|

মালফুযাত – প্রফেসর মুশফিক আহমদ (রহঃ) – পর্ব ৯: ১৬১–১৮০

প্রফেসর মুশফিক আহমদ (রহঃ)-এর বয়ান, পরামর্শ, আমল ও দাওয়াতি জীবনের মালফুযাত, ১৬১ থেকে ১৮০ নম্বর। সম্পূর্ণ সূচিপত্র দেখুন।

সংগ্রহ ও সংকলন: মুশফিক আহমদ (রহঃ)-এর মালফুযাত সংকলন।

এই পর্বে যা আছে


১৬১. সফরে মদিনায় পৌঁছানোর পর, হারাম শরিফে (মসজিদে নববী) জিয়ারতে…

সফরে মদিনায় পৌঁছানোর পর, হারাম শরিফে (মসজিদে নববী) জিয়ারতে যাওয়ার পূর্বে বাসায় স্যার সাথীদের নিয়ে কিছু মুযাকারা করেন। মুযাকারার এক প্রসঙ্গে স্যার বলেন, হারাম শরিফের দেয়ালে সূরা মুহাম্মদ সম্পূর্ণ লেখা আছে। মদিনায় অবস্থানকালীন, হারাম শরিফে দৈনিক সূরা মুহাম্মদ তেলাওয়াত করা যায়, তা খুব ভালো হবে।

১৬২. একদিন নামাজের পরে স্যার মসজিদে নববীতে বসে ছিলেন। আমি…

একদিন নামাজের পরে স্যার মসজিদে নববীতে বসে ছিলেন। আমি স্যারের পাশে বসে হারাম শরীফের কোনো এক এন্তেজামের দায়িত্বে থাকা জিম্মাদার ব্যক্তির দাঁড়ি না থাকার বিষয়টি স্যারকে এভাবে বললাম যে, “উনাকে দেখলাম একেবারে ক্লিন শেভ।” স্যার আমার কথা শুনে আমার দিক থেকে মুখ অন্যদিকে ফিরিয়ে নিলেন। স্যারের চেহারায় একটু বিরক্তির ভাব ছিল, গম্ভীর মনে হচ্ছিল। তিনি আমার কথার প্রসঙ্গে কোনো কিছু বললেন না, একেবারে চুপ থাকলেন। স্যারের এই নীরবতা, গম্ভীরতা এবং আমার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া—এসব দেখে আমার মনে হলো, তিনি যেনো আমাকে এই উত্তরই দিলেন: “তুমি কি এসব দেখতে এখানে এসেছো? এর দ্বারা তোমার লাভ বা ক্ষতি কী? তুমি বরং নিজের চিন্তা করো।”

১৬৩. একদিন মসজিদে নববীর মূল অংশের ঠিক উত্তরে—যেখানে ওপরে তাবু…

একদিন মসজিদে নববীর মূল অংশের ঠিক উত্তরে—যেখানে ওপরে তাবু, ছাদ নাই- স্যারের সঙ্গে বসে ছিলাম। আমার খুব ইচ্ছে হচ্ছিল স্যারের সঙ্গে রিয়াজুল জান্নাতে যাই। কিন্তু সরাসরি স্যারকে বলার সাহস হচ্ছিল না। তখন রিয়াজুল জান্নাত সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল, কোনো রেজিস্ট্রেশনের প্রয়োজন ছিল না। ইচ্ছা হলে যতবার খুশি রিয়াজুল জান্নাতে কিংবা আসহাবে সুফফার অংশে যাওয়া যেত। তবে ভিড় অনেক হতো। দায়িত্বশীলরা একটু পরপর জিকির তেলাওয়াতে মশগুল মানুষদেরকে অনুরোধ করতেন বের হয়ে যেতে, যাতে অন্যরাও সুযোগ পান। সরাসরি না বলে আমি ইচ্ছেটা ঘুরিয়ে জানানোর চেষ্টা করলাম। সেখানের ফজলত টা স্যারের কাছে এভাবে জিজ্ঞেস করি — “আমার ঘর (রওজা) ও মিম্বরের মধ্যবর্তী জায়গাটি জান্নাতের বাগানসমূহের একটি বাগান… এরকম কিনা?” স্যার দেরি না করে সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিলেন— ”হাঁ ঠিক, তবে ওই বাগান থেকে যদি বের হয়ে যায়, সেখান থেকে যেনো বের না হয়!” মনে হচ্ছিল এই ছোট্ট কথা দিয়ে স্যার সম্পূর্ণ জীবনের নিয়ত কে শেখাচ্ছেন, ছোট্ট বাক্যে যেন জীবনের নিয়ত শেখানো হচ্ছিল। জান্নাতে যে প্রবেশ করবে, সে আর বের হবে না। স্যারের কথাটুকু শুধু জায়গাটির ফজিলতের প্রতি ইঙ্গিত ছিল না, ছিল জান্নাতি জীবনের আকাঙ্ক্ষার এক গভীর আত্মিক প্রেরণা, মনে হচ্ছিল এক চিরস্থায়ী আত্মিক নিয়ত শেখাচ্ছেন স্যার, আল্লাহর নৈকট্য একবার পেলে আর তা যেন হারিয়ে না যায়। জান্নাতি অবস্থান থেকে আর যেন বের না হও, জান্নাতের কোনো গেট যখন খুলে যায়, তখন আর ফিরে যেতে না হয়। এমন নিয়ত করে নেয়া যেন এমন কোনো কাজ না হয়, যা সেই জান্নাতি অবস্থান থেকে সরিয়ে দেয়। (স্যার হয়তো বলতে চেয়েছিলেন, রিয়াজুল জান্নাহ শুধু একটি স্থানের নাম না, একটি আত্মিক অবস্থান, একটি চিরকালের গন্তব্যের ক্ষণিক স্বাদ। এখান থেকে এমন নিয়ত হয়ে যায়, যার দ্বারা আল্লাহর অসন্তুষ্টিমূলক কোনো কাজ আর না হয়, কখনোই এমন কিছু না করে যা সেই জান্নাতি অবস্থান থেকে সরিয়ে দেয়)।

১৬৪. স্যারের সাথে যতবার রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর রওজা…

স্যারের সাথে যতবার রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর রওজা মোবারক জিয়ারতের জন্য যাওয়ার সুযোগ আল্লাহ পাক দিয়েছেন, প্রত্যেকবার একই অবস্থা দেখেছি। বাবুস্‌সালাম দিয়ে প্রবেশের আগেই স্যার খুব ছোট ছোট কদমে, ধীরে ধীরে অগ্রসর হতেন। মুখে বিশেষ কোনো তাসবীহ বা দোয়া উচ্চারণ করতে দেখেছি মনে পরে না, তবে চেহারায় এক ধরনের পরিবর্তন দেখা যেত—মনে হতো, সে মুহূর্তে উনি আমাদের কাউকে চিনেন না। হুজুরের মিম্বার অতিক্রম করে যতই সামনে অগ্রসর হতেন, ততই স্যারের চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ত এবং অনেকটা শিশু বাচ্চার মতো বেচাইন হয়ে উঠতেন। আঁ আঁ ধরনের কান্নার শব্দ ক্রমে বাড়তে থাকত। কখনও কখনও মনে হতো, স্যারের বুক ধড়ফড় করে নিঃশ্বাস গলার কাছে এসে আটকে যাচ্ছে—বড় বড় নিঃশ্বাস ফেলতেন। রওজা মোবারক যত কাছে হতো, ততই এই উ উ আঁ আঁ কান্না আরও প্রবল হতো। কখনো কখনো মুখ গুঁজে কান্নার শব্দ শোনা যেত। রওজার সামনে সাধারণভাবে বা জোরে সালাম দিতে দেখেছি—এমনটা মনে পড়ে না। খুব আস্তে, অথবা কাঁদতে কাঁদতে বাচ্চারা যেভাবে কথা বলে ওই স্বরে সালাম দিতেন। কখনও কখনও কান্নার হিসকির মাঝেই সালাম দিতেন—বোঝাই যেত না। রওজা মোবারক পার হয়ে যত সামনে অগ্রসর হতেন, কান্নাও তত বেড়ে যেত। ভিড় কম থাকলে, কখনও রওজার দক্ষিণ-পূর্ব কোণায় দাঁড়ানোর সুযোগ পেলে সেখানে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে যেতেন, যতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব হতো থাকতেন, রওজার দিকে চোখ না তুলে নিচের দিকে তাকিয়ে থাকতেন, চোখ দিয়ে পানি গড়াতে থাকত। কখনো কখনো সেখানে হাত তুলে দোয়া করতেন, দোয়ার মধ্যেই কখনও হিসকির সাথে, কখনও গলা চেপে কান্না করতে থাকতেন। রওজার গেট দিয়ে বের হওয়ার সময়ও সেই কান্না—উঁ উঁ করে বাচ্চার মতো হেসকির সঙ্গে চলতে থাকত। রওজা মোবারক থেকে বের হওয়ার পরেও অনেকক্ষণ পর্যন্ত কাঁদতে থাকতেন। এর ব্যতিক্রম কখনো দেখিনি। রওজা মোবারক থেকে বের হওয়ার পর সেসময়ে যদি জান্নাতুল বাকী খোলা থাকত, তবে সেখানে জিয়ারতের উদ্দেশ্যে যেতেন। কখনো কখনো স্যারের কান্না হাঁটতে হাঁটতে জান্নাতুল বাকী পর্যন্তও চলতে থাকত। কি এক চাহিদা, কি এক ব্যথা, কত আবেগ, কি এক সম্পর্ক, কত গভীর ভালোবাসা স্যারের সেই কান্নার মধ্যে প্রকাশ পেত—যেসব ভাই স্যারের সঙ্গে জিয়ারতে গিয়েছেন, সবাই তা নিজ চোখে দেখেছেন।

১৬৫. ভাই ডাক্তার সফিউল্লাহ সাহেব (নওগাঁ) বলেন, এমবিবিএস সম্পন্ন করার…

ভাই ডাক্তার সফিউল্লাহ সাহেব (নওগাঁ) বলেন, এমবিবিএস সম্পন্ন করার পর স্যারের কাছে পরামর্শ চেয়ে বললাম, স্যার, আমাদের অনেক বন্ধু ব্র্যাক-এ ভালো বেতনে চাকরি করছে। ব্র্যাক-এর হেলথ সেক্টর আছে, তারা হেলথ সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রোগ্রামে কাজ করছে। বড় এনজিও, বেতনও অনেক ভালো। ওদের কিছু সার্কুলার বা অফার আছে—চাকরিতে আবেদন করব কি না, বা জয়েন করব কি না, সে বিষয়ে। স্যার আমার কথা শুনে বললেন, শোনো, এতটুকু তো বোঝা থাকা দরকার তোমাদের, কিছু প্রশ্ন আছে, যা করাটাই অনুচিত—সব প্রশ্ন করা যায় না। তোমাদের তো কিছু ব্যাপার জিজ্ঞাসা না করেই জানা থাকা উচিত। এনজিওরা এই দেশে দুইটা প্রজেক্ট নিয়ে মাঠে নেমেছে: এক, সুদকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করা; আরেক হলো মুসলমানদের মেয়েদের ঘর থেকে বের করা। এই দুইটা টার্গেট নিয়ে বিভিন্ন প্রজেক্টে মাঠে নেমেছে ওরা, ওরা ওদের এই টার্গেট বাস্তবায়নের কাজ করে চলছে। এখন তুমি ওদের সঙ্গে কাজ করতে যাবে কিনা, এই ব্যাপারে পরামর্শ চাওয়াও তো ঠিক না।

১৬৬. ভাই ডা. শফিউল্লাহ বলেন, এর কিছুদিন পর স্যারের সাথে…

ভাই ডা. শফিউল্লাহ বলেন, এর কিছুদিন পর স্যারের সাথে বিয়ের ব্যাপারে পরামর্শ করলাম—কোথায় বিয়ে করব, কেমন পরিবার হলে ভালো হয়, পড়াশোনা কেমন হলে ভালো, দীনদারি কেমন হওয়া উচিত, আর আনুষঙ্গিক বিষয়গুলো কেমন হওয়া ভালো, একটা মেয়ে নির্বাচন করতে হলে দীনি এবং দুনিয়াবি দিক থেকে কুফু মেলানোর ব্যাপারে কীভাবে ভাবতে হবে—এসব বিষয়েই আলোচনা করলাম। স্যার বললেন, “এই বিষয়টা নিয়ে অত বেশি চিন্তা করার দরকার নেই। আল্লাহ পাক যেটা মিলিয়ে দেন, মোটামুটি হলেই চলবে। মাকে দেখিয়ে নিও, আব্বা-আম্মাকে সঙ্গে নিয়ে সিদ্ধান্ত নিও।” স্যার আরও যোগ করলেন, “মেয়েরা হচ্ছে বাঁকা হাড়ের তৈরি—এইটাকে সোজা করতে যাওয়া যাবে না। আব্বা-আম্মাকে সঙ্গে নিয়ে মোটামুটি চলবে মনে হলে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিও।” সাথে স্যার একটি দোআও শিখিয়ে দিলেন—হযরত মূসা (আঃ) এর সেই বিখ্যাত দোআ, যা তিনি মাদয়ানের কূপের পাশে বসে আল্লাহর কাছে করেছিলেন: رَبِّ إِنِّي لِمَا أَنْزَلْتَ إِلَيَّ مِنْ خَيْرٍ فَقِيرٌ (হে আমার রব! আপনি আমার প্রতি যে কল্যাণ নাযিল করবেন, আমি তার মুখাপেক্ষী)। স্যার বললেন, “এই দোআটা বেশি বেশি করে পড়তে থাকো।”

১৬৭. একদিন জামাতের সময় না থাকায় হারাম শরীফে না গিয়ে…

একদিন জামাতের সময় না থাকায় হারাম শরীফে না গিয়ে বাসার (হোটেল) নিকটবর্তী মসজিদে নামাজে যাই। জামাতের আগেই পরিচয় হয় সেখানের ইমাম সাহেবের সাথে (বাংলাদেশী, এবং বাংলাদেশের নামকরা এক কওমী মাদ্রাসার ছাত্র ছিলেন), জামাতের একামত সংক্ষিপ্তভাবে (প্রথমে আল্লাহু আকবার ২ বার, আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ১ বার আশহাদু আন্না মুহামম্মাদার রসুলুল্লাহ ১ বার এভাবে) ইমাম সাহেব নিজেই দিলেন, নামাজ পড়ালেন যা হানাফী ধারা অনুসরনে মনে হলো না। নামাজের পর আমি স্যারকে বললাম, ইমাম সাহেব …… মাদ্রাসার ছাত্র, আর ঐ মাদ্রাসায় পড়াশুনার পরতো লা-মাজহাবি হবার কথা না, নিশ্চয়ই হানাফী হবার কথা? স্যার বললেন, হ্যাঁ, এখানে (মক্কা শহর/ সৌদি আরব) বাংলাদেশি এবং আরাকানি অনেক আলেম ও ইমাম—তারা নিজেদের হানাফি মাজহাব ছেড়ে দিয়ে “সালাফি” (লা-মাজহাবি) হয়েছেন শুধুমাত্র চাকরি টিকিয়ে রাখার জন্য (যেখানে স্থানীয়ভাবে সালাফী ধারা বেশি প্রচলিত, সেখানে ইমাম, মুয়াজ্জিন বা ধর্মীয় কাজে নিযুক্ত হতে গেলে হানাফী মত বা অন্যান্য মাজহাব অনুসরণের ক্ষেত্রে চাপ পড়ে, যদি তারা হানাফি পদ্ধতিতে ইমামতি করেন, বা হানাফী মাসয়ালা মতো আমল করেন, তাহলে চাকরি চলে যাওয়ার ভয় থাকে)। কেউ স্বেচ্ছায়, কেউ আবার চাপে পড়ে আকীদা ও আমলের ব্যাপারে নমনীয়তা দেখাতে গিয়ে ধীরে ধীরে একেবারে ধারা পরিবর্তন করে ফেলেন। এধরণের অবস্থান দ্বীলকে ভেতর থেকে ফাঁপা করে দেয়। প্রথমে ফিকহী নমনীয়তা, পরে আকীদাগত স্খলন—শেষ পর্যন্ত এমন জায়গায় দাঁড়ায়, যেখানে ধর্ম একটি ‘চাকরি’র অংশ ছাড়া কিছুই থাকে না। স্যার এ আলোচনায় খুব স্পষ্ট করে বললেন, “এই রুচি ও কৃত্তিকলাপ ইমান ধ্বংসের মতো, কখনও কখনও অনেক দূর পর্যন্ত নিয়া যায়”। পরবতীর্তে স্যার একথার এভাবে ব্যাখ্যাও করেন, এই পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি ও ভয়াবহ পরিণতি হচ্ছে শুরুটা হয় ফিকহী বিষয়ে নমনীয়তা দিয়ে, পরে তা আকীদার বিরুদ্ধ অবস্থানে গিয়ে দাঁড়ায়। ধীরে ধীরে আলেমদের প্রতি শ্রদ্ধাহীন হয়ে পড়ে, নিজেকে “সরাসরি কুরআন-হাদীস বুঝি” ভাবতে শুরু করে। ক্রমান্নয়ে ধর্মকে পেশার সাথে মেলাতে গিয়ে দ্বীনের মূল উদ্দেশ্য ও রুহানিয়াত থেকে বিচ্যুত হয়। এই পরিবর্তন দুনিয়াবি সুবিধা অর্জনের লক্ষ্যে হলে তা এক প্রকার কপটতা (নাফাক)-এর রূপ ধারণ করে, পয়সার কাছে বিক্রি হয়ে যায়।

১৬৮. স্যার একবার বলছিলেন, যে অপচয় করে, সে অবশ্যই কৃপণতা…

স্যার একবার বলছিলেন, যে অপচয় করে, সে অবশ্যই কৃপণতা করবে, আর যে কৃপণতা করবে, সে অপচয় করতেও বাধ্য। যে অপচয় করে, সে কৃপণ হবেই, আর যে কৃপণ, সে অপচয়ে লিপ্ত হবেই। নিজের ঘরে দুই লাখ টাকার কার্পেট কিনে বিছাচ্ছে, সেই কার্পেটের ওপর গরিব প্রতিবেশীকে বসিয়ে তার দুঃখের কথা শুনবে না, কারণ সে গরিব—তাকে বসাবে না। অপ্রয়োজনীয় জায়গায় খরচ করা, নিষিদ্ধ জায়গায় খরচ করা হলো অপচয়; ও কার্পেট কিনলো লাখ টাকায় এটা অপচয়, আর গরিব প্রতিবেশীকে একশো টাকা দিতে পারল না—এটা কৃপণতা। বন্ধুর শালার বিয়েতে পাঁচ হাজার টাকা খরচ করবে, কিন্তু ভাগ্নির ছেঁড়া জামা দেখে পাঁচশো টাকা দিয়ে নতুন জামা কিনে দেবে না। অপচয় আর কৃপণতা একে অন্যের ছায়া; অপ্রয়োজনে খরচ করবে, তো সে প্রয়োজনে হাত গুটিয়ে রাখবে, আর যে প্রয়োজনে চোখ বুজে, সে বিলাসিতায় চোখ মেলে থাকবে। গরিব আত্মীয় বা গরিব প্রতিবেশী অসুস্থ— এক কেজি বড়ই বা সাগরকলার একটা ছড়া নিয়ে দেখতে যাবে, কিন্তু ওষুধের টাকাটাও দেবে না। অথচ বউকে নিয়ে যাবে সিঙ্গাপুর ঘুরতে—অপ্রয়োজনীয় ট্যুর, দামি শপিং—সবই চলছে নিয়মিত। যে অপ্রয়োজনীয় জায়গায় খরচ করে, সে প্রয়োজনীয় জায়গায় খরচ করতে পারবে না—সে কৃপণ হবে, কৃপণতা করবেই। আর সঠিক জায়গায় খরচ না করলে? তার টাকাতো আছে—সে খরচ করবেই, খরচ করবে ভুল জায়গায়, খরচ হয়ে যাবে বেজায়গায়। লাখ টাকার চাকরি করে, পকেট যে একদম খালি এমন না, গাড়ি-বাড়ি আছে, কিন্তু যে খালা, যে ফুপু কোলে করে বড় করেছে, উনার হাতে তুলে দেয় পঞ্চাশ টাকা—আর নিজেকে ভাবে বড় দানবীর! বড় খোঁজ-খবর লেনেওয়ালা! আমাদের এই কৃপণতা কোথায় গিয়ে ঠেকেছে—বড় দুঃখ আর বেদনাভরা কণ্ঠে কথাগুলো বলেছিলেন স্যার।

১৬৯. হজরত ইলিয়াস রহমতুল্লাহি আলাইহির শেখ (হজরত মাওলানা খলীল আহমদ…

হজরত ইলিয়াস রহমতুল্লাহি আলাইহির শেখ (হজরত মাওলানা খলীল আহমদ সাহারানপুরী) এসেছেন দিল্লিতে। তিনি অবস্থান করছিলেন নিজামুদ্দিন থেকে দুই ক্রোশ (চার মাইল) দূরে। ওই সময় হজরত ইলিয়াস রহমতুল্লাহি আলাইহি এতটাই অসুস্থ ছিলেন যে উনার জন্য নিজামুদ্দিনের দোতলা থেকে নিচে নামা নিষেধ ছিল, তিনি এতটাই দুর্বল ছিলেন। সেই অবস্থায়, কোনো এক ফাঁকে কাউকে কিছু না বলে তিনি হেঁটে চার মাইল দূরে উনার শেখের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যান। স্যার এক মোযাকারায় এই ঘটনা উল্লেখ করে বলেছিলেন— উনারা উনাদের জীবনকে সর্বোচ্চভাবে ব্যবহার করেছেন। স্যার তখন দুইটি ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করেন: “Maximum Utilize”। স্যার বলেন, ”উনারা উনাদের জীবনের ম্যাক্সিমাম ইউটিলাইজ করেছেন।” এ প্রসঙ্গে স্যার একটি দৃষ্টান্ত দেন, যেমন আখের রস বিক্রেতা রস বের করার জন্য আখকে মেশিনে ঢুকিয়ে চিপে রস বের করেন। একবার চিপে বের করার পরও সে আবার সেটিকে মেশিনে ঢোকায়। এভাবে দু’বার, তিনবার, চারবার, পাঁচবার— যতক্ষণ না এক ফোঁটা-দুই ফোঁটা রসও বের হওয়া বন্ধ হয়, ততক্ষণ সে আখটিকে ভাঁজ করে আবার মেশিনে চিপে যায়, দুইভাজ করে দেয় চারভাজ করে দেয়, শেষ পর্যন্ত আখের মধ্যে আর কোনো রস না থাকা পর্যন্ত সে তা করে যায়। ঠিক তেমনভাবেই, হজরতরা উনাদের জীবনের সব রস— সময়, মেধা, অর্থ, সম্পদ, চিন্তা, শরীরের শক্তি, দেমাগের শক্তি, দীলের শক্তি— সবকিছু দীনের ময়দানে ঢেলে দিয়েছেন। জীবনের কোনো ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষা তারা বাকী রাখেননি, উনাদের জীবনের প্রতিটি অংশ, প্রতিটি সম্ভাবনা উনারা দ্বীনের খেদমতে সর্বোচ্চভাবে ব্যবহার করেছেন, Maximum Utilize করেছেন।

১৭০. ইসলামিক ফাউন্ডেশনের অফিসার মাজহারুল মান্নান ভাইয়ের ট্রান্সফারের বিষয়টি অনেক…

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের অফিসার মাজহারুল মান্নান ভাইয়ের ট্রান্সফারের বিষয়টি অনেক দিন ধরেই ঝুলে ছিল। বিগ্রেডিয়ার (অব.) মোসাহেদ চৌধুরী ২০০৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করলে, উনি স্যারের কাছে পরামর্শ চান, মোসাহেদ চৌধুরী সাহেবের কাছে ট্রান্সফারের জন্য সুপারিশ করতে যাবেন কি না। স্যারের সঙ্গে মোসাহেদ সাহেবের অনেক দিনের পরিচয় ও ভালো সম্পর্ক ছিল। তাছাড়া তাবলিগের মেহনতের সুবাদে মাজহারুল মান্নান ভাইয়ের সাথেও উনার পূর্বপরিচয় ছিল। স্যার তখন মাজহারুল মান্নান ভাইকে বলেছিলেন, “সুপারিশ তো দূরের কথা, উনাকে এগিয়ে গিয়ে সালাম পর্যন্ত দেবে না, এখন এটাও ঘুষ। কাকরাইলে উনি যেদিকে ওজু করবেন, তুমি অন্যদিকে ওজু করবে যেনো হঠাৎ তাকানো ও দেখা সাক্ষাৎ না হয় (মাশওয়ারা, শবগুজারি ইত্যাদিতে দেখা হবার সম্ভাবনা থেকেও বিরত থেকো)।”

১৭১. সায়ীদ আবুবকর ভাইয়ের বিসিএসের প্রথম পোস্টিং হয় ঝিনাইদহ জেলার…

সায়ীদ আবুবকর ভাইয়ের বিসিএসের প্রথম পোস্টিং হয় ঝিনাইদহ জেলার হরিণাকুন্ডু উপজেলায় অবস্থিত লালন শাহ সরকারি কলেজে। একে তো ছোট কলেজ, উপজেলা পর্যায়ে অবস্থিত, তার উপর দীর্ঘদিন ধরে কোনো ট্রান্সফার হচ্ছিল না। মনে হচ্ছিল, একটু বড় শহরের ভালো কোনো কলেজে গেলে ভালো লাগতো। একসাথে যোগদান করা কলিগদের অনেকেই উনার সামনে বিভিন্নভাবে যোগাযোগের মাধ্যমে ভালো কলেজে ট্রান্সফার নিয়ে নিয়েছে। এক সময় স্যার ঝিনাইদহে উনার বাসায় গেলে স্যারকে জানান, “স্যার, ছোট কলেজ, অনেকদিন হয়ে গেল, ভালো লাগছে না, অনেকেই এর মধ্যে ভালো ভালো কলেজে ট্রান্সফার নিয়ে নিচ্ছে।” স্যার তখন উনার কথার জবাবে প্রশ্ন করেন, “ওরা কি তোমাকে বেতন কম দেয়?” সায়ীদ ভাই বললেন, “না, বেতন তো কম দেয় না।” তখন স্যার বললেন, “আল্লাহ পাক যেখানে সহজে রিজিকের ব্যবস্থা করে রেখেছেন, সেখানেই থাকো।”

১৭২. এক সফরে মদীনা মুনাওয়ারায় কিছুদিন আমাদের এক ভাই বিথুন…

এক সফরে মদীনা মুনাওয়ারায় কিছুদিন আমাদের এক ভাই বিথুন ভাইয়ের বাসায় থাকা হয়েছিল। মসজিদে নববী (হারাম শরীফ) থেকে বাসাটি বেশ দূরে ছিল— ‘তারিক আল-আয়ুন’ বা ‘তরিখে আইয়ুন’ এলাকার ওই বাসা থেকে হেঁটে হেঁটে হারাম শরীফে আসতে ২৫ থেকে ৩০ মিনিট লেগে যেতো। বাসা থেকে হারাম শরীফে নামাজ আদায়ের উদ্দেশ্যে পায়ে হেঁটে যাতায়াতের জন্য যথেষ্ট আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়ে বের হতে হতো। তীব্র রোদের ভেতর মাঝে মাঝে আমি গাড়িতে উঠতে চাইলে স্যার কখনো নিষেধ করতেন না, তবে নিজে কখনো গাড়িতে উঠতেন না; কষ্ট করে হেঁটেই যেতেন। স্যারের এই পায়ে হাঁটার দৃঢ় অভ্যাস আমাদের মাঝেও এক ধরনের প্রেরণা জাগিয়ে তুলত—আমরাও তখন আর গাড়িতে উঠতাম না। একদিন স্যার কিছুটা অসুস্থ ছিলেন, আমরাও ক্লান্ত। জোহরের নামাজের জন্য আগেভাগেই আমি নিচে নেমে গাড়ির ব্যবস্থা করে রাখি, রোদ আর ক্লান্তি এড়াতে একটু আরামেই যেন হারামে পৌঁছানো যায়—এই চিন্তা থেকেই। ভাবলাম, স্যার গাড়ি দেখে নিশ্চয়ই কিছু বলবেন না, গাড়িতে উঠেই যাবেন। কিন্তু স্যার নিচে নেমে গাড়ির দিকে একবার তাকালেন, আমাকে গাড়ির দরজা খুলে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কিছু না বলেই সোজা রাস্তা ধরে হাঁটা শুরু করলেন। প্রথমে বুঝতেই পারিনি—স্যার তো হাঁটতেই শুরু করে দিয়েছেন! যখন দেখলাম স্যার বেশ খানিকটা এগিয়ে গেছেন, আমি গাড়িওয়ালাকে বিদায় দিয়ে স্যারের পিছু পিছু হাঁটা ধরলাম। সেই মুহূর্তে এক গভীর শিক্ষা হৃদয়ে গেঁথে গেল—হারামে নামাজ পড়তে যাওয়া যেন স্যারের কাছে শুধু ইবাদত নয়, তা যেন এক আত্মশুদ্ধির সফর। কষ্ট করে হাঁটার মাধ্যমেই যেন স্যার সেই সফরকে পূর্ণাঙ্গ করে তুলতেন। এরপর ওই সফরে আর কখনো স্যারকে গাড়িতে যাওয়ার প্রস্তাব দিইনি, এমনকি নিজেও আর গাড়ির কথা ভাবিনি। স্যারের পেছনে পেছনে হেঁটেই হারামের পথে যাত্রা করতাম।

১৭৩. স্যার একবার বলেছিলেন, অনেক সময় স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে তালাক হয়…

স্যার একবার বলেছিলেন, অনেক সময় স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে তালাক হয় যার বাহ্যিক কারণ হিসেবে নানা কিছু বলা হয়—রান্নায় অদক্ষতা, কথাবার্তায় সৌজন্যের অভাব, শাশুড়ির সাথে বিরোধ, সব কিছু বলে বলে করাতে হয় ইত্যাদি। কিন্তু বাস্তবে এগুলো মূল কারণ নয়। বিচ্ছেদের আসল শিকড় থাকে অনেক গভীরে—মন ও অন্তরের সূক্ষ্ম অমিল ও অসন্তোষে, যা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রকাশ পায় না, এমনকি ভুক্তভোগী নিজেও তা স্পষ্ট বুঝতে বা বলতে পারে না। ধীরে ধীরে মনে জমে থাকা বিরক্তি, ক্লান্তি আর মানসিক দূরত্ব সম্পর্ককে ভেঙে দেয়। দৃশ্যমান সব অভিযোগের আড়ালে লুকিয়ে থাকে অন্য গভীর ও অজানা অস্বস্তি, অন্তরের সেই গহীন কোণে, যেখানে ভাষা হয়তো পৌঁছাতে পারে না, যুক্তিতর্ক কাজ করে না, সেই কারণটুকু স্বয়ং ভুক্তভোগীও অনেক সময় সম্পূর্ণরূপে উপলব্ধি করতে পারে না। বাহ্যিক আচরণ ও অভিযোগগুলো ওই গভীর সমস্যার ক্ষুদ্র বহিঃপ্রকাশ। স্যার বুঝাতে চেয়েছিলেন, সম্পর্কের সমস্যা বোঝার জন্য কেবল বাহ্যিক দোষের দিকে তাকানো যথেষ্ট নয়; দরকার অন্তরের গভীরে কী ঘটছে তা অনুভব করার চেষ্টা। সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে শুধু দায়িত্ব পালন নয়, হৃদয়ের আন্তরিক সম্পর্ক, সহমর্মিতা ও বোঝাপড়া জরুরি। কোনো টানাপোড়েন বা বিচ্ছেদ দেখলে তার বাহ্যিক কারণগুলোকে একমাত্র সত্য না ধরে সংবেদনশীল মন দিয়ে ভেতরের অজানা অস্বস্তি, অব্যক্ত কষ্টগুলো বোঝার চেষ্টা করতে হয়। বাহ্যিক উপসর্গ নয়, ভেতরের ব্যথার মূল উৎস খুঁজে বের করতে পারলে সমাধানের পথ পাওয়া সহজ হয়।

১৭৪. একদিন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে স্যার বসেছিলেন। এক ছাত্র…

একদিন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে স্যার বসেছিলেন। এক ছাত্র এসে বলল, স্যার, লেখাপড়ায় মন বসে না। অনেক চেষ্টা করছি, কিন্তু কিছুতেই মনোযোগ দিতে পারছি না, কী করবো? ঐ ভাইয়ের কথা শুনে স্যার বললেন, “মন বসানোর মূল বিষয় হলো আখেরাত, আখিরাতের চিন্তা। তোমার নামাজ সুন্দর হবে, নিয়মিত কুরআন তেলাওয়াত করতে থাকবে, তাসবিহ—তাহলীলের প্রতি যত্নবান হবে, তো দ্বীল প্রশান্ত হবে। সামনে কবর আছে, কিয়ামতের ময়দানে আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে হবে, জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের হিসাব দিতে হবে আল্লাহ সামনে দাড়িঁয়ে। নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে সেই দিনের জন্য, এই ভাবনাগুলোতে মনকে বসানো, দ্বীল লাগানো, মনোযোগ স্থির করা। আসল মনোযোগ বসবে এই আখিরাতের চিন্তায়, আমলের চিন্তায়। বাকি লেখাপড়া করতে হয় করবা, পড়াশুনা করার জন্য এখানে এসেছো, করে নিবা, আল্লাহ পাক তাতেই বরকত দান করবেন ইনশাআল্লাহ (এটা দ্বীল লাগানোর বিষয় না, বা এতে আলাদা করে মন বসানোর কিছু নেই)।”

১৭৫. একবার স্যার বলেছিলেন—“ইয়াকুব নানুতুবী রহমতুল্লাহি আলাইহি (সম্ভবত এই নাম…

একবার স্যার বলেছিলেন—“ইয়াকুব নানুতুবী রহমতুল্লাহি আলাইহি (সম্ভবত এই নাম বা অন্য কোন বুজুর্গের কথা) কখনো অসুস্থ হলে ডাক্তারের কাছে যেতেন, ডাক্তার যখন ওষুধের প্রেসক্রিপশন দিতেন, তখন তিনি ওষুধের দাম জেনে নিতেন এবং সেই পরিমাণ অর্থ সদকা করে দিতেন।” এরপর স্যার বললেন—এখানে একটা ‘মাপ’ আছে— ‘ঐ পরিমাণ অর্থ’ (চিকিৎসা যত খরচসাপেক্ষ, সদকার পরিমাণও যেন সে অনুযায়ী হয়)। এই প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে স্যার আরও বলেছিলেন—“প্রফেসর নাদের আলী খান সাহেব—এর কাছে কেউ একবার বিশেষ এক অবস্থার কথা বলছিলেন এবং বললেন, ‘আমি এই পরিমাণ জিকির করি এই ব্যাপারে।’ তখন তিনি শুনে বললেন— এই পরিমাণ হলে চলবে না, আরেকটু বাড়াতে হবে (এই পরিমাণ জিকির ঐ পরিস্থিতি কভার করবে না)।” স্যার বলেন—প্রত্যেকটা বিষয়ে একটা নির্দিষ্ট ‘মাপ’ আছে। কেউ যদি সাত লাখ টাকার চিকিৎসা করে, আর সদকা করে মাত্র সাত টাকা— আবার বলে, ‘সাআআআত টাকা সদকা ও তো করলাম!’ এই মাপ তো যথেষ্ট হলো না। ছদকার এক্বিন পয়দা করার জন্য মাপকে তো ঠিক করতে হবে, স্যার বলেন ৭ লাখ টাকা ছদকা করে ৭ টাকার ঔষধ কিনতে যাই দেখি কি হয় (যখন সাত লাখ টাকা সদকা করে আর সাত টাকার ওষুধ কেনে, তখনই সেই সদকার প্রকৃত শক্তির প্রতি এক্বিন প্রকাশ পায়)!

১৭৬. হজের এক সফরে আমাদের জামাতে থাকা এক সাথী একটি…

হজের এক সফরে আমাদের জামাতে থাকা এক সাথী একটি অদ্ভুত এবং উদ্বেগজনক অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হন। সফরের বিভিন্ন পর্যায়ে, কখনো ব্যাগের ভেতর, কখনো ব্যাগের পকেটে, কখনো জামার পকেটে, আবার কখনো বালিশের নিচে কিংবা কোনো কিছু সরানোর পর — তিনি দেখতে পান মেয়ে মানুষের লম্বা চুলের গুচ্ছ বা চুলের পুটলি। বার বার এরকম পাওয়ার পর বিষয়টি তার কাছে খুবই অস্বাভাবিক মনে হলেও, কারো সঙ্গে তা বলেননি, নিজে নিজে বিস্মিত ও আতঙ্কিত হয়ে প্রতিবারই তা ফেলে দিতেন। মিনায় অবস্থানকালে, একদিন তাবুর ভেতর নিজের বিছানার পাশে, আবারো বালিশের নিচে চুলের সেই একই ধরণের গুচ্ছ আবারো দেখতে পেয়ে তার উদ্বেগ বাড়ে, এবারও সে তা বাইরে ফেলে দেয়। এরপর যখন মিনার আমল শেষ করে সবাই মক্কায় ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন তিনি ব্যাগ গোছানোর সময় একইভাবে ব্যাগের ভেতর, ব্যাগের পকেটে ও বিছানার নিচে আবার চুলের দলা দেখতে পান। এবার আর চুপ থাকতে না পেরে বিষয়টি স্যারের সঙ্গে শেয়ার করেন। স্যার গভীর মনোযোগ দিয়ে তার কথা শোনেন, সেই ভাই নিশ্চিত করে বলেন, এই ব্যাগ আমি উপুড় করে সব কিছু বের করেছিলাম, যেখানে এসব থাকার কথা না, সেখানে বারবার এভাবে চুল পাওয়া অস্বাভাবিক। আমাদের সারির তাবুগুলো পুরুষদের জন্য নির্ধারিত, সেখানে কোনো নারীর প্রবেশের সুযোগই ছিল না—এমন অবস্থায় এই চুলগুলো কোথা থেকে আসছে, তা ভাবনার বিষয়। এ কথা শুনে স্যার কিছুক্ষণ চুপ থাকেন, যেহেতু জামাতের অনেকেই তখন মক্কা রওনা হয়ে গিয়েছিলেন, বাকি সাথীরাও তাড়া দিচ্ছিলেন রওনার জন্য, কিন্তু স্যার তাদের অনুমতি দিয়ে নিজে ওই ভাইয়ের সঙ্গে থেকে যান। আমরা আরও ৪—৫ জন স্যারের সঙ্গে থেকে যাই। স্যার ওই ভাইকে বললেন, “চুলের এই দলাগুলো তাবুর বাইরে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় রাখো।” এরপর তিনি নিজে পাশে বসে দীর্ঘ সময় ধরে নীরবে কিছু দোআ পড়তে থাকেন। তিনবার এভাবে দোআ পড়ে চুলগুলো এপিঠ—ওপিঠ করে একটা কাঠি দিয়ে নিজ হাতে উল্টিয়ে উল্টিয়ে তাতে ফুঁ দেন। তারপর আগুন ধরিয়ে সেগুলো পুড়িয়ে দেন। স্যার কোনো তাড়াহুড়া না করে, একজন সাথীর অজানা ও অদৃশ্য সমস্যার প্রতি যে আন্তরিকতা ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেন, তা আমাদের হৃদয়ে গভীর ছাপ রেখে যায়, ঐ ভাইয়ের ঐ পরিস্থিতিকে স্যার হালকাভাবে দেখেননি। একজন সাথীর একান্ত সমস্যাকে অবহেলা না করে, বরং যথাসম্ভব সময় নিয়ে, সতর্কতা ও নিরবতায়, দোআ পরেন, দীর্ঘ সফরের ক্লান্তি বা মক্কায় ফেরার তাড়াহুড়া স্যারের মধ্যে তখন দেখা যায় নাই। ওই ভাই পরবর্তীতে জানান, এরপর থেকে হজের ঐ সফরের বাকী দিনগুলোতে আর কোনো ঐরূপ চুলের দলা পাইনি, এবং সেই অস্বস্তিকর, আতঙ্কের পরিস্থিতিও আর ফিরে আসেনি।

১৭৭. আমাদের এক ভাই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রাবস্থায় বিনোদপুর মির্জাপুর এলাকার…

আমাদের এক ভাই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রাবস্থায় বিনোদপুর মির্জাপুর এলাকার একটি মেসে একা এক রুমে থাকতেন। মেসের রুমে তিনি এক অদ্ভুত এবং ভয়ানক অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হচ্ছিলেন, যা কেবল মানসিক নয়—দেহগতভাবেও তাকে বিপর্যস্ত করে তুলছিল। এক শুক্রবার বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে বসে ঐ ভাই নিজের অভিজ্ঞতা স্যারকে বলতে শুরু করলেন। কয়েক মাস ধরেই এই সমস্যা চলছিল, তবে ইদানীং তা এমন মাত্রায় পৌঁছেছিল যে, রাতে ঘুমানো উনার পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছিল। রুমের দরজা বন্ধ করে শুতে গেলেই, ঘুম ঘুম ভাব আসতে শুরু করলেই তিনি অনুভব করতেন—কোনো এক অজানা সত্তা যেন তার হাত কিংবা পা চেপে ধরছে, এমন শুরু হলে তখন উনি আর চোখ খুলতে পারতেন না। কখনো দুই হাত, কখনো পায়ের গোড়ালির ওপর, আবার কাত হয়ে শোয়া অবস্থায় শরীরের ওপরের হাত বা কনুইয়ের ওপর চেপে ধরে থাকে। উনার বর্ণনায় একটি বিষয় ছিলো খুব স্পষ্ট—তিনি ঠিক অনুভব করতে পারতেন যে, কেউ একজন আছে। মাঝে মাঝে সংকল্প করেন, আজকে তোমাকে ধরবো আর দেখেই ছাড়বো তুমি কে। এক পাশ হয়ে শোয়া থাকা অবস্থায় যখন অজানা সত্তা তার শরীরের ওপর চাপ সৃষ্টি করে, তিনি নিচের হাত দিয়ে কৌশলে তার হাত ধরে ফেলতেন। তিনি বলেন, আমি শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে এত শক্ত করে তার হাত ধরতাম, যেনো সে পালাতে না পারে। আমি অনুভব করতাম আমি কারো মানুষের মতো হাত ধরে ফেলেছি। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, যখনই তিনি ওই অজানা হাতটি ধরতেন, সেটি ধীরে ধীরে বাতাসের মতো, একটি ফোলানো বেলুন থেকে হাওয়া ছাড়ার মতো মিইয়ে গিয়ে উধাও হয়ে যেত। শরীরে প্রচণ্ড কাতুকুতু ও শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা চলত যতক্ষণ না সে তাকে ছেড়ে দিত, সেই মুহূর্তগুলোতে মনে মনে আয়াতুল কুরসী এবং লা হাওলা ওয়ালা কুউওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ পড়তেন, ধীরে ধীরে সে ছেড়ে দিতো ও শরীরের অস্বস্তিকর কাতুকুতু ভাব কমে যেয়ে আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হতো, তখন ঔ ভাই ছোখ মেলতে (দেখতে) পারতেন। কিছুক্ষণের মধ্যে ঘুমের ভাব আসলে চোখ বন্ধ হবার সাথে সাথেই আবারো সে আসতো ও পুনরায় একই অবস্থা হতো। এই অবস্থা দিনে দিনে এত ভয়াবহ রূপ নেয় যে, এক রাতে একাধিকবার—৫, ৬, ৭ বার পর্যন্ত এমন ঘটতে থাকত। ঘুম তখন যেন শত্রু হয়ে দাঁড়ায়। মসজিদে জামাতে বা বন্ধুদের সাথে থাকলে এই সমস্যাগুলো হতো না—শুধু ওই একা ঘরের মধ্যেই তা ফিরে ফিরে আসত। স্যার মনোযোগ দিয়ে সব শুনেন, এবং বিন্দুমাত্র আতঙ্ক বা বিস্ময় প্রকাশ না করে শুধু বলেন, “প্রতি শুক্রবার সূরা কাহাফ তিলাওয়াত শুরু করো, ইনশাআল্লাহ, আল্লাহ পাক হেফাজতের ব্যবস্থা করবেন।”সেদিন ছিল শুক্রবার, সেই দিন থেকেই ওই ভাই নিয়মিত সূরা কাহাফ পড়া শুরু করেন। ভাইটি বলেন, আশ্চর্য হলেও সত্য, এক সপ্তাহের মধ্যেই সেই ভয়ংকর অবস্থা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর থেকে আর কখনো সেই অভিশপ্ত অনুভূতি ফিরে আসেনি। এই ঘটনার পর উনার ভেতরে সূরা কাহাফের প্রতি এমন এক গভীর আস্থা জন্ম নেয় যা কেবল অভিজ্ঞতাজাত, মুখে নয়—হৃদয়ের গভীরে গাঁথা। স্যার যে সেদিন উনার সমস্যার কথা শুনে অবাক হননি, সেটিও ওই ভাইয়ের মনে গেঁথে যায়। তিনি ভাবেন, হয়তো স্যার উনার জন্য গোপনে দোয়া করেছিলেন। কিংবা হয়তো সূরা কাহাফের পাঠ ছিলো এমন এক প্রেসক্রিপশন, যার প্রতি ছিলো স্যারের অবিচল আস্থা, আল্লাহ পাকের ইচ্ছাতে সেটাই হয়ে ওঠে পরিপূর্ণ প্রতিকার।

১৭৮. এক ভাই বিদেশ থেকে পড়াশুনা শেষে ফিরে আসার সময়…

এক ভাই বিদেশ থেকে পড়াশুনা শেষে ফিরে আসার সময় একটি ব্যবসা শুরু করেন। আল্লাহর রহমতে শুরুতেই তিনি প্রায় ৫০ লাখ টাকার লাভ করেন। এমন অপ্রত্যাশিত লাভে তিনি কিছুটা হতবিহ্বল হয়ে যান—এতো টাকা নিয়ে তিনি কী করবেন বুঝে উঠতে পারছিলেন না। সেই সময় টঙ্গী ইজতেমায় বিদেশিদের একটি টেন্টে ভাইয়ের দেখা হয় স্যারের সঙ্গে। তিনি স্যারকে বললেন, “স্যার, আমি প্রথম ব্যবসা করলাম, আর প্রথম ধাপেই ৫০ লাখ টাকা লাভ হলো, এত টাকা একসাথে হাতে পেয়ে বুঝতে পারছি না কী করবো।” তিনি ভাবছিলেন, স্যার হয়তো এই অর্থ কীভাবে সঠিকভাবে ব্যবহার করা যায়, সেসব বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেবেন—কোনো সদুপদেশ, পরামর্শ, বা দুনিয়া—আখেরাতের কল্যাণে অর্থ ব্যবহারের আলোচনা হবে। কিন্তু স্যারের জবাব ছিল একেবারে সরল, কিন্তু অত্যন্ত গভীর: “খরচ করে ফেলো।” ভাই মনে করলেন, “স্যার হয়তো বুঝলেন না আমি কী জানতে চাচ্ছি, আমি তো ভাবছিলাম স্যার কোনো গঠনমূলক উপদেশ দেবেন।” তিনি সেই পরামর্শ হৃদয়ে ধারণ করতে পারি নাই, মনে হলো স্যারের পরামর্শটা ‘অসংগত’। ভাই বলেন, “আমার আব্বাও জীবনে একসাথে এত টাকা দেখেননি। তিনি একজন শিক্ষক ছিলেন, হয়তো সর্বোচ্চ ৫—৭ লাখ টাকা একসাথে দেখেছেন। আর আমি জীবনের প্রথম ব্যবসাতেই ৫০ লাখ টাকার লাভ করে ফেললাম। মনে মনে ভাবছিলাম, স্যার নিশ্চয়ই এই অর্থের ভালো ব্যবহার নিয়ে কোনো দিকনির্দেশনা দেবেন। কিন্তু স্যারের পরামর্শ ছিল— ‘খরচ করে ফেলো’। তখন মনের ভেতর থেকে কথাটি গ্রহণ করতে পারছিলাম না, মনে হচ্ছিল, এতো বড় পরিমাণ অর্থ হেলায় খরচ করে দেওয়ার কথা কীভাবে বলেন!” কিন্তু সময়ের ব্যবধানে, জীবন ও স্যারের বয়ানগুলো পড়ে ও শুনে বুঝতে পারি, বুঝে আসে—সেই সময় স্যারের কথার ভেতরে ছিল এমন এক হিকমত, যা তাৎক্ষণিকভাবে বোঝা যায়নি, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে জীবনকে বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। আমি তখন সম্পূর্ণ আসবাববিহীন জীবন যাপন করতাম—টানাপোড়েন, দুঃস্থতা, আল্লাহর উপর নির্ভরতা, নামাজে কান্না, দোয়ায় আস্থার জিন্দেগি। যখন ৫০ লাখ টাকা পেয়ে গেলাম, তখন শুরু হলো প্ল্যান, খরচের হিসাব, বিনিয়োগ, বিজনেস সম্প্রসারণ, আরও কোটির প্ল্যান। ধীরে ধীরে সেই আসবাবহীন জীবন থেকে চলে এলাম আসবাবনির্ভর জীবনে। আল্লাহর উপর নির্ভরতা কমতে থাকলো। এখন বুঝি, স্যারের সেই ‘খরচ করে ফেলো’ উপদেশটা ছিল যেন আমাকে সেই আসল বুনিয়াদে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা। যদি আমি সে সময় সেই অর্থ খরচ করে ফেলতাম, তাহলে হয়তো আমার হৃদয় সেই আগের মতোই নির্ভরশীল থাকতো আল্লাহর উপর (দুনিয়ার আসবাব যখন হাতের মুঠোয় আসে, তখন বিশ্বাসের ভিত্তি না থাকলে সেই আসবাবই আমাদের আত্মার দিক পরিবর্তন করে দেয়। কখনো কখনো, আল্লাহর উপর নির্ভরশীলতা বজায় রাখার জন্য প্রয়োজন হয় আসবাব থেকে ফাঁকা থাকার)।

১৭৯. স্যার বলতেন, অন্যের দোষের জন্য, অন্যের গুনাহের জন্য নিজেকে…

স্যার বলতেন, অন্যের দোষের জন্য, অন্যের গুনাহের জন্য নিজেকে দায়ী মনে করতে পারা—এটা হলো পূর্ণতার কামাল। আধ্যাত্মিক পরিপূর্ণতার চূড়ান্ত স্তর, এখানে এমন এক অবস্থায় পৌঁছে, যেখানে একজন বান্দা আল্লাহর কাছে এতটাই নরম, এতটাই দায়িত্বশীল ও বিনয়ী হয়ে যায় যে: সে অন্যের গুনাহ দেখলে নিজেকে দায়ী মনে করে, অন্যের দুর্বলতা দেখলে নিজের আত্মসমালোচনা করে, নিজের ঈমান, দাওয়াহ ও আখলাককে দায়ী করে, এবং আল্লাহর দরবারে নিজের গুনাহ মনে করে কাঁদে, যদিও সেই গুনাহ তার নিজের না। এটি সেই উচ্চতম ইহসানের স্তর, যা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চরিত্রে পূর্ণভাবে প্রকাশিত ছিল এবং পরে সেই ধারা ও আদর্শে মাশায়েখগণ আল্লাহ ওয়ালাগণ চলেছেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তো সম্পূর্ণ নির্দোষ ছিলেন, তবুও তিনি বারবার উম্মতের জন্য কান্না করতেন, এটা ছিল উনার ‘উম্মত—প্রেম’ আর বিনয়ী হৃদয়ের নিদর্শন, উম্মতের ভুলের বোঝা নিজের মনে করতেন। “পূর্ণতার কামাল” হলো আত্মশুদ্ধি, বিনয়, জবাবদিহির অনুভব এবং উম্মতের হালতের দায় নিজের উপর নেওয়ার সেই মহত আধ্যাত্মিক গুণ—যা আল্লাহর নিকটত্বের চূড়ান্ত নিদর্শন। তার দৃষ্টিভঙ্গি এমন হয় যে, সমাজে বা অন্যের জীবনে যদি কোনো বিপথগামিতা বা গুনাহ ঘটে, তাহলে তিনি নিজেকেই জিজ্ঞাসা করেন— আমি তার উপকার করতে পারিনি কেন, বা আমার ভেতরের ফসাদের কারনে কি তার/তাদের এই বাহ্যিক ফসাদের কারণ? স্যার বলেন, এই দৃষ্টিভঙ্গি “নাফস” (অহম/আত্মমগ্নতা)—এর বিপরীত, মানুষ সহজে বলে, “ওর ভুল”, “ও গুনাহগার”, কিন্তু যিনি কামালের পথে আছেন তিনি বলেন, হয়তো আমি যদি আরও খাঁটি হতাম, তাহলে সে মানুষটার ঈমান আমল সুন্দর হতো, ও হয়তো এই হালতের মধ্যে পড়তো না। এই দৃষ্টিভঙ্গি অহংকার ভেঙে দেয়, আত্মসমালোচনায় অভ্যস্ত করে, আর সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা মমতা ও ভালবাসা জাগায়। যিনি এই স্তরে পৌঁছান, তিনিই ‘আল্লাহর ওয়ালী’ হওয়ার পথে চলছেন—দ্বীনের প্রকৃত দাঈ, তার হৃদয়ে আছে করুণা, দায়িত্ব, বিনয়, আত্মশুদ্ধির দৃঢ় নিয়্যত ও প্রজ্ঞা। অন্যের গুনাহকে নিজের দোষ মনে করার এই আত্মদায়িত্ববোধই কামালিয়াতের পূর্ণতায় পৌঁছায়।

১৮০. স্যার একবার বলেন, টঙ্গীর ইজতেমায় হযরতজী এনামুল হাসান সাব…

স্যার একবার বলেন, টঙ্গীর ইজতেমায় হযরতজী এনামুল হাসান সাব রহমতুল্লাহি আলাইহি—এর কামরায় বসা ছিলেন। টেন্টের বাইরে, সম্ভবত উত্তর পাশের রাস্তা বা মাঠ বা নদীর ওপার থেকে বাঁশির শব্দ ভেসে আসছিল। হযরতজী রহমতুল্লাহি আলাইহি সেই বাঁশির আওয়াজ শুনেই ব্যাথার মনে বলে উঠলেন: আমারই গুনাহের কারণে আজ এই বাঁশি বাজছে। এটা ছিল উনার আত্মজ্ঞান ও আত্মসমালোচনার এক নিয়মিত প্রকাশ। হযরতজী রহমতুল্লাহি আলাইহি নিজের অন্তরের দোষ ও কমতিকে এমনভাবে অনুভব করতেন, যেন দুনিয়ার প্রতিটি গাফলতি ও গুনাহের পেছনে উনার কোনো না কোনো দায় থেকে যায়। এই দৃষ্টিভঙ্গি সাধারণ মানুষের পক্ষে কল্পনাও করা কঠিন। স্যার আরও বলেন—সারা দুনিয়া থেকে হযরতজী রহ.—এর কাছে চিঠি আসত, যাতে বিভিন্ন হালত, অভিযোগ, গাফলতি ও বেউসুলির কথা লেখা থাকত। উনি সেইসব চিঠি রাতের বেলা সামনে নিয়ে বসতেন এবং কাঁদতেন, হায় আল্লাহ! এই সমস্ত গন্ডগোল, বেউসুলি, হালাত—সবই আমার পাপের ফল। আমি আমার দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করতে পারিনি, এ জন্যই দুনিয়াজুড়ে এ অবস্থা। দীর্ঘ সময় ধরে ইস্তেগফার করতেন, নিজের দোষ স্বীকার করতেন, কাঁদতেন। স্যার বলেন, অন্যের গুনাহকে নিজের দোষ মনে করা, এই আত্মদায়িত্ববোধই কামালিয়াতের পূর্ণতায় পৌঁছায়। একবার ভারতের এক ছোট ইজতেমায়, রাত গভীর, সব সাথী ঘুমিয়ে পড়েছে। কিন্তু হযরতজী রহমতুল্লাহি আলাইহি মাঝরাতে বসে কাঁদছেন। আল্লাহ পাক যদি কিয়ামতের দিন আমাকে জিজ্ঞেস করেন—তুমি তোমার সাথীদের তাহাজ্জুদের লোক বানাতে পারলে না কেন? তারা সারারাত ঘুমিয়ে কাটাল—তখন আমি কী জবাব দেব? হযরতজী নিজে তাহাজ্জুদ পড়তেনই, কিন্তু অন্য কেউ না পড়লে উনার তাতে কি আসে যায়, উনি নিজের ওপরই দায় চাপাচ্ছেন। যেন তাবলীগের সমস্ত হালত, উম্মতের সমস্ত অবস্থা—সব উনার আমানত, সব উনার জবাবদিহিতার বিষয়। যিনি সত্যিকারের পূর্ণতা বা ‘কামাল’—এর পথে আছেন, তিনি নিজের আমল বা বাহ্যিক সফলতাকে কেন্দ্র করে অহংকার করেন না।


← আগের পর্ব (১৪১–১৬০)  |  সূচিপত্র  |  পরের পর্ব (১৮১–২০০) →

সংগ্রহ ও সংকলন: মুশফিক আহমদ (রহঃ)-এর মালফুযাত সংকলন।

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *