মালফুযাত – প্রফেসর মুশফিক আহমদ (রহঃ) – পর্ব ৫: ৮১–১০০
প্রফেসর মুশফিক আহমদ (রহঃ)-এর বয়ান, পরামর্শ, আমল ও দাওয়াতি জীবনের মালফুযাত, ৮১ থেকে ১০০ নম্বর। সম্পূর্ণ সূচিপত্র দেখুন।
সংগ্রহ ও সংকলন: মুশফিক আহমদ (রহঃ)-এর মালফুযাত সংকলন।
এই পর্বে যা আছে
- ৮১. এয়ার মার্শাল জামাল উদ্দীন আহামেদ, উনি পরবর্তীতে বিমান বাংলাদেশের…
- ৮২. গাইবান্ধার মামুন ভাই বলেন, তিন চিল্লার শেষ চিল্লায় স্যার…
- ৮৩. ভাই ওয়াহিদুল হক (রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলের স্টাফ ছিলেন)…
- ৮৪. ওয়াহিদুল হক ভাই বলেন, কেন্দ্রিয় মসজিদে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন জোড়…
- ৮৫. ওয়াহিদুল হক ভাই বলেন, আমি, রফিক ভাই, আজিজুল ভাই…
- ৮৬. হাফেজ শাহজুল ইসলাম সাহেব বলেন, একদিন আছরের পর মাগরিবের…
- ৮৭. একবার এক আলেমের সাথে দেখা করার জন্য বিকেল বেলা…
- ৮৮. মাওলানা মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন সাহেব (বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রিয় মসজিদের সাবেক…
- ৮৯. মাওলানা মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন সাহেব বলেন, কেন্দ্রিয় মসজিদে অনেক…
- ৯০. মাওলানা মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন সাহেব বলেন, একবার পারিবারিক কিছু…
- ৯১. মাদানীনগর মাদ্রাসায় (২০০৬ সালে) এতেকাফের জামাতে এক বয়ানে স্যার…
- ৯২. সাথীদের ব্যাক্তিগত যোগ্যতার ক্বদর করার ব্যাপারে স্যার উৎসাহ দিতেন…
- ৯৩. স্যার বলতেন আমাদের মুরব্বীরা নিজেরা এসলাহ ওয়ালা ছিলেন, খামাখাই…
- ৯৪. ক্বারীদের ক্বেরাতের নকল করা, অন্যের বয়ানের নকল করা, ইত্যাদির…
- ৯৫. অন্যের হুবহু অনুকরণের বিপরীতে নিজস্ব স্বকীয়তার কথা বলতে গিয়ে…
- ৯৬. স্যার ক্লাস শেষে বেশীরভাগ সময় কোন জামাত, মারকাজ বা…
- ৯৭. এক বয়ানে স্যার বলেন, আল্লাহ তায়ালা আমাদের জন্য তকদীরের…
- ৯৮. স্যার বলতেন, শরীয়তের হুকুমের সাথে আমাকে নিজেকে মেলাতে পারলে…
- ৯৯. সূরা সাজদাহ ও সূরা মূলক রাতে তেলাওয়াত করা স্যারের…
- ১০০. স্যার একবার এক মোজাকারায় বলেন, মানুষ প্রতি মুহুর্তে পরিবর্তন…
৮১. এয়ার মার্শাল জামাল উদ্দীন আহামেদ, উনি পরবর্তীতে বিমান বাংলাদেশের…
এয়ার মার্শাল জামাল উদ্দীন আহামেদ, উনি পরবর্তীতে বিমান বাংলাদেশের বোর্ড অব ডাইরেক্টরস এর চেয়ারম্যান ও ছিলেন। স্যারের সাথে আগে থেকেই পরিচয় ছিল, বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। বিমান বাহিনী থেকে অবসরের পর বিমান বাংলাদেশে চেয়ারম্যান হিসাবে যোগদানের পর একদিন গাসতে স্যার উনার সাথে দেখা করতে গিয়েছিলেন ডি.ও.এইচ.এস. এর বাসায়। রুমি ভাই ও মাহফুজ ভাই স্যারের সাথে ছিল। রুমি ভাইয়ের আব্বা উনার বন্ধু ছিলেন। স্যার উনার সাথে কথা বার্তার এক পর্যায়ে অত্যন্ত ফ্রিভাবে হাসিমুখে বললেন, মানুষ চাকরী করে হয় টাকার জন্যে, না হয় সম্মানের জন্যে, আপনারতো কোনটারই ঠেকা নেই, তো এই আলকাতরা গিল্লেন কেন? মাহফুজ ভাই বলেন, বড় ভদ্র মানুষ, খুব বিনয়ের সাথে বলছিলেন, মুসফিক ভাই কি করি, বসে বসে থেকে, একটা রুটিন লাইফে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। চেয়ারম্যান হিসেবে বড় কোন দায়িত্ব পালন করছি, এজাতীয় কথা উনার ছিল না। একটা দায়িত্ব নিয়ে সময়তো কাটছে, উনার কথার ধরণ এরকম ছিল। স্যারের কথার ধরণ মনে হয় এরকম ছিল যে, একদিকে মর্যাদায় আপনি বাহিনীর চীফ ছিলেন, অন্যদিকে টাকা পয়সার বা বেতনের আপনার এখন খুব দরকার, তাও তো না। বাহিনী থেকে এই অবসরের পর, শেষ জীবনে, নতুন এই ঝামেলার চাকরী না নিলেও তো হতো।
৮২. গাইবান্ধার মামুন ভাই বলেন, তিন চিল্লার শেষ চিল্লায় স্যার…
গাইবান্ধার মামুন ভাই বলেন, তিন চিল্লার শেষ চিল্লায় স্যার আমাদের জামাতের নূসরতে গিয়েছিলেন, শরীয়তপুর জেলার গোসাইরহাটে। জামাতে আসার পর আমার সাথে স্যারের প্রথম সাক্ষাতেই স্যার আমাকে জিজ্ঞেস করেন, বাসায় যোগাযোগ করেছি কিনা? আমার পাশ থেকে জামাতের এক বড় ভাই আমার উত্তর এইভাবে দেন যে ও ওর আম্মাকে বাসায় রেখে এসেছে, বয়স্ক মাকে, মায়ের সাথে মাঝে মাঝে যোগাযোগ করেছে। একথায় স্যার তখন আর কিছু বললেন না। পরে দুপুরে খাবার সময় আমি স্যারের সাথে এক প্লেটে খেতে বসি। খেতে খেতে আমি স্যারকে জিজ্ঞেস করলাম, চিল্লা থেকে বাসায় যোগাযোগ করলে অসুবিধাটা কি, সমস্যাটা কি হবে, আপনি কেন এই প্রশ্নটা করলেন যে বাসায় যোগাযোগ করেছি কিনা? স্যার খুব অল্প কথায় সুন্দর জবাব দিলেন, আমার সারাজীবন মনে থাকবে, স্যার বললেন, কেউ যদি দই বসায় (দই বানানোর জন্য), আর সেটা যদি বার বার টোকা দিয়ে দেখে, তাহলে দইতো আর বসবে না। ভাই বলেন, স্যারের এতোটুকু কথায় আমি উত্তর পেলাম, আমারাতো চিল্লায় এখানে আল্লাহ পাকের সাথে সম্পর্ক গড়ার জন্য এসেছি, এখানে আসার পর অন্যান্য বিভিন্ন সম্পর্কগুলোর সাথে যদি আমার যোগাযোগ থাকে, তাহলে তো এই সম্পর্ক গড়বে না।
৮৩. ভাই ওয়াহিদুল হক (রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলের স্টাফ ছিলেন)…
ভাই ওয়াহিদুল হক (রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলের স্টাফ ছিলেন) স্যারের কথা বলতে গিয়ে বলেন, এক দিন উপশহর মার্কাজে আমি স্যারের সাথে শবগুজারীতে গিয়েছিলাম। মার্কাজের আমল শেষে খানাপিনার পর আমাদের সাথীরা শুয়ে পড়ে এবং কিছু সাথী যার যে দায়িত্ব ছিল, সে সেই জিম্মাদারীতে চলে যায়। আমার খুব মনে পরে যে স্যার রাতে দুইটার দিকে উঠে স্যারের ব্যাগ থেকে একটা কালো কলা বের করে খেয়ে নিলেন, অতি মজে যাবার কারণে বা ব্যাগে রাখার কারনে যে কলাটা নরম ও চোচা কালো হয়ে গিয়েছিলো। আমি স্যারকে বললাম স্যার কিছু খানা আছে, বেড়ে দিবো কি? স্যার বললেন, ভাই আলহামদুলিল্লাহ, আমার খানা হয়ে গেছে। এরকম খুবই অল্প ও সাধারণ খানা খেয়ে দিনের পন দিন স্যার রোজা রাখতেন।
৮৪. ওয়াহিদুল হক ভাই বলেন, কেন্দ্রিয় মসজিদে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন জোড়…
ওয়াহিদুল হক ভাই বলেন, কেন্দ্রিয় মসজিদে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন জোড় বা অনুষ্ঠানে প্রায়ই ছাত্রদের সাথে খেদমতে থাকা হতো। এরকম এক ছাত্রদের জোড়ে মসজিদের আমতলায় আমরা খেদমতের এন্তেজাম করছিলাম, খেদমতের সাথীরা সবাই ছিল। স্যার খেদমত দেখতে এসে বললেন, ওয়াহিদুল হক ভাই মসলা কম ব্যবহার করেন, খানাতে আল্লাহ পাক বরকত দিয়ে দিবেন।
৮৫. ওয়াহিদুল হক ভাই বলেন, আমি, রফিক ভাই, আজিজুল ভাই…
ওয়াহিদুল হক ভাই বলেন, আমি, রফিক ভাই, আজিজুল ভাই আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারীদের মধ্যে তিন চিল্লার সাথী ছিলাম। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের খুব সাধারণ কর্মচারী ছিলাম। বিভিন্ন সময় স্যারের খেদমত করতে চেয়েছি, স্যার কখনো আমাদের দ্বারা কোন রকম শারীরিক খেদমত নেননি। বিভিন্ন সময় জামাতে বা বিভিন্ন প্রোগ্রামে ক্যাম্পাসের ভেতরে বা বাইরে স্যারের সাথে থেকেছি। আমাদের অনেক সময় ভূল ত্রুটি হয়েছে, কিন্তু কোন ব্যাপারে স্যার কোন সময় আমাদের উপর রাগ হননি। এরকম কোন আচরণ আমরা কোন দিন স্যারের কাছ থেকে পাইনি, যার দ্বারা মনে একটু কষ্ট লেগেছে। আমাদের বিভিন্ন সমস্যায় আমরা স্যারের কাছে খুব সহজে যেতে পারতাম, বসতে পারতাম, দ্বীল খুলে স্যারের সাথে কথা বলতে পারতাম। একবার আমার আম্মা অসুস্থ হলে পার্বতীপুর থেকে উনাকে এনে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্ত্তি করি। আমি এতো ছোট কর্মচারী, উনার মতো একজন মুরব্বী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আমার মায়ের খোঁজ খবর নিতে হাসপাতালে গিয়েছিলেন।
৮৬. হাফেজ শাহজুল ইসলাম সাহেব বলেন, একদিন আছরের পর মাগরিবের…
হাফেজ শাহজুল ইসলাম সাহেব বলেন, একদিন আছরের পর মাগরিবের কিছু পূর্বে স্যার মরহুম জামাল উদ্দিন হুজুরের (বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদের পেশ ইমাম ছিলেন) বাসায় যান। হুজুর মেহমানদারী হিসাবে নাস্তা পেশ করলে, স্যার খেয়ে নেন। খানা শেষে আযানের সময় হলে স্যার একটু হাসি মুখে বললেন, এই একটু হলে রোজাটা হয়ে যেতো। স্যার খানা শুরুর আগে রোজার কথা বলেননি, খানা খাওয়া শেষ হলে বললেন। তখন জামাল উদ্দিন হুজুর জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি বললেন না কেন, একটু পরেই দেয়া যেতো। স্যার বললেন, আমি রোজা ছিলাম “নফল”, আর সামনে যে খানা এসেছিল সেটা গ্রহন করা ছিল “সুন্নত”, কোনটাকে নেবো।
৮৭. একবার এক আলেমের সাথে দেখা করার জন্য বিকেল বেলা…
একবার এক আলেমের সাথে দেখা করার জন্য বিকেল বেলা উনার বাসায় স্যার গিয়েছিলেন। আলেম সাহেব বড় আখলাকওয়ালা ও সাদাসিদে স্বভাবের ছিলেন, বাসায় মেহমানদারী করার মতো বিশেষ কোন খাবার ছিল না। পানি ছিল, ঐ পানিই উনি স্যারের সামনে পেশ করলেন। স্যার রোজা ছিলেন, সময়টা ছিল ইফতারীর অল্প কিছু পূর্বে, ঐ পানিই স্যার খেয়ে নিলেন। আর অল্প সময় পর পানিটা খেলেই তো রোজাটা হয়ে যেতো, পরে স্যারকে এব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলে স্যার বললেন, আমি যদি তখন পানিটা না খেতাম তাহলে উনি বুঝতে পারতেন যে আমি রোজা আছি, আর আমার ইফতারীর ব্যবস্থা করার জন্য পেরেশান হয়ে যেতেন, ঐ পেরেশানীটা আমি উনাকে দিতে চাইনি।
৮৮. মাওলানা মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন সাহেব (বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রিয় মসজিদের সাবেক…
মাওলানা মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন সাহেব (বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রিয় মসজিদের সাবেক পেশ ইমাম) বলেন, এই মুহুর্তে আমার কি করণীয়, কোন সময়ে আমার উপর কি হুকুম, কোন হালতে আমার কি সিদ্ধান্ত নিতে হবে, কোন সময়, কোন অবস্থা আল্লাহ পাকের কোন হুকুমের দিকে ইংগিত করে, এসব ব্যাপারে স্যার সবসময়ই সচেতন থাকতেন। এপ্রসঙ্গে বলতে গিয়ে উনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদে সহকারী ইমাম নিবে, সার্কুলার হয়েছে জেনে আমি ১৯৭৪ সালে পাবনা থেকে রাজশাহী আসলাম। আমি দরখাস্ত করার আগেই দেখতে এলাম যে পরিবেশ কেমন, কেমন লাগবে ইত্যাদি। মসজিদে এসে পৌঁছার পরে মাওলানা জামাল উদ্দিন সাহেব (কেন্দ্রিয় মসজিদের তৎকালীন পেশ ইমাম) এবং স্যারের সাথে মসজিদেই দেখা ও পরিচয় হয়। এশার নামাজের সময় হলে মাওলানা জামাল উদ্দিন সাহেব আমার ক্বেরাত শুনার জন্যই হোক বা যে জন্যই হোক আমাকে নামাজ পড়াতে বললেন। আমি কেবল পাবনা থেকে রাজশাহী এসেছি, মুসাফির, আবার এশার নামাজ চার রাকাত, নামাজ পড়াতে (ইমামের মসল্লায় যেতে) একটু ইতস্তত করছিলাম। এই মুহুর্তে স্যার আমার পাশে থেকে বললেন, উনি তো পাবনা থেকে এসেছেন। তখন মাওলানা জামাল উদ্দিন সাহেব বললেন, ও উনিতো মুসাফির, বলে উনিই নামাজ পড়ালেন, আর আমাকে নামাজ পড়াতে হলো না, আমি রেহাই পেলাম।
৮৯. মাওলানা মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন সাহেব বলেন, কেন্দ্রিয় মসজিদে অনেক…
মাওলানা মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন সাহেব বলেন, কেন্দ্রিয় মসজিদে অনেক সময় নামাজের ওয়াক্তে এস্তেঞ্জা ও ওজুর জায়গায় ভীড় জমে যেতো। এরকম ভীড় থাকলে স্যার প্রায়ই আমার বাসায় (মসজিদ চত্তরে পেশ ইমাম সাহেবের বাসা) চলে আসতেন। আমার বাসায় স্যার গোসলের দরকার থাকলে গোসল করে নিতেন, বা এস্তেঞ্জা ওজু সেরে নামাজে শরীক হতেন। এরকম একদিন স্যারের ওজু শেষ হতে হতে আমি একটু চায়ের ব্যবস্থা করেছি। ওজু সেরে চায়ের দস্তরখান দেখেই স্যার একটু মিষ্টি হেসে বললেন, এটাকি ওজুর বরকত?
৯০. মাওলানা মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন সাহেব বলেন, একবার পারিবারিক কিছু…
মাওলানা মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন সাহেব বলেন, একবার পারিবারিক কিছু ব্যাপারে বড় ধরণের কিছু সমস্যার মধ্যে পড়েছিলাম, খুব পেরেশান ছিলাম। স্যারকে হালত বলে দোয়ার দরখাস্ত জানালাম, বললাম খুব সমস্যার মধ্যে পড়ে গেছি। আমার বিস্তারিত অবস্থার কথা শুনে স্যার বললেন, “মুসিবত আসার আগে সতর্ক হতে হয়, আর মুসিবত এসে গেলে তখন ছবর করতে হয়”। উনি বলেন, বিভিন্ন ব্যাপারে আগে থেকেই সতর্ক ও সচেতন হওয়া, বা কোন মুসবতের হালতে বিচলিত না হওয়া, ধৈর্য অবলম্বন করার ব্যাপারে স্যারের ওই উপদেশটা আমার জীবনের জন্য বড় মূল্যবান ছিল।
৯১. মাদানীনগর মাদ্রাসায় (২০০৬ সালে) এতেকাফের জামাতে এক বয়ানে স্যার…
মাদানীনগর মাদ্রাসায় (২০০৬ সালে) এতেকাফের জামাতে এক বয়ানে স্যার বলেন, আল্লাহ তায়ালা উমুমী কাজকে আফজাল বলেছেন। وَمَنْ أَحْسَنُ قَوْلًا مِّمَّن دَعَآ إِلَى ٱللَّهِ وَعَمِلَ صَٰلِحًا وَقَالَ إِنَّنِى مِنَ ٱلْمُسْلِمِينَ বিভিন্ন হাইছিয়্যতে দাওয়াত দেওয়া যায়, আলিম হিসেবে, পীর হিসেবে, বাপ হিসেবে, আরো বিভিন্ন হিসেবে। কিন্তু আহসান ক্বওল, ঐটার সম্পর্ক করা হয়েছে যেটা একজন মুসলিমিন হিসেবে। আলিমও না, পীরও না, কিছুই না, একজন সাধারণ মুসলমান। ঐটার সম্পর্ক আহসানের সাথে। আল্লাহ তায়ালা ঐখানে ফায়দাও বেশী দিয়ে থাকেন। রসূল করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, আল্লাহ তায়ালা উনার দ্বারা মু’জেজা জাহির করেছেন। এটার দরকারও ছিল, নবী হিসেবে একটা দলিল পেশ করার জন্য মু’জেজা। কিন্তু মানুষ যে দ্বীন গ্রহণ করেছে, ঐটা মু’জেজা ইত্যাদির দ্বারা কম। বরং একেবারে সাদাসিদে কথা, একজন সাধারণ মানুষ যে কথা বলতে পারে, إِنَّنِى مِنَ ٱلْمُسْلِمِينَ, এর বুনিয়াদের উপর। সেই ধরনের কথার দ্বারা রসূল করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছেও বেশী মানুষ মুসলমান হয়েছে। চাঁদ দুই টুকরা হয়ে গেলো, ঈমানতো আনলোই না, বললো যাদুকর। অথচ হিজরতের সময় দেখা যায় যে বললেন, একটা ভালো কথা বলবো? বলেন। বলো, لآ اِلَهَ اِلّا اللّهُ, বলে নিল, সহজেই ইসলাম কবুল করলেন। অতি সাধারণ কথার দাওয়াত, বলো আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নাই, তোমার জীবন সুন্দর হয়ে যাবে। আল্লাহ তায়ালা এই দাওয়াতকে সহজ করেছেন, মানুষ স্বাভাবিকভাবে, সাধারণ হয়ে যখন দাওয়াত দেবে আল্লাহ তায়ালা এর ভেতর শক্তি দিয়ে দিবেন।
৯২. সাথীদের ব্যাক্তিগত যোগ্যতার ক্বদর করার ব্যাপারে স্যার উৎসাহ দিতেন…
সাথীদের ব্যাক্তিগত যোগ্যতার ক্বদর করার ব্যাপারে স্যার উৎসাহ দিতেন। স্যার বলতেন প্রত্যেক মানুষ যদি বলে যে আমি এক ও অদ্বিতীয়, তার মতো পৃথিবীতে কেউ নাই, তার এই কথা শুদ্ধ। এই দ্বীনের ময়দানে যারা মেহনত করেছেন তাদের প্রত্যেককেই আল্লাহ তায়ালা স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য দান করেছেন। আনোয়ারুল আযীম সাব একবার এক হতাশার কথা বললে স্যার উনাকে বললেন, এতোদিন আপনি ছিলেন উনার (অন্যের) লোক, এখন আপনি একজন স্বতন্ত্র ব্যাক্তি। স্যার এই আয়াত- فَلَآ أُقْسِمُ بِمَوَٰقِعِ ٱلنُّجُومِ, পড়ে বিভিন্ন সময় বলতেন, প্রত্যেক তারকার নিজস্ব কক্ষপথ আছে। ঐ কক্ষপথেই যদি সে থাকে, তবে সে সুন্দরও থাকে নিরাপদও থাকে। হাসসান বিন ছাবেত রাদিয়াল্লাহ তায়ালা আনহু, খন্দকের সময় উনাকে বলা হলো এই ইহুদীকে কতল করো, উনি আগ্রহ দেখালেন না, উনার জামা কাপড় খুলে আনো, আমি এসব পারবো না। আমরা হলেতো উনাকে গালি দিতাম। স্যার এপ্রসঙ্গে বলেন, উনি এই ময়দানের নয়ই, উনি ছিলেন কবি, এমনকি উনার জন্য আলাদা মেম্বর ছিল মসজিদে নববীতে। তখন কবিতার খুব চর্চাও ছিল, দামও ছিল। কাফেররা আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিরূদ্ধে কবিতা লিখতো, তার মোকাবেলায় উনি রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রসংসায় কবিতা দিয়ে উত্তর দিতেন। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জানতেন উনাকে দিয়ে যুদ্ধ হবে না, কবিতার লেখার উৎসাহ দিতেন, তুমি এটা লেখো, জিবরীল আমীন তোমাকে সাহায্য করবে। আল্লাহর নবী তার কোন দোষারোপ করেননি, এখানে তাকে কতো উপরে তুললেন। স্যার বলতেন, আমরা সব মরিচ এক শীল পাটায় পিশতে চাই, কিন্তু সবাই স্বতন্ত্র, ব্যাক্তিত্বের, যোগ্যাতার পার্থক্য আছে। স্বাতন্ত্রতা অনুযায়ী সাথীর রেয়ায়েত করতে হবে, তার মূল্য দিতে হবে। যাকে আমাদের তাবলিগের ভাষায় বলে যোগ্যতার ক্বদর করা।
৯৩. স্যার বলতেন আমাদের মুরব্বীরা নিজেরা এসলাহ ওয়ালা ছিলেন, খামাখাই…
স্যার বলতেন আমাদের মুরব্বীরা নিজেরা এসলাহ ওয়ালা ছিলেন, খামাখাই অন্যের এসলাহের পেছনে লাগা তাদের মেজাজের মধ্যেই ছিল না। একবার স্যার বলেন, আমি একবার নিযামুদ্দিনে জোড়ে গেছি, একই সময় জামেয়া মিল্লিয়াতে একটা সেমিনারও ছিল। আমি খুবই সংকোচে ছিলাম যে যাবো কিনা, এসেছি তাবলিগের কাজে, থাকছি মারকাজে, আর এখান থেকে বাইরে ইউনিভার্সিটিতে সেমিনারে যাবো, কেমন হবে, ইত্যাদি। আমি মাওলানা আহমদ লাট সাহেবকে বললাম, যে যাবো কিনা। উনি এমনভাবে এর উত্তর দিলেন যে এটা যেনো মহান এক কাজে যাবো আমি, “হ্যাঁ, হ্যাঁ, জরুর জরুর, জরুর যানা পরে, জরুর যানা পরে”। উনার কথায় আমি ভাবছি, এসেছি নিযামুদ্দিনে, দ্বীনের ফিকিরের মারকাজ থেকে আমি যাবো ফিজিক্স এর সেমিনার করতে, এটা আবার ‘ জরুর যানা পরে ’ কিভাবে হলো। এটা বলে উনি বললেন, যাবার সময় হজরতজ্বীকে বলে যেয়ো। হজরতজ্বীকে যখন বললাম, হজরতজ্বী বললেন, “হ্যাঁ, হ্যাঁ, জরুর”। এই ছিলো উনাদের মেজাজ। আমাদের এক জামাত নিযামুদ্দিন থেকে রোক হয়ে গেছে, জামাতের সাথীরা সেখানকার এন্তেজামের সাথীদের বলেওনি, নিজেদের মধ্যে একটু আলোচনা করেছিলো, যাতে কোন বিশেষ জায়গায় যাওয়ার একটু আগ্রহ প্রকাশ পায়। একথা কোনভাবে হজরতজ্বীর কানে পৌঁছে, তো সেই জামাতের হওয়া রোক বাতিল করে তাদের আগ্রহের জায়গায় নতুন করে রোক করা হয়। স্যার বলতেন আমাদের মুরব্বীরা সাথীদের এসলাহের পেছনে লাগতো না, যে এর এসলাহ দরকার, এর এসলাহ করেই ছাড়বো ইত্যাদি।
৯৪. ক্বারীদের ক্বেরাতের নকল করা, অন্যের বয়ানের নকল করা, ইত্যাদির…
ক্বারীদের ক্বেরাতের নকল করা, অন্যের বয়ানের নকল করা, ইত্যাদির চেয়ে এক্ষেত্রে প্রত্যেকের ব্যাক্তিগত স্বকীয়তাকে স্যার বেশী পছন্দ করতেন। স্যার বলতেন, অন্যের ক্বেরাত অন্যের বয়ানতো সামনে থাকবেই, কিন্তু সেটা যেনো নিজের থেকে বের হয়। রাজশাহী উপশহরে এক মাদ্রাসায় স্যারকে দাওয়াত দিয়েছিলেন, ক্বেরাতের জন্য মাদ্রাসার বেশ সুনাম ছিল, স্যার গেলে সেখানকার ওস্তাদ স্যারকে হিফজ খানার কিছু ছাত্রদের ক্বেরাত শুনান, ছোট ছোট ছাত্ররা সুন্দর শুদ্ধভাবে মিসরের, সৌদি আরবের প্রসিদ্ধ কিছু ক্বারীর ক্বেরাত হুবহু শুনিয়েছিল। পরে সেখানে নাস্তার সময় মাদ্রাসার মুহতামিম ও হিফজখানার ওস্তাদদের মধ্যে মুজাকারায় স্যার ছাত্রদের ক্বেরাতে প্রসিদ্ধ ক্বারীর হুবহু নকল করার জন্য উৎসাহ দান করতে নিষেধ করেন। ক্বেরাতকে শুদ্ধ করতে হবে, এব্যাপারেতো তোন ছাড় নাই, কিন্তু অমুক অমুক ক্বারীর মতো সুর করা চাই, এই জজবা ছাত্রদের না হলেই ভালো। এপ্রসঙ্গে স্যার উদাহরণ দিতেন, একটা ফুল গাছের একটা ডাল ছিড়লাম। সেই ডালে একটা ফুল আছে, এই ফুলটা সেই ডালের নিজস্ব ফুল নয়, আগের গাছের ডালের ফুল। এই ডালটা যদি আমি মাটির মধ্যে পুঁতে দেই তো প্রথমে ডালের পাতাগুলো মরে যাবে, ছালগুলো শুকিয়ে যাবে, কিন্তু কিছু দিন পর সেই ডাল থেকে আস্তে আস্তে আরেকটা ফুলগাছ হয়ে যাবে, ঐ ফুল গাছের ডালেও ফুল হবে যেটা অবিকল ঐ আগের গাছের মতই একই ফুল, কিন্তু সেটা ঐ ডালের নিজস্ব ফুল, ঐ আগের গাছের ফুল নয় এটা।
৯৫. অন্যের হুবহু অনুকরণের বিপরীতে নিজস্ব স্বকীয়তার কথা বলতে গিয়ে…
অন্যের হুবহু অনুকরণের বিপরীতে নিজস্ব স্বকীয়তার কথা বলতে গিয়ে স্যার একবার জাপানীদের ফুল ডিজাইনের প্রশংসা করেন। স্যার বলেন, এই ব্যাপারে ওরা সারা দুনিয়াতে বিখ্যাত, সব পাতা সব ফুল ডাল থেকে ঝেড়ে ফেলে দিবে, একটা পাতা আর একটা কলি রাখবে। বড় নিষ্ঠুরভাবে সব ফুল সব পাতা ঝেড়ে ফেলবে, মাত্র একটা ফুল আর একটা পাতা রাখে। এই ডিজাইন সবাই পারবে না, ডালের সব ফুল রাখবে, সব পাতা রাখবে, আসলে ওটা দেখার মতো কিছু থাকবে না। ডালের একটা ফুল আর একটা পাতা এমনভাবে রাখে যেটা দেখার মতো থাকবে।
৯৬. স্যার ক্লাস শেষে বেশীরভাগ সময় কোন জামাত, মারকাজ বা…
স্যার ক্লাস শেষে বেশীরভাগ সময় কোন জামাত, মারকাজ বা কোন তাকাজা থাকলে সেখানে চলে যেতেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের একটা বড় সময় স্যারের বাসা ছিল না, স্যার বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে থাকতেন। সফর, তাকাজা বা জামাত থেকে ফিরে মসজিদে এসে রাতে থাকতেন। স্যারের একটা ছোট সবুজ রংয়ের ব্যাগ ছিল, স্যারের লুঙ্গি, জামা, ছোট কালো একটা বিছানার হোল্ডার, জায়নামাজ, মশারী ঐ ব্যাগে থাকতো (যা ছিল স্যারের থাকার সম্বল ও ছামান)। জামাতে সফরে গেলে ব্যাগটা সঙ্গে নিয়ে যেতেন, কোন তাকাজায় গেলে স্যারের ব্যাগটা কখনো মসজিদের ভেতরে পূর্ব পার্শ্বে থাকতো আবার কখনো হাফেজ শাহজুল ইসলাম সাহেবের রুমে (কেন্দ্রীয় মসজিদের ওজুখানার সাথে পশ্চিম পার্শ্বের রুম) থাকতো। হাফেজ সাহেব বলেন, একদিন মাঝরাতে স্যার মসজিদে ফিরেন, মসজিদে তালা ছিল, হয়তো স্যার ব্যাগ বের করার জন্য মসজিদে ঢুকতে পারেননি, বাইরে গার্ডরা যেখানো শুয়ে থাকে, সেখানে শুয়ে ছিলেন। আমাকে বা গার্ডদের কাউকে স্যার ডাকেননি ব্যাগ বের করার জন্য। রাত দুইটা আড়াইটার দিকে দেখি মসজিদে সামান্য ছোট একটা জায়নামাজের মতো, ঐটা বিছিয়ে স্যার শুয়ে আছেন, কোন বালিশ বা আর কিছু ছিল না। আমি দেখেই দৌঁড়ে রুম থেকে বালিশ মশাড়ি নিয়ে এসে বিছানা করে দিলাম। স্যারের একটা অভ্যাস ছিল, স্যার না করতেন না, লাগবে না, বা না হলে চলবে এরকম বলতেন না। মাঝে মাঝে আমার খুব খারাপ লাগতো যে স্যার দূর থেকে এসে আমি এখানেই আছি স্যার ডাকতে পারতো, কিন্তু রুমের দরজা বন্ধ দেখলে ঘুমিয়ে গেছি মনে করে ডাকতেন না। স্যারকে খানার জন্য ডাকলে, কোথাও খেয়ে আসলে বলতেন যে খেয়ে এসেছি, না খেলে রুমে চলে আসতেন। বেশিরভাগ সময় আমার একার জন্য পাক করতাম, দুজনে খেয়ে নিতাম, স্যার খুব অল্প খেতেন, আমার খানা কম মনে হতো না। সকালে বেশিরভাগ দিন আলু ভর্ত্তা আর ভাত দিয়ে নাস্তা করতাম, মসজিদে গিয়ে স্যারকে বলতাম, স্যার নাস্তা, স্যার রোজা না থাকলে চলে আসতেন, একত্রে নাস্তা করতাম। বেশীরভাগ সময় সোমবার বৃহস্পতিবার রোজা রাখতেন। কখনো কখনো হল থেকে ছাত্ররা নাস্তা বা খানা নিয়ে এলে, স্যার আমাকে বলতো এখন খানা লাগবে না।
৯৭. এক বয়ানে স্যার বলেন, আল্লাহ তায়ালা আমাদের জন্য তকদীরের…
এক বয়ানে স্যার বলেন, আল্লাহ তায়ালা আমাদের জন্য তকদীরের একটা রাস্তা দিয়েছেন। আর মানুষ নিজেও কিছু চিন্তা করে। মানুষ নিজে যেগুলো চিন্তা ও পরিকল্পনা করে সেগুলো যদি তকদীরের সাথে না মেলে তাহলে সে ব্যাথা পায়। আমাদের দেশে শহরে গ্রামে পুরোনো গল্প আছে, যে একজন গরীব মানুষ মাথায় ঝুড়িতে করে একহালি ডিম নিয়ে যাচ্ছে, আর সেই ডিম মাথায় রেখেই সে কল্পনা করছে, এই ডিম ফুটবে তো বাচ্চা হবে, তারপর মুরগী বড় হবে তো আরো ডিম দিবে, তারপর এভাবে অনেক ডিম মুরগী বিক্রি করবে তো আরো ধনী হবে, তারপর ছাগল কিনবে, তারপর গরু কিনবে, ইত্যাদি, ইত্যাদি, আর কিছুক্ষণের মধ্যেই সে তার কল্পনার মধ্যে বিরাট ধনী হয়ে গেলো। এতোক্ষণে হোচট খেয়ে পড়েছে আর তার ডিমগুলো পড়ে ভেঙ্গে গেল, তো সে মনে বড় ব্যাথা পায় যে জীবনের পরিকল্পনা নষ্ট হয়ে গেলো, সব আশা ভেঙ্গে গেলো। এই ব্যাথার কারণটা কি? বাস্তব, বাস্তবতা এক জিনিষ আর তার কল্পনা আরেক জিনিষ। বাস্তবতার সাথে যদি কল্পনা মিলে যায় তাহলে ব্যাথা হয় না। আর যদি কল্পনা ভিন্ন আর বাস্তবতা ভিন্ন হয় তো তখন ব্যাথা পায়। দুনিয়ার মানুষ যে হর হামেশা বিভিন্ন সময়, বিভিন্ন হালতে মনে ব্যাথা পায় তার কারণ হলো যে তার মনের কল্পনা আর আল্লাহ তায়ালার ফায়সালা মিলেনি। আল্লাহ তায়ালা তাকে যে হালত দিয়েছেন, যে ঘটনাগুলো তার জন্য দিয়েছেন সেগুলোর সাথে তার কল্পনাগুলো মিলছে না, সেগুলো সে আশা করে নাই। ধারণা করেছিলো কিছু, আশা করেছিলো কিছু, আর হয়েছে অন্য কিছু, ঘটেছে বিপরীত কিছু। যেটা ঘটে গেছে বা যেটা হওয়ার ওইটাই যদি সে আশা করতো, তার চাহিদা ঐটাই হতো, তাহলে তার আর কষ্ট হতো না।
৯৮. স্যার বলতেন, শরীয়তের হুকুমের সাথে আমাকে নিজেকে মেলাতে পারলে…
স্যার বলতেন, শরীয়তের হুকুমের সাথে আমাকে নিজেকে মেলাতে পারলে আশা করা যায় আল্লাহ তায়ালা আমার ইচ্ছাকে আমার তকদ্বীরের সাথে মিলিয়ে দিবেন। আমার কাজ শরীয়তের হুকুমের সাথে নিজেকে মিলিয়ে নেয়া। যদি আমার বাহ্যিক আমলকে আল্লাহ পাকের হুকুমের সাথে শরীয়তের আহকামের সাথে মেলাতে পারি, ইনশাআল্লাহ আল্লাহ তায়ালা মেহেরবানী করে আমার দ্বীলকে আমার তকদ্বীরের সাথে মিলিয়ে দিবেন। আর যার দ্বীল তার তকদ্বীরের সাথে মিলে যাবে সে কখনো এমন অবস্থা পাবে না যে চেয়েছিলাম কিছু আর হলো অন্য কিছু। বরং সে সবসময় সেটাই চাইবে যেটা তার হওয়ার, অন্য ভিন্ন কিছু সে চাইবেই না। মূসা আলাইহিস সাল্লাম দোয়া করেন- رَبِّ إِنِّى لِمَآ أَنزَلْتَ إِلَىَّ مِنْ خَيْرٍۢ فَقِيرٌۭ আয় আল্লাহ তুমি আমাকে যা দিতে চাও মেহেরবানী করে ঐটা দিয়ে দাও। এমন দোয়া করলেন যে রদ হওয়ার কোন উপায়ই নেই। তুমি আমাকে যা দিতে চাও ঐটা দিয়ে দাও, ঐটাতো আল্লাহ তায়ালা দেবেনই, ঐটার জন্যই দোয়া করছেন। আর যখন ঐটা হয়ে যাবে তো নিশ্চয়ই শুকরিয়া আদায় করবে, যে আয় আল্লাহ তুমি আমাকে মেহেরবানী করে যেটা দিতে চেয়েছিলে সেটা দিয়েছো, আমার উপর বড় মেহেরবানী করেছো। এজন্য নবীদের জীবনে, ওলী আল্লাহদের জীবনে কখনো কোন ঘটনা পাওয়া যাবে না যে হায় হায় করছে। বরং সুস্থ আলহামদুলিল্লাহ, অসুস্থ আলহামদুলিল্লাহ, খেতে পেরেছি আলহামদুলিল্লাহ, উপবাস আলহামদুলিল্লাহ, আর এই আলহামদুলিল্লাহগুলো যে বলছে তা কৃত্রিমভাবে বানিয়ে বলছে তাও নয়, দ্বীল থেকে বলছে। কারণ আল্লাহ তায়ালার নিকট থেকে যা আসছে তার কাছে এমন প্রত্যেক জিনিষ প্রত্যেক হালত তার কাছে ভাল লাগছে।
৯৯. সূরা সাজদাহ ও সূরা মূলক রাতে তেলাওয়াত করা স্যারের…
সূরা সাজদাহ ও সূরা মূলক রাতে তেলাওয়াত করা স্যারের জীবনের একটা নিয়মিত আমল ছিল। বেশীরভাগ সময় এই দুই সূরার আমল দুই রাকাত নামাজে মাগরীব ও এশার মাঝখানে স্যার করার চেষ্ঠা করতেন। মাগরীবের পর বয়ান বা কোন এস্তেমায়ী আমলে থাকলে স্যার আমল বা বয়ান শেষে সাথে সাথেই দুই রাকাত নামাজে দাড়িয়ে যেতেন এবং এই দুই সূরা দিয়ে দুই রাকাত নামাজ পড়ে নিতেন। এশার জামাত শুরু হবার পূর্বে কিছু সময় থাকলেই স্যার এই আমল করার চেষ্ঠা করতেন। কোন দিন এশার আগে সম্ভব না হলে এশার পর পরেই পরে নিতেন। রাজশাহীতে থাকাকালীন, সফরে থাকাকালীন, বয়ান মজমা এস্তেমার ব্যাস্ততার মধ্যেও স্যারকে এই আমলের বড় এহতেমাম করতে দেখেছি। প্রথম রাকাতে সেজদা দেখে বুঝতাম স্যার এই দুই সূরার আমল করছেন। সফর তাকাজা বয়ান ইত্যাদির কারণে এশার পর পরেই সম্ভব না হলে শোবার পূর্বে অবশ্যই পড়ে শুতেন। সফরে চলন্ত সওয়ারীতে ট্রেনে, প্লেনে স্যারকে এই আমল করতে দেখেছি। কাজল ভাইয়ের বাসায় বহু দিন রাতে শোবার পূর্বে স্যারকে এই আমল করতে দেখেছি।
১০০. স্যার একবার এক মোজাকারায় বলেন, মানুষ প্রতি মুহুর্তে পরিবর্তন…
স্যার একবার এক মোজাকারায় বলেন, মানুষ প্রতি মুহুর্তে পরিবর্তন হতে থাকে, ঈমান বাড়ে ও কমে, বৃদ্ধি পায় আবার হ্রাস পায়। الإيمان يزيد وينقص এক মুহুর্তের আগের এক ব্যক্তি এবং এক মুহুর্তের পরের এক ব্যক্তি এক নয়, তার সম্পূর্ণ সেল (রক্তের সেল) পরিবর্তন হয়ে যায়। একজন লোক নামাজ পড়লো, নামাজ পড়ার আগের ঐ ব্যক্তি এবং নামাজ পড়ার পরের ঐ ব্যক্তি যদি এক হয়, ওলামারা বলেন যে নামাজ থেকে ঐ ব্যক্তি ফায়দা পায়নি। আল্লাহ ওয়ালাদের এরকম কথা পাওয়া যায়, যে কারো তিন দিন যদি একই অবস্থার মধ্যে যায় তবে সে ধংসের মধ্যে আছে। তিন দিনের মধ্যে যেনো তার কিছুটা পরিবর্তন হয় (ঈমান বাড়ে)। গত পরশুর ফজরের নামাজ, গত কালের ফজরের নামাজ ও আজকের ফজরের নামাজ যদি এক হয়, তবে ও গাফলতের মধ্যে আছে। মানুষ পরিবর্তনের মধ্যে থাকবে, বাড়ার মধ্যে থাকতে হবে।
← আগের পর্ব (৬১–৮০) | সূচিপত্র | পরের পর্ব (১০১–১২০) →
সংগ্রহ ও সংকলন: মুশফিক আহমদ (রহঃ)-এর মালফুযাত সংকলন।
