|

মালফুযাত – প্রফেসর মুশফিক আহমদ (রহঃ) – পর্ব ১৩: ২৪১–২৬০

প্রফেসর মুশফিক আহমদ (রহঃ)-এর বয়ান, পরামর্শ, আমল ও দাওয়াতি জীবনের মালফুযাত, ২৪১ থেকে ২৬০ নম্বর। সম্পূর্ণ সূচিপত্র দেখুন।

সংগ্রহ ও সংকলন: মুশফিক আহমদ (রহঃ)-এর মালফুযাত সংকলন।

এই পর্বে যা আছে


২৪১. স্যার এক বয়ানে বলেন, আল্লাহ তায়ালা নবী আলাইহিমুস সালাম…

স্যার এক বয়ানে বলেন, আল্লাহ তায়ালা নবী আলাইহিমুস সালাম গণকে দ্বীনের দাওয়াত দিয়ে এভাবে পাঠাননি যে, দ্বীন জরুরি; বরং পাঠিয়েছেন এই বিশ্বাস দিয়ে যে, দ্বীন যথেষ্ট। এই দুটি কথার মাঝে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য। যে দ্বীনকে যথেষ্ট মনে করে, সে তার পূর্ণ শক্তি দ্বীনের ওপর ঢেলে দেয়। বাকি সবকিছুর গুরুত্ব তার কাছে গৌণ হয়ে যায়। পক্ষান্তরে, যে কেবল দ্বীনকে জরুরি মনে করে, সে দ্বীনের পাশাপাশি দুনিয়ার অন্য প্রয়োজনীয় বিষয়গুলোকেও সমান গুরুত্ব দেয়। স্যার বলেন, আজ আমরা অনেকেই দ্বীনকে “ভালো” মনে করি, কেউ কেউ “প্রয়োজনীয়” বলেও মনে করি; কিন্তু দ্বীন দাবী করে, আমরা দ্বীন কে ঐরকম “যথেষ্ট” মনে করি, যেরকম সাহাবা রাদিআল্লাহু তাআলা আনহুম গণ মনে করতেন। স্যার বোঝাতে চান, যদি একজন ব্যক্তি দ্বীনদার হয়, তবে তার চাকরি, ডিগ্রি, সম্পদ, বংশ, এসব কিছু না থাকলেও তা কোনো ঘাটতি নয়। যে দ্বীনদার, মুত্তাকি, পরহেজগার, তার বাকি কিছু না থাকলেও আল্লাহর কাছে সে পরিপূর্ণ।

২৪২. একবার কাকরাইল মসজিদে একসাথে দই খাচ্ছিলেন। সেই সময় মাহফুজ…

একবার কাকরাইল মসজিদে একসাথে দই খাচ্ছিলেন। সেই সময় মাহফুজ ভাই দইয়ের প্রশংসা করে বলে উঠলেন, “এই দই তো বেশ একেবারে রাইবেন্ডের (পাকিস্তানের মারকায) দইয়ের মতো!” এই কথা শেষ হতে না হতেই স্যার জিজ্ঞেস করলেন: “তুমি যে পাকিস্তান সফর করেছো তা জানাতে চাচ্ছো?” আমাদের মন অনেক সময় চায়, আমরা এমনভাবে কথা বলি যাতে কথার মধ্যে সফরের গৌরব প্রচার করার একটি সূক্ষ্ম প্রবণতা থাকে এবং মানুষ নিজে থেকেই আমাদের প্রশংসা করতে বাধ্য হয়। এই খুব সূক্ষ্ম আত্মপ্রচারের চর্চা কে স্যার ধরে ফেললেন, যা বাহ্যিকভাবে নিরীহ মনে হলেও আত্মশুদ্ধির পথে বড় অন্তরায়। স্যারের এই প্রশ্নটি মাহফুজ ভাইকে কিছুটা অস্বস্তিতে ফেলে দেয়, হঠাৎ এভাবে প্রশ্ন করায় মাহফুজ ভাই কিছুটা লজ্জিত হয়ে বললেন: “না, আসলে তা বোঝাতে চাচ্ছিলাম না।” এরপর যেনো মৃদু আক্ষেপ ভরে বললেন: “যদি জানাতেও চাই, প্রচার করতেও চাই, তা কি আর আপনাকে বলবো?” স্যারের কথা এখানেও শেষ হলো না, স্যারের তরফ থেকে আরও এক খোঁচা (দরদভরা সংশোধনের ভাষা) আসল– স্যার আবার বললেন: “না, তুমি এই প্র্যাকটিস করছো, আর কী!” স্যার সরাসরি কোনো কঠোর কথা বলেননি, বরং হাস্যরসের মাধ্যমে, হালকা মন্তব্যে তিনি হৃদয়ে আঘাত করেছেন। কিন্তু সেই আঘাতে কোনো অপমান নেই, বরং ছিলো একটি চেতনা জাগানোর চেষ্টা। মাহফুজ ভাই হয়ত অবচেতনভাবে তার সফরকে মহিমান্বিত করার চেষ্টা করছেন বা এর মাধ্যমে কোনো বিশেষ বার্তা দিতে চাইছেন। দ্বীনি সফরে বা নেক আমলে লিপ্ত হওয়ার পর তা প্রকাশ না করা এবং বিনয়ী থাকা ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। স্যারের মন্তব্যে সম্ভবত সফরের নিয়তের স্বচ্ছতা বজায় রাখা, এবং বিদেশ সফর সম্পর্কে কোনো প্রকার প্রচার বা লোক দেখানোর সূক্ষ্ম উদ্দেশ্য পোষণ থেকেও বিরত রাখার বেপারে তাকিদ ছিলো। স্যার যেনো বলতে চাচ্ছিলেন, আমাদের প্রতিটি আমল যেন একমাত্র আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টির জন্য হয়, লোক দেখানো বা প্রশংসা কুড়ানোর জন্য নয়। আমরা অনেক সময় অজান্তেই নিজের প্রশংসা বা কাজের প্রচারের ফাঁদে পড়ে যাই, দইয়ের প্রশংসার মাধ্যমে অসাবধানতাবশত বিদেশ সফরের এই বিষয়টি প্রকাশ পেয়ে যায়, যে বেপারে সতর্কতা গ্রহণ স্যারের উদ্দেশ্য ছিলো।

২৪৩. এক মোজাকারায় স্যার বলেন: “আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সাদিকীনদের সঙ্গী…

এক মোজাকারায় স্যার বলেন: “আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সাদিকীনদের সঙ্গী হতে বলেছেন।” يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَكُونُوا مَعَ الصَّادِقِينَ স্যার বলেন, এখানে “مَعَ الصَّادِقِينَ”, অর্থাৎ “সত্যবাদীদের সঙ্গী হও”, এই শব্দটি খুবই গভীর ও ব্যাপক অর্থবোধক। স্যার বলেন: “এই ‘সঙ্গী হওয়া’ ব্যাপক শব্দটি কেবল শরীরের পাশে থাকার নাম নয়, বরং এটি মনের মিল, চিন্তার মিল, উদ্দেশ্যের মিল, সব কিছুর এক গভীর সম্পর্ক বোঝায়।” স্যার বলেন, সঙ্গ দুই রকম হতে পারে: এক হলো স্থানের সঙ্গ: যেমন, কেউ কারও পাশে বসে আছে, কিংবা একসাথে অবস্থান করছে। এটি বাহ্যিক বা শারীরিক সঙ্গ, শারীরিকভাবে কাছাকাছি থাকা বা এক স্থানে অবস্থান করা। আরেক হলো মতের সঙ্গ: যেমন বলা হয়, “أنا معك”, “আমি তোমার সাথে আছি।” এখানে সঙ্গ মানে চিন্তার মিল, এটি হল চিন্তাভাবনা, মতাদর্শ, মন এবং বিশ্বাসের ঐক্য। যখন আমরা বলি, “আমি তোমার সঙ্গে আছি” বা “আমি তোমার সাথে একমত”, তখন এটি মতের সঙ্গকেই বোঝায়। আল্লাহ তায়ালা যখন মুমিনদের সঙ্গী হতে বলেছেন, তখন এর প্রধান উদ্দেশ্য হল এই মনের মিল ও চিন্তার ঐক্য। স্যার স্মরণ করালেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত মুয়াজ রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুকে ইয়েমেনের গভর্নর করে পাঠিয়েছিলেন। এরপর জীবদ্দশায় আর দেখা হয়নি। কিন্তু হযরত মুয়াজ রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু জীবনের শেষ পর্যন্ত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গেই ছিলেন। এই সঙ্গ ছিল ঈমানের কারণে, আকিদার কারণে, চিন্তার কারণে, শারীরিক উপস্থিতির কারণে নয়। স্যার বলেন, আল্লাহর নির্দেশ, “সাদিকীনদের সঙ্গী হও”, এই ‘সঙ্গী’ হওয়ার অর্থ মূলত সেই মতের সঙ্গ, বা ভাবগত বা অন্তরগত সঙ্গ’। তাদের মতো চিন্তা করা, তাদের বিশ্বাসকে বিশ্বাস করা, তাদের মতো জীবনব্যবস্থা গ্রহণ করা, তাদের পথের অনুসারী হওয়া। এটা কেবল পাশেই বসা নয়, বরং অন্তরের গভীরে তাদের অনুসারিত হওয়া, মনের ঐক্য স্থাপন করা।

২৪৪. স্যার বলেন, আল্লাহতাআলা আমাদেরকে সাদিকিনদের সঙ্গী হওয়ার আদেশ দিয়েছেন…

স্যার বলেন, আল্লাহতাআলা আমাদেরকে সাদিকিনদের সঙ্গী হওয়ার আদেশ দিয়েছেন। তোমরা মা‘আস্-সাদিকীন হও। স্যার বুঝিয়েছেন, এখানে “مَعَ” (সঙ্গে হও) শব্দটি শুধু বাহ্যিক সঙ্গ নয়, বরং তাদের মতাদর্শ গ্রহণ, ও অন্তর দিয়ে তাদের অনুসরণ করাকে বোঝায়। এর দ্বারা বোঝানো হয়, সাদিকীন কেবল কিছু ব্যক্তি নন; বরং তারা একটি মানসিকতা, একটি আদর্শ। সেই আদর্শের প্রতি সমর্পিত হওয়াই হচ্ছে প্রকৃত সঙ্গী হওয়া। স্যার বলেন, এই নির্দেশের আড়ালে এক গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা নিহিত আছে, ”প্রত্যেক ‘হাঁ’ এর সাথে একটি ‘না’ জড়িত থাকে।” অর্থাৎ, যখন কাউকে সঙ্গী হওয়ার কথা বলা হয়, তখন পরোক্ষভাবে বলা হয়, তার বিরুদ্ধপন্থীদের থেকে দূরে থাকো। এটি إثبات (ইসবাত) ও نفي (নফি) এর নীতি। সত্যনিষ্ঠ, ঈমানদার, আল্লাহভীরু, ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রকৃত অনুসারীদের সঙ্গ গ্রহণ করা, তাদের ভালোবাসা, তাদের উপর বিশ্বাস করা, এবং তাদের পথে চলা। এবং একই সাথে, ভ্রষ্ট, কপট ও বিপথগামীদের চিনে তাদের ভালোবাসা থেকে, তাদের সঙ্গ গ্রহণ থেকে, তাদেরকে বিশ্বাস করা থেকে, এবং তাদের পথে চলা থেকে দূরে থাকা। স্যার ইঙ্গিত করেছেন, “সাদিকীনদের সঙ্গী হও” বলা মানেই “বিপথগামী মুর্তাদ, মুনাফিক, বা বাতিলপন্থীদের সঙ্গী হইও না”, এটা আর আলাদা করে বলার প্রয়োজন পড়ে না, কারণ তা এর অন্তর্নিহিত অংশ।

২৪৫. স্যার প্যারিসে থাকাকালীন, স্যারের এক বন্ধু, খ্রিষ্টান, যিনি স্যারের…

স্যার প্যারিসে থাকাকালীন, স্যারের এক বন্ধু, খ্রিষ্টান, যিনি স্যারের সাথে খুব ভালো সম্পর্ক রাখতেন, তিনি একবার একটি অদ্ভুত অনুরোধ নিয়ে এসেছিলেন। প্যারিসের স্থানীয় এক গির্জায় প্রতি রবিবার আনুষ্ঠানিক যে ধর্মীয় ভাষণ (সারমন) দেওয়া হয়, যা মূলত খ্রিষ্টানদের ‘ওয়াঅয’ বা ধর্মীয় উপদেশের একটি কাঠামোবদ্ধ পাঠ। এসব ভাষণ কখনো ওই গির্জার ফাদার নিজে দেন, আবার কখনো কোনো ইয়াং ভলান্টিয়ারদের দিয়েও পড়ানো হয়। স্যার বলেন, একবার ওই গির্জায় বক্তব্য দেওয়ার পালা সেই বন্ধুর ওপর এলে, সে স্যারকে অনুরোধ করল: “তুমি আমার জন্য একটা সুন্দর ‘সারমন’ লিখে দাও।” স্যার তার প্রস্তাব গ্রহণ করেন। স্যার হয়তো ভেবেছিলেন ইসলামের শিক্ষার কিছু বার্তা এমনভাবে দেওয়া যায় যাতে সার্বজনীন কল্যাণের দিকটা ফুটে ওঠে। স্যার তার জন্য একটি অতি পরিচিত কিন্তু গভীর অর্থবোধক দোআ কুরআন শরীফ থেকে উদ্ধৃত করে সারমন আকারে লিখে দেন। দোআটি ছিল নবী মূসা আলাইহি ওয়া সাল্লামের। যখন তিনি ফেরাউনের সামনে দাওয়াত নিয়ে যাচ্ছিলেন। এতে আত্মপ্রকাশের আগেই আত্মশুদ্ধি, এবং কথার শক্তি চাওয়ার অনন্য নমুনা আছে। ”হে আমার প্রভু! আমার বক্ষ প্রশস্ত করে দাও, আমার কাজ সহজ করে দাও, আমার জিহ্বার জড়তা দূর করে দাও, যাতে তারা আমার কথা বুঝতে পারে।” رَبِّ اشْرَحْ لِي صَدْرِي وَيَسِّرْ لِي أَمْرِي وَاحْلُلْ عُقْدَةً مِّن لِّسَانِي يَفْقَهُوا قَوْلِي স্যার বলেন, রবিবারের আগেই সে দুই-একবার রিহার্সেল করে এসে আমাকে বলল– ”এইটা পড়া যাবে না!” আমি জিজ্ঞাসা করলাম কেন? সে জানালো, ”এই কথাগুলো বেশি ‘হাই থট’ এর হয়ে গেছে। সবাই বুঝে ফেলবে যে এইটা আমার পেট থেকে বের হয়নি। আমি ধরা পড়ে যাব যে এটা আমি নিজে লিখিনি।”

২৪৬. কাজল ভাই একবার মেহমানদারির প্রসঙ্গে স্যার, এর একটি গভীর…

কাজল ভাই একবার মেহমানদারির প্রসঙ্গে স্যার, এর একটি গভীর পর্যবেক্ষণের কথা স্মরণ করে বলছিলেন– “স্যার বলতেন, মেহমান ও মেজবান, উভয়ের হৃদয়ের অবস্থা একে অপরের কাছে প্রকাশ হয়ে যায়। যে আন্তরিকতা দিয়ে মেহমানদারি করা হয়েছে, তা মেহমান বুঝে ফেলে। আবার যেভাবে মেহমান তা গ্রহণ করেছে, সেটাও মেজবান টের পায়।” স্যার বলতেন, এটা শুধু খাবার খাওয়ানো বা দাওয়াতের আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এক অন্তরঙ্গ হৃদ্যতা, দীলের লেনদেন। যেন এক নীরব মুআমালাহ-হৃদয়ের আদান-প্রদান। স্যার বোঝাতে চান, এটা এমন এক লেনদেন যা ঢেকে রাখা যায় না, জোর করে সাজানোও যায় না। কথা, আচরণ, পরিবেশন, শরীরী ভাষা, এমনকি হাঁটাচলা ও চোখের চাহনি, সব মিলিয়ে আল্লাহ পাক দীলের ভেতরের হালত প্রকাশ করে দেন। আল্লাহ পাক উভয়ের মুভমেন্ট, চলাফেরা, পরিবেশন, কথাবার্তার মাধ্যমে উনাদের মনের অবস্থা প্রকাশ করে দেন, কে কতটা আন্তরিক ছিল। স্যারের ভাষায়, মেহমান বুঝে ফেলে যে, এটা শুধুই রেওয়াজ বা চাপের দাওয়াত। আবার মেজবানও অনুভব করেন, এই মেহমান আমার ‘বেতাকল্লুফী’ বা সাদাসিধে পরিবেশনকেই দীল থেকে গ্রহণ করেছেন, নাকি শুধু ভদ্রতা করেছেন। স্যার ইঙ্গিত প্রদান করেন যে, আল্লাহ পাক দীলের অবস্থা বা অন্তরের সত্তাকে প্রকাশ করে দেন, মুখাবয়ব ও আচরণের মাধ্যমে।

২৪৭. কাজল ভাই স্মরণ করেন, হযরত মাওলানা জামাল উদ্দিন স্যার…

কাজল ভাই স্মরণ করেন, হযরত মাওলানা জামাল উদ্দিন স্যার যিনি বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদের খতিব ছিলেন এবং পরবর্তীতে ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের সম্মানিত শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, স্যারের ঘনিষ্ঠ ছিলেন, তাদের মাঝে পরস্পর মহব্বতপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। কাজল ভাই বলেন, “আমি একাধিকবার জামাল স্যারের বাসায় স্যারের সাথে গিয়েছি। দেখতাম, উনার মেহমানদারির এক বিশেষ আদব আছে। খাবার পরিবেশনের একটা নির্দিষ্ট তরতীব মেনে চলতেন, একটি আইটেম এনে দিতেন, সেটি শেষ হলে আরেকটি; এভাবে এক এক করে সব পরিবেশন করতেন। একসঙ্গে সব খাবার পরিবেশন করতেন না।” কাজল ভাই একবার বিস্ময়ের সাথে স্যারকে জিজ্ঞেস করেন, “স্যার, এমন তরতীব কেন? সব একসাথে দিলে তো যেমন ইচ্ছা মেপে খাওয়া যেত!” এ কথা শুনে জামাল উদ্দিন স্যার মুচকি হেসে বললেন, “তোমার স্যার আর কি বলবেন, তার আগে আমিই তোমাকে ঘটনা শুনাই!” জামাল উদ্দিন স্যার বলেন, “৭৮ বা ৭৯ সালের কথা। একদিন স্যার আমার বাসায় আসেন। সেদিন বাসায় মেহমানদারী করানোর মতো তেমন কিছু ছিল না। আমার স্ত্রী ঘরের ভিতর থেকে যেটুকু ছিল তা-ই সরলভাবে পরিবেশন করেন, আগের দিনের পান্তা ভাত, কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ। কিন্তু তোমার স্যার সে খাবার এমন পরিতৃপ্তি ও আনন্দ নিয়ে চেটে পুটে খেলেন যে তা আমার স্ত্রীর মনে গভীর প্রভাব ফেলল।” জামাল স্যার উনার আহলিয়ার কথা উল্লেখ করে বলেছিলেন: “এমন মেহমান যদি আমাদের বাসায় আসে, তাহলে কোনো সংকোচ বা চিন্তার কিছু নেই। যিনি পান্তা ভাত এমন তৃপ্তি নিয়ে খেতে পারেন, তার মেহমানদারিতে হৃদয়ের আনন্দ পাওয়া যায়, তার মেহমানদারিতে কোনো সমস্যা নাই।” এর পর থেকে জামাল উদ্দিন স্যার, এর বাসায় অন্তরের ইচ্ছা হয়ে গিয়েছিল, যখনই মুশফিক স্যার বাসায় আসেন, তার জন্য যত্ন করে বিভিন্ন আইটেম প্রস্তুত করবেন এবং এমনভাবে পরিবেশন করবেন যেন স্যার প্রতিটি আইটেম খান। তাই একসঙ্গে সব কিছু না দিয়ে, ধীরে ধীরে পরিবেশন করতেন, যাতে কোনো কিছু বাদ না পড়ে, এবং স্যার যেন স্বাচ্ছন্দ্যে সবকিছু (প্রতিটা আইটেম) উপভোগ করতে পারেন।

২৪৮. স্যার প্রায়ই বলতেন যে, নিশ্চুপ থাকা, আর নিষ্ক্রিয় থাকা…

স্যার প্রায়ই বলতেন যে, নিশ্চুপ থাকা, আর নিষ্ক্রিয় থাকা, এক জিনিস নয়। অনেক সময় নিশ্চুপ ব্যক্তিরাই দুনিয়ার অনেক মহান কাজ করে গেছেন। অনেক মহান কাজ নিশ্চুপ ব্যক্তিদের হাত ধরেই সম্পন্ন হয়েছে। অনেকে যারা প্রকৃতভাবে দ্বীনের কাজের বোঝা বহন করেন, অনেক সময় তাদের বাহ্যিক কর্মকম্প বা উচ্চারিত শব্দ থাকে না, কিন্তু ভেতরে তারা উত্তাল এক বাতেনী দায়িত্ব পালন করে যান। এই প্রসঙ্গে স্যার আমাদের তাবলিগ জামাতের তৃতীয় আমির হযরতজী এনামুল হাসান রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর উদাহরণ দিতেন। বাহ্যিক দৃষ্টিতে উনাকে কোনো বিশেষ দায়িত্বে বা ছোটাছুটিতে দেখা যেত না। তিনি ছিলেন একেবারেই চুপচাপ প্রকৃতির মানুষ। কিন্তু উনার এই বাহ্যিক নীরবতা ছিল উনার গভীর চিন্তা, পরিকল্পনা ও আল্লাহর সাথে একান্তে সংযোগের একটি রূপ। তিনি নীরবে থেকেই সারা পৃথিবীতে তাবলিগের কাজকে এমনভাবে আঞ্জাম দিয়েছেন যা সত্যিই অভাবনীয়। একবার স্যারের এক ভাগ্নে কৌতূহলবশত হযরতজী সম্পর্কে জানতে চাইলেন। তিনি স্যারকে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমাদের চিফ বস কী করেন?” স্যার খুব সহজভাবে উত্তর দিলেন, “ওনাকে তো পান খাওয়া ছাড়া আর কোনো কাজ করতে দেখি না (তিনি কোনো বয়ান করেন না, তালিম করেন না, গাশত করেন না, বই লেখেন না, ছোটাছুটি করেন না… বসে বসে পান খাওয়া ছাড়া উনাকে আর কোনো বিশেষ কাজে দেখা যায় না।)” স্যার জানতেন ভাগ্নে বিচক্ষণ ও সমঝদার মানুষ, স্যারের এই আপাত সহজ উত্তরটি ভাগ্নের বুঝতে একটুও বাকি রইল না। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে উত্তর দিলেন, “এটাতো (পান খাওয়া) বড় কঠিন কাজ।” বাহ্যিক কর্মের চেয়ে নীরবতার মাঝে যে গভীর আধ্যাত্মিক শক্তি ও কর্মতৎপরতা লুকিয়ে থাকে, তা তিনি বুঝেছিলেন। বাহ্যিক দৃষ্টিতে তুচ্ছ মনে হলেও, প্রকৃতভাবে এটি (এই পান খাওয়া) ছিল এক পর্দার আড়ালের ইন্তেজামী ও রূহানী নেতৃত্ব, যার প্রভাব গোটা দুনিয়ার উপর পড়েছে। পরবর্তীতে স্যার এই প্রসঙ্গে বলেছিলেন, “এই একটা পান খানেওয়ালা মানুষ দুনিয়াতে না থাকার কারণেই আজ দুনিয়াতে (তাবলিগী মহলে) এই বেহাল অবস্থা। ওই রকম একটা পান খানেওয়ালা মানুষ আর নেই।” এর মাধ্যমে স্যার বোঝাতে চেয়েছিলেন, হযরতজীর নীরবতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা আত্মিক শক্তি ও আল্লাহর সাথে গভীর সম্পর্কের অভাব আজ অনুভব হচ্ছে। এই আলোচনার ধারাবাহিকতায় স্যার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মক্কী জীবনের গুরুত্বপূর্ণ দিকের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। মক্কায় কাফেরদের অমানবিক অত্যাচার চরম পর্যায়ে পৌঁছেছিল। হযরত বেলাল রাদিআল্লাহু তাআলা আনহু, হযরত খাব্বাব রাদিআল্লাহু তাআলা আনহু, হযরত সুমাইয়া রাদিআল্লাহু তাআলা আনহা এবং উনার পরিবারের ওপর নির্মম নির্যাতন চলছিল। উনাদের ছোট সন্তান আবদুল্লাহ রাদিআল্লাহু তাআলা আনহু-সহ পুরো পরিবারকে শহীদ করে দেওয়া হয়েছিল। মক্কায় বাইতুল্লাহ এর মধ্যে ৩৬০টি মূর্তি। এমন করুণ পরিস্থিতিতে বাহ্যিক দৃষ্টিতে তো এমনই মনে হয় যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোনো তাৎক্ষণিক ভূমিকা নিচ্ছেন না; তিনি যেন চুপচাপ। না কোনো প্রতিবাদ করছেন, না প্রকাশ্যে কিছু বলছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঐসময় বাহ্যিকভাবে নিশ্চুপ ছিলেন ঠিকই, কিন্তু নিষ্ক্রিয় ছিলেন না। এই নিশ্চুপতা ছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর গভীর দূরদৃষ্টি, কৌশলগত পরিকল্পনা এবং অবিচল প্রত্যয়ের প্রতিচ্ছবি, একটি নির্দিষ্ট পথের দিকে নীরবে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি চিন্তা-ভাবনা করছিলেন, পরিকল্পনা সাজাচ্ছিলেন এবং উম্মতের জন্য সঠিক দিকনির্দেশনা তৈরি করছিলেন। তিনি মোটেও বিকারগ্রস্ত হয়ে বসে ছিলেন না। স্যার বলেন, কোনো পরিস্থিতিতে হয়তো আমরা কিছু বলতে বা করতে পারছি না, বাহ্যিকভাবে চুপ থাকতে হচ্ছে, এটি গ্রহণযোগ্য। কিন্তু দীনের দায়িত্ব বা তাকাজার ব্যাপারে নিষ্ক্রিয় থাকাঅর্থাৎ, কোনো দায়ভার নেই বা কোনো দায়িত্ব নেই, এমন নিষ্ক্রিয় থাকা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। যে ব্যক্তি এমন নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়, সে যেন নিজেকে উম্মত থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে, উম্মতের পরিচয়কেই ঝাপসা করে দেয়, যেন নিজেকে উম্মতের কাঠামো থেকে আলাদা করে ফেলে (উম্মত চুপ থাকতে পারে, কিন্তু দায়িত্বহীন হতে পারে না)!

২৪৯. সিলেটের গহরপুরের একজন প্রখ্যাত আলেম ও মুহাদ্দিস ছিলেন হযরত…

সিলেটের গহরপুরের একজন প্রখ্যাত আলেম ও মুহাদ্দিস ছিলেন হযরত নূরুদ্দীন সাহেব রহমতুল্লাহি আলাইহি। একবার কাকরাইল মসজিদে তালীমের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। সে সময় তালিম প্রসঙ্গে আলোচনায় কিছু কথা বলতে গিয়ে বলেছিলেন, “কুরআনের আয়াত, হাদীস শরীফ, এগুলো ইলম নিজে নয়, বরং বলা যেতে পারে ইলমের পাত্র। এগুলোর ভিতর ইলম পাওয়া যেতে পারে, তবে ইলম পেতে হলে বিশেষ মেহনতের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়।” হজরত মাওলানার ওই কথা উদ্ধৃত করে স্যার এক সময় কিছু কথায় এই বিষয়টিকে সহজবোধ্য কিছু দৃষ্টান্ত দিয়ে ব্যাখ্যা করেছিলেন। স্যার বলেন, মনে করা যাক একটি পাত্রে দুধ আছে, কিন্তু সেই পাত্র বা বাটি দুধ নয়, তা দুধ ধারণ করছে, দুধ তার ভিতরে আছে। আবার সেই দুধের মধ্যেও মাখন আছে, তবে দুধ মানেই মাখন নয়। মাখন আছে দুধের মধ্যে ঠিকই কিন্তু দুধ কিনলেই মাখন পেয়ে যাবে তাও নয়। মাখন পেতে হলে দুধ ঘেঁটে, পরিশ্রম করে মাখন আলাদা করতে হয়। ঠিক তেমনই, কুরআন-হাদীসের মধ্যে ইলম আছে ঠিকই, কিন্তু তা শুধু পড়ে ফেললেই চলে না (ইলম অর্জন হয় না)। কুরআন-হাদীসের জ্ঞান, জানাশুনা বা মালুমাত এক জিনিস আর ইলম ভিন্ন জিনিস। স্যার বলেন, আমরা সাধারণত ইলম বলতে যেগুলো বুঝি, সেগুলো ইলমের বাইরের কাঠামো, অর্থাৎ পাত্র। স্যার উদাহরণ দেন: দোকানে চা খেতে গেলে আমরা বলি, ‘এক কাপ’ বা ‘এক কাপ দেন।’ প্রায় সময়ই ‘এক পেয়ালা চা দেন’ এরূপ বলা হয় না। অথচ আমরা কাপ বা পেয়ালা চাই না, চাই চা। চা থাকে (পরিবেশন করা হয়) কাপেই, কাপ দেখে চা চিনি। দোকানদার যদি খালি কাপ দিয়ে দেয়, তাহলে কেউ তা গ্রহণ করবে না। স্যার বলেন, অনুরূপ ইলম বহন করে তার বাইরের পাত্র, আয়াত, হাদীস, কিতাব ইত্যাদি; কিন্তু ইলম নিজে এক অন্তর্নিহিত রূহ, যা কিছু বিশেষ মেহনত ছাড়া ধরা দেয় না। ইলম কেবল মুখস্থ জ্ঞান বা তথ্য নয়, বরং তা একটি নূর, যা হৃদয়ে উদিত হয় মেহনত, খালিস নিয়ত, এবং আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে। কুরআন ও হাদীস ইলমের বাহক, কিন্তু সেই ইলম আহরণ করতে হলে তাকওয়া ও আমলের দরজা দিয়ে এগোতে হয়। স্যার বোঝাতে চেষ্টা করেন, মনের একাগ্রতা, আমলের নূর, এবং আত্মার মেহনত ছাড়া আসল ইলম অর্জন অসম্ভব।

২৫০. একবার কোনো কথাবার্তার প্রসঙ্গে মাহফুজ ভাই বলেন, “আট রশির…

একবার কোনো কথাবার্তার প্রসঙ্গে মাহফুজ ভাই বলেন, “আট রশির পীর সাহেব…” এই বাক্য শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই স্যারের চেহারায় এক বিরাট পরিবর্তন দেখা গেল। মুহূর্তের মধ্যে তিনি গম্ভীর হয়ে গেলেন, এবং চেহারায় এক ধরনের রাগ ও অস্বস্তির ছাপ স্পষ্ট ফুটে উঠল। মাহফুজ ভাই নিজেও স্যারের এই আচরণে কিছুটা হতচকিত হয়ে পড়েন। ভেতরে ভেতরে অস্বস্তি নিয়ে স্যারকে জিজ্ঞেস করেন: “স্যার, আমার কি কোনো ভুল হয়েছে?” স্যার তখন সংযত কণ্ঠে কিন্তু দৃঢ়ভাবে বললেন: ”তুমি ‘সাহেব’ বললে কেনো?” ‘সাহেব’ তো একটি সম্মানসূচক শব্দ। কাউকে সম্মান দেখাতে গেলে এই শব্দ ব্যবহার করা হয়। একজন বেদআতির কথা উল্লেখ করতে উনাকে এই সম্মান প্রদর্শন কেনো, সাহেব শব্দ কেনো বললে?” এরপর স্যার আরও বলেন: কোনো বেদআতি ব্যক্তিকে সম্মান করা মানে হলো, দীনকে ধ্বংস করার কাজে অংশ নেওয়া। যাকে দীন থেকে বিচ্যুতি করার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে (যেমন বিদআতি), তাকে সম্মানসূচক উপাধি দিলে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হতে পারে। ‘সাহেব’, বা এধরনের শব্দের ব্যবহার তখনই গ্রহণযোগ্য, যখন তা প্রকৃত সম্মান প্রাপ্তদের জন্য ব্যবহৃত হয়। যার কাজ বাতিল, যার দাওয়াত বিদআতের, তাকে বাহ্যিকভাবে ‘সাহেব’ বলাও, দ্বীনের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। কারণ তা আন্তরিক সম্মানের ইঙ্গিত দেয়, যা একটি ভ্রান্ত পথকে “পরোক্ষ বৈধতা” দিচ্ছে, এমনটা দ্বীন সহ্য করতে পারে না। এই কথার স্মরণ করতে গিয়ে মাহফুজ ভাই বলেন, এই প্রশ্নের মধ্যেই ছিল স্যারের ঈমানী বোধ, দীন রক্ষার স্পষ্ট মিযাজ এবং সুন্নতের প্রতি ভালোবাসার এক নিখাদ পরিচয়। এই কথাটি স্যার শুধু কথার সৌন্দর্যে বলেননি, বরং তা ছিল হক ও বাতিলের মাঝখানের সীমারেখাকে স্পষ্ট করে দেওয়া। স্যার বোঝাতে চেয়েছেন, দ্বীনের ক্ষেত্রে ভাষা ও শব্দের ব্যবহারও দ্বীনদারীর অংশ।

২৫১. আহলে হাদিস সম্প্রদায়ের কিছু আলেম ওলামা ও শায়েখদেরকে যে…

আহলে হাদিস সম্প্রদায়ের কিছু আলেম ওলামা ও শায়েখদেরকে যে তারা আলেম মনে করে, এপ্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে স্যার একবার বলেন, এদেরকে যে তারা আলেম শায়েখ মনে করে এটা তাদের কোনো গভীর পাপের প্রতিফল। পাশে বসা মাহফুজ ভাই, যিনি নিজেও একজন কট্টর আহলে হাদিস পরিবেশে বেড়ে ওঠা আহলে হাদিস পরিবারের একজন, জিজ্ঞেস করেন: ”স্যার, এই পাপটা কী? এটা কি আল্লাহওয়ালা এবং ফোকাহাদের প্রতি বিদ্বেশপ্রসূত কোনো গভীর (অন্তর্জাগতিক) পাপ?” স্যার দৃঢ় কণ্ঠে উত্তর দেন: ”হ্যাঁ। একদম সঠিক। আল্লাহওয়ালা ও ফোকাহাদের প্রতি বিদ্বেষ। এই বিদ্বেষ কেবল সাধারণ বিদ্বেষ নয়, বরং জগৎশ্রেষ্ঠ সকল ইমাম, ফোকাহা, এবং আল্লাহওয়ালাদের প্রতি চরম বিদ্বেষ তারা পোষণ করে।” ইমাম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি আলাইহি, ইমাম শাফেয়ী রহমাতুল্লাহি আলাইহি, ইমাম মালেক রহমাতুল্লাহি আলাইহি, ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহমাতুল্লাহি আলাইহি, মাওলানা জালাল উদ্দিন মুহাম্মদ রুমি রহমাতুল্লাহি আলাইহি, মাওলানা ইলিয়াস রহমাতুল্লাহি আলাইহি, এমন যারা ইসলামী জ্ঞান, ফিকহ এবং আধ্যাত্মিকতার ক্ষেত্রে যুগের পর যুগ ধরে উম্মাহকে পথ দেখিয়েছেন, তাদের প্রতি চরম বিদ্বেষ এরা পোষণ করে। স্যার বোঝাতে চান, এটা তাদের হৃদয়ের গভীর পচন ও আত্মিক স্খলন, এক গভীর পাপ। এই পাপের ফলেই আল্লাহ পাক তাদের ওপর এমন গজব চাপিয়েছেন যে, তারা কিছু ফাসেক ও আত্মিক নূরবিচ্ছিন্ন ব্যক্তিদেরকে (তাদের প্রচারণা ও মিশনের ফাঁদে) আলেম ও শায়েখ হিসেবে গণ্য করতে শুরু করে, যা এক গভীর আধ্যাত্মিক অন্ধত্ব। যে জাতি ইলম ও রুহানিয়াতের আসল অভিভাবকদের অস্বীকার করে, তাদের নেতৃত্ব অবধারিতভাবেই ইলমহীনদের হাতে চলে যায়। আলোচনার একপর্যায়ে প্রসঙ্গ ওঠে সালাফী মিশন ও আরব দুনিয়ার কিছু দেশের বর্তমান হীনতাগ্রস্ত অবস্থার। স্যার বলেন: এরা যখন এই ফোকাহাদের ইজতিহাদ ও ফতোয়াকে অস্বীকার করে, তখন আল্লাহ পাক তাদের ঘাড়ের ওপর আমেরিকাকে চাপিয়ে দেন। এখন আমেরিকা যা বলে তাই মানে, আমেরিকাই এখন তাদের ইমাম। আমেরিকার প্রতিটি নির্দেশ মেনে চলে। (যারা একসময় নিজেদের ইমামদের অনুসরণ করতে অস্বীকৃতি জানায়, আল্লাহ তাদের ওপর এমন বিজাতি ক্ষমতাকে চাপিয়ে দেন, যাদেরকে তারা নিজেদের ইমাম হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য হয়।) আহলে হাদিসরা বিদ’আত প্রসঙ্গে অত্যন্ত কঠোর, এই কথাটি যখন আলোচনায় আসে, তখন স্যার বলেন, বেদআত তাড়াতে গিয়ে তারা শুধু বেদআতই নয়, আদবও তুলে ফেলে। আদব, রুহানিয়াত, ইখলাস, মুহাব্বত, সব ফেলে দেয়। মাথার চুল আঁচড়িয়ে পরিপাটি করতে গিয়ে তারা মাথার চামড়া শুদ্ধ তুলে ফেলে। তারা বিদ’আত দূর করতে গিয়ে এমন চরম পন্থা অবলম্বন করে যে, এর ফলে ইসলামের সৌন্দর্য, ঐতিহ্য এবং উম্মাহর হাজার বছরের স্বীকৃত আদব-ইখলাস, ও রুহানিয়াতকে ধ্বংস করে ফেলে। স্যার গভীর উপলব্ধি থেকে ইঙ্গিত দেন, আল্লাহওয়ালা ও ফুকাহাদের প্রতি বিদ্বেষ একটি আত্মিক জড়ত্বের ফল। বিদ্বেষের এই মেঘ যাদের অন্তরে জমে, তাদের ঈমানের নূর নষ্ট হয়ে পড়ে, এপর্যায়ে হক ও বাতিলের পার্থক্য তার সামনে ধরা পড়ে না।

২৫২. একবার ১০ দিনের জোড়ে, ইজতিমার ময়দানে হযরত মাওলানা সায়ীদ…

একবার ১০ দিনের জোড়ে, ইজতিমার ময়দানে হযরত মাওলানা সায়ীদ আহমদ খান সাহেব, এর নিকট একজন ব্যক্তি এসে তার একটি স্বপ্নের কথা বললেন, যেটি ছিল ইমাম মাহদী আলাইহিস সালামকে নিয়ে। স্বাভাবিকভাবেই এমন স্বপ্ন শুনে অনেকেই অভিভূত হয়ে পড়েন, আবেগে ভেসে যান, ভবিষ্যতের কল্পনায় হারিয়ে যান। কিন্তু হযরত মাওলানা অত্যন্ত সরল ও স্পষ্টভাষায় বললেন: ”ইমাম মাহদী আলাইহিস সালাম কবে আসবেন না আসবেন, সেই চক্করে তুমি পড়ো না। তোমার কাজ তুমি করে যাও।” এই প্রসঙ্গ টেনে স্যার একবার বলেন: “এ ধরনের স্বপ্ন, আলোচনা, অতিরিক্ত চিন্তা ও ভবিষ্যতের আলামতের সঙ্গে ঘটনা মেলানো, সবই অনেক সময় শয়তানের এক সূক্ষ্ম ফাঁদ। যার ভেতর পড়ে মানুষ ইনঅ্যাক্টিভ (নিষ্ক্রিয়) হয়ে পড়ে, আমলহীন হয়ে যায়। সে খুব বড় এক ‘ফিকিরে’ আছে, কিন্তু বাস্তব জীবনের করণীয় থেকে সম্পূর্ণ গাফেল। ইমাম মাহদীর চিন্তায় এতটাই মগ্ন হয়ে পড়ে যে তার ইবাদত, দাওয়াত, আত্মশুদ্ধি, সবই যেন গৌণ হয়ে যায়।” স্যার ব্যাখ্যা করেন, এ ধরণের চিন্তার ফাঁদে পড়া মানুষ, প্রতিদিন দিন গোনে: মাহদী কখন আসবেন? প্রতিটি সমসাময়িক ঘটনা মিলিয়ে দেখে: এই বুঝি আলামত! এই বুঝি দাজ্জালের আগমন! অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ হয়ে অন্যদের বোঝাতে থাকে: এই সময়টা স্পেশাল, এখন মাহদীর যুগ চলছে। বাস্তব দ্বীনি দায়িত্ব, আত্মশুদ্ধির প্রয়াস ভুলে গিয়ে শুধু ঐ কল্পনার মধ্যেই ঘুরপাক খেতে থাকে। স্যার বলেন: “শয়তানের কৌশল তো এটাই, তাকে এমন এক আবেগে ডুবিয়ে দাও, যেন সে তার আসল করণীয় ভুলে যায়। একটা ‘বড়’ ভাবনার নামে তাকে বিভ্রান্ত করো, যেন আজকের প্রয়োজনীয় আমলটাই তার কাছে গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে।” প্রাসঙ্গিক আলোচনায় স্যার অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বোঝাতে চান, ভবিষ্যতের অজানা বিষয় নিয়ে না ভেবে বর্তমানের দায়িত্ব ও করণীয়তে মনোযোগী হওয়াই প্রকৃত হিদায়াতের পথ। অনেক স্বপ্ন, আবেগ, ভাবনা, এসবের মধ্যেও শয়তান তার কৌশল লুকিয়ে রাখে, যেন মানুষ বাস্তব আমল থেকে দূরে সরে যায়। স্যার ইঙ্গিত দেন: ইমাম মাহদী আলাইহিস সালাম কবে আসবেন, সেটা আল্লাহর ইলমে গোপন। কিন্তু আমি আজকের দিনটা কীভাবে কাটালাম, সে হিসাব আমার জন্য নির্ধারিত। মহা চিন্তার নামে যদি আমি বর্তমান আমলের দরজাই বন্ধ করে ফেলি, তাহলে সেটা এক ভয়ংকর আত্মিক ফাঁদ ছাড়া কিছু নয়।

২৫৩. মালদা থেকে দিল্লি পর্যন্ত ট্রেনে সফরকালে ওই সময় হিন্দু…

মালদা থেকে দিল্লি পর্যন্ত ট্রেনে সফরকালে ওই সময় হিন্দু সম্প্রদায়ের কোনো বিশেষ ধর্মীয় অনুষ্ঠান চলছিলো। ফলে রাস্তাঘাট ও স্টেশনজুড়ে গেরুয়া পোশাকধারী বহু যোগী চোখে পড়ছিল। আমিও তখন একটি গেরুয়া-সদৃশ জুব্বা পরে ছিলাম, পূর্বে এই জুব্বা পরেই স্যারের সাথে বহুবার সফর করেছি, জামাতে গিয়েছি, কিন্তু স্যার কখনো এর রঙ নিয়ে কিছু বলেননি। কিন্তু সেদিন পরিবেশ ছিল আলাদা। সেই দিন ট্রেনে, ও স্টেশনগুলোতে হিন্দু যোগীদের ব্যাপক উপস্থিতির মধ্যে আমার পোশাক যে একপ্রকার তাদের সাথে রঙের দিক থেকে মিলে যাচ্ছে, তা আমি খেয়াল করিনি। অথচ স্যার অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে তা লক্ষ্য করেন। যদিও আমি বিষয়টি নিয়ে বিচলিত ছিলাম না, স্যার তা সতর্কতার সাথে পর্যবেক্ষণ করছিলেন। ট্রেনের মধ্যেই স্যার অত্যন্ত কোমল ও স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বললেন: ”তোমার জামাটা চেঞ্জ করে নিলেই বোধ হয় ভালো।” স্যারের কথাটি ছিল অত্যন্ত সাধারণ এবং নিরুত্তাপ। আমি মনে মনে পোশাক পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিলেও, স্যারের কথার সময়োপযোগী গুরুত্ব ও ইঙ্গিত আমি বুঝতে পারিনি। আমি ভেবেছিলাম, যেহেতু এখন পরা অবস্থায় আছি, ট্রেনেই পরিবর্তন করার দরকার নেই, দিল্লিতে পৌঁছে পরিবর্তন করব। স্যারের কথার উত্তরে আমি বললাম, “হ্যাঁ, এদের (যোগীদের) সাথে একই রকম লাগছে, দিল্লি গিয়ে পরিবর্তন করে নেব, ইনশাআল্লাহ।” স্যার হয়তো মুহূর্তের বাস্তবতা ও পরিবেশের হুকুম অনুযায়ী রঙের সামঞ্জস্যতা এড়ানোর জন্য তখনই পরিবর্তনের আশা করেছিলেন, আমি তা বুঝে উঠতে পারিনি। স্যার যাত্রাপথে এ বিষয়ে আর বিশেষ কিছু বলেননি। সে সময় নিজামুদ্দিন মারকাজে বাংলাদেশের জোড় চলছিল, বেশ ভিড় ছিল। স্যারের কথা আমার মনে ছিল, কিন্তু আমি ভেবেছিলাম গোসলের সময় পোশাক খুলে অন্য পোশাক পরে নেব। নিজামুদ্দিন মারকাজে পৌঁছে যখন আমি সেই জুব্বাতেই ঘোরাফেরা করছিলাম, স্যার কিছুটা কঠোর গলায় বললেন, ”তোমার জামাটা পরিবর্তন করার কথা ছিল!” স্বাভাবিকভাবে স্যার কখনো এমন বিরক্তির স্বরে কথা বলেন না। স্যারের এই ছোট কথাতেই স্যারের তখনকার মনোভাব সহজেই আঁচ করতে পারলাম এবং পরনের জুব্বাটি খুলে অন্য একটি পোশাক পরে নিলাম। স্যারের এই সাধারণ অথচ জোরালো নির্দেশনায় মনে হচ্ছিল শরঈ দৃষ্টিতে বৈধ পোশাক হলেও স্থান-কাল-পাত্র অনুযায়ী সমাজের বার্তাও বিবেচনায় রাখা আবশ্যক। বিশেষত এমন দেশে যেখানে ধর্মীয় পরিচিতি স্পর্শকাতর, সেখানে মুসলমানের সাতন্ত্রতা বজায় রাখার জন্য পোশাকে ভারসাম্য রাখা শুধু প্রয়োজন নয়, দায়িত্বও বটে।

২৫৪. হাসান হাবিব ভাই বলেন, এক জুমার দিন আসরের নামাজের…

হাসান হাবিব ভাই বলেন, এক জুমার দিন আসরের নামাজের পর আমি কাকরাইল মসজিদের ভেতরে স্যারকে দেখতে পেয়ে স্যারের কাছে গেলাম। নামাজ শেষে স্যার একাকী বসে আছেন, আত্তাহিয়্যাত অবস্থায় বসে আছেন, মনোযোগের সাথে কিছু পড়ছেন। আমার মনে হলো, হয়তো স্যার সেই দরূদ শরীফটি পাঠ করছেন, যেটির ফজিলত সম্পর্কে প্রসিদ্ধ- “যে ব্যক্তি জুমার দিনে আসরের পর ৮০ বার এই দরূদ পাঠ করবে, তার ৮০ বছরের গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে।” হাসান হাবিব ভাই বলেন, এই প্রসঙ্গে উনার মনে একটি কথা এসে যায়, যা উনি কারও মাধ্যমে শুনেছিলাম — মাওলানা আব্দুল মালেক সাহেব তার ‘জাল হাদীস’ গ্রন্থে এই হাদীসটিকে জাল হিসেবে উল্লেখ করেছেন। যদিও উনি সরাসরি সেই কিতাব পড়েননি, তবে কথাটি নির্ভরযোগ্য একজনের মুখে শুনেছেন। উনি বলেন, আমি স্যারের কাছে গিয়ে চুপচাপ বসে রইলাম। স্যার আমার দিকে একবার তাকালেন, কিন্তু আমল চালিয়ে যেতে থাকলেন। আমল শেষে আমি স্যারের কাছে নম্রভাবে জিজ্ঞেস করলাম: “স্যার, আপনি কি ওই দরূদ শরীফটি পড়ছিলেন যে জুমার দিন আসরের পর ৮০ বার পড়লে ৮০ বছরের গুনাহ মাফ হয়?” স্যার বললেন, “হ্যাঁ, ওইটাই।” আমি বললাম, “স্যার, শুনেছি মাওলানা আব্দুল মালেক সাহেব নাকি এই হাদীসটিকে জাল হিসেবে উল্লেখ করেছেন।” এই কথা বলার পর হঠাৎ স্যারের চেহারায় এক দৃঢ় রাগ ও ক্ষোভের ছাপ দেখা দিলো- স্যার প্রচণ্ড ক্ষেপে গেলেন, এমন ক্ষিপ্ত অবস্থায় আমি স্যারকে পূর্বে কখনও দেখি নাই। বিরবির করে কিছু বললেন, তবে তার গাম্ভীর্য ও তীব্রতার কারণে আমি তখন ঘাবড়ে গিয়ে কিছুই বুঝে উঠতে পারিনি। মনে হচ্ছিল, স্যার খুব কষ্ট পেয়েছেন। আমি ভয়ে উঠে চলে গেলাম। পরে স্মরণ করার চেষ্টা করলে স্যারের বলা কথার সারমর্ম এই ছিল — এই হাদীসের সনদ নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, আমাদের আকাবির ও বুযুর্গানে দ্বীন (যেমন হাকীমুল উম্মত থানভী রহমতুল্লাহ, মাওলানা ইউসুফ কান্ধলভী রহমতুল্লাহ, মাওলানা জাকারিয়া রহমতুল্লাহ প্রমুখ) এই আমলটি করে এসেছেন এবং তা তাদের তরীকার অংশ হিসেবে প্রমাণিত। তাদের আমলের উপর আমাদের ভরসা থাকা উচিত।

২৫৫. পোশাক শুধু শরীর ঢাকার জন্য নয়; এটি একটি সামাজিক…

পোশাক শুধু শরীর ঢাকার জন্য নয়; এটি একটি সামাজিক ভাষাও। এক অঞ্চলে কোন পোশাক কারো ধর্ম বা সম্প্রদায়ের পরিচায়ক, সেটা ভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন অর্থ বহন করতে পারে। এই বাস্তবতা বোঝা জরুরি। এপ্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে একসময় স্যার উদাহরণ স্বরূপ বললেন– “বাংলাদেশে শাড়ি মুসলমান নারী এবং হিন্দু নারী, উভয়ের মাঝেই বহুল প্রচলিত। এখানে একজন মুসলিম নারী শাড়ি পরলে তাতে ধর্মীয় বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয় না। কিন্তু ভারতে এর বিপরীত। ভারতে শাড়ি মূলত হিন্দু নারীদের সাংস্কৃতিক পোশাক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। মুসলিম নারীরা সাধারণত সালোয়ার কামিজ পরেন। সেখানে যদি একজন মুসলিম নারী শাড়ি পরে কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে যান, তাহলে উপস্থিত লোকেরা উনার ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে বিভ্রান্ত হতে পারে।” এই কথার সাথে সাথে স্যার আরেকটি বিষয় তুলে ধরেন– “এক সময় বাংলাদেশে মুসলিম নারীরা কপালে টিপ দিতেন। কিন্তু এখন এই অভ্যাস নেই বললেই চলে। বর্তমানে কপালে টিপ দেওয়া, বিশেষ করে লাল টিপ, মূলত হিন্দু নারীদের সংস্কৃতির অংশ। তাই আজকের প্রেক্ষাপটে মুসলিম নারীর জন্য কপালে টিপ দেওয়া সাজসজ্জার অংশ হিসেবে ঠিক নয়। এটা তার ধর্মীয় পরিচয়কে অস্পষ্ট করে তোলে। মুসলমানের সাজগোজ এমন হওয়া উচিত, যাতে করে সে আলাদা হয়ে চেনা যায়, গুলিয়ে ফেলা না যায়।” এরপর স্যার এক ঘটনা দিয়ে ব্যাখ্যা করলেন– “একটি মুসলিম নারী কপালে বড় লাল টিপ পরে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন। খানা পরিবেশনকারী ওয়েটার উনাকে আলাদাভাবে জিজ্ঞেস করলো, ‘আপনি গরুর গোশতের কাবাব খাবেন কি না?’ কারণ সে বুঝতে পারছিল না, ঐ নারী হিন্দু না মুসলিম। এই বিভ্রান্তির উৎস ছিল কপালের লাল টিপ।” পরে স্যার পাগড়ির প্রসঙ্গে বললেন– “বাংলাদেশে কালো পাগড়ি পরা যায়, এতে কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু ইরানে গিয়ে কেউ যদি কালো পাগড়ি পরে, সেটা শিয়া আলেমদের প্রতীক হিসেবে ধরা হয়। সেখানে সুন্নি কেউ যদি এটা পরে, তা বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে।” স্যার নিজের জীবনের একটি বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা শোনালেন, যা তিনি আমেরিকা সফরের সময়ে নিজে ভোগ করেছিলেন। স্যার বললেন– “আমি আমেরিকায় রাস্তায় হাঁটছিলাম, মাথায় কালো পাগড়ি ছিল। হঠাৎ একটি চলন্ত গাড়ি আমার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় গাড়ির ভেতর থেকে একজন চিৎকার করে উঠলো, ‘এই আয়াটুললাহ!’, এই বলে পেপসির বোতল ছুড়ে মেরে দিলো আমার মাথায়।” স্যার বললেন, ঘটনার পর স্থানীয় সাথিরা বললো, কালো পাগড়ি এখানে (আমেরিকায়) অনেকের চোখে শিয়া বা মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক কট্টরপন্থার প্রতীক হিসেবে ধরা হয়, এখানে রাস্তায় পাগড়ি পরে বের হবে না, শুধু টুপি পরে বের হবে। এভাবেই স্যার পোশাক ও আচার-আচরণে সামাজিক প্রেক্ষাপটের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করলেন। স্যার আরও বলেন– “আমাদের দেশে পাগড়ি নানা রঙের হতে পারে। কিন্তু ভারতে রঙিন পাগড়ি আবার শিখ ধর্মাবলম্বীদের সাংস্কৃতিক প্রতীক। সেখানে মুসলমানদের এমন রঙিন পাগড়ি ব্যবহার বিভ্রান্তির সৃষ্টি করতে পারে।” এসব আলোচনা থেকে স্যার বোঝাতে চেয়েছিলেন, ইসলামি পরিচয় শুধু কথায় নয়, আচরণে ও পোশাকে-পরিচ্ছদেও প্রকাশিত হওয়া উচিত। স্থানভেদে যে বিষয়টি নিছক রুচি বা অভ্যাস, অন্যত্র তা ধর্মীয় প্রতীক হয়ে উঠতে পারে। একজন মুসলমানের উচিত, পোশাক ও সাজসজ্জায় নিজের পরিচয়কে পরিষ্কার রাখা, ও এমন কিছু পরিহার করা যা অন্য ধর্মের অনুসারীদের অনুকরণ বা বিভ্রান্তির কারণ হয়।

২৫৬. একবার মুফতি ফয়জুল্লাহ রহমতুল্লাহি আলাইহি – কে কেউ প্রশ্ন…

একবার মুফতি ফয়জুল্লাহ রহমতুল্লাহি আলাইহি – কে কেউ প্রশ্ন করলেন: ”পাগড়ি কত হাত লম্বা হওয়া উচিত?” তিনি উত্তরে বললেন: ”যত হাত হলে পাগড়ি মনে হয়।” (এমন যেন না হয় যে একেবারে ব্যাণ্ডেজ এর মতো সামান্য কিছু মাথায় জড়িয়ে রাখা হয়েছে, আবার এমনও না হয় যে ৫০ হাত লম্বা কাপড় জড়িয়ে। বরং এমন পরিমাণ হওয়া উচিত যাতে সেটিকে বাস্তবসম্মত এবং পাগড়ি বলা যায়।) এরপর উনাকে জিজ্ঞেস করা হলো: ”পাগড়ির রং কী হওয়া উচিত?” উনি বললেন: ”বিভিন্ন রং (বিভিন্ন রঙের হতে পারে।)” (উনার এই উত্তরের অর্থ এই নয় যে শরীয়তে পুরুষদের জন্য যেসব রং নিষিদ্ধ, সেগুলোকেও বৈধ বলা হয়েছে। বরং, শরীয়তের সীমারেখার মধ্যে থেকেই বিভিন্ন বৈধ রঙ ব্যবহার করা যেতে পারে) এই কথাগুলো যখন স্যার বলেছিলেন, তখন তিনি এক গভীর শ্রদ্ধা ও মুগ্ধতার সাথে কথায় জোর দিয়ে বলেন: ”উনি (মুফতি সাহেব) একথা বলবেন না কেন? মুফতিই তো!…” স্যারের কথায় এরকম ইঙ্গিত ছিলো যে এই সংক্ষিপ্ত অথচ গভীরতায় পূর্ণ উত্তরের ভেতরেই একজন প্রকৃত মুফতির পরিচয় লুকায়িত। কারণ, তিনি এমন উত্তর দিয়েছেন যা একদিকে শরীয়তের সীমা ছাড়ায় না, আবার অপরদিকে সাধারণ মানুষের ফিতরতের (স্বভাবগত অনুভূতি ও বাস্তবতা) সাথে সম্পূর্ণ সঙ্গতিপূর্ণ। স্যার বোঝাতে চান, মুফতী সাহেবের এই উত্তরে আছে ভারসাম্য, প্রজ্ঞা এবং বাস্তবতার বিবেচনা, যা একজন আলিমের বিশেষ গুণ। কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যায় বা কঠোর সীমারেখায় আটকে না থেকে শরীয়তের মূল উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে সহজ, সংবেদনশীল ও বাস্তবসম্মত জবাব, এটাই “ফিকহি এলেমের” নিখুঁত সৌন্দর্য।

২৫৭. এক বয়ানে স্যার বলছিলেন, আজকের দুনিয়ার যেকোনো মাদ্রাসার যেকোনো…

এক বয়ানে স্যার বলছিলেন, আজকের দুনিয়ার যেকোনো মাদ্রাসার যেকোনো পরীক্ষায় যদি কোনো এক সাহাবি অংশ নেন, তবে তিনি শুধু ফেলই করবেন না, বরং ‘জিরো’ পেয়ে ফেল করবেন। কারণ, আজ যেসব বিষয়ে মাদ্রাসায় পড়ানো হয়, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে সেগুলোর অস্তিত্বই ছিল না। প্রথম ক্লাসে মক্তব থেকে শুরু হয় ‘আলিফ, বা, তা, ছা’ শেখা। অথচ সাহাবাদের যুগে এই পড়াশুনা ছিলো না। আজ যেটা দ্বারা ‘বা’ ‘তা’ ও ‘ছা’ আলাদা হয়, আরবী অক্ষরগুলোর নিচে উপরের ‘নোকতা’, সেসব নিছক পরবর্তীকালের সৃষ্টি। যদি নোকতাই না থাকে, তাহলে ‘জিম, হা, খা’, এসব চেনা যাবে কীভাবে? যদি মূল অক্ষরই না থাকে, তাহলে বাকিটা তো শুরুই হয় না। তারপর, আজ আমরা যেসব শাস্ত্রে (ইলমে) গর্ব করি, তাফসির, হাদিস, ফিকাহ, নাহু-সারফ, এইসবের সংজ্ঞা যদি সাহাবাদের সামনে রেখে জিজ্ঞেস করা হয়, একজন সাহাবিও উত্তর দিতে পারবেন না। কোনও এক জন সাহাবী কে যদি জিজ্ঞেস করা হয় যে ‘হাসান হাদিস আর জইফ হাদিসের মধ্যে পার্থক্য কী?’ একজন সাহাবিও উত্তর দিতে পারবেন না। তাহলে প্রশ্ন আসে, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট থেকে তারা কী শিখেছিলেন? তাদের এলেম টা আসলে কী ছিল? অক্ষর জানতেন না, সংজ্ঞা জানতেন না, গ্রামার জানতেন না, তাফসির-ফিকাহের বর্তমান কাঠামো জানতেন না, তাহলে সাহাবিদের ‘ইলম’ আসলে কী ছিল? সাহাবিরা জানতেন না ‘ইলম’ কী, কিন্তু তারা ছিলেন ইলমের জীবন্ত রূপ। তারা জানতেন না ‘তাফসির’ কী, কিন্তু তারা বুঝতেন কুরআনের প্রাণ। তারা জানতেন না ‘ফিকাহ’ কী, কিন্তু তারা ছিলেন আল্লাহর হুকুমের অনুসারী প্রতিটি পদক্ষেপে। স্যার বলেন, তাদের এলেম ছিলো, আল্লাহর সাথে এক গভীর সম্পর্ক, এমন এক সম্পর্ক, যা থেকে জন্ম নিতো আল্লাহর ইচ্ছাকে বোঝার ক্ষমতা। আর সেই ইচ্ছানুযায়ী চলতে তাদের অন্তর পেতো শান্তি, তৃপ্তি, এক অপরিমেয় আনন্দ। এটাই ছিল তাদের এলেম।

২৫৮. স্যার বলতেন, অনেক বড় জিনিসের পরিচয় দিতে গেলে, সেটাকে…

স্যার বলতেন, অনেক বড় জিনিসের পরিচয় দিতে গেলে, সেটাকে একটা ছোট সংজ্ঞার গন্ডির মধ্যে ঢোকানো যায় না। সহজ জিনিসের সংজ্ঞা সহজ হয়, কিন্তু অর্থ যত গভীর হয়, তার সংজ্ঞা তত কঠিন হয়। আমরা কোনো জিনিসের সীমানা দেখিয়ে তাকে চিনি। ম্যাপে যেমন বলা হয়, এইটা ঢাকা, এইটা বাংলাদেশ, এইটা আমেরিকা, তেমনি সংজ্ঞাও হচ্ছে এক ধরনের বর্ডারলাইন। কিন্তু যদি কোনো কিছুর সীমা-পরিসীমাই না থাকে, তবে তাকে সংজ্ঞা দিয়ে ধরা যায় না। এইজন্যই আল্লাহর পরিচয় এ বলা হয়েছে: তার সদৃশ কিছুই নেই। আল্লাহর পরিচয় নেতিবাচক ভাষায়, “এইটা না, ওইটা না” এজাতীয় কিছু বলা হয়, কিন্তু ইতিবাচকভাবে বলা মুশকিল, “এইটাই আল্লাহ।” কারণ, আল্লাহর সত্তা সীমাহীন, অনন্ত। তাকে সংজ্ঞায় বাঁধা যায় না, চিনতে হয়। স্যার বলেন, তেমনি সাহাবিদের এলেমও সীমাবদ্ধ কোনো সংজ্ঞার মধ্যে বন্দি ছিল না। আজ আমরা কুরআন-হাদিসভিত্তিক যেসব শাস্ত্র নিয়ে গর্ব করি, সেগুলো নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শাস্ত্রের কাঠামোকে যদি আমরা এলেমের পূর্ণতা মনে করি, তাহলে আমরা সাহাবিদের এলেমের রূপরেখা হারিয়ে ফেলব। স্যার বোঝাতে চান, এলেম মানে শুধু তথ্য নয়, এলেম মানে আল্লাহর দিকে যাত্রা। এলেম মানে মুখস্থ সংজ্ঞা নয়, এলেম মানে হৃদয় দিয়ে বুঝে ফেলা, কোনটা আল্লাহ চায়, আর কোনটা চায় না। এটা এমন এক দ্যুতিময় উপলব্ধি, যেখানে হৃদয় ও আমল আনন্দের সাথে আল্লাহর দিকে ফিরে।

২৫৯. স্যার বলতেন, সাহাবাদের জ্ঞান বা ‘এলেম’ ছিল এক বিশেষ…

স্যার বলতেন, সাহাবাদের জ্ঞান বা ‘এলেম’ ছিল এক বিশেষ ধরনের উপলব্ধি, যা কেবল তথাকথিত মালুমাত বা পাণ্ডিত্য ছিল না। এটি ছিল আল্লাহ তাআলার সাথে এক গভীর আত্মিক সম্পর্ক, যার মাধ্যমে উনারা আল্লাহর ইচ্ছা বুঝতে পারতেন এবং সেই ইচ্ছা পালনে নিজেদের অন্তরে অনাবিল আনন্দ অনুভব করতেন। স্যার একটি সুন্দর উপমার মাধ্যমে এই বিষয়টি পরিষ্কার করেছেন। একজন মা যেমন তার সন্তানের প্রতিটি কান্নাকে আলাদা আলাদাভাবে বুঝতে পারেন, যদিও সন্তানের ভাষা কেবল একটাই, কান্না। বাচ্চা জাগতে চাইলেও কাঁদে, ঘুমাতে চাইলেও কাঁদে, ঠান্ডায় কাঁদে, গরমেও কাঁদে, খেতে চাইলেও কাঁদে, এমনকি না খাওয়ার ইচ্ছাও কান্না দিয়েই প্রকাশ করে। প্রতিটি কান্নার সুর এক হলেও একজন মা তার সন্তানের কান্নার ভিন্ন ভিন্ন অর্থ অনুধাবন করতে পারেন। বিভিন্ন হালতে বাচ্চার একই ধরনের কান্নার সুরের ভিন্ন ভিন্ন তফসীর মায়ের কাছে পরিষ্কার। তিনি শুধু সন্তানের প্রয়োজনই বোঝেন না, বরং সেই প্রয়োজন পূরণ করতে পেরে তিনি নিজে আনন্দিত হন। স্যার বলেন, মা যখন বুঝতে পারেন বাচ্চা দুধ খেতে চাইছে তাই কাঁদছে, তখন তিনি তাকে দুধ দেন। এই কাজটি করতে উনার মনে কোনো বিরক্তি আসে না, বরং ভালো লাগে। আবার, বাচ্চা কান্না করছে তো মা টের পেয়ে যান ও কোলে উঠতে চাইছে, মা ক্লান্ত থাকা সত্ত্বেও, এমনকি নিজের জ্বর বা অসুস্থতা সত্ত্বেও উঠে দাঁড়িয়ে তাকে কোলে তুলে নেন। এই কাজটিতেও তিনি পরম আনন্দ পান। এটিই হলো সন্তানকে গভীরভাবে চেনা। সাহাবায়ে কেরামের ‘এলেম’ও ছিল ঠিক এমনই। উনারা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সান্নিধ্যে থেকে আল্লাহ তাআলা উনাদের কাছে কী চান, তা বুঝতে পারতেন। সেই চাওয়া পূরণের জন্য উনারা নিজেদের প্রস্তুত করতেন এবং আল্লাহর ইচ্ছা পালনে এক গভীর আনন্দ অনুভব করতেন। এই সবকিছু মিলেই ছিল উনাদের ‘এলেম’। স্যার বিষয়টি পরিষ্কার করে দেন যে, আজকাল আমরা যেগুলোকে ‘এলেম’ বলি, যেমন বিভিন্ন হাদিস, তফসীর, ফিকাহ, ইত্যাদি এগুলো মালুমাতের বিভিন্ন শাখা, সেগুলো আসলে প্রকৃত ‘এলেম’-এ পৌঁছানোর একটি পথ মাত্র, স্বয়ং ‘এলেম’ নয়। প্রকৃত ‘এলেম’ হলো আল্লাহর সাথে সেই গভীর সম্পর্ক, উনার ইচ্ছাকে বোঝা এবং তা পালনে আত্মিক তৃপ্তি ও আনন্দ লাভ করা।

২৬০. স্যার বিভিন্ন বয়ান ও মোজাকারায় প্রসঙ্গক্রমে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি…

স্যার বিভিন্ন বয়ান ও মোজাকারায় প্রসঙ্গক্রমে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এই হাদীসটা বলতেন– “আমরা নিরক্ষর উম্মত, লিখিও না, গুনিও (হিসাব করা) না।” “إنا أمة أمية، لا نكتب ولا نحسب” এই প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে স্যার একবার বলেন, আমরা যেসব উপকরণকে বর্তমানে ‘এলেম’ বলি, সেগুলো সাহাবাদের কাছে তেমনভাবে ছিল না। এর অর্থ এই নয় যে উনাদের এলেম ছিল না, বরং উনাদের এলেম ছিল এমন এক গভীর উপলব্ধি, যা প্রচলিত লিখন-পঠনের গণ্ডির ঊর্ধ্বে ছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছ থেকে সাহাবায়ে কেরাম যে এলেম অর্জন করেছেন, তার কোনো নির্দিষ্ট নাম, সুরত, সংখ্যা বা সংজ্ঞা ছিল না। সেখানে ‘ফিকহ’ বা ‘হাদিস’ নামক পৃথক কোনো বিষয় ছিল না, বরং সমগ্র জীবন ও দ্বীন ছিল উনাদের এলেমের আধার।


← আগের পর্ব (২২১–২৪০)  |  সূচিপত্র  |  পরের পর্ব (২৬১–২৮০) →

সংগ্রহ ও সংকলন: মুশফিক আহমদ (রহঃ)-এর মালফুযাত সংকলন।

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *