|

মালফুযাত – প্রফেসর মুশফিক আহমদ (রহঃ) – পর্ব ১৪: ২৬১–২৮০

প্রফেসর মুশফিক আহমদ (রহঃ)-এর বয়ান, পরামর্শ, আমল ও দাওয়াতি জীবনের মালফুযাত, ২৬১ থেকে ২৮০ নম্বর। সম্পূর্ণ সূচিপত্র দেখুন।

সংগ্রহ ও সংকলন: মুশফিক আহমদ (রহঃ)-এর মালফুযাত সংকলন।

এই পর্বে যা আছে


২৬১. স্যার বলেন, বর্তমানে কেউ যখন এলেম অর্জনের জন্য কোনো…

স্যার বলেন, বর্তমানে কেউ যখন এলেম অর্জনের জন্য কোনো মাদ্রাসায় ভর্তি হতে যায় এবং উনাকে প্রশ্ন করা হয়, “আপনি কী শিখতে চান?”, তখন যদি সে উত্তর দেয়, “আমি ফিকহ শিখতে চাই”, তবে এই কথাতেই বোঝা যায় যে সে প্রকৃতপক্ষে এলেমের উপযুক্ত নয়। সে আসলে কিছু ‘মালুমাত’ বা তথ্য অর্জন করতে চায়। স্যার সহজভাবে বুঝিয়ে বলেন, মালুমাতের সঙ্গে এলেমের সম্পর্ক অনেকটা ঘাসের সঙ্গে দুধের সম্পর্কের মতো। ঘাস দুধের উৎস হতে পারে, কিন্তু ঘাস নিজেই দুধ নয়। ঘাস থেকে দুধ তৈরি হওয়ার প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত জটিল এবং এর জন্য বিশেষ যোগ্যতার প্রয়োজন, যা মানুষের জ্ঞানের প্রায় বাইরে। একটি ষাঁড় প্রচুর ঘাস খেলেও এক ফোঁটা দুধও দিতে পারে না। অন্যদিকে, গাভী দুধ দিতে পারে, তবে সব সময় নয়। গাভীর মধ্যে একটি বিশেষ ‘হালত’ বা ‘কাইফিয়ত’ থাকা চাই, গাভীর যদি অভ্যন্তরীণ সেই হালত থাকে, তবেই সে ঘাস থেকে দুধ উৎপন্ন করতে পারে। এই দুধ কোথা থেকে এসেছে? ঘাস থেকে নাকি গাভীর যোগ্যতা থেকে? এই প্রশ্ন রেখে স্যার বলেন, এই দুই বিষয়কে আলাদা করা কঠিন। স্যার উল্লেখ করেন, এখানে ঘাসের চেয়ে গাভীর যোগ্যতার অধিকার বেশি। কারণ গাভী অনেক সময় ঘাস ছাড়াও অন্যান্য জিনিস খেয়েও ভালো দুধ দেয়। আবার ছাগল সিগারেটের গোড়া, প্যাকেটের খোসা, এমনকি নাইলনের মোজা, দৈনিক পত্রিকা ইত্যাদি খেয়েও ভালো দুধ দেয়। এই দুধ আসলে আসে ছাগল বা গাভীর নিজস্ব বিশেষ যোগ্যতা বা বিশেষ হালাত থেকে। ঘাস বা অন্যান্য খানা উপকরণ কেবল সহায়ক মাধ্যম। স্যার বলেন, ইলমের ব্যাপারেও একই কথা প্রযোজ্য। কিতাব পড়তে পারা, ব্যাখ্যা করতে পারা, তথ্য সংগ্রহ করতে পারা, মালুমাত হাসিল হওয়া হতে পারে, কিন্তু যদি তার মধ্যে ইলম গ্রহণের যোগ্যতা না থাকে, ‘বিশেষ ওই হালাত’ না থাকে, তাহলে সত্যিকারের এলেম তার অন্তরে নাজিল হবে না। স্যার বোঝাতে চান, ঘাস একটা বাহ্যিক উপকরণ, কিন্তু আসল হলো প্রাণীর অন্তরীণ যোগ্যতা ও হালাত। সাহাবায়ে কিরাম ছিলেন নিরক্ষর, কিন্তু তাদের অন্তরে ছিল পরিশুদ্ধ, এবং কার্যকর ইলম। বই, বিভাগ ও মালুমাত কেবল বাহ্যিক উপকরণ, ইলম পাবার জন্য দরকার নিজের ওই বিশেষ হালাত (যোগ্যতা)। নয়তো মালুমাত কেবল ঘাসই থেকে যাবে, তা থেকে দুধ বের হবে না।

২৬২. এক মোযাকারায় স্যার বলেছিলেন– “তালিবে ইলম যদি তার অন্তরকে…

এক মোযাকারায় স্যার বলেছিলেন– “তালিবে ইলম যদি তার অন্তরকে আগে খালি না করে, যদি সে মনে করে ‘আমি জানি’, ‘আমি বুঝি আমি কী শিখতে চাই’, তাহলে তার ইলমের আরম্ভই জাহালতের উপর ভিত্তি করে গঠিত। সত্যিকার তালিব তো সে-ই, যে জানে, ‘আমি জানি না’।” স্যার ব্যাখ্যা করলেন, সূরা বাকারা কীভাবে আল্লাহ তাআলা এলেমের এ পাঠ দিয়েই শুরু করেছেন: “আলিফ-লাম-মীম। এই সেই কিতাব, এতে কোনো সন্দেহ নেই”। স্যার বলেন, “الٓمّٓ”, এটা দিয়ে আমরা কী বুঝি? কিছুই না। কেউই কিছু বুঝে না। কিন্তু তারপরেই আল্লাহ বলছেন, “لَا رَيْبَ فِيهِ”, এতে কোনো সন্দেহ নেই! এখানেই এলেমের মৌলিক দর্শন নিহিত, আমি কিছুই জানি না, কিছুই বুঝি না, কিন্তু যিনি শিক্ষা দিবেন, তার উপর আমার পূর্ণ আস্থা আছে। কি শিখাবেন, কখন শিখাবেন, কিভাবে শিখাবেন, আমি কিছুই জানি না। আমি শুধু তার দরজায় দাঁড়িয়ে আছি, হাত পেতে আছি। স্যার তখন প্রসঙ্গ আনলেন, হযরত মূসা আলাইহিস সালাম যখন এলেম হাসিলের উদ্দেশ্যে খিজির আলাইহিস সালাম-এর কাছে গেলেন, তখন কী বলেছিলেন? “তিনি বললেন, আমি কি আপনার অনুসরণ করতে পারি, যাতে আপনি আমাকে সেই এলেম শেখান, যা আপনাকে শিখানো হয়েছে?” هَلْ أَتَّبِعُكَ عَلَىٰ أَن تُعَلِّمَنِ مِمَّا عُلِّمْتَ رُشْدًا স্যার ইঙ্গিত করলেন– মূসা (আ.) বলেননি, “আপনি যে এলেম অর্জন করেছেন, তা আমাকে দিন”। বরং বলেছেন, “مِمَّا عُلِّمْتَ”, “যা আপনাকে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে”। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তিনি কোনো নির্দিষ্ট বিষয় চাননি, বলেননি, ‘আমাকে এইটা শিখান’, বরং বললেন, ‘আপনাকে যা দান করা হয়েছে, তা থেকে কিছু আমাকে দিন’। স্যার বোঝান, এটাই তো সত্যিকারের তালিবের ভাষা, “আমি জানি না আমি কী শিখব, আপনি জানেন।” স্যার বলেন, ধরে নেওয়া যাক, মুআয ইবনে জাবাল রাদিআল্লাহু তাআলা আনহু যিনি সাহাবীদের মধ্যে বড় মুফতি হিসেবে পরিচিত, যদি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে প্রশ্ন করতেন, “তুমি কী শিখতে চাও?” তিনি কখনো বলতেন না, “আমি ফতোয়া শিখতে চাই” বা “আমি ফিকহ শিখতে চাই”। বরং তার উত্তর হতো, “আমি জানি না”। এই আলোচনায় স্যার একটি মৌলিক আদবের দিক তুলে ধরেন। তিনি বলেন– “যে তালিব ওস্তাদকে বলে, ‘আমাকে হাদীস শিখান’, সে তো ওস্তাদকেই নির্দেশ দিচ্ছে। তাহলে ওস্তাদ কে? আর তালিব কে? যে নিজেই বলে দেয় ‘আমি কী শিখতে চাই’, সে তো নিজেরাই শিক্ষক হয়ে বসে আছে! তালিব হবে সে-ই, যে নিজের অন্তর খালি করে, বলে, ‘আপনি যা যথার্থ মনে করেন, তাই আমাকে শিখান।’ তবেই সে শিখবে।” ইলমের দরজায় প্রবেশ করতে হলে আগে নিজের ”জানি” দাবিকে ছেড়ে দিতে হয়। ”জানি না”, এই স্বীকারোক্তি দিয়েই ইলমের যাত্রা শুরু হয়। স্যার স্পষ্ট করেন, যিনি জানেন না, এবং জানেন তিনি জানেন না, তার জন্যই উম্মুক্ত থাকে আল্লাহর হিদায়াতের দরজা।

২৬৩. স্যার এলেমের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন: এলেম মানে তথ্য…

স্যার এলেমের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন: এলেম মানে তথ্য জমা বা তথ্য জানা (মালুমাত) নয়, এলেম হচ্ছে আল্লাহ পাকের সাথে একটি সম্পর্ক গড়ে তোলা। যে সম্পর্ক যার যত বেশি গভীর হবে, সে নিজেকে এই সম্পর্কের ক্ষেত্রে তত বেশি অযোগ্য মনে করবে। প্রকৃত এলেমের অধিকারী ব্যক্তি নিজের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে অধিক সচেতন থাকেন এবং অহংকারমুক্ত হন। এপ্রসঙ্গে আলোচনায় স্যার খলিফা হজরত ওমর রাদিআল্লাহু তাআলা আনহুর “খুতবাতুল জাবিয়াহ” থেকে প্রসঙ্গ আনেন। (সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কের পার্শ্ববর্তী এক ঐতিহাসিক এলাকা, জাবিয়াহ। এই স্থানেই এক অবিস্মরণীয় খুতবা প্রদান করেন ইসলামের দ্বিতীয় খলীফা, হযরত ওমর ইবনে খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু। ইতিহাসে এই খুতবা পরিচিত “খুতবাতুল জাবিয়াহ” নামে।) সে সময় ইসলাম চতুর্দিকে বিজয় লাভ করছিল। একের পর এক এলাকা মুসলিম শাসনের অন্তর্ভুক্ত হচ্ছিল। হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বিজিত অঞ্চলের বিভিন্ন বাহিনীর নেতৃস্থানীয় সাহাবিদের নিয়ে জাবিয়াতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেন। স্যার খলিফা হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, সেখানে খলিফা তার খুতবায় বলেন: “কোরআন শরীফ সম্বন্ধে যার কোনো প্রশ্ন আছে, সে যেন উবাই বিন কা’বের (রাদিআল্লাহু তাআলা আনহু) নিকট যায় (আল্লাহ তা’আলা উনাকে কোরআনের বিশেষ জ্ঞান দান করেছিলেন)। ফিকাহ সম্পর্কে যার কোনো প্রশ্ন আছে, সে যেন মু’আজ ইবনে জাবালের (রাদিআল্লাহু তাআলা আনহু) কাছে যায়। ফরায়েজ (উত্তরাধিকার আইন) বিষয়ে কারো কোনো প্রশ্ন থাকলে, সে যেন যায়েদ ইবনে সাবেতের (রাদিআল্লাহু তাআলা আনহু) কাছে যায়। আর যার টাকা-পয়সার দরকার আছে, সে যেন আমার নিকট আসে।” স্যার বোঝান, মুসলিম জাহানের সর্বোচ্চ বাক্তি হওয়া সত্ত্বেও হযরত উমর রাদিআল্লাহু তাআলা আনহু নিজেকে ইলমের কোনো বিশেষ যোগ্যতার অধিকারী মনে করেননি। তিনি নিজেকে কোরআন, ফিকাহ বা ফরায়েজের মতো মৌলিক ইসলামী জ্ঞানগুলোর জন্য অযোগ্য মনে করে সাহাবায়ে কেরামের সেইসব বিশেষজ্ঞদের দিকে মানুষকে নির্দেশ করেছেন। অথচ তিনি ছিলেন ইসলামের এক স্তম্ভস্বরূপ, যার এলেম, প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা আজও অতুলনীয়। দুনিয়াবি সম্পদ সম্পর্কে সাহাবাদের দৃষ্টিভঙ্গি স্যার এভাবে বোঝান, সাহাবাদের যুগে একটি প্রচলিত ধারণা ছিল যে, টাকা-পয়সা বা দুনিয়াবি সম্পদ ‘সাধারণ’ বা ‘ফালতু’ লোকের কাছে থাকে, আর তা কোনো ‘ভদ্র লোকের’ কাছে থাকা উচিত নয়। এই ধারণাটি তাদের দুনিয়াবিমুখতা এবং আখিরাতমুখী জীবনযাত্রার এক স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি। হযরত উমর রাদিআল্লাহু তাআলা আনহু নিজেও এই মানসিকতা ধারণ করতেন। উনার বক্তব্য স্পষ্টভাবে বোঝায়, তিনি এলেমের আসনে বসা নয়, বরং এলেমদারদের কদর করার আসনে ছিলেন। তাই তিনি বলেন: “টাকা-পয়সার জন্য যেন আমার কাছে আসে, কেননা আমি এইগুলি বহন করতে পারি।” অর্থাৎ, তিনি নিজেকে অর্থসম্পদের মতো (তুচ্ছ) দুনিয়াবি ভার বহনের জন্য যোগ্য মনে করতেন, কিন্তু ইলমের মতো মহৎ বিষয় নয়। তিনি নিজেকে ইলমের ব্যাপারে অযোগ্যই মনে করেছেন। ওমর রাদিআল্লাহু তাআলা আনহুর ইন্তেকালের পর আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিআল্লাহু তাআলা আনহু বলেছিলেন: ❝আজ দুনিয়া থেকে এলেমের দশ ভাগের নয় ভাগ উঠে গেল।❞ কী অসাধারণ উক্তি! যে মানুষ নিজেকে এলেমের জন্য অযোগ্য ভাবতেন, উনার মৃত্যুতে সাহাবীরা এলেম হারিয়ে যাওয়ার শোক প্রকাশ করেন। এই উক্তিটি হযরত উমর রাদিআল্লাহু তাআলা আনহুর এলমের গভীরতা ও উনার অসাধারণ ব্যক্তিত্বের এক সুস্পষ্ট প্রমাণ। অথচ উনি নিজে কখনও নিজেকে এভাবে দেখেননি, বরং সর্বদা বিনয়ের সাথে নিজের সীমাবদ্ধতার কথা বলেছেন। স্যার স্পষ্ট করেন, এটাই হলো সত্যিকারের এলেম। স্যার এই আলোচনার মাধ্যমে এলেমের প্রকৃত মর্মকে এভাবে তুলে ধরেন: এলেম কেবল কিতাবি জ্ঞান নয়, বরং তা হলো, আল্লাহর প্রতি গভীর ভালোবাসা, আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আনুগত্য ও বাধ্যতা, আল্লাহর বান্দা হিসেবে নিজের অযোগ্যতা উপলব্ধি করা, এবং আল্লাহর প্রকৃত বান্দা হওয়ার জন্য প্রবল আগ্রহ ও আকাঙ্ক্ষা। এই সব কিছু মিলেই গড়ে ওঠে সত্যিকারের ‘এলেম’।

২৬৪. স্যার এক বয়ানে ‘এলেম’ এবং ‘জ্ঞান’ (মালুমাত/ইনফরমেশন) এর মৌলিক…

স্যার এক বয়ানে ‘এলেম’ এবং ‘জ্ঞান’ (মালুমাত/ইনফরমেশন) এর মৌলিক পার্থক্য অত্যন্ত জোর দিয়ে তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, এদের পাত্রই ভিন্ন। ‘এলেম’-এর পাত্র হলো মানুষের ক্বলব (অন্তর/হৃদয়), আর ‘জ্ঞান’-এর পাত্র হলো মানুষের দেমাগ (মস্তিষ্ক/ব্রেন)। এই পার্থক্য বোঝাতে স্যার একটি উপমা ব্যবহার করেছেন। একজন পাউডার দুধ আনার জন্য বাজারে যাচ্ছে কাগজের ঠোঙ্গা নিয়ে, আরেকজন গ্রামের এক সহজ-সরল মানুষ, যিনি পাউডার দুধ সম্পর্কে কোনো ধারণা রাখেন না, একটি কাগজের ঠোঙ্গা নিয়ে বাজারে যাচ্ছেন দেখে তাকে জিজ্ঞেস করল, “ঠোঙ্গা নিয়ে কী আনতে যাও?” সে উত্তর দিল, “দুধ আনতে যাচ্ছি।” প্রশ্নকর্তা লোকটি স্বাভাবিক তরল দুধকেই দুধ হিসেবে জানে, তাই অবাক হবে, “দুধ আনতে যাচ্ছো? কাগজের ঠোঙ্গায় কীভাবে দুধ আনবে?” এই উপমার মাধ্যমে স্যার বোঝাতে চেয়েছেন যে, পাত্রের সাথে পাত্রে ধারণ করা বস্তুর গভীর সম্পর্ক রয়েছে। তরল দুধের জন্য কাগজের ঠোঙ্গা যেমন উপযুক্ত পাত্র নয়, তেমনি এলেমের জন্য মানুষের দেমাগ কোনভাবেই উপযুক্ত পাত্র নয়। এলেম ধারণের জন্য প্রয়োজন পবিত্র ক্বলব। এর বিপরীতে, জ্ঞানের পাত্র হলো মানুষের দেমাগ, ক্বলব নয়। স্যার বলেন, সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিআল্লাহু তা’আলা আনহু বলেছিলেন, “যে কারো অনুসরণ করতে চায়, সে যেন সাহাবীদের অনুসরণ করে, যারা দুনিয়া থেকে বিদায় হয়ে গেছেন।” তাদের বৈশিষ্ট্য কী ছিল? ইবনে মাসউদ রাদিআল্লাহু তা’আলা আনহু তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করেছেন: * ‘আব্বারাহা কুলুবান’ (أَبَرَّهَا قُلُوباً): তাদের ক্বলব ছিল সবচেয়ে বেশি পাক (পবিত্র)। * ‘আ’মাকাহা ইলমান’ (أَعْمَقَهَا عِلْماً): তাদের এলেম ছিল সবচেয়ে বেশি গভীর। * ‘আকাল্লাহা তাকাল্লুফান’ (أَقَلَّهَا تَكَلُّفاً): তাদের জীবন ছিল সবচেয়ে বেশি সরল-সাদাসিধে। স্যার অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে বলেন যে, এই তিনটি কথার সাথে জাগতিক জ্ঞানের (পাণ্ডিত্য, দর্শন, গণিত ইত্যাদি) কোনো সম্পর্ক নেই। একজন খ্যাতিমান চোর-ডাকাত বা অপরাধীও অত্যন্ত প্রতিভাবান বিজ্ঞানী বা দার্শনিক হতে পারে, হয়েছেও। স্যার এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন, মনের অপবিত্রতা বা ক্বলবের দূষণ জ্ঞান বা পাণ্ডিত্যের পথে কোনো অন্তরায় নয়। কিন্তু, ওইরকম একটি অপবিত্র ক্বলব দিয়ে ’এলেম’ অর্জন করা সম্ভব নয়। আল্লাহ তা’আলা সেই ক্বলবেই এলেম ঢালেন, যা পবিত্র। ক্বলব যত বেশি পাক হবে, তত বেশি এলেম সেখানে প্রবেশ করবে। স্যার বলেন, এই তথাকথিত মালুমাতের উদ্দেশ্যই হলো দুনিয়াবি বিনিময়, হয় অর্থ, না হয় প্রতিপত্তি (খাতির)। অর্থাৎ, এই জ্ঞান কেন চাওয়া হয়? হয় টাকার জন্য, নয়তো সম্মান-প্রতিপত্তির জন্য। অন্যদিকে, আল্লাহর পক্ষ থেকে যে ‘এলেম’ আসে, তা যত বেশি কেউ অর্জন করে, সে তত বেশি অপরিচিতি পছন্দ করে। সে না টাকা চায়, না সম্মান চায়, বরং একমাত্র আল্লাহর কাছে প্রিয় হওয়াই তার একমাত্র আকাঙ্ক্ষা। স্যার পরিষ্কার করেন, সম্পূর্ণ ভিন্ন এই দুটি জিনিস: একটি ক্বলবের পবিত্রতা ও আমলের প্রেরণা নিয়ে আসে, আর অন্যটি কেবল তথ্যের সমষ্টি এবং দুনিয়াবি স্বার্থের সাথে জড়িত।

২৬৫. এলেমের গভীরতা কী, তা বোঝাতে স্যার আবু তালহা রাদিআল্লাহু…

এলেমের গভীরতা কী, তা বোঝাতে স্যার আবু তালহা রাদিআল্লাহু তা’আলা আনহু, এর ঘটনা বর্ণনা করেন। একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মজলিসে তিনি উপস্থিত ছিলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোরআন শরীফের একটি আয়াত তেলাওয়াত করলেন: “لَن تَنَالُوا الْبِرَّ حَتَّىٰ تُنفِقُوا مِمَّا تُحِبُّونَ” [তোমরা কখনো পূর্ণতা (সচ্চরিত্রতা/পরহেযগারি) লাভ করতে পারবে না যতক্ষণ না তোমরা নিজের প্রিয় বস্তু আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করো।] আবু তালহা রাদিআল্লাহু তা’আলা আনহু আয়াত শুনে তাৎক্ষণিকভাবে জিজ্ঞেস করলেন, “আল্লাহ তা’আলা কি আমাদের প্রিয় জিনিস চান?” রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “হ্যাঁ।” তখন তিনি বললেন, “আমার সবচেয়ে প্রিয় জিনিস হলো আমার বাগান ‘বাইরুহা’।” এটি ছিল অত্যন্ত মূল্যবান একটি খেজুর বাগান, যেখানে সুপেয় পানির কূপও ছিল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেও এই বাগানে যেতেন এবং এর পানি পান করতেন, যা বাগানটির মূল্য ও মর্যাদা আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। আবু তালহা রাদিআল্লাহু তা’আলা আনহু দৃঢ়চিত্তে বললেন, “এটিই আমার সবচেয়ে প্রিয়, আমি এটিই আল্লাহর রাস্তায় সাদকা করব।” এবং তিনি তা-ই করলেন। স্যার উল্লেখ করলেন, এলেমের গভীরতা এইটা, শুধু শুনলেন, তা বুঝলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে আমল করলেন। অথচ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে তাকে বিশেষভাবে এই আমলটি করতে বলেছেন তা নয়, বলেননি। তিনি নিজেই নিজের নিকট তফসির করলেন, এই আয়াত তার জন্য নাযিল হয়েছে এবং তিনি এর ওপর আমল করতে আগ্রহী হলেন। স্যার এর বিপরীতে আধুনিক ‘এলেম’ বা তথাকথিত জ্ঞানচর্চার একটি চিত্র তুলে ধরেন। ধরা যাক কোনো আলেমকে উপরোক্ত আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো, তিনি হয়তো এর ব্যাখ্যায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বক্তৃতা দেবেন। আয়াতটি কখন নাযিল হয়েছে, এর শানে নুযুল কী, কোন কোন মুফাসসির এ বিষয়ে কী বলেছেন, তাদের অভিমত কী, এর বিস্তারিত ব্যাখ্যা, এসব তথ্য দিয়ে তিনি দীর্ঘ সময় পার করবেন। আর যদি তিনি এক ধাপ এগিয়ে থাকেন, তবে সেই ঘণ্টার পর ঘণ্টার বক্তৃতার জন্য বিশাল অংকের ফিও দাবি করবেন। স্যার বলেন, আবু তালহা রাদিআল্লাহু তাআলা আনহু কিছু বলেননি, বিস্তারিত তফসিরে যান নাই, তবে নিজের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদ আল্লাহর রাস্তায় দিয়ে দিলেন। এটাই ছিল এলেম, আয়াত শোনার সঙ্গে সঙ্গে হৃদয়ে গ্রহণ, এবং তৎক্ষণাৎ আমল। উনাকে কেউ বলেননি, “তুমি এই বাগান দান করো।” তিনি নিজেই হৃদয়ের গভীরতা থেকে বুঝলেন, আল্লাহ আমার কাছেই বলছেন। স্যার বলেন, “এটাই এলমের গভীরতা।”

২৬৬. একটি বয়ানে স্যার বলেন, আল্লাহর কোনো নিয়ামত বা অনুগ্রহ…

একটি বয়ানে স্যার বলেন, আল্লাহর কোনো নিয়ামত বা অনুগ্রহ যখন অন্তরে আনন্দ সৃষ্টি করে, সেই আনন্দই হলো শুকর বা শুকরিয়া (এটি শুধু মুখের “আলহামদুলিল্লাহ” নয়, বরং অন্তরের এক গভীর উপলব্ধি।) অনেক সময় মানুষ উত্তম কোনো জিনিস পায়, বড় এক নিয়ামতের মালিক হয়েও বুঝতে পারে না যে এটি আদৌ বড় কিছু। মূল্য উপলব্ধির অভাবেই সে শুকর আদায় করে না। অথচ যদি সে ঠিকমতো অনুধাবন করত, কি পেয়েছি, কে দিয়েছে, কত বড় সম্পদ, তাহলে নিশ্চয়ই তার অন্তর কেঁপে উঠত, চোখে পানি আসত, আর শুকরিয়া আদায় করত। এই প্রসঙ্গে স্যার এমন একটি গল্প বলেন, যা হৃদয়কে গভীরভাবে স্পর্শ করে। এক দরবেশ, আল্লাহ পাকের ঘনিষ্ঠ বান্দা, বড় ওলি আল্লাহ ছিলেন। যিনি কয়েকদিন ধরে উপবাসে ছিলেন, ক্ষুধায় কষ্ট পাচ্ছিলেন। শহরে কিছুই পাচ্ছিলেন না খাওয়ার মতো। তখন ভাবলেন, শহরের বাইরে চলে যাই, জঙ্গলে গিয়ে গাছের পাতা খেয়ে অন্তত পেট বাঁচাই। সেই যুগে শহরের চারপাশে উঁচু দেয়াল থাকত, প্রবেশ বা প্রস্থান ছিল নির্দিষ্ট গেট দিয়ে। দরজাগুলো পাহারায় থাকত। তিনি শহর ছাড়তে চাইলেন, কিন্তু দেখলেন গেট বন্ধ। জানতে চাইলেন, কেন? জবাব এলো, রাজা তার একটি প্রিয় বাজপাখি হারিয়েছেন, সেটি যেন বাইরে না পালিয়ে যায়, এই জন্য গেট বন্ধ রাখা হয়েছে। এই কথা শুনে ওই দরবেশ চমকে উঠলেন, “কি অবোধ লোক এই রাজা! পাখি তো আকাশপথে উড়ে যায়, গেট বন্ধ করে কীভাবে তাকে আটকাবে?” এই বিস্ময়ের সাথে সাথে তার মনে এক প্রশ্ন জাগে, “আল্লাহ্! এটা কেমন বণ্টন? আমার এতো জ্ঞান-বুদ্ধি, এলম-তাকওয়া থাকা সত্ত্বেও আমি তিন-চার দিন অনাহারে, আর এমন নির্বোধ একজন লোক দেশের বাদশা! এটা কি ইনসাফ?” তার অন্তরে এই চিন্তা উদিত হতেই, আল্লাহর পক্ষ থেকে এক ইলহাম হলো। তাকে জিজ্ঞেস করা হলো: “তুমি যদি এই বণ্টন পছন্দ না করো, আমি বদলে দিই? তুমি হয়ে যাও রাজা, অন্ধকার মস্তিষ্কের অধিকারী, বুদ্ধিবিবেকহীন; আর তোমার সমস্ত এলম, তাফাক্কুর, আমার দিকে ধাবমান হৃদয়, আমি ওই রাজার হাতে দিয়ে দিই? রাজি আছো?” এই ইলহাম শুনেই তার অন্তর কেঁপে উঠল। বুঝলেন, কী ভয়ানক ভুল ভেবেছিলেন। আল্লাহর বণ্টনেই যে শ্রেষ্ঠতা লুকায়িত, তা বুঝে তিনি তাওবা করলেন, ইস্তেগফার করলেন, কাঁদতে কাঁদতে বললেন: “আয় আল্লাহ! আমি তোমার বণ্টনে সন্তুষ্ট। তোমার বণ্টনই আমার জন্য সর্বোত্তম।” দৃষ্টি কোথায় থাকা দরকার, এইকথা বোঝাতে স্যার বলেন, মানুষ অনেক সময় যে জিনিসটি পায়নি, তার পেছনে বেশি মনোযোগ দেয়, দুঃখ পায়, আফসোস করে। অথচ আল্লাহ তাকে যে অফুরন্ত নেয়ামত দিয়েছেন, যার কোনো তুলনা নেই, তার দিকে তাকায়ই না। স্যার বোঝান, এই দরবেশ, তিনি ক্ষুধায় ছিলেন, খাবার ছিল না। কিন্তু তার অন্তরে ছিল আল্লাহর নূর, ইলম, চিন্তার গভীরতা, হৃদয়ের আলো। তিনি জানতেন কে তার রব, কেন তিনি পৃথিবীতে আছেন। তিনি ছিলেন সেই রাজা থেকে অযুত গুণে ধনবান। কিন্তু সাময়িক কষ্টে পড়ে তিনি ভুলেই গিয়েছিলেন, আসল সম্পদ কি, আর কে দিয়েছেন তা। এই ঘটনাটির মধ্য দিয়ে স্যার শিখিয়ে দেন, শুকর শুধুমাত্র পাওয়া নয়, বরং উপলব্ধির ফল। অনেকেই পায়, কিন্তু অনুধাবন করে না। (যে উপলব্ধি করতে পারে, সে গরিব হলেও ধনবান; আর যে উপলব্ধি করে না, সে ধনবান হয়েও গরিব।)

২৬৭. স্যার এক বয়ানে বলছিলেন, আল্লাহ তাআলার বড় একটি নিয়ামত…

স্যার এক বয়ানে বলছিলেন, আল্লাহ তাআলার বড় একটি নিয়ামত মানুষের ওপর হলো তার এলেম। কিন্তু আমরা আজকাল এলেম বলতে যা বুঝি, ওই বাকপটুতা, বক বক করতে পাড়া, বলতে পারা, ব্যাখ্যা করতে পারা, যে যত বকতে পারে, সে তত বড় আলেম! যে যত আলোচনা করতে পারে, তাকে তত বেশি জানে বলে মনে করা হয়। যে যত কথা বলতে পারে, তার এলেমকে তত উচ্চমার্গীয় ভাবা হয়। তার বয়ান বক্তৃতা উনাকে বাচাল করে তোলে, যেখানেই যায়, সেখানেই সে কথা বলতে চায়, যাতে মানুষ তাকে ‘আলেম’ মনে করে। যেন কথা না বললে আলেম বলেই গণ্য হবে না। স্যার বলেন এইটাকে দীনের ময়দানে, ইসলামে, এলেম বলা হয় না, এলেম মানে কেবল মুখে বলা নয়, বরং এলেম মনের একটা অবস্থার নাম, অন্তরের এক নিরব গভীর উপলব্ধি, হৃদয়ের একটি বিশেষ অবস্থা। এই প্রসঙ্গে স্যার এক মহামূল্যবান ঘটনা উল্লেখ করেন, যা সাহাবি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু, এর জীবনের এক মুহূর্ত থেকে নেওয়া। তিনি ছিলেন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাচাতো ভাই, এবং তরুণ সাহাবিদের মধ্যে অন্যতম, যাঁকে “তর্জুমানুল কুরআন” (কুরআনের ব্যাখ্যাকারী) এবং “হিবরুল উম্মাহ” (উম্মতের পণ্ডিত) বলা হতো। তখন তিনি ছিলেন বয়সে বৃদ্ধ, দৃষ্টিশক্তিও হারিয়ে ফেলেছিলেন। তখন একবার এক মজলিসে কিছু যুবককে উচ্চস্বরে আলোচনা করতে দেখলেন। তিনি তাদের কাছে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন এবং সেখানে গিয়ে কিছু নসিহত পেশ করলেন। সাহাবায়ে কেরাম সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বললেন, “তোমাদের চেয়ে উত্তম ব্যক্তিদের আমি দেখেছি (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, এর সাহাবীগণ) অধিকাংশ সময়ে নীরব থাকতেন। উনারা বোবা ছিলেন না; বরং উনাদের এলেমই উনাদেরকে বোবা বানিয়ে দিয়েছিল (নীরব করে রেখেছিল)।” স্যার বলেন, সাহাবিদের নীরবতা ছিল অজ্ঞতার কারণে নয়, বরং অন্তর্দৃষ্টির কারণে। তাদের এলম এত গভীর ছিল, যে তারা প্রতিটি কথা বলার আগে বারবার চিন্তা করতেন, এই কথাটি আল্লাহর সামনে কতটা গ্রহণযোগ্য, এতে ফিতনা আছে কি না, অহংকার লুকিয়ে আছে কি না। ফলে অনেক সময় তারা বলার মতো কিছু থেকেও চুপ থাকতেন। ইলমের গভীরতা মানুষকে প্রতিটি কথা বলার আগে সতর্ক করে তোলে। এই সতর্কতার কারণে তার মনে হয়, নিজের ইলমের তুলনায় মুখের অনেক কথাই হয়তো অনর্থক। ফলে সে চাইলেও অনেক কথা বলতে পারে না। স্যার বোঝান, আল্লাহ তাআলা যাকে ইলম দান করেন, উনার এলেম উনাকে আল্লাহর রাস্তা চিনিয়ে দেয়, শয়তানের ধোঁকা চিনিয়ে দেয়, রিয়ার গন্ধ আগেই ধরিয়ে দেয়। তার ইলম যত গভীর হয়, দ্বীনের পথে চলা তার জন্য তত সহজ হয়। তার এই জানাটাই (এলেম) তাকে নির্দেশনা দান করে নিরবতার, সংযমের ও আমলের পথে।

২৬৮. জামালপুরের এক ভাই যিনি সাধ্যমতো দাওয়াতের মেহনত করতেন। ভাইটির…

জামালপুরের এক ভাই যিনি সাধ্যমতো দাওয়াতের মেহনত করতেন। ভাইটির মাঝখানে বাৎসরিক চিল্লায় এক ধরনের গ্যাপ (কাযা) হয়ে গিয়েছিল, তার বাৎসরিক চিল্লায় যেতে অসুবিধা হচ্ছিল, নানা পারিবারিক দায়িত্ব, ঝামেলা আর পারিপার্শ্বিক সমস্যার কারণে চাইলেও বের হতে পারছিলেন না। তিনি স্যারের সাথে পরামর্শ করতে এসেছিলেন। স্যার তাকে চিল্লায় জামাতে বের হয়ে যাওয়ার জন্য বললেন। স্যার তাকে গভীর মমতার সাথে বোঝালেন, স্যার বললেন, মানুষ মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচার জন্য যেমন প্রাণপণে ছোটে, যেভাবে প্রাণপণে দৌড় দেয়, এখন তোমার চিল্লায় বের হওয়ার জন্য ঐভাবে চেষ্টা করা দরকার, ছুটে বেরিয়ে পড়া দরকার। আল্লাহর পথে বের হওয়ার জন্য আমাদের এমন একনিষ্ঠতা ও প্রচেষ্টা থাকা উচিত।

২৬৯. হজরত মূসা আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উদাহরণ দিয়ে এক…

হজরত মূসা আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উদাহরণ দিয়ে এক বয়ানে স্যার উল্লেখ করেন: কেউ যদি লাঠিকে সাপ দেখে, তবে সেই লাঠির প্রতি তার কোনো আকাঙ্ক্ষা থাকবে না। আবার যদি সাপকে লাঠি দেখে, তবে সে ঐ সাপকেও ভয় পাবে না। অর্থাৎ, বস্তুর প্রকৃত হাকিকত বা এলম জেনে গেলে (অন্তরের দৃষ্টি খুলে গেলে) তার প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ বদলে যায়। স্যার বলেন, فَإِذَا هِيَ حَيَّةٌ تَسْعَىٰ, হঠাৎ উনার লাঠি এক চলমান সাপ হয়ে গেল (দ্রুতগামী, ভয়ঙ্কর চঞ্চল এক সাপ)। এই জিনিসটি মূসা আলাইহি ওয়া সাল্লাম, এর জন্য এক বিশেষ এলেম হাসিল করার উসিলা ছিল। ঐ মুহূর্তে উনার উপর আল্লাহ তা’আলার একটি বড় হুকুম আরোপিত হয়েছিল। উনার লাঠি ছিল অতি প্রিয় এবং উপকারী জিনিস। তিনি এর উপর ভর করে দাঁড়াতেন, ছাগলের জন্য পাতা ঝরাতেন এবং আরও অনেক কাজে এটি ব্যবহার করতেন। এটি ছিল উনার নির্ভরতার প্রতীক। আল্লাহ পাকের ঐ হুকুমে তিনি এই প্রিয় ও নির্ভরশীল জিনিসটিকে বিনা দ্বিধায় যখন ছেড়ে দিলেন, আল্লাহ তা’আলা উনার এই ত্যাগকে কবুল করলেন এবং উনাকে সবচেয়ে বড় জ্ঞান ও নিয়ামত দান করলেন, যা সাধারণ মানুষের চোখে পড়ে না। সেই জ্ঞান ও নিয়ামত হলো যে সেই জিনিসের হাকিকত (প্রকৃত সত্তা, গাইবের দেখা) উনাকে দেখালেন। স্যার বলেন, আল্লাহ তা’আলা যেরকম মূসা আলাইহি ওয়া সাল্লাম, এর উপকারী ও ভরসার জিনিস বিসর্জন দেওয়াকে কবুল করে উনার চোখের পর্দাকে সরিয়ে দিয়েছিলেন। এ রকম জ্ঞান আল্লাহ তা’আলা অন্যান্য নবীদেরকেও দান করেছিলেন। আল্লাহ তা’আলা ইব্রাহিম আলাইহি ওয়া সাল্লামকেও আসমান, জমিনের মালাকুত অর্থাৎ গাইবের জগৎ দেখিয়েছিলেন। وَكَذَٰلِكَ نُرِيٓ إِبْرَٰهِيمَ مَلَكُوتَ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضِ وَلِيَكُونَ مِنَ ٱلۡمُوقِنِينَ এভাবে আমি ইব্রাহিমকে আসমান ও জমিনের মালাকুত (রহস্যময় জগৎ) দেখালাম, যেন সে দৃঢ় বিশ্বাসীদের অন্তর্ভুক্ত হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মেরাজে নিয়ে আল্লাহ পাক হাকিকত দেখিয়েছিলেন। এখানে স্যার ব্যাখ্যা করেন যে, দৃষ্টির অন্ধত্ব এবং অন্তরের অন্ধত্ব, এ দুটি ভিন্ন বিষয়। মানুষ কেবল চোখের দেখায় সীমাবদ্ধ থাকলে প্রকৃত সত্য অনুধাবন করতে পারে না। স্যার বলেছেন যে, আল্লাহ তা’আলা মূসা আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অন্তরের (কলবের) দেখা দেখিয়েছিলেন, যা বাইরের দৃষ্টির আড়ালে থাকা এক ভিন্ন সত্যের জগৎ। যখন আল্লাহ তা’আলা মূসা আলাইহি ওয়া সাল্লামকে উনার হাতের লাঠি ফেলে দিতে বললেন, তিনি দ্বিধা না করে তা ফেলে দিলেন। আর যখন তিনি তা ফেললেন, তখন লাঠির মধ্যে এমন এক জিনিস দেখলেন যা তিনি পূর্বে কখনো দেখেননি। “فَإِذَا هِيَ حَيَّةٌ تَسْعَىٰ”, এক চলমান সাপ। স্যার বলেন, আল্লাহ তা’আলা বড় মেহেরবানী করে আমাদের দ্বীন দান করেছেন। যত বেশি আমরা এই দ্বীনের পথে চলবো, আল্লাহর হুকুমের উপর আমল করবো, এবং প্রিয় জিনিসকে ছাড়তে পারবো (অর্থাৎ আল্লাহর জন্য ত্যাগ স্বীকার করবো), আল্লাহ তা’আলা তত বেশি আমাদের চোখের পর্দাকে হটিয়ে দিবেন, আসবাবের (বস্তুগত উপায় উপকরণ) হাকিকত আমাদের সামনে খুলে দেবেন, এবং অজানা জিনিস আমাদেরকে জানবার তৌফিক দান করবেন। আর যখন এই শুদ্ধ জ্ঞান (এলেম) আসবে, তখন উনার জন্য পথ চলা সহজ হবে। এই জ্ঞান মানুষকে শুধু বাহ্যিক দৃষ্টি থেকে মুক্ত করে না, বরং অভ্যন্তরীণ সত্য ও রহস্য উন্মোচন করে, যা তাকে আল্লাহর পথে অবিচল থাকতে এবং সকল পরিস্থিতিতে দৃঢ় থাকতে সাহায্য করে। স্যার বলেন, এই এলম লাভের কারণেই হযরত মূসা আলাইহি ওয়া সাল্লাম বনি ইসরাঈলকে নিয়ে যখন সমুদ্র এবং ফেরাউনের বাহিনীর মাঝখানে পড়েছিলেন, তখন তিনি ভয় পাননি। কারণ তিনি সমুদ্রের হাকিকত জানতেন এবং ফেরাউনের বাহিনীর হাকিকতও জানতেন। সামনে সমুদ্র পেছনে ফেরাউনের বাহিনী, যেনো এক জাতাকলে দুই দিক থেকে চাপা খাওয়ার দশা, কিন্তু উনি খুব স্থির, উনি নিশ্চিন্ত, উনার অন্তরের দৃষ্টিতে সবকিছু পরিষ্কার ছিল, কোন বিচলিত ছিলেন না।

