা সামনে আনবে। এভাবে সে মানুষকে সর্বোত্তম কাজ থেকে সরিয়ে তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ (সময়য়ের অগ্রাধিকার অনুযায়ী) নেক আমলে ব্যস্ত রাখতে চেষ্টা করবে।
← আগের পর্ব (২৬১–২৮০) | সূচিপত্র | পরের পর্ব (৩০১–৩২০) →
সংগ্রহ ও সংকলন: মুশফিক আহমদ (রহঃ)-এর মালফুযাত সংকলন।
