মালফুযাত – প্রফেসর মুশফিক আহমদ (রহঃ) – পর্ব ১৭: ৩২১–৩৪০
প্রফেসর মুশফিক আহমদ (রহঃ)-এর বয়ান, পরামর্শ, আমল ও দাওয়াতি জীবনের মালফুযাত, ৩২১ থেকে ৩৪০ নম্বর। সম্পূর্ণ সূচিপত্র দেখুন।
সংগ্রহ ও সংকলন: মুশফিক আহমদ (রহঃ)-এর মালফুযাত সংকলন।
এই পর্বে যা আছে
- ৩২১. এক মোজাকারায় স্যার বলেন, কোনো পীর, আলেম, মুরুব্বী, বুযুর্গ-…
- ৩২২. রাজশাহীর এক পুরাতন জিম্মাদার সাথী একবার সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলর…
- ৩২৩. একবার মাদানীনগর মাদ্রাসার ইছলাহী জোড়ে স্যার অবস্থান করছিলেন। সে…
- ৩২৪. নওগাঁর আত্রাইয়ের প্রিন্সিপাল আব্দুর রউফ খান সাহেব মঈন শূরা…
- ৩২৫. রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদের মুয়াজ্জিন হাফেজ শাহজুল ইসলাম সাহেব…
- ৩২৬. আরাফাত ভাই বলেন, সম্ভবত ২০০৪ সালের দিকে দিনাজপুর জেলায়…
- ৩২৭. একবার লন্ডনে একটি ইজতেমা/জোর উপলক্ষে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান…
- ৩২৮. রাজশাহীর আরানীর শহীদুল ইসলাম ভাই বলেন, একবার তিনি উনার…
- ৩২৯. শহীদুল ইসলাম ভাই স্মৃতিচারণ করে বলেন, বহু বছর আগের…
- ৩৩০. খুলনার হাফেজ মাওলানা মামুন সাহেব বলেন, আমরা সাধারণত কোনো…
- ৩৩১. একবার দশ দিনের জোড়ের মাঝখানের ৪ দিনের বড় এক…
- ৩৩২. স্যারের ইন্তেকালের কিছুদিন আগে, যখন তিনি পর্চা ছাড়া জামাতে…
- ৩৩৩. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের মজমায় এক মুজাকারায় স্যার বলেন, যারা…
- ৩৩৪. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে এক মুজাকারায় স্যার বলেন, আমরা…
- ৩৩৫. মানুষ সাধারণত খুব দ্রুত নিজের অনুভূতির উপর নির্ভরশীল হয়ে…
- ৩৩৬. ঢাকায় এক প্রোগ্রাম শেষে উপস্থিত সাথীদের মধ্যে পরামর্শ হলো…
- ৩৩৭. নওগাঁ জেলার চকদেবপাড়ার বাসিন্দা কাজী আনসার আলী সাহেব ছিলেন…
- ৩৩৮. বাচ্চাদের সাথে স্যারের এক অমায়িক ও শিশুসুলভ আচরণের ঘটনা…
- ৩৩৯. ঢাকার পশ্চিম আগারগাঁও এলাকায় এক ভাইয়ের বাসায় দুপুরে খানার…
- ৩৪০. একবার স্যার কিছু সাথী সহ ঢাকার পশ্চিম রাজাবাজারে আবুল…
৩২১. এক মোজাকারায় স্যার বলেন, কোনো পীর, আলেম, মুরুব্বী, বুযুর্গ-…
এক মোজাকারায় স্যার বলেন, কোনো পীর, আলেম, মুরুব্বী, বুযুর্গ- এমনকি সাহাবীকেও নবীদের পর্যায়ে উঠিয়ে দেওয়া যাবে না। “তিনি ভুল করতে পারেন না”, এই ধারণা শুধুমাত্র নবীদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। মানুষের প্রতি অতিরঞ্জিত ভক্তি থেকে যদি তাকে ভুলের ঊর্ধ্বে মনে করা হয়, তাহলে তা আকিদাগত বিচ্যুতি হয়ে যায়।
এটি নবীদের বিশেষ মর্যাদা, যা অন্য কারো ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।
وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الْهَوَىٰ
إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحَىٰ
“তিনি (নবী) নিজের প্রবৃত্তি থেকে কিছু বলেন না। এটি তো কেবলই ওহী, যা উনার কাছে প্রেরিত হয়।”
স্যার বলেন, মুরুব্বিদের প্রতি সম্মান রাখা আর উনাদেরকে ভুলের ঊর্ধ্বে মনে করা, এই দুইয়ের মাঝে আকাশ-পাতাল পার্থক্য রয়েছে। বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে পীর-মাশায়েখ বা মুরুব্বিদের এমন এক উচ্চাসনে বসানো হয়, যেন মনে হয় উনারা ভুল করতেই পারেন না, এমনকি তাদের ভুল কাজকে ভুল মনে করা হয় না। এটি একটি ভুল আকিদা। মুরুব্বিদের ভুল হতে পারে এবং সেই ভুলকে ভুল হিসেবেই দেখতে হবে। আমাদের জন্য আদর্শ হলো আল্লাহ ও উনার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর স্পষ্ট বিধান। স্যার সতর্ক করে বলতেন, মুরব্বি, পীর বা যেকোনো ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের প্রতি ভালোবাসা যেন অন্ধত্বে রূপ না নেয়।
স্যার এই বিষয়টি বিভিন্ন সময়ে জোর দিয়ে বুঝাতেন যে, আমাদের মুরুব্বি, আলেম বা নেতা, যেই হোন না কেন, তারা সম্মানের যোগ্য, কিন্তু তারা মানব। তাদের কথা ও কাজ কোরআন-সুন্নাহর আলোকে যাচাইযোগ্য। অন্ধ অনুসরণ ইসলাম সমর্থন করে না।
৩২২. রাজশাহীর এক পুরাতন জিম্মাদার সাথী একবার সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলর…
রাজশাহীর এক পুরাতন জিম্মাদার সাথী একবার সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলর পদে নির্বাচনে দাঁড়ান। স্যার সফর থেকে ফিরে এ খবর শুনে কাজল ভাইকে বললেন, “চলো, ওর সাথে একটু দেখা করে আসি।”
দু’জনে উনার বাসায় গেলেন। তিনি স্যারকে ভেতরে নেওয়ার জন্য অনুরোধ করছিলেন, কিন্তু স্যার ভেতরে প্রবেশ করলেন না; দরজার বাইরে দাঁড়িয়েই কথা বলতে চাইলেন।
স্যার প্রথমেই জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি নাকি নির্বাচনে দাঁড়িয়েছো? কেন দাঁড়িয়েছো?”
তিনি বললেন, “স্যার, আমি ইস্তেখারা করেছি।”
স্যার আবার জিজ্ঞাসা করলেন, “ইস্তেখারায় কী পেয়েছো?”
তিনি বললেন, “আমি স্বপ্নে চেয়ার দেখেছি।”
এ কথা শুনে স্যার শুধু বললেন, “ও… কুরসি দেখেছো!”
কাজল ভাই বলেন, এই কথা বলে স্যার আর কোনো কথা না বলেই হাঁটা শুরু করলেন এবং বললেন, “চলো যাই।”
সে সময় স্যারের এভাবে চলে আসাটা কিছুটা খটকা লাগলেও তখন বিষয়টি পুরোপুরি বুঝতে পারিনি। পরবর্তীতে স্যারের সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়ার মধ্যে এই ইঙ্গিতই ছিল, “নির্বাচনে দাঁড়ানোর ইচ্ছাটা ওর কেন হলো?”
স্যার বোঝাতে চেয়েছেন, শুধু ইস্তেখারা করলেই যথেষ্ট নয়; ইস্তেখারার আগে নিজের নিয়ত ও উদ্দেশ্যকে যাচাই করা আরও জরুরি।
নিয়ত (অভ্যন্তরীণ উদ্দেশ্য) কেই স্যার মূল বিষয় হিসেবে তুলে ধরেন। কোনো কাজের আগে এই প্রশ্নটি জরুরি, “আমি কেন এটা করতে চাই?” স্যার বলেন, ইস্তেখারা করা ঠিক পদ্ধতি। কিন্তু তার আগে দেখতে হবে, এই কাজের ইচ্ছাটা কেন এসেছে? ভেতরে আসল উদ্দেশ্য কী? কেন উনার মনে হলো যে তাকে নির্বাচনে দাঁড়াতে হবে? মানুষের মনে যখন কোনো পদের বা লালসার সুপ্ত বাসনা থাকে, তখন ইস্তিখারায় সেই বাসনার প্রতিফলন হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
৩২৩. একবার মাদানীনগর মাদ্রাসার ইছলাহী জোড়ে স্যার অবস্থান করছিলেন। সে…
একবার মাদানীনগর মাদ্রাসার ইছলাহী জোড়ে স্যার অবস্থান করছিলেন। সে সময় এক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, তাবলীগের পুরাতন সাথী, যিনি সৌদি আরবে চাকরিতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, স্যারের সাথে বিদায় সাক্ষাৎ করতে আসেন।
কথার এক পর্যায়ে তিনি স্যারকে বললেন, “দুই বছরের জন্য সৌদি আরবে চাকরিতে যাচ্ছেন, এবং আরো জানালেন যে আমি নিজে সাধারণত সব কাজেই ইস্তেখারা করি। এই সিদ্ধান্তটাও (সৌদি যাওয়া) ইস্তেখারা করেই নিয়েছি।”
তখন স্যার কিছু কথা বলতে গিয়ে বলেন, “কোনো কাজের আগে নিয়ত যাচাই করা সবচেয়ে জরুরি। ইস্তেখারা করা সঠিক পদ্ধতি। কিন্তু তার আগে দেখতে হবে, এই কাজের ইচ্ছাটা কেন হলো?”
স্যার বলেন, মানুষের কাজের ক্ষেত্রে দুইটি দিক থাকে, পদ্ধতি এবং নিয়ত বা অন্তরের চাহিদা। পদ্ধতি ঠিক হলেও যদি অন্তরের উদ্দেশ্য ভুল হয়, তাহলে সেই আমল সঠিক ফল দেয় না। শুধু ইস্তেখারা করলেই যথেষ্ট নয়; বরং তার আগে নিজের অন্তরের উদ্দেশ্য পরিষ্কার হওয়া জরুরি।
যেহেতু তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের মাঝে সুপরিচিত ও অনুসরণীয় ছিলেন, সম্ভবত এ কারণেই স্যার কিছুটা সরাসরি ইঙ্গিত দেন যে, অনেক সময় বাহ্যিকভাবে দ্বীনি উদ্দেশ্যের কথা বলা হলেও, অন্তরে দুনিয়ার লাভ, যেমন বেশি আয়, সুযোগ-সুবিধা বা অবস্থান লুকিয়ে থাকতে পারে। তখন সেই উদ্দেশ্যের উপর ভিত্তি করে করা ইস্তেখারা প্রকৃত দিশা দেয় না। যদি বিদেশের চাকরিতে বেতন ও সুযোগ-সুবিধা বর্তমান অবস্থার চেয়ে কম হতো, তাহলে কি একইভাবে সেখানে যাওয়ার জন্য ইস্তেখারা করতাম? দেশে সম্মানজনক অবস্থান থাকা সত্ত্বেও কেন বিদেশে যাওয়ার ইচ্ছা জাগল, এই প্রশ্নটি আগে নিজের কাছে করা জরুরি।
৩২৪. নওগাঁর আত্রাইয়ের প্রিন্সিপাল আব্দুর রউফ খান সাহেব মঈন শূরা…
নওগাঁর আত্রাইয়ের প্রিন্সিপাল আব্দুর রউফ খান সাহেব মঈন শূরা এবং নওগাঁ জেলার শূরার একজন সাথী ছিলেন। স্যারের সাথে উনার গভীর মহব্বত ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার সম্পর্ক ছিল।
জীবনের শেষ দিকে তিনি মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েন। সংবাদ পেয়ে স্যার উনাকে দেখার জন্য আত্রাইয়ে উনার বাড়িতে উপস্থিত হন। প্যারালাইসিসের কারণে উনার একটি হাত ও একটি পা অকার্যকর হয়ে যায়; চলাফেরা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। শারীরিকভাবে অত্যন্ত দুর্বল থাকলেও উনার ঈমানি জজবা ও সজাগতা ছিল বিস্ময়কর। উনার চেতনা ও অনুভূতি সম্পূর্ণ সজাগ ছিল। শরীরের একপাশ অকেজো হওয়া সত্ত্বেও তিনি হুইলচেয়ারে করে স্থানীয় দাওয়াতের কাজে, এমনকি দ্বিতীয় গাশতেও শরিক হতেন। দ্বীনের মেহনতের প্রতি উনার এ মজবুত সম্পর্ক ছিল দৃষ্টান্তমূলক।
স্যারের সাথে স্থানীয় ও নওগাঁর কিছু সাথী ছিলেন। খবর পেয়ে উনার পরিবারের সদস্যরা, বিশেষ করে উনার এক ছেলে, যিনি স্থানীয় এক স্কুলের শিক্ষক ছিলেন, অত্যন্ত আগ্রহ ও আবেগ নিয়ে স্যারের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। স্যার পৌঁছালে পুরো বাড়িতে যেন আনন্দের পরিবেশ সৃষ্টি হয়; সবাই আন্তরিকতার সাথে মেহমানদারিতে লেগে যান। প্রিন্সিপাল আব্দুর রউফ সাহেব উনার এই অসুস্থ অবস্থায় স্যারকে কাছে পেয়ে অত্যন্ত আনন্দিত হন এবং ইশারায় সন্তানদের মেহমানদারির তাকিদ দিতে থাকেন। কথা বলতে না পারলেও ইশারা, ইঙ্গিতের মাধ্যমে ছেলেদেরকে নির্দেশ দেন, স্যার ও উনার সাথীদের খেদমতে যেন কোনো ত্রুটি না হয়।
এই সময় স্যার উনার ছেলেরা, নাতিরা, পরিবারের অন্যান্য সদস্য ও উপস্থিত স্থানীয় সাথীদের সামনে অসুস্থ মুমিনের মর্যাদা এবং দ্বীনি মেহনতের স্বরূপ নিয়ে সংক্ষিপ্ত কিছু মুজাকারা করেন। স্যার বলেন, “মানুষ যখন বাহ্যিকভাবে দুর্বল হয়ে যায়, চলাফেরা করতে পারে না, আগের মতো দ্বীনের মেহনত করতে পারে না, তখন বাহ্যিকভাবে মনে হয় সে আর কিছু করতে পারছে না। কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি এমন নয়। এই অবস্থায় আল্লাহ তাআলা তার দোয়ার মাধ্যমে বড় বড় কাজ নেন। তার দোয়ার দ্বারা উম্মতের হেদায়েতের ফায়সালা হয়, অনেক বড় বড় ফেতনা দূর হয়।”
স্যার বলেন, “একজন ব্যক্তি সুস্থ অবস্থায় যতটা কাজ করেন, অসুস্থ অবস্থায়ও তিনি দ্বীনের কাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান না। দ্বীনের কাজ শুধু বাহ্যিক দৌড়ঝাঁপের নাম নয়। বরং কখনো কখনো উনার দোয়া ও অন্তরের তাওয়াজ্জুহের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা আগের চেয়েও বড় কাজ গ্রহণ করেন।” স্যার বোঝান, মহান আল্লাহর পথে মেহনত কোনো সাময়িক শারীরিক কসরত নয়; বরং এটি হৃদয়ের এক স্থায়ী সম্পর্ক। অসুস্থতা বা বার্ধক্য মানেই দ্বীনি কাজ থেকে অবসর নয়; বরং এটি দোয়া ও তাওয়াজ্জুহের মাধ্যমে উম্মতের কল্যাণে কাজ করার এক নতুন এবং অনেক সময় আরও শক্তিশালী মাধ্যম।
স্যার খুব শক্তভাবে বিষয়টি বুঝিয়ে বলেন- মানুষ যখন সুস্থ থাকে, তখন সে হাত-পা ও শারীরিক শক্তির মাধ্যমে মেহনত করে। কিন্তু যখন আল্লাহ তাআলা তাকে অসুস্থতা দেন, তখন উনার মেহনতের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে যায় উনার ‘কলব’ (হৃদয়) ও উনার ‘দোয়া’। বাহ্যিকভাবে অক্ষম মনে হলেও, সে দ্বীনের কাজে অক্ষম হয় না; বরং অনেক সময় আল্লাহ তাআলা তাকে আরও বেশি শক্তিশালী করে দেন, পূর্বের থেকে তার কাজের গতি আরো বাড়িয়ে দেন, তার দোয়ার মাধ্যমে। শারীরিক দুর্বলতা কখনো দ্বীনের কাজ থেকে কাউকে বঞ্চিত করে না। বাহ্যিকভাবে অক্ষম মনে হলেও, আধ্যাত্মিকভাবে সে পূর্বের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী ও সক্ষম হয়ে উঠতে পারে। যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে সম্পর্ক বজায় রাখে, আল্লাহ তাআলা তাকে এমনভাবে কবুল করেন যে, তার নীরব দোয়ার মাধ্যমেও উম্মতের জন্য বড় বড় কল্যাণের দরজা খুলে যায়।
৩২৫. রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদের মুয়াজ্জিন হাফেজ শাহজুল ইসলাম সাহেব…
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদের মুয়াজ্জিন হাফেজ শাহজুল ইসলাম সাহেব দীর্ঘ সময় স্যারের সান্নিধ্য পেয়েছেন; মসজিদে উনার নির্ধারিত রুমে স্যার দীর্ঘ সময় একত্রে থেকেছেন। তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, স্যার বিভিন্ন দেশ (ফ্রান্স, সৌদি আরব, আমেরিকা) সফর থেকে ফিরে আসার পর প্রায়ই আমার হাতে মোটা অংকের রিয়াল, ডলার বা টাকা তুলে দিতেন। কখনও ৬০০ ডলার, কখনও ৭০০ ডলার, কখনও ৮০০ রিয়াল, কখনও ৫০ হাজার টাকা, কখনও ১ লাখ টাকা, কখনও দেড় লাখ টাকা-বা তারও বেশি।
স্যার আমার হাতে টাকা দিয়ে বলতেন, “কাটাখালী দেওয়ানপাড়া (বাখরাবাজ) মাদ্রাসায় পৌঁছে দিয়েন।” আমি যখন জানতে চাইতাম, রশিদ কী নামে কাটবো (রশিদে কার নাম লেখা হবে), স্যার সবসময় বলতেন, “আব্দুল্লাহ।” কৌতূহলবশত একদিন আমি প্রশ্ন করলাম, “স্যার, এই ‘আব্দুল্লাহ’ ব্যক্তিটি কে (যার নামে আপনি মাদ্রাসায় টাকা দিতে পাঠান, আমি তার নামে টাকা জমা দিয়ে আসি)?” তখন স্যার মুচকি হেসে উত্তর দিলেন, “আল্লাহর বান্দা।”
হাফেজ সাহেব বলেন, নিজের নাম গোপন রেখে ‘আব্দুল্লাহ’ (আল্লাহর বান্দা) পরিচয়ে দান করা ছিল স্যারের নিয়মিত আমল। আমি সেই নামেই মাদ্রাসায় টাকা জমা দিতাম। তিনি চাইতেন না দাতা হিসেবে উনার পার্থিব কোনো নাম বা যশ ছড়িয়ে পড়ুক। তিনি আরও বলেন, আমানতদারিতার ওপর স্যারের ছিল অগাধ বিশ্বাস। একবার আল্লাহর রাস্তায় টাকা বের করে দেওয়ার পর তিনি আর পার্থিব হিসাবের পেছনে পড়ে থাকতেন না। কখনো জিজ্ঞাসা করতেন না, টাকা পৌঁছেছে কি না; কোনো হিসাব চাইতেন না। আমি নিজে থেকে রশিদ এনে দিলে তিনি তা নীরবে রেখে দিতেন; কিন্তু কোনোদিন বলেননি, “দিয়ে এসেছেন তো?”
হাফেজ সাহেব বলেন, স্যার চাইলে নিজেই মাদ্রাসায় গিয়ে টাকা দিয়ে আসতে পারতেন। কিন্তু তিনি অনেকবার এরকম আমাকে মাধ্যম বানিয়েছেন। হয়তো মাদ্রাসায় সরাসরি গেলে দাতা হিসেবে যে বিশেষ সম্মান বা প্রটোকল পাওয়া যায়, তা থেকে নিজেকে বাঁচাতে চাইতেন; এবং অন্য একজন সাথীকে এই নেক কাজে শরিক করে তার মাঝেও দ্বীনি খিদমতের জজবা তৈরি করা স্যারের উদ্দেশ্য ছিল।
হাফেজ সাহেব বলেন, মাদ্রাসার পাশাপাশি স্যার ব্যক্তিগতভাবেও অসহায় সাথী ও নওমুসলিমদের গোপনে সাহায্য করতেন। এক্ষেত্রেও তিনি তৃতীয় ব্যক্তির মাধ্যমে সহযোগিতা পাঠাতেন, যাতে গ্রহীতা দাতার সামনে লজ্জিত না হন। কয়েকবার স্যার আমাকে নির্দিষ্ট কিছু সাথীর নাম বলে তাদেরকে অর্থ দেওয়ার জন্য দিয়েছিলেন। আমি এরকম একবার এক সাথীকে দিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, ভাই, এটা কিসের টাকা? উনি বললেন, একজন নতুন মুসলমান হয়েছে, তাকে দেওয়ার জন্য স্যার দিয়েছেন।
হাফেজ সাহেব বলেন, ‘আব্দুল্লাহ’ বা “আল্লাহর বান্দা” এই পরিচয়টিই একজন মুমিনের আসল পরিচয়। স্যারের এই আমল আমাদের জন্য একটি বড় শিক্ষা যে, দান করা মানে কেবল টাকা দেওয়া নয়; বরং নিজের ‘অহং’ বা ‘আমি’কে বিসর্জন দেওয়া। দান যেন লৌকিকতামুক্ত হয়, মানুষের কাছে পরিচিতি অর্জনের জন্য না হয়; বরং আল্লাহর সাথে সম্পর্ক মজবুত করার মাধ্যম হয়।
৩২৬. আরাফাত ভাই বলেন, সম্ভবত ২০০৪ সালের দিকে দিনাজপুর জেলায়…
আরাফাত ভাই বলেন, সম্ভবত ২০০৪ সালের দিকে দিনাজপুর জেলায় শূরার একটি ফয়সালাকে কেন্দ্র করে কিছু জটিলতা সৃষ্টি হয়। শূরার ফয়সালার বিপরীতে সৃষ্ট অভ্যন্তরীণ কিছু সমস্যার সমাধানের লক্ষ্যে দিনাজপুর মারকাজ মসজিদে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাশোয়ারা অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত মাশোয়ারায় কাকরাইল মারকাজের শীর্ষস্থানীয় মুরুব্বিগণ উপস্থিত ছিলেন। বিশেষ আমন্ত্রণে স্যারও সেই মাশোয়ারায় শরিক হওয়ার জন্য দিনাজপুর আসেন।
দিনাজপুর মারকাজের মুরুব্বিগণ (যাদের অনেকেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র ছিলেন) আগত মেহমানদের ইস্তেকবাল ও আপ্যায়নের জন্য অত্যন্ত রাজকীয় এবং বিলাসপূর্ণ খানা-পিনার আয়োজন করেন। রান্নার জৌলুস ও পদের আধিক্য দেখে স্যার অস্বস্তি বোধ করলেন।
স্যার আয়োজকদের জিজ্ঞাসা করলেন, “এত উন্নত মানের মেহমানদারির আয়োজন কোন তাকাযাকে (প্রয়োজন) সামনে রেখে করা হয়েছে? এই মেহমানদারীর মাকসাদটা (ভেতরের মূল উদ্দেশ্যটি) আসলে কী?”
আয়োজকগণ উত্তর দিলেন, “স্যার, ইতিপূর্বে যখন আলী আকবর হুজুররা (রহমতুল্লাহি আলাইহি) আসতেন, আমরা তাদের জন্যও এমন আয়োজন করতাম। সেই ধারাবাহিকতায় এবারও মুরুব্বিদের জন্য এই ব্যবস্থা করেছি।” স্যার তাদের এই উত্তরে সন্তুষ্ট হতে পারলেন না; বিষয়টি গভীরভাবে ধরলেন।
তিনি অত্যন্ত সূক্ষ্ম এক হাকিকত উন্মোচন করে বললেন: “পূর্বের বড়দের কথা ভিন্ন, তারা আল্লাহওয়ালা ছিলেন, তাই মহব্বতের খাতিরে তোমরা খাইয়েছ; তাদের জন্য খাওয়ানো আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ছিল। কিন্তু আজ বিশেষ এক সংকটের সমাধানের মাশোয়ারায় যারা এসেছেন, তাদের জন্য কেন এই বিশেষ আয়োজন? এত বড় আয়োজন কেন? ভেতরের উদ্দেশ্যটা কী?”
স্যার তখন বিষয়টির ভেতরের উদ্দেশ্যটি পরিষ্কার করে বুঝিয়ে দিলেন। এর পেছনে কি অবচেতন মনে এই চাহিদা কাজ করছে না যে, উনাদেরকে (আগত মুরুব্বীদের) ভালো খাইয়ে সন্তুষ্ট রাখলে কাকরাইল থেকে বিশেষ কোনো সুযোগ-সুবিধা বা নিজেদের পক্ষে ফয়সালা পাওয়া যাবে? অথবা তাদেরকে সন্তুষ্ট করলে ভবিষ্যতে দিনাজপুরের (আমাদের) জন্য বিশেষ দৃষ্টি পাওয়া যাবে, বা কাকরাইলে গেলে কিছু বিশেষ সুবিধা মিলবে?
দ্বীনি কাজের যেকোনো আয়োজনে লৌকিকতা বা কোনো পার্থিব স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্য থাকলে সেই কাজের বরকত নষ্ট হয়ে যায়। বিশেষ করে ফয়সালা বা মাশোয়ারার সময় মেহমানদারির আড়ালে কাউকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করা অত্যন্ত গর্হিত কাজ। যখন কোনো বিশেষ পদমর্যাদার মানুষকে এই উদ্দেশ্যে আপ্যায়ন করা হয় যে, উনার থেকে কোনো সুযোগ পাওয়া যাবে, তখন তা বাহ্যিকভাবে মেহমানদারি মনে হলেও হাকিকতে তা ‘ঘুষ’ হিসেবে গণ্য হতে পারে। স্যার তাবলীগের ৬ উসূলের “تصحيح النية (তাসহীহে নিয়্যত)” বিষয়টি সামনে আনেন। তিনি বুঝিয়ে দেন, আমাদের প্রত্যেক কাজের আগে নিজেকে প্রশ্ন করা দরকার, “আমি এটা কেন করছি?” স্যারের এরকম প্রাসঙ্গিক আলোচনায় ধীরে ধীরে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায়। উপস্থিত দায়িত্বশীল আয়োজকগণ স্যারের এই পর্যবেক্ষণের সামনে নিরুত্তর হয়ে পড়েন এবং স্বীকার করেন যে, প্রকৃত মাকসাদ হয়তো অজান্তেই সেদিকে চলে গিয়েছিল।
স্যার বিষয়টি স্পষ্টভাবে তুলে ধরে বলেন, এই ধরনের মেহমানদারী, যদি ভেতরে কোনো দুনিয়াবি উদ্দেশ্য থাকে, তাহলে তা ঘুষের অন্তর্ভুক্ত; স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে করা এরূপ মেহমানদারি ‘ঘুষের’ মাসআলার মধ্যে পড়ে। এরপর স্যার বলেন, “এই খানা আমি খাব না।” সেদিন স্যার সেই আয়োজনের খাবার গ্রহণ করেননি; নিজে না খেয়ে নিজের আমলের মাধ্যমে স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, দ্বীনি মারকাজে অপচয় ও স্বার্থপরতার কোনো স্থান নেই। পরে দিনাজপুর সরকারি কলেজের শিক্ষক শামীম ভাই নিজ বাসা থেকে সাধারণ খাবার নিয়ে আসেন। স্যার সেই খাবারই সাথীদের নিয়ে গ্রহণ করেন।
৩২৭. একবার লন্ডনে একটি ইজতেমা/জোর উপলক্ষে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান…
একবার লন্ডনে একটি ইজতেমা/জোর উপলক্ষে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান থেকে মুরুব্বীদের জামাত যাওয়ার প্রস্তুতি হচ্ছিল। বাংলাদেশ থেকে যে জামাত যাবে, সেই জামাতে আনোয়ারুল আজিম সাহেব যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন। পূর্বেও উনার সফরের অভিজ্ঞতা ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা ছিল। প্রথমে কাকরাইলের মাশোয়ারায় উনার নাম অন্তর্ভুক্ত থাকলেও পরে কোনো কারণে হাজী আব্দুল মুকিত সাহেব উনাকে যেতে নিষেধ করেন এবং জামাতের তালিকা থেকে উনার নাম বাদ দেওয়া হয়।
তিনি বিষয়টি নিয়ে কারও কাছে কোনো অভিযোগ না করে নীরবে সরাসরি দিল্লির নিজামুদ্দিন মারকাজে চলে যান। সেখানে গিয়ে হযরতজি মাওলানা এনামুল হাসান (রহমতুল্লাহি আলাইহি) এর সাথে সাক্ষাৎ করে নিজের অবস্থা ও আগ্রহ প্রকাশ করেন। হযরতজি উনাকে নিজের কাফেলায় (জামাতে) অন্তর্ভুক্ত করে নেন। এভাবে তিনি খোদ হযরতজির সফরসঙ্গী হয়ে, নিজামুদ্দিন মারকাজের কাফেলায় শামিল হয়ে ইংল্যান্ড সফর করেন।
স্যার যখন এই কথা শুনাচ্ছিলেন, তখন মাহফুজ ভাই প্রশ্ন করলেন, “স্যার, হযরতজির সাথে লন্ডন সফর করে উনার (আনোয়ারুল আজিম সাহেবের) লাভটা (ব্যক্তিগত) কী?”
তখন স্যার একটি গভীর নসীহতপূর্ণ কথা বলেন, “শয়তান সর্বদা চায় মানুষকে নিষ্ক্রিয় (‘inactive’: স্যার এখানে এই ইংরেজী শব্দটি ব্যবহার করেন) করে রাখতে। কোনো না কোনোভাবে সে মানুষকে জান, মাল ও সময় দ্বীনের কাজে খরচ করা থেকে বিরত রাখতে চায়। কোনো না কোনো উছিলায় মুমিন যেন দ্বীনি কোরবানি থেকে দূরে সরে যায় এবং অলস বসে থাকে, তাহলেই শয়তানের চক্রান্ত কামিয়াব হয়।”
স্যার তুলে ধরেন, এখানে মূল বিষয় ‘লাভ’ নয়; বরং দ্বীনের ময়দানে ‘সক্রিয়’ থাকা। কেউ যদি কোনো কারণে একটি সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয় বা কোনো দ্বীনি কাজ থেকে বাধা আসে, তখন শয়তান কৌশলে নিষ্ক্রিয়তার ফাঁদ পাতে; মনে হতাশা ও অভিমান তৈরি করে তাকে নিরুৎসাহিত করে বসিয়ে রাখতে চায়। শয়তান চায়ই আমরা যেন আল্লাহর পথের মেহনত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি এবং ঘরে বসে থাকি।
স্যারের বর্ণনায় খুশির ভাব ছিল যে আনোয়ারুল আজিম সাহেব এই পরিস্থিতিতে নিষ্ক্রিয় হয়ে বসে থাকেননি; বরং নিজে থেকেই এমন একটি পথ খুঁজে নিয়েছেন, যার মাধ্যমে তিনি উপস্থিত দ্বীনি তাকাযার সাথে সম্পৃক্ত থাকতে পেরেছেন। তিনি অভিমান না করে বিকল্প পথ গ্রহণ করেছেন এবং নিজের জান, মাল ও সময়ের ব্যবহার নিশ্চিত করতে দিল্লির কাফেলায় (হযরতজির সফরসঙ্গী হিসেবে) যুক্ত হয়েছেন।
স্যারের আলোচনায় ফুটে ওঠে, শয়তানের অন্যতম কৌশল হলো মানুষকে থামিয়ে দেওয়া, আর মুমিনের কাজ হলো যেকোনো অবস্থায় দ্বীনের ময়দানে নিজেকে সক্রিয় রাখা; পরিস্থিতি যাই হোক, দ্বীনি ময়দান ত্যাগ করা উচিত নয়। তিনি ইঙ্গিত করেন, কোনো অবস্থাতেই নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া বা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়া ঠিক নয়; বরং দ্বীনি কাজে কোনো এক দরজা বন্ধ হলে অন্য দরজা তালাশ করা দরকার। স্যার স্পষ্ট করেন যে, মুমিনের কর্মতৎপরতাই শয়তানের পরাজয়।
৩২৮. রাজশাহীর আরানীর শহীদুল ইসলাম ভাই বলেন, একবার তিনি উনার…
রাজশাহীর আরানীর শহীদুল ইসলাম ভাই বলেন, একবার তিনি উনার মেয়ের পড়াশোনার বিষয়ে স্যারের পরামর্শ জানতে চান। তিনি জানতে চেয়েছিলেন, পার্শ্ববর্তী আত্মীয় (মামাতো ভাইয়ের আহলিয়া) এর কাছে অনাবাসিকভাবে হিফজ পড়ানো যাবে কি না। স্যার উত্তরে বলেন, “হ্যাঁ, এখানে পড়ানো যেতে পারে, এতে কোনো অসুবিধা নেই।”
তবে স্যার সাথে সাথে একটি ভারসাম্যপূর্ণ পরামর্শও দেন। তিনি বলেন, “যদি প্রাতিষ্ঠানিক কোনো ব্যবস্থার মাধ্যমে পড়াশোনা হয়, তাহলে আরও ভালো হয়। সেখানে হিফজের পাশাপাশি কিছু কিতাবের জ্ঞান, মাসআলা-মাসায়েল ইত্যাদিও সহজে শেখা যায়। দ্বীনের মৌলিক জ্ঞানও একসাথে অর্জন করা গুরুত্বপূর্ণ।”
এরপর মাদ্রাসায় আবাসিকভাবে রেখে পড়ানোর বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে স্যার সে পথে পরামর্শ দেননি। তিনি বলেন, “পূর্ণ সময়ের জন্য বোর্ডিংয়ে রেখে না; বরং নির্দিষ্ট সময়ে নিয়ে যাওয়া এবং পড়া শেষে আবার বাসায় নিয়ে আসা, এভাবে পড়ানো ভালো।” স্যার ইঙ্গিত দেন, পারিবারিক পরিবেশ, অভিভাবকের তত্ত্বাবধান ও সান্নিধ্য, এগুলোও মেয়ের গড়ে ওঠার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই পূর্ণকালীন পরিবার থেকে দূরে রেখে নয়, বরং পরিবার, পরিবেশ ও তত্ত্বাবধান, চরিত্র গঠন, নিরাপত্তা, সবকিছুর সমন্বয়ে পরিবারের কাছে থেকে পড়াশোনা হলে ভাল।
৩২৯. শহীদুল ইসলাম ভাই স্মৃতিচারণ করে বলেন, বহু বছর আগের…
শহীদুল ইসলাম ভাই স্মৃতিচারণ করে বলেন, বহু বছর আগের এক দৃশ্য আজও আমার হৃদয়ে গভীরভাবে রেখাপাত করে আছে; এখনো চোখে ভাসে, অন্তরে দাগ কেটে আছে। তখন রাস্তাঘাট আজকের মতো উন্নত ছিল না। এক পরিচিত ভাই রাজশাহীর আরেকজনকে সঙ্গে নিয়ে স্যারসহ আমাদের সেই অজপাড়াগাঁ ‘আড়পাড়া’য় এসেছিলেন। বর্ষার কর্দমাক্ত পথ, পাকা রাস্তা নেই; কাদামাটির পথ দিয়ে কষ্ট করে চলতে হতো। হাঁটার সময় স্যান্ডেল কাঁদায় আটকে যাচ্ছিল, তাই খুলে হাতে নিয়ে হাঁটতে হচ্ছিল। স্যারের স্যান্ডেল জোড়া আমি হাতে নিয়েছিলাম, এইটুকু এখনো স্পষ্ট মনে আছে। তবে স্যার ঠিক কী উদ্দেশ্যে সেখানে গিয়েছিলেন, তা আজ আর মনে নেই।
ফেরার সময় আমি স্যারকে অন্য একটি পথে এগিয়ে দিতে রওনা হলাম, যেখান থেকে দুই-তিন কিলোমিটার দূরে একটি পাকা রাস্তা ছিল, সেখানে আড়ানী বা পুঠিয়ার ভ্যান বা কোনো বাহন পাওয়ার আশা করা যেত। আমরা ভ্যানের অপেক্ষায় রাস্তার উপর দাঁড়িয়ে; আর স্যার রাস্তার পাশের মসজিদে একাকী বসে ছিলেন।
ভ্যান খোঁজার জন্য বারবার রাস্তার এদিক ওদিক তাকাচ্ছি, আবার ফিরে মসজিদে বসা স্যারের দিকে উঁকি দিচ্ছি, এভাবেই সময় কাটছিল। এমনই এক মুহূর্তে আমি মসজিদে এগিয়ে গিয়ে উঁকি দিয়ে দেখি, স্যার একা বসে, আর উনার চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরছে। দু’হাত তুলে দোয়ার হালতে ছিলেন না; নীরবে বসে ছিলেন, আর অঝোর ধারায় উনার দু’চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছিল।
সেই মুহূর্তে মনে প্রশ্ন জাগল, কেনইবা স্যার সেই কাদা-মাটির পথে আমাদের এখানে এলেন? কী ছিল এই সফরের ভেতরের তাকাযা ও চাহিদা? উনার এই নীরব অশ্রুবিসর্জন দেখে মনে হচ্ছিল, এ যেন আল্লাহর প্রতি গভীর প্রেম এবং উম্মতের ফিকিরে ব্যাকুল এক অন্তরের বহিঃপ্রকাশ।
ভাই বলেন, এই দৃশ্য আমাকে ভেতর থেকে বড় নাড়া দিয়েছিল। সেই নির্জন কান্নার দৃশ্য আমার অন্তরে আজও অমলিন। বাহ্যিক মেহনতের আড়ালে লুকিয়ে থাকা স্যারের আরেক জীবন ছিল এটা। আমরা সামনে যা দেখতাম, স্যারের বয়ান, মেহনত, দাওয়াত- তা তো এক দিক; কিন্তু অন্তরের গোপন সম্পর্ক, নির্জনে কান্না ও দোয়া, স্যারের জীবনের আরেকটা শক্তিশালী দিক ছিল। তিনি আরও বলেন, এরকম আরও কয়েকবার দেখেছি, স্যার একা থাকলে উনার চোখে অশ্রু থাকত; নীরবে চোখ বেয়ে পানি ঝরত।
৩৩০. খুলনার হাফেজ মাওলানা মামুন সাহেব বলেন, আমরা সাধারণত কোনো…
খুলনার হাফেজ মাওলানা মামুন সাহেব বলেন, আমরা সাধারণত কোনো ওস্তাদ বা বয়োজ্যেষ্ঠের সামনে পা মেলে (আরাম করে) বসি না। কিন্তু দীর্ঘ সময় এভাবে বসে থাকা সহজ নয়; কিছুক্ষণ পরই হাঁটুতে ব্যথা শুরু হয়ে যায়। কিন্তু আমি লক্ষ্য করেছি, স্যার এই বয়সেও দীর্ঘ সময় ধরে পূর্ণ আদবের সাথে স্থির হয়ে বসে থাকতেন, আত্তাহিয়াতের মতো করে হাঁটু গেড়ে বসে থাকতেন। এই বয়সে এমনভাবে স্থির হয়ে বসে থাকা, এটা আমার কাছে বিস্ময়কর মনে হতো। উনার এই দৈহিক স্থিরতা ও ধৈর্য ছিল দেখার মতো, যা আমাদের মতো তরুণদের পক্ষেও কষ্টসাধ্য; একজন সাধারণ মানুষের পক্ষে প্রায় অসম্ভব বলেই মনে হয়। স্যারের এই ছোট ছোট বিষয়গুলোই আসলে বড় এক মুজাহাদার পরিচয় দেয়।
তিনি দ্বিতীয় আরেকটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেন। হাটহাজারী মাদ্রাসার পুরোনো মসজিদে এক রাতের স্মৃতিচারণ করে বলেন, সেই মসজিদের মশার উপদ্রব ছিল বর্ণনাতীত। প্রচুর বড় বড় মশা সেখানে ছিল সে সময়। মনে হতো, কোনো মানুষকে সেখানে এক রাত বেঁধে রাখলে তা কঠিন শাস্তির জন্য যথেষ্ট, মশার কামড়েই সে অতিষ্ঠ হয়ে পড়বে। কিন্তু এমন পরিস্থিতিতেও আমি স্যারকে দেখলাম গভীর রাতে অত্যন্ত নিবিষ্টচিত্তে তাহাজ্জুদ নামাজে দাঁড়িয়ে আছেন। স্যারের কাছে বাহ্যিক এ অবস্থা বা পরিবেশের কোনো প্রতিক্রিয়া ছিল না। দীর্ঘ সময় ধরে একাগ্রতার সাথে লম্বা লম্বা নামাজ পড়লেন। মশার উপদ্রব যেন উনাকে বিন্দুমাত্র বিচলিত করতে পারেনি, যেন অন্য কোনো জগতে মগ্ন হয়ে আছেন।
তিনি বলেন, স্যারের দীর্ঘক্ষণ আদবের সাথে বসে থাকা এবং তীব্র মশার উপদ্রব উপেক্ষা করে লম্বা তাহাজ্জুদ পড়ার কথা স্মরণ হলে মনে হয়, উনার বাহ্যিক বয়ান ও মুজাকারার পাশাপাশি জীবনের ভেতরে ছিল গভীর আমলি মুজাহাদার এক নীরব দিক। মনে হয়, তিনি আমলের মাধ্যমে শারীরিক যন্ত্রণার ঊর্ধ্বে উঠে এক ভিন্ন আধ্যাত্মিক প্রশান্তি লাভ করতেন।
৩৩১. একবার দশ দিনের জোড়ের মাঝখানের ৪ দিনের বড় এক…
একবার দশ দিনের জোড়ের মাঝখানের ৪ দিনের বড় এক জামাত ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রিয় মসজিদে। ঐ জামাতে এশার পর মুজাকারায় স্যার একটি সহজ কিন্তু গভীর আমলের তরগীব দেন। অনেকেই শেষ রাতে ওঠার নিয়ত করেন, কিন্তু ঘুমের চাপে উঠতে পারেন না। স্যার বাস্তববাদী এক পরামর্শ দিলেন যে, “অন্তত বিছানায় যাওয়ার আগে চার রাকাত নামাজ পড়ে নেওয়া উচিত।” অর্থাৎ, আমরা যেন রাতে অন্তত চার রাকাত নামাজ পড়ে ঘুমাতে যাই। এতে শয়তান মানুষকে ইবাদত থেকে পুরোপুরি মাহরুম করতে পারে না। পরে যদি শেষ রাতে ওঠা সম্ভব হয়, তবে তা হবে ‘নূরের উপর নূর’-অতিরিক্ত প্রাপ্তি।
স্যার বলেন, তাহাজ্জুদের সময়, অর্থাৎ শেষ রাতে ওঠা সর্বোত্তম। তবে যদি কারও জন্য তা কঠিন হয় বা সুযোগ না থাকে, বা সম্ভব না হয়, তাহলে অন্তত ঘুমানোর আগে চার রাকাত নামাজ পড়ে শুয়ে পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত।
তিনি বোঝান, সবার পক্ষে শেষ রাতে ওঠা সহজ নয়; কিন্তু ঘুমানোর আগে কিছু সময় বের করে চার রাকাত নামাজ পড়া প্রত্যেকের পক্ষেই সম্ভব। এই ছোট আমলটিই ধীরে ধীরে বড় আমলের পথ খুলে দেয়। যে ব্যক্তি নিয়মিত ঘুমানোর আগে নামাজ পড়ে, তার অন্তরের সাথে রাতের ইবাদতের একটি সম্পর্ক তৈরি হয়। এই সম্পর্কই একসময় তাকে তাহাজ্জুদের দিকে নিয়ে যায়। স্যার আরও ইঙ্গিত করেন, আল্লাহর স্মরণে দিন শুরু করা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি আল্লাহর স্মরণেই দিন শেষ করাও অত্যন্ত মূল্যবান।
৩৩২. স্যারের ইন্তেকালের কিছুদিন আগে, যখন তিনি পর্চা ছাড়া জামাতে…
স্যারের ইন্তেকালের কিছুদিন আগে, যখন তিনি পর্চা ছাড়া জামাতে চলছিলেন, তখন পুরান ঢাকা ও তেজগাঁও এলাকায় এক জামাতের সাথে কঠিন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। একই দিনে পাঁচটি মসজিদ থেকে বের করে দেওয়া হয়। সর্বশেষ একটি মসজিদ থেকে রাত প্রায় এগারোটার সময় পুলিশ ডেকে জামাতকে বের করে দেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত সেই জামাত হাতিরপুলে হাবিবুল্লাহ ভাইয়ের বাসায় রাত যাপন করে।
এত অপমান ও লাঞ্ছনার পরেও সাথীরা অসীম ধৈর্য ও হিম্মতের সাথে মেহনতে অটল ছিলেন। বারবার বেইজ্জত হয়ে মসজিদ থেকে বের করে দেওয়া সত্ত্বেও তারা হিম্মত হারাননি; বরং সফরের মুজাহাদার উপর অটল থেকেছেন। পরদিন সকালে স্যার সেই জামাতের সাথীদের সামনে এক হৃদয়স্পর্শী মুজাকারা করেন। সেখানে তিনি বাহ্যিক মেহনতের চেয়েও ভেতরের আত্মশুদ্ধি, দুর্বলের সাথে নরম ব্যবহার, এবং মানুষের অধিকার বা ‘হক’ আদায়ের ওপর বিশেষ জোর দেন।
স্যার দুর্বলের সাথে নরম ব্যবহার করার উপর বিশেষভাবে গুরুত্ব দেন। স্যার বোঝান, যারা দুর্বল, অসহায় বা অন্যের উপর নির্ভরশীল, যেমন পরিবারের নারী সদস্য, শিশু, বৃদ্ধ, গরিব বা অধীনস্থ মানুষ, তাদের সাথে কঠোরতা নয়; বরং কোমলতা ও সহানুভূতির আচরণ করা উচিত। একজন মুমিনের প্রকৃত সৌন্দর্য তার এই নম্রতা ও দয়ার মধ্যেই প্রকাশ পায়। নম্রতা ও ধৈর্যই হলো একজন ঈমানদারের প্রকৃত হাতিয়ার। অনেক সময় মানুষ বাইরের মানুষের সাথে ভালো ব্যবহার করে, কিন্তু নিজের ঘরের ভেতরে, নিজের অধীনস্থদের সাথে কঠোর হয়ে যায়। অথচ প্রকৃত পরীক্ষা হলো সেখানে, যেখানে কেউ প্রতিবাদ করতে পারে না, বা আমাদের উপর নির্ভরশীল। একজন মুমিনের চরিত্রের সত্যিকারের পরিচয় প্রকাশ পায় তার দুর্বলদের সাথে আচরণের মাধ্যমে।
স্যার আরেকটি ব্যাপার অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বলেন, “আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য অন্যের হক আদায় করা অপরিহার্য।” তিনি বিশেষভাবে পারিবারিক উত্তরাধিকার ও বোনদের হকের কথা উল্লেখ করেন। স্যার বলেন, যদি দেখা যায় আমাদের আব্বা বা চাচারা পূর্বে ফুফুদের বা অন্য কোনো আত্মীয়ের হক (জমি-জমা বা সম্পদ) ঠিকমতো আদায় করেননি, তবে বর্তমান প্রজন্মের দায়িত্ব হলো সেই হিসাব বের করা এবং যথাসাধ্য তা আদায় করে দেওয়ার চেষ্টা করা। স্যার এ বিষয়ে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়ে বলেন, পরিবারের ভেতরে ভাই-বোনদের হক, ফুপুদের হক, চাচাতো ভাই-বোনদের হক, আত্মীয়-স্বজনের হক, এসব বিষয়ে সচেতন হওয়া জরুরি। স্যার বলেন, এসব বিষয় খোঁজ নিয়ে, হিসাব করে, যথাসাধ্য হক আদায় করে দেওয়ার চেষ্টা করতে হবে। অতীতে কেউ অবহেলা করে থাকলে সেই সম্পদ খুঁজে বের করে প্রকৃত পাওনাদারের কাছে পৌঁছে ফেরত দেওয়া উচিত।
স্যার বোঝান, দ্বীনের মেহনত শুধু বাহ্যিক কোরবানি বা কষ্ট সহ্য করার নাম নয়; বরং মানুষের হক আদায় করা এবং দুর্বলদের প্রতি সঠিক আচরণ করাও দ্বীনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আমরা যখন আল্লাহর পথে অপমান ও কষ্ট সহ্য করছি, তখন আমাদের আরও বেশি সতর্ক হতে হবে যেন আমাদের দ্বারা অন্য কেউ, বিশেষ করে নিজের পরিবার বা দুর্বল মানুষ, সামান্যতম বেইজ্জত বা হকের দিক থেকে বঞ্চিত না হয়। দ্বীনের ওপর টিকে থাকার জন্য যেমন সাহস ও ধৈর্য দরকার, তেমনি অন্যের হক আদায়ের জন্যও (পাওনা মিটিয়ে দেওয়ার জন্য) দরকার সততা, হিম্মত ও নৈতিকতা। তিনি ইঙ্গিত করেন, কোরবানির সাথে সাথে চরিত্র ও লেনদেন শুদ্ধ না হলে দ্বীনের মেহনত পূর্ণতা পায় না।
৩৩৩. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের মজমায় এক মুজাকারায় স্যার বলেন, যারা…
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের মজমায় এক মুজাকারায় স্যার বলেন, যারা নলকূপ বা চাপকল (টিউবওয়েল) বসানোর কাজ করে, তারা জানে যে মাটির নিচে পানি আছে; কিন্তু ঠিক কত ফিট নিচে পানি পাওয়া যাবে, তা তারা আগে থেকে জানে না। তাদের কাজ হলো পাইপ মাটির নিচে গেড়ে যাওয়া। তারা মাটির স্তর ও বালির ধরন দেখে বুঝতে চেষ্টা করে, কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত ভালো পানির স্তরে পৌঁছাতে না পারে, ততক্ষণ থামে না, গেড়েই যায়। তোমার আর আমার কাজও ঠিক তাই, মেহনত চালিয়ে যাওয়া।
স্যার বলেন, দ্বীনের মেহনত, দাওয়াত বা নিজের আমল, এসব ক্ষেত্রেও ফল কখন আসবে, তা আমরা জানি না। কখন হেদায়েত হবে বা দোয়া কবুল হবে, তা আমাদের হাতে নেই। তবে এ মেহনত কখনো বিফলে যায় না; এর ভেতরে ফল অবশ্যই আছে। অনেক সময় মানুষ ফল না দেখে হতাশ হয়ে পড়ে এবং চলার মাঝপথে থেমে যায়। অথচ হয়তো ঠিক সেই জায়গার পরেই “পানির স্তর” ছিল, অর্থাৎ হেদায়েত খুব কাছেই ছিল। যদি কোনো মিস্ত্রি ১০০ ফিট পাইপ গেড়ে ধৈর্য হারিয়ে থেমে যায়, অথচ আর ১০ ফিট নিচেই পানি থাকে, তবে তার পরিশ্রম বৃথা হয়ে যায়। স্যার সতর্ক করেন, যেন আমরা সফলতার একেবারে নিকটে গিয়েও ধৈর্য হারিয়ে না ফেলি।
স্যার বুঝান, মিস্ত্রির কাজ হলো পাইপ গেঁথে যাওয়া; পানি তুলে আনা বা পানির স্তর সৃষ্টি করাতে তার হাতে নেই। একইভাবে, আমাদের কাজ হলো আল্লাহর হুকুম অনুযায়ী জান, মাল ও সময় দিয়ে মেহনত করে যাওয়া, ‘পাইপ গাঁড়তেই থাকা’ অর্থাৎ মেহনতে কোনো বিরতি না দেওয়া। ফলাফল আল্লাহ তাআলার হাতে, আল্লাহ দেবেন।
পাইপ গাঁড়ার সময় যেমন কখনো কাদা ওঠে, কখনো পাথর আসে, আবার কখনো বালির স্তর দেখা যায়, মিস্ত্রিরা কাদা দেখে নিরাশ হয় না যে এখানে পানি নেই। বরং জানে, কাদা পার হলেই বালির স্তর আসবে; তারা জানে এর পরেই ভালো স্তর আসতে পারে। তেমনি দ্বীনের পথে চলতে গিয়েও আমাদের জীবনে যখন বাধা বা ব্যর্থতা আসে; তখন মুমিনেরও ধৈর্য হারানো উচিত নয়, তখন বুঝতে হবে আমরা সাফল্যের একটি স্তর পার করছি। আমরা যেন ফলের অপেক্ষায় হতাশ না হয়ে যাই; বরং নিজের কাজ করে যেতে থাকি।
আমাদের দায়িত্ব হলো অবিরত চেষ্টা করে যাওয়া, থেমে না যাওয়া। ফল দেওয়া আল্লাহ তাআলার কাজ। যে ব্যক্তি ধৈর্য ধরে মেহনত চালিয়ে যায়, আল্লাহ তাআলা একসময় তার জন্য ফলাফলের দরজা খুলে দেন; যে থামে না, আল্লাহ তাআলা একসময় তাকে “পানির স্তর” পর্যন্ত পৌঁছে দেন। নলকূপের মিস্ত্রি যেমন দৃঢ় বিশ্বাস রাখে যে মাটির নিচে পানি আছেই, তেমনি একজন মুমিনের বিশ্বাস হওয়া উচিত, মেহনত করলে আল্লাহ তাআলা ফল দেবেনই। ফল কখন আসবে তা আমাদের জানা নেই; কিন্তু “ফল আছে”, এই বিশ্বাস নিয়ে কাজ করে যাওয়াই মুমিনের কর্তব্য।
৩৩৪. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে এক মুজাকারায় স্যার বলেন, আমরা…
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে এক মুজাকারায় স্যার বলেন, আমরা সাধারণত কোনো কিছুর মান বিচার করি তার বাজারমূল্য বা সৌন্দর্য দিয়ে; কিন্তু কোনো কিছু দামী হলেই তা সব জায়গায় ব্যবহারের যোগ্য হয় না। অনেক সময় মনে হয়, কোনো বড় কাজের জন্য কেবল বড় ডিগ্রিধারী বা নামী-দামী মানুষই প্রয়োজন। একজন উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তি হয়তো তাত্ত্বিকভাবে অনেক মূল্যবান হতে পারেন, কিন্তু ময়দানের কঠিন পরিস্থিতিতে এমন একজনের প্রয়োজন হয়, যার মধ্যে ধৈর্য, কষ্ট করার ক্ষমতা এবং নির্দিষ্ট কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে।
স্যার বলেন, “ক্রিস্টাল (স্ফটিক বা হীরা) অত্যন্ত দামি, স্বচ্ছ, দৃষ্টিনন্দন ও রাজকীয় জিনিস। অন্যদিকে অ্যালুমিনিয়াম অত্যন্ত সাধারণ ও সস্তা এক ধাতু। কিন্তু যখন একটি উড়োজাহাজ বা এভিয়েশন ইঞ্জিন তৈরির প্রশ্ন আসে, তখন সেই দামি ক্রিস্টাল কোনো কাজেই আসে না; সেখানে সস্তা অ্যালুমিনিয়ামই অপরিহার্য।” তিনি উদাহরণ দিয়ে বোঝান, অনেকসময় অফিসে দেখা যায়, কেউ খুব স্টাইলিশ, কথা বলায় চমৎকার; কিন্তু চাপের সময় সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। আবার একদম সাধারণ, শান্ত স্বভাবের একজন মানুষ পুরো টিমকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যায়। মরুভূমিতে সোনার বার নিয়ে গেলে তার কোনো মূল্য নেই, সেখানে এক বোতল পানি জীবন বাঁচায়। তাই কোনো জিনিস বা মানুষকে তার বাহ্যিক দামে নয়; বরং সঠিক পরিস্থিতিতে সে কতটা কার্যকর, এটাই তার প্রকৃত মূল্য।
দ্বীনি কাজের ক্ষেত্রেও আমরা অনেক সময় মনে করি, যদি অমুক বড় আলেম, প্রভাবশালী নেতা, বা ধনী ব্যক্তি আমাদের সাথে থাকতেন, তবে কাজ দ্রুত এগিয়ে যেত। এটি অনেকটা ইঞ্জিনে ক্রিস্টাল লাগানোর চেষ্টার মতো। কিন্তু স্যার শেখান, দ্বীনি মেহনত বা সমাজ সংস্কারের জন্য এমন মানুষ প্রয়োজন, যারা ইখলাসের সাথে ঘাম ঝরিয়ে মেহনত করে। আল্লাহর কাছে ব্যক্তির সামাজিক দামের চেয়ে তার ইখলাসই বড়। তিনি বোঝাতেন, আল্লাহ তাআলা বাহ্যিক আভিজাত্য নয়; বরং বান্দার ইখলাস, মুজাহাদা ও উপযোগিতার ভিত্তিতে কাজ নেন। আমরা যেন মশহুর হওয়ার পেছনে না ছুটি; বরং নিজের ভেতরকে এমনভাবে গড়ে তুলি, যাতে আমরা আল্লাহর কাছে মকবুল হতে পারি।
স্যার বলতেন, জনপ্রিয়তা (মশহুর হওয়া) একটি পরীক্ষা, আর কবুলিয়াত (মকবুল হওয়া) একটি নেয়ামত। দুনিয়ার মানুষ আমলের পরিমাণ দেখে, আর আল্লাহ দেখেন আমলের নিষ্ঠা ও গুণগত মান। তিনি আরও বুঝাতেন, মানুষের প্রশংসা পাওয়ার তৃষ্ণা ত্যাগ করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের আকাঙ্ক্ষাই একজন মুমিনের আসল পরিচয়। একটি পাত্র বাইরে থেকে যতই সুন্দর হোক, ভেতরের বস্তু যদি নাপাক হয়, তবে তাতে যা-ই রাখা হবে সবকিছুই নাপাক হয়ে যাবে। তেমনি, আমাদের কথা ও কাজ বাহ্যিকভাবে যত সুন্দরই হোক না কেন, ভেতরটা যদি অহংকার, হিংসা ও লৌকিকতায় ভরা থাকে, তবে তা আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হয় না।
৩৩৫. মানুষ সাধারণত খুব দ্রুত নিজের অনুভূতির উপর নির্ভরশীল হয়ে…
মানুষ সাধারণত খুব দ্রুত নিজের অনুভূতির উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, আবেগের বশবর্তী হয়ে পড়ে। কোনো কিছু ভালো লাগলে আগ্রহ নিয়ে করে, আর ভালো না লাগলে তা এড়িয়ে যায়। কোনো কাজ করতে ভালো লাগলে আমরা তাতে উৎসাহ পাই, আর ভালো না লাগলে আমাদের মাঝে স্থবিরতা চলে আসে। এই মানসিকতা দ্বীনের পথে বড় বাধা। আল্লাহ পাকের ইবাদত ও আনুগত্যের বিষয়টি সম্পূর্ণ আলাদা। এই প্রসঙ্গে স্যার একবার বলেন, আল্লাহর ইবাদত করতে হবে ‘তা’আববুদান’ (تعبُّدًا), ‘তালাযজুজান’ (تلذُّذًا) নয়।
স্যার বলেন, ‘তালাযজুজান’ (ভালো লাগা বা স্বাদ খোঁজা) শব্দটি এসেছে লযযত বা স্বাদ থেকে। কেবল নিজের ভালো লাগা, তৃপ্তি বা মানসিক প্রশান্তির জন্য কোনো কাজ করা। যদি কেউ ইবাদতকে কেবল নিজের ‘ভালো লাগা’র ওপর নির্ভর করায়, তবে যে দিন তার মন ভালো থাকবে না বা তবিয়ত সায় দেবে না, সে দিন সে ইবাদত ছেড়ে দেবে। এখানে প্রকৃত ইলাহ বা উপাস্য আল্লাহ থাকেন না, বরং নিজের ‘নফস’ বা প্রবৃত্তিই প্রধান হয়ে দাঁড়ায়। মন চাইলে মানলাম, না চাইলে মানলাম না, এটি প্রকৃত আনুগত্য নয়; নিজের মন, রুচি ও অনুভূতিকে মাপকাঠি বানানো। দ্বীনের বুনিয়াদ হলো আল্লাহর প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য। ইবাদতকে নিজের অনুভূতির সাথে যুক্ত করলে তা দুর্বল হয়ে যায়; আর বান্দা হওয়ার চেতনার উপর দাঁড়ালে তা দৃঢ় ও স্থায়ী হয়।
‘তা’আব্বুদান’ (দাসত্ব বা আনুগত্য), এখানে মুখ্য বিষয় হলো, আমি আল্লাহর দাস (عبد), আর তিনি আমার মালিক। বান্দা হিসেবে মালিকের হুকুম পালন করা, ‘আমি আল্লাহর বান্দা’, এই পরিচয়ের ভিত্তিতে উনার ইবাদত করা; ইবাদতকে “ভালো লাগা-মন্দ লাগা” এর উপর নির্ভরশীল না করা। এখানে নিজের ভালো লাগা বা খারাপ লাগার কোনো স্থান নেই। আল্লাহ আদেশ করেছেন, এইটাই যথেষ্ট কারণ। স্যার বলেন, আল্লাহর আনুগত্য করতে হবে উনার আনুগত্যের কারণেই। আমি উনার বান্দা, এই পরিচয়ই যথেষ্ট। আমার মন চাইলো কি চাইলো না, ভালো লাগলো কি লাগলো না, এসব এখানে বিবেচ্য নয়।
স্যার আরও ইঙ্গিত করেন, যিনি কেবল স্বাদের জন্য ইবাদত করেন, তিনি আসলে নিজের নফসের ইবাদত করেন। আর যিনি কষ্ট করে, মনকে বাধ্য করে আল্লাহর হুকুম পালন করেন, তিনিই প্রকৃত ‘عبد’ বা বান্দা। ইবাদতের প্রকৃত রূপ হলো, “তাও‘আন ওয়া কারহান” (طوعًا وكرهًا), ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায়, আল্লাহর আদেশ মানতে হবে। মনের অবস্থা যাই হোক, কখনো ইবাদতে খুব স্বাদ পাওয়া যাবে, কখনো হয়তো একেবারে শুষ্কতা অনুভব হবে; এবাদত নিজের ভালো লাগার জন্য নয়, এটা আদেশ। ভালো লাগুক বা না লাগুক, মন চাক বা না চাক, যেহেতু আমার আল্লাহ হুকুম দিয়েছেন, তাই আমি তা পালন করবই, ইচ্ছা হোক বা না হোক।
স্যার বোঝাতে চেয়েছেন, যে ব্যক্তি নিজের নফস ও অনুভূতির ঊর্ধ্বে উঠে আল্লাহর নির্দেশ মানতে পারে, তার ইবাদতই প্রকৃত ইবাদত। আর যে ব্যক্তি ‘নিজের ভালো লাগা’কে মাপকাঠি বানায়, তার ইবাদত স্থায়ী হয় না। স্যার চাইতেন, আমরা যেন ইবাদতকে কেবল ‘মুড’ বা ভালো লাগার ফ্রেমে না বাঁধি। মুমিন তার প্রবৃত্তির গোলাম নয়, তার ভালো লাগা বা মন্দ লাগার চেয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি বড়।
৩৩৬. ঢাকায় এক প্রোগ্রাম শেষে উপস্থিত সাথীদের মধ্যে পরামর্শ হলো…
ঢাকায় এক প্রোগ্রাম শেষে উপস্থিত সাথীদের মধ্যে পরামর্শ হলো, মাওলানা আব্দুল মালেক সাহেব হজের সফরে যাচ্ছেন, উনার সাথে সাক্ষাৎ করা যায়। পরামর্শ অনুযায়ী স্যারসহ পাঁচজন একটি গাড়িতে করে হযরতপুরে মারকাযুদ দাওয়াহ আল-ইসলামিয়া মাদ্রাসায় উনার সাথে দেখা করতে যান। বর্ণনাকারী হাসান হাবিব ভাইও সে দলে উপস্থিত ছিলেন।
হযরত মাওলানা আব্দুল মালেক সাহেব তখন সফরের প্রস্তুতিতে ছিলেন; হাতে সময় খুবই কম, বের হওয়ার সময় ঘনিয়ে এসেছিল। সাক্ষাৎটি ছিল সংক্ষিপ্ত। বিদায় নেওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে স্যার অত্যন্ত বিনয়ের সাথে একটি গভীর আবেদন পেশ করেন।
স্যার বলেন, “আপনি হজে যাচ্ছেন; সেখানে বিভিন্ন সময় ও স্থানে দোয়ার বিশেষ মওকা পাবেন। একটি বিষয়ের জন্য দোয়া করবেন, মানুষ সাধারণত ‘মালুমাত’ (তথ্য)কেই ‘ইলম’ মনে করে। দোয়া করবেন, উম্মত যেন ‘মালুমাত’ ও ‘ইলম’ এর পার্থক্য বুঝতে পারে।”
স্যারের এই আবেদন শোনার পর হযরত মাওলানা আব্দুল মালেক সাহেব কিছুক্ষণ নীরবে মাথা নিচু করে থাকলেন। এরপর মাথা তুলে একটি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়লেন, যেন কথাটির গভীরতা তিনি অন্তরে অনুভব করলেন।
স্যার বিভিন্ন সময় বয়ান ও মুজাকারায় এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি তুলে ধরতেন। তিনি বোঝাতেন, বর্তমানে অনেকেই কিছু পড়াশোনা, কিতাব বা মাসায়েলের জ্ঞানকে ‘ইলম’ মনে করে। অথচ কিতাব পড়ে তথ্য জানা এক জিনিস, আর হক্কানি আলেমদের সোহবতে থেকে ইলমের হাকিকত অর্জন করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। ইলম শুধু মস্তিষ্কে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা মানুষের চরিত্র ও আচরণে প্রকাশ পায়। স্যার আরও ইঙ্গিত করতেন, তথ্যের আধিক্য মানুষকে অনেক সময় অহংকারী করে তোলে; কিন্তু প্রকৃত ইলম মানুষকে বিনয়ী করে। ইলমের উদ্দেশ্য হলো আমল ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন; কেবল তর্কে জেতা বা তথ্য দিয়ে অন্যকে চমকে দেওয়া নয়। আমরা যেন তথ্যের পেছনে না ছুটে, সেই ইলম অর্জনের চেষ্টা করি, যা আমাদের অন্তরকে শুদ্ধ করে এবং আল্লাহর নৈকট্যের দিকে নিয়ে যায়।
হযরত মাওলানা আব্দুল মালেক সাহেবের মতো একজন পরিচিত আলেমের কাছে এই দোয়া চাওয়ার মধ্য দিয়ে স্যার বুঝাতে চেয়েছেন, এই সমস্যাটি অত্যন্ত গভীর ও উম্মতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। উম্মত যখন ‘মালুমাত’ ও ‘ইলম’ এর পার্থক্য বুঝতে পারবে, তথ্যকে ইলম মনে করার ভুল থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে, তখনই প্রকৃত হিদায়াতের পথে অগ্রসর হতে পারবে।
৩৩৭. নওগাঁ জেলার চকদেবপাড়ার বাসিন্দা কাজী আনসার আলী সাহেব ছিলেন…
নওগাঁ জেলার চকদেবপাড়ার বাসিন্দা কাজী আনসার আলী সাহেব ছিলেন তাবলিগের একজন নিবেদিতপ্রাণ পুরাতন মুরব্বি এবং জেলা শূরার সাথী। স্যার নওগাঁয় একটি জামাতের সাথে সফরে, তখন এই প্রবীণ মুরব্বি বেশ অসুস্থ ছিলেন। অসুস্থ সাথীদের খোঁজখবর নেওয়া এবং উনাদের দেখতে যাওয়া ছিল স্যারের জীবনের অন্যতম নিয়মিত আমল। সেই ধারাবাহিকতায় স্যার কিছু সাথী নিয়ে কাজী সাহেবের বাড়িতে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে উপস্থিত হলেন।
স্যারকে নিজের আঙিনায় দেখে কাজী আনসার আলী সাহেব যারপরনাই আনন্দিত হলেন। অসুস্থ শরীরেও উনার এই উদ্দীপনা ও ইস্তেকবাল (অভ্যর্থনা) দেখে উপস্থিত সবাই বুঝতে পারলেন, স্যারের প্রতি উনার মহব্বত কতটা গভীর ছিল। তিনি ব্যস্ত হয়ে সন্তানদের দোকানে পাঠালেন মিষ্টি ও বিস্কুট আনার জন্য। একজন অসুস্থ মানুষের মধ্যে মেহমানদারির এমন ব্যাকুলতা সচরাচর দেখা যায় না।
স্যার উনার পাশে বসলেন। দীর্ঘ সময় ধরে অত্যন্ত আপনজনের মতো কুশল বিনিময় করলেন। কোনো আনুষ্ঠানিক বা তাত্ত্বিক বয়ান ছিল না; স্যার উনার পারিবারিক খবরাখবর নিচ্ছিলেন। উনার ছেলেরা কী করে, আলেম ছেলেটি চট্টগ্রামে কেমন আছে, আত্মীয়স্বজন কে কোথায়, এভাবে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জিজ্ঞেস করছিলেন। মনে হচ্ছিল, দীর্ঘদিন পর দুই ঘনিষ্ঠ বন্ধু একত্রিত হয়েছেন। বয়সের ব্যবধান থাকলেও সেখানে শ্রদ্ধার সাথে মিশে ছিল অকৃত্রিম আন্তরিকতা।
মুসাফাহা করে স্যার যখন ঘর থেকে বের হচ্ছিলেন, ঠিক তখনই কাজী সাহেব আবেগাপ্লুত কণ্ঠে স্যারের নাম ধরে ডাক দিলেন, “মুশফিক!” স্যার সাথে সাথে ফিরে এসে উনার হাত ধরলেন। তখন বৃদ্ধ মুরব্বি স্যারকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন। অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে বললেন, “তোমার সাথে আর কবে দেখা হয় না হয়, বোধ হয় আর দেখা হবে না।” স্যার উনাকে সান্ত্বনা দিলেন; কিন্তু সেই মুহূর্ত ছিল গভীর আবেগ ও মহব্বতে ভরা। সেটিই ছিল উনাদের শেষ সাক্ষাৎ। স্যারের পরবর্তী নওগাঁ সফরের আগেই কাজী আনসার আলী সাহেব ইন্তেকাল করেন।
কাজের ব্যস্ততায় আমরা অনেক সময় অসুস্থ বা অসহায় সাথীদের ভুলে যাই। কিন্তু স্যার উনার আমলের মাধ্যমে দেখিয়েছেন, উনাদের খোঁজখবর নেওয়া, উনাদের পাশে দাঁড়ানো এবং উনাদের সময় দেওয়া ঈমানি দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। স্যার দেখিয়েছেন, দ্বীনি সম্পর্কের ভিত্তি কেবল সাংগঠনিক নয়, বরং আত্মিক। কাজী সাহেবের সেই আবেগভরা ডাক ও কান্না প্রমাণ করে, দ্বীনের মেহনত মানুষের হৃদয়ে এমন এক বন্ধন তৈরি করে যা রক্তের সম্পর্কের চেয়েও মজবুত হতে পারে।
অনেকের ধারণা, কেবল দীর্ঘ বয়ান আর তাত্ত্বিক আলোচনা করাই বোধহয় দ্বীনি খিদমতের একমাত্র রূপ; কিন্তু স্যারের জীবনদর্শন ছিল ভিন্ন। স্যার দেখিয়েছেন, অসুস্থ সাথীর শিয়রে বসা কিংবা তার পরিবারের ছোটখাটো বিষয়েও আন্তরিকতা দেখানো, বড় মাপের আমল। এই ছোট ছোট আমলগুলোই মানুষের অন্তরে দ্বীনের প্রতি এমন এক গভীর ভালোবাসা জন্ম দেয়, যা হাজারো বয়ানের চেয়েও বেশি কার্যকর। বয়ান কান পর্যন্ত পৌঁছায়, কিন্তু আল্লাহর জন্য ভালোবাসা (ব্যক্তিগত মমতা) পৌঁছায় মানুষের হৃদস্পন্দন পর্যন্ত। মানুষের মন জয় করে তাকে দ্বীনের পথে ডাকা যে কত বড় কার্যকর কৌশল হতে পারে, স্যারের এই ‘হালত পুর্ছি’ বা কুশল বিনিময়ের আমলটি তার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।
একজন বয়োজ্যেষ্ঠ মুরব্বি যখন বিদায়ের মুহূর্তে অশ্রু বিসর্জন দেন, তখন বুঝতে বাকি থাকে না যে সেই সম্পর্কের শেকড় হৃদয়ের কতটা গভীরে। কাজী সাহেবের সেই কান্না ছিল যেন উনার অন্তরের নিভৃত কোণ থেকে আসা এক শেষ নিবেদন। স্যারের এই সাক্ষাৎ কেবল কোনো লৌকিক সৌজন্য ছিল না, বরং এতে ছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সেই পবিত্র আদর্শের প্রতিফলন, যিনি মানুষের মন জয় করতেন অকৃত্রিম মমতা দিয়ে। কাজী আনসার আলী সাহেবের সেই শেষ ডাক এবং টলমল চোখের পানি আমাদের হৃদয়ে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
৩৩৮. বাচ্চাদের সাথে স্যারের এক অমায়িক ও শিশুসুলভ আচরণের ঘটনা…
বাচ্চাদের সাথে স্যারের এক অমায়িক ও শিশুসুলভ আচরণের ঘটনা বর্ণনা করেন সায়ীদ আবুবকর ভাই। তিনি শুধু বড়দের সাথেই নয়; ছোট শিশুদের সাথেও এমনভাবে মিশে যেতেন, যেন তিনি তাদেরই একজন। ভাই বলেন, চাকরির সুবাদে আমাকে ঝিনাইদহ ও সিরাজগঞ্জে থাকতে হয়েছে। উভয় স্থানেই স্যার সফরে গিয়ে আমার বাসায় অবস্থান করেছেন, রাত যাপন করেছেন। ঝিনাইদহে থাকাকালীন একবার স্যার আমার বাসায় মেহমান হলেন। আমার দুই মেয়ে তখন একেবারেই ছোট। আমরা স্যারকে শোয়ার জন্য একটি ঘর নির্দিষ্ট করে দিলাম।
বাচ্চারা সাধারণত বাড়িতে মেহমান আসলে খুব কৌতূহলী হয়। স্যারের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হলো না। এদিকে ছোট দুই মেয়ে খুব আনন্দিত, বাড়িতে একজন মেহমান এসেছে। পরম উৎসাহে তারা নিজেদের মতো করে ব্যস্ত হয়ে পড়ল ‘রান্নাবান্না’ করতে। কাগজের টুকরো দিয়ে তারা পাকিয়ে ফেলল মাছ, গোশত আর ভাত, তাদের শিশু মনের কল্পনার খাবার। তারপর তারা সেই ‘খাবার’ স্যারের সামনে নিয়ে এলো খাওয়ার জন্য, এবং পরম মমতায় স্যারকে তা খাওয়ার জন্য পরিবেশন করল।
স্যার তখন তাদের সাথে একদম ছোট শিশু হয়ে মিশে গেলেন, তাদের পরিবেশন করা সেই কাগজের টুকরো দিয়ে তৈরি খাবার অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করলেন। শুধু তাই নয়, তিনি বাচ্চাদের সামনে সেই কাগজের খাবারগুলো ঠোটের কাছে নিয়ে চিবানোর মতো এমন নিপুণ অভিনয় আর অঙ্গভঙ্গি করলেন যে, মনে হচ্ছিল তিনি সত্যিই খুব সুস্বাদু কোনো খাবার খাচ্ছেন। তিনি বাচ্চাদের বোঝালেন যে, তাদের রান্না করা সেই খানা অত্যন্ত চমৎকার হয়েছে, অভিব্যক্তিতে স্পষ্ট ছিল “খুব মজা হয়েছে!”
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিশুদের সাথে শিশুদের মতো আচরণ করতেন। তাদের সাথে হাসাহাসি ও খেলাধুলা করতেন। বড় হয়েও ছোটদের মন জয় করা এবং তাদের কল্পনার জগতের সাথে একাত্ম হওয়া একটি উঁচু মাপের চারিত্রিক গুণ। স্যার উনার এই আচরণের মাধ্যমে সেই সুন্নাহকেই জীবন্ত করেছেন। সাঈদ ভাই বলেন, এই দৃশ্য আজও আমার চোখে ভাসে, একজন বড় মাপের মানুষ বা জ্ঞান তাপস হওয়া মানেই গম্ভীর হয়ে থাকা নয়। শিশুদের মন জয় করতে বড় কোনো কথা বা উপদেশের প্রয়োজন হয় না; বরং দরকার আন্তরিকতা, ভালোবাসা এবং তাদের স্তরে নেমে আসার মানসিকতা। স্যার মেহমান হিসেবে গিয়ে নিজেকে কোনো গণ্ডিতে আটকে রাখেননি। বরং মেজবানের সন্তানদের সাথে এমনভাবে মিশে গেছেন যেন তিনি তাদেরই পরিবারের একজন অতি আপনজন।
৩৩৯. ঢাকার পশ্চিম আগারগাঁও এলাকায় এক ভাইয়ের বাসায় দুপুরে খানার…
ঢাকার পশ্চিম আগারগাঁও এলাকায় এক ভাইয়ের বাসায় দুপুরে খানার দাওয়াত ছিল। মেজবানের পরিচিতির সুবাদে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন ছাত্রীও সেখানে উপস্থিত ছিল। মেজবান ভাই স্যারের উপস্থিতির এই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে ছাত্রীদের উদ্দেশে কিছু দ্বীনি আলোচনার ব্যবস্থা করেন। বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে ঘরোয়া মজলিসে মাস্তুরাতের মুজাকারার আয়োজন করা হয়।
মাস্তুরাতের সে মুজাকারায় প্রথাগত শিক্ষার আলোচনা প্রসঙ্গে স্যার এক উদাহরণ পেশ করেন। একজন মেডিকেল কলেজের শিক্ষক মেডিকেলের শিক্ষার্থীদের একটি বিশেষ অধ্যায় পড়াচ্ছিলেন, “হঠাৎ কেউ অজ্ঞান হয়ে গেলে তার প্রাথমিক চিকিৎসা ও তাৎক্ষণিক করণীয়”। কয়েকটি ক্লাস ধরে তিনি বিষয়টি বিস্তারিতভাবে বুঝিয়েছেন, কীভাবে রোগীকে সামলাতে হয়, কীভাবে প্রাথমিক চিকিৎসা দিতে হয় ইত্যাদি। খুঁটিনাটি অনেক থিওরি শেখানোর পর যেদিন সেই চ্যাপ্টারের শেষ ক্লাস, শিক্ষক প্র্যাকটিক্যাল ডেমোস্ট্রেশন (ব্যবহারিক প্রদর্শন) কে সামনে আনতে চান, এই পাঠের শেষ পর্যায়ে হঠাৎ নিজেই অজ্ঞান হয়ে মেঝেতে পড়ে গেলেন।
হঠাৎ শিক্ষকের এই শারীরিক অবনতি দেখে শিক্ষার্থীরা একটু ঘাবড়ে গেলো, সবাই আতঙ্কিত হয়ে ব্যাস্ত হয়ে পড়ল। কেউ চিৎকার করছে, কেউ ডাক্তার ডাকতে বলছে, কেউ ডাক্তার ডাকতে দৌড়ালো, কেউ অ্যাম্বুলেন্সে ফোন দিল, কেউবা ডিপার্টমেন্টের অফিসে খবর দিতে ছুটল, চারদিকে হইচই শুরু হয়ে গেল, পুরো ক্লাসে শোরগোল, সবাই অস্থিরতায় লিপ্ত। কিন্তু যেটা তারা এতদিন শিখেছিল, তাৎক্ষণিক প্রাথমিক চিকিৎসা, একজন শিক্ষার্থীও শিক্ষকের শেখানো সেই ‘প্রাথমিক চিকিৎসা’ বা ‘ফার্স্ট এইড’ দেওয়ার কথা মনে করল না, তার কোনো প্রয়োগ কেউ করতে পারল না।
আসলে এটি ছিল ঐ শিক্ষকের একটি পরিকল্পিত প্রাকটিক্যাল পরীক্ষা, উনার অজ্ঞান হওয়াটা ছিল একটি চমৎকার সাজানো অভিনয় বা ‘সারপ্রাইজ টেস্ট’। কিছুক্ষণ পর শিক্ষক উঠে দাঁড়ালেন। তিনি দেখতে চেয়েছিলেন, দীর্ঘ ক্লাসে তিনি যা পড়িয়েছেন, বাস্তব সংকটের মুহূর্তে শিক্ষার্থীরা তার কতটুকু প্রয়োগ করতে পারে। উনার শিক্ষার্থীরা শুধু তত্ত্ব (থিওরি) শিখেছে, নাকি বাস্তবে তা প্রয়োগ করার সক্ষমতাও অর্জন করেছে। কিন্তু দেখা গেল, শিক্ষার্থীরা জেনেছে, বুঝেছে ঠিকই, কিন্তু বাস্তবে কাজে লাগাতে পারেনি, তাত্ত্বিকভাবে জানলেও বিপদের সময় তাদের সেই শিক্ষার কোনো প্রতিফলন নেই।
স্যার এই উদাহরণের মাধ্যমে আমাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ এক সত্যের দিকে ইঙ্গিত করেন: আমরা অনেকেই অনেক মাসলা-মাসায়েল জানি, বয়ান মোজাকারা শুনি, অনেক দ্বীনি কিতাব পড়ি, কিন্তু যখন ধৈর্যের পরীক্ষা আসে, যখন শোকর গুজার হওয়ার মুহূর্ত আসে কিংবা চারিত্রিক দৃঢ়তা দেখানোর সময় হয়, তখন আমরা সাধারণ মানুষের মতোই বিচলিত হয়ে পড়ি। সেই মুহূর্তে আমাদের তাত্ত্বিক দ্বীনদারী কোনো কাজে আসে না। স্যার আমাদের দ্বীনি জীবনের স্বরূপ এভাবে বোঝান, দেমাগ (মস্তিষ্ক) যা ধারণ করবে, জীবন যেন ঠিক তার সাক্ষ্য দেয়; জবান যা বলবে, জীবন যেন ঠিক তার সাক্ষ্য দেয়, তবেই সেটা দ্বীনদারী, তবেই তার শিক্ষা (ইলম) সার্থক। আমাদের জ্ঞান বা অর্জিত শিক্ষা যদি আমল পর্যন্ত না পৌঁছায়, তবে তা প্রকৃত জ্ঞান নয়; বরং এমন শিক্ষার কোনো বাস্তব উপযোগিতা নেই।
৩৪০. একবার স্যার কিছু সাথী সহ ঢাকার পশ্চিম রাজাবাজারে আবুল…
একবার স্যার কিছু সাথী সহ ঢাকার পশ্চিম রাজাবাজারে আবুল কাশেম ভাইয়ের বাসায় অবস্থান করছিলেন। দুপুরে খাওয়া-দাওয়া শেষে ‘কায়লুলা’ (দুপুরের বিশ্রাম) করার সময় হলে দেখা গেল, আবুল কাশেম ভাইয়ের ছোট ঘরটিতে সবার বিশ্রামের পর্যাপ্ত জায়গা হচ্ছে না, বাসার ছোট রুমে সবার জন্য আরামদায়কভাবে বিশ্রামের সুযোগ ছিল না।
যেহেতু আবুল কাশেম ভাইদের মহল্লার মসজিদটি বেশ বড় এবং দোতলা-তিনতলা ফাঁকা আছে; তাই সাথীদের কেউ আবুল কাশেম ভাইয়ের নিকট পরামর্শ চাইলেন যে মসজিদের দোতলায় গিয়ে বিশ্রাম নেওয়া যাক। পরিচিত মেজবানের মহল্লার মসজিদ হওয়ায় সেখানে বিশ্রামে কোনো বাধা আসার সম্ভাবনাও ছিল না, কেউ আপত্তিও করবে না। কিছু সাথী মসজিদে চলে গেলেন, কিন্তু স্যার নড়ছেন না। তিনি দীর্ঘক্ষণ ওভাবেই বসে রইলেন।
স্যার দীর্ঘ সময় চুপচাপ থাকার পরও যখন নিজে মসজিদে গিয়ে বিশ্রাম নেওয়ার ব্যাপারে কোনো আগ্রহ দেখালেন না, আর এব্যাপারে কিছু বলছেনও না, তখন মাহফুজ ভাই স্যারকে জিজ্ঞাসা করলেন, “স্যার, মসজিদকে বাসস্থান বানানো ঠিক নয়, এই উসুলের কারণেই কি আপনি যাচ্ছেন না?”
স্যার সংক্ষেপে উত্তর দিলেন, “হ্যাঁ, এই উসুলের কারণেই আমি যাচ্ছি না।” এরপর তিনি পরিষ্কার করলেন যে, কেবল আরামের জন্য বা নিজের প্রয়োজনে মসজিদকে ব্যবহার করা ঠিক নয়।
শরীয়তের দৃষ্টিতে মসজিদ হলো আল্লাহর ঘর, যা কেবল নামাজ, জিকির ও দ্বীনি কার্যক্রমের জন্য বরাদ্দ। একান্ত অপারগতা বা দ্বীনি সফর (যেমন জামাতে থাকা) ব্যতীত কেবল ব্যক্তিগত আরামের জন্য মসজিদকে শয্যাস্থল বানানো, বিশ্রাম বা আরামের জায়গা বানানো মসজিদের মর্যাদার পরিপন্থী। সাথীরা অনেকেই মসজিদে বিশ্রাম নিতে গেছেন এবং সেখানে যাওয়ার যৌক্তিকতাও ছিল (পরিচয় ও পর্যাপ্ত জায়গা)। কিন্তু স্যার নিজের আমলের মাধ্যমে বোঝালেন, দ্বীনের আদব শুধু বড় বড় বিষয়ে নয়; বরং এ ধরনের ছোট ছোট বিষয়েও সংরক্ষণ করতে হয়।
← আগের পর্ব (৩০১–৩২০) | সূচিপত্র | পরের পর্ব (৩৪১–৩৬০) →
সংগ্রহ ও সংকলন: মুশফিক আহমদ (রহঃ)-এর মালফুযাত সংকলন।
