|

মালফুযাত – প্রফেসর মুশফিক আহমদ (রহঃ) – পর্ব ১০: ১৮১–২০০

প্রফেসর মুশফিক আহমদ (রহঃ)-এর বয়ান, পরামর্শ, আমল ও দাওয়াতি জীবনের মালফুযাত, ১৮১ থেকে ২০০ নম্বর। সম্পূর্ণ সূচিপত্র দেখুন।

সংগ্রহ ও সংকলন: মুশফিক আহমদ (রহঃ)-এর মালফুযাত সংকলন।

এই পর্বে যা আছে


১৮১. স্যারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল দোহার এলাকার এক পুরোনো…

স্যারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল দোহার এলাকার এক পুরোনো সাথী, ১৯৭২ সালে একত্রে চিল্লা দিয়েছেন, স্থানীয় আলীয়া মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল ও তবলিগের জিম্মাদারও ছিলেন। একবার স্যার উনার বাড়িতে বেরাতে যাওয়ার প্রোগ্রাম করেন এবং কয়েকজন সাথীও স্যারের সঙ্গে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হন। তিনি এলাকার একজন প্রভাবশালী ও সচ্ছল ব্যক্তি ছিলেন, শুক্রবার জুম্মার দিন উনার বাসায় যাওয়া হয়। জুম্মার নামাজের পূর্বে চা—নাস্তার ব্যবস্থা ছিল। নামাজ শেষে যখন মেহমানরা বাসায় প্রবেশ করেন, বাসার বড় মেহমানখানায় ডান পাশে ডাইনিং রুম, বাম পাশে ড্রয়িং রুম, দুই রুমই ছিল প্রশস্ত এবং প্রায় ১০/১২ জনের চলাফেরা, খাওয়া—দাওয়া ও বিশ্রামের জন্য উপযুক্ত। জুমার নামাজের সময় মেজবানের ঘরের মহিলারা ডান পাশের রুমের ডাইনিং টেবিলে খাবার সুন্দর করে সাজিয়ে রেখেছিলেন। মেজবান, যিনি তবলিগের জিম্মাদার ও স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী, বিষয়টি দেখে কিছুটা অস্বস্তি অনুভব করেন—ঘরওয়ালারা পাশের ঘরে মেঝেতে দস্তরখানে খাবার সাজিয়ে রাখলেই ভালো হতো, ডাইনিং টেবিলে খাবার পরিবেশন, মেজবান কিছুটা বিচলিত হন। তিনি স্যারের নিকট প্রস্তাব রাখেন, “স্যার, খাবারগুলো পাশের ঘরে মেঝেতে এনে দস্তরখানে খাওয়ার ব্যবস্থা করবো কি?” উনার এই প্রশ্নে স্যার সরাসরি বলেন, “না,” এবং কোনো দ্বিধা না করেই সোজা গিয়ে ডাইনিং টেবিলে বসে পড়েন। স্যারের দেখাদেখি অন্য সাথীরাও ডাইনিং টেবিলে বসে যান এবং টেবিল চেয়ারেই খাওয়া—দাওয়া সম্পন্ন হয়। এই দৃশ্য সফরের সাথী হাসান হাবিব ভাইকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। তিনি স্যারকে পরে জিজ্ঞেস করেন, “আমি তাবলীগে লাগার পর বহুবার বিভিন্ন বিবাহ অনুষ্ঠান বা কমিউনিটি সেন্টারে মাটিতে বসে খেয়ে দেখিয়েছি যে এটি সুন্নত তরীকা। অথচ আজ আপনি (আপনার মতো ব্যাক্তি) নিজে টেবিল চেয়ারে খেলেন? আমরা অনেক সময় অপারগ হয়ে বাইরে হোটেলে ডাইনিং টেবিলে খানা খাই, কিন্ত সেখানে অপশন ছিল, একেবারে অপারগ না, এবং যার বাসা, মেজবান জিজ্ঞাসও করলেন যে মেঝেতে আনবে কিনা, রীতিমতো ইচ্ছুক হয়েই গেলেন।” ভাই বলেন, স্যার আমার মনের কথাটা আমার প্রশ্নটা বুঝলেন, যদিও আমি স্পষ্ট করে বলতে পারিনি, স্যার কিছু কথা বলে এমন পূর্ণাঙ্গ উত্তর দিলেন, যাতে আমার প্রশ্নের সমাধান মিলেছিল। স্যার বলেন, “শরীয়তে মেহমান ও মেজবানের উপর আলাদা আলাদা হুকুম আছে। মেহমানের আদব হলো, মেজবানকে লজ্জা না দেওয়া এবং কষ্ট না দেয়া। মেজবান যদি ডাইনিং টেবিলে খাবার সাজিয়ে রাখেন, আর আমি বলি ‘না, আমরা মেঝেতে খাবো’, তাহলে তার জন্য লজ্জার বিষয় হয়ে দাঁড়াতো। আর খাবার সরিয়ে এনে নতুন করে মেঝেতে পরিবেশনের প্রয়াস তার জন্য কষ্টকর হতো। এজন্য আমি দ্রুত গিয়ে টেবিলে বসে পড়লাম, যাতে তার সেই মানসিক অস্বস্তি দূর হয়ে যায়, সে যেন স্বস্তিতে থাকেন, লজ্জাও না পান, কষ্টকরও না হয়।” স্যার আরও বলেন, “তুমি যদি সুন্নত আদায়ের নিয়তে মেঝেতে বসতে চাইতে, কিন্তু মেজবান লজ্জা বা কষ্ট পেত, তাহলে সুন্নত আদায়ের ঐ নেকীকে ঢেকে ফেলতো মেজবানকে লজ্জা দেবার ও পেরেশান করার গুনাহ। কারো বাড়িতে মেহমান হলে খেয়াল রাখার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মেজবান যেন কষ্ট বা লজ্জায় না পড়ে।” (এটা শরীয়তের আদব ও আকলসঙ্গতও, শরীয়তের নির্দেশনা কেবল বাহ্যিক রীতি—পালনে সীমাবদ্ধ নয়; বরং মানুষের সম্মান, অনুভূতি, মানবিকতা, সহমর্মিতা ও সামাজিক মর্যাদা রক্ষাকেও গুরুত্ব দেয়।)

১৮২. স্যার একবার বলেন, একজন আলেম হজ্জের উদ্দেশ্যে উনার স্ত্রীকে…

স্যার একবার বলেন, একজন আলেম হজ্জের উদ্দেশ্যে উনার স্ত্রীকে নিয়ে মক্কা মুকাররমা যান। হারাম শরিফে প্রবেশের পর তিনি ও উনার স্ত্রী তাওয়াফ ও অন্যান্য ইবাদতের প্রস্তুতি নেন। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার ঘটে—যখন সবাই কাবা শরিফের দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ হয়ে দোয়া—মুনাজাতে লিপ্ত, তখন ওই আলেমের স্ত্রী আশ্চর্য হয়ে বলতে থাকেন: “কাবা কোথায়? আমি তো কাবা দেখতে পাচ্ছি না!” আশপাশের সবাই বিস্ময়ে বলেন, “এই যে সামনে, এটাই তো কাবা শরিফ!” কিন্তু তিনি বারবার একই কথা বলেন—“আমার চোখে কাবা পড়ছে না!” এ এক গভীর রহস্য! আশপাশের লোকজন তাকে বারবার বুঝান, “এই যে সামনেই তো কাবা!” কিন্তু উনার চোখে কাবা শরিফ ধরা পড়ছে না। এই ভয়ংকর ও অস্বাভাবিক অবস্থার কারণে আলেম অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হন। পরে অনুসন্ধানে জানা যায়, সেই নারী কালো জাদুর (سِحْر) সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। একজন আলেমের স্ত্রী হওয়ার সুবাদে স্থানীয় মহিলারা যখন ইন্তেকাল করতেন, তখন তাদের গোসল করাতে তিনি এগিয়ে আসতেন। কিন্তু গোসলের সময় কৌশলে এই পবিত্র দায়িত্বের আড়ালে মৃত নারীদের কাফনের ভেতরে তাবিজ রেখে দিতেন, মৃত নারীদের কাফন পড়ানোর সময় গোপনে লাশের মধ্যে, বা মুখগহ্বরে, বা শরীরের গোপন অংশে নিজের বানানো তাবিজ ঢুকিয়ে দিতেন, যেগুলো তার জাদুর কাজে ব্যবহার করতেন, তার জাদুবিদ্যার কাজে ব্যবহৃত হতো। এই অপকর্ম বহু বছর ধরে সে করে আসছিল, অথচ লোকচক্ষুর আড়ালে ছিল। স্যার বলেন, হজে গিয়ে সে এই জঘন্য কাজের পরিণতি দুনিয়াতেই প্রত্যক্ষ করল—আল্লাহ তাআলা তার চোখ থেকে কাবা শরিফকে গায়েব করে দিলেন, কাবা শরিফ উনার দৃষ্টিসীমা থেকে গায়েব হয়ে যায়। দ্বীনী খেদমতের নাম করে যারা কুফরি বা হারাম কাজে জড়িয়ে পড়ে, হারাম কাজের শাস্তি কখনো কখনো দুনিয়াতেই প্রকাশ পায়। ঘটনার তিন দিন পর ঐ মহিলা মৃত্যুবরণ করেন।

১৮৩. স্যার একবার বলেন, তাবলিগের অনেক পুরনো সাথী, যারা চিল্লা…

স্যার একবার বলেন, তাবলিগের অনেক পুরনো সাথী, যারা চিল্লা, তিন চিল্লা ও অনেক বছর মেহনত করার পর হঠাৎ করে তাবলিগের কাজ থেকে সরে যান—এর পেছনে অনেক কারণের মধ্যে এটাও একটা গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো, তাবলিগের কাজ করলেও নিয়তের গভীরে দুনিয়াবী কোনো উদ্দেশ্য বা চাওয়া লুকিয়ে থাকে। যখন কেউ দুনিয়াবী কোনো লক্ষ্য নিয়ে তাবলিগের কাজে যুক্ত হন, তখন সেই উদ্দেশ্য যদি পূর্ণ হয়ে যায় তো কাজ ছেড়ে দেয় (তিনি ভাবেন, ‘আমার তো যা চাওয়া ছিল, তা পেয়েই গেছি’, তখন কাজ ছেড়ে দেন)। আর যদি উদ্দেশ্য পূর্ণ না হয়, তখনও হতাশ হয়ে তাবলিগ ত্যাগ করেন। কোনো ছাত্র যদি ভালো রেজাল্টের আশায় তাবলিগের সঙ্গে যুক্ত হয়, রেজাল্ট ভালো হলেও সে কাজ ছাড়ে, কারণ তার উদ্দেশ্য পূর্ণ হয়ে গেছে, আর যদি রেজাল্ট খারাপ হয়, তাহলে তো ছাড়বেই। কেউ যদি ব্যবসার উন্নতির জন্য তাবলিগে সময় দেয়, উন্নতি হলে তাবলিগ ত্যাগ করে, না হলেও ত্যাগ করে। চাকরির জন্য বা প্রমোশনের আশায় তাবলিগে আসে, প্রমোশন হলেও ত্যাগ করে, না হলেও ত্যাগ করবে। তাবলিগের মেহনতে টিকে না থাকার বা নিয়মিতভাবে কাজ না করার বহু কারণের মধ্যে এটি একটি মারাত্মক কারণ—এই অশুদ্ধ নিয়ত। গুরুত্বপূর্ণ নজর দেবার বিষয় হলো: তাবলিগের কাজে কেন আমি যুক্ত হয়েছি, কেন আমি তাবলিগ করছি, আমার নিয়ত কী? শুদ্ধ নিয়ত না হলে, দায়িত্ব থেকে না হলে, কাজ দীর্ঘস্থায়ী হয় না, এক সময় থেমে যায়। দায়িত্ববোধ সৃষ্টি হয় না, কারণ যার উদ্দেশ্য দুনিয়া, সে কাজকে ‘আত্মিক দায়’ নয়, বরং ‘সুযোগ হিসেবে’ দেখে, ফলে কাজের ধারাবাহিকতা থাকে না। যে মেহনতটা হলো একান্তই আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, দ্বীলের গভীরে অন্য উদ্দেশ্য লুকিয়ে থাকলে মেহনতের আত্মিক স্বাদ চলে যায়, খুশু—খুযু হারিয়ে যায়, এক পর্যায়ে মেহনতটা ‘বোঝা’ মনে হয়। وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ আল্লাহর জন্য যে কাজ, সেখানে অনুকূল প্রতিকূল ফলাফলের পরোয়া থাকে না। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য মেহনত করলে উত্থান—পতন, সফলতা—বিফলতা—সবই সহনীয় হয়ে যায়, ক্লান্তি আসলেও তা ধৈয্যে পরিণত হয়। কারণ উদ্দেশ্য তখন ‘রেজাল্ট’ নয়, বরং رِضَا بِالْقَضَاءِ (রাযা—বিল—কাযা)। এখানে সব হালতে আত্মিক স্থিরতা ও আনন্দ থাকে, অন্তরে এক ধরনের প্রশান্তি থাকে যে, “আমি আল্লাহর নির্দেশ পালন করছি,”। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য মেহনত না হলে উত্থান বা পতন উভয় অবস্থায়ই মেহনতে ক্লান্তি নিয়ে আসে।

১৮৪. স্যার বলতেন: তাবলিগের মেহনত ছেড়ে দেওয়ার সাধারণ মানে আমরা…

স্যার বলতেন: তাবলিগের মেহনত ছেড়ে দেওয়ার সাধারণ মানে আমরা বুঝি, কেউ দোকানে বসে গেলো, কিংবা জমির কাজে এতটা মগ্ন হয়ে গেলো যে তাবলিগের জন্য সময়ই বের করতে পারছে না। তার জীবন থেকে চিল্লা, গাশত, তালিম, দাওয়াত—এসব একে একে মুছে যেতে থাকে। স্যার বলেন, আরেকটি সূক্ষ্ম রকমের “কাজ ছেড়ে দেওয়া” আছে, যা সাধারণভাবে আমাদের চোখে পড়ে না। অনেকে মনে করে, মারকাযে বসে তাবলিগের ম্যানেজমেন্ট সামলাচ্ছে—এটাই হচ্ছে দাওয়াতের বড় কাজ, বাস্তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মূল দাওয়াতের কাজ থেকে দূরে সরে যাওয়া। দাওয়াতের কাজ এবং এর ম্যানেজমেন্ট—এ দুটি এক নয়, দাওয়াতের কাজ এক জিনিষ আর এর ম্যানেজমেন্ট আরেক জিনিষ। স্যার বলেন, তাবলিগের কাজ থেকে দূরে সরে যাওয়ার এই সূক্ষ্ম রূপ হলো—ম্যানেজমেন্টে ব্যস্ত থেকে মূল মেহনত থেকে ছিটকে পড়া। অনেক সময় এটি এত সূক্ষ্মভাবে ঘটে যে বোঝাও কঠিন হয়, এতোবড় তাকাজার আনজাম দিচ্ছে সে মনে করে, তার ম্যানেজমেন্ট কেন্দ্রিক জজবা তাকে বুঝতে দেয় না। চিল্লা তিনদিন লাগায় না, গাসত তালিম দাওয়াতের ফিকির নাই, কিন্তু মাশোয়ারা মেম্বার মার্কাজ সামলানোতে খুব ব্যস্ত, সে ম্যানেজমেন্ট নিয়ে আছে, আসলে এও কাজ ছেড়ে দিয়েছে, বসে গেছে, পার্থক্য শুধু কেউ বসেছে দোকানে, আর ও বসেছে মারকাযে। ও ভাবে— আমি তো মারকাযের তাকাজা নিয়েই আছি, অথচ মূল দাওয়াতি আমল, চিল্লা, গাশ্ত, তালিম, দাওয়াত—এসবের কোনোটার ধারে কাছেও নেই, সেও বসে গেছে, শুধু ভিন্ন আঙ্গিকে। এরকম কিছু সাথী মূল দাওয়াতি আমলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে কেবল প্রাসঙ্গিক কিছু ব্যবস্থাপনার মধ্যে নিজেকে গুম করে ফেলে। স্যার এপ্রসঙ্গে ডাক্তারদের শিক্ষকদের উদাহরণ দিতেন। নিজে ডাক্তারি করা, রোগী দেখা, রোগী রোগ স্বাস্থ্য ঔষধ অবস্থা ইত্যাদির সাথে বাস্তব সম্পর্ক, রোগীর আপডেট নেওয়া, প্রেসক্রিপশন করা ইত্যাদি এগুলোতো ডাক্তারি। অপরদিকে রোগী, রোগ, ঔষধ ইত্যাদির সাথে সম্পর্ক ত্যাগ করে ডাক্তারদের ফাইল, প্রমোশন, বদলি, হাসপাতালের বিল্ডিং এর ইট বালু সিমেন্ট নিয়ে ব্যস্ততা বা এ জাতীয় ম্যানেজমেন্টের চেয়ারে নিজেকে বন্দি করে ফেলা আরেক জিনিষ, সেই ডাক্তার আসলে চিকিৎসা থেকে সরে গেছে। হাসপাতালের পরিবেশে থাকার কারণে মানুষ ভাবে— এ তো অনেক বড় ডাক্তার, বড় চেয়ারে বসা দেখে ভুল ধারণা তৈরি হয়। অথচ বাস্তবে হয়তো গত ২০ বছরে তিনি একজন রোগীকেও দেখেননি। একই কথা শিক্ষকদের ক্ষেত্রেও, শিক্ষকতা এক জিনিষ আর অনেক বড় শিক্ষা অধিদপ্তরের আমির হওয়া ভিন্ন জিনিষ। যিনি ছাত্রদের পড়ান, পড়ালেখার সাথে মিশে আছেন—তিনি শিক্ষক। পড়ানোর ময়দান থেকে সরে গিয়ে শুধুই শিক্ষা অফিসের বড় দায়িত্ব সামলানো, অফিসিয়াল চেয়ার, ফাইল—প্রশাসনে নিজেকে সীমাবদ্ধ করে ফেলা— সেটাও মূল শিক্ষকতার মেহনত থেকে সরে যাওয়া। তাকে আর শিক্ষক বলা হয় না, নির্দিষ্ট কিছু ব্যবস্থাপনার চেয়ারে সে বসে গেছে। মারকাজে বসাটা বোঝা যায় না, এই “বসে যাওয়া” তাবলিগি পরিবেশে বিধায় চোখে পড়ে না বলে সেটা বুঝা কঠিন হয়, ওতো তবলিগের ম্যানেজমেন্টেই আছে, সহজে ধরা পড়ে না, কিন্তু এটাও কাজ থেকে বসে যাওয়াই, মূল কাজ থেকে দূরে সরে যাওয়া। ম্যানেজমেন্ট, দায়িত্ব, বড় মেম্বার—এসব কখনো মূল মেহনতের বিকল্প হতে পারে না।

১৮৫. স্যার একবার বলেছিলেন: অনেক সময় আল্লাহ পাক বান্দার কোনো…

স্যার একবার বলেছিলেন: অনেক সময় আল্লাহ পাক বান্দার কোনো বিশেষ গুনাহ, যেমন পিতা মাতার নাফরমানি ও বেয়াদবির কারণে, উনাকে দাওয়াতের মেহনতের ময়দান থেকে সরিয়ে দেন। অনেক সময় মেহনতের পরিবেশ থেকে সে পুরোপুরিই বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, আবার অনেক সময় মানুষ বাইরে থেকে ভাবে, সে তাবলিগ করছে; কিন্তু ভিতর থেকে আল্লাহ তাকে সরিয়ে নিয়েছেন। স্যার একটি বাস্তব মেছাল দিয়ে ব্যাখ্যা করেছিলেন— কেউ যদি পিতা—মাতার সাথে বেয়াদবি করে, তাদের অসন্তুষ্ট করে, যেমন সে তিনদিনের জামাতে যাওয়ার নিয়ত করল, তার পিতা বললেন—”এখন যেও না।” সে বলল—“আমি যাবই।” তিনদিনে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু পিতার সাথে এই ভাষায় কথা বলা—”যাবই”—এটা শরীয়তের গণ্ডিতে পড়ে না, শরীয়তের দৃষ্টিতে অবশ্যই দোষনীয়। তিন দিন যাবে, চলে যাও, গোপনে চলে যাও, তিন দিন যাওয়াও ছাড়া যাবে না, আবার পিতার সাথে বেয়াদবিও করা যাবে না। যারা পিতা—মাতার সাথে বেয়াদবি করে, পিতামাতার নাফরমানি করে, তারা শেষ পর্যন্ত তাবলিগেও টিকে থাকতে পারে না। আমাদের একজন ভাই, যাঁর পারিবারিক অবস্থা সম্পর্কে স্যারের ভালো ধারণা ছিল, তিনি একদিন স্যারের কাছে এসে পরামর্শ করলেন যে তিনি তিন চিল্লায় যেতে চান। স্যার তাকে শর্ত দিয়ে বলেছিলেন: “তুমি তিন চিল্লায় যেতে পারো, তবে তোমার মাকে রাজি করিয়ে যেতে হবে। মা যেন খুশি মনে তোমাকে পাঠান। তাকে খুশি করে সম্মতি নিয়ে তারপর তুমি যাও।” স্যার বলেন, পিতা—মাতার সাথে বেয়াদবি বড় গুনাহ, যা তাবলিগের বরকত থেকেও বঞ্চিত করে দেয়, এমনকি সে শেষ পর্যন্ত তাবলিগের মেহনতে টিকে থাকতে পারে না, হয়তো কিছুদিন তাবলিগ করেও কিন্তু মূল মেহনতের নকশা তার কাছ থেকে হারিয়ে যায়। এটাই দাওয়াতের আসল রূহ, দাওয়াত হলো ইখলাস, দুআ, বিনয় আর শরীয়তের সকল সম্পর্ক ঠিক রেখে আল্লাহর পথে চলা। আল্লাহর পথে চলতে হলে, আল্লাহর বান্দাদের হক আদায় করেই চলতে হবে। পিতা মাতা উনারা আমাদের দুনিয়ার দরজা। তাদের সাথে নাফরমানি করে তাদেরকে অসন্তুষ্ট রেখে দাওয়াত, আমল আসলে টেকে না।

১৮৬. স্যার একবার বলেন, অনেক সময় আমরা বলি, “অমুক ভাই…

স্যার একবার বলেন, অনেক সময় আমরা বলি, “অমুক ভাই তাবলিগে যায় না।” কিন্তু এই কথাটা পুরোপুরি ঠিক নয়। আসলে বাস্তবতা হলো, তাকে আল্লাহ পাক তাবলিগে নিচ্ছেন না, তাকে সাসপেন্ড করে রেখেছেন, তাবলিগের এ মোবারক মেহনত থেকে, তাকে বঞ্চিত করে রেখেছেন। স্যার বলেন, কেউ নিজে থেকে না যাওয়ার মতো মনে করলেও, প্রকৃতপক্ষে সে যাচ্ছে না কারণ আল্লাহ তার দ্বীল থেকে ডাকে সাড়া দেওয়ার তৌফিক কেড়ে নিয়েছেন। এটা একটা বড় ধরণের মাহরূমিয়াত (বঞ্চনা)। তার কোন গুণাহের কারণে, বদ আখলাকির কারণে, তাকাব্বুরির কারণে, দুনিয়ার তলবের কারণে, লোভের কারণে, রিয়া, আত্মপ্রদর্শন, গাফলতি ইত্যাদির কারণে আল্লাহ পাক তাকে বঞ্চিত করে দেন এই মোবারক মেহনত থেকে। এই বঞ্চনার পেছনে থাকে এমন কোনো গভীর নাফরমানি। যখন কোনো বান্দাকে আল্লাহ উনার পথে আসার তাওফিক থেকে বঞ্চিত করেন, সেটা তার জন্য এক মহাবিপদ, এই অবস্থাকে অবহেলা করা উচিত নয়। তাবলিগের মেহনত থেকে দূরে থাকা মানেই কেবল কাজ না করা নয়, বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে এক প্রকার বিরক্তি, গজব বা সতর্কবার্তা — যে তিনি তার বান্দার কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন, যা গভীরভাবে ভাববার বিষয়, বড় ভয়ের ব্যাপার। নিজের আমল, ইখলাস ও আখলাকের দিকে গভীরভাবে নজর রাখতে হবে, যেন আমরা দ্বীনের এই মোবারক কাজ থেকে মাহরূম হয়ে না যাই।

১৮৭. জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আদিল ভাই বলেন, আমার যখন অনার্স…

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আদিল ভাই বলেন, আমার যখন অনার্স ফাইনাল পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়, তার কিছুদিন পর স্যার সালাম বরকত ও কামালউদ্দিন হল মসজিদে একটি প্রোগ্রামে এসেছিলেন। নামাজের পূর্বে আমি এবং ফয়জুল হক ভাই (বর্তমানে ফরিদপুরের রাজেন্দ্র কলেজের গণিত বিভাগের শিক্ষক) স্যারের পাশে বসে ছিলাম। ফয়জুল হক ভাই স্যারকে জানালেন, “আদিল অনার্সে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হয়েছে।” স্যার কিছুক্ষণ নীরব থেকে তারপর বললেন: “যে কোনো কিছু পেয়ে সন্তুষ্ট তার সন্তুষ্টির ভিত্তি খুব দুর্বল, আর যে না পেয়ে সন্তুষ্ট— সেটাই প্রকৃত সন্তুষ্টি।” স্যার বোঝালেন যে, সন্তুষ্টি বা الرِّضَا হলো এক অভ্যন্তরীণ অবস্থা, যা মানুষকে আল্লাহর ফয়সালার ওপর আত্মিক প্রশান্তি ও নিরাপত্তা দেয়। মানুষ যদি তখনই খুশি হয় যখন তার মনমতো কিছু অর্জিত হয়— যেমন উচ্চ ফলাফল, নাম, খ্যাতি, পদ— তখন তার এই খুশি খুবই ভঙ্গুর। কারণ যখন সে তা পাবে না, তখন সে অস্থির হয়ে যাবে, হতাশ হবে, বা ক্ষোভে আক্রান্ত হবে। স্যার বুঝিয়ে দেন যে, যে মানুষ শুধুমাত্র সফলতার মুহূর্তেই খুশি হয়, তার খুশি ক্ষণস্থায়ী ও অস্থির, যে শুধু প্রাপ্তিতেই খুশি হয় আসলে সে প্রকৃত সন্তুষ্টি লাভ করতে পারেন না। যে ব্যক্তি না পাওয়ার মধ্যেও সন্তুষ্ট থাকে, সে আসলে নিজের আত্মাকে আল্লাহর উপর ছেড়ে দিয়েছে। তার সন্তুষ্টি নির্ভর করে না বাইরের কিছু অর্জনের ওপর, বরং আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও তাকওয়ার ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে থাকে, সেটিই প্রকৃত শান্তি ও পরিপূর্ণতা। স্যারের কথায় প্রকাশ পায় যে: এই রিযা বা সন্তুষ্টি আল্লাহর নিকট পছন্দনীয় ঈমানদারদের এক গুণ, এটা এমন এক মাকাম (আধ্যাত্মিক স্তর), যেখানে মানুষ অর্জনহীন অবস্থাতেও আত্মতৃপ্ত থাকে।

১৮৮. হযরত মাওলানা সাইয়েদ আহমদ খান রহমতুল্লাহি আলাইহি—এর একটি মূল্যবান…

হযরত মাওলানা সাইয়েদ আহমদ খান রহমতুল্লাহি আলাইহি—এর একটি মূল্যবান কথা উদ্ধৃত করে স্যার একবার বলেন: “এই যুগের মানুষ আল্লাহ পাকের হুকুম জানে, কিন্তু হুকুমের মাত্রা বোঝে না”। কখন কোন আমল কতটুকু করা উচিত—সে জ্ঞান তার নেই। কেউ ফরজ ছেড়ে দিয়ে নফল শক্ত করে নিচ্ছে। কেউ হজের সুন্নত আদায়ের জন্য ফরজ নামাজ ছেড়ে দিচ্ছে। কেউ ‘হজরতজি আসছেন’ ‘হজরতজি আসছেন’ বলে এমনভাবে সম্মান জানাচ্ছে যে, ডানে—বামে থাকা কয়েকজন মানুষকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিচ্ছে। অথচ হজরতের ইস্তেকবাল ও সম্মানেরও একটা সীমা আছে, যা খেয়ালেই নাই। সে জানে আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করতে হবে, কিন্তু কোথায় কতটুকু তা জানে না। মা উপবাস, অথচ প্রতিবেশী চাচিকে দান করছে; প্রতিবেশী অনাহারে, অথচ মুরব্বিদের জন্য বিরিয়ানী কাবাব বানাচ্ছে। মহব্বত করতে হবে—তা জানে, কিন্তু কতটুকু করতে হবে তা জানে না। তাহাজ্জুদ পড়বে নাকি বিছানায় অসুস্থ পিতার খেদমত করবে, কোনটার প্রাধান্য কোন অবস্থায় কতটুকু, এই মাত্রাজ্ঞান তার নেই। ঘৃণা করতে হবে জানে, কিন্তু কোথায় সীমা টানতে হবে তা জানে না। আয়—ব্যয়ের হিসাব নেই, ব্যয় করছে আয়ের নিশ্চয়তা ছাড়া, আবার আয় করছে ব্যয়ের নিয়ম ছাড়া। জীবনজুড়ে তার এই ‘মাত্রাজ্ঞান’—এর অভাব স্পষ্ট। সে বুঝে না বিবিকে কতটুকু মহব্বত করতে হবে, আবার মাকে কতটুকু ছাড় দিতে হবে। একদিকে স্ত্রীর হক আছে, অন্যদিকে মায়ের হক আছে—কিন্তু কোনটাকে কোথায় প্রাধান্য দিতে হবে তা জানে না। শরীয়তের প্রতিটি হুকুম ও আমলের একটি নির্ধারিত সীমা ও মাত্রা রয়েছে। এই ‘মাত্রাজ্ঞান’—ই হচ্ছে জীবনের ভারসাম্য, আর সেই ভারসাম্যই হচ্ছে জীবনের সৌন্দর্য, তার জীবন। এই সীমা অতিক্রম করলেই ফিতনা সৃষ্টি হয়, হক নষ্ট হয়, আমল নষ্ট হয় এবং সম্পর্ক বিনষ্ট হয়, জীবন পেরেশান হয়।

১৮৯. টাঙ্গাইলের ঘাটাইল কোর্ট মসজিদে এসএসসি জামাতের নূসরতে জামাতের ছাত্রদের…

টাঙ্গাইলের ঘাটাইল কোর্ট মসজিদে এসএসসি জামাতের নূসরতে জামাতের ছাত্রদের নিয়ে স্যার মোজাকারা করছিলেন। মোজাকারায় স্যার বলেন, মানুষের অভ্যাস ও আচরণ অনেকটাই নির্ভর করে তার পরিবেশ ও সে যে কাজে নিয়োজিত থাকে তার ওপর। স্যার এক বাস্তব উদাহরণ তুলে ধরেন, রাখাল হাল চাষ করে, লুঙ্গি পরে এবং হুক্কা খায়। এখন প্রশ্ন আসে—হাল চাষ করার মতো কষ্টকর কাজে হুক্কা কি আদৌ উপযোগী? বা লুঙ্গি পরে হাল চাষ করা কতটা সুবিধাজনক? বাস্তবতা হলো, হাল চাষে যেহেতু দৌড়াতে হয়, মাটি ভাঙতে হয়, সেখানে প্যান্ট হলে চলাফেরা সহজ হতো, আবার হুক্কার পরিবর্তে সিগারেট বা বিড়ি হলে বহন করাও সহজ হতো। তবুও সে হুক্কা খায় এবং লুঙ্গি পরে, কারণ সে পরিবেশ তাকে এই অভ্যাসে অভ্যস্ত করে তুলেছে। অন্যদিকে, একজন অফিস কর্মচারী, যিনি সারাদিন বসে থাকেন, উনার জন্য হুক্কা খাওয়াই সুবিধাজনক এবং লুঙ্গি পরলে হয়তো আরামদায়ক হতো। কিন্তু তিনি সিগারেট খান ও প্যান্ট পরেন। কেন? কারণ, তিনি যে পরিবেশে আছেন, সেই পরিবেশই তাকে এই আচরণে অভ্যস্ত করেছে। কৃষক যদি অফিসে বসতে শুরু করে, কিছুদিন পরই দেখা যাবে, সে নিজে থেকেই প্যান্ট পরতে শুরু করেছে। আবার, একজন অফিসার যদি কৃষিকাজ শুরু করে, কিছুদিনের মধ্যে দেখা যাবে, তিনিও লুঙ্গি পরে নিয়েছেন। কেননা, পরিবেশ এবং কাজের ধারা মানুষকে ধীরে ধীরে উপযুক্ত অভ্যাস ও আচার শেখায়। স্যার বলেন, আমরা যদি দ্বীনের কাজকে মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরি, তাহলে দ্বীনি আমল, দ্বীনি অভ্যাস, দ্বীনি আখলাক (আচরণ) ধীরে ধীরে আমাদের জীবনে অটোমেটিকভাবে আসতে থাকবে। যেমনভাবে পরিবেশ একজন কৃষক বা একজন অফিসারের পোশাক—অভ্যাস ইত্যাদি পরিবর্তন করে দেয়, ঠিক তেমনিভাবে দ্বীনের পরিবেশ ও দ্বীনের কাজ আমাদের পরিবর্তন করে দিতে পারে। যখন আমরা দাওয়াতের এই কাজের সাথে মজবুতভাবে সম্পৃক্ত হবো, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের, নবীজির আনুষঙ্গিক গুণাবলি—সদাচরণ, ইনসাফ, ত্যাগ, ধৈর্য, সঠিক পথে চলা—এসব আপনাআপনিই ধীরে ধীরে আমাদের জীবনে প্রবেশ করতে থাকবে। তাবলিগের এই কাজকে—নবীজির কাজকে মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরতে হবে, আমরা যদি নেক কাজে অটল থাকি, নেক পরিবেশে থাকি, তাহলে দ্বীনদারী আমাদের জীবনের স্বাভাবিক অংশ হয়ে উঠবে ইনশাআল্লাহ।

১৯০. এক মুজাকারায় স্যার বলেন—আমাদের জীবনের বেশিরভাগ কাজ, বেশিরভাগ প্রচেষ্টা…

এক মুজাকারায় স্যার বলেন—আমাদের জীবনের বেশিরভাগ কাজ, বেশিরভাগ প্রচেষ্টা অনেক সময় অনর্থক হয়ে যায়, যার কোন স্থায়ী ফল বা প্রয়োজনীয়তা থাকে না। এই প্রসঙ্গে স্যার খড়ির চুলার উদাহরণ দেন, খোলা খড়ির চুলায় যে তাপ উৎপন্ন হয় তার প্রায় ৭০—৭৫ শতাংশ তাপ একেবারেই অপচয় হয়ে যায়, কেবলমাত্র ২৫—৩০ শতাংশ ব্যবহারিক কাজে লাগে—যেমন রান্না বা গরম করার কাজে। আল্লাহ তায়ালা যে কর্মশক্তি, সময় ও মেধা দিয়েছেন, আমাদের জীবনে তার অনেক বড় অংশই অপচয় হয়ে যায় অপ্রয়োজনীয় চিন্তা, অর্থহীন ব্যস্ততা ও লক্ষ্যহীন কর্মে। خَلَقَ الْإِنْسَانَ فِي كَبَدٍ মানুষের জীবন মূলত একটি কষ্টের নাম, সংগ্রামের নাম, কিন্তু সেই সংগ্রাম যদি সঠিক পথে না হয়, তবে তা শুধুই অপচয়, পরিণামে যা মানুষের জন্য ব্যর্থতা নিয়ে আসে। স্যার পিরামিডের উদাহরণ তুলে ধরেন, মানব ইতিহাসে বিরল এক নিষ্ঠুর অপচয়ের প্রতীক। হাজার হাজার শ্রমিক, অপরিমাণ অর্থ, অপরিসীম সময়, শ্রম, মেধা, স্থাপত্য—জ্ঞান—সবকিছু ব্যয় করা হয়েছে, শুধুমাত্র একটি কবর বানানোর জন্য! অথচ একটি কবরের জন্য চার হাত মাটিই যথেষ্ট ছিল। সেই বিশাল কাঠামো আজ ইতিহাসের গৌরব বলে দেখে, বাস্তবে তা মানুষের সীমাহীন অপচয়, অহংকার ও উদ্দেশ্যহীন নির্মাণের জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত, সেই অপচয়ের ক্ষতিপূরণ আজ কোনভাবেই সম্ভব নয়। আমাদের জীবনেও অনেকসময় এরকম পিরামিড আসে, লক্ষ্যহীনভাবে, চিন্তা—পরিকল্পনা ছাড়াই মেধা, শক্তি ও সময়ের বলি দেই নির্দিধায়। জীবনকে লক্ষ্যপূর্ণ করতে, অহেতুক কর্মকাণ্ড ও চিন্তা থেকে নিজেকে বাঁচাতে, আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে প্রতিটি শক্তি ও সময় ব্যয় করার ফায়সালায় আসা, যে এই জীবন শুধুই সাজানোর জন্য নয়, বরং হিসাব দেওয়ার জন্য। জীবনের সর্বশক্তি খরচ করে এমন পিরামিড গড়ে না তুলি যার প্রকৃত কোন মূল্য বা কোন প্রয়োজনই হয়তো নেই, মূল্যবান জীবনের এমন নিষ্ঠুর অপচয় না হয়। অপচয় শুধু খাদ্যে, অর্থে নয়—মেধা, সময়, চিন্তাশক্তি ও কর্মশক্তির অপচয়ও চরম ক্ষতির কারণ, জীবনের প্রতিটি কাজের উদ্দেশ্য থাকা উচিত এবং সেই উদ্দেশ্য হওয়া উচিত আখিরাতমুখী ও নেক আমলে অবদান রাখা।

১৯১. স্যার বলতেন, “সব সমস্যার সমাধান ইসলামে নেই”, ও নিজের…

স্যার বলতেন, “সব সমস্যার সমাধান ইসলামে নেই”, ও নিজের কল্পনায় একটা ভার্চুয়াল সমস্যা বানিয়ে রেখেছে, কাল্পনিক অনেক বড় সমস্যা তৈরি করে রেখেছে, ‘এই সমস্যার সমাধান ইসলাম দেবে?’ ইসলাম বাস্তব সমস্যার সমাধান দিবে। ওর চিন্তা থেকে সমস্যা এসেছে, ওই সমস্যার সমাধান ইসলাম দেবে না। ইসলাম জীবনের প্রকৃত সমস্যার সমাধানের জন্য এসেছে। মানুষের জীবনে যেসব বাস্তব সংকট, মানবিক প্রশ্ন, ন্যায়—অন্যায়, হালাল—হারাম, জীবনযাপন, নৈতিকতা— এসবই ইসলাম সমাধান করে। ইসলাম কখনও মানুষের কল্পনায় বানানো এক ফাঁপা সমস্যার উত্তর খুঁজে বেড়ায় না। এমন প্রশ্নের উত্তর ইসলাম দেবে না, যা বাস্তব সমস্যা নয়, কল্পনার অবাস্তব প্রশ্ন। ইসলাম ঐ জীবনব্যবস্থা যা মানুষকে তার বাস্তব জীবনের প্রশ্নে সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ দিকনির্দেশনা দেয়। অবাস্তব, কল্পনানির্ভর বা মস্তিষ্ক—সৃষ্ট প্রশ্ন ইসলামের উদ্দেশ্যের মধ্যে পড়ে না, কেউ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে কাল্পনিক প্রশ্ন তোলে, কল্পনার ভয় তৈরি করে, কল্পিত সমস্যায় হাবুডুবু খায়, সে নিজেরই ধোঁকার শিকার। স্যারের ভাষায়, কল্পনার ভয় সৃষ্টি করে জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলা নিজের জন্যই ধোঁকার কারণ। বাস্তব প্রশ্নের সমাধান ইসলামে খোঁজা, কল্পনার সমস্যার ঘোরে পড়ে জীবনকে পেরেশান না করা।

১৯২. স্যার বলতেন, “বড়র কথাকে বিনা বিচারে গ্রহণ করা এবং…

স্যার বলতেন, “বড়র কথাকে বিনা বিচারে গ্রহণ করা এবং ছোটর কথাকে বিনা বিচারে বর্জন করা এই দুইটাই ক্ষতির কারণ।” স্যার বলেন, অনেক সময় বড়দের মুখ থেকেও ভুল কথা বের হতে পারে, ভুল সিদ্ধান্ত আসতে পারে, আর কখনো একজন ছোট, অখ্যাত বা নতুন সাথির কথাতেই হক থাকতে পারে, গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কাউকে কেবল তার পদ, বয়স, বড় দায়িত্ব বা খ্যাতির কারণে অন্ধভাবে অনুসরণ করা উচিত নয়; আবার কাউকে কেবল ছোট, অখ্যাত, গরীব, বা অশিক্ষিত বলে উপেক্ষাও করা উচিত নয়। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের মতামত থেকেও ফিরে এসেছেন বয়সে বা অবস্থানে ‘ছোট’ এমন তরুণ সাহাবীর কথা শুনে, নিজের ফয়সালা পরিবর্তন করলেন। উনি তো সবথেকে বড় মুরব্বী, অহংকার করে তাকে পাত্তাই দিলেন না, এরকম না। অপরদিকে অন্ধ অনুসরণে বা মানুষকে ভুলের ঊর্ধ্বে মানলে, তার ভুলকেও দ্বীন বানিয়ে ফেলে। বড়রা ভুল করতে পারে না, এই বিশ্বাসই একটি ভুল ধারণা। হক বা সত্যের মানদন্ড ব্যক্তি না বরং আল্লাহ পাকের কালাম ও রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবন। যে হককে চেনে, সে বুঝে নেয় কথার ওজন; আর যে মুখ (মানুষ) দেখে চলে, সে অনেক সময় হক থেকেও বঞ্চিত হয়।

১৯৩. পাকিস্থানের জিম্মাদার হাজী শফি কুরাইশি সাহেব এর কথা উল্লেখ…

পাকিস্থানের জিম্মাদার হাজী শফি কুরাইশি সাহেব এর কথা উল্লেখ করে স্যার একবার বলেন উনার এন্তেকালের কিছুদিন পূর্বে একলোক এসে উনাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ইসলামে অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান কি? উনি খুব দৃঢ়তার সাথে উত্তর দেন: “ইসলামে কোনো অর্থনৈতিক সমস্যা নেই।” নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কখনো দারিদ্র্য বা অভাবকে সমস্যা হিসেবে দেখেননি, বরং তিনি এটাকে একটি পরীক্ষার অংশ হিসেবে গ্রহণ করেছেন। যিনি আল্লাহ পাকের কাছে দোয়া করছেন চাচ্ছেন, দারিদ্রতা, মিসকিনি, উনি এই সমস্যার কি সমাধান দেবেন! এপ্রসঙ্গে স্যার আরো বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুনিয়ার প্রতি আসক্তিকে (وَهْنُ) সমস্যা হিসেবে দেখেছেন, কিন্তু দারিদ্র্যকে নয়। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও সাহাবায়ে কেরাম অভাবগ্রস্ত হয়ে আবু আইয়ূব আনসারী রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু—এর ঘরে যাচ্ছেন, নিজেও ক্ষুধার্ত অবস্থায়। কিন্তু কখনো আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেননি, “আমাদের এই দারিদ্র্যের (অর্থনৈতিক সমস্যার) সমাধান খুঁজতে হবে।” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সালাম ফিরিয়ে দেখেন, এক সাহাবি ক্ষুধার কারণে নামাজে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেছেন। কতদিন খাওয়া হয়নি, যার কারণে নামাজের ভেতরেই অজ্ঞান হতে হয়েছে! কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবীদের এই কঠিন অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য কি উদ্যেগ নিলেন? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই দারিদ্র্য বা ক্ষুধাকে সমস্যা হিসেবেই উপস্থাপন করেননি। বরং রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “তোমরা যদি জানতে আল্লাহর কাছে এই অবস্থার বিনিময়ে কী পুরস্কার আছে, তাহলে আরও অভাব ও ক্ষুধা কামনা করতে।” মরুভূমির তপ্ত সফরে পানি শেষ হয়ে গেলো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, হজরত আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু সহ সাহাবায়ে কেরাম সবাই আছেন। পানির প্রয়োজন ছিল অপরিসীম। কিন্তু কেউ চিন্তাও করেনি এক মনজিল পরেই এই সমস্যা হতে পারে, সম্পূর্ণ জামাত এতোবড় সমস্যায় পড়তে পারেন! উট জবাই করে সাহাবারা তার নাড়িভুঁড়ি শরীরের সঙ্গে লাগিয়ে গরম থেকে স্বস্তি নিচ্ছেন। এক মনজিল পর যে পানি শেষ হতে পারে এইটা কারোরই মনে থাকবার কথা না? মরুভূমির সফর এতোগুলো সাথীর পানির যে প্রয়োজন হবে, এতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে এতো বেখেয়াল সবাই, কারো মাথায় এই চিন্তা এলো না? আল্লার নবী এই সমস্যা হতে পারে তার কি ফিকির করে গিয়েছিলেন? এতোবড় গূরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে পূর্ব থেকে কোন প্রস্তুতি নেই। এজাতীয় সমস্যা, অর্থনৈতিক সমস্যা, এগুলো কোন ব্যাপারই ছিল না, কোন চিন্তার বিষয়ই না। হ্যাঁ, টাকা এসেছে জাকাত দিতে হবে, সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কখনো এই দারিদ্র্য, ক্ষুধা বা অর্থনৈতিক সংকটকে ‘সমস্যা’ আখ্যা দেননি। বরং তিনি এ অবস্থাকেই ভালোবাসতেন। যিনি একটা জিনিষ পছন্দ করছেন উনি ঐটা থেকে পরিত্রানের জন্য সমাধান দেবেন? এর প্রমাণ: “اللهم أحيني مسكينًا، وأمتني مسكينًا، واحشرني في زمرة المساكين” “হে আল্লাহ! আমাকে মিসকিন অবস্থায় জীবিত রাখুন, মিসকিন অবস্থায় মৃত্যু দিন, এবং কিয়ামতের দিন মিসকিনদের সাথে আমার হাশর করুন।” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দারিদ্র্যকে সমস্যা হিসেবে দেখেনইনি। একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবি সফওয়ান ইবনে উমাইয়া রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু—কে ছেঁড়া চাদরে দেখে কেঁদে ফেলেন। তার আগে তিনি বিলাসবহুল জীবনে অভ্যস্ত ছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “অচিরেই তোমাদের দুনিয়া প্রসস্থ হয়ে যাবে।’’ সাহাবীরা জিজ্ঞাসা করেন, ‘‘তাহলে কি আমরা তখন ভালো অবস্থায় থাকব?” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “না, তোমরা এখনই ভালো আছো।” ইসলামে অর্থনৈতিক সমস্যা সমস্যা নয়, বরং দুনিয়ার প্রতি ভালবাসা এবং মৃত্যুকে অপছন্দ করা কে আল্লাহর নবী আসল সমস্যা হিসেবে দেখেছেন। যিনি অভাবকে আল্লাহর পক্ষ থেকে নিয়ামত হিসেবে দেখছেন, দুনিয়ার প্রতি অনাসক্ত থাকা ও আখেরাতমুখী জীবন চাচ্ছেন, উনি এই সমস্যার সমাধানের কি চেষ্ঠা করবেন! নিজের ক্ষুধা, সাহাবাদের কষ্ট কিছুই ‘সমস্যা’ হিসেবে দেখেননি। বরং তিনি এই অবস্থা চেয়েছেন, ভালোবেসেছেন, দোয়া করেছেন এই অবস্থায় জীবন ও মৃত্যু কামনা করেছেন।

১৯৪. স্যার এক বয়ানে বলেন, আল্লাহ পাক নামাজের মতো গুরুত্বপূর্ণ…

স্যার এক বয়ানে বলেন, আল্লাহ পাক নামাজের মতো গুরুত্বপূর্ণ এবাদতের পরেই অনর্থক কাজ থেকে বেচে থাকার কথা বলেছেন। “قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُونَ، الَّذِينَ هُمْ فِي صَلَاتِهِمْ خَاشِعُونَ… وَالَّذِينَ هُمْ عَنِ اللَّغْوِ مُعْرِضُونَ” জীবন, সময়, ও সম্পদ, সবই আল্লাহর কাছে বিক্রয় করা। অবান্তর আলোচনা, অর্থহীন বিনোদন, ফাহেশা কথাবার্তা, খেল তামাশা, মিডিয়া পত্রিকা ইত্যাদিকে জীবনের অংশ বানিয়ে নিয়েছি। দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে এমন لغو (লাঘু) যা থেকে আল্লাহ পাক বাচতে বলছেন, এমন কথা, কাজ, সময় কাটানো বা আচরণ-যা দ্বীন দুনিয়া, কোনো দিক থেকেই উপকার বয়ে আনে না।। স্যার বলেন, প্রতিটি দিনের প্রতিটি মুহূর্ত দিয়ে আমরা আসলে এক ধরনের লেনদেন করছি, আমরা কী দিচ্ছি আর কী পাচ্ছি, এই হিসেবেই নির্ধারিত হবে আমাদের পরিণতি লাভ না ক্ষতি। মুমিনের সময় ও মনোযোগ নির্দিষ্ট লক্ষ্যে নিবদ্ধ থাকে, কেবল ফলপ্রসূ কাজই সে করবে। বড় দামি এই জীবনের প্রতি মূহুর্ত দিয়েই আমি কেনা বেচা করছি, দিন শেষে এই ব্যবসার হিসেবে আমি লাভবান না লোকসানের মুখে!

১৯৫. গাইবান্ধার একজন পুরানা মুরব্বী নুরুল হোসাইন সাহেব, হাইস্কুল শিক্ষক…

গাইবান্ধার একজন পুরানা মুরব্বী নুরুল হোসাইন সাহেব, হাইস্কুল শিক্ষক ছিলেন, যিনি ‘নুরুল বিএসসি’ নামে এলাকায় পরিচিত ছিলেন। শিক্ষক হিসেবে যেমন এলাকায় সম্মানিত ছিলেন, তেমনি দ্বীনের কাজে তবলিগের সাথেও জড়িত ছিলেন। তিনি একবার বলেন, স্যার সম্পর্কে আগে থেকেই জানা থাকলেও কখনো কাছ থেকে দেখা বা একসাথে বসার সুযোগ হয়নি। একবার স্থানীয় সাথীদের সাথে ইজতেমায় গিয়েছিলাম। মাঠে স্যার আমাদের জামাতের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন আমরা শুকনা চিড়া গুড় খাচ্ছিলাম। আমি স্যারকে দেখে মুসাফাহা করে বললাম, ‘স্যার, একটু আমাদের সাথে খান।’ ধারণা ছিল, তিনি সৌজন্যবশত হাসিমুখে ধন্যবাদ দিয়ে চলে যাবেন। কিন্তু স্যার একদম আপনজনের মতো কোনো দ্বিধা ছাড়াই বসে পড়লেন এবং আমাদের সঙ্গে ঐ সাদাসিদে শুকনা চিড়া গুড় খেতে শুরু করলেন। উনি বলেন, এতো বড় মুরব্বি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কিন্তু বিনয়ের এমন চমৎকার ব্যবহার আমি জীবনে কম দেখেছি, এ আচরণ অন্তরে দাগ কেটে যায়। দ্বীনদার মানুষকে তার অহংকারহীন ব্যবহারেই চিনা যায়, লৌকিকতা ছাড়া সাদাসিদে চলাফেরা ও বিনয়ই একজন দ্বীনদার ব্যক্তির শান। এই ঘটনা ঐ নুরুল বিএসসি স্যারের মনে গভীর প্রভাব ফেলে ও এলাকায় ফিরে উনি তবলিগের কাজে যত্নশীল হন। তিনি বলেন, স্যারের ওই বিনয়ী ও আন্তরিক আচরণ আমার জীবনে এক শিক্ষা হয়ে গিয়েছিল, বড় হওয়া মানে যে অহংকার নয়, বরং আরও বেশি বিনয়ী হওয়া। উনার ভাষায়, স্যার কোনো দ্বিধা না করে থপ করে বসে পড়লেন, আর চিড়া গুড় খেতে শুরু করলেন, একদম আপনজনের মতো, কল্পনাও করিনি যে উনার মতো একজন মুরব্বি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, অচেনা একজনের কথায় এমন সহজভাবে বসে যাবেন (নিজেকে বড় মনে না করে সাধারণ মানুষের সাথে দ্বীল থেকে মহব্বতের ব্যবহার করা, এই ব্যবহারে মানুষ দ্বীনের দিকে আকৃষ্ট হয়, হৃদয় নরম হয় এবং দ্বীনের সৌন্দর্য প্রতিফলিত হয়)।

১৯৬. স্যার একবার প্রফেসর সানাউল্লাহ সাহেবের একটি ঘটনার কথা বলেন…

স্যার একবার প্রফেসর সানাউল্লাহ সাহেবের একটি ঘটনার কথা বলেন, যিনি সৌদি আরবে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভালো বেতনের চাকরির সুযোগ পান। বেতন ছিল আকর্ষণীয় এবং তিনি মনে করেন, এটি দুনিয়ারও লাভ, দ্বীনেরও লাভ, দ্বীনদার মানুষ হিসেবে তিনি মনে করেছিলেন, এতে দুনিয়ার উপকার তো হবেই, সেই সঙ্গে আরবের মাটিতে থেকে দ্বীনের মেহনতের ফিকিরও করতে পারবেন। তিনি পরামর্শ নিতে হজরতজ্বী এনামুল হাসান সাহেব রহমতুল্লাহি আলাইহি এর নিকট যান। বিস্তারিত শুনে হজরতজ্বী জিজ্ঞেস করেন, “তুমি কত দিনের জন্য যাচ্ছো? ইন্ডিয়ায় ফিরে আসবে, নাকি সেখানেই থেকে যাবে?” তিনি বলেন, “হ্যাঁ, কয়েক বছর পর ফিরে আসব।” তখন হজরতজ্বী শুধু এটুকু বলেন, “সৌদি থেকে ফিরে এসে এখানে তো আর ওখানকার মতো বেতন পাবে না।” স্যার বলেন, হজরতজ্বী খুব কম কথা বলতেন, কিন্তু উনার সেই সংক্ষিপ্ত মন্তব্যে এতটা গভীরতা ছিল যে, সানাউল্লাহ সাহেব বুঝে যান, আসলে এ সিদ্ধান্তে দ্বীনের প্রকৃত লাভ কতটুকু তা তিনি নিজেই উপলব্ধি করে ফেলেন। তিনি আর সৌদি বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই চাকরিতে যাননি। স্যার বলতেন, দ্বীনের মেহনত শুধুই করার বিষয় নয়, বরং কেমন করে করা হচ্ছে সেটাই প্রধান। মাঝে মাঝে মানুষ দ্বীনের খেদমতের আড়ালে এমন পথ বেছে নিতে চায়, যেখানে দুনিয়ার মোটা লাভ থাকে, অথচ তা অজান্তেই ইখলাস ও ইস্তিকামাত কে ক্ষতিগ্রস্ত করে ফেলে। স্যারের ভাষায়, যাদের অন্তরে আল্লাহ তাআলা খুশু দেন, তারা বড় লম্বা ভাষণ ছাড়াই ছোট্ট একটি কথাতেই নিজের করণীয় বেছে নিতে পারেন, তারা এমন সামান্য কথাতেও নিজেদের পথ পেয়ে যান। দ্বীনের কাজ করার ইচ্ছা থাকলেই যথেষ্ট নয়, সঠিক নিয়্যত, পরিপূর্ণ ইখলাস ও আল্লাহওয়ালাদের সঙ্গ ও পরামর্শ খুব জরুরি।

১৯৭. স্যার এক মোজাকারায় বলেন, এমন কিছু লোক দেখা যায়…

স্যার এক মোজাকারায় বলেন, এমন কিছু লোক দেখা যায়, অশিক্ষিত, দুশ্চরিত্র, স্মাগলার, ঘুষ, জালিয়াতি ইত্যাদির মাধ্যমে বিপুল অর্থ উপার্জন করেছে। দ্বীনের কোনো মেহনতে সে কখনো ছিল না, না তাবলিগি চিল্লা, না মসজিদের ইবাদত বা কুরআন হাদীসের কোনো তালিম। কিন্তু তাদের টাকা ও প্রভাব এত বেশি হয়ে যায় যে, সমাজের সর্বস্তরের মানুষ তাদের সামনে নতজানু হয়ে পড়ে। স্যার উদাহরণ দিয়ে বলেন, এমন একজন, যিনি নিজে অশিক্ষিত হলেও অপরাধমূলক কাজ করে প্রচুর টাকা বানিয়েছেন, এখন সেই টাকার জোরে সরকারি কলেজের প্রিন্সিপাল তার এক ফোনেই উঠে দাঁড়ায়, তার পাঠানো ছাত্রকে কোনো প্রশ্ন ছাড়াই ভর্তি করে নেয়। মাদ্রাসায় গেলে মোহতামিম সাহেব তাকে সামনে বসান, ওয়াজ মাহফিলে গেলে হুজুররা তাকে প্রধান অতিথির আসনে বসান, সভাপতির আসনে নিয়ে আসেন, এমনকি মসজিদে গেলে ইমাম সাহেব তাকে সম্মানের সাথে ইমামের পেছনে জায়নামাজ বিছিয়ে দেন। সে কাকরাইলে মারকাযে আসলেও সম্মানজনক পজিশন পায়। সে দেখে, টাকার জোর তো সবখানেই, টাকার কারনেই আজ সবখানে সম্মান! এইরকম দ্বীনের লাইনে যত উপরে উঠবে, ততই তার টাকার এক্বিন (বিশ্বাস) আরও বাড়তে থাকবে। সে মনে করে: আমি তো টাকার মাধ্যমে দুনিয়াও পেলাম, দ্বীনও পেলাম, প্রিন্সিপালও আমাকে দেখে উঠে দাঁড়ায়, ইমাম সাহেবও সম্মান করেন, মার্কাজের মুরব্বিরাও আমাকে বিশেষ একরাম করেন! তার অন্তরে এক ভয়ানক বিশ্বাস জন্ম নেয়, “টাকাই সব কিছু, টাকা দিয়েই সব হয়, এই টাকাই তাকে দুনিয়ার সম্মান দিয়েছে, দ্বীনের ময়দানেও সম্মান দিয়েছে!” একবার এস্তেমার মাঠে আরব টেন্টে কাতারের প্রিন্স এসেছেন। তাদের সাথে কিছু বিতর্কিত ব্যক্তিকে একত্রে দেখে স্যার অত্যন্ত বেদনার সাথে বলেন, “এদের দুনিয়া তো গেলই, দ্বীনও গেল।” কারণ, তারা এখন তাবলিগের মাধ্যমে দ্বীন হাসিল করছে না, বরং টাকার জোরে তাবলিগে মর্যাদা অর্জনের মোহে বিভ্রান্ত। তারা দেখছে, তাবলিগের বরকতে তো কাতারের প্রিন্সদের পাশে বসছি! তাহলে এত কষ্ট করে তিনদিন, চিল্লা করার কী দরকার? টাকা কারনেই তো তাবলিগের শীর্ষ পর্যায়ে! তাবলিগে এসে কাতারের প্রিন্সদের সাথে আছি, কত বড় আলেম, কত বড় মুরব্বি, কত কত কুরবানি করনেওয়ালার এখানে এক্সেস নাই। এই টাকার কারণেই তো আমি আজ কাতারের প্রিন্সদের লেভেলে পৌঁছে গেছি, এই তাবলিগের বরকতে! যারা সারাজীবন নামাজ পড়েছে, চিল্লা দিয়েছে, তিন দিন দিয়েছে, তাদের অনেকে আবার অবাক হয়ে তাকায়, টাকা তাকে কত উপরে উঠিয়েছে! তো টাকার এক্বিন তার অন্তরে বসতেই থাকবে, যে টাকার মতো জিনিস কি আমি ছাড়তে পারি? টাকা দিয়ে দুনিয়াতো সুন্দর হয়ই, দ্বীনও পাওয়া যায়, আখেরাতও সুন্দর হয়! সমাজ তাকে দ্বীনের মঞ্চে যত সম্মান দেয়, তার অন্তরে ‘টাকার ঈমান’ ততই মজবুত হয়। টাকার কারণে দ্বীনের এত উপরে পৌঁছে গেছি! এভাবেই ধীরে ধীরে দ্বীনের চেহারা ও মূল উদ্দেশ্য তার কাছে বিকৃত হয়ে যায়। দ্বীনের মেহনতের ভিত্তি হলো ইখলাস, ইস্তিকামাত এবং ত্যাগ। যেখানেই টাকা দিয়ে দ্বীনের কাজের সম্মান বা পজিশন কেনা হয়, সেখানে দ্বীনের রূহ থাকে না। বরং এতে দ্বীন একপ্রকার ব্যবসায় পরিণত হয়।

১৯৮. একবার প্রসঙ্গক্রমে স্যার বললেন, “যে ব্যক্তি কোনো গোপন মিশন…

একবার প্রসঙ্গক্রমে স্যার বললেন, “যে ব্যক্তি কোনো গোপন মিশন নিয়ে চলে, তার বাহ্যিক আচরণ সাধারণত খুব চমৎকার হয়। সে জানে, যদি আখলাক সুন্দর না হয়, তাহলে মানুষকে প্রভাবিত করতে পারবে না, তার মিশন সফল হবে না।” স্যার উদাহরণ দিলেন, ধরো, এমন একটি সংগঠন যারা মুসলমানদের মাঝে বিভেদ সৃষ্টি করতে চায়, দীনকে দুর্বল করতে চায়, এমনকি গভীরভাবে ধ্বংসাত্মক, ফেতনা, সৃষ্টিকারী কিংবা মুসলিম সমাজকে ভেতর থেকে ধ্বংস করার মিশনে নিয়োজিত, ওদের লিডারকে দেখলে তোমার মনে হবে, যেন কোনো আল্লাহওয়ালা বুযুর্গ। তার বাহ্যিক আচরণ এমন হবে যেন সে একজন দ্বীনদার, সদাচারী, সুন্নাতপন্থী ব্যক্তি। তার আচরণে নবী রাসূলদের আদর্শের ছায়া দেখা যাবে, যেন বুঝাই যায় না সে ভিতরে ভিতরে কী এক ভয়ানক মিশন বহন করছে। তার কথা, আচরণ, চালচলন, সব কিছুতেই এক ধরনের নুরানিয়াত থাকবে। অথচ ভিতরে ভিতরে সে এক ভয়ংকর ষড়যন্ত্রের নেতৃত্ব দিচ্ছে। ওতো কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য বা মিশন নিয়ে কাজ করছে, ওর বাহ্যিক আচরণ খুবই মার্জিত, আকর্ষণীয় ও সুচিন্তিত হবেই। সে জানে, বাহ্যিক রূপ যত সুন্দর হবে, তার গোপন মিশন তত সহজে চলবে। স্যার আরও বলেন, পকেটমারদের যে লিডার, সে ইমামের পিছনে গিয়ে বসে, গায়ে বড় পাঞ্জাবি, মুখে দরদভরা কথা, কিন্তু রাত বারোটায় তার কর্মীরা এসে হিসাব দেয় কার কার পকেট কাটা হয়েছে। সমাজের সবচেয়ে বড় স্মাগলার হয়তো মসজিদ করছে, মাদ্রাসায় টাকা দিচ্ছে, ব্রিজ বানাচ্ছে, স্কুল করছে, ও নিজে হাতে কোন খারাপ কাজ না, রাতদিন সমাজসেবায় নিয়োজিত, কিন্তু ভিতরে ভিতরে পুরো চক্র চালাচ্ছে, সেই চক্রের পরিচালনার কাজ করে। এই ধরনের মানুষদের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো, তাদের “বাহ্যিকতা” দিয়ে তাদের “বাস্তবতা” ধরা যায় না। কারণ তারা জানে, যদি বাহ্যিক আচরণ খারাপ হয়, তাহলে তাদের গোপন মিশন টিকবে না। তারা যে মিশনেই থাকুক না কেন, যত খারাপই হোক না কেন, তাদের আখলাক ও সামাজিক আচরণ এতটাই পরিপাটি ও আকর্ষণীয় হয় যে, সাধারণ মানুষ খুব সহজেই বিভ্রান্ত হয়ে যায় এবং তাদেরকে অনুসরণ করতেও শুরু করে। যারা প্রকৃত দ্বীনদার, তাদের ভেতর, বাহির এক হয়। আর যারা বিশেষ প্রজেক্ট নিয়ে চলে, তাদের বাহ্যিক আখলাক, সৌন্দর্য এক বিশাল ষড়যন্ত্রের পর্দা হয়ে থাকে। তার বাহ্যিক আখলাক দেখে সাধারণের জন্য বুঝা বড় মুশকিল। এই কথাগুলোর মাধ্যমে স্যার চোখ খুলে দিতে চাচ্ছিলেন, যাতে আমরা বাহ্যিক চাকচিক্যের আড়ালে থাকা ফেতনা ও ধোঁকার জগৎ সম্পর্কে সচেতন হই এবং নিজের জীবনে সত্যিকারের ইখলাস ও ত্যাগের ভিত্তিতে দ্বীনের ওপর অটল থাকতে পারি। শুধু মিষ্টি কথা, মার্জিত পোশাক, দান, খয়রাত বা বাহ্যিক ভদ্র আচরণই দ্বীনদার হবার প্রমাণ নয়, ইখলাসের প্রমাণ নয়। প্রকৃত মুমিন হওয়ার জন্য দরকার সত্য, স্বচ্ছতা এবং ভেতরের নিষ্ঠা।

১৯৯. একবার স্যার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ঘটনার কথা স্মরণ করছিলেন…

একবার স্যার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ঘটনার কথা স্মরণ করছিলেন। একবার একটি জামাত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছিল, জামাতের সাথীরা ছিলেন খুবই গরিব, সাদাসিধে, গ্রামের মানুষ। এমন সাথীও ছিলেন, যাঁরা জীবনে কখনো ইস্ত্রি করা জামা গায়ে দিয়ে দেখেননি, হয়তো একবারও ইস্ত্রি করা কাপড় পরার সৌভাগ্য হয়নি। গ্রামের সাদাসিধে গরিব মানুষ, ইস্ত্রি করা জামা পরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সৌন্দর্য উপভোগ করার অবকাশ কই! স্যার ছাত্রদের তরগীব দেন, এই সাথীদের খেদমত করো, ভালো ব্যবহার করো যাতে তারা খুশি হন। ছাত্ররা তাদের জামাকাপড় লুঙ্গি বিছানার চাদর ইত্যাদি নিয়ে নিজ হাতে ধুয়ে, পরিষ্কার করে, পবিত্র করে, ইস্ত্রি করে, ভাঁজ করে সুন্দরভাবে গুছিয়ে তাদের হাতে তুলে দিল। স্যার বলেন, এই খেদমতে তারা এতটাই অভিভূত হয়েছিল যে চোখে পানি আর অন্তরে এক গভীর ভালোবাসা নিয়ে আনন্দে বলে ওঠে, “এরা তো শুধু জামা ধুয়ে দেয় না, ইস্ত্রিও করে দেয়!” স্যার বোঝাতে চাইছিলেন, কেবল কথার সৌন্দর্য নয়, খেদমত, বিনয় আর ভালোবাসার স্পর্শে যখন হৃদয় জয় করা যায়, সেটিই দাওয়াতের প্রকৃত সৌন্দর্য প্রকাশ করে, দ্বীলকে আকর্ষণ করে, দ্বীল থেকে দোয়াকে টেনে নিয়ে আসে। এই ঘটনার প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। স্যার বলেন, এরপর থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র, শিক্ষক, এমনকি কর্মচারীদের মধ্যেও তাবলিগের কাজের প্রতি ভালো মনোভাব তৈরি হয়। পুরো ক্যাম্পাসে কাজ বেড়ে যায়, পরিবেশ বদলে যায়। এই ঘটনার মাধ্যমে স্যার এক গভীর সত্য প্রকাশ করতে চেয়েছেন, বিনয়, ভালোবাসা ও নিঃস্বার্থ সেবা হলো দাওয়াতের শক্তিশালী অস্ত্র, দাওয়াত শুধু কথায় নয়; খেদমতের মাধ্যমে হৃদয়ে জায়গা করে নিতে হয়।

২০০. একবার স্যার বলেন, আমাদের দেশে এমন বহু তাবলিগি ভাই…

একবার স্যার বলেন, আমাদের দেশে এমন বহু তাবলিগি ভাই আছেন, যাদের জীবনে কেউ কখনও এক কাপ চাও খাইয়েছে কিনা সন্দেহ। এতটাই নিঃস্ব, এতটাই সাদাসিধে এ মানুষগুলো, যাদের গায়ে হয়তো কখনও দামি কাপড় উঠেনি, পায়ে কখনও দামি সেন্ডেল জোটেনি, কিন্তু দাওয়াত ও তাবলিগের কাজ তারা করে যাচ্ছেন নীরবে, নিঃস্বার্থভাবে, নিরবিচারে। স্যার বলেন, এ দরিদ্র শ্রেণির মানুষেরা যখন তাবলিগের মাঠে থাকে, তখন সে কাজ সহজে নষ্ট হয় না। কারণ, এরা কাউকে দেখানোর জন্য করে না, পদ পদবি চায় না, বিনিময় প্রত্যাশা করে না, শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তারা ত্যাগ করে, কষ্ট করে, সময় দেয়। তারা চিল্লা দেয়, তিনদিনে যায়, গাশত করে, নামাজ পড়ে, দোয়া করে, কান্নাকাটি করে। এদের অন্তরের খালিস নিয়তই হলো সেই শক্ত ভিত, যার ওপর ভর করে কাজ এগোয়, গড়ে ওঠে এক পবিত্র পরিবেশ। এমন ভিত থাকা সমাজে সহজে কোনো ফিতনা প্রবেশ করতে পারে না। অন্য এক সময় স্যার মিসরের কাজের প্রসঙ্গে বলেন, সেখানে তাবলিগের কাজের ভিত তৈরি হয়েছে উচ্চশিক্ষিত শ্রেণিকে কেন্দ্র করে। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, প্রফেসর, শিক্ষিতরাই সেখানের কাজের মূল চালিকা শক্তি। তখন স্যার এক উপমা দিয়ে বলেন, আমাদের দেশের তাবলিগি কাজ অনেকটা সেই পিলারের মতো, যার নিচের ভিত্তি চওড়া এবং উপরের দিক সরু। এটি যেমন দেখতে সুন্দর, তেমনি স্থিতিশীলও, কারণ নিচের ভিত্তি মজবুত, সহজে হেলানো যায় না। পক্ষান্তরে, যদি ভিত্তিটা সরু হয় আর উপরের অংশ চওড়া হয়, যেমনটা কখনো কখনো শিক্ষিত শ্রেণিভিত্তিক কাঠামোতে দেখা যায়, তখন সামান্য ঝাঁকিতেই সেই কাঠামো ধ্বসে পড়ার সম্ভাবনা থাকে। ​স্যার বোঝাতে চেয়েছিলেন, দাওয়াতের কাজকে টেকসই করতে হলে, ভিত্তিটা হতে হবে নিচ থেকে, খালিস নিয়তসম্পন্ন দরিদ্র ও সাধারণ শ্রেণিকে কেন্দ্র করে। কারণ, এই শ্রেণি সহজে ভেঙে পড়ে না, তারা পরিশ্রমী, ধৈর্যশীল, তারা আল্লাহর উপর ভরসা রাখে,আর দোয়া কান্নাকাটিই তাদের ভিত্তি। সমাজে তাবলিগের কাজ যদি এমন শ্রেণির মধ্যে গভীরভাবে প্রোথিত হয়, তবে ফেতনা থেকেও সহজে রক্ষা পাওয়া যায়, এবং কাজটি বহুদূর এগিয়ে যায়। (দাওয়াতের ময়দানে টিকে থাকার জন্য প্রয়োজন খালিস নিয়ত, বিনয়ী অন্তর, এবং একনিষ্ঠ খেদমত। আর এসব গুণাবলি সবচেয়ে বেশি দেখা যায় সাধারণ, দরিদ্র, প্রান্তিক মানুষদের মধ্যেই। আমাদের উচিত এই শ্রেণির মূল্যায়ন করা ও তাদের উৎসাহ প্রদান করা, এবং তাদের অনুসরণে নিজের যাত্রাকে শুদ্ধ করা)।


← আগের পর্ব (১৬১–১৮০)  |  সূচিপত্র  |  পরের পর্ব (২০১–২২০) →

সংগ্রহ ও সংকলন: মুশফিক আহমদ (রহঃ)-এর মালফুযাত সংকলন।

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *