|

মালফুযাত – প্রফেসর মুশফিক আহমদ (রহঃ) – পর্ব ১৬: ৩০১–৩২০

প্রফেসর মুশফিক আহমদ (রহঃ)-এর বয়ান, পরামর্শ, আমল ও দাওয়াতি জীবনের মালফুযাত, ৩০১ থেকে ৩২০ নম্বর। সম্পূর্ণ সূচিপত্র দেখুন।

সংগ্রহ ও সংকলন: মুশফিক আহমদ (রহঃ)-এর মালফুযাত সংকলন।

এই পর্বে যা আছে


৩০১. স্যার একবার বলেন, সময় ও পরিস্থিতি আমার কাছে কী…

স্যার একবার বলেন, সময় ও পরিস্থিতি আমার কাছে কী দাবি করছে, সেটাকে চিনতে পারার নামই হলো এলেম। স্যার বোঝাতেন, মালুমাত- অনেক তথ্য জানাটাই শুধু এলেম নয়; বরং প্রতিটি মুহূর্তে আল্লাহ আমার কাছে কী চান, সেটি বুঝতে পারাই প্রকৃত এলেম। প্রসঙ্গ আলোচনায় স্যার হযরত মাওলানা ইলিয়াস রহমাতুল্লাহি আলাইহির কথা বলেন। তিনি ছিলেন বড় আলেম এবং পীর। অনেক ছাত্র তার কাছে পড়াশোনা করত এবং লোকেরা তার সোহবতে আধ্যাত্মিক উপকার পেত। সেই সময় মেওয়াতের মুসলমানদের মধ্যে দ্বীনি জ্ঞান খুব কম ছিল, নামাজ, আকিদা ও মৌলিক ইসলামী আমল বড় দুর্বল ছিল। তিনি মাদরাসার ব্যস্ততা ও ব্যক্তিগত তরিকতের কাজ রেখে গ্রামাঞ্চলে গিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে দ্বীনি দাওয়াত শুরু করেন। বড় আলেম ছিলেন, উচ্চস্তরের দরস বা খানকাহি কার্যক্রম রেখে সাধারণ অশিক্ষিত মুসলমানদের মাঝে দাওয়াতের কাজ শুরু করেন; সময়ের দাবিকে তিনি চিনেছিলেন। স্যার বলতেন, এটাকেই বলা হয় এলেম, সময়ের তাকাজা চিনতে পারা। স্যার উদাহরণ দেন হযরত মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী রহমাতুল্লাহি আলাইহির জীবন থেকে। তিনি মদিনা মুনাওয়ারায় দীর্ঘদিন ধরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর রওজার নিকটে বসে বুখারী শরীফের দরস দিতেন। এতো বড় মর্যাদাপূর্ণ কাজ এবং পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্থানে বসে দ্বীনের শিক্ষা দেওয়া। কিন্তু যখন ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হলো এবং মুসলমানদের রাজনৈতিক ও সামাজিক ভবিষ্যৎ সংকটে পড়ল, তখন তিনি সেই মর্যাদাপূর্ণ স্থান ছেড়ে ও মর্যাদাপূর্ণ কাজ ছেড়ে হিন্দুস্তানে এলেন। বুখারী শরীফের দরস ফেলে করছেন রাজনৈতিক আন্দোলন; রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর রওজার নিকটে বসা ফেলে বসে বৈঠক করছেন হিন্দুদের সাথে হিন্দুস্থানে। স্যার বলতেন এটাকে বলে এলম, এখন এই মুহূর্তের দাবি কি সেটাকে চেনা, কোন সময়ে তার জন্য কোন কাজটি সবচেয়ে বেশি জরুরি, তা বুঝতে পারা। স্যার আরও একটি ঐতিহাসিক ঘটনার উদাহরণ দেন। ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান বিভক্ত হওয়ার সময় লক্ষ লক্ষ মুসলমানের সামনে প্রশ্ন দাঁড়িয়েছিল- তারা কি সবকিছু ছেড়ে পাকিস্তানে চলে যাবে, নাকি নিজেদের ভূমিতে থেকে যাবে? অনেকে আতঙ্কে ঘরবাড়ি, সম্পদ ও ব্যবসা-বাণিজ্য ছেড়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে রওনা হচ্ছিল। সে সময় তিনজন বড় আলেম, হযরত মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী রহমাতুল্লাহি আলাইহি, হযরত মাওলানা আব্দুল কাদের রায়পুরী রহমাতুল্লাহি আলাইহি এবং হযরত মাওলানা জাকারিয়া সাহেব রহমাতুল্লাহি আলাইহি নিজেদের মধ্যে পরামর্শে বসলেন। প্রশ্ন ছিল- এই কঠিন সময়ে উম্মতের জন্য তাদের করণীয় কী? তাদের প্রত্যেকের জন্য আলাদা সুযোগ ছিল। কেউ তাদের পাকিস্তানে যাওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানাচ্ছিল, আবার কেউ তাদের জন্য সৌদি আরব নিয়ে যাবার ব্যবস্থা করার প্রস্তাব দিচ্ছিল। কিন্তু তারা পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নিলেন, ব্যক্তিগতভাবে তিনজন নিজেদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিলেন আমরা এই সময়ে মুসলমানদের এই হাল দেখে ভারত বর্ষ ত্যাগ করবো না, ভারতেই থেকে যাব, অথচ তাদের জন্য উত্তম আমন্ত্রণ ছিল, তাদের জন্য উত্তম এন্তেজাম ছিল, পৃথক সুযোগ ছিল। স্যার বলতেন সেই সিদ্ধান্ত ছিল তাদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত, আর তাতে কি হল লক্ষ লক্ষ মুসলমান লক্ষ লক্ষ পরিবার ওই গৃহহীন অবস্থায় গৃহহারা অবস্থা থেকে নিরাপদ হয়ে গেল লক্ষ লক্ষ মুসলমানের জীবন হেফাজত হয়ে গেল, সেই সময় উম্মতের পাশে থাকা তাদের জন্য সবচেয়ে জরুরি কাজ তারা বুঝেছিলেন। স্যার বলতেন উনারা ছিলেন এলেমওয়ালা, উনারা ছিলেন জিকিরওয়ালা।

৩০২. স্যার বলতেন, আল্লাহ পাক দ্বীনের মেহনতকে ব্যবসার সাথে তুলনা…

স্যার বলতেন, আল্লাহ পাক দ্বীনের মেহনতকে ব্যবসার সাথে তুলনা করেছেন। ব্যবসার স্বভাবই হলো তা বাড়ানো। প্রকৃত ব্যবসায়ী তার পুঁজি পুরোপুরি কাজে লাগায়, ব্যবসা সম্প্রসারণের চিন্তা করে। যদি কেউ পুঁজি থাকা সত্ত্বেও ব্যবসা না বাড়ায়, তবে সে প্রকৃত অর্থে ব্যবসায়ী নয়। স্যার বলতেন, আমাদের পুঁজি হলো আমাদের সময়। আল্লাহ আমাদের যে সময়, সুযোগ ও সামর্থ্য দিয়েছেন সেটাই আমাদের মূলধন। কিন্তু শয়তান চায়, এই মূলধন যেন দ্বীনের ময়দানে পুরোপুরি ও উত্তমভাবে ব্যবহার না হয়। তিনি বলতেন, সময়ের এই মূলধন যদি দ্বীনের ময়দানে পূর্ণভাবে ব্যবহার না হয়, তবে তা অন্য ময়দানে খরচ হয়ে যাবে। পরিবার কিছু নেবে, বিনোদন কিছু নেবে, মিডিয়া কিছু নেবে, দুনিয়াবি ব্যস্ততা কিছু নেবে, কিন্তু সময় ফাঁকা থাকবে না। মূলধন খরচ হবেই; প্রশ্ন হলো, কোথায় খরচ হচ্ছে? কারও সময়, শক্তি ও সামর্থ্য যদি বেশি হয়, কিন্তু সে যদি সামান্য কাজেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখে, তবে তার আসল সামর্থ্য অপচয় হয়। শয়তান মানুষকে বুঝায়, “তুমি তো পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ছ, একবার চিল্লা দিয়েছ, গাস্ত করো, মানুষ তো তোমাকে দিনদার বলেই চেনে, এর বেশি আর কী দরকার?” এইভাবে শয়তান মানুষকে তার পূর্ণ মূলধন দ্বীনের কাজে ব্যবহার করতে দেয় না। স্যার উদাহরণ দিতেন কারও কাছে যদি ১০০ টাকা পুঁজি থাকে, সে ছোট ব্যবসা করবে; মোড়ে বসে বাদাম বিক্রি করবে, ট্রেনে ফেরি করবে, তার পুঁজির সাথে সেটাই মানানসই। কিন্তু যদি কারও পুঁজি ১০০ কোটি টাকা হয়, আর তাকে যদি দেখা যায় রাস্তার মোড়ে পানের দোকান নিয়ে বসে আছে, তাহলে বোঝা যাবে সে আসলে ঐ পান দোকানী না, সে তার পুঁজির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যবসা করছে না। পুঁজি যত বড়, ব্যবসার পরিসরও তত বড় হতে হয়। বড় পুঁজিকে ছোট গণ্ডিতে আটকে রাখলে তার সঠিক ব্যবহার হয় না। স্যার বোঝাতেন, দ্বীনের কাজ এমনভাবে হবে যেন এটা আমার নিজের ব্যবসা। কেবল সওয়াবের হিসাবের জন্য নয়, কেবল আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব পালন হিসেবে নয়; বরং দায়িত্ববোধ থেকে, নিজের পূর্ণ সামর্থ্য দিয়ে। স্যার বলতেন, যে ব্যক্তি দ্বীনের কাজকে নিজের ব্যবসা বানিয়েছে, সে তার সময়ের পূর্ণ ও উত্তম ব্যবহার নিয়ে চিন্তিত থাকবে।

৩০৩. স্যার একবার বলেন, দ্বীনি কাজের ভিত হলো আস্থা। তাই…

স্যার একবার বলেন, দ্বীনি কাজের ভিত হলো আস্থা। তাই এমন কোনো কথা বা আচরণ করা উচিত নয় যা অযথা মানুষের আস্থা ভেঙে দেয়, নেতৃস্থানীয় বড়দের সম্পর্কে সাধারণের খারাপ ধারণা সৃষ্টি হয়। কিন্তু যখন কোনো ভুল প্রবণতা এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে তা পুরো কাজের ক্ষতি করছে, দ্বীনি মেহনতকে নষ্ট করছে, তখন নীরব থাকা সমাধান নয়। তখন দায়িত্ববোধের সঙ্গে সত্যকে সামনে আনা এবং সংশোধনের চেষ্টা করা জরুরি হয়ে পড়ে। স্যার বলেন, কখনো কখনো সত্য কথা বলা বা ভুল সংশোধনের চেষ্টা করলে কিছু তাৎক্ষণিক অস্বস্তি বা সমস্যা তৈরি হতে পারে। কিন্তু যদি বড় ক্ষতির আশঙ্কা থাকে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণের কথা চিন্তা করে সাহসের সঙ্গে সংশোধনের পথে এগোতে হয়। এই ভারসাম্যই হলো দ্বীনি কাজের একটি সূক্ষ্ম দায়িত্ব।

৩০৪. নব্বইয়ের দশকে কখনো কখনো স্যার কাকরাইলে অল্প কিছু পুরানা…

নব্বইয়ের দশকে কখনো কখনো স্যার কাকরাইলে অল্প কিছু পুরানা সাথীকে নিয়ে বসে তাবলীগের কাজে দেখা দেওয়া কিছু ভুল প্রবণতা ও মেজাজের খেলাফ অবস্থা সম্পর্কে সতর্কতামূলক আলোচনা করতেন। উদ্দেশ্য ছিল দ্বীনি মেহনতের সঠিক মেজাজের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করা। একদিন এ ধরনের এক আলোচনায় মাহফুজুর রহমান ভাই স্যারকে বললেন, “যে কারণে কাজের মেজাজ নষ্ট হচ্ছে এবং যারা এভাবে কাজকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, তাদের ব্যাপার যদি আপনি প্রকাশ্যে বলে দেন, তাহলে সবাই সতর্ক হতে পারবে।” স্যার বললেন, “না, এভাবে প্রকাশ করলে ক্ষতি বেশি হবে।” জিজ্ঞেস করা হলো, “ক্ষতি কি এই কারণে যে মানুষের আস্থা নষ্ট হয়ে যাবে?” স্যার বললেন, “হ্যাঁ, আস্থার ওপরেই তো কাজ চলে। মানুষ আস্থা থাকার কারণেই তাবলীগে আসে। যদি মুরুব্বিদের ওপর থেকে সাধারণ মানুষের আস্থা নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে কাজের বড় ক্ষতি হবে।” অনেক বছর পরে, জীবনের শেষ দিকে স্যার যখন বিভিন্ন ভুল প্রবণতা ও কিছু মুরুব্বির ত্রুটির কথা সাথীদের সামনে প্রকাশ্যে আনতে শুরু করলেন, তখন একদিন তাকে সেই পুরোনো কথাটি স্মরণ করিয়ে দেওয়া হলো। বলা হলো, “স্যার, একসময় আপনি বলেছিলেন এসব প্রকাশ করলে আস্থা নষ্ট হবে।” স্যার তখন বললেন, “হ্যাঁ, তখন সেই অবস্থায় প্রকাশ করলে ক্ষতি বেশি হতো। কিন্তু এখন যদি প্রকাশ না করা হয়, তাহলে যে ক্ষতি হবে তা প্রকাশ করলে যে ক্ষতি হবে তার চেয়ে অনেক বেশি হবে।” তারপর স্যার একটি উদাহরণ দিলেন, ধরো একজন মেয়ের এমন একটি রোগ হয়েছে, যা চিকিৎসা করালে প্রকাশ হয়ে যাবে। আর রোগ প্রকাশ হয়ে গেলে তার বিয়ে হওয়ার সম্ভাবনা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। কিন্তু যদি এই ভয়েই চিকিৎসা না করানো হয়, তাহলে রোগ বাড়তে বাড়তে একসময় তার মৃত্যুও হতে পারে। তখন কী করবে? সাময়িক ক্ষতির ভয়ে চিকিৎসা না করিয়ে মৃত্যুর দিকে যাবে, নাকি কিছু ক্ষতির আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও চিকিৎসা করিয়ে বাঁচার চেষ্টা করবে?

৩০৫. স্যার বলেন, কোনো দায়িত্বকে শুধু তার সাধারণ কাজের মধ্যে…

স্যার বলেন, কোনো দায়িত্বকে শুধু তার সাধারণ কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ মনে করা ঠিক নয়। দায়িত্বের প্রকৃত অর্থ হলো, সময় ও পরিস্থিতির প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া। স্যার উদাহরণ দিয়ে বোঝান, সন্তান প্রতিপালন করা পিতা-মাতার দায়িত্ব। সাধারণ অবস্থায় তাকে স্কুল বা মাদ্রাসায় পাঠানো, খাওয়ানো-পড়ানো, এগুলো প্রতিপালনের অংশ। কিন্তু সন্তান অসুস্থ হয়ে গেলে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া, পরীক্ষা করানো, চিকিৎসা করানো, এটাও সেই প্রতিপালনেরই অংশ। তখন যদি কেউ বলে, “পড়াশোনা বন্ধ করে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছ কেন?” তা তো অর্থহীন কথা। তেমনি একজন ব্যবসায়ীর মূল কাজ দোকান খোলা রাখা ও বেচাকেনা করা। কিন্তু যদি বন্যা এসে দোকানে পানি ঢোকার আশঙ্কা হয়, তখন দোকান বন্ধ করে মালপত্র সরিয়ে নেওয়াই হবে ব্যবসার সঠিক সিদ্ধান্ত। ওই মুহূর্তে দোকান বন্ধ করাও ব্যবসারই অংশ হয়ে যায়। তিনি বলেন, দায়িত্বশীল মানুষ কখনো নিজের দায়িত্বের ব্যাপারে নির্লিপ্ত থাকতে পারে না। দায়িত্বের জায়গায় উদাসীন থাকা সঠিক মনোভাব নয়। কেউ যদি শোনে তার সন্তান চুরি করেছে, আর সে বলে, “তাতে আমার কী?”- তাহলে সবাই বিস্মিত হবে। কারণ দায়িত্বশীল মানুষ নিজের দায়িত্বের ব্যাপারে নির্লিপ্ত থাকতে পারে না। স্যার বলেন- দায়ী কে? দ্বীনের মেহনতকারী কে? উম্মত কে? যে ব্যক্তি নিজেকে উম্মতের দায়িত্বশীল মনে করে, সে দ্বীনের কাজের ক্ষতির ব্যাপারে নির্লিপ্ত থাকতে পারে না। যদি দ্বীনের কাজের ভেতরে কোনো অনিয়ম, দুর্নীতি বা ক্ষতির কারণ দেখা যায়, তাহলে মানুষকে সতর্ক করা, সত্য স্পষ্ট করা এবং সংশোধনের চেষ্টা করা, এটিও দ্বীনের কাজেরই অংশ। স্যার বলতেন, দ্বীনের কাজ শুধু কিছু নির্দিষ্ট আমলে সীমাবদ্ধ নয়। দ্বীনের কাজকে ক্ষতি থেকে রক্ষা করা, ভুলের ব্যাপারে মানুষকে সচেতন করা এবং প্রয়োজন হলে তার মোকাবেলার চেষ্টা করা, এগুলোও দাওয়াতের কাজেরই অংশ, দ্বীনের মেহনতেরই অংশ। স্যার বলেন, যেখানে দ্বীনের কাজ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, সেখানে নীরব থাকা দায়িত্বশীলতার পরিচয় নয়। সত্য স্পষ্ট করা এবং মানুষকে সতর্ক করা- এটিও দ্বীনের খেদমতেরই অংশ। এটি দ্বীনের কাজের বাইরে নয়; বরং দ্বীনের কাজকে হেফাজত করারই একটি দিক।

৩০৬. স্যার বলেন, সব নেক কাজ সব সময় সমান গুরুত্বপূর্ণ…

স্যার বলেন, সব নেক কাজ সব সময় সমান গুরুত্বপূর্ণ নয়। যে মুহূর্তে যে কাজটি সবচেয়ে জরুরি, সময় ও পরিস্থিতির দাবি বুঝে সেটিকে অগ্রাধিকার দেওয়াটাই প্রকৃত এলেম। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, দোকানে চুরি হওয়ার আশঙ্কা থাকলে ব্যবসায়ী নাইটগার্ড রাখে। নাইটগার্ড রাখা ব্যবসারই অংশ। কৃষক ধান চাষ করলে জমিতে পোকা ধরলে কীটনাশক ছিটায়, এটাও চাষাবাদেরই অংশ। একজন বাবা তার সন্তানকে পড়াশোনা করাচ্ছে; হঠাৎ যদি সন্তান অসুস্থ হয়ে যায়, তখন তাকে মাদ্রাসায় পাঠানো নয়, হাসপাতালে নিয়ে যাওয়াটাই তখন বড় কাজ। ওই মুহূর্তে চিকিৎসাই হয়ে যায় প্রধান দায়িত্ব। স্যার বোঝাতেন, প্রতিটি কাজেরই একটি নির্দিষ্ট সময় ও অগ্রাধিকার থাকে। যে মুহূর্তে যে কাজটি সবচেয়ে জরুরি- সেটিই তখন বড় কাজ। দ্বীনের ভাষায় এটাকেই বলা হয় হালের তাকাযা, সময়ের দাবি। স্যার বোঝান, দায়িত্বের জায়গায় উদাসীন থাকা বা প্রয়োজনের সময় চুপ করে থাকা কখনো প্রকৃত দ্বীনদারির লক্ষণ নয়। যেমন সন্তান অসুস্থ অথচ তাকে জোর করে পড়াশোনায় বসিয়ে রাখা দায়িত্বশীলতার পরিচয় নয়; বরং তার চিকিৎসা করাই তখন সঠিক কাজ। তেমনি দ্বীনের ময়দানেও আমাকে বুঝতে হবে- এই মুহূর্তে আল্লাহ আমার কাছে কী চান।

৩০৭. এক হজের সফরে একটি এজেন্সির সঙ্গে ৪৫ দিনের প্যাকেজে…

এক হজের সফরে একটি এজেন্সির সঙ্গে ৪৫ দিনের প্যাকেজে চুক্তি হয়েছিল। সেই চুক্তি অনুযায়ী মক্কা শরীফে ২০ দিন এবং মদিনা শরীফে ২৫ দিন থাকা-খাওয়া ও অন্যান্য ব্যবস্থার দায়িত্ব এজেন্সির উপরই থাকবে-এ রকম স্পষ্ট কথা ছিল। মদিনা শরীফে দশ দিন থাকার পর হঠাৎ এজেন্সির মালিক জানালেন, তার অন্যান্য হাজীদের মত আমাদের প্যাকেজ ও নাকি শেষ হয়ে গেছে। মদিনাতে সে দশ দিনের বেশি থাকা খাবার ব্যবস্থা করতে পারবে না, এখন থেকে আমাদের নিজ দায়িত্বে থাকার ব্যবস্থা করতে হবে। তাকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হল যে উনার সঙ্গে তো ২৫ দিন মদিনায় রাখার চুক্তি হয়েছে। সে অনুযায়ী বাকি ১৫ দিনের ব্যবস্থাও তো উনারই দায়িত্বে পড়ে। কিন্তু তিনি কিছুতেই তা মানতে রাজি হলেন না। বরং তিনি একটি রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় শিল্প উপদেষ্টা ছিলেন, সেই প্রভাবের একটা ভাবও তার আচরণে ছিল। সেই প্রভাবের দাপটে তিনি আমাদের কোনো অনুরোধই গ্রহণ করলেন না, এমনকি আমাদের কথা শুনতেও চাইছিলেন না। উল্টো তিনি স্যারের কাছে এসে বললেন, “স্যার, আপনার সাথীদেরকে বোঝান যেন তারা বিষয়টা মেনে নেয়।” তখন স্যার তাকে শান্তভাবে বললেন, “না, এটা তো আপনি নিজেরাই চুক্তি করেছেন। এখন কেন আপনি সেই চুক্তি ভঙ্গ করবেন?” কিন্তু তারপরেও তিনি কোনো গুরুত্ব দিলেন না। বিষয়টি এড়িয়ে যেতে চাইলেন। পরিস্থিতি দেখে স্যার আমাদের বললেন, “তোমরা একটি লিখিত দরখাস্ত বাংলাদেশ হজ মিশনে জমা দাও। অন্যায় হলে তার প্রতিকার চাওয়া উচিত।” স্যারের পরামর্শ অনুযায়ী দরখাস্ত করা হলো। কিছুক্ষণ পর হজ মিশন থেকে ওই এজেন্সির মালিককে ফোন করে কঠোরভাবে সতর্ক করা হয় যে হাজিদের সঙ্গে প্রতারণা করলে তার লাইসেন্স পর্যন্ত বাতিল হয়ে যেতে পারে। এরপর পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে গেল। তিনি নিজেই আমাদের কাছে এসে অনুরোধ করতে লাগলেন যেন অভিযোগটি তুলে নেওয়া হয়। একই সঙ্গে বাকি ১৫ দিনের জন্য থাকার-খাওয়ার সব ব্যবস্থাও করে দিলেন। পরে স্যার বললেন, “হজের এজেন্সিগুলোর মধ্যে অনেকেই হাজিদের সরলতা দেখে সুযোগ নিতে চায়। যদি কেউ অন্যায় করে আর তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়, তাহলে সে আরো সাহস পায়। এজাতীয় অন্যায়ের ক্ষেত্রে সঠিক জায়গায় কথা বলা দরকার। এতে শুধু নিজের অধিকারই রক্ষা হয় না, ভবিষ্যতে অন্য হাজিরাও হয়রানি থেকে বাঁচে।”

৩০৮. হাসান হাবিব ভাই বলছিলেন, একবার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে…

হাসান হাবিব ভাই বলছিলেন, একবার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে এক জোর শেষে খানার আয়োজন ছিল। অনেক ছাত্র একসাথে বসে খানা খাচ্ছিল। সেই সময় তিনি স্যারের সাথে এক প্লেটে বসে খানা খাওয়ার সুযোগ পান। ভাই বলেন, আমি লক্ষ্য করছিলাম, খেদমতের সাথীরা স্যারের প্লেটের প্রতি আলাদা কোনো খেয়াল রাখে কি না। সাধারণত দেখা যায়, কোনো মুরুব্বী বা দায়িত্বশীল ব্যক্তি থাকলে পরিবেশনকারীরা একটু বেশি যত্ন করে; ভালো অংশটা, ভালো গোস্ত, এক চামচ বেশি গোস্ত, মাছের মাথা বা বিশেষ তরকারি আগে এনে দেয়। কখনো ফল বা ভালো খাবারটাও আলাদা করে তুলে দেয়। কিন্তু সেদিন দেখলাম, স্যারের প্লেটে তেমন কিছুই হচ্ছে না। অন্যদের প্লেটে যেমনভাবে খানা পরিবেশন হচ্ছে, স্যারের প্লেটেও ঠিক সেভাবেই হচ্ছে। কোনো বাড়তি কেয়ার বা আলাদা নজর নেই। আমি তখন স্যারকে জিজ্ঞেস করলাম, “স্যার, আমরা যখন জামাতে যাই বা আমির সাহেবের দায়িত্বে থাকি, তখন সাথীরা ‘আমির সাহেব, আমির সাহেব’ বলে খুব বেশি খেয়াল রাখে। ভালো অংশটা আগে দেয়, মাছের মাথা বা এক চামচ বেশি গোস্ত, বিশেষ কিছু এনে প্লেটে তুলে দেয়। কিন্তু আপনার প্লেটে তো এরকম কিছু দেখলাম না।” স্যার সংক্ষেপে উত্তর দিলেন, “দ্বিপাক্ষিক।” আমি বললাম, “স্যার, দ্বিপাক্ষিক কথাটা ঠিক বুঝলাম না।” তখন স্যার বুঝিয়ে বললেন, তোমার দিল আগে বলে যে, খেদমতের সাথীরা আমির সাহেবের খোঁজ কেন নেয় না; এরপর সাথীরা দৌড়ে তোমার কাছে আসে। তুমি তোমার দিল থেকেই নিজের (আমির সাহেবের) কদর বের করে দাও, তখন আর কোনো সাথী তোমার (প্লেটের) আলাদা খোঁজ নিতে আসবে না। যখন তোমার দিল নিজের মর্যাদা ও গুরুত্বের কথা মনে মনে ভাবতে থাকে, খেদমতের সাথীরা আমির সাহেবের খোঁজ নিচ্ছে না কেন? তখন সেই চাহিদাই সাথীদেরকে টেনে নিয়ে আসে তোমার খোঁজ নিতে। কিন্তু তুমি যদি নিজের দিল থেকেই নিজের কদর বের করে দাও, নিজের জন্য বাড়তি গুরুত্ব আশা না করো, তাহলে মানুষও স্বাভাবিকভাবেই তোমার সাথে স্বাভাবিক আচরণ করবে।

৩০৯. সফরে মদিনায় অবস্থানকালে একবার শনিবার সকালে মসজিদে কুবায় হেঁটে…

সফরে মদিনায় অবস্থানকালে একবার শনিবার সকালে মসজিদে কুবায় হেঁটে যাওয়ার ফজিলত সম্পর্কে আলোচনা হচ্ছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শনিবার মসজিদে কুবায় যেতেন এবং সেখানে নামাজ আদায় করতেন। এ আমলের উমরার সমতুল্য ফজিলত সম্পর্কেও হাদিসে উল্লেখ রয়েছে। তখন স্যার এ প্রসঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত কথা বলেন। স্যার বললেন, “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো কাজ করেছেন বলেই সব কাজ একই স্তরের সুন্নত হয়ে যায় না। কোন আমল শরীয়তের দৃষ্টিতে ওয়াজিব, কোনটা সুন্নতে মুয়াক্কাদা, কোনটা মুস্তাহাব বা নফল, এসব নির্ধারণ করেছেন ফুকাহাগণ।” স্যার ব্যাখ্যা করে বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জীবন ছিল পূর্ণাঙ্গ আদর্শ। উনার জীবনে অসংখ্য আমল, অভ্যাস ও আচরণ রয়েছে। কিন্তু শরীয়তের দৃষ্টিতে সেগুলোর গুরুত্ব এক রকম নয়। কোনো আমল তিনি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নিয়মিত করেছেন, কোনোটি মাঝে মাঝে করেছেন, আবার কোনোটি ছিল সাধারণ নফল বা ব্যক্তিগত অভ্যাসের অন্তর্ভুক্ত। এই কারণে ফুকাহাগণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সমগ্র জীবন, উনার আমলের ধারাবাহিকতা, গুরুত্ব ও নির্দেশনাকে গভীরভাবে পর্যালোচনা করে শরীয়তের বিভিন্ন পরিভাষা নির্ধারণ করেছেন। স্যার বলেন, “ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নতে মুয়াক্কাদা, সুন্নতে যায়িদা, মুস্তাহাব, নফল, এসব শরীয়তের বিধানের স্তর বোঝানোর জন্য ফুকাহাদের নির্ধারিত পরিভাষা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আমল ও নির্দেশনাকে বিশ্লেষণ করে উনারা এসব স্তর নির্ধারণ করেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সারা জীবনের আমল ও তার গুরুত্বকে বিবেচনা করে আলেমরা বলেছেন, এটি ওয়াজিব, এটি সুন্নতে মুয়াক্কাদা, এটি সুন্নতে যায়িদা, আর এটি নফল।” উদাহরণ হিসেবে স্যার বলেন, আমরা যে বারো রাকাত সুন্নতে মুয়াক্কাদা নামাজের কথা বলি, “সুন্নতে মুয়াক্কাদা” শব্দটি সরাসরি হাদিসের শব্দ নয়; বরং ফুকাহাদের পরিভাষা। উনারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আমলের ধারাবাহিকতা ও গুরুত্ব বিবেচনা করে এটিকে সুন্নতে মুয়াক্কাদা হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। তবে স্যার এ কথা বলেননি যে, শনিবার মসজিদে কুবায় যাওয়া সুন্নত নয়। স্যার নিরুৎসাহিত ও করেননি, বরং তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জীবন থেকে প্রমাণিত বিভিন্ন আমলের গুরুত্ব এক নয়; শরীয়তের দৃষ্টিতে তার স্তর নির্ধারণ করেছেন ফুকাহাগণ। শনিবারে মসজিদে কুবায় নামাজ আদায় করা হাদিস শরীফে প্রমাণিত একটি ফজিলতপূর্ণ আমল। স্যার এখানে শুধু তুলে ধরেছেন যে শরীয়তের বিধানের দৃষ্টিতে কোনো আমলের গুরুত্ব নির্ধারণ করার জন্য আলেম ও ফুকাহাদের ব্যাখ্যাকে সামনে রাখতে হয়। উনারা গভীর অধ্যয়নের মাধ্যমে নির্ধারণ করেছেন কোন আমল কতটুকু গুরুত্ব বহন করে।

৩১০. নওগাঁর ভাই সাগর বলেন, একবার আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্ট্রাল…

নওগাঁর ভাই সাগর বলেন, একবার আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্ট্রাল মসজিদে অবস্থানকালে একজন প্রিয় ভাইয়ের পক্ষ থেকে একটি নতুন ডায়েরি উপহার পাই। সেই ডায়েরিতে হযরত স্যার (রহমাতুল্লাহি আলাইহি)-এর নিকট কিছু দোয়া লিখে দেওয়ার অনুরোধ জানাই।

স্যার অত্যন্ত স্নেহ ও মমতার সাথে নিজের হাতে আরবিতে কিছু দোয়া লিখে দেন (হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুকে হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে পাঁচটি বাক্য শিখিয়েছিলেন, তার মর্মানুযায়ী)। দোয়াগুলো শুধু শব্দের সমষ্টি ছিল না; বরং এর ভেতরে ছিল একজন মুরব্বির আন্তরিকতা, দয়া এবং একজন শায়েখের (শিক্ষকের) হৃদয়ের গভীর অনুভূতি।

  • ১. হে আল্লাহ! আমার গুনাহ ক্ষমা করে দিন।
  • ২. আমার উপার্জনকে পবিত্র ও হালাল করে দিন।
  • ৩. আমার চরিত্রকে প্রশস্ত, সুন্দর ও উন্নত করে দিন।
  • ৪. আপনি আমার জন্য যা নির্ধারণ করেছেন, তাতে আমাকে সন্তুষ্ট রাখুন।
  • ৫. যে বিষয় থেকে আপনি আমাকে দূরে রেখেছেন (আমার তাকদিরে নেই), তার প্রতি আমার মনকে আকৃষ্ট করবেন না।

(অনুবাদ: স্যারের বিভিন্ন বয়ান অবলম্বনে প্রণীত।)

আলহামদুলিল্লাহ, আজও সেই লিখিত দোয়াগুলো আমার কাছে অমূল্য সম্পদ হিসেবে সংরক্ষিত আছে। আমি দৃঢ়ভাবে অনুভব করি, এগুলো কেবল দোয়া নয়; বরং স্যারের পক্ষ থেকে আমার জন্য এক বিশেষ রহমত ও ভালোবাসার নিদর্শন।

ছোট আমল যেমন কারও জন্য দোয়া লেখা বা তার অনুরোধকে গুরুত্ব দেওয়া, স্যার হয়তো মনে করতেন- এগুলো আল্লাহর নিকট অত্যন্ত মূল্যবান হতে পারে এবং মানুষের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।

ভাই বলেন, স্যার ছিলেন এমনই একজন দরদী মানুষ, যিনি মানুষের প্রতি ভালোবাসা, সহানুভূতি এবং খালেস দোয়ার মাধ্যমে তাদের হৃদয় জয় করতেন। উনার জীবন আমাদের শেখায়, একজন দাঈ বা দীনের মেহনতকারী ব্যক্তির জন্য মানুষের সাথে হৃদয়ের সম্পর্ক গড়ে তোলা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

নোট: স্যারের হাতে লেখা দোয়ায় শব্দে সামান্য পার্থক্য থাকতে পারে; দোয়াটি হাদিসে বর্ণিত দোয়ার মর্মানুযায়ী। স্যার এটি দোয়া হিসেবে লিখেছেন, হাদিস হিসেবে নয়।

৩১১. একবার নাটোরের এক পুরাতন জিম্মাদার সাথী বিদেশ সফর (কিছু…

একবার নাটোরের এক পুরাতন জিম্মাদার সাথী বিদেশ সফর (কিছু আরব দেশ) থেকে ফিরে এসে স্যারকে উনার সফরের কিছু কারগুজারী শোনালেন। কথার এক পর্যায়ে তিনি বললেন, “স্যার, আমি একটি সফরনামা লিখতে চাই।”

স্যার বললেন, “লিখতে পারো, তবে প্রুফ রিডার ছাড়া কোন পাঠক পাবে না (খেয়াল রাখো, এমন না হয় যে তোমার সেই সফরনামার প্রুফরিডার ছাড়া আর কোনো পাঠক না থাকে!)”। এই সংক্ষিপ্ত কথার মধ্যে স্যার একটি গভীর ইঙ্গিত দিলেন, শুধু লেখা নয়; এমন লেখা হওয়া দরকার, যা মানুষের উপকারে আসে, মানুষের কাছে পৌঁছে এবং পাঠকের অন্তরে প্রভাব ফেলে।

এক ভাই একটি ঘটনা বললেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র চিল্লা থেকে এসে পড়াশোনা ছেড়ে এলাকায় চলে গেছে। পরে তার এলাকায় একবার সফরে গিয়ে দেখা গেল পোস্টারে তার নামের আগে লেখা- “বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ…”। এই কথা শুনে স্যার হালকা মুচকি হাসলেন। সরাসরি কিছু না বলে, ইঙ্গিতপূর্ণ ভঙ্গিতে একই শব্দ উচ্চারণ করলেন, “বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ!” এই ছোট্ট প্রতিক্রিয়ার মধ্যেই একটি বড় শিক্ষা ছিল।

প্রাসঙ্গিক আলোচনায় আরও কিছু বিষয় উঠে আসে, অনেক সময় দেখা যায়, কেউ ভালো নিয়তে উম্মতের উপকারের জন্য বই লিখছেন। অনেক পরিশ্রম করছেন, সময় ও অর্থ ব্যয় করছেন, বই প্রকাশ করছেন। কিন্তু সেই বইয়ের পাঠক তৈরি হয় না। বইগুলো মাদ্রাসায় জমে থাকে, লাইব্রেরিগুলো নিতে চায় না। পরে কোনো মেহমান এলে উপহার হিসেবে দিয়ে জায়গা খালি করা হয়। আর যিনি বই নিয়ে যান, তিনি হয়তো সেটি পড়েনও না, শুধু তাকেই সাজিয়ে রাখেন।

স্যার বলেন, শুধু পরিশ্রম করলেই যথেষ্ট নয়; কাজের ভেতরে এমন মান, গভীরতা ও প্রয়োজনীয়তা থাকা দরকার, আর তার চেয়েও বড় দরকার, মানুষের অন্তরে পৌঁছাতে পারে এমন ইখলাস। স্যার বলেন, লেখালেখি, বক্তৃতা, নেতৃত্ব- এসব বিশেষ যোগ্যতা, গভীরতা ও ইখলাসের বিষয়। নিজেকে বড় করে উপস্থাপন করার চেয়ে নিজের ভেতরকে গড়ে তোলা বেশি জরুরি। যোগ্যতা, ইখলাস ও গভীরতা ছাড়া কোনো খেদমত স্থায়ী প্রভাব ফেলে না। যে ব্যক্তি নিঃশব্দে নিজের যোগ্যতা তৈরি করে, আল্লাহ তাআলাই সময় হলে (কবুল করলে) তাকে (কৃত খেদমতকে) মানুষের অন্তরে স্থান করে দেন।

৩১২. রাজশাহীতে কাজল ভাইয়ের বাসায় একবার এক ঘরোয়া বৈঠকে, মাহফুজ…

রাজশাহীতে কাজল ভাইয়ের বাসায় একবার এক ঘরোয়া বৈঠকে, মাহফুজ ভাইসহ দুই একজন সাথী ছিলেন, কোনো আনুষ্ঠানিক বয়ান বা মোজাকারা ছিল না; বরং প্রসঙ্গক্রমে চলা এক ঘরোয়া বৈঠক। কথার এক পর্যায়ে স্যার বাংলা সাহিত্যের এক কবি, কবি মুহাম্মদ রফিক এর একটি বহুল আলোচিত উক্তি “সব শালা কবি হবে” তুলে ধরেন, যা সে সময়ের প্রেক্ষাপটে আলোড়ন তুলেছিল।

স্যারের ছাত্রজীবনে এই কবির সাথে পরিচয় ও বন্ধুত্ব ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তারা একই বর্ষের ছিলেন এবং একই কক্ষে থাকতেন। সে সময় দেশ ছিল রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে, রাষ্ট্রপ্রধানের লিখা কবিতা তখনকার বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকের প্রথম পাতায় ‘বিশেষ মর্যাদা’য় প্রকাশিত হতে শুরু করেছে। কবি মোহাম্মদ রফিক তৎকালীন রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সামাজিক অবক্ষয়কে তুলে ধরেছিলেন তার এক কবিতার মাধ্যমে। সেই বিখ্যাত ‘খোলা কবিতা’র দুঠো পংক্তি এরকম-

– ‘সব শালা কবি হবে; পিঁপড়ে গোঁ ধরেছে, উড়বেই;

– বন থেকে দাঁতাল শুয়োর রাজাসনে বসবেই।’

কবি রফিক-এর ঔ উক্তিটা উল্লেখ করে গভীর একটা বাস্তবতা স্যার নিয়ে এসেছিলেন। স্যার বোঝান, সব কাজ সবার জন্য না, দেখাদেখি করে কিছু হওয়া যায় না, শুধু অন্য কাউকে দেখে অনুকরণ করলে সত্যিকারের যোগ্যতা তৈরি হয় না।

স্যার বলেন, কেউ একজন ভালো বক্তা, তাকে দেখে আমিও বক্তা হতে চাই; কেউ বই লিখছে, আমিও লিখতে শুরু করি; কেউ দাওয়াতের কাজে পরিচিত, আমিও একইভাবে পরিচিত হতে চাই; এখানে সমস্যা ইচ্ছার মধ্যে না, ইচ্ছার পেছনের মানসিকতায়। আসল সমস্যা কোথায়? যখন চিন্তা হয়, “ও করছে, আমিও করব”; “ওর নাম হচ্ছে, আমারও হওয়া দরকার”; তখন কাজটা হয় ’অনুকরণ’, ’প্রতিযোগিতা’, বা কখনো ’নামের লোভ থেকে’। কিন্তু তখন থাকে না: গভীরতা, প্রস্তুতি, ইখলাস; ফলে বাইরে কাজটা একই রকম দেখালেও, ভেতরে শক্তি থাকে না।

কোনো ভালো মানুষকে দেখে অনুপ্রাণিত হওয়া অবশ্যই ভালো। কিন্তু তার কাজের অনুকরণের পূর্বে চিন্তা হওয়া উচিত, “আমি কি এই কাজের জন্য উপযুক্ত, আমার এটার জন্য কি প্রস্তুতি আছে, আমার ভেতরে কি এই কাজের হক আদায় করার যোগ্যতা আছে?”

স্যার বলেন, মহান দাঈ ও বক্তা আলী মিয়া রহমাতুল্লাহি আলাইহি (আবুল হাসান আলী নদভী) সারা পৃথিবী ঘুরে অসাধারণ বক্তৃতা দিয়েছেন। উনাকে দেখে অনেকেই বক্তা হতে চায়। স্যার বলেন, চেষ্টা করলেই সবাই বক্তা হয়ে যায় না। একইভাবে লেখালেখির প্রসঙ্গে স্যার বলেন, লেখা সবাই পারে, কিন্তু লেখক সবাই না। তিনি উদাহরণ দেন, হযরত মাওলানা ইলিয়াস রহমাতুল্লাহি আলাইহি- এর জীবনী যদি আমরা লিখতাম, হয়তো দশ ভলিউম লিখে ফেলতাম, কিন্তু ভেতরে থাকত না কিছুই; অথচ আলী মিয়া উনার জীবন নিয়ে ছোট্ট একটি কিতাব (দ্বীনি দাওয়াত) লিখেছেন, এইটা একটা প্রাণবন্ত জীবনী।

স্যার বলেন, কিতাব লেখা, জীবনী লেখা সহজ কাজ নয়; গভীরতা, উপলব্ধি ও আমল না থাকলে শুধু শব্দ দিয়ে বই হয়, কিন্তু উপকার হয় না। মিম্বারে উঠে কথা বললেই বক্তা হওয়া যায় না, কবিতা লিখলেই কবি হওয়া যায় না, নামে বই প্রকাশ হলেই লেখক হওয়া যায় না। এগুলো বিশেষ যোগ্যতার বিষয়, মেহনতের বিষয়, এবং আল্লাহর দেওয়া বিশেষ অনুগ্রহ।

৩১৩. একবার বিশ্ব ইজতেমায় ইয়েমেন থেকে তিনজন সম্মানিত শায়েখ আগমন…

একবার বিশ্ব ইজতেমায় ইয়েমেন থেকে তিনজন সম্মানিত শায়েখ আগমন করেন। উনারা সবাই হাশিমি বংশের, ইয়েমেনের হাদরামাউত অঞ্চলের প্রসিদ্ধ মাদ্রাসার উস্তাদ এবং তাসাউফের বড় মাশায়েখ (পীর) ছিলেন। ইজতেমার আরব টেন্টে উনাদের উপস্থিতি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। মিশরের জিম্মাদার সাথী আব্দুল মোনায়েম আব্দেল্লাহকে উনাদের খেদমতে নিয়োজিত করা হয়। ইজতেমা শেষে উনারা তিন দিনের জন্য সময় দিতে সম্মত হন। উনাদের জামাতের রুখ করা হয় সিলেটের হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহি আলাইহির মাজার মসজিদে; সাধারণভাবে গ্রহণযোগ্য ঐতিহাসিক মতে হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহি আলাইহির জন্মও ইয়েমেনের হাদরামাউত অঞ্চলে এবং তিনি ও আরবের বিখ্যাত হাশিমি বংশীয় ছিলেন। সেই জামাতে স্যারকেও সাথে যাওয়ার জন্য বলা হয়।

ময়দান থেকে জামাত রওনা দিল। পথে মাগরিব পড়া হলো মাদানীনগর মাদ্রাসায়। এরপর শীতের রাতে গাড়ি চলতে লাগল সিলেটের দিকে। রাস্তা ছিল ভাঙাচোরা অন্ধকার ও কষ্টকর, তার সাথে ছিল প্রচণ্ড কুয়াশা। এক পর্যায়ে গভীর রাতে ড্রাইভার পথ ভুল করে অন্যদিকে চলে যায়। রাত প্রায় দুইটা-আড়াইটার সময় গাড়ি নরসিংদী পার হয়ে কোনো এক এলাকায় ঢুকে পড়ে।

সেখানে পথ খোঁজার জন্য যেখানে থামা হলো, পার্শ্ববর্তী একটি বাড়িতে ঘটনাক্রমে সেই সময় কোনো উপলক্ষে অতিথিপরায়ণতার আয়োজন ছিল। মাঝরাতে ভূলপথে পৌঁছে জামাতের জন্য খানা পিনা, চা-নাস্তা ও উত্তম আপ্যায়নের ব্যবস্থা হয়ে গেল। ইয়েমেনি শায়েখগণ বিস্মিত হয়ে গেছেন, কোথায় যাচ্ছেন, কোথায় এসেছেন, কিছুই জানা নেই; আবার ড্রাইভার করেছে রাস্তা ভুল, ভূল পথে আবার আল্লাহপাক রেখেছেন রিজিক, হয়ে গেল উত্তম খানাপিনাও চা নাস্তার ব্যবস্থা।

খানা শেষে গাড়ি চলা শুরু হলে পথিমধ্যে এক সাথী কুরআন শরীফের সূরা আশ-শূরা এর একটি আয়াত পাঠ করলেন এবং এর অর্থ জানতে চাইলেন: “اللّٰهُ لَطِيفٌ بِعِبَادِهِ يَرْزُقُ مَن يَشَاءُ وَهُوَ الْقَوِيُّ الْعَزِيزُ”

স্যার সম্ভবত বুঝতে পেরেছিলেন, তিনি আসলে কী জানতে চাচ্ছেন। স্যার সংক্ষেপে বললেন, “লতিফ সেই সত্তা, যিনি বান্দার অন্তরের গভীর প্রয়োজন ও গোপন চাহিদা সূক্ষ্মভাবে জানেন এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা করেন।” ছিল প্রয়োজন, পথ ভুল হয়েছে কিন্তু সেটাই হয়ে গেল রিজিকের দরজা। ঘটনাটি যেন সেই আয়াতের জীবন্ত তাফসীর হয়ে উঠল।

অন্য এক প্রসঙ্গে স্যার একবার বলেন, আল্লাহ তাআলার “লুতফ (لُطف)” বা সূক্ষ্ম অনুগ্রহ অনেক সময় আমরা সাথে সাথে বুঝতে পারি না। কোনো ঘটনা আমাদের কাছে বিপদ বা ভুল মনে হতে পারে, কিন্তু তার ভেতরেই আল্লাহ তাআলা অদৃশ্যভাবে রহমত ও ব্যবস্থা রেখে দেন।

৩১৪. রংপুরের ভাই সাজ্জাদ বলেন, তাদের মহল্লার এক সাথী, ভাই…

রংপুরের ভাই সাজ্জাদ বলেন, তাদের মহল্লার এক সাথী, ভাই রিপন, একবার জামালপুরের এক সাথীর সাথে চিল্লায় যান। চিল্লার শেষে সেই জামালপুরের সাথী ব্যক্তিগত প্রয়োজনে রিপন ভাইয়ের কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা কর্জ নেন। সময় শেষে রিপন ভাই নিজ এলাকায় ফিরে আসেন। নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পর তিনি টাকা ফেরত চাইলেও, ওই সাথী বারবার “দিচ্ছি, দিচ্ছি” বলে দেরি করতে থাকেন। এভাবে অনেকদিন কেটে যায়, একসময় যোগাযোগও প্রায় বন্ধ করে দেন। প্রায় এক বছর পার হয়ে যায়, কিন্তু টাকা আর ফেরত আসে না। এই অবস্থায় ভাই রিপন ভাই সাজ্জাদকে একদিন বলেন, “তুমি তো রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যাচ্ছো, সুযোগ পেলে বিষয়টা স্যারকে বলে দেখো, কোনোভাবে যদি টাকাটা উদ্ধার করা যায়।” ভাই সাজ্জাদ একদিন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে স্যারের সাথে দেখা করে বিষয়টি খুব সাধারণভাবে তুলে ধরেন, “স্যার, এমন একটি ঘটনা, এ ব্যাপারে কি করা যায়?” বিষয়টি বাহ্যিকভাবে দেখলে স্যারের সাথে এর কোনো সরাসরি সম্পর্ক ছিল না। একজন রংপুরে, একজন জামালপুরে, স্যার রাজশাহীতে। তবুও স্যার বিষয়টিকে নিজের দায়িত্বের মতো গুরুত্ব সহকারে গ্রহণ করলেন। ভাই বলেন, কিছুদিন পর স্যার আমাকে ডেকে জামালপুরের একজন দায়িত্বশীল সাথীর যোগাযোগের নম্বর দিলেন। তিনি সম্ভবত সেখানকার মারকাজের শূরার সাথী ছিলেন। স্যারের নির্দেশনা অনুযায়ী তার সাথে যোগাযোগ করা হলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই রিপন ভাইয়ের টাকা সহজেই উদ্ধার হয়ে যায়। ভাই বলেন, স্যার শুধু বড় বড় বয়ান বা নসিহতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না; বরং মানুষের বাস্তব সমস্যাকেও গুরুত্ব দিতেন। একজন মুমিনের হক নষ্ট হলে তা আদায়ের ব্যাপারে যত্নবান হওয়া, এটিও যে দ্বীনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, ভাই রিপনের এই ঘটনাকে নিজের দায়িত্বের মধ্যে নিয়ে স্যার তা বাস্তবভাবে বুঝিয়েছেন।

৩১৫. একবার আল্লাহর রাস্তায় (তাবলিগে) সময় লাগানো অবস্থায় স্যার এক…

একবার আল্লাহর রাস্তায় (তাবলিগে) সময় লাগানো অবস্থায় স্যার এক কঠিন অবস্থার সম্মুখীন হন। সেই সময় উনার মেয়ে হঠাৎ মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েন, অবস্থা একেবারে সংকটজনক। পরিবারের সবাই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। পরিস্থিতি এতটাই আশঙ্কাজনক ছিল যে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করা জরুরি হয়ে পড়ে। স্যারের বড়ভাই (হেদায়েত আহমদ চৌধুরী, তখন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের চেয়ারম্যান) সহ আত্মীয়স্বজন দ্রুত উদ্যোগ নিয়ে উনাকে হাসপাতালে ভর্তি করান এবং চিকিৎসার সব ব্যবস্থা করেন।

ঠিক পরদিন সকালে কাকরাইল থেকে হাজী আব্দুল মুকিত সাহেব কয়েকজন উচ্চপদস্থ ব্যক্তিকে নিয়ে স্যারকে রাহবার করে বড়ভাইয়ের দফতরে গাসতে (সাক্ষাতে) যান। রিসেপশন থেকে নাম পাঠানোর পর বড়ভাই সবাইকে ভেতরে ডাকার আগে শুধু স্যারকে একা ডেকে পাঠান। ভেতরে ঢোকার পর তিনি স্যারকে কঠোরভাবে শাসন করেন এবং প্রচণ্ড কড়া ভাষায় বললেন, “মেয়ে মারা যায় যায় অবস্থা, আর তুমি তবলিগে ঘুরে বেড়াচ্ছো?” এরপর আবার সবাইকে ভেতরে ডেকে স্বাভাবিকভাবে হাসিমুখে কথা বলেন ও আপ্যায়ন করে বিদায় দেন। কিন্তু স্যারকে যে ধমকটি দিয়েছিলেন, তা তিনি একান্তভাবেই দিয়েছিলেন।

স্যার যখন বাড়িতে ফিরলেন, তখন মনে তীব্র ভয় ও সংকোচ ছিল। ভাবছিলেন, বাড়িতে হয়তো সবাই খুব রাগ করে আছেন এবং পরিবেশ বেশ উত্তপ্ত হবে। এমন সংকটের সময় বাসায় স্বাভাবিকভাবে অনেক অস্থিরতা থাকার কথা। কিন্তু তেমন কিছুই নেই, বাসার পরিস্থিতি আশ্চর্যজনকভাবে শান্ত ও স্বাভাবিক; তিনি অবাক হয়ে বিষয়টি লক্ষ্য করেন, কোনো অস্থিরতা বা হৈচৈ নেই।

পরে জানা গেল, এর পেছনের কারণটি ছিল স্যারের আহলিয়ার (স্ত্রী) দেখা একটি স্বপ্ন। সেই রাতে স্যারের আহলিয়া স্বপ্নে দেখেন, এক ব্যক্তি ছুরি নিয়ে বাসায় প্রবেশ করে বলছে,

“মুসফিককে তো পেলাম না, আতিককে মেরে গেলাম।”

(আতিক- স্যারের ছোট ভাই, ইসতিয়াক আহমদ চৌধুরী)

বাস্তবে দেখা গেল, সেই সংকটময় অবস্থায় স্যারের মেয়ে সুস্থ হয়ে উঠলেন, কিন্তু আতিক সাহেবের মেয়ে ইন্তেকাল করেন। এই স্বপ্ন থেকে স্যারের আহলিয়া তাবির করেছেন, আল্লাহর রাস্তায় থাকার কারণেই হয়তো আল্লাহ তাদের সন্তানকে হেফাজত করেছেন।

স্যার এই ঘটনাকে আরেকভাবে ব্যাখ্যা করেন। তিনি বাস্তবমুখী দিক থেকে বলেন, ”আমি উপস্থিত থাকলেও জাহেরী (জাগতিক) কোনো ব্যবস্থা সহজ হতো- এমন না, বরং না থাকাতেই বাহ্যিক ব্যবস্থাটা আরও সহজ হয়েছে। ভাই ও আত্মীয়রা দায়িত্ব নিয়ে দ্রুত সব ব্যবস্থা করে ফেলেছেন। তাদের তৎপরতায় দ্রুত অ্যাম্বুলেন্স, ভালো হাসপাতাল ও উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা সহজ হয়েছে। আমি থাকলে হয়তো সবাই ভাবত, ‘মুসফিক তো আছেই’। কিন্তু আমি না থাকায় আল্লাহ তাআলা অন্যদের মাধ্যমে কাজগুলো সহজ করে দিয়েছেন।”

নোট: আল্লাহ তাআলা উনার বান্দার জন্য এমনভাবে ফয়সালা করেন, যা অনেক সময় পরে গিয়ে বুঝা যায়। কখনো কখনো বান্দার অনুপস্থিতিই কল্যাণের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তবে এর অর্থ এই নয় যে স্যার এই ঘটনা দিয়ে বুঝিয়েছেন, দায়িত্বহীনতা গ্রহণযোগ্য। বরং যার উপর দায়িত্ব রয়েছে, সে যথাসাধ্য ব্যবস্থা করবে এবং আল্লাহর উপর ভরসা রাখবে- এ বিষয়েও স্যারের সুস্পষ্ট মুজাকারা রয়েছে।

৩১৬. একবার খবর এলো আব্দুস সোবহান স্যার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য…

একবার খবর এলো আব্দুস সোবহান স্যার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (ভিসি) হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন, যদিও তখনো তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেননি। সে সময় স্যার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে অবস্থান করছিলেন। এ খবর শোনার পর স্যার উনার সাথে সাক্ষাৎ করার আগ্রহ প্রকাশ করেন।

পরবর্তীতে অফিস সময়ে প্রথম বিজ্ঞান ভবনে আব্দুস সোবহান স্যারের চেম্বারে গিয়ে দেখা করা হয়। সেখানে স্যার অত্যন্ত আন্তরিকতা ও দরদের সাথে উনার সাথে দীর্ঘক্ষণ কথা বলেন। মনে হচ্ছিল একজন অভিভাবক যেন নিজের সন্তানের মতো কাউকে বড় একটি দায়িত্বে যাওয়ার আগে উপদেশ দিচ্ছেন।

কথার এক পর্যায়ে স্যার দায়িত্ব (জিম্মাদারি) সম্পর্কে একটি গভীর বিষয় তুলে ধরেন। হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু-এর একটি প্রসিদ্ধ উক্তি উল্লেখ করেন, “দজলা নদীর তীরে একটি বকরিও যদি অযত্নে মারা যায়, তবে আমার ভয় হয় যে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা আমাকে সে বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন।”

এরকম আরেকটি কথা প্রচালিত আছে, ইরাকের কোনো রাস্তায় যদি একটি খচ্চরের পা গর্তে পড়ে যায়, বা হোঁচট খায়, তবে উমরকে জিজ্ঞেস করা হবে: কেন তুমি তার জন্য রাস্তা সমান করে দাওনি?

স্যার বলেন, বাস্তবিক দৃষ্টিতে তো মদিনা থেকে বহু দূরে দজলা নদীর পাড়ে কী ঘটছে, তা জানা একজন শাসকের পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু হযরত উমর রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু সেই ছাগলের ব্যাপারেও নিজের দায়িত্ব অনুভব করছেন; এই কথার মাধ্যমে উমর রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু ‘দায়িত্বের অনুভূতি’ বুঝিয়েছেন।

একজন উপাচার্যের পক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি কোণে কী ঘটছে, তা সরাসরি জানা সম্ভব নয়। স্যার বলেন, একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তির জন্য সবকিছু জানা সম্ভব নয়, কিন্তু তার অন্তরে যদি দায়িত্বের ফিকির থাকে, তাহলে আল্লাহ তাআলা তাকে সাহায্য করেন।

যদি দায়িত্ববোধ জাগ্রত থাকে, তাহলে আল্লাহ তাআলা কাজকে সহজ করে দেন এবং অনেক অদেখা বিষয় থেকেও হেফাজত করেন। স্যার আরও ইঙ্গিত দেন- দায়িত্বের সাথে সাথে শত্রুতা, বিরোধিতা ও বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ এসে থাকে। দায়িত্বশীল ব্যক্তির উচিত আল্লাহর সাথে সম্পর্ক মজবুত রাখা, নিয়মিত দোয়া ও যিকিরে থাকা এবং বিশেষভাবে ‘মানযিল’ পড়ার প্রতি যত্নবান হওয়ার ব্যাপারে স্যার তাকিদ দেন, যাতে আল্লাহ তাআলার হেফাজত লাভ করা যায়।

স্যার বোঝান, দায়িত্ব শুধু একটি পদ নয়; এটি একটি আমানত। এর সাথে জবাবদিহিতা জড়িত। সবকিছু নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব না হলেও, অন্তরে যদি জবাবদিহিতার সঠিক ফিকির ও দায়িত্ববোধ থাকে, তাহলে আল্লাহ তাআলা সাহায্য করেন এবং কাজকে সহজ করে দেন।

৩১৭. ভাই আব্দুল কাইয়ুম বলেন, একবার নারায়ণগঞ্জে সফরে এক মসজিদের…

ভাই আব্দুল কাইয়ুম বলেন, একবার নারায়ণগঞ্জে সফরে এক মসজিদের জামাতের সাথীরা এসে স্যারকে দাওয়াত দিলেন। তারা বললেন, “স্যার, আমাদের পক্ষ থেকে পুরো জামাতের জন্য দাওয়াত।” স্যার এই দাওয়াত গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানালেন। তিনি স্পষ্টভাবে বললেন, “‘আমাদের পক্ষ থেকে’, এমন কোনো দাওয়াত হয় না।” মহল্লার সাথীরা নাছোড়বান্দা; তারা জোর দিয়ে বলতে লাগলেন যে তারা সবাই মিলে জামাতকে খাওয়াতে চান। স্যার প্রশ্ন করলেন, “কে খাওয়াবে?” তারা উত্তর দিলেন, “আমরা খাওয়াবো।” স্যার অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বললেন, “এই ‘আমরা’ বলতে কোনো দাওয়াত হয় না। কে দাওয়াত দিচ্ছে, দাওয়াত হতে হবে নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির পক্ষ থেকে।” পরবর্তীতে একজন সাথী যখন আলাদাভাবে এসে বললেন, “স্যার, এই বেলার খাবার আমার পক্ষ থেকে দাওয়াত।” তখন স্যার বললেন, “হ্যাঁ, এটা ঠিক আছে। এই দাওয়াত গ্রহণ করা যায়।”

ভাই বলেন, সবাই মিলে চাঁদা তুলে একবেলা, একদিন বা তিনদিন খাওয়ানোকে স্যার প্রকৃত মেহমানদারী মনে করতেন না। স্যার বলতেন, দাওয়াত কেবল পেট ভরার মাধ্যম নয়, বরং এটি একটি ইবাদত। আর ইবাদতে ব্যক্তির নিষ্ঠা (ইখলাস) ও নির্দিষ্ট সংকল্প প্রয়োজন। তাই দাওয়াত দেওয়ার সময় ‘আমরা’ নয়, বরং ‘আমি’ বা নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির পক্ষ থেকে হওয়াটাই উত্তম। স্যার চেয়েছিলেন দাওয়াত যেন কোনো “মসজিদওয়ার জামাত” বা “কমিটি” বা “অজ্ঞাত গোষ্ঠী”র পক্ষ থেকে না হয়ে নির্দিষ্ট কোনো বান্দার পক্ষ থেকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হয়। স্যার চাচ্ছিলেন সাথীরা যেন মেহমানদারীকে একটি ‘সামাজিক অনুষ্ঠান’ না বানিয়ে বরং ‘ব্যক্তিগত ইবাদত’ হিসেবে গ্রহণ করে।

৩১৮. এক মুজাকারায় স্যার দ্বীনি মেহমানদারী ও তাবলীগী উসূলের সূক্ষ্ম…

এক মুজাকারায় স্যার দ্বীনি মেহমানদারী ও তাবলীগী উসূলের সূক্ষ্ম কিছু আদব বলেছিলেন। স্যার বলেন, দ্বীনের কাজে বের হওয়া জামাতের মেহমানদারী কোনো সামাজিক লৌকিকতা বা প্রথা নয়। যখন বলা হয় “আমরা খাওয়াবো” বা মহল্লার পক্ষ থেকে চাঁদা তুলে খাওয়ানো হয়, তখন তাতে ব্যক্তিগত আন্তরিকতা বা ‘ইকরাম’ (সম্মান) এর চেয়ে একটি ‘অনুষ্ঠান’ বা ‘রুটিন’ কাজ বেশি প্রকাশ পায়। আর দাওয়াত যখন নির্দিষ্ট ব্যক্তির পক্ষ থেকে হয়, সেখানে মেজবানের সাথে মেহমানের একটি আত্মিক সম্পর্ক তৈরি হয়।

স্যার বলেন, নিয়ম অনুযায়ী কোনো কিছু দান করা বা মেহমানদারী করার জন্য ‘মালিকানা’ স্পষ্ট হওয়া জরুরি। যখন বলা হয় ‘আমাদের পক্ষ থেকে’ এবং এর পেছনে নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি খরচ না করে বরং চাঁদা বা অস্পষ্ট কোনো উৎস থাকে, তখন সেখানে মেজবান (যিনি খাওয়াচ্ছেন) কে, তা অস্পষ্ট থেকে যায়। যখন একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তি দাওয়াত দেন, তখন তার অন্তরে মেহমানের প্রতি যে মহব্বত ও ত্যাগের জজবা থাকে, “আমাদের” বা “কমিটির” দাওয়াতের ক্ষেত্রে অনেক সময় সেই ব্যক্তিগত রুহানিয়াত বা আন্তরিকতা থাকে না।

নির্দিষ্ট ব্যক্তি যখন বলেন “আমার দাওয়াত”, তখন তিনি মেহমানের প্রতিটি লোকমার সওয়াব নিজের জন্য আশা করেন এবং মেহমানের সর্বোচ্চ খেদমত করার চেষ্টা করেন। “আমরা” শব্দের আড়ালে অনেক সময় দায়িত্বহীনতা বা লৌকিকতা লুকিয়ে থাকে। মেহমানদারীর মূল প্রাণ হলো ‘ইকরাম’। যখন মহল্লার পক্ষ থেকে বা কমিটির পক্ষ থেকে খানা আসে, তখন সেটি কেবল একটি ‘অর্ডার’ বা ‘প্রথা’ হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু যখন একজন ব্যক্তি তার ঘর থেকে খানা নিয়ে আসেন, তখন সেই খানার সাথে তার মহব্বত ও দোয়া শামিল থাকে। স্যার মূলত এই ব্যক্তিগত আত্মিক সম্পর্কের ওপর জোর দিয়েছেন।

স্যারের অভিমত ছিল, মহল্লায় জামাত আসলে কে খাওয়াবে, তা নিয়ে মসজিদে বসে মাশওয়ারা (পরামর্শ) করা বা চাঁদা তোলা তাবলীগী উসূলে কাম্য নয়। কারণ, এতে অনেক সময় কারো ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি হতে পারে। বরং নিয়ম হলো, মহল্লার সাথীরা ব্যক্তিগতভাবে আগ্রহ নিয়ে জামাতের জিম্মাদারকে দাওয়াত দেবেন। জামাতের জিম্মাদার বা আমীর যখন কোনো দাওয়াত গ্রহণ করবেন, তখন তাকে নিশ্চিত হতে হবে যে এটি কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির আন্তরিক দাওয়াত কি না। “মহল্লার দাওয়াত” হিসেবে নয়, বরং “অমুক ভাইয়ের দাওয়াত” হিসেবে তা গ্রহণ করা উচিত। এতে মেজবানের ইখলাস বজায় থাকে এবং মেহমানের প্রতি তার ব্যক্তিগত দায়িত্ববোধ তৈরি হয়।

স্যার বলতেন, “আমাদের দাওয়াত” বললে সেটি একটি ‘প্রথা’ বা ‘রুটিন’ হয়ে যায়, জামাতকে খাওয়ানোর জন্য মসজিদ ভিত্তিক চাঁদা তোলা বা ‘সবাই মিলে’ কোনো আয়োজন করাতে অনেক সময় কারো ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি হতে পারে (কেউ হয়তো লোকলজ্জার ভয়ে চাঁদা দিচ্ছে)। বরং মেহমানদারী খাওয়ানোর দ্বারা দাতা (মেজবান) ও গ্রহীতার (মেহমানের) মাঝে একটি মহব্বতের সম্পর্ক তৈরি হওয়া চাই।

৩১৯. একবার এক ভাই স্যারের নিকট গাইবান্ধার জনৈক পুরাতন সাথীর…

একবার এক ভাই স্যারের নিকট গাইবান্ধার জনৈক পুরাতন সাথীর সংবাদ দিলেন। তিনি জানালেন যে, ওই ব্যক্তি তার পৈতৃক কিছু জমি বিক্রি করে দিচ্ছেন। সংবাদটি শোনামাত্র স্যার রীতিমতো চমকে উঠলেন এবং বিচলিতভাবে এর কারণ জানতে চাইলেন। ভাইটি কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “স্যার, সামান্য জমি বিক্রির কথা শুনে আপনি এতটা আঁতকে উঠলেন কেন?”

তখন স্যার যে উত্তর দিলেন, তা হলো- “তেমন কিছু নয়, তবে সাধারণত সমাজে দুই শ্রেণির মানুষের দেখা মেলে। এক শ্রেণির মানুষের নেশা হলো জমি কেনা, আর অন্য শ্রেণির নেশা হলো জমি বিক্রি করা।”

স্যার বিষয়টি বুঝিয়ে বললেন: যাদের রক্তে জমি কেনার নেশা মিশে আছে, তারা সারাজীবন অতি সাধারণ ও কৃচ্ছ্রসাধনের মধ্য দিয়ে জীবন অতিবাহিত করেন। তারা নিজেদের আরাম-আয়েশ বিসর্জন দিয়ে তিল তিল করে সম্পদ বৃদ্ধিতে মগ্ন থাকেন। নিজের জীবনকে অত্যন্ত কষ্টকর বা ‘ফকিরের হাল’ করে রাখে, মৃত্যুর সময় ১০০ বিঘা জমি (বিপুল পরিমাণ স্থাবর সম্পত্তি) রেখে যায়।

বিপরীত দিকে, যাদের একবার জমি বিক্রির নেশা বা অভ্যাস ধরে যায়, তারা ছোটখাটো প্রয়োজন বা বিলাসিতার অযুহাতে সম্পদ হাতছাড়া করতে শুরু করে। একবার এই পথ উন্মুক্ত হলে তা আর থামতে চায় না। ফলশ্রুতিতে, এক সময়ের সচ্ছল ব্যক্তিও একদিন নিঃস্ব ও রিক্ত হয়ে পড়ে। বর্ণনাকারী ভাইটি বলেন, স্যার সেদিন ওই সাথীর ব্যাপারে যে আশঙ্কা করেছিলেন, পঁচিশ বছর পর আজ তা-ই অক্ষরে অক্ষরে সত্য প্রমাণিত হয়েছে। সম্পদ ধরে রাখার মানসিকতা হারিয়ে আজ সেই ব্যক্তি সম্পূর্ণ নিঃস্ব ও উদ্বাস্তু জীবন যাপন করছেন।

৩২০. হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু একবার একটি…

হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু একবার একটি কঠোর বাক্য ব্যবহার করেছিলেন, اُمْصُصْ بَظْرَ اللَّاتِ

(এটি আরবদের ভাষায় অত্যন্ত অশালীন গালি ছিল, মক্কার প্রধান দেবী ‘লাত’ প্রাসঙ্গিক তৎকালীন আরবে এটি ছিল চরম অবমাননাকর একটি গালি, যা অত্যন্ত অবজ্ঞাভরে ব্যবহৃত হতো)।

হোদায়বিয়ার সন্ধির সংকটময় মুহূর্তে মক্কার কুরাইশ প্রতিনিধি উরওয়া ইবনে মাসউদ যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি অবমাননাকর ইঙ্গিত করেছিলেন, এবং তার ধৃষ্টতাপূর্ণ কথার জবাবে তখন হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু অত্যন্ত রাগান্বিত হয়ে তাদের প্রিয় দেবীর নাম উল্লেখ করে এই কঠোর শব্দ প্রয়োগ করেছিলেন, যাতে তারা বুঝতে পারে তাদের অবস্থান কতটা তুচ্ছ।

সাধারণ দৃষ্টিতে এটি অন্যের উপাস্যকে গালি না দেওয়ার কুরআনী নির্দেশনার সাথে সাংঘর্ষিক মনে হতে পারে। যাতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, কোরআন শরীফে তো স্পষ্টভাবে অন্যের উপাস্যদের গালমন্দ করতে নিষেধ করা হয়েছে,

وَلَا تَسُبُّوا الَّذِينَ يَدْعُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ فَيَسُبُّوا اللَّهَ عَدْوًا بِغَيْرِ عِلْمٍ

তাহলে একজন মহান সাহাবী এমন কথা কীভাবে বললেন? এই বিষয়টি পরিষ্কার হবার জন্যই হযরত মাওলানা সাইয়েদ আহমদ খান সাহেবের নিকট স্যার দশ দিনের জোরে প্রশ্নটি উত্থাপন করেছিলেন।

তিনি সরাসরি উত্তর না দিয়ে একটি গভীর তাৎপর্যপূর্ণ পাল্টা প্রশ্ন করলেন-

کیا ابو بکر نبی تھے؟ ابو بکر نبی تھے؟ “আবু বকর কি নবী ছিলেন?”

তিনি একই প্রশ্ন দু’বার করলেন। স্যার আবার ওই একই প্রশ্ন করলেন, এবারও হযরত মাওলানা সাহেব স্যার কে আবার ওই একই কথা জিজ্ঞাসা করলেন যে, আবুবকর কি নবী ছিলেন? স্যারের ভাষায় এই সংক্ষিপ্ত প্রশ্নই তখন বিষয়টির প্রকৃত উপলব্ধির পথ উন্মুক্ত করে দিল। হযরত মাওলানা সাহেবের শিক্ষা হলো, কাউকেই নবীর সমপর্যায়ে নেওয়া যাবে না।

মাওলানা সাইয়েদ আহমদ খান সাহেব এই প্রশ্নের মাধ্যমে বোঝাতে চেয়েছিলেন, হযরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু নিঃসন্দেহে সর্বশ্রেষ্ঠ সাহাবীদের একজন, কিন্তু তিনি নবী নন। আর ইসলামের আকিদা অনুযায়ী, ভুল থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত (মাসুম) কেবল নবীগণই। নবী ব্যতীত যেকোনো কারো দ্বারা ইজতিহাদি বা পরিস্থিতিগত ভুল হতে পারে। সাধারণ মানুষ, এমনকি সাহাবীরাও, মানবীয় সীমাবদ্ধতার বাইরে নন।

স্যার বলেন, হযরত মাওলানা সাহেবের এই সংক্ষিপ্ত কিন্তু গভীর প্রশ্নের (উত্তরের) মাঝে লুকায়িত ছিল ইসলামের এক মৌলিক আকিদা। নিষ্পাপত্ব কেবল নবীদের গুণ: ইসলামি আকিদা অনুযায়ী, একমাত্র আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামগণই ‘মাসুম’ বা ভুলের ঊর্ধ্বে। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সর্বক্ষণিক সঙ্গী হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু-এর সেই উক্তিটি ছিল উনার তীব্র আবেগ ও নবীপ্রেমের বহিঃপ্রকাশ।


← আগের পর্ব (২৮১–৩০০)  |  সূচিপত্র  |  পরের পর্ব (৩২১–৩৪০) →

সংগ্রহ ও সংকলন: মুশফিক আহমদ (রহঃ)-এর মালফুযাত সংকলন।

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *