মালফুযাত – প্রফেসর মুশফিক আহমদ (রহঃ) – পর্ব ১১: ২০১–২২০
প্রফেসর মুশফিক আহমদ (রহঃ)-এর বয়ান, পরামর্শ, আমল ও দাওয়াতি জীবনের মালফুযাত, ২০১ থেকে ২২০ নম্বর। সম্পূর্ণ সূচিপত্র দেখুন।
সংগ্রহ ও সংকলন: মুশফিক আহমদ (রহঃ)-এর মালফুযাত সংকলন।
এই পর্বে যা আছে
- ২০১. মুন্সিগঞ্জের ভাই তালহা একবার স্মৃতিচারণা করে বলছিলেন, ২০১০ সালে…
- ২০২. একদিন মাহফুজ ভাই স্যারকে প্রশ্ন করেন, “স্যার, আপনি তো…
- ২০৩. বগুড়ার ভাই মাহবুব তিন চিল্লার সফরে পাকিস্তানে অবস্থান করছিলেন…
- ২০৪. বিরামপুরের প্রফেসর ফরহাদ ভাই একবার এক স্মৃতির কথা বলেন…
- ২০৫. এক ভাই স্মৃতিচারণ করে বলেন, আমরা তখন বিশ্ববিদ্যালয় হলে…
- ২০৬. একবার স্যার ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টে নিজ কক্ষে বসে ডিগ্রি পাস…
- ২০৭. রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে এক বয়ানে স্যার বলেছিলেন, যখন…
- ২০৮. স্যার এক মোজাকারায় বলেন, আমাদের ইমান কতটা পূর্ণ, তা…
- ২০৯. একবার নাটোরের ভাই আমানুল্লাহর জামাতের নুসরতে এসে সাথীদের সাথে…
- ২১০. একবার স্যার ইখলাস এর গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি…
- ২১১. একবার হজ্জ সফরে, মিনা থেকে মক্কার পথে ফিরছিলেন স্যার…
- ২১২. নওগাঁ সরকারি কলেজের এক ছাত্রজামাত ১০ দিনের মেহনতের জন্য…
- ২১৩. ভাই সাগর বলেন, স্যারের জীবনযাপন ছিল সরলতা ও সুন্নাহর…
- ২১৪. রাজশাহীতে কাজল ভাইয়ের বাসায় স্যারের অবস্থানকালে অনেকবার স্যারের মাথা…
- ২১৫. একবার হজ্জের সফরে মিনায় হালাল হবার জন্য মাথা কামানোর…
- ২১৬. হজ্জের সফরে আরাফার দিন আসরের নামাজের প্রস্তুতি চলছিল। স্যারের…
- ২১৭. আরিফুর রহমান ভাই হজ্জের সফরের স্মৃতিচারণ করে বলেন, আরাফার…
- ২১৮. ভাই আরিফুর রহমান বলেন, হজের সফরের শেষে মদীনায় স্যারসহ…
- ২১৯. নাট্যকার সেলিম আল দীনের কাছে একবার স্যারকে মাহফুজ ভাই…
- ২২০. ভাই আব্দুল কাইয়্যুম বলেন, একবার রমজান মাসে স্যার মাদানীনগর…
২০১. মুন্সিগঞ্জের ভাই তালহা একবার স্মৃতিচারণা করে বলছিলেন, ২০১০ সালে…
মুন্সিগঞ্জের ভাই তালহা একবার স্মৃতিচারণা করে বলছিলেন, ২০১০ সালে পরীক্ষার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলে ছিলেন। সেসময় স্যারকে নিয়ে ভাই তালহা ও স্যার রিকশায় একসাথে হলে আসতেছিলেন। রিকশায় আসার পথে স্যারকে বলেন, স্যার, পরীক্ষা শেষ, আমি তো তিন চিল্লার নিয়ত করেছিলাম, খুব মন চাচ্ছে বের হয়ে যেতে, কিন্তু নানা হালত, পারিবারিক চাপ, শরীরিক দুর্বলতা, মানসিক টানাপোড়েন, সব মিলিয়ে বুঝতে পারছি না কীভাবে যাবো। ভাই বলেন, স্যার আমার বিস্তারিত হালত শুনে মমতাভরা কণ্ঠে এক উদাহরণ পেশ করলেন। স্যার বললেন, দেখো, একটি মা যখন সন্তান জন্ম দেওয়ার অপেক্ষায় থাকে, তার হৃদয়ে থাকে এক অপার আনন্দ, এক নতুন প্রাণকে বুকে জড়িয়ে ধরার স্বপ্ন। কিন্তু সন্তান জন্মের মুহূর্ত যখন ঘনিয়ে আসে, তখন তাকে প্রচণ্ড কষ্ট, ব্যথা ও যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এখন যদি সেই মা ব্যথা সহ্য করতে না পারে, কেবল ব্যথানাশক খেতে থাকে, তাহলে সে কি সন্তানের মুখ দেখতে পারবে? না, সন্তান জন্মানোর জন্য সেই কষ্টকে তাকে গ্রহণ করতেই হবে। সেই কষ্টের মধ্য দিয়েই আসে সন্তানের আগমন, এক পরিপূর্ণতা, এক নতুন সূচনা। এরপর স্যার গভীর মমতায় ভাইকে বলেন, তোমার পথেও এখন কিছু কষ্ট আসবে, কিছু টানাপোড়েন থাকবে, কিন্তু তুমি এই কষ্টগুলোকে পেইন কিলার দিয়ে চাপা দিও না। বরং আল্লাহর উপর ভরসা রেখে এগিয়ে যাও। তিন চিল্লার নিয়ত করেছো, বের হয়ে যাও। ইনশাআল্লাহ, ধীরে ধীরে এসব হালত সহজ হয়ে যাবে, আল্লাহ পাক সফলতা দান করবেন। জীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও ইবাদতের পথে কিছু কষ্ট, ত্যাগ ও পরীক্ষার মুখোমুখি হতেই হয়, দ্বীনের মেহনত পরিশ্রম ও ত্যাগ ছাড়া ফলপ্রসূ হয় না। কিন্তু এই কষ্টগুলোই মূলত আল্লাহর রহমতের দ্বার উন্মুক্ত করে।
২০২. একদিন মাহফুজ ভাই স্যারকে প্রশ্ন করেন, “স্যার, আপনি তো…
একদিন মাহফুজ ভাই স্যারকে প্রশ্ন করেন, “স্যার, আপনি তো এক সময় এমন এক পরিবেশে ছিলেন, যেখানে দ্বীনদারি সহজ ছিল না। সেখান থেকে আপনি কিভাবে এতটা গভীরভাবে দ্বীনের পথে আসতে পারলেন? এর পেছনে এমন কোন জাহেরী আমল আছে কি, যেটা আপনি মনে করেন এই পরিবর্তনের পেছনে মুখ্য ভূমিকা রেখেছে?” স্যার বিনয়ভরে জবাব দেন, “হ্যাঁ, আমার জীবনে দুটি গুরুত্বপূর্ণ আমল ছিল, যেগুলোর প্রতি আমি সবসময় যত্নবান ছিলাম এবং কোনো অবস্থাতেই ছাড় দিইনি। প্রথমত, আমি কখনো কোনো নারীর সংস্পর্শে যাইনি। কোন কোন সময় মেয়েরা আমাকে খুঁজে বের করে যোগাযোগ করতে চেয়েছে, ঠিকানাও সংগ্রহ করেছে, এমনকি দেখা করার ইচ্ছা পোষণ করেছে। কিন্তু আমি মেয়েদের চক্করে পরিনি, কোন মেয়ের সাথে সম্পর্কের পথে যাইনি। বরং এমন অবস্থায় আমি নিজের বাসা পর্যন্ত পরিবর্তন করেছি, শুধুমাত্র এই ফিতনা থেকে নিজেকে রক্ষা করার জন্য।” “দ্বিতীয়ত, আমি জীবনে কখনো নামায ছাড়িনি। আনন্দে, দুঃখে, ক্লান্তিতে, ব্যস্ততায়, সফরে, অসুস্থতায়, যে অবস্থাতেই থাকি না কেন, আমি নামায কখনোই পরিত্যাগ করিনি।” আমাদের জন্য স্যারের এই কথা এক গভীর আত্মসমীক্ষার দরজা খুলে দেয়, আজ আমি কিসে অটল? কোন ফিতনায় আমি আপোষ করছি? আমি নামায নিয়ে কতটা সতর্ক? এই প্রশ্নগুলোর জবাবই নির্ধারণ করবে আমাদের ভবিষ্যতের দীনদারি।
২০৩. বগুড়ার ভাই মাহবুব তিন চিল্লার সফরে পাকিস্তানে অবস্থান করছিলেন…
বগুড়ার ভাই মাহবুব তিন চিল্লার সফরে পাকিস্তানে অবস্থান করছিলেন। ঐ সময় স্বল্প কিছুদিনের জন্য স্যারও রাইব্যান্ড সফরে ছিলেন। সফরের মধ্যেই ভাই মাহবুব একদিন স্যারের নিকট পরামর্শ চাইলেন, “স্যার, আমি আমার স্ত্রীকে এমন অবস্থায় বাসায় রেখে সফরে এসেছি, যখন তার সন্তান প্রসবের নির্ধারিত সময় একেবারে নিকটবর্তী। একটু খোঁজখবর নিলে ভালো হতো, ফোনে অন্তত হালহকিকত জেনে নিলে মনে হয় ভালো হত। আমি ফোন করতে চাই।” স্যার মনোযোগ দিয়ে কথা শুনলেন এবং বললেন, “ঠিক আছে, তুমি ফোন করতে পারো, ফোন করো। তবে মনে রেখে, যেদিন তুমি ফোন করবে, সেদিন থেকেই নতুন করে তোমার তিন চিল্লার গণনা শুরু করবে।” এই উত্তরে স্যারের দৃষ্টিভঙ্গি যেন স্বাভাবিক কথার আড়ালে এক গভীর আত্মিক দাওয়াত। স্যার হয়তো বলতে চাচ্ছিলেন, তুমি যার রাস্তায় এসেছো, যার দরবারে এসেছো, যার কাছে কিছু পাওয়ার আশা করছো, তার উপরেই পুরোপুরি ভরসা করো। যার উপর নির্ভর করো, সে যেন আসলেই নির্ভরযোগ্য হন। বাহ্যিক এই খোঁজখবর নিয়ে কী হবে? স্যারের এই কথার পর ভাই মাহবুব আর বাসায় ফোন করে নাই। স্যারের কথাবার্তায় অনেক সময়ই এমন সূক্ষ্ম শিক্ষা থাকতো, যা হৃদয়কে নাড়িয়ে দিত, স্যারের প্রতিটি উক্তিতে থাকতো চিন্তা ও চেতনার জাগরণ। স্যার যেন প্রশ্ন রেখে গেলেন অন্তরে, আসল ভরসার জায়গাটা কোথায়? আমরা কী সত্যিই আল্লাহর উপর নির্ভর করছি? নাকি আমাদের নির্ভরতা এখনো মানুষ, ফোন, কিংবা বাহ্যিক উপায়ে সীমাবদ্ধ? এই উপলব্ধিই আমাদের আল্লাহর পথে চলার সত্যিকারের মান নির্ধারণ করে। সফরের এক পর্যায়ে কোনো দরকারে ঐ ভাই সিরাজগঞ্জের আলেম, মাওলানা আব্দুল্লাহ সাহেবকে ফোন করে। তখনই মাওলানা সাহেব জানালেন, স্যার আমার এখানে আসতেছেন, আপনি একটু পর ফোন করলে স্যারের সাথেও কথা বলতে পারবেন। এক ঘণ্টা পর যখন ভাই মাহবুব আবার ফোন করেন, মাওলানা সাহেব ফোন রিসিভ করেই স্যারের হাতে দিয়ে দেন। প্রথম কথায় স্যার জিজ্ঞেস করলেন, তোমার ছেলের খবর কী? ভাই আশ্চর্য হয়ে বললেন, স্যার, আমার ছেলে হয়েছে এটা তো আমি জানিই না! আমি তো আর পরে ফোন করিনি। আপনার কাছ থেকেই প্রথম শুনছি। স্যার শান্তভাবে জানালেন, হ্যাঁ, তোমার ছেলে হয়েছে। মাহবুব আবার জানতে চাইলেন, স্যার, কোনো নাম রেখেছেন কিনা? স্যার বললেন, তোমার ছেলের নাম ‘আতিক’।
২০৪. বিরামপুরের প্রফেসর ফরহাদ ভাই একবার এক স্মৃতির কথা বলেন…
বিরামপুরের প্রফেসর ফরহাদ ভাই একবার এক স্মৃতির কথা বলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষার পরপরই তিনি তিন চিল্লার সফরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সফরে বের হওয়ার আগে যখন তিনি স্যারের নিকট বিদায় নিতে যান, স্যার পকেটে হাত ঢুকিয়ে কিছু টাকা বের করে নীরবে উনার হাতে তুলে দেন। না ছিল কোনো জিজ্ঞাসা, না কোনো শর্ত, না কোনো হিসেব, যেন এক নিঃশব্দ দোয়া, এক অলিখিত আশীর্বাদ উনার হাতে তুলে দিলেন। তখন আমার আর্থিক অবস্থা কেমন ছিল, সেটা হয়তো স্যার অন্তর দিয়ে অনুভব করেছিলেন। পরবর্তীতে টাকা গুনে দেখা যায়, টাকার পরিমাণ ১২০০ টাকা। সময়টা ছিল ১৯৭৭/৭৮ সাল। সে সময়কার ১২০০ টাকা অনেক বড় অঙ্কের ছিল। তিনি বলেন, এ টাকায় পুরো তিন চিল্লার সময়টা নির্বিঘ্নে কেটেছে, এমনকি সফর শেষে হাতে কিছু টাকা রয়ে গিয়েছিল। তিনি আরও বলেন, স্যার কখনো সেই টাকা ফেরত চাওয়ার প্রসঙ্গ তোলেননি, এবং আমিও কখনো সাহস করে সে টাকা ফিরিয়ে দিতে পারিনি, কারণ তা তো শুধু টাকা ছিল না! সেই টাকা শুধু আর্থিক সহায়তা ছিল না, আমার জন্য সেটি ছিল এক আল্লাহওয়ালার অন্তরের অন্তর্দৃষ্টি, ছায়ার মতো দয়া, আর ঈমানি পথের প্রেরণা। (মানুষের পথে সাহায্য খুঁজতে গেলে হিসেব আসে, শর্ত আসে; কিন্তু আল্লাহওয়ালাদের দেয়া সাহায্য শুধুই দান নয়, তাদের সাহায্যে থাকে বরকত, থাকে ভালোবাসা, থাকে আখিরাতের সুঘ্রাণ। একটা দান, যখন আল্লাহর জন্য হয়, তখন তা হয়ে দাঁড়ায় সারা জীবনের পাথেয়।)
২০৫. এক ভাই স্মৃতিচারণ করে বলেন, আমরা তখন বিশ্ববিদ্যালয় হলে…
এক ভাই স্মৃতিচারণ করে বলেন, আমরা তখন বিশ্ববিদ্যালয় হলে থাকতাম। স্যার মাঝে মাঝে আমাদের হলে আসতেন, গাশতের দিন বয়ান করতেন, তাবলিগের কাজের হালত দেখতেন, উৎসাহ দিতেন। তখন আমাদের হলে তিন দিনের জামাত বের হওয়া শুরু হয়। জামাতে যাবার সময় অন্য হল বা মহল্লা থেকে খেদমতের হাড়ি পাতিল, প্লেট চুলা ইত্যাদি নিয়ে যেতে হতো। একবার স্যার আমাদের হলের নিজস্ব খেদমতের সামগ্রী কেনার জন্য আমার হাতে পাঁচ হাজার টাকা তুলে দেন। সে সময় ৫,০০০ টাকা খুবই উল্লেখযোগ্য অঙ্ক, এবং তা দিয়ে প্রয়োজনীয় ভালো মানের সব সামগ্রী কেনা যেত। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা সেই অর্থের সদ্ব্যবহার করিনি। ভাই বলেন, আমরা সেই টাকা খেয়েদেয়ে শেষ করে ফেলি। কোনো প্রস্তুতি নেয়া হয়নি, কোন ছামানাও কেনা হয়নি, আর স্যারকেও জানাইনি। অথচ অবাক করার বিষয় হলো, স্যার কখনো আমাদের কিছু জিজ্ঞেসই করলেন না। না তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ছামানা কিনলে কি কিনলে না? না বললেন, টাকার কি করেছো? না চাইলেন, কোনো হিসেব বা ব্যাখ্যা। ভাই বলেন, আমাদের বিবেক মাঝে মাঝে কষ্ট পেত এই ভেবে যে, স্যার নিশ্চয়ই হয়তো সব জানতেন। কিন্তু তার মুখে কখনো আক্ষেপ ছিল না, রাগ ছিল না, এমনকি কোনো ইঙ্গিতও ছিল না যে তিনি এ বিষয়ে অবগত। পরবর্তীতে স্যারের সাথে দেখা হলে সেই একই প্রাণবন্ত হাসি, স্নেহের দৃষ্টি, যেন কিছুই হয়নি! প্রত্যেক মানুষই ভুল করে। কিন্তু সবার ভুল ধরিয়ে দেওয়ার পদ্ধতি এক রকম হয় না। কেউ সরাসরি বলে দেন, কেউ কটাক্ষ করেন, আবার কেউ হালকা ইঙ্গিত দিয়ে বুঝিয়ে দেন। তবে আল্লাহওয়ালারা বা সত্যিকারের সৎ ও স্নেহভাজন মানুষরা অনেক সময় কিছু বলেন না, নিরব থাকেন। উনাদের এই নিরবতা কোনো দুর্বলতা বা অজ্ঞতা নয়, বরং এটি: আস্থা ও সংশোধনের সূক্ষ্ম পদ্ধতি। যে আমাদের মুখের উপর কিছু বলেন না, অথচ আমাদের ভুল দেখেও বিশ্বাস রাখেন, নিরব থেকে আমাদের সংশোধন চান, দোয়া করেন, তার নিরবতা অনেক বেশি স্পর্শ করে হৃদয়কে, আমাদের আত্মসম্মান ও দায়বোধ জাগিয়ে তোলে। আমরা তখন শুধরে যেতে চাই নিজের থেকে, স্যারের এই নিরবতা হয়ে ওঠে, এক ধরনের অভিমানহীন উপদেশ, আর আখিরাতমুখী সংশোধনের এক মার্জিত আহ্বান।
২০৬. একবার স্যার ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টে নিজ কক্ষে বসে ডিগ্রি পাস…
একবার স্যার ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টে নিজ কক্ষে বসে ডিগ্রি পাস কোর্সের পরীক্ষার খাতা দেখছিলেন। এটি সেই সময়ের কথা, যখন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়নি; দেশের অনেক কলেজের ডিগ্রি, প্রিভিয়াস ও মাস্টার্স কোর্সের পরীক্ষা পরিচালনা করা হতো রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। স্যারের সামনে ছিল একগাদা খাতা, অধিকাংশ খাতাতেই অপ্রাসঙ্গিক, অগোছালো এবং অপ্রতুল উত্তর। কিছু কিছু খাতায় এমন আজগুবি লেখা ছিল, যা দেখে বোঝা যায়, ছাত্ররা হয়তো বিষয় বুঝেইনি। খাতাগুলোর নম্বর দেখে বোঝা যাচ্ছিল, অধিকাংশই পাশের যোগ্য নয়। স্যার স্বাভাবিক নিয়মেই খাতা দেখছিলেন, যথাযথ উত্তর না পেলে ফেল দিচ্ছিলেন। বেশিরভাগ ফেল করছে দেখে পাশে বসে থাকা মাহফুজ ভাই স্যারের দিকে তাকিয়ে আবেগে বললেন, “স্যার, একটু দয়া করেন, যেটুকু লিখেছে সেটুকুর ভিত্তিতে কোনোমতে পাশটা করিয়ে দিন।” স্যার মাথা নাড়লেন, শান্ত ভঙ্গিতে বললেন, “এটা দয়ার জায়গা নয়।” মাহফুজ ভাই জিজ্ঞেস করলেন, “তাহলে এটা কিসের জায়গা?” স্যার বললেন, “এটা বিচারের জায়গা। জাজমেন্টের জায়গা।” এই সংক্ষিপ্ত কথোপকথন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রতিটি ক্ষেত্রেরই একটি নিজস্ব মানদণ্ড আছে, কিছু স্থানে দয়া নয়, যেখানে ন্যায়ের প্রয়োজন, সেখানে দয়া ন্যায়ের বিকৃতি।
২০৭. রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে এক বয়ানে স্যার বলেছিলেন, যখন…
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে এক বয়ানে স্যার বলেছিলেন, যখন কারও আখেরাতমুখী উন্নতি ঘটতে থাকে, তখন তার অন্তরের শুদ্ধতা ও পরিচ্ছন্নতা বাড়তে থাকে। মানুষ যদি আখেরাতের লাইনে উন্নতি করতে থাকে, তার দ্বীনি তরক্কী হতে থাকে, তাহলে দুনিয়ার কোনো জরুরতে, দুনিয়ার কোনো ব্যস্ততায় বা কাজের মধ্যে সে স্থায়ী থাকতে পারবে না, সে এতমিনান (সন্তুষ্টি) পাবে না। সে সবসময় সেই অবস্থাকে পরিবর্তন করতে চাইবে, কোথাও তার দ্বীল এতমিনান হবে না। তার অস্থিরতা, ঈমানি স্পর্শকাতরতা বাড়তে থাকবে, আর তখন সে দুনিয়ার কোনো কাজে, কোন অবস্থানে স্থায়ী হতে চাইবে না। স্যার বলেন, তার এই অভ্যন্তরীণ পরিচ্ছন্নতা ও দ্বীনি উন্নতি যত বাড়তে থাকে, সে তত বেশি নিজেকে বিশুদ্ধ রাখতে চায়, তত বেশি প্রতিটি ক্ষেত্রে নিজের জন্য অশুদ্ধতা বা ত্রুটি দেখতে পায়। তখন তার চোখে তার ব্যস্ততার মধ্যে, তার কাজের মাঝে, চারপাশের সব কিছুতেই ক্রমাগত অশুদ্ধতা ধরা পড়তে শুরু করে। যা আগে তার কাছে স্বাভাবিক মনে হতো, এখন তা তার কাছে অপূর্ণাঙ্গ বা ত্রুটিপূর্ণ মনে হয়। স্যার স্পষ্ট করে উল্লেখ করেন, হয়তো তার দুনিয়াবী কাজ গুলো শুদ্ধই, কিন্তু তার দ্বীনি উন্নতি, তার পরহেজগারী ও অন্তরের অনুভব তাকে তার এমন শুদ্ধ কাজেও সম্পূর্ণ শান্তি দেয় না। স্যার আরো বলেন, দুনিয়ার আরাম আয়েশ বা কর্মব্যস্ততায় দ্বীল এতমিনান হওয়াটা (আত্মিক প্রশান্তি খুঁজে পাওয়াটা) দ্বীনের পথে স্থবিরতার লক্ষণ হতে পারে। যদি কেউ দুনিয়ার কোনো কাজে নিজেকে স্থায়ী করে ফেলে, এবং তাতেই তৃপ্ত হয়ে যায়, তাতে যদি সে পরিপূর্ণ স্বস্তি ও এতমিনান পায়, তবে খুব সম্ভবত এটি ইঙ্গিত দেয় যে সে দ্বীনের পথে থেমে গেছে, কিংবা তার দ্বীনি হালত নিম্নগামী হয়েছে। যার অন্তর দুনিয়ার ভেতরেই শান্তি পেয়ে যায়, দ্বীনদারীর দিক থেকে সে হয় দাঁড়িয়ে পড়েছে, না হয় পিছিয়ে যাচ্ছে।
২০৮. স্যার এক মোজাকারায় বলেন, আমাদের ইমান কতটা পূর্ণ, তা…
স্যার এক মোজাকারায় বলেন, আমাদের ইমান কতটা পূর্ণ, তা অনেক সময় আমাদের পার্থিব বস্তুর প্রতি আসক্তি এবং তার দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার প্রবণতা থেকে বোঝা যায়। প্রসঙ্গক্রমে স্যার একটি উদাহরণ দিয়ে বলেন, মনে করো একজন ব্যক্তি একটি দামি ও সুপরিচিত ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেল চালাতে অভ্যস্ত। এলাকায় সবাই তাকে এই মোটরসাইকেল চালক হিসেবেই চেনে। এখন, যদি কোনো কারণে তাকে সাইকেল চালিয়ে কোথাও যেতে হয় এবং সে এই ভেবে লজ্জা পান যে, “আমি দামি মোটরসাইকেল চালিয়ে অভ্যস্ত, এখন সাইকেল চালালে লোকে কী ভাববে?” এই মনোভাবই প্রমাণ করে যে সে এখনো ইমানের পূর্ণাঙ্গ স্বাদ গ্রহণ করতে পারেননি। কেননা, এই পরিস্থিতিতে সাইকেল চালানোকে ছোট বা অসম্মানের মনে করছে, সে তার সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে আসবাবের উঁচু নিচুকে যুক্ত করে ফেলেছে। এই ধরনের মানসিকতা ইমানের দুর্বলতারই লক্ষণ। একজন মুমিন কখনোই পার্থিব বস্তুর মানদণ্ডে নিজের সম্মান বা মর্যাদা পরিমাপ করবে না। বরং, বিনয় এবং আল্লাহ্র সন্তুষ্টিই তার কাছে মুখ্য। স্যার আরও বলেন, কেউ যদি এই ধরনের পরিস্থিতিতে (দ্বীলের এই অবস্থায়) মাঝে মাঝে সাইকেলও না চালায়, তাহলে দিল কখনোই সেই ইমানের স্বাদ অনুভব করতে পারবে না, যা মানুষকে পার্থিব অহংকার ও লোক লজ্জার ঊর্ধ্বে রাখে। একজন প্রকৃত মুমিনের বৈশিষ্ট্য হলো বিনয় ও সরলতা। দামী জিনিস ব্যবহার করা বা ভালো অবস্থানে থাকা দোষের নয়, কিন্তু এর কারণে নিজেকে অন্যের চেয়ে বড় ভাবা বা ছোট জিনিসের প্রতি বিতৃষ্ণা অনুভব করা ইমানের দুর্বলতা। ইমানের পূর্ণতা তখনই আসে যখন আমরা সকল আসবাবের ঊর্ধ্বে উঠে আল্লাহ্র সন্তুষ্টিকে জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য বানাতে পারি।
২০৯. একবার নাটোরের ভাই আমানুল্লাহর জামাতের নুসরতে এসে সাথীদের সাথে…
একবার নাটোরের ভাই আমানুল্লাহর জামাতের নুসরতে এসে সাথীদের সাথে মোজাকারায় স্যার দাওয়াতের কাজের ব্যাপারে তরগীব দেন। স্যার প্রশ্ন করেন, “এই যে আমরা এখানে গেলাম, ওখানে গেলাম, কী ফায়দা হলো আমাদের? বিভিন্ন জায়গায় গাশ্ত করছি, গাশ্ত করি, দাওয়াত দেই, এর কি ফায়দা হয়?” প্রশ্নটি উত্থাপন করে স্যার নিজেই এর উত্তর দেন এক উপমার মাধ্যমে। স্যার বলেন, মনে করো একটা পাখি বটগাছ থেকে একটা ফল মুখে করে নিয়ে রাজার রাজপ্রাসাদের চূড়ায় গিয়ে বসল। ফলটা খেয়ে সে তার ঠোঁটটা ঐ বিল্ডিংয়ের গায়ে একটু মুছে দিল, শুধু একটু ঘষে দিল। ওখানে তো ঐ পাখি এমন কোনো বিশাল কাজ করেনি, শুধু তার ঠোঁটটা একটু ঘষে দিয়েছে। হয়তো তার ঠোঁটে ফলের বিচি ছিল। তার ঐ সামান্য একটু ঘষাতেই রাজপ্রাসাদের চূড়ায় একটা নরম, ছোট্ট শিকড় বের হলো। আস্তে আস্তে সেই শিকড় থেকে ডালপালা গজালো, গাছ বড় হতে শুরু করলো। ধীরে ধীরে সেই গাছ এতটাই বড় হয় যে, কখনো কখনো ঐ গাছের মোটা শিকড়ের ফাঁকে প্রাসাদের কিছু ইটের গাঁথুনি বা পিলার দেখা যায়। এক পর্যায়ে দেখা যায়, বিল্ডিংয়ের অস্তিত্বই নেই, কিন্তু ঐ গাছ সটান দাঁড়িয়ে আছে। তেমনি তোমাদের এই গাসত, সাক্ষাৎ, সালাম, মেহমানি, এসব হয়তো বাহ্যিকভাবে সামান্য মনে হয়, কিন্তু একসময় ঠিক সেই ঠোঁট ঘষার মতো তা কারো অন্তরে দ্বীনের বীজ বপন করে দেয়। ধীরে ধীরে তা বেড়ে ওঠে, ঐ একটু ঠোঁট ঘষা যেরকম বিশাল গাছের এক অস্তিত্বে নিয়ে আসে, তেমনি এই একটু ঘষা মাজা গাশ্তে ঐ ভাইয়ের জিন্দেগীতে, ঐ ভাইয়ের ঘরে, বা ঐ এলাকায় বেদ্বীনিকে দূরে হটিয়ে দ্বীনকে নিয়ে আসে, দ্বীনি জিন্দেগী দাড় করিয়ে দেয়। হয়তো আজ নয় (দেখা যাচ্ছে না), কিন্তু একদিন সেই ভাইয়ের জীবনে, তার পরিবারে, তার এলাকায় দ্বীনের চর্চা প্রতিষ্ঠা পাবে, এবং বেদ্বীনির সব অবশেষ মুছে যাবে। স্যার বলেন, আল্লাহর জন্য দাওয়াতের প্রতিটি ক্ষুদ্র প্রচেষ্টাও আল্লাহর কাছে অনেক বড় এবং এর ফলাফল অকল্পনীয়, আপাতদৃষ্টিতে ছোট এই প্রচেষ্টাগুলোই সুদূরপ্রসারী ও বিশাল পরিবর্তনের কারণ হতে পারে।
২১০. একবার স্যার ইখলাস এর গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি…
একবার স্যার ইখলাস এর গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক তুলে ধরেছিলেন। স্যার বলেন, “ধরা যাক, কোনো ভিআইপি জামাত এসেছে, সেখানে সচিব আছেন, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, অথবা বিদেশী ভাইয়েরা আছেন। তখন আমরা নিজের অজান্তেই খুবই উৎসাহ ও উদ্দীপনা নিয়ে তাদের নুসরতে লেগে যাই। সাথীদের নিয়ে শহরজুড়ে গাসত করি, মেহমানদারিতে কোনো ঘাটতি রাখি না, সময় দেই, মাল খরচ করি, পরিশ্রম করি। আর তখন আমাদের মনেও ভাল লাগে যে, দ্বীনের জন্য কত বড় কাজ করছি, কত সুন্দর মেহনত করছি। তাদের মেহমানদারী করতে আমাদের মধ্যে এক ধরনের বাড়তি আগ্রহ ও উদ্দীপনা কাজ করে। বড় আত্মতৃপ্তি অনুভব করি যে, “আল্লাহ পাক আমাকে দ্বীনের জন্য সময়, মাল ও জান খরচ করার তৌফিক দিলেন।” বড় কর্মকর্তা, সচিব বা বিদেশী জামাত, তাদের নুসরত করার লোকের অভাব হয় না। কিন্তু যদি কোনো গ্রামের সাধারণ কৃষক ভাইদের জামাত আসে, গরীব মানুষ, কুলি, মজুর শ্রেণির জামাত আসে? তখন সেই একই আগ্রহ, সেই একই আন্তরিকতা, সেই একই সময় দেওয়ার মন মানসিকতা দেখা যায় না। কিন্তু কেন এমনটা হয়? স্যার প্রশ্ন তোলেন, “কেন ঐ একই আগ্রহ পাই না সাধারণ জামাতের ক্ষেত্রে? কেন হবে এরকম?” গ্রামের খুব গরীব মানুষ, সাধারণ কৃষক, কুলি মজুরদের জামাত আসে, তখন সেই একই আগ্রহ, সেই একই উদ্দীপনা তাদের নুসরত করার জন্য, তাদের সাথে সময় দেওয়ার জন্য বা তাদের মেহমানদারী করার জন্য থাকে কি? স্যার বলেন, যদি সত্যিই আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাজ করি, তাহলে জামাতের সদস্য কারা, সেটার ওপর নির্ভর করার কথা না। এখলাস তো তাকে তাকাজা দেখে কাজ করাবে, ব্যক্তি দেখে নয়। বরং এক জন মুমিনতো এমন জামাতের দিকে বেশি মনোযোগ দেবে, যাদের দুর্বলতা বেশি, যাদের সাহায্য ও নূসরতের প্রয়োজন বেশি। কারণ এসব সাথীর প্রতি খিদমত করলেই আল্লাহর সন্তুষ্টির আশা বেশি।
২১১. একবার হজ্জ সফরে, মিনা থেকে মক্কার পথে ফিরছিলেন স্যার…
একবার হজ্জ সফরে, মিনা থেকে মক্কার পথে ফিরছিলেন স্যার ও সাথীসঙ্গীরা। দীর্ঘ হেঁটে চলা, প্রচণ্ড গরম, আর হজ্জের চূড়ান্ত আমল শেষ করার ক্লান্তি, সব মিলিয়ে সবার মাঝেই দ্রুত মক্কায় পৌঁছে ‘হালাল’ হওয়ার এক রকম তাড়া কাজ করছিল। মিনা থেকে মক্কার পথে ফিরছেন হাজ্বীদের দল। সবার মনে তখন একটাই চিন্তা, কত দ্রুত হোটেলে পৌঁছে মাথা কামানো, গোসল করা, হালাল হওয়া যাবে, প্রচন্ড রোদ আর হাঁটার ক্লান্তি সবার চোখে মুখে স্পষ্ট। এই ক্লান্তি আর কষ্টের মুহূর্তে হঠাৎ এক ভাই অসুস্থ হয়ে পড়েন। প্রচণ্ড গরমে তার শরীর ভেঙে পড়ে, তিনি রাস্তাতেই শুয়ে পড়েন, বমি করতে করতে একবারেই নিস্তেজ হয়ে পড়েন। অবস্থা এমন যে, সাথে থাকা সকলেই দুশ্চিন্তায় পড়ে যান, সবাই ঐ ভাইকে নিয়ে ভীষণ চিন্তিত। স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে পুলিশের সাথে যোগাযোগ করা হয়, কিছুক্ষণ পরে পুলিশ ও অ্যাম্বুলেন্স আসে এবং জানায়, রোগীর সাথে তার সঙ্গীদের মধ্য থেকে একজনকে যেতে হবে হাসপাতালে, অ্যাম্বুলেন্সে একটি সিট ফাঁকা আছে। এমন এক পরিস্থিতি, যখন সবাই ক্লান্ত, হালাল হওয়ার জন্য অধীর, দ্রুত হালাল হওয়ার তাগিদে মক্কার দিকে ছুটছেন, আবার ঐ অসুস্থ ভাইটি ভিন্ন এজেন্সির হওয়ায় তার হোটেলও ছিল ভিন্ন ও দূরে। এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই দ্বিধায় পড়ে যান। সেখানে একজন রোগীর সাথে হাসপাতালে যাওয়া মানে নিজের গন্তব্যে পৌঁছাতে অনেক দেরি হওয়া, নিজের কষ্ট আরও বাড়িয়ে তোলা। অন্যরা অপেক্ষাকৃত তরুণ হলেও, স্যার ছিলেন জামাতের সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ ও অভিভাবকসুলভ। সাথে থাকা সাথীদের সবাই যুবক, কেউ কেউ যেতে আগ্রহ দেখালেও স্যার নিজেই এগিয়ে এলেন, নির্দ্বিধায় বললেন, আমি যাবো। রোগীর সাথে স্যারের কষ্ট হবে এবং ফিরতে দেরী হতে পারে মনে করে সাথীদের কেউ কেউ স্যারকে না যাবার রায় দেন। ‘স্যার’ দ্ব্যর্থহীনভাবে বললেন, “আমিই যাই।” স্যার আরবী ভাষার অজুহাতে (হাসপাতালে কথা বলতে সুবিধা হবে) কৌশলে রোগীর সাথে হাসপাতালে যাওয়ার গুরুদায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিলেন, বাকী সাথীদেরকে ফ্রি করে দিয়ে নিজে এ্যাম্বুলেন্সে উঠে পড়েন। নিজের ক্লান্তি, বয়স, এবং দ্রুত হালাল হওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে বিসর্জন দিয়ে, অসুস্থ ভাইটিকে হাসপাতালে ভর্তি করানো, চিকিৎসার তদারকি করা, সুস্থ হলে তাকে হোটেলে পৌঁছে দেওয়া, এসব সম্পন্ন করে যখন স্যার নিজ হোটেলে ফিরলেন, তখন বেশ রাত। ততক্ষণে বাকি সাথীরা হালাল হয়ে বিশ্রাম নিচ্ছেন। এটি শুধুমাত্র একটি হজ্জ্বের অভিজ্ঞতা ছিল না, কেবল একটি সফরের স্মৃতি নয়, জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ছিল। নিজের আরাম, আয়েশ, ব্যক্তিগত সুবিধা, ও ক্লান্তি উপেক্ষা করে অন্যের প্রয়োজনে এগিয়ে আসা ঐ সময় খুব সাধারণ ত্যাগ ছিল না। অন্যের অবস্থান, পরিচয় বা সম্পর্ক বিচার না করে, কষ্টে থাকা একজনকেও ভালোবাসা ও যত্নের সঙ্গে দেখাভাল ও সঙ্গ দেওয়া, এক মহৎ হৃদয়, নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগ এবং অসাধারণ ভালবাসা, নেতৃত্ব, এখলাস এবং ত্যাগের দৃষ্টান্ত দেখালেন স্যার।
২১২. নওগাঁ সরকারি কলেজের এক ছাত্রজামাত ১০ দিনের মেহনতের জন্য…
নওগাঁ সরকারি কলেজের এক ছাত্রজামাত ১০ দিনের মেহনতের জন্য মান্দা উপজেলার মইনূম এলাকায় অবস্থান করছিল। জামাতের ১০ দিনের সফরের প্রায় শেষ দিকে, দিনগুলো কাটতে কাটতে শেষদিকে এসে ছাত্রদের আর্থিক অবস্থা বেশ দুর্বল হয়ে পড়ে। ঐ এলাকায় বাজারও প্রতিদিন বসতো না, সহজলভ্য জিনিসপত্রও পাওয়া যেত না। মইনূম বাজার মসজিদে অবস্থানকালে, স্যার, কাজল ভাই এবং কিছু সাথী এই জামাতের নুসরাতে গিয়েছিলেন। স্যার ঐ রাতে জামাতের সাথে রাত্রিযাপন করেন। সেদিনের খানাপিনা ছিল অত্যন্ত সাদাসিধা। ঐদিন হাটবার ছিল না, ফলে বিশেষ কিছু রান্না করা সম্ভব হয়নি। সাধারণ আলোর চাল (আতপ চাল) দিয়ে, গরুর চর্বি (তেল) এবং লাউ দিয়ে ভুজনার মতো এক প্রকার খিচুড়ি রান্না করা হয়েছিল। জামাতের সাথী ভাই সাগর বর্ণনা করেন, তারা খুব পেরেশান ছিলেন যে এই সাধারণ খাবার স্যার খেতে পারবেন কি না। এমন সম্মানিত মেহমানের সামনে এই খিচুরি পেশ করা কি শোভনীয় হলো? কিন্তু স্যার অত্যন্ত আগ্রহ ও তৃপ্তির সাথে সেই খাবার গ্রহণ করেন। স্যার এমনভাবে খেয়ে উঠেন যে, সাথীদের বিন্দুমাত্র বুঝতে দিলেন না যে এটি কোনো সাধারণ খাবার। স্যার আচরণে একটুও বুঝতে দেননি যে খাবারটা খুবই সাদামাটা হয়েছে। ভাই সাগর বলেন, স্যারের এই তৃপ্তি সাথীদের হৃদয়ে এক গভীর প্রভাব ফেলেছিল। মাগরিবের পর স্যার জামাতের হালত (অবস্থা) নিয়ে বয়ান করেন। স্যার হযরত আমির ইবন আব্দুল কায়স রহমতুল্লাহি আলাইহি এর একটি ঘটনা উল্লেখ করেন। যখন তাকে গভর্নর হিসেবে পাঠানো হয়েছিল, তখন স্থানীয় লোকজন তার জন্য একটি বড় ও সম্মানজনক বাড়ি নির্মাণের প্রস্তাব দেয়। কিন্তু তিনি সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলেন, “আমাকে যদি বাড়ি বানিয়ে দিতে চাও তবে এমন বাড়ি বানিয়ে দাও যেন আমি শুলে আমার পা দেয়ালের সাথে লেগে থাকে, আর দাঁড়ালে আমার মাথা চালের সাথে ঠেকে যায়। কারণ আমার এই দুনিয়ার জীবনের দরকার এতটুকুই।” এই ঘটনা বর্ণনা করে স্যার বয়ানের মধ্যে প্রশ্ন করে বলেন, এমন ঘরে শুয়ে কি দুনিয়ার মহব্বত হবে নাকি আখিরাতের দিকেই মন নিবদ্ধ থাকবে? স্যার আরও বলেন, অনেক আল্লাহওয়ালাদের জীবনতো এমন ছিল যে, ঘোড়ার পিঠেই জন্ম এবং এই ঘোড়ার পিঠেই প্রান্তর থেকে প্রান্তর ছুটে চলেছেন, দুনিয়ার বিলাসিতা থেকে তারা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন, তারা ছিলেন অজেয়। তিনি আরও বলেন, যখন কেউ এমন অভাবী, দুর্বল অবস্থায় থেকেও মেহনত করে যায়, মেহনতের এই দুর্ভোগই তাকে আল্লাহর দরবারে কদরের স্থান এনে দেয়। আল্লাহ পাক তাতে এস্তেকামাত (স্থিরতা, অবিচলতা) দান করেন, সাহায্য করেন, এবং আখেরাতের চিন্তা হৃদয়ে গেঁথে দেন। আল্লাহ পাক আখিরাতের জন্য তাদের অন্তরকে প্রস্তুত করে দেন।
২১৩. ভাই সাগর বলেন, স্যারের জীবনযাপন ছিল সরলতা ও সুন্নাহর…
ভাই সাগর বলেন, স্যারের জীবনযাপন ছিল সরলতা ও সুন্নাহর এক প্রতিচ্ছবি। স্যারের প্রতিটি কাজ, এমনকি ছোটখাটো অভ্যাসও অন্যদের জন্য শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করত। ওজুর পরে কেউ যদি গামছা বা রুমাল এগিয়ে দিতেন, স্যার তা বিনয়ের সাথে গ্রহণ করে ব্যবহার করতেন, হাত মুখ মুছতেন, কখনো অবহেলা করতেন না, অন্যদের দেওয়া কোনো বস্তুকে সম্মান করে মনোভাব প্রকাশ করতেন। একবার নওগাঁয় এক সফরে এক সাথী স্যারকে ওজু করতে দেখে অনুপ্রাণিত হন। সেই সাথী বিনয়ের সাথে স্যারকে একটি ছোট রুমাল হাদিয়া (উপহার) দেন। স্যার অত্যন্ত খুশি মনে সেই রুমাল কবুল করেন এবং উপহারদাতার সামনেই সেটি ব্যবহারও করেন। স্যারের এই আচরণে কেবল রুমাল গ্রহণই ছিল না, বরং উপহারদাতার প্রতি তার ভালোবাসা ও সম্মানও প্রকাশ পেয়েছিল। ছোট উপহারকেও কীভাবে সাদরে গ্রহণ করতে হয় এবং এর মাধ্যমেও মানুষের মন জয় করা যায়, স্যার আমাদের শিখিয়েছিলেন। স্যার কখনো নিজেকে সাধারণ মানুষ থেকে আলাদা মনে করেননি, স্যারের সরলতা এবং অন্যের দেওয়া তুচ্ছ জিনিসকে শ্রদ্ধার সাথে গ্রহণ করা স্যারের বিনয়ী চরিত্রের পরিচায়ক ছিল।
২১৪. রাজশাহীতে কাজল ভাইয়ের বাসায় স্যারের অবস্থানকালে অনেকবার স্যারের মাথা…
রাজশাহীতে কাজল ভাইয়ের বাসায় স্যারের অবস্থানকালে অনেকবার স্যারের মাথা কামিয়ে দিয়েছিলাম। অনেক সময় অসাবধানতায় স্যারের মাথা কেটে ফেলতাম, রক্ত বের হত। কিন্তু স্যার কখনো একটিবারও বিরক্ত হননি, একবারের জন্যও “ওহ! আহ!” বলেননি, বিরক্তি প্রকাশ করেননি, আঘাতের কথা বলেননি, এতটুকুও জিজ্ঞেস করেননি যে, “কেটে গেছে নাকি?” যখন নিজেই অনেক সময় “ওহ” বলে উঠতাম (নিজের হাতে স্যারের মাথায় কেটে দিলাম), স্যার খুব স্বাভাবিকভাবে বলে উঠতেন, “ওওওরকম এমন একটু হয়ই”, বরং “জাযাকাল্লাহ” বলে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতেন। রাজশাহীতে স্যারকে কখনো কোনো সেলুন বা দোকানে গিয়ে মাথা কামাতে দেখি নাই।
২১৫. একবার হজ্জের সফরে মিনায় হালাল হবার জন্য মাথা কামানোর…
একবার হজ্জের সফরে মিনায় হালাল হবার জন্য মাথা কামানোর ব্যবস্থা করা হয়, স্যার ইফরাদ হজ্জ করছিলেন। সাথে ছিল সাধারণ এক টাকা দামের একটি প্লাস্টিকের রেজার এবং পূর্বে ব্যবহৃত বলাকা ব্লেড। এই অতি সাধারণ রেজারেই সাধারণ ব্লেড ভরে স্যারের মাথা কামানো হচ্ছিল। রেজারের প্যাঁচ ভালো না থাকায় ব্লেডটি কিছুটা আলগা হয়ে যাচ্ছিল, ফলে চুল ঠিকমতো কাটা যাচ্ছিল না এবং বারবার মাথা কেটে রক্ত বের হচ্ছিল। স্যার নিজে রেজারটি হাতে নিয়ে প্যাঁচ টাইট করার চেষ্টা করেন, কিন্তু তা যথেষ্ট টাইট হচ্ছিল না। তখন মাটিতে পড়ে থাকা একটি ম্যাচের কাঠির মতো শলাকা ব্লেডের নিচে ভরে রেজারের প্যাচটা টাইট করে আবার চুল কাটার জন্য দেন। চুল কাটতে কাটতে মাথার অনেক জায়গায় কেটে যায় এবং বেশ রক্তও বের হয়, এক জায়গায় তো মাথা ছিলে গিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছিল। কিন্তু স্যার একবারের জন্যও “ওহ, ব্যথা,” বা “ওহ, কষ্ট হচ্ছে,” অথবা “মাথা কেটে ফেলেছ নাকি!” এমন কোনো কথা বলেননি। বরং, যখন আমরাই স্যারের রক্তক্ষরণ দেখে “ওহ! ওহ!” করছিলাম এবং বলছিলাম, “স্যার, কেটে যাচ্ছে তো!” আমাদের এই উদ্বিগ্ন মুখ দেখে স্যার তার চিরচেনা হাসির অভ্যাসের মতো এক ঝলক হেসে উঠে বললেন, “চুল তো কাটা হচ্ছে, কেটে (চুল) দাও, শেষ করো।” হজ ও ওমরার পর যখনই হালাল হওয়ার জন্য মাথা কামানোর দরকার হতো, স্যার সবসময় সফরসঙ্গীদের হাতেই মাথা কামিয়ে নিতেন। স্যারকে কখনো কোনো দোকানে, সেলুনে মাথা কামাতে দেখা যায়নি। অনেক সময় হোটেলে (বাসায়) যাওয়ার পথে সেলুন বা রাস্তায় চুল কাটার জন্য থাকা ব্যক্তির ডাক শুনে স্যারকে সহজে (মাথা না কেটে অল্প সময়ে) মাথা কামিয়ে নেওয়ার কথা বললেও, স্যার অন্যদের কখনো নিষেধ করেননি; কিন্তু নিজে কখনো দোকানে বা নাপিতের হাতে চুল কাটেননি। অন্য একবার এরকম চুল কাটার পূর্ব মুহূর্তে স্যার বলেন, “তোমার চুল আগে কেটে দেই।” কিন্তু স্যারের হাতে চুল কামিয়ে নিতে ইতস্তত লাগছিলো, স্যারকে বসিয়ে প্রথমে স্যারের চুল কেটে দেওয়া হয়। স্যারের চুল কাটা হয়ে যাওয়ার পর ইচ্ছা ছিল যে, স্যার গোসল করতে করতে বাইরে দোকানে গিয়ে নিজের চুল কামিয়ে আসা যাবে। কিন্তু স্যারের চুল কাটা শেষ হতেই স্যার বললেন, “তুমি বসো।” “স্যার, আপনি গোসল করে নেন, আমি চুল কেটে নিব ইনশাআল্লাহ।” স্যার একটু জোর দিয়ে বললেন, “আবার কোথায় যাবে, এখানেই বসো।” স্যার নিজ হাতে তার সফরসঙ্গি, বয়সে অনেক ছোট, ছাত্রদের মধ্যে, চুল কামিয়ে দেন, একটুও ইতস্তত করেননি, খুব স্বাভাবিক ও সাদাসিধা মনে চুল কামিয়ে দিলেন।
২১৬. হজ্জের সফরে আরাফার দিন আসরের নামাজের প্রস্তুতি চলছিল। স্যারের…
হজ্জের সফরে আরাফার দিন আসরের নামাজের প্রস্তুতি চলছিল। স্যারের সাথে প্রায় ১২-১৪ জন একত্রে তাবুর নিচে কাতারবন্দী হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। সাথীদের মধ্যে তখন কেবলার দিক নিয়ে কিছুটা অস্পষ্টতা দেখা দেয়। সাথীদের কেউ কেউ বললেন, কাতার কেবলামুখী হয়নি, এদিকে (ডানে বা বামে) একটু ঘুরে সোজা করতে হবে। আবার অন্য একজন বললেন, না, এভাবেই কেবলা ঠিক আছে। তাবুর ভেতরে কেবলার কোনো নির্দেশক চিহ্ন ছিল না, তাবুর বাইরে বড় খুঁটিতে কেবলার নির্দেশনা চিহ্ন ছিল। এমন দ্বিধাদ্বন্দ্বের মুহূর্তে স্যার বাইরে গিয়ে কেবলা নির্দেশক দেখে নিশ্চিত হয়ে আসতে বললেন, ঠিক করে দেখে আসো কেবলার দিক। একভাই বাইরে গিয়ে দেখে আসলেন এবং ফিরে এসে কাতার সোজা করে একামত দেওয়া হলো। এরই মধ্যে এক ভাই বলে উঠলেন, “আরও একটু এইদিকে মোড় নিলে ভালো হয়।” অন্য একজন (যিনি এইমাত্র বাইরে গিয়ে দেখে এসেছিলেন) বললেন, “না, এভাবেই বোধহয় ঠিক আছে।” ঐ ভাইয়ের এই কথার পর স্যার একটু জোর দিয়েই বললেন, “বোধহয় কী? ঠিকমতো দেখে আসো, অস্পষ্টতা নিয়ে কেন? (বোধহয়, মনে হয়, মানে কী? এরকম অস্পষ্টতা নিয়ে কেনো, অস্পষ্টতা থাকবে কেন? অস্পষ্টতা রাখবে কেন? স্পষ্টভাবে দেখে এসো)!” স্যারের এই তাকিদের পর আবারও দুই তিন ভাই তাবুর বাইরে গিয়ে নিশ্চিত হয়ে এলেন, তখন কাতার সোজা করে নিয়ে নামাজ আদায় করা হলো। নামাজের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতে কেবলার মতো মৌলিক বিষয়ে অস্পষ্টতা বা অনুমাননির্ভরতা স্যার ঐসময় একদমই পছন্দ করেননি। স্যারের দৃঢ় উক্তি, “বোধহয় কী? ঠিকমতো দেখে আসো, অস্পষ্টতা নিয়ে কেন?” মনে হচ্ছিল শুধু কেবলার দিক নির্ণয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নয়, বরং জীবনের প্রতিটি ছোট বড় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে এটি এক অমূল্য শিক্ষা (যখনই কোনো বিষয়ে সামান্যতম সন্দেহ জাগে, তা নিরসন করে, নিশ্চিত হয়ে শুরু করাই প্রকৃত সচেতনতা ও দূরদর্শিতার পরিচয়)।
২১৭. আরিফুর রহমান ভাই হজ্জের সফরের স্মৃতিচারণ করে বলেন, আরাফার…
আরিফুর রহমান ভাই হজ্জের সফরের স্মৃতিচারণ করে বলেন, আরাফার ময়দানে স্যারের সাথে পায়ে হেঁটে যাওয়ার ইচ্ছা থাকলেও মাস্তুরাত (মহিলা সদস্য) থাকায় তা সম্ভব হয়ে উঠেছিল না। তবে মিনার তাবুতে ফেরার পরে, জামারাতে একত্রে রওয়ানা হলাম। মিনার তাঁবু থেকে জামারাতে পাথর মারতে যাওয়ার সময়কার ঐ জনসমুদ্রের মধ্যে আমাদের জন্য দায়িত্বশীল একজন রাহবার ছিলেন স্যার। পথে ছিলো বিপুল ভিড়, মানুষের স্রোত যেন থামছেই না, লাখ লাখ মানুষের ভিড়ে জামারার পথে চলাটা ছিল এক কঠিন অভিজ্ঞতা। বিশেষ করে আহলিয়া ও বয়স্ক আম্মা সাথে ছিলেন। ভাই বলেন, আমি নিজে চেষ্টা করছিলাম আম্মা ও স্ত্রীকে নিয়ে স্যারের পেছনে চলতে, কিন্তু সামনে থাকা স্যারকে ফলো করাটাই হয়ে উঠছিল দুরূহ। লক্ষ করছিলাম, স্যার কিছু দূর গিয়ে বারবার পেছনে ফিরে আমাদের দেখছেন, আমরা ঠিক আছি কি না, দলছুট হচ্ছি কি না, মাস্তুরাতদের নিয়ে চলাচলের সময় রাস্তায় কোনো অসুবিধা হচ্ছে কিনা। এভাবে পুরো পথজুড়ে, স্যার আমাদের গতির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে চলেছেন, একবার থেমে দাঁড়াচ্ছেন, আমরা এগোলে আবার হাঁটা শুরু করছেন। লাখো মানুষের সেই চলমান ভিড়ে স্যার উনার নিজস্ব গতিতে এগিয়ে না গিয়ে, বারবার পেছনে ফিরে আমাদের অনুসরণ করছিলেন। জামারাতে পৌঁছে পাথর নিক্ষেপের কাজ শেষে ফিরতি পথেও একইভাবে স্যারের সাথি ছিলাম। অথচ ইচ্ছে করলে স্যার আমাদের দায়িত্ব আমার (যেহেতু আমি পুরানো সাথী) উপর ছেড়ে দিয়ে নিজে এগিয়ে যেতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। স্যারের এই আখলাক আমাদের চোখে একজন রাহবারের প্রকৃত রূপ তুলে ধরেছিল, যিনি নেতৃত্ব দেন, কিন্তু ঊর্ধ্বতাসুলভ আচরণ করেন না; বরং দল থেকে দুর্বলদের খেয়াল রাখেন, গতি ও কষ্টের ভারসাম্য বজায় রাখেন, এবং সাথীদের সঙ্গেই নিজেকে একাত্ম করেন।
২১৮. ভাই আরিফুর রহমান বলেন, হজের সফরের শেষে মদীনায় স্যারসহ…
ভাই আরিফুর রহমান বলেন, হজের সফরের শেষে মদীনায় স্যারসহ সাথীরা এক ভাইয়ের বাসায় কিছুদিন অবস্থান করেছিলেন। স্যার সাধারণত চা খেতেন এবং জামাতের সাথীরাই চায়ের ব্যবস্থা করতেন। একদিন অন্য সাথীরা বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। স্যার বিশ্রাম থেকে উঠে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কি চা বানাতে পারো?” আমি সম্মতি জানালে স্যার বললেন, “তুমি যদি চা বানাতে পারো তাহলে চা বানাও, ভেতরে (মাসতুরাতকে) বলার দরকার নেই।” ভাই স্যারের স্মৃতিচারণ থেকে বলেন এটা ছিল স্যারের অসাধারণ বিচক্ষণতা এবং অন্যের প্রতি যত্নের প্রমাণ। উনি বলেন যে স্যার সাধারণত কখনো চা বানানো বা এই ধরনের কোনো কাজের কথা উনাকে বলেননি। স্যারের এই জিজ্ঞাসা থেকে বোঝা যায়, স্যার নিশ্চিত হতে চেয়েছিলেন যে উনি কাজটি করতে সক্ষম কিনা। যখন উনি হ্যাঁ বললেন, তখন স্যার উনাকে উনার স্ত্রী বা মাকে বিরক্ত করতে নিষেধ করলেন, যাতে উনারা বিশ্রাম নিতে পারেন। ভাই যখন ভেতরে গিয়ে উনার স্ত্রীকে স্যারের চায়ের কথা জানালেন, স্যার চা খাবেন এটা বানানো আর এমন কি কষ্ট বলে সানন্দে চা তৈরি করে দেন। সফরের ক্লান্তি এবং বিশ্রামের গুরুত্ব স্যার কতটা উপলব্ধি করতেন, তা এই ছোট্ট ঘটনা থেকেই বোঝা যায়। একটা সফরের মধ্যে সাথে থাকা সাথীর মাস্তুরাতের বিশ্রামের ব্যাপারেও স্যার খেয়াল রাখতেন (সত্যিকারের নেতৃত্ব কেবল আদেশ করা নয়, বরং নিজের অধীনস্থ বা সঙ্গীদের প্রয়োজন ও আরামের দিকে খেয়াল রাখা; অন্যের আরাম এবং সুবিধার প্রতি সর্বদা সংবেদনশীল থাকা উচিত, এমনকি তুচ্ছ ছোট বিষয়েও)।
২১৯. নাট্যকার সেলিম আল দীনের কাছে একবার স্যারকে মাহফুজ ভাই…
নাট্যকার সেলিম আল দীনের কাছে একবার স্যারকে মাহফুজ ভাই গাসতে নিয়ে যান। কথোপকথনের মধ্যে স্যার শিল্প সংস্কৃতি ও মানবজীবনের প্রবণতা নিয়ে আলোচনা করেন। স্যার বলেন, “মানুষ যখন গতির মধ্যে থাকে, অর্থাৎ লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও শৃঙ্খলার সাথে জীবনের পথে চলতে থাকে, তখন তার শিল্পের দিকে মনোযোগ দেওয়ার অবকাশ থাকে না। সে তখন আবিষ্কারে ব্যস্ত থাকে, চলার মধ্যেই থাকে। কিন্তু যখন গতি থেমে যায়, তখন সে নিজের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়, নিজের দিকে তাকায়। তখনই সে নাটক, শিল্প, কবিতা, গান, এসবের দিকে ধাবিত হয়, ও প্রকৃত গন্তব্য হারিয়ে ফেলে।” স্যার উদাহরণ দিয়ে বলেন: “পাখি যখন আকাশে উড়ে চলে, তার দৃষ্টি থাকে গন্তব্যে, গতি থাকে শৃঙ্খলাবদ্ধ। সে তখন উড়ে চলে দিগন্তের দিকে। কিন্তু যখন সে পানির ধারে নামে, গতি কমিয়ে দেয়, তখন সে চারপাশের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়, পানির ঢেউ, গাছের ডাল, রোদের ঝিলিক, সবকিছুর মধ্যে সে সৌন্দর্য খুঁজে পায় এবং নাচতে থাকে, গানে মেতে ওঠে।” পাখির এই উপমা দিয়ে স্যার ব্যাখ্যা করেন, জীবনের ‘গতি’ হলো, লক্ষ্যভিত্তিক, শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবন, যেখানে নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে অগ্রসর হয়। গতির সাথে থাকে, তার মনোযোগ থাকে গন্তব্যে, তার সময় ও শক্তি ব্যয় হয় আবিষ্কারে ও অগ্রগতিতে। কিন্তু যখন এই গতি থেমে যায়, তখন সে নিজের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে বসে পড়ে, জীবনের মূল গন্তব্য থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ে।
২২০. ভাই আব্দুল কাইয়্যুম বলেন, একবার রমজান মাসে স্যার মাদানীনগর…
ভাই আব্দুল কাইয়্যুম বলেন, একবার রমজান মাসে স্যার মাদানীনগর মাদ্রাসার মসজিদে ই‘তিকাফে ছিলেন। স্যারের ই‘তিকাফের সাথী হিসেবে প্রাথমিকভাবে একটি জামাত আগে থেকেই স্যারের সঙ্গে অবস্থান করছিলেন। স্যারের ই‘তিকাফের জামাতে সাথীর সংখ্যা দাঁড়ায় আনুমানিক ১৯ জন। আমি (ভাই কাইয়্যুম) এবং ভাই মতিয়ার পরে এসে শেষের দিকে ই‘তিকাফে স্যারের সাথে শরিক হই। ই‘তিকাফ শেষে ঢাকায় ফেরার পরিকল্পনা নিয়ে আলাপ চলছিল। এ সময় স্যার স্থানীয় এক ভাইয়ের কথা উল্লেখ করে বলেন, “উনি আমাদেরকে দাওয়াত করেছেন। তোমরা যেহেতু তখন উপস্থিত ছিলে না, আমরা উনার সঙ্গে ১৯ জনের হিসেবেই কথা বলেছি। এখন দু’টি পথ এক, তোমরা আমাদের সঙ্গেই বের হলে, তবে আমরা বাসায় ভেতরে প্রবেশ করবো আর তোমরা বাইরে অপেক্ষা করবে। আমরা খাওয়া দাওয়া শেষ করলে একসাথে ঢাকায় ফিরবো। দুই, তোমরা চাইলে এখান থেকেই আলাদাভাবে ঢাকায় ফিরে যেতে পারো।” স্যারের এই কথার মধ্যে ছিল এক সূক্ষ্ম সৌজন্যবোধ, ভদ্রতা ও মেহমানদারির উসূল শেখানোর চেষ্টা। তিনি চাচ্ছিলেন যেন নিমন্ত্রণকারীর আতিথেয়তায় কোনো রকম চাপ বা অস্বস্তি সৃষ্টি না হয়। এমন সময় ঐ মেজবান ভাই শুনেছেন যে আমরা দুইজন অতিরিক্ত আছি, নিজেই এগিয়ে এসে স্যারকে বললেন, “স্যার, সাথী যদি বেশি হয় তাতে কোনো সমস্যা নেই। ২০-২৫ জন হলেও অসুবিধা হবে না।” পরে সবাই একসঙ্গেই স্যারের সাথে ঢাকায় ফিরে আসা হয়।
← আগের পর্ব (১৮১–২০০) | সূচিপত্র | পরের পর্ব (২২১–২৪০) →
সংগ্রহ ও সংকলন: মুশফিক আহমদ (রহঃ)-এর মালফুযাত সংকলন।