২৭০. স্যার একবার বলেন, জ্ঞান এমন কিছু, যা কেউ অর্জন…

স্যার একবার বলেন, জ্ঞান এমন কিছু, যা কেউ অর্জন করে টাকার বিনিময়ে, পায় টাকার জন্য, কেউ মানুষের প্রশংসার জন্য। এই জ্ঞান বিক্রি হয়- বক্তৃতার মাধ্যমে, লেখার মাধ্যমে, সম্মেলনের মাধ্যমে। কিন্তু আল্লাহর পক্ষ থেকে যে এলেম আসে, তা কেউ বিক্রি করে না, প্রকাশ করেও অহংকার করে না। বরং সেই ব্যক্তি চায়, “এই এলেম আমার হৃদয়ে থাকুক, আমি যেন আল্লাহর প্রিয় বান্দা হতে পারি।”

২৭১. শাহ আলম ভাই বলেন: ১৯৯৫ সালের টঙ্গী ইজতেমায় আমি…

শাহ আলম ভাই বলেন: ১৯৯৫ সালের টঙ্গী ইজতেমায় আমি আমার শ্বশুরের (আনোয়ারুল আযীম সাহেব) সাথে দেখা করতে যাই। তখন তিনি বললেন-‘তুমি আসরের সময়ে এসো, আছরবাদ তোমাকে মুফতী জয়নাল আবেদীন সাহেব, ভাই আব্দুল ওয়াহাব সাহেব, পাকিস্তানের মুরব্বীদের সাথে দেখা করাবো।’ আমি শ্বশুরকে জানালাম-ইনশাআল্লাহ আসবো। পরে স্যারের কাছে এসে সব ঘটনা বললাম, এবং প্রশ্ন করলাম যে-এত বড় বড় মাপের মুরব্বীদের সাথে দেখা করা, তাদের কাছে যাওয়া, বা তাদের সাথে পরিচিত হওয়া আমার জন্য ঠিক হবে কিনা? আমি যাব কিনা? স্যার বললেন: ‘হ্যাঁ, যেতে পারো। তবে নিয়ত করবে, ওলামাদের সাথে সাক্ষাৎ করা ইবাদত, তাদের জিয়ারত করা ইবাদত। এবাদতের নিয়তে যেও।’ সাথে সাথে স্যার বললেন, ‘তবে একটা সতর্কতা আছে।’ শাহ আলম ভাই জানতে চাইলেন, ’স্যার, কী সতর্কতা?’ স্যার উত্তর দিলেন, “তোমার শ্বশুর যখন উনাদের কাছে নিয়ে যাবেন, উনারা তোমার সাথে মুসাফাহা করবেন, কিছু হাদিয়া দিতে পারেন, কিছু নাস্তাও করাতে পারেন। তখন শয়তান যেন তোমাকে এই বুঝ না দেয় যে, ‘আমি আর সাধারণ শাহ আলম নই, আমাকে পাকিস্তানের আমীর হাদিয়া দেন, মুফতি জয়নাল আবেদীন সাহেব নাস্তা করান। আমি তো একটা বিশেষ পর্যায়ের, একটা বিশেষ লেভেলের সাথী, এতোবড় মুরব্বীদের সাথে চলা (নিকটবর্তী হওয়া)।’ এই ধরনের চিন্তা যদি অন্তরে আসে, তবে তা ধ্বংসের কারণ হতে পারে, এই ধরনের আত্মগর্ব বা মাকামের চিন্তা যদি অন্তরে জন্ম নেয়-তাহলে সারা জীবনের ধ্বংসের জন্য এটুকুই যথেষ্ট।” শাহ আলম ভাই বলেন: স্যার এভাবেই বোঝালেন-আমাদের দীল সবসময় কোন দিকে যাচ্ছে, সেটার প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখা জরুরি। কারণ, আত্ম-অহংকার বা বিশেষত্বের অনুভূতি আমাদের ইবাদত ও দ্বীনের পথে বাধা তৈরি করে। দীল যেন সর্বদা আল্লাহমুখী থাকে, সেজন্য দীলের দিকে সতর্ক নজর রাখা দরকার।

২৭২. একবার স্যার বলেন, কোন বিষয়ের আসল এলেম হলো ঐ…

একবার স্যার বলেন, কোন বিষয়ের আসল এলেম হলো ঐ বিষয় বা জিনিসকে তার প্রকৃত রূপে চেনা। এই এলেম অর্জন হয় ত্যাগের মাধ্যমে। যত বেশি প্রিয় জিনিস ত্যাগ করা যায়, আল্লাহর রাস্তায় মেহনত করা যায়, তত বেশি আল্লাহ সেই অন্তর, জ্ঞান (আসবাবের প্রকৃত রূপ), সেই হকিকতের দৃষ্টি দান করেন। مَثَلُ ٱلَّذِينَ ٱتَّخَذُوا۟ مِن دُونِ ٱللَّهِ أَوْلِيَآءَ كَمَثَلِ ٱلْعَنكَبُوتِ ٱتَّخَذَتْ بَيْتًۭا ۖ وَإِنَّ أَوْهَنَ ٱلْبُيُوتِ لَبَيْتُ ٱلْعَنكَبُوتِ ۖ لَوْ كَانُوا۟ يَعْلَمُونَ “যারা আল্লাহকে ছেড়ে অন্য অভিভাবক গ্রহণ করে, তাদের দৃষ্টান্ত মাকড়সার মতো, যে একটি ঘর তৈরি করে। আর নিঃসন্দেহে সব ঘরের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল ঘর হলো মাকড়সার ঘর, যদি তারা বুঝত!” স্যার বলেন, বাহ্যিকভাবে তো সবাই জানে মাকড়সার জাল দুর্বল। এটা তো এমন কোনো অজানা তথ্য নয়। কিন্তু আল্লাহ তাআলা বলছেন: “لَوْ كَانُوا يَعْلَمُونَ”, “যদি তারা জানত!” অর্থাৎ, এই জানাটা বাহ্যিক জানা নয়; এটি এমন এক জানার কথা, যা অন্তরকে কাঁপিয়ে তোলে, জীবন বদলে দেয়। এই জানাটা হলো, ফেরাউনের শক্তি, নমরুদের রাজত্ব, আমাদের টাকাপয়সা, ক্ষমতা, দুনিয়ার আড়ম্বর, সবই আসলে একেকটা মাকড়সার জালের মতো দুর্বল। বাহ্যিক চোখে এগুলো বড় ও শক্তিশালী মনে হয়, কিন্তু অন্তরের চোখ (হকিকতের দৃষ্টি) খুললে বোঝা যায়, এগুলো বাস্তবে কিছুই নয়। স্যার বলেন, আল্লাহ তাআলা হজরত মূসা আলাইহিস সালামকে এক চরম বাস্তবতা উপলব্ধি করিয়ে দেন। তিনি যে লাঠিকে এতদিন ধরে উপকারী জিনিস মনে করতেন, যেটা উনার প্রিয় ছিল, যেটার ওপর তিনি নির্ভর করতেন, আল্লাহ তা এক মুহূর্তে সাপ বানিয়ে দেন। কিন্তু এরপর আল্লাহ তাআলা সেই সাপও আবার লাঠি বানিয়ে দেন। এই এলেম পাওয়ার পর মূসা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে সব কিছুর হকিকত পরিষ্কার হয়ে যায়। সাগর আর ফেরাউনের বাহিনী, দুই দিক থেকেই ঘেরা পরিস্থিতিতে তিনি একটুও ভয় পাননি। কারণ, তিনি জানতেন, এগুলোও তো সেই মাকড়সার জালের মতো, বাহ্যিক দৃষ্টিতে যতই বিশাল হোক না কেন। হজরত মূসা আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: إِنَّ مَعِىَ رَبِّى سَيَهْدِينِ “আমার সাথে আমার প্রভু আছেন, তিনি আমাকে পথ দেখাবেন।” স্যার খুব জোড় দিয়ে বলেন, লাঠি আসলে লাঠি নয়, আবার সাপও সাপ নয়। বাহ্যিক রূপ যেমন বদলে যায়, তেমনি বাস্তবতাও (আসবাবের কার্যকারিতা) একমাত্র আল্লাহর হুকুমেই নির্ধারিত হয়। হাকিকি এলেম এটাই শেখায়, কোনো কিছু নিজ থেকে কিছু নয়। না উপকারী, না ক্ষতিকর। সবই আল্লাহর হুকুমে কার্যকর।

২৭৩. আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০০৩ সালে আলিগড়ের প্রফেসরদের চার…

আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০০৩ সালে আলিগড়ের প্রফেসরদের চার মাসের জামাত বাংলাদেশে এলে স্যার তাকাজা রেখে এক মাসের জন্য সেই জামাতের রুখ রাজশাহীতে নেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোর মসজিদগুলোতে সেই জামাত থাকাকালীন স্যার ছামানা সহ জামাতের সাথে ছিলেন। জামাতের সাথী মুস্তাফা কামাল সাহেব বলেন, উনার (স্যারের) উপস্থিতির কারণে আমরা আমলের সময় খুব সতর্ক থাকতাম, কারণ তিনি তালিমের সঠিক সময়ে অজু ও নফল সেরে বসে পড়তেন। তিনি নিজের থেকে কিছুই বলতেন না এবং খুব বেশি চুপচাপ থাকতেন। আমরা ভাবতাম, উনি হয়তো কোনো টেনশনে আছেন, কিন্তু ছাত্রদের কাছে জানলাম-উনি স্বভাবগতই চুপচাপ থাকেন। তিনি আমাদের বয়ান উর্দু থেকে বাংলায় তরজমা করতেন, তবে নিজে থেকে বয়ান করতে রাজি হতেন না। সাথীদের পক্ষ থেকে উনার বয়ানের রায় দেওয়া হলে উনি বলতেন “এখানকার ছাত্ররা আপনাদের কাছ থেকে উর্দুতে বয়ান শোনার জন্য আগ্রহী হয়ে আছে।” আমরা কাজের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে তিনি সংক্ষিপ্ত উত্তর দিতেন, যাতে আমাদের সন্তুষ্টি পূর্ণ হতো না। একদিন আমাদের আমীর সাহেব বললেন, আপনি কিছু বক্তব্য রাখুন আমাদের জামাতের সাথীদের জন্য, তখনও তিনি সহজে রাজি না হয়ে বললেন- “আমি আমার বন্ধুর কাছে শেখা পুরোনো সবক আবার স্মরণ করার জন্য আলিগড়ের উস্তাদ সানাউল্লাহর জামাতে জুড়েছি।” অনেক অনুরোধ করার পরে তিনি কিছু কথা বলেছিলেন।

২৭৪. স্যার বলেন, আওয়াম (সাধারণ জনগণ) দলিলের দ্বারা নয়, মহব্বতের…

স্যার বলেন, আওয়াম (সাধারণ জনগণ) দলিলের দ্বারা নয়, মহব্বতের দ্বারা কাছে আসবে। আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম নিজেদের উম্মতগণকে দাওয়াত দিতেন দলিলের সাথে নয়, বরং মহব্বতের সহিত। দ্বীনের উপর মজবুত করার জন্য ফাযায়েলের সাথে দলিল পেশ করতেন। নিজের উম্মতের প্রতি সমস্ত নবীর অস্বাভাবিক মহব্বত ছিল, যা আল্লাহ পাক কুরআন শরীফে বর্ণনা করেছেন। নিজের সন্তানের প্রতি যে মহব্বত হয় তার থেকেও অনেক বেশি মহব্বত উম্মতের প্রতি নবীদের হতো। এ কথা বলে স্যার নিজের একটি কারগুজারী শোনালেন। ফ্রান্সে থাকাকালীন এদিক-ওদিক থেকে সাক্ষাতের প্রচুর তাকাজা আসতেই থাকত। তখন খুব প্রয়োজন দেখা দিল একটি চার চাকার গাড়ির, যাতে যেকোনো সময় প্রয়োজন হলে সহজে ব্যবহার করা যায়। ওখানে তখন সুদ ছাড়া কিস্তিতে গাড়ি কেনা যেত। স্যার বলেন-প্রয়োজনের তাগিদে আমি তিন কিস্তিতে গাড়ি কিনে ফেললাম। সেই গাড়ি আমাদের খুব কাজে এলো। দুই কিস্তি পরিশোধের পর তৃতীয় কিস্তি দেওয়ার টাকা আমি জোগাড় করতে পারলাম না। কিস্তি জমা দেওয়ার শেষ তারিখ কাছাকাছি চলে আসায় খুব চিন্তিত হয়ে পড়লাম-গাড়ি হাতছাড়া হয়ে যাবে ভেবে। সানাউল্লাহ সাহেব এ কথা জানতেন না যে, গাড়িটি কিস্তিতে কিনেছি। আমাকে চিন্তিত দেখে সানাউল্লাহ বারবার জিজ্ঞেস করতে লাগলেন কারণ কী। শেষে তাকে সব বললাম। শুনে আমার থেকেও বেশি সানাউল্লাহ চিন্তিত হয়ে পড়লেন। তাকে চিন্তিত দেখে আমাদের এক আরব বন্ধু, যিনি প্রায়ই সাক্ষাত (গাস্তে রাহবারি) করাতেন, তিনি তার চিন্তার কারণ জানতে চাইলেন। তাকেও বলতে হলো। তখন আর কী, পরের দিনই ঐ আরব বন্ধু ও এক ফরাসি বন্ধু মিলে তৃতীয় কিস্তি পরিশোধ করে দিলেন এবং খুব খুশিও হলেন এই কারণে যে, তারা আমাদের কোনো কাজে আসতে পেরেছেন (এই উপকার করতে পেরে)। সেই কিস্তির টাকা পরবর্তীতে অনেক অনুরোধ সত্ত্বেও তারা ফেরত নেননি। স্যার বলেন, দ্বীনের কাজ করনেওয়ালাদের আপোষের মধ্যে এত বেশি মহব্বত সৃষ্টি হয় যে একজন মুসলমান আরেকজন মুসলমানের চিন্তাকে নিজের চিন্তা বানিয়ে নেয়। কথায় জোর দিয়ে স্যার বলেন-বলতেই হয়, অবশ্যই এমন হওয়া উচিত।

২৭৫. মোহাম্মদপুরে মুফতি মনসুরুল হক সাহেব যখন জামিয়াতুল আবরার রাহমানিয়া…

মোহাম্মদপুরে মুফতি মনসুরুল হক সাহেব যখন জামিয়াতুল আবরার রাহমানিয়া নামে নতুন মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন, তখন কোনো এক সময়ে স্যার সেখানে গমন করেন। (নব্বইয়ের দশকের শেষ ভাগ, সঠিক সাল তারিখ মনে নেই, শাহ আলম ভাই বলেন) মাদরাসার ওস্তাদদের একত্র করে মুফতি সাহেব স্যারকে কিছু কথা বলার অনুরোধ জানান। স্যার কথা শুরু করলে, মুফতি সাহেব নিজেও সামনে বসে মনোযোগ দিয়ে শুনতে থাকেন। স্যার তখন অত্যন্ত দরদভরা কণ্ঠে বলেন: “আপনারা আলেম-ওলামা, মাদরাসার খেদমতে নিয়োজিত। মাদরাসার নিজস্ব অনেক ব্যস্ততা ও দায়িত্ব আছেই। কিন্তু এর বাইরেও দাওয়াত ও তাবলিগের যে মেহনত চলছে, এই কাজের সাথেও আপনাদের যেকোনো ভাবে সম্পৃক্ত থাকা খুবই জরুরি। যদি আলেমসমাজের অংশগ্রহণ যথেষ্ট না হয়, তবে খুব শীঘ্রই এক বড় ধরনের ফিতনা ও মসিবতের সম্ভাবনা রয়েছে।” স্যার বিশেষভাবে উল্লেখ করেন, তাবলিগের এই মেহনতে ওলামাদের সম্পৃক্ততার মাধ্যমেই এই বিশাল দাওয়াতি মেহনত নিরাপদ, সঠিক দিকনির্দেশনা পূর্ণ এবং শরীয়তের ছায়াতলে থেকে অগ্রসর হতে পারবে। দাওয়াত ও তাবলিগের এই কাজ থেকে আলেমদের বিচ্ছিন্নতা আমজনতার মধ্যে ভুল ধারণা সৃষ্টি করতে পারে। স্যার বলেন: “আজকে দাওয়াত ও তাবলিগের কাজ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আম জনতা, সাধারণ মুসলমানদের হাতেই চলছে। সাধারণ মানুষই তিন চিল্লা ইত্যাদি মেহনতের মাধ্যমে দীনের দিকে আসছে। এখন যদি ওলামায়ে কেরাম তাদের সাথে যথেষ্টভাবে জড়িত না থাকেন, তাহলে আমজনতা আস্তে আস্তে আলেমদেরকে নিজেদের কাজের অংশী মনে করবে না। তারা বুঝবে, ‘ওলামারা আলাদা, তারা তাবলিগের সাথে নেই।’ তখন স্বাভাবিকভাবে আমজনতা তাবলিগের তিন চিল্লাওয়ালাদের কে (সাথীদের) আসল মুরব্বি ভেবে নেবে। দীনী মাসআলা-মাসায়েল, শরীয়তের বিষয়গুলোও তারা সেখানেই জিজ্ঞেস করবে। এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে ভয় হচ্ছে, যদি কোনো ভুল-ভ্রান্তি বা শরীয়তের পরিপন্থী কিছু তাদের মধ্যে দেখা দেয়, আর আলেমগণ তখন লোকমা (সংশোধন) দিতে চান, তাহলেও তারা হয়তো সেই কথা গ্রহণ করবে না। বলবে, ‘এরা তো আমাদের সাথে নেই, তাবলিগের মানুষ না, বাইরের লোক।’ দীনি শরিয়তের গুরু আলেমসমাজের কথা এভাবে তাদের কাছে গুরুত্ব হারাবে।” স্যার তাগিদ দেন, দীনি সকল ব্যস্ততার পাশাপাশি যেকোনোভাবে তাবলিগের এই মেহনতে ওলামায়ে কেরাম দের সম্পৃক্ততা যথেষ্ট হওয়া দরকার, সময় করে শরিক হওয়া দরকার, খোঁজখবর রাখা দরকার। যাতে করে তাদের (আমজনতা) দীনদারি আলেমদের তত্ত্বাবধানে গড়ে উঠে। ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে যখন আপনারা লোকমা দেবেন, তখন তারা আন্তরিকভাবে গ্রহণ করে।

২৭৬. স্যার একবার সফর প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে বলেছিলেন, আমরা অনেক…

স্যার একবার সফর প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে বলেছিলেন, আমরা অনেক সময় বলি, “আমি সফরে যাচ্ছি।” কিন্তু বাস্তবে আমাদের সফর আসল সফর নয়। আমাদের যাত্রার আগে থেকেই সবকিছু নির্ধারিত থাকে, কোথায় যাচ্ছি, কতদিন থাকব, কোথায় থাকব, কী খাব, কোন গাড়িতে উঠব, কখন ফিরব, সবই আগে থেকে ঠিক করা থাকে। আমরা শুধু সেই নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুসারে পথ চলি। এই ধরণের যাত্রা মূলত পরিকল্পিত ভ্রমণ, এটি সফরের গভীর অর্থকে ধারণ করে না। আসল সফর হলো সেই যাত্রা, যেখানে অজানার পথে পদক্ষেপ নেওয়া হয়- যেখানে গন্তব্য নিশ্চিত নয়, পথের অবস্থা অনিশ্চিত, থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা অনির্ধারিত, এবং সময়ের সীমাও অজানা। এই অনিশ্চিত যাত্রাই মানুষকে আত্মসমর্পণ শেখায়, নিজের নয়, বরং আল্লাহর হাতে নিয়তি সঁপে দেওয়ার শিক্ষা দেয়। পথের সমস্ত ফলাফল, সাফল্য-ব্যর্থতা, বিপদ-আপদ, সুখ-দুঃখ সবকিছুর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আল্লাহর হাতে ছেড়ে দেয়। রাস্তা অজানা, মানচিত্র নেই, অনেক অনিশ্চয়তা আছে। তারপরও নিজের সব উদ্বেগ, পরিকল্পনা, নিরাপত্তা বা ফলাফল নিয়ে চিন্তা না করে আল্লাহর উপর পূর্ণ বিশ্বাস রেখে আত্মবিশ্বাসী হয়ে অগ্রসর হতে থাকে। এই প্রসঙ্গে স্যার “A Road to Makkah” বইয়ের উদাহরণ টেনে বলেন, মুহাম্মদ আসাদ উনার আত্মজীবনীমূলক এই গ্রন্থে সেই সত্যটিই তুলে ধরেছেন। তিনি যখন ইসলাম গ্রহণের পর একা মরুভূমির পথে যাত্রা শুরু করেন, তখন উনার সামনে ছিল না কোনো সরকারি প্রোটোকল, না ছিল পূর্বনির্ধারিত পথ, না ছিল থাকার জায়গা, খাবার, কিংবা জীবনের নিশ্চয়তা। তবু তিনি এগিয়ে গিয়েছিলেন-একটি লক্ষ্যকে সামনে রেখে, সত্যের সন্ধানে, এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রেখে। সেই অজানা পথেই তিনি প্রকৃত সফরের স্বাদ পেয়েছিলেন। মরুভূমির উত্তপ্ত বালু, পানির অভাব, জীবনের ঝুঁকি, এসবের ভেতর দিয়েই তিনি শিখেছিলেন সফরের আত্মিক অর্থ। তিনি বুঝেছিলেন, “সফর মানে কেবল এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়া নয়; বরং নিজের ভেতরের এক অবস্থা থেকে আরেক অবস্থায় পরিবর্তনের নামই সফর।” এমন সফর মানুষকে নম্র করে, তাওয়াক্কুল শিক্ষা দেয়, এবং আল্লাহর নিকটবর্তী করে। যে সফরে সবকিছু নিশ্চিত, সেখানে মানুষ নিজের ওপর নির্ভর করে, উপকরণের ওপর ভরসা করে; কিন্তু যে সফরে কিছুই নিশ্চিত নয়, সেখানে মানুষ আল্লাহর ওপরই ভরসা করতে শেখে, আর এই অবস্থাই মানুষকে প্রকৃতভাবে পরিণত করে “মুসাফিরে”।

২৭৭. এক সফরে হযরত মাওলানা ইব্রাহিম আফ্রিকি দামাত বারাকাতুহু সাহেবের…

এক সফরে হযরত মাওলানা ইব্রাহিম আফ্রিকি দামাত বারাকাতুহু সাহেবের সঙ্গে সিলেট শহর থেকে জকিগঞ্জের পথে মাইক্রোবাসযোগে যাত্রা চলছিল। হযরতের সঙ্গীসাথীদের মধ্যে স্যারসহ কয়েকজন আলাদা একটি মাইক্রোতে ছিলেন। পথিমধ্যে দুই পাশে ছিল বিস্তীর্ণ সবুজ মাঠ, দূরে সারি সারি পাহাড়, প্রকৃতির এক অপার সৌন্দর্য যেন চোখে ভাসছিল। দূর পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে স্যার সিলেটের একটি প্রবাদ শুনালেন, “দিনে পাহাড়, রাতে জুই (আগুন), দেখিয়া না যাইয়া শুই।” (মানুষ অনেক সময় দূর থেকে যা দেখে, সেটাকেই বাস্তব বলে ধরে নেয়। কিন্তু দূর থেকে দেখা জিনিসের ভেতরের প্রকৃতি যেমন বোঝা যায় না, তেমনি বাহ্যিক সৌন্দর্য বা আকর্ষণ দেখে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও বুদ্ধিমানের কাজ নয়। দিনে যে পাহাড় এত সুন্দর লাগে, কাছে গেলে হয়তো তা কাঁটাঝোপে ভরা দুর্গম পাথর। আবার রাতে দূরে দেখা জুই বা আগুন, দেখতে উজ্জ্বল ও উষ্ণ মনে হলেও, কাছে গেলে তা দগ্ধ করে দেয়। স্যারের নিকট থেকে শোনা হযরত ইউসুফ রহিমাহুল্লাহ-এর আরেকটি উক্তি ছিল, “আমাদের চোখই হলো সবচেয়ে বড় মিথ্যাবাদী;” কারণ এটি বাস্তবতা দেখে না, শুধু বাহ্যিক রূপ দেখে।) এভাবে মনে হচ্ছিল, স্যার যেন এই প্রবাদটির মাধ্যমে আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছেন, মুমিনের দৃষ্টিভঙ্গি হতে হবে গভীর, বিচক্ষণ ও সত্যনিষ্ঠ। যা দেখি, তা যাচাই না করে গ্রহণ করা ঠিক নয়; যা শুনি, তা বুঝে না নিয়ে বিশ্বাস করা উচিত নয়। কেননা দুনিয়ার বহু বিষয় দূর থেকে আকর্ষণীয় মনে হলেও, কাছে গেলে তার আসল রূপ প্রকাশ পায়। আকর্ষণীয় জিনিস সব সময় কল্যাণকর হয় না; বাহ্যিক চাকচিক্যে নয়, বরং বাস্তবতা যাচাই করে চলাই বুদ্ধিমানের পথ। প্রলোভনের আগে প্রজ্ঞা, এই চেতনা নিয়েই মুমিনকে চলতে হবে। ​ দ্রষ্টব্য: প্রবাদটির ব্যাখ্যা অংশটি স্যারের বক্তব্য নয়; তা নিজস্ব উপলব্ধি হিসেবে সংযোজিত হয়েছে।

২৭৮. পায়ে হেঁটে চলার প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে স্যার একবার বলেছিলেন-…

পায়ে হেঁটে চলার প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে স্যার একবার বলেছিলেন- হাঁটা শুধু দেহের জন্য উপকারী নয়, এর ভেতরে আত্মারও বিশেষ উপকার নিহিত আছে। হাঁটার সঙ্গে “পৌরুষত্ব” (পৌরুষ), সাহস এবং দৃঢ়তার এক গভীর সম্পর্ক আছে। ‘رِجَالٌ’ (রিজাল) শব্দটি আরবি ভাষায় যেমন ‘পুরুষ’ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, তেমনি এর মূল অর্থের একটি দিক হলো ‘পা’ বা ‘যিনি পায়ে হেঁটে চলেন’। এখানে শারীরিক চলাচলের সঙ্গে মানসিক ও আত্মিক শক্তিরও এক গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান। আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “وَأَذِّنْ فِي النَّاسِ بِالْحَجِّ يَأْتُوكَ رِجَالًا” –মানুষের মাঝে হজের ঘোষণা দাও-তারা তোমার নিকটে আসবে পায়ে হেঁটে…, এখানে “رِجَالًا (রিজালান)” শব্দটি এসেছে ‘পায়ে হেঁটে আসা’ অর্থে। অর্থাৎ, যারা কষ্ট সহ্য করে, দৃঢ়তা ও ত্যাগের মনোভাব নিয়ে আল্লাহর পথে পদক্ষেপ গ্রহণ করে- তাদেরই ‘রিজাল’ বলা হয়েছে। অন্য স্থানে আল্লাহ পাক বলেনঃ “رِجَالٌ لَّا تُلْهِيهِمْ تِجَارَةٌ وَلَا بَيْعٌ عَن ذِكْرِ اللَّهِ” –এরা সেই পুরুষগণ, যাদের ব্যবসা-বাণিজ্য ও ক্রয়-বিক্রয় আল্লাহর স্মরণ থেকে বিমুখ করে না। এখানে ‘রিজাল’ অর্থে এসেছে আল্লাহভীরু, সাহসী ও কর্মমুখর পুরুষগণ, যারা পৃথিবীর ব্যস্ততার মাঝেও আত্মার জাগরণ ধরে রাখে। হাঁটা মানে কেবল চলা নয়, এ হাঁটা কেবল একটি শারীরিক অনুশীলন নয়; এটি সাহস, দৃঢ়তা ও আত্মসংযমের এক প্রতীক। পায়ের গতি যেমন শরীরকে চাঙ্গা করে, তেমনি আত্মাকে উদ্দীপ্ত করে, হৃদয়ে সাহস সঞ্চার করে এবং আল্লাহর পথে চলার তাওফিক জাগায়। পায়দল জামাত এ এক রুহানি সফর; আত্মশুদ্ধি ও দৃঢ় ঈমানের পথে এক অনুশীলন।

২৭৯. একবার এক মজলিসে স্যার প্রসঙ্গক্রমে এক ছোট বাচ্চা মেয়ের…

একবার এক মজলিসে স্যার প্রসঙ্গক্রমে এক ছোট বাচ্চা মেয়ের উদাহরণ দেন। স্যার বলেন- একটি ছোট মেয়ে বিয়ের বাড়িতে গিয়ে দেখে, বউকে কী সুন্দরভাবে সাজানো হয়েছে! কেউ তার হাতে মেহেদি লাগাচ্ছে, কেউ মাথার টিকলি ঠিক করে দিচ্ছে, কেউ জামা ওড়না গুছিয়ে দিচ্ছে, কেউবা মুখে মিষ্টি তুলে দিচ্ছে। চারদিকে হাসি খুশি, আনন্দ উৎসব, গান-বাজনা, রঙ ছিটানো, বিশাল প্যান্ডেল, আলো ঝলমল, আত্মীয়-স্বজনের ভিড়-সব মিলিয়ে এক প্রাণবন্ত পরিবেশ। ছোট মেয়েটির মনে তখন গভীর আনন্দ জেগে ওঠে। ঘরে ফিরে আম্মা-আব্বাকে বলে, “বিয়ে তো খুব মজার জিনিস! কত আনন্দের! আমাকেও বিয়ে দিয়ে দাও।” তার ঐ অবুঝ মনে বিয়ে মানেই সাজসজ্জা, গান-বাজনা, খাওয়া-দাওয়া আর আনন্দ উল্লাস। তাই সে বিয়ে করতে চায়। কিন্তু স্বামী নামে যে একটি জিনিস আছে, সেটি সে জানে না, বোঝেও না। এই বিয়ে যে এক বড় জিম্মাদারী, এর প্রকৃত দায়িত্ব, ত্যাগ ধৈর্য ও আনন্দের মধ্য দিয়ে যে জীবনের গভীর বাস্তবতা-তা সে বোঝে না। ঐ চেপ্টারটাই তার সামনে নাই, বাহ্যিক আনন্দই সে দেখে, ভিতরের বাস্তবতা তার অজানা। স্যার বলেন, আমাদের দ্বীনদারীর অবস্থাও আজ ঐ ছোট মেয়েটির মতোই। স্যার ব্যথাভরা ভারী কণ্ঠে বলেন, আমাদের তাবলিগ, দ্বীনদারী, দ্বীনের নামে এই হরকত, সবই অনেকটা ঐ বাচ্চা মেয়ের মতো। ঐ ছোট মেয়েটি বিয়ের বাহ্যিক আনন্দে মুগ্ধ, কিন্তু প্রকৃত দায়িত্বকে বোঝে না; আমাদের অবস্থাও যেন এমন না হয়, যেন আমরা দ্বীনের বাহ্যিক রূপেই কেবল মুগ্ধ থেকে যাই। বিরাট মজমা, বিরাট বক্তৃতা, বিরাট প্যান্ডেল, বিরাট মিম্বর, বিরাট রিসেপশন, বিরাট হৈ-চৈ, বিরাট খাওয়া দাওয়া সবই আছে। কিন্তু আল্লাহ নামে যে কিছু আছে, আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টিই যে আসল লক্ষ্য, তা আমরা বুঝি না, অজানাই থেকে যায়। স্যার বলেন- আল্লাহর নাম আছে আমাদের জিহ্বায়, কিন্তু সেই ভালোবাসা ও সেই ভয় কোথায়? সেই আল্লাহর রঙ, যা দ্বীনের প্রকৃত প্রাণ তাই বা কোথায়? দ্বীনের নাম আমরা জানি, দ্বীনের বাহ্যিক রূপে মুগ্ধ হই, কিন্তু দ্বীনের মর্ম অনুধাবনের যথেষ্ট চেষ্টা থাকে না, দ্বীনের রূহকে বোঝার যথেষ্ঠ তাকিদ অনুভব করি না। এই চিল্লা, এই এস্তেমা, এই দৌড়ঝাঁপ, দ্বীনের নামে আমাদের এই মেহনত-বড় মজমা, বড় বক্তৃতা, সবই থাকে। কিন্তু এইসব আয়োজনে আল্লাহর সন্তুষ্টি, যা আসল উদ্দেশ্য, তা কোথাও যেন হারিয়ে যায়। তাবলিগের রঙ আমরা দেখি, এই আয়োজন, সাজ-সজ্জা, দৌড়ঝাঁপ, মেহনত-সবই বাহ্যিক রূপ; কিন্তু অন্তরের দিকের সেই বিশাল মেহনত, আল্লাহর সন্তুষ্টির তালিব হওয়া, এই মূল অধ্যায়টাই খোলা হয় না, ভুলে যাই।

২৮০. এক ভাই এক সময় একটি মেয়েকে বিয়ে করার বিষয়ে…

এক ভাই এক সময় একটি মেয়েকে বিয়ে করার বিষয়ে স্যারের কাছে পরামর্শ নিতে যান। মেয়েটির চরিত্র ভালো ছিল না। সেই ভাইয়ের উদ্দেশ্য ছিল, তাকে বিয়ের মাধ্যমে সঠিক পথে নিয়ে আসা। কিন্তু স্যার বিস্তারিত জানার পর তাকে সেখানে বিয়ে করতে খুব কঠোরভাবে নিষেধ করেন। পরবর্তীতে দেখা গেল, সেই সুন্দরী মেয়েটিকে অন্য একজন বিয়ে করলে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তার জীবন নানা দিক থেকে ভয়াবহ পেরেশানিতে ভরে ওঠে। অন্যদিকে সেই ভাই একজন নেককার, আলেমা মেয়েকে বিয়ে করেন। তার সংসার শান্তিময় হয়, তার সন্তানরা আজ হাফেজ হচ্ছে, আলেম হচ্ছে। গভীর কৃতজ্ঞতার সাথে ওই ভাই বলেন, “সেই একদিনের স্যারের একটি মাত্র পরামর্শ আমার পুরো জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। আমার চিন্তা-ভাবনা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও জীবনযাত্রার দিক পরিবর্তন করে দিয়েছে।” এই প্রসঙ্গে স্যারের এক মোজাকারা ছিলো, স্যার বলেন “অনেক সময় একটি নসিহতের ওজন লাখো নেক আমলের চেয়েও বেশি হয়ে থাকে।” এই কথার ব্যাখ্যায় স্যার একটি ঐতিহাসিক ঘটনা উল্লেখ করেন। উমাইয়া খেলাফতের খলিফা সোলেমান ইবনে আব্দুল মালিক (আল্লাহ উনার প্রতি রহম করুন) উনার মৃত্যুর পূর্বে উনার যোগ্য ও নেককার উজির রজা ইবনে হায়াৎ রহমতুল্লাহি আলাইহি কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “আমার পরে কাকে আমি খলিফা নিযুক্ত করে যাবো?” উজির রজা ইবনে হায়াৎ রহমতুল্লাহি আলাইহি ছিলেন অত্যন্ত পরহেজগার, দূরদর্শী ও যোগ্য একজন উজির। তিনি খলিফাকে পরামর্শ দেন, “আপনি পরবর্তী খলিফা হিসেবে ওমর ইবনে আব্দুল আজিজকে নিযুক্ত করুন।” খলিফা সোলেমান ইবনে আব্দুল মালিক উজিরের এই পরামর্শ গ্রহণ করেন। তিনি লিখিতভাবে ফরমানে ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ রহমাতুল্লাহি আলাইহিকে পরবর্তী খলিফা মনোনীত করেন, তাতে সীলমোহর দেন এবং সেই সীলমোহরকৃত ফরমান উজির রজার হাতে অর্পণ করে ইন্তেকাল করেন। এর ফলাফল ইতিহাসে সুস্পষ্ট, ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ রহমাতুল্লাহি আলাইহি এর খেলাফত ইসলামের এক উজ্জ্বল স্বর্ণযুগে পরিণত হয়। এই ঘটনা উল্লেখ করে স্যার বলেন, “অনেক সময় এরকম একটিমাত্র পরামর্শ দীনের ময়দানে হাজারো লাখো নেক আমলের চেয়েও বেশি ওজন রাখে, বড় বড় দিনী খেদমতের থেকেও বেশি প্রভাব রেখে যায়।”


← আগের পর্ব (২৪১–২৬০)  |  সূচিপত্র  |  পরের পর্ব (২৮১–৩০০) →

সংগ্রহ ও সংকলন: মুশফিক আহমদ (রহঃ)-এর মালফুযাত সংকলন।

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *