মালফুযাত – প্রফেসর মুশফিক আহমদ (রহঃ) – পর্ব ১২: ২২১–২৪০
প্রফেসর মুশফিক আহমদ (রহঃ)-এর বয়ান, পরামর্শ, আমল ও দাওয়াতি জীবনের মালফুযাত, ২২১ থেকে ২৪০ নম্বর। সম্পূর্ণ সূচিপত্র দেখুন।
সংগ্রহ ও সংকলন: মুশফিক আহমদ (রহঃ)-এর মালফুযাত সংকলন।
এই পর্বে যা আছে
- ২২১. হজযাত্রীদের উদ্দেশ্যে এক মোজাকারায় স্যার বলেছিলেন, সব আমলেই মূল…
- ২২২. হজযাত্রীদের সাথে মোজাকারায় স্যার বলেন, হাশরের ময়দানে মানুষ উলঙ্গ…
- ২২৩. স্যারের শেষ হজ্জের সফর, ১২/১৩ জন, তিন চারটি এজেন্সির…
- ২২৪. মিনায় অবস্থানকালে একবার এক সাথী বিভিন্ন গাড়ি থেকে বিতরণকৃত…
- ২২৫. মক্কার বাসায় পৌঁছার পর সাথীদের মধ্যে আলোচনা চলছিল, “কাবা…
- ২২৬. স্যার বলতেন, আসল দোয়া হলো অন্তরের চাওয়া, অন্তরের গভীর…
- ২২৭. হজের এক সফরের শুরুতে জামাতের সাথী এক ভাই স্যারকে…
- ২২৮. এক বয়ানে স্যার তওবা ও ইস্তেগফারের পার্থক্য ব্যাখ্যা করতে…
- ২২৯. স্যার ও কাজল ভাই ওই সময় জুবেরী ভবনে একই…
- ২৩০. বর্তমান সময়ের হজ ও ওমরাহর ক্ষেত্রে তানইম থেকে বারবার…
- ২৩১. হজরত মাওলানা লুৎফর রহমান সাহেব রহমতুল্লাহ এর সাথে স্যারের…
- ২৩২. একবার এক ভাই স্যারের নিকট জানতে চাইলেন, “স্যার, গারিব…
- ২৩৩. হজে গমনেচ্ছু কিছু ভাইদের সামনে একবার স্যার হজ্বের উদ্দেশ্য…
- ২৩৪. একবার স্যার রাজশাহী থেকে ঢাকায় ফিরছিলেন। তখনকার দিনে যাত্রাপথ…
- ২৩৫. রুয়েট-এর প্রাক্তন কর্মকর্তা আব্দুল মুমিন ভাইয়ের বাসায় এক বিকেলে…
- ২৩৬. এক সময় কাকরাইলে কিছু বিষয় নিয়ে মুরব্বীদের মাঝে মতপার্থক্য…
- ২৩৭. এক আলোচনায় স্যার বলছিলেন: “আইনস্টাইন, যিনি বিজ্ঞানের দুনিয়ায় এক…
- ২৩৮. স্যার প্রায়শই কোরআনের এই আয়াতটি উদ্ধৃত করতেন: “وَمَا خَلَقْتُ…
- ২৩৯. ইখলাস বোঝাতে স্যার অনেকসময় একটি উপমা দিতেন: এক মেয়ে…
- ২৪০. একবার স্যার বলছিলেন, “দীনের কাজের ফায়দা কেবল তার তরতীব…
২২১. হজযাত্রীদের উদ্দেশ্যে এক মোজাকারায় স্যার বলেছিলেন, সব আমলেই মূল…
হজযাত্রীদের উদ্দেশ্যে এক মোজাকারায় স্যার বলেছিলেন, সব আমলেই মূল উদ্দেশ্য হলো: মানুষের মনকে পার্থিব সকল চিন্তা ও সম্পর্ক থেকে বিচ্ছিন্ন করে একমাত্র আল্লাহর দিকে সম্পূর্ণভাবে মনোনিবেশ করানো। নামাযের শুরু হয় তাকবীরে তাহরীমা দিয়ে। এ তাকবীর এমন এক ঘোষণা, যা সমস্ত পার্থিব সম্পর্ক ও কাজকে ‘হারাম’ বা নিষিদ্ধ করে দেয়। নামায শুরুর মুহূর্তেই মানুষ দুনিয়ার সব ব্যস্ততা থেকে সরে এসে শুধুমাত্র আল্লাহর সামনে দাঁড়ায়, এ যেন একান্তে উনার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার সুযোগ। স্যার ব্যাখ্যা করেন, নামায যেভাবে এই উদ্দেশ্য বাস্তব করে তোলে, হজ্বও একই সাধনারই এক বৃহৎ সংস্করণ। হজ্বেও রয়েছে এই একই বাস্তবতা, এখানেও শুরু হয় ইহরাম দিয়ে। এই ‘ইহরাম’ শব্দটি এবং ‘তাকবীরে তাহরীমা’ উভয়ই এসেছে মূল আরবি শব্দ ‘হারাম’ থেকে, যার অর্থ ‘নিষিদ্ধ’। অর্থাৎ, হজ্ব শুরু করার সাথেই যেমন কিছু কাজ নিষিদ্ধ হয়ে যায়, তেমনি চিন্তা ভাবনার দিক থেকেও এক ধরণের নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হয়। মনের সমস্ত দিক যেন এক আল্লাহর দিকে ঘুরে পড়ে। এ এক বাস্তব হাশরের অনুশীলন, যেখানে মানুষ কারও দিকে খেয়াল রাখে না, শুধু আল্লাহ, শুধুই শুধুই আল্লাহর সন্তুষ্টি! স্যার বলেন, “তাকবীরে তাহরীমা বলার সাথে সাথে কি সব দুনিয়াদার চিন্তা এক মুহূর্তেই চলে যায়? তা তো হয় না! নামাযে দাঁড়ানোর পরও নানা খেয়াল চলে আসে, মন এদিক ওদিক ছুটে বেড়ায়।” তাই হজ্বের প্রস্তুতিও এমন হওয়া উচিত যেন মনকে ধীরে ধীরে প্রশিক্ষিত করা যায়। স্যারের ভাষায়, “এজন্য পূর্ব থেকেই ফিকির করতে হবে, আল্লাহর কাছে দোয়া করতে হবে, চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে যেন হজ্বের সময় অন্য কোনো খেয়াল না আসে।” তিনি জোর দিয়ে বলেন, ফিকাহ্ ও মাসায়েলের সাথে সাথে হজ্বের ফযীলতের অংশগুলোও বারবার করে পড়তে হবে। কারণ এই ফযীলতগুলো পড়লে অন্তরে হজের মাহাত্ম্য ও তলব সৃষ্টি হবে। দুনিয়াবী চাহিদা ধীরে ধীরে কমতে থাকবে, একমাত্র আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টি অর্জনের তলব বাড়তে থাকবে।
২২২. হজযাত্রীদের সাথে মোজাকারায় স্যার বলেন, হাশরের ময়দানে মানুষ উলঙ্গ…
হজযাত্রীদের সাথে মোজাকারায় স্যার বলেন, হাশরের ময়দানে মানুষ উলঙ্গ অবস্থায় পুনরুত্থিত হবে। উম্মুল মু’মিনীন আয়শা রাদিয়াল্লাহু আনহা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “সব মানুষ যখন উলঙ্গ থাকবে, তখন পরস্পরের প্রতি লজ্জা হবে না?” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উত্তর দিলেন, “সেদিন মানুষের অবস্থা এত ভয়াবহ ও দুশ্চিন্তাময় হবে যে, কারো চোখ অন্য কারো দিকে পড়ার অবকাশই থাকবে না।” স্যার বলেন, হজ্বের ইহরামের অবস্থা মূলত সেই হাশরের ময়দানেরই একটি অনুশীলন। ইহরামের কাপড় একটি প্রতীক মাত্র। বাস্তবে, এই অবস্থার উদ্দেশ্য হলো দুনিয়ার সব পরিচয় ও সম্মান পরিত্যাগ করে একমাত্র আল্লাহর সামনে দাঁড়ানো। ইহরামের কাপড়ে মাথা খালি রাখার বিধানটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। দুনিয়ার সমাজে মাথার পোষাক সম্মানের প্রতীক। রাজার মুকুট, আলেমদের পাগড়ি, এসব কিছুই মানুষের মর্যাদা ও পরিচয় বহন করে। অথচ ইহরামে সেই সম্মান পরিচয়ের প্রতীকটিও তুলে ফেলা হয়। যেন বুঝিয়ে দেওয়া হয়, এখন সে ব্যক্তি দুনিয়ার নয়, হাশরের বাস্তবতার ভেতর প্রবেশ করেছে, যেখানে সম্মান, পরিচয়, পদ পদবি সব কিছুই মূল্যহীন। অন্য সময়ে নামাযের মধ্যে মাথা খালি রাখা আদবের পরিপন্থী ধরা হয়, এবং মসজিদগুলোতে নামাযের সময় টুপি রাখা হয় যাতে মাথা ঢেকে নামায পড়া যায়। কিন্তু ইহরামের সময় উল্টো, সেখানে মাথা খালি রাখা ইবাদতেরই অংশ। স্যার বলেন, এই পুরো হজ্বের সফর যেন হাশরের ময়দানের ধ্যানে ও একাগ্রতায় কাটে, এটাই হওয়া উচিত। অন্য সব চিন্তা থেকে মুক্ত থেকে, দুনিয়ার সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করে একমাত্র আল্লাহর স্মরণে মগ্ন থাকা, অন্য কোন খেয়াল নয়, এক খেয়ালের মধ্যে, এক ধ্যানের মধ্যে সম্পূর্ণ সময় কাটানো। তবে এটি কেবল কথায় সম্ভব নয়; একাগ্রতা ও ধ্যান এমন জিনিস নয় যা শুধু মুখে বললেই অর্জিত হয়। এর জন্য চাই পূর্ব প্রস্তুতি, অভ্যাস, নিয়মিত ফিকির ও মুজাহাদা (অভ্যন্তরীণ সাধনা)। দোয়া, আমল, মাসায়েল শেখা, ফাযায়েলের তালিম, এসবের মাধ্যমে নিজের মনকে তৈরি করতে হয়, যেন সম্পূর্ণ সময়টুকু দুনিয়ার কোন ফিকির কোন চিন্তা ভাবনা অন্তরে না রেখে আল্লাহ পাকের স্মরণে মগ্ন থাকা যায়।
২২৩. স্যারের শেষ হজ্জের সফর, ১২/১৩ জন, তিন চারটি এজেন্সির…
স্যারের শেষ হজ্জের সফর, ১২/১৩ জন, তিন চারটি এজেন্সির মাধ্যমে হজ্জে যাওয়া, একত্রে স্যারের সাথে পায়দল রওনা দেই আরাফাতের ময়দানের উদ্দেশ্যে। লক্ষ লক্ষ মানুষের ঢলে আমরাও চলছি এক দিকেই, আরাফাতের দিকে। সকাল গড়িয়ে গেছে, রৌদ্র উঠেছে, সেই রৌদ্রের প্রখর তাপে প্রচণ্ড ভিড়ের মাঝে পায়ে হেঁটে চলেছিলাম। অনেক সফরেই স্যারের সাথে পায়ে হেঁটেছি, কিন্তু সেদিনের এই হাটার সফর ছিলো একেবারে আলাদা। অন্যান্য সফরে স্যার ডানে বামে তাকিয়ে সাথীদের খোঁজ রাখতেন, কথা বলতেন, কথা শুনতেন। কিন্তু আজ, এই সফরে স্যার একেবারে নীরব, যেন তিনি কারও সাথেই নেই, শুধু চলছেন, নিশ্চুপ, একটানা। যারা সাথে ছিলাম কারও দিকেই স্যারের বিশেষ কোনো খেয়াল নেই। মনে হচ্ছিল, স্যারের জানাই নেই, তিনি একা নন। হয়তো স্যারের মন সেদিন অন্য কোথাও, এক ফকিরের মতো এক গভীর ভাবনায় নিমগ্ন, মনে হচ্ছিল যেন এক অদৃশ্য চিন্তা স্যারকে আপন করে নিয়েছে, ভুলিয়ে রেখেছে দুনিয়ার সবকিছু। এক ভাই স্যারের মাথার উপর ছাতা ধরলেন, রোদের তাপ থেকে রক্ষা করার জন্য। রোদের প্রচণ্ড তাপ থেকে একটু যেন রক্ষা করা যায়, এই আশায়। স্যার কোনো প্রতিক্রিয়া দিলেন না, তাকালেন না, বললেনও না কিছু। নীরবে হেঁটে চলেছেন, যেন দুনিয়ার কোনো কিছু দৃষ্টিতে পড়ছে না। স্যারের দীর্ঘ কদমে ঐ ছাতা ধরে থাকা ভাই তাল মিলিয়ে চলতে না পেরে এক সময় ছাতা নামিয়ে ফেললেন। এরই মধ্যে আরেক ভাই স্যারের মাথায় একটা ছোট্ট ছাতি (ক্যাপের মতো ছাতা) লাগিয়ে দিলেন, হাতে ধরে রাখতে হয় না, ইলাস্টিক ব্যান্ডে মাথায় আটকানো থাকে। কপালের ওপর দিয়ে ইলাস্টিকটা স্যারের মাথায় আটকে দিলেন, যাতে স্যার রোদের তাপে কষ্ট না পান। স্যার কিছু বললেন না। নাড়া চাড়া করলেন না। সেই নীরব ভাব আর গভীর চিন্তার জগতেই, চলেছেন নিশ্চুপ। প্রখর রৌদ্রের মধ্যে চলতে চলতে সাথীরা ক্লান্ত, কিছু সময়ের জন্য একটু বিশ্রাম নিলে ভাল হয়, স্যারের দিকে তাকিয়ে চলছি সব সাথি, কেউ কিছু স্যারকে বলছে না, সেই সফর, সেই মুহূর্ত একেবারে অন্যরকম। পথ চলতে চলতে রোদের তাপে ও ভিড়ের চাপে অনেকেই ক্লান্ত হয়ে পড়ছিল, সাথীরা একটু বসে বিশ্রাম নিতে চাইছিল। কেউ স্যারের কাছে সে প্রস্তাব করলে শুধু বললেন, “আগে যাই”, স্যারের চলা থামলো না। আরও কিছুদূর যাওয়ার পর সাথীরা আবারও অনুরোধ করল যেন একটু বসে নেয়া যায়। এবার স্যার একটু বসলেন বটে, কিন্তু মাত্র দুই তিন মিনিট। তারপর আবার উঠে দাঁড়ালেন, চলতে শুরু করলেন, একই ছন্দে, একই নীরবতায়। যেন কারো ক্লান্তির কথা স্যারের মনে নেই। আরাফার ময়দানে তাবু পর্যন্ত পৌঁছানো পর্যন্ত স্যার একই ভাবেই ঐ একই অজানা ফিকিরে, একই ভঙ্গিতে হাঁটলেন, নিশ্চুপ, নিরবিচারে। পথচলার পুরোটা সময় তেমন কথা নেই, কারো দিকে তাকানো নেই, চলছেন তো চলছেনই। স্যারের চোখে মুখে ছিল না কোনো ক্লান্তির ছাপ, আবার ছিল না কোনো উত্তেজনার প্রকাশও। মনে হচ্ছিল, স্যার যেন আরাফার ময়দানের আগে থেকেই “আরাফা”র আসল তাৎপর্যে, নিজেকে ভুলে একান্তভাবে আল্লাহ পাকের সামনে উপস্থিত হবার প্রস্তুতিতে। সেদিনের পথচলার সাথীরা শুধু তাকিয়ে ছিলাম, স্যারের পদচারণায় দিকে, এই দৃশ্যের বর্ণনার ভাষা নেই, শুধু উপলব্ধি, যা লিখে বোঝানো যায় না।
২২৪. মিনায় অবস্থানকালে একবার এক সাথী বিভিন্ন গাড়ি থেকে বিতরণকৃত…
মিনায় অবস্থানকালে একবার এক সাথী বিভিন্ন গাড়ি থেকে বিতরণকৃত ফ্রি খাবারের একটি প্যাকেট থেকে একটি ফলের জুস স্যারের সামনে পরিবেশন করেন। তখন স্যার বললেন: “যেখানে জমজম মওজুদ, সেখানে এইসব রদ্দি (অপ্রয়োজনীয় ও নিম্নমানের) জিনিস কেন খাব?” মক্কা ও মদীনায় অবস্থানকালে স্যার সাধারণত জমজম ব্যতীত অন্য কোনো পানি, বোতলজাত মিনারেল ওয়াটার বা পানীয়জাত কিছু গ্রহণ করতেন না। এমনকি জমজম পাশে থাকলে ফল থেকে তৈরি জুসও প্রস্তাব করা হলে তিনি তা গ্রহণ না করে জমজমকেই অগ্রাধিকার দিতেন। জমজমের উপস্থিতিতে অন্য যেকোনো পানীয় পান করা থেকে পুরোপুরি বিরত থাকতেন। তবে হজের সফরে স্যার ফল হিসেবে মালটা খেতে পছন্দ করতেন। মালটা কেটে সামনে পরিবেশন করা হলে তিনি তা পছন্দ করে খেতেন।
২২৫. মক্কার বাসায় পৌঁছার পর সাথীদের মধ্যে আলোচনা চলছিল, “কাবা…
মক্কার বাসায় পৌঁছার পর সাথীদের মধ্যে আলোচনা চলছিল, “কাবা শরীফ প্রথম দর্শনে কী দোয়া করা উচিত?” সাথীদের এই কথাবার্তার শেষে স্যার কিছু মোজাকারা করেন। স্যার বলেন: ইবাদতের মাধ্যমে দোয়ার মধ্যে কবুলিয়াত সৃষ্টি হয়। আর ঈমানের মাধ্যমে এই অনুভূতি জাগে, আমি কী চাইব, কী চাওয়া দরকার, কী চাওয়া উচিত। ইবাদতের মাধ্যমে দোয়ার মধ্যে কবুলিয়াত সৃষ্টি হয়। যখন একজন বান্দা আন্তরিকতার সঙ্গে ইবাদত করে, নামাজ, রোজা, তিলাওয়াত, জিকির ইত্যাদির মাধ্যমে নিজের মন-প্রাণকে পরিশুদ্ধ করে তখন তার দোয়ায় এক ধরনের ওজন ও গ্রহণযোগ্যতা (কবুলিয়াত) সৃষ্টি হয়। ইবাদত বান্দাকে আল্লাহর কাছাকাছি নিয়ে যায়, ফলে তার দোয়াও আল্লাহর কাছে অধিক গৃহীত হওয়ার যোগ্যতা লাভ করে। আর ঈমানের মাধ্যমে এই অনুভূতি জাগে, আমি কী চাইব, কী চাওয়া দরকার। একজন মুমিন শুধু ইবাদত করে আল্লাহর কাছে কিছু চাওয়াতেই সীমাবদ্ধ থাকেন না, বরং তার ঈমান তাকে এই সচেতনতা ও অনুভূতি জাগিয়ে তোলে যে, আমি আসলে কী চাইছি? আল্লাহর কাছে কোন দোয়াগুলো করা উচিত? আমার চাওয়া কি দুনিয়াদারী, না আখিরাতনির্ভর? ঈমান একজন মুমিনকে শেখায়, কী দোয়া করা উচিত, কী তার মূল চাহিদা হওয়া উচিত। স্যার খুব জোর দিয়ে বুঝাতে চাইছিলেন শুধু চাওয়া নয়, কী চাওয়া উচিত সেটা জানা আগে জরুরি। স্যার বলেন, শয়তানের দোয়াও কবুল হয়েছে। তার ইবাদত, তার একাগ্রতা তার দোয়াকে আল্লাহর দরবারে কবুল করিয়ে দিয়েছে। কিন্তু সে তো হয়েছে ইবলিস, বিতাড়িত। শুধু দোয়া কবুল করানোই যথেষ্ট নয়; বরং আগে শিখতে হবে, ‘আমি কী চাইছি?’ এই চাওয়ার শিক্ষাই আসল। স্যার আরও বলেন, মানুষ কী চাইছে, তার দোয়াতেই তা প্রকাশ পায়। দোয়াই তার অন্তরের চাহিদার প্রতিচ্ছবি। এক ভাই স্যারের কাছে জানতে চান, স্যার, তাহলে আমরা কী দোয়া করব? স্যার উত্তর দেন: এইটা শিখতেই তো আমরা এখানে এসেছি! দোয়া শেখা, অন্তরের চাহিদা গঠন করা, চাইতে জানা, অন্তরের চাওয়াই শেখা, আমার আসল প্রয়োজন কোনটা।
২২৬. স্যার বলতেন, আসল দোয়া হলো অন্তরের চাওয়া, অন্তরের গভীর…
স্যার বলতেন, আসল দোয়া হলো অন্তরের চাওয়া, অন্তরের গভীর আগ্রহ, চাহিদা, আকাঙ্ক্ষাটাই দোয়া। আমাদের প্রতিদিনের জীবনে বহু চাওয়া পূর্ণ হচ্ছে, মানে আমাদের বহু দোয়াই কবুল হচ্ছে। কিন্তু এই কবুল হওয়া আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? স্যার বলতেন, দোয়া কবুল হওয়াটাই আসল না, বরং কী চাইছি, কেন চাইছি, এই চাওয়ার বিশুদ্ধতা ও মানটাই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের মেহনত হওয়া উচিত এই চাওয়ার মান বাড়ানো নিয়ে। চাওয়ার ময়দানে আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে আছি এটাকে বুঝবার জন্য স্যার আব্দুল ওয়াহাব সাহেবের এক কথাকে উল্লেখ করে বলেন, একবার ইজতেমার দোয়ার পরদিন আব্দুল ওয়াহাব সাহেব বলেন, গতকাল ইজতেমায় যতদূর চোখ যায় শুধু লোক আর লোক। কিন্তু এরা অধিকাংশই এসেছে নিজের ধান্দায়, চাকরি, ব্যবসা, জমি ইত্যাদি উন্নতির জন্য। আল্লাহর জন্য নয়। স্যার এই প্রসঙ্গে আব্দুল ওয়াহাব সাহেবের আরেকটি কথা বলতেন, “কেউ মারা গেলে প্রতিবেশীরা এসে কাঁদে, কিন্তু সে কাঁদে আসলে নিজের বাপের কথা মনে করে। মৃতের জন্য কাঁদে না।” আমাদের নামাজ, রোজা, তাওয়াফ, সাদকা, কান্না, সবই না হয়ে যায় দুনিয়ার জন্য, শুধুই পার্থিব স্বার্থে। আল্লাহর জন্য কাঁদা, আল্লাহর মহব্বত চাওয়া, আখেরাত সাজানোর জন্য চাওয়া, আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টি অর্জন এইগুলো আমার চাহিদা হয়। এক ওলি আল্লাহর কথা স্যার বলেন, তার কাছে উনার এক নেককার বন্ধু এসে বললেন, “তোমার আশপাশে কত মুরিদ, কত লোকজন, কত ভিড়! ভালোই তো লাগছে!” তিনি জবাব দিলেন: “না দোস্ত! আমি যে ভাণ্ডার নিয়ে বসে আছি, সেটা নেওয়ার মতো লোক নেই। এরা সবাই নিজের ধান্দায় এসেছে, তারা তো ইমান এখলাস তকওয়া আখলাক শেখার জন্য না, নিজ নিজ চাহিদা পাস করাতে এসেছে। স্যার বলেন, চাওয়া শুদ্ধ করাই দোয়ার মূল মেহনত। দোয়ার কবুল হওয়া মানেই সফলতা নয়, ইবলিস তার মকবুল দোয়া দিয়ে আরও মরদুদ (বিতাড়িত, প্রত্যাখ্যাত) হয়েছে। স্যার বলেন, কী চাইছি, সেটাই মুখ্য। আমাদের প্রতিদিনের দোয়া, ইবাদত, কান্না, এসব যেন কেবল নিজের লাভ-ক্ষতির হিসাবই শুধু না হয়ে থাকে। আমাদের হৃদয় যেন আল্লাহর জন্য তলবওয়ালা হয়, দোয়া যেন আল্লাহর রেজার দিকে মোড় নেয়।
২২৭. হজের এক সফরের শুরুতে জামাতের সাথী এক ভাই স্যারকে…
হজের এক সফরের শুরুতে জামাতের সাথী এক ভাই স্যারকে জিজ্ঞাসা করেন, স্যার, হজের দোয়া কী (তাওয়াফ সাফা মারওয়া মিনা আরাফাত মুজদালিফা ইত্যাদিতে কি দোয়া পড়তে হয়)? উত্তরে স্যার বললেন, হজের কোনো দোয়া নাই। স্যার, হজ তো দোয়ারই জায়গা, দোয়া নাই, এটা কীভাবে? স্যার বুঝাতে চাচ্ছিলেন, হজ অবশ্যই দোয়ারই জায়গা। কিন্তু যদি মানুষ ‘দোয়া পড়া’র চক্করে পড়ে যায়, তাহলে দোয়া আর ‘হবে’ না। সে দোয়া পড়বে, দোয়া ‘করবে’ না। হজের ময়দানগুলো, আরাফাত, মুযদালিফা, মিনা, তাওয়াফ, সায়ী এসব তো দোয়ারই ময়দান। এখানে মুখস্থ কিছু দোয়া পড়ে গেলেই দায় সারা হয় না। বরং এখানে অন্তরের গভীর থেকে আত্মনিবেদন, কান্না, অনুতাপ আর আশা নিয়ে আল্লাহর দরবারে নিজেকে পেশ করবে আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টির আশায়। স্যার আরো বুঝালেন: দোয়ার ‘তেলাওয়াত’ এক জিনিস আর দোয়া করা আরেক জিনিস। মোবারক এই জায়গাগুলোতো দোয়া তেলাওয়াত করার জায়গা না, এগুলো দোয়া ‘করার’ জায়গা। এখানে মুখস্থ কিছু আরবী শব্দ পড়াটাই শুধু না, বরং আল্লাহর সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলার, নিজেদের অন্তর খুলে বলার জায়গা এগুলো। স্যার আরো স্পষ্ট করেন, যদি কারো অন্তর গরু-ছাগল, চাকরি-বাণিজ্য, দুনিয়ার চিন্তায় ভরা থাকে, তাহলে সে নির্দিষ্ট কিছু দোয়া পড়লেও আসল দোয়া তো ওর চাকরি বাবসাই। দোয়া শুধু মুখে কিছু আরবী শব্দ পড়া নয়, বরং অন্তরের গভীর অবস্থার প্রকাশ। দুনিয়ার আকর্ষণ ও ব্যস্ততা যদি অন্তর ভরে রাখে, কিছু দোয়া তেলাওয়াত করবে ঠিকই কিন্তু সে অন্তর থেকে খাঁটি দোয়া বের হওয়া কঠিন।
২২৮. এক বয়ানে স্যার তওবা ও ইস্তেগফারের পার্থক্য ব্যাখ্যা করতে…
এক বয়ানে স্যার তওবা ও ইস্তেগফারের পার্থক্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এক উদাহরণ দেন। স্যার বলেন: একজন মহিলা রান্না করছিলেন। পাশেই উনার ছোট্ট সন্তান ছিল। তিনি একটু পানি আনতে বাইরে গেলেন। ফিরে এসে দেখলেন, উনার সেই অবুঝ শিশুটি চুলার ভেতরে পড়ে গিয়ে পুড়ে মারা গেছে। এই মর্মান্তিক ঘটনা একজন মায়ের জীবনের সবচেয়ে বড় দুঃখ হয়ে থাকবে। তিনি যতবার ঘটনাটি স্মরণ করবেন, ততবার উনার হৃদয়ে অনুশোচনার আগুন জ্বলবে, চোখে পানি আসবে, অন্তর কাঁপবে। স্যার বললেন: এই অন্তরের জ্বালা, এই অশ্রু, এই অনুশোচনা, এটাই ‘ইস্তেগফার’। ইস্তেগফার মানে শুধু মুখে “আস্তাগফিরুল্লাহ” বলা নয়, বরং এমন গভীর অনুতাপ, যা হৃদয় থেকে আসে, যা ভুলের স্মরণে বারবার দগ্ধ করে, কাঁদিয়ে তোলে। স্যার এরপর বলেন: আর ওই নারী যদি এই ঘটনার পর নিজের অন্তরে দৃঢ় সংকল্প করে নেন, “আমি জীবনে আর কখনোই আমার কোনও শিশুকে একা রেখে আগুনের কাছে যাব না”, তাহলে এই সিদ্ধান্ত, এই প্রতিজ্ঞা হলো ‘তওবা’। এই উদাহরণের মাধ্যমে স্যার বুঝিয়েছেন, ইস্তেগফার কেবল মুখের কথা নয়, হৃদয়ের কান্না, যখন অন্তর কাঁদে, তা হয় ইস্তেগফার। আর তওবা কেবল একবারের নয়, বরং একটি পরিবর্তিত জীবনের সিদ্ধান্ত, যখন জীবন বদলায়, তা হয় তওবা।
২২৯. স্যার ও কাজল ভাই ওই সময় জুবেরী ভবনে একই…
স্যার ও কাজল ভাই ওই সময় জুবেরী ভবনে একই রুমে থাকতেন। শের-ই-বাংলা হলের এক ভাই, ভাই রানা একদিন কাজল ভাইকে খুবই লাজুক ভঙ্গিতে অনুরোধ করলেন যেন তিনি স্যারের মাধ্যমে উনার পিতাকে এক বিষয়ে রাজি করানোর চেষ্টা করেন। ভাই রানার মনবাসনা ছিল, একটি মেয়েকে তিনি বিয়ে করতে চান, যাকে তিনি দ্বীনি ও দুনিয়াবি দিক থেকে উপযুক্ত মনে করেন। মেয়ের মা ও রানার মা দুজনেই এতে সম্মত ছিলেন। সমস্যা একমাত্র উনার পিতা, তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ অনড়, কোনো কথাই শুনতে চান না, এই বিয়েতে কোনো ভাবেই উনার মত নাই। কিন্তু ভাই রানা স্যারের বহু বয়ান শুনে এ বিশ্বাস পোষণ করতেন যে, স্যার যদি উনার পিতাকে একটু বলেন, তবে তিনি হয়তো মন গলিয়ে রাজি হয়ে যাবেন। তবে সরাসরি স্যারের কাছে গিয়ে নিজের ইচ্ছা প্রকাশ করার সাহস তিনি করতে পারছিলেন না। দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে কাজল ভাইয়ের কাছে বললেন, “স্যারকে কি বলা যায় এই কথা? স্যার কি আমার পিতাকে এই বেপারে বলবেন?” কাজল ভাই শুরুতে সহজভাবেই বলে ফেললেন, “আরে, এটা তো কোনো ব্যাপার না! স্যার নিশ্চয়ই বলবেন।” কিন্তু কথাটা বলার পর পরই কাজল ভাইয়ের মনে এক ধরণের দ্বিধা ও সংকোচ জেগে উঠলো, স্যারের অনুমতি না নিয়ে এমন প্রতিশ্রুতি দেওয়া কি ঠিক হলো? অবশেষে লজ্জা ও দায়িত্ববোধ নিয়ে কাজল ভাই স্যারের কাছে বিষয়টি তুলে ধরলেন। স্যার শুনে বললেন, “তুমি তাকে (রানা) কি বলেছো?” কাজল ভাই বললেন, “বলেছি যে, স্যারকে বলবো, ইনশাআল্লাহ স্যার রাজি হবেন।” স্যার শান্তভাবে বললেন, “ঠিক আছে।” এই উত্তর পেয়ে ভাই রানা খুব খুশি হলেন। তিনি জানিয়ে দিলেন, কবে স্যারকে উনার পিতার সঙ্গে দেখা করতে হবে, তারিখ ঠিক হলো। কাজল ভাই ধারণা করেছিলেন রানার বাড়ি রাজশাহীর আশেপাশে কোথাও হবে, কিন্তু পরে জানলেন সেটা কুষ্টিয়া, এবং তা-ও আবার শহর থেকে অনেক দূরে, গ্রামের একেবারে ভেতরে। এত দূরে যাওয়ার কথা ভেবে কিছুটা অস্বস্তি জন্ম নিলেও, স্যার এটাও সহজভাবেই নিলেন। সোমবার, সেদিন স্যার রোজা ছিলেন, রাজশাহী থেকে ট্রেনে চেপে বেলা ২ টায় কুষ্টিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা হলো। কুষ্টিয়া শহরে পৌঁছে দেখা গেল, গ্রামের পথ খুবই ভাঙাচোরা, গাড়িতে চলতেও কষ্ট হচ্ছিল। মাগরিবের পর ভাই রানার বাড়িতে পৌঁছলেন। ইফতার পথেই করে নিয়েছিলেন। সেদিন রাতে কোনো আলোচনা না হয়ে শুধু খাওয়া-দাওয়া সেরে বিশ্রামে। সকালে নাশতার সময় স্যার রানাকে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার আব্বা কোথায়? ডাকো, একসাথে খাই।” আব্বা আসলে নাশতার ফাঁকে স্যার শুধু জিজ্ঞেস করলেন, “ছেলে তো বড়ই হয়ে গেলো, বিয়ের ব্যাপারে কী চিন্তা করছেন?” এতটুকুই। অত্যন্ত অবাক করা বিষয়, যে পিতা সম্পর্কে ভাই রানা বলেছিলেন, তিনি কিছুতেই রাজি নন, সেই পিতা উত্তরে বললেন, “স্যার, আপনি যেটা বলবেন তাই হবে।” এ যেন আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে স্যারের প্রতি এক অনুগ্রহ ও কুদরত! কথাবার্তা পাকা হলো, রানার পিতা বললেন, ছেলের মা তো আগেই রাজি। স্যার বললেন, “তাহলে দেরি কিসের?” নাশটা করতে করতেই মেয়ের বাড়িতে খবর পাঠানো হলো। নাশতার পরই স্যার ও কাজল ভাই মেয়ের বাড়িতে গেলেন। আশ্চর্যের বিষয়, মেয়ের পিতা তাবলিগে সময় লাগানো এক পুরনো সাথী ছিলেন। স্যারের নাম তিনি আগেই জানতেন। যখন শুনলেন মুশফিক স্যার স্বয়ং উনাদের বাড়িতে এসেছেন, তিনি আনন্দে অভিভূত হয়ে পড়েন। কোথায় বসাবেন, কিভাবে আপ্যায়ন করবেন, এই নিয়ে খুব ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। সে দিনই বিয়ের সমস্ত আয়োজন সম্পন্ন হলো। স্যার নিজেই বিয়ে পড়ালেন। ফেরার পথে স্যার আনন্দভরে কাজল ভাইকে বললেন: “দুনিয়াতে যে কত রকমের নেক আমল আছে, আমরা কল্পনাও করতে পারি না। আজ আল্লাহ তাআলা আমাদের এমন একটি নেক আমল করার তাওফিক দিলেন, যেটা আগে চিন্তায়ও আসেনি।” (এক ছাত্রের লজ্জাশীলতা, হালাল চাহিদার প্রতি আন্তরিকতা, স্যারের দায়িত্ববোধ, ছাত্রের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বিষয়ে স্যারের এমন আন্তরিক অংশগ্রহণ, রোজা অবস্থায় দীর্ঘ কষ্টসাধ্য সফর করা, সবই ছিল নিছক আল্লাহর জন্য। এক নীরব শিক্ষা, কেবল মিম্বার-মসজিদেই নয়, মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের সহজ নেক আমলগুলোর মধ্য দিয়েও হয়ে উঠতে পারে এক বরকতময় ইবাদত।)
২৩০. বর্তমান সময়ের হজ ও ওমরাহর ক্ষেত্রে তানইম থেকে বারবার…
বর্তমান সময়ের হজ ও ওমরাহর ক্ষেত্রে তানইম থেকে বারবার ওমরাহ করার আমলের বিরুদ্ধে এক সুস্থ ও ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি স্যার বজায় রাখতেন। হজ বা ওমরার সফরে স্যার কখনও নিজে তানইম থেকে ইহরাম বেঁধে অতিরিক্ত ওমরাহ করেননি। এমনকি কোনো সফরে সাথীদের মধ্যেও অতিরিক্ত ওমরাহ করার জন্য তানইম যাওয়ার বিষয়ে তরগীব বা আলোচনা করেননি। তবে যদি কেউ আগ্রহবশত তানইম থেকে ওমরাহ করতেন, স্যার উনাদের বারণও করতেন না, নিরুৎসাহও করতেন না। উনাদের কারগুজারী শুনে নিতেন, কিন্তু নিজে সেই পথে আগ্রহ প্রকাশ করতেন না, বরং নীরব থাকতেন। একবার এমন একটি সফরে, যেখানে হজ ও ওমরাহর ভিসায় মক্কা ও মদিনার বাইরে কোথাও যাওয়া নিষিদ্ধ ছিল, এমনকি তায়েফেও যাওয়া যেত না, তখন সফর-সাথীদের অনেকের ইচ্ছা ছিল হজের পরে অন্তত একটি অতিরিক্ত ওমরাহ করার। স্যার তখন ব্যতিক্রমভাবে একটি চেষ্টা করেছিলেন, সফরের সৌদি মুয়াল্লিম অফিসে একটি আবেদনপত্র লেখেন যাতে করে ফেরার রুট মদিনা থেকে সরাসরি জেদ্দা না হয়ে মক্কা হয়ে হয়, যাতে সাথীরা মক্কায় এক রাত থেকে একটি অতিরিক্ত ওমরাহ আদায় করতে পারেন। স্যার সে চিঠিতে আরবী ভাষায় সংবেদনশীল ও বিনীতভাবে লিখেন, বাংলাদেশের বেশিরভাগ সাধারণ মানুষ জীবনে একবারই হজ বা ওমরাহ করতে পারেন, দূরত্ব ও খরচের কারণে বারবার আসা সম্ভব হয় না। তাদের এই একবারের সফরে যদি একটি অতিরিক্ত ওমরাহর সুযোগ হয়, তা বড় সৌভাগ্যের বিষয় হবে। চিঠি ছিল আন্তরিক ও মুয়াল্লিম অফিসের মর্যাদা রক্ষা করে রচিত, কিন্তু তবুও সৌদি অফিস পূর্বনির্ধারিত রুটের বাইরে কিছু পরিবর্তন করতে রাজি হয়নি। ফলে অতিরিক্ত ওমরাহর সেই চেষ্টা সফল হয়নি। কিন্তু তাও স্যার তানইম থেকে ওমরাহ করার কোনো তরগীব দেননি, নিজেও তানইম গিয়ে ওমরাহ করেননি। যদিও সফরের দু একজন নিজের আগ্রহে গিয়ে তানইম থেকে ইহরাম নিয়ে ওমরাহ করে আসেন। একই সফরে একাধিক ওমরাহ করা সুন্নত নয় এবং এটি বাড়াবাড়ির কারণ হতে পারে; বা সৎ উদ্দেশ্য থাকলেও সুন্নতের সীমা অতিক্রম করে আমল করলে তাতে বরকতের বদলে বাড়াবাড়ি চলে আসতে পারে; অথবা সাহাবায়ে কিরাম হজ বা উমরাহ করে মক্কায় থেকে বারবার উমরাহ করতেন না; বা যেকোনো কারনেই হোক, স্যার নিজে কখনও মসজিদে আয়েশা থেকে ইহরাম করে অতিরিক্ত ওমরা করেননি। তবে স্যার কখনও এটাকে নাজায়েয বা নিষিদ্ধ বলেননি, এবং পুরুষদের জন্য আলাদা কোনো বাধা বা নিষেধ হিসেবেও উল্লেখ করেননি। কেউ করতে চাইলে নিষেধ বা নিরুৎসাহ ও করেননি। স্যারের এই নিঃশব্দ অবস্থান আমাদের জানায়, যা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও সাহাবাদের আমল ছিল না, তা ‘ইবাদতের লোভে’ অহেতুক না বাড়িয়ে দীনের আমলে পরিমিতবোধের মধ্যে থাকা ভালো।
২৩১. হজরত মাওলানা লুৎফর রহমান সাহেব রহমতুল্লাহ এর সাথে স্যারের…
হজরত মাওলানা লুৎফর রহমান সাহেব রহমতুল্লাহ এর সাথে স্যারের গভীর হৃদ্যতা ছিল। তিনি স্যারকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন এবং সুযোগ পেলে নিজামুদ্দিন মারকাযের মূল্যবান অভিজ্ঞতা শোনাতেন। স্যারের প্রতি উনার ভালোবাসা ও আস্থা এতটাই গভীর ছিল যে, অনেক অন্তরঙ্গ কথা তিনি সরলতার সাথে বলে যেতেন। একবার স্যার বলছিলেন: “মাওলানা সাহেব একদিন বলছিলেন, একসময় নিজামুদ্দিন মারকাযে জামাত বিদায়ের আগে তিনি হেদায়েতের কথা বলছিলেন। কথা হয়ে গেছে, মজমার পরিবেশ শান্ত ও গভীর, জামাত প্রস্তুত, দোয়ার জন্য সকলেই অপেক্ষমাণ, হজরতজি এসে দোয়া করবেন। এরই মধ্যে হজরতজি রহমতুল্লাহি আলাইহি দোয়ার জন্য চলে এসেছেন, মিম্বারের দিকে অগ্রসর হচ্ছেন, মেম্বারে বসবেন। হজরতজিকে আসতে দেখে তিনি মজমার উদ্দেশ্যে বললেন– ‘হজরতজি চলে এসেছেন, আপনারা বসে পড়ুন’: “آپ بیٹھ جاؤ” (আপনারা বসে পড়ুন) উর্দু ভাষায় এ তো খুব সাধারণ একটি শব্দ, কিন্তু হয়তো ঠিক এখানেই লুকিয়ে ছিল দাওয়াত ও তাবলিগের সেই সূক্ষ্ম আদব, যা সাধারণ চোখে ধরা পড়ে না। হজরতজি রহমতুল্লাহ মিম্বারে বসেই খুব কোমল অথচ গভীর অর্থপূর্ণ কণ্ঠে বললেন: “ہم نے حکم دینا سیکھا، دعوت دینا نہیں سیکھا۔” “আমরা আদেশ করতে শিখেছি, দাওয়াত দিতে শিখিনি।” এই একটি বাক্যে যেন তিনি বলে দিলেন, দাওয়াতের কাজ কেবল বক্তব্য বা পরিকল্পনার নাম নয়, এটি একটি নফস ভাঙার ও ভাষা কোমল করার সাধনা। এমনকি “বসুন” বলার মধ্যেও যেন আদবের পরিপূর্ণতা থাকে, হুকুম নয়, অনুরোধ; শাসন বা আদেশ নয়, দাওয়াত। হজরতজির মতে, এমন শব্দ ব্যবহার যাতে দীনী মজমায় আদবের ঘাটতি বা বেঅহেতরমির শামিল হয়, তা পরিহার করা উচিত। কথার ঢঙ, শব্দের ভঙ্গিমা, সবকিছুর মধ্যেই আদব থাকতে হবে। দ্বীনের খেদমতে কখনো এমন ভাষা, ভঙ্গি বা তর্জনী ব্যবহার করা উচিত নয়, যাতে মানুষ ‘হুকুম’ অনুভব করে। “বসুন” বলার চেয়ে “বসে গেলে ভালো হবে” বা “আমরা বসে পড়ি” বলা বেশি মার্জিত। স্যার বারবার জোর দিয়ে বলতেন, দাওয়াতের কাজের প্রাণ হলো আদব। হক কথাও যদি কঠিন ভাষায় বলা হয়, মানুষ তাতে আকৃষ্ট হয় না। আর যদি কোমল ভাষায়, ভালোবাসা দিয়ে বলা হয়, তা মানুষের অন্তরে গেঁথে যায়।
২৩২. একবার এক ভাই স্যারের নিকট জানতে চাইলেন, “স্যার, গারিব…
একবার এক ভাই স্যারের নিকট জানতে চাইলেন, “স্যার, গারিব (গরিব) বা অপরিচিত বলতে কী বোঝায়?” এই প্রশ্নটি উঠে আসে সেই হাদিস প্রসঙ্গে যেখানে বলা হয়েছে, “ইসলাম গরিব (অপরিচিত) অবস্থায় শুরু হয়েছে, আবার সে গরিব অবস্থায় ফিরে যাবে, বা যে অবস্থায় তার সূচনা হয়েছিল আবার সে রকম অপরিচিত অবস্থায় ফিরে আসবে।” স্যার উত্তরে এই গারিব বা অপরিচিত বলতে যা বুঝিয়েছেন, তা হলো: প্রত্যেকটি সৎকাজ বা দ্বীনি উদ্যোগ তার মূল উদ্দেশ্য (মাকসাদ) হারিয়ে ফেলবে। এর মানে এই নয় যে সেই উদ্যোগগুলো বিলুপ্ত হয়ে যাবে, বরং তাদের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য ও প্রকৃত লক্ষ্যগুলো মানুষের কাছে অপরিচিত হয়ে উঠবে। স্যার উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি পরিষ্কার করেন: তাবলীগ থাকবে, কিন্তু তার মূল মাকসাদ হারিয়ে যাবে। মাদ্রাসা থাকবে, কিন্তু তার মূল মাকসাদ অপরিচিত হয়ে যাবে। তাবলীগ ওয়ালার সংখ্যা কমবে না, কিন্তু তারা তাদের মূল মাকসাদের উপর স্থির থাকবে না। খানকা (সূফী সাধকদের আশ্রয়স্থল) থাকবে, এর সংখ্যাও হয়তো কমবে না, কিন্তু এর মূল মাকসাদ অপরিচিত হয়ে যাবে। অর্থাৎ, ইসলামের নামাজ রোজা হজ ইত্যাদির বাহ্যিক রূপ ও কার্যক্রম হয়তো বজায় থাকবে, কিন্তু সেগুলোর পেছনের মৌলিক উদ্দেশ্য এবং আধ্যাত্মিক লক্ষ্যগুলো অস্পষ্ট বা বিস্মৃত হয়ে যাবে। স্যার বলেন এই ‘গরিব’ বা ‘অপরিচিত’ বলতে কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর সংখ্যা কমে যাওয়া বা কোনো আমল বা কোনো প্রতিষ্ঠানের বিলীন হয়ে যাওয়া না। প্রতিটি মহৎ কাজ তার মূল ‘মাকসাদ’ (উদ্দেশ্য) হারিয়ে ফেলবে। অর্থাৎ, ‘গারিব’ অবস্থার অর্থ হলো, ইসলামের বাহ্যিক রূপ, কাঠামো এবং কার্যকলাপগুলো হয়তো টিকে থাকবে, কিন্তু সেগুলোর ভেতরের মূল উদ্দেশ্য, স্পৃহা ও আল্লাহ তা’আলার সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যগুলো ধীরে ধীরে বিস্মৃত হয়ে যাবে বা বিকৃত হয়ে পড়বে।
২৩৩. হজে গমনেচ্ছু কিছু ভাইদের সামনে একবার স্যার হজ্বের উদ্দেশ্য…
হজে গমনেচ্ছু কিছু ভাইদের সামনে একবার স্যার হজ্বের উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি নিয়ে কিছু কথা বলেন। স্যার বলেন: “ইহরাম শুধু কিছু জায়েয কাজকে সাময়িকভাবে হারাম করা নয়, বরং হজ্বের নিয়্যতের সাথে সাথে দুনিয়ার যাবতীয় ইচ্ছা, প্রয়োজন এমনকি জায়েয কাজগুলো অন্তর থেকেও বের করে দেওয়া” এপ্রসঙ্গে স্যার উপমা পেশ করেন: যেমন এক মুমূর্ষ রোগী, হাসপাতালের বেডে বা আই সি ইউ তে থাকলে সন্তান কাঁদছে কিনা, খেয়েছে কিনা, এসব আর তার মনে থাকে না। সন্তানের পড়াশুনা বিয়েসাদি ইত্যাদির কোনো ফিকির থাকে না। চাকরি বাবসা ক্ষেতের কোনো চাহিদা সামনে থাকে না। দুনিয়ার কোনো লাভ উনাকে হাসায় না, কোনো ক্ষতি উনাকে কাঁদায় না। কারণ সে চলে যায় এক সংকীর্ণ, ও একান্ত এক হালতের মধ্যে। একান্ত নিজস্ব এক জগৎ, এক অনুভূতি, মৃত্যুর মুখোমুখি এক হালতে। এক সময়ের চরম ব্যস্ততার চিন্তা, এখন তার নিকট একেবারেই ফালতু, এইতো কিছু দিন পূর্বের লাভ ক্ষতির আসবাব, কার্যক্রম এখন তার নিকট একেবারেই মূল্যহীন। একেবারেই এক সংকীর্ণ হালতের মধ্যে সে। স্যার বলেন: “হজ্বের ইহরামও এমন এক অবস্থা, যেখানে মানুষ দুনিয়ার সব চিন্তা, সব ফিকির, পার্থিব সব দায়িত্ব, সকল ধরনের বাস্ততা ছেড়ে একান্তভাবে আল্লাহর দিকে রওনা দেয়। এই ইহরামের মধ্য দিয়ে শুধু শরীরকে বাস্ততা থেকে বিচ্ছিন্ন করা নয়, সকল কিছু থেকে দেমাগের সকল চিন্তা, এমনকি দীলের ফিকির ও ঘুরিয়ে নেয়া একান্ত আল্লাহর জন্য। স্যার আরো বলেন: “হজে যাওয়ার পর নয়, বরং আগে থেকেই অন্তরকে দুনিয়ার যাবতীয় ‘জায়েয’ চিন্তা থেকেও মুক্ত করে প্রস্তুত হতে হয়।” এই প্রস্তুতি দুইভাবে দরকার– জাহিরী: মাসআলা-মাসায়েল জেনে নেওয়া, বাতেনী: অন্তরকে শুদ্ধ করা, দুনিয়া থেকে হিজরত করে একমাত্র আল্লাহর দিকে মনোযোগী হওয়া। স্যার বলেন, হজ্ব শুধু একটি সফর নয়, এটি অন্তরের এক হিজরত, দুনিয়ার ব্যস্ততা, জায়েয চিন্তা ও দায়িত্ব থেকে অন্তরকে একান্তভাবে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে দেওয়া, আল্লাহর একান্ত নৈকট্যের দিকে রওনা দেওয়া। সাদা কাপড়ের ইহরাম বাঁধার আগেই এই সফরের প্রকৃত শুরু হওয়া উচিত অন্তরের এই ইহরাম দিয়ে।
২৩৪. একবার স্যার রাজশাহী থেকে ঢাকায় ফিরছিলেন। তখনকার দিনে যাত্রাপথ…
একবার স্যার রাজশাহী থেকে ঢাকায় ফিরছিলেন। তখনকার দিনে যাত্রাপথ ছিল পাবনা ও মানিকগঞ্জ হয়ে, যমুনা নদী পার হত আরিচা ও নগরবাড়ী ঘাট ফেরির মাধ্যমে। ফেরিতে ওঠার পর প্রায় দুই-আড়াই ঘণ্টা সময় লাগত নদীপথ পার হতে। ফেরিতে বসে স্যার জরুরত নামাজ শেষ করে একপাশে বসেছিলেন। পাশে বসা এক যুবক ভাইয়ের সাথে আলাপ হয়। আলাপ পরিচয়ের মাঝে স্যার তাকে কিছু দাওয়াতও দেন। দীর্ঘ কথাবার্তায় সে ভাই নিজের জীবনের নানা অভাব, সমস্যা ও পারিবারিক টানাপোড়েনের কথা স্যারের সামনে খুলে বলেন। স্যার ধৈর্যসহকারে মনোযোগ দিয়ে সব শোনেন, কিছু পরামর্শও দেন। কিছুক্ষণ পর সেই ভাই ব্যাগ থেকে একটি টিফিন বাটি বের করলেন। তাতে ছিল পরোটা আর ডিম ভাজি, তিনি বললেন, তার স্ত্রী ভোরে উঠে নাশতার এই বক্সটি বানিয়ে দিয়েছেন। কথাবার্তার আন্তরিকতায় তিনি স্যারকেও অংশগ্রহণ করতে বলেন, স্যার হাসিমুখে তার সঙ্গে নাশতায় শরিক হন। নাশতা শেষ করে স্যার মৃদু হাসি দিয়ে বললেন: ”তুমি এতক্ষণ কত রকম অভাব অভিযোগ বললে, এখন দেখি পরোটার সঙ্গে ডিমও খাচ্ছ। বাংলাদেশের কয়জন মানুষ ডিম দিয়ে পরোটা খায়? আল্লাহ পাকের শুকরিয়া আদায় করো।” জীবনে কত নেয়ামত আছে, আমরা তা বুঝতে পারি না কেবল এই কারণে যে, আমরা সমস্যা দেখতে শিখেছি, শুকরিয়া দেখতে শিখিনি। নিজের সমস্যা গুনতে গুনতে, কষ্টের হিসাব রাখতে রাখতে, নিজের ওপর থাকা আল্লাহর অনুগ্রহগুলো ভুলে যাই। স্যার ছোট্ট এক মুহূর্তেই সেই ভুলটা ধরিয়ে দিলেন, যেন অন্তরে কৃতজ্ঞতার আলো জ্বলে ওঠে। স্যার কেবল কথা বলেননি, ওই একটি ছোট্ট দৃশ্যের মাধ্যমে বোঝাবার চেষ্টা করেন, শুকরিয়া কিভাবে বাস্তব জীবনে চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিতে পারে।
২৩৫. রুয়েট-এর প্রাক্তন কর্মকর্তা আব্দুল মুমিন ভাইয়ের বাসায় এক বিকেলে…
রুয়েট-এর প্রাক্তন কর্মকর্তা আব্দুল মুমিন ভাইয়ের বাসায় এক বিকেলে উপস্থিত হয়েছিলেন স্যার ও কাজল ভাই। উদ্দেশ্য ছিল সামনের গ্রীষ্মকালীন অবকাশে চিল্লার তাসকিল করা। স্যার এর আগেও আব্দুল মুমিন ভাইয়ের পরিচিত ছিলেন। কিন্তু সেদিন আগমনের সময়টি ছিল ভিন্ন, আব্দুল মুমিন ভাইকে পাওয়া গেল খুবই বিষণ্ণ অবস্থায়। উনার মন খারাপের কারণ জানতে চাইলে তিনি স্যারকে জানালেন, “স্যার, আজ আমার মেয়ের মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার ফল প্রকাশ হয়েছে। ওর প্রস্তুতি এত ভালো ছিল যে আমরা নিশ্চিত ছিলাম সে সুযোগ পাবে, কোনোভাবেই বাদ পড়ার কথা ছিল না। কিন্তু আজ যখন ফল পেলাম, দেখলাম সে সুযোগ পায়নি। এ কারণে বাসার সবার মন খুব খারাপ।” আব্দুল মুমিন ভাইয়ের কথা শুনে স্যার বেশ কিছুক্ষণ উনার সঙ্গে আলোচনা করলেন। স্যারের কণ্ঠ ছিল কিছুটা উঁচু, যেন দরজার ওপার থেকে বাসার ভেতরের সবাই শুনতে পান। আব্দুল মুমিন ভাইও ভেতর থেকে উনার মেয়ে, মেয়ের মা এবং অন্যদের স্যারের কথা শুনতে বললেন। মাগরিবের আগ পর্যন্ত স্যার দীর্ঘক্ষণ আলোচনা চালিয়ে গেলেন। স্যার যখন বাসা থেকে বেরিয়ে আসছিলেন, আব্দুল মুমিন ভাই স্যারকে বললেন, “স্যার, আমার যে পরিমাণ মন খারাপ ছিল, আপনার কথাগুলো শোনার পর বেশ হালকা লাগছে।” স্যার কথাগুলোর মাধ্যমে বোঝালেন, বর্তমানে যে কষ্ট বা ব্যর্থতা চোখে পড়ছে, হয়তো ভবিষ্যতে সে ব্যর্থতার মধ্যেই আল্লাহ্র হিকমতপূর্ণ কোনো জয় লুকিয়ে রেখেছেন। অনেক সময় মানুষ যে দরজা চায় তা না দিয়ে, অপ্রত্যাশিত অন্য দরজায় আল্লাহ বরকত দেন। স্যার বোঝাতে চেয়েছিলেন: মানুষ প্রায়শই নিজের জন্য যা ভালো মনে করে, তাৎক্ষণিক বিচারে তার কাছে সেটাই কাম্য মনে হয়। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সে বুঝতে পারে যে আসলে ওইটা তার জন্য ভালো ছিল না, বরং মন্দ ফল নিয়ে এসেছিল। বর্তমানের অনেক ভালো জিনিস ভবিষ্যতে খারাপ ফল বয়ে আনতে পারে। আবার, বর্তমানের অনেক অনুশোচনা বা কষ্ট ভবিষ্যতে তাকে খুশি করতে পারে। আল্লাহ তায়ালা মানুষের জন্য যা কল্যাণকর, সেটাই নির্ধারণ করেন, যা মানুষ অনেক সময় তাৎক্ষণিকভাবে উপলব্ধি করতে পারে না। কাজল ভাই বলেন, পরবর্তীতে আব্দুল মুমিন ভাইয়ের সাথে দেখা হলে মুমিন ভাই নিজেই বলেন, “ওই দিন স্যারের আমাদের বাসায় আসাটা আমাদের সবার জন্য বড়ই রহমত ছিল। বাসার সবাই ওই দিন এতটাই বিমর্ষ ছিল যে সবাই খুব ভেঙে পড়েছিল। আল্লাহ পাক এখন আমাদের সবাইকে বুঝিয়েছেন যে ওই দিনের ওই হালতের মধ্যেই আমাদের মঙ্গল ছিল। বর্তমানে আল্লাহ পাক ভালো বন্দোবস্ত করেছেন।”
২৩৬. এক সময় কাকরাইলে কিছু বিষয় নিয়ে মুরব্বীদের মাঝে মতপার্থক্য…
এক সময় কাকরাইলে কিছু বিষয় নিয়ে মুরব্বীদের মাঝে মতপার্থক্য দেখা দেয়। এই পার্থক্য কিছু মানুষের মধ্যে দুশ্চিন্তা ও বিভ্রান্তির জন্ম দেয়। অনেক সাথী, বিশেষ করে কিছু মুকিম ভাই, এ নিয়ে কোনো আলোচনা করতে রাজি নন, এমনকি মাসওয়ারাতে এ প্রসঙ্গ তুলতেও তারা অনীহা প্রকাশ করেন। তাদের যুক্তি ছিল: “এগুলো মুরব্বীদের ব্যাপার, তারা যেভাবে ভালো মনে করেন, করবেন। আমাদের এসব আলোচনায় না যাওয়াই ভালো।” এই মানসিকতার প্রসঙ্গে একদিন স্যার একটি দৃষ্টান্তমূলক মন্তব্য করেন। তিনি বললেন: ”এক গরু তুলসী গাছ খেতে গেছে। একজন তা দেখে গরুটাকে তাড়াতে লাগলো। তখন আরেকজন এসে বলল, ‘এই গরুটাকে তাড়াচ্ছো কেন?’ সে উত্তর দিল, ‘এই গরু আমাদের দেবতাকে খেয়ে ফেলছে।’ তখন সে বলল, ‘আরে গরুও তো দেবতা। এক দেবতা আরেক দেবতার উপর চড়াও হয়েছে, এটা দেবতাদের নিজেদের ব্যাপার। আমাদের ওতে নাক গলানো উচিত না।’” এর পর স্যার বোঝাতে গিয়ে বলেন: “অনেকেই মুরব্বীদের মতপার্থক্য বা কিছু ভুল আচরণের মুখোমুখি হয়ে, এমন মনোভাব পোষণ করেন, ‘উনারা তো বড়, উনারা যা করেন, তাতেই নিশ্চয় হিকমত আছে।’ অথচ শরীয়তের আলোকে সঠিক-বেঠিকের এক সংবেদনশীল ও গঠনমূলক উপলব্ধি থাকা জরুরি। শুধুমাত্র “উনারা মুরব্বী”, এই ভয়ে অথবা অন্ধ আনুগত্যের কারণে সবকিছু পাশ কাটিয়ে যাওয়া কোনো সহিহ মনোভাব না। স্যার বোঝাতে চান, মুরব্বীদের প্রতি সম্মান রাখা জরুরি। কিন্তু সম্মান ও অন্ধ অনুসরণ এক জিনিস নয়। যদি কোথাও বিভ্রান্তি, ভুল বোঝাবুঝি বা স্পষ্ট অন্যায় লক্ষ্য করা যায়, তবে সে বিষয়ে শরীয়তের আলোকে যথাযথ ও নম্রভাবে সুরাহার চেষ্টাও আমাদের দায়িত্ব।
২৩৭. এক আলোচনায় স্যার বলছিলেন: “আইনস্টাইন, যিনি বিজ্ঞানের দুনিয়ায় এক…
এক আলোচনায় স্যার বলছিলেন: “আইনস্টাইন, যিনি বিজ্ঞানের দুনিয়ায় এক কিংবদন্তি, উনার একটি গাণিতিক ভুল (মহাজাগতিক ধ্রুবক, বা আপেক্ষিকতার তত্ত্ব বা এরকম কিছু), একজন ইন্টারমিডিয়েট লেভেলের ছাত্রও বুঝতে পারবে। এটা ধরতে মাস্টার্স বা পিএইচডি লাগবে না। দুনিয়ার নামকরা অনেক সায়েন্টিস্টদের সামনে এই ভুলটি তুলে ধরা হয়েছে, কিন্তু তারা কিছুতেই মানতে রাজি না, এমনকি অনেকে শুনতেও চায় না। বললেই ভাবটা এমন, ‘অবিশ্বাস্য কথা’। ‘ওরে বাপরে বাপ! এটা আইনস্টাইনের কথা!’ অর্থাৎ, আইনস্টাইন ভুল করতে পারে, এই ধারণাটাই তারা গ্রহণ করতে পারে না। এই উদাহরণ টেনে স্যার বলেন: “ঠিক একই রকম মানসিকতা অনেক সাথীর মধ্যেও দেখা যায়। তাবলিগের কোনো বড় মুরব্বী বা কোনো প্রসিদ্ধ তাবলিগী যদি কোথাও কিছু ভুল করেন, আর কেউ যদি নম্রভাবে সেই ভুলের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে, তখন কিছু মানুষ তৎক্ষণাৎ ক্ষেপে ওঠে। তারা বলে, ‘উনার সমালোচনা করবে? তিনি তো অমুক বড় মুরব্বী! অমুক বড় কুরবানিওয়ালা!’ যেনো ‘বড়’ মানেই ‘ভুলের ঊর্ধ্বে’। স্যার বড় সতর্কতার সাথে বলেন, “এটা এক ভয়ংকর মানসিকতা।” যখন কোনো মুরব্বী বা আলিমকে কেউ ভুল ধরলে বলা হয়, “উনার সমালোচনা করা যাবে না”, তখন এটি অনেক সময় সত্যকে আড়াল করার দরজা খুলে দেয়। অন্ধ আনুগত্যের এই সংস্কৃতি দ্বীনের ক্ষতি করে, কারণ এতে হক চাপা পড়ে যায়। স্যার জোর দিয়ে বোঝান, দ্বীনের উপর চলা মানে হলো, হকের উপর থাকা। হককে ব্যক্তি দিয়ে বিচার করা নয়, বরং ব্যক্তিকে হক দিয়ে বিচার করা।
২৩৮. স্যার প্রায়শই কোরআনের এই আয়াতটি উদ্ধৃত করতেন: “وَمَا خَلَقْتُ…
স্যার প্রায়শই কোরআনের এই আয়াতটি উদ্ধৃত করতেন: “وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ” ওয়ামা খলাকতুল জিন্না ওয়াল ইনসা ইল্লাল ইয়া’বুদুন। (আমি জিন ও মানুষকে শুধুমাত্র আমার ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছি)। স্যার বলতেন এখানে إِلَّا لِيَعْبُدُونِ إِلَّا لِيَعْرِفُونِ (ইল্লা লি-ইয়ারিফুন) অর্থে ব্যবহিত হয়। এখানে ইবাদত মারেফত অর্থে বাবহীত হয়। স্যার ব্যাখ্যা করতেন যে, এখানে ‘ইয়া’বুদুন’, অর্থাৎ, আল্লাহ তায়ালা জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছেন উনার মা’রেফাত হাসিলের জন্য। এই মা’রেফাতই হলো ইবাদতের মূল রহস্য। ইবাদত কেবল বাহ্যিক কাজ নয় (যেমন নামাজ, রোযা, হজ), বরং এর আধ্যাত্মিক ভিত্তি হলো আল্লাহর প্রতি চিন্তা, ভালবাসা, ভয় এবং নির্ভরতা, যা আল্লাহর পরিচয় (মা’রেফাত) ছাড়া সম্ভব নয়। স্যার একসময় মা’রেফাত প্রসঙ্গ আলোচনা করতে গিয়ে এক মেওয়াতি (ভারতের মেওয়াত অঞ্চলের একজন সাধারণ, সরলপ্রাণ মানুষ) ব্যক্তির উদাহরণ দেন। সেই মেওয়াতিকে যখন মা’রেফাত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তিনি খুব সহজ করে উত্তর দিয়েছিলেন: “জান পেহচান”, অর্থাৎ, ‘চিন পরিচয়’। এমন চেনা-পরিচয়, যেখানে কেউ কিছু চাইলে তিনি তা দিয়ে দেন। মা’রেফাত হলো আল্লাহ তায়ালার সাথে এমন গভীর পরিচয় গড়ে তোলা, যেখানে উনার কাছে কিছু চাইলে তিনি তা পূরণ করে দেন। এক গভীর সম্পর্ক। স্যার বলতেন, আল্লাহ পাকের পরিচয় পাওয়াই ইবাদতের আসল রহস্য। অন্যান্য সব পরিচয় তার কাছে তুচ্ছ হয়ে যাবে, যখন আল্লাহ্র পরিচয় হাসিল করতে পারবে। আল্লাহ্র এই মা’রেফাত হাসিলের পর বান্দার মধ্যে যে গুণটি সৃষ্টি হয়, তাই হলো ইখলাস।
২৩৯. ইখলাস বোঝাতে স্যার অনেকসময় একটি উপমা দিতেন: এক মেয়ে…
ইখলাস বোঝাতে স্যার অনেকসময় একটি উপমা দিতেন: এক মেয়ে বাড়িতেই থাকত। ম্যাট্রিক পাসের পর কলেজে ভর্তি হলো এবং বাইরে যাওয়া শুরু করল। মেয়েটি ছিল খুবই সুন্দরী, তার পোশাক-পরিচ্ছদ, চালচলন সবই ছিল আকর্ষণীয়। রাস্তাঘাটে, বন্ধু-বান্ধবদের মাঝে সবাই তার প্রশংসা করত। যখন সবাই তাকে ভালোবাসত এবং তার প্রশংসা করত, প্রথমদিকে তার বেশ ভালোই লাগত, সকলের প্রশংসা সকলের ভালোবাসা উনাকে আনন্দ দিতো। এভাবে চলতে চলতে ধীরে ধীরে যদি সে কোনো একজনের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে, তখন তার আর অন্য কারো প্রশংসা ভালো লাগে না। সে চায় না অন্য কেউ তার প্রশংসা করুক। ওই একজনের আকর্ষণ, ওই এক জনের নিকট ভালো হবার আকাঙ্ক্ষা, ওই এক জনের নিকটবর্তী হবার তলব উনাকে অন্য সকলের প্রশংসা পাওয়া থেকে বিমুখ করে তোলে। কেউ তাকে ভালো বলল বা কী বলল, এখন তার আর সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। এখন তার নজর শুধু ওই একদিকে, সে যেন তাকে ভালো বলে, সে যেন তাকে ভালো জানে। অন্য কারো দিকে তার এখন আর কোন রকম নজর নেই। এখন আর অন্য কেউ তাকে চিনুক বা তার প্রশংসা করুক, এটা সে পছন্দ করবে না। স্যার এই উপমা দিয়ে বোঝাতেন যে, এটাই হলো ইখলাস। যখন কোনো বান্দা আল্লাহ্র দিকে এমনভাবে আকৃষ্ট হয়ে যায়, তখন তার আর অন্য কেউ চিনুক, এটা ভালো লাগে না। সে শুধু সেই পরিচয় নিয়ে থাকতে পছন্দ করে, যে তিনি (আল্লাহ) যেন আমাকে চেনেন এবং অন্য কেউ যেন আমাকে না চেনে। স্যার অসংখ্য বয়ানে এই মা’রেফাত ও ইখলাসের প্রসঙ্গ এনেছেন।
২৪০. একবার স্যার বলছিলেন, “দীনের কাজের ফায়দা কেবল তার তরতীব…
একবার স্যার বলছিলেন, “দীনের কাজের ফায়দা কেবল তার তরতীব বা কর্মপদ্ধতির উপর নির্ভর করে না, বরং অনেক বেশি নির্ভর করে, এই কাজ যার দ্বারা হচ্ছে, সে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে কতটুকু মকবুল।” স্যার বলেন: “তরতীব খুব উন্নত হতে পারে, পরিকল্পনা চমৎকার হতে পারে, বই-পুস্তক, দাওয়াতি ভাষা সব নিখুঁত হতে পারে, কিন্তু যদি এই তরতীব চালানোর ব্যক্তি আল্লাহর কাছে ঐ পর্যায়ের মকবুল না হন, তবে এই কাজ থেকে ফায়দা খুবই সীমিত হবে, নাহয় কোনো উপকারই হবে না। অপরদিকে, যদি কোনো ব্যক্তি সত্যিকার অর্থে আল্লাহর কাছে মকবুল হন, যদি তার তরতীব খুব উন্নত না হয়, তবু তার মাধ্যমে কাজের ফায়দা অনেক বেশি হবে।” হযরত মাওলানা ইলিয়াস রহমাতুল্লাহি আলাইহির প্রসঙ্গ তুলে স্যার বলেন: দাওয়াত ও তাবলিগের খুবই সহজ ও সাধারণ তরতিব উনি দেখিয়েছেন, কিন্তু উনি বাক্তি ছিলেন আল্লাহর প্রিয় বান্দা, এক মকবুল বান্দা, তাই উনার সহজ তরতীবের মাধ্যমেই আল্লাহ তাআলা হাজারো মানুষকে বদলিয়ে দিয়েছেন, আজও দুনিয়াবাপি মানুষ ফায়দা পাচ্ছে। স্যার বোঝাতে চান, তরতীব হলো দাওয়াতের বাহ্যিক অবকাঠামো, যা প্রয়োজনীয় ও উপকারী, কিন্তু তা আসল শক্তি নয়। মকবুলিয়াত হলো সেই অদৃশ্য আত্মিক গ্রহণযোগ্যতা, যার দ্বারা কাজের মাঝে নূর, তাসির, বরকত ও হিদায়াত জন্ম নেয়। আল্লাহর দৃষ্টিতে যিনি প্রিয়, উনার মাধ্যমে সামান্য কথা, সামান্য হরকতও অনেক বড় ফায়দা নিয়ে আসতে পারে। আর আল্লাহ পাকের নিকট মকবুল না হলে, হতে পারে উনার জ্ঞান ও পরিকল্পনা অনেক সুসংগঠিত, অনেক সুশৃঙ্খল, কিন্তু তা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নির্জীব হয়ে যায়, মানুষের অন্তর পর্যন্ত পৌঁছায় না। স্যার স্পষ্ট করতে চাইছেন, দ্বীনের মেহনতকে মকবুল ও তাসিরদার বানাতে চাইলে, শুধু বাহ্যিক গঠন নয়, বরং মেহনতকারীর ভিতরের আমল, ইখলাস, তাকওয়া, এবং আল্লাহমুখিতা বেশি জরুরি। উসুল, পদ্ধতি, তরতীব, শৃঙ্খলা, সবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার প্রাণশক্তি অন্তরের নিষ্কলুষ মনোভাব ও আল্লাহর কাছে কবুল হওয়া।
← আগের পর্ব (২০১–২২০) | সূচিপত্র | পরের পর্ব (২৪১–২৬০) →
সংগ্রহ ও সংকলন: মুশফিক আহমদ (রহঃ)-এর মালফুযাত সংকলন।
