|

মালফুযাত – প্রফেসর মুশফিক আহমদ (রহঃ) – পর্ব ১৮: ৩৪১–৩৬০

প্রফেসর মুশফিক আহমদ (রহঃ)-এর বয়ান, পরামর্শ, আমল ও দাওয়াতি জীবনের মালফুযাত, ৩৪১ থেকে ৩৬০ নম্বর। সম্পূর্ণ সূচিপত্র দেখুন।

সংগ্রহ ও সংকলন: মুশফিক আহমদ (রহঃ)-এর মালফুযাত সংকলন।

এই পর্বে যা আছে


৩৪১. মুমিনের প্রতিটি আচরণের পেছনে থাকবে ঈমানি সচেতনতা। আখলাকের মূলনীতি…

মুমিনের প্রতিটি আচরণের পেছনে থাকবে ঈমানি সচেতনতা। আখলাকের মূলনীতি হিসেবে স্যার বলতেন, মানুষকে তাদের মর্যাদা অনুযায়ী স্থান দেওয়া (আনযিলুন-নাসা মানাযিলাহুম)। বড়র সম্মান আর ছোটর স্নেহ যেমন আলাদা, তেমনি জ্ঞানী এবং বড়দের তাদের পাণ্ডিত্য ও ত্যাগ অনুযায়ী বিশেষ সম্মান দিতে হবে। এটি কোনো বৈষম্য নয়, বরং এটিই হলো প্রকৃত ইনসাফ বা ন্যায়বিচার।

স্যার ইমাম মালেক রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর জীবনের একটি ঘটনা শোনাতেন। একবার উনার মজলিসে অনেক ফকীহ উপস্থিত ছিলেন। ঐ মজলিসে ইমাম আউযায়ী রহমতুল্লাহি আলাইহি আসলেন, তিনি উনাকে বিশেষ সম্মান প্রদর্শন করলেন, একটু উচু তাকিয়ার উপর বসতে দিলেন। এরপর যখন ইমাম আবু হানিফা রহমতুল্লাহি আলাইহি আসলেন, ইমাম মালেক রহমতুল্লাহি আলাইহি ইমাম আবু হানিফা রহমতুল্লাহি আলাইহিকে দেখে অত্যন্ত সম্মান করে নিজের পাশে জায়গা করে দিলেন এবং উনার বসার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা (চাদর বা গালিচা) বিছিয়ে দিলেন।

উপস্থিতরা যখন এই বিশেষ একরাম বা সম্মানের কারণ জিজ্ঞেস করলেন, (উভয়ের মধ্যে) এই পার্থক্যের কারণ জানতে চাইলেন, তখন ইমাম মালেক রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাদের ইলম ও প্রজ্ঞার স্তরের কথা উল্লেখ করেন। উনি এই হাদিসটি (أَنْزِلُوا النَّاسَ مَنَازِلَهُمْ) উল্লেখ করে বলেন, “ইনাদের দুইজনের স্তর এক নয়।”

৩৪২. আমাদের প্রচলিত ধারণা হলো, সবার সাথে সবসময় একইভাবে হাসিমুখে…

আমাদের প্রচলিত ধারণা হলো, সবার সাথে সবসময় একইভাবে হাসিমুখে মেলামেশা করাই উত্তম চরিত্র। কিন্তু স্যার এই ধারণাকে সংশোধন করে বলতেন, নেককার আর বদকারের প্রতি আচরণ অবশ্যই ভিন্ন হতে হবে।

মুমিনের আসল চরিত্র কেমন হওয়া উচিত, তা বোঝাতে গিয়ে স্যার একটি উদাহরণ পেশ করতেন। তিনি বলতেন, সবার সাথে বাছ-বিচারহীনভাবে একই আচরণ করা মূলত “গরুর আখলাক”। একটি গরু তার সামনে উপস্থিত ব্যক্তিটি অনেক বড় আল্লাহওয়ালা নাকি চরম পাপাচারী, সেই পার্থক্য করতে পারে না, সে সবার সাথেই এক আচরণ করে। সবার কথার জবাবে তার একটাই ডাক, একই জবাব, ‘হাম্বা!’ যে-ই তাকে নাড়া দেয়, তার জবাবে ও কান নাড়িয়ে একই ভঙ্গিতে সাড়া দেয়; ওর একই আচরণ সবার সাথে। কিন্তু শরীয়ত মুমিনকে এই শিক্ষা দেয়নি।

স্যার শিখিয়েছেন যে, উত্তম চরিত্র মানে কেবল ‘নরম হওয়া’ নয়; বরং উত্তম চরিত্র হলো যেখানে নরম হওয়া দরকার সেখানে নরম হওয়া, আর যেখানে আদর্শের প্রশ্নে শক্ত হওয়া দরকার সেখানে পাহাড়ের মতো অটল থাকা। মানুষ কী বলবে বা কেউ অসন্তুষ্ট হবে কি না, এই চিন্তা না করে আল্লাহর হুকুম অনুযায়ী আচরণ করা হলো মুমিনের সিফত।

৩৪৩. স্যার বলেন, ঈমানের দাবি হলো, হুব্বুন ফিল্লাহ, বুগদুন ফিল্লাহ…

স্যার বলেন, ঈমানের দাবি হলো, হুব্বুন ফিল্লাহ, বুগদুন ফিল্লাহ (الْحُبُّ فِي اللَّهِ , الْبُغْضُ فِي اللَّهِ)। আল্লাহর জন্যই হবে ভালোবাসা, আবার আল্লাহর জন্যই হবে বিদ্বেষ বা ঘৃণা। সত্যবাদী আর আমানতদারকে আল্লাহর জন্য ভালোবাসা, সাথে সাথে আর মিথ্যাবাদী ও খিয়ানতকারীকে আল্লাহর জন্যই ঘৃণা করা (কোনো ব্যক্তি আল্লাহর অবাধ্যতায় লিপ্ত বা সত্যের বিরোধী হলে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে তার সেই কর্মকে বা তাকে অপছন্দ করা)। মুমিনের ভালোবাসা বা ঘৃণা কোনোটিই মর্জিমতো হবে না; বরং সবকিছুর মাপকাঠি হবে আল্লাহর সন্তুষ্টি।

স্যার ফাজায়েলে ছাদাকাত কিতাবের রেফারেন্স দিয়ে বলেন, যে ব্যক্তি সবার কাছে সমান প্রিয়, সম্ভবত তার দ্বীনদারিতে ত্রুটি আছে। কারণ হক আর বাতিল কখনো একসাথে কারো ওপর সন্তুষ্ট হতে পারে না। হকের ওপর যে অটল থাকবে, বাতিল তার প্রতি অসন্তুষ্ট হবেই। তাই সবার কাছে ভালো হওয়ার চেষ্টা করা মানে হলো হকের সাথে আপস করা।

স্যার মুমিনের মৌলিক বৈশিষ্ট্য এবং চারিত্রিক মানদণ্ড হিসেবে কালামে পাক থেকে উপমা দিতেন:

> أَشِدَّاءُ عَلَى الْكُفَّارِ رُحَمَاءُ بَيْنَهُمْ

> أَذِلَّةٍ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ أَعِزَّةٍ عَلَى الْكَافِرِينَ

স্যার স্পষ্ট করতেন যে, দ্বীনদারি আর সামাজিকতা এক নয়। একজন মুমিন কখনোই বলতে পারে না যে, মুমিনও আমার বন্ধু, ইহুদি-মুশরিকও আমার বন্ধু। সহযোগিতার ক্ষেত্র আলাদা; ক্ষুধার্থকে খাবার খাওয়ানোর সময় সে কাফের কি মুসলিম তা দেখবে না। কিন্তু ‘কালবি মহব্বত’ বা হৃদয়ের ভালোবাসা ও বন্ধুত্বের সম্পর্ক কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির ভিত্তিতে হতে হবে। কাফের বা পাপাচারীর সাথে তার সম্পর্ক হবে কেবল মানবিক প্রয়োজনে বা দাওয়াতের প্রয়োজনে, হৃদয়ের টানে নয়। যে আল্লাহর শত্রু সে মুমিনের বন্ধু হতে পারে না, আর যে আল্লাহর বন্ধু সে মুমিনের শত্রু হতে পানে না। স্যার বলতেন এটা আমাদের আকীদার অংশ।

৩৪৪. একবার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কুষ্টিয়ায় একটি জামাত যায়। কয়েকদিন…

একবার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কুষ্টিয়ায় একটি জামাত যায়। কয়েকদিন কুষ্টিয়া শহরে থাকার পর পরামর্শ অনুযায়ী স্যারসহ জামাতের একটি অংশ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যান। কিন্তু আমাদের কয়েকজনের ক্লাস ও ব্যস্ততা থাকায় আমরা পাঁচজন কুষ্টিয়া শহর থেকেই রাজশাহীর উদ্দেশ্যে রওনা দেই। কুষ্টিয়া থেকে আমাদের ফেরার পথে এক ভয়াবহ ডাকাতির ঘটনা ঘটে। হুজুর মানুষ দেখে হয়তো ডাকাতরা আমাদের ছেড়ে দেয়; অন্য সবাইকে তল্লাশি করা হলেও আমরা রেহাই পাই।

সেই সময় পদ্মা নদীর উপর বাস চলাচলের সেতু ছিল না; ফেরি দিয়ে পার হতে হতো। আমরা যে বাসে উঠলাম, তাতে গরুর ব্যবসায়ীও ছিল, যারা চাঁপাইনবাবগঞ্জের দিকে গরু কেনার উদ্দেশ্যে যাচ্ছিলেন এবং যাদের কাছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ টাকা ছিল। পথিমধ্যে নির্জন এলাকায় একদল ডাকাত কৌশলে বাস থামিয়ে ফেলে। আগে থেকেই তাদের কয়েকজন বাসে ছিল। তারা ড্রাইভারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় এবং মুহূর্তেই পুরো বাসে ত্রাস সৃষ্টি করে।

বাসে উঠে তারা সামনে বসা এক বৃদ্ধ মুরুব্বি যাত্রীকে ছুরি মেরে গুরুতর আহত করে, যাতে সবাই ভয়ে স্তব্ধ হয়ে যায়। সামনে একজন পিস্তল উঁচিয়ে পেছনের দিকে তাক করে দাঁড়িয়ে ছিল। এরপর তারা একে একে যাত্রীদের তল্লাশি করে টাকা-পয়সা নিয়ে নিতে থাকে। কেউ দেরি করলে তাকে মারধর ও হুমকি দিচ্ছিল। ডাকাতরা আমাদের কাছে এসে তল্লাশি না করে পেছনে তল্লাশি শুরু করে।

মোতাহার স্যার, কাজল ভাইসহ আমরা পাঁচজন বাসের মাঝামাঝি একসাথে বসে ছিলাম। অত্যন্ত ভীত অবস্থায় আমরা দোয়া, ইস্তিগফার ও দোয়া ইউনূস পড়ছিলাম। আল্লাহর রহমতে ডাকাতরা আমাদের স্পর্শও করেনি। তারা সবকিছু নিয়ে দ্রুত চলে গেলে বাসে হাহাকার শুরু হয়। বিশেষ করে গরুর ব্যবসায়ীরা কান্নায় ভেঙে পড়ে। আর সামনে সেই আহত বৃদ্ধ, তিনি কষ্টে বলছিলেন, “আমি আমার অসুস্থ স্ত্রীকে চিকিৎসার জন্য রাজশাহী নিয়ে যাচ্ছিলাম, এখন আমি নিজেই রোগী হয়ে গেলাম।” উনার লুঙ্গি ও পাঞ্জাবি রক্তে ভিজে যায়।

আমরা তখন অন্যদের মতোই তাড়াহুড়ো করে বাস থেকে নেমে ফেরিঘাটের দিকে রওনা দেই। সেই বৃদ্ধের রক্তাক্ত অবস্থা চোখে পড়েছিল, কিন্তু ভয়ের চাপে আমরা আর কিছু করতে পারিনি। পরে রাজশাহীতে স্যার ফিরে আসলে পুরো ঘটনা শুনালাম। এই ‘অলৌকিক’ভাবে রক্ষা পাওয়ার খুশিতে ভেবেছিলাম, স্যার হয়তো আমাদের বেঁচে যাওয়া ও আমলের মধ্যে থাকার কথা শুনে খুশি হবেন। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন।

স্যারের চেহারায় গভীর বেদনার ছাপ ফুটে উঠল। তিনি শুধু সেই রক্তাক্ত ও অসহায় বৃদ্ধের কথাই জিজ্ঞাসা করছিলেন, “যে বৃদ্ধকে ছুরি মারা হয়েছিল, উনার কী হলো?” বললাম, আমরা তো নেমে চলে এসেছি; উনার পরের অবস্থা জানি না। যখন স্যার শুনলেন যে সবাই যার যার মতো নেমে গেছে এবং সেই বৃদ্ধকে ওই অবস্থায় ফেলে আসা হয়েছে, তখন উনার চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠল। তিনি সম্পূর্ণ নীরব হয়ে গেলেন। মনে হচ্ছিল, তিনি সেই অসহায় বৃদ্ধের কষ্টই অনুভব করছেন। আমাদের বেঁচে যাওয়ার গল্পে তিনি খুশি হতে পারেননি।

স্যার উনার গম্ভীর ও ব্যথিত চেহারার মাধ্যমে বুঝিয়ে দিলেন, মুমিন সেই ব্যক্তি যার হৃদয় অন্যের দুঃখে দগ্ধ হয়। নিজের নিরাপত্তা পাওয়াকে ‘কামিয়াবি’ মনে করা যথেষ্ট নয়; বরং অন্যের কষ্টে সাড়া দেওয়াই একজন মুমিনের আসল পরিচয়। আমাদের মনে হচ্ছিল, “আলহামদুলিল্লাহ, আমরা বেঁচে গেছি।” এটিকে এক ধরনের ‘কেরামতি’ ভেবেছিলাম। কিন্তু স্যারের অন্তরে বাজছিল, একজন অসহায় মানুষ রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। স্যার পরোক্ষভাবে বুঝিয়ে দিলেন, সেই মুহূর্তে ওই বৃদ্ধকে হাসপাতালে নেওয়া বা অন্তত উনাকে বাস থেকে নামাতে সাহায্য করাটা ছিল সে সময়ের শ্রেষ্ঠ আমল।

বিপদের সময় দোয়া-দরুদ পড়া অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। আমল মানুষকে বিপদ থেকে বাঁচাতে পারে, কিন্তু আখলাক বা চরিত্র নির্ধারণ করে মানুষ আল্লাহর প্রিয় বান্দা হতে পারল কি না। স্যারের বেদনাভরা অশ্রুসিক্ত চেহারা যেন এ কথাই বলছিল, অন্যের অসুস্থতা বা বিপদের মুখে নিজের নিরাপত্তায় তৃপ্ত হওয়াটা এক প্রকারের আত্মকেন্দ্রিকতা, যা একজন দায়ী বা মুবাল্লিগের শান হতে পারে না।

৩৪৫. রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের সাবেক ছাত্র নাটোরের চান মোহাম্মদ…

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের সাবেক ছাত্র নাটোরের চান মোহাম্মদ ভাই স্যারের সান্নিধ্যের এক স্মৃতি ব্যক্ত করেন। অনার্স পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর তিনি কয়েকজন সাথী মিলে আল্লাহর রাস্তায় সময় লাগাবেন (তিন চিল্লা বা চার মাসের জন্য পাকিস্তান সফর)। এ উদ্দেশ্যে কাকরাইল গিয়ে পরামর্শ অনুযায়ী সফরের প্রস্তুতি শুরু করেন। প্রস্তুতি সম্পন্ন হলো, টাকা ভাঙানো (প্রয়োজনীয় ডলার সংগ্রহ) হলো এবং যাত্রার দিনক্ষণও চূড়ান্ত হলো।

কিন্তু ঠিক যাত্রার আগমুহূর্তে খবর এলো যে, খুব শীঘ্রই উনাদের মাস্টার্সের ক্লাস শুরু হতে যাচ্ছে। চার মাসের এই দীর্ঘ সফর শেষে ফিরে আসতে আসতে অনেক ক্লাস মিস হয়ে যাবে, সময়মতো ক্লাসে যোগ দেওয়া সম্ভব হবে না।

এই খবর শোনার পর কাফেলার অন্য সাথীরা তাদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করলেন। তারা ভাবলেন, মাস্টার্স ক্লাস মিস করা ঠিক হবে না, তাই তারা স্থানীয়ভাবে অল্প কয়েকদিনের জামাতে চলে গেলেন।

কিন্তু উনি ভাবলেন, “ক্লাসের তো কেবল ঘোষণা এসেছে, এখনো তো শুরু হয়নি। আমি আল্লাহর রাস্তায় বের হই, পরে যা হওয়ার হবে।” সফরের সিদ্ধান্তে অটল থাকলেন, আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে তিনি পাকিস্তানের উদ্দেশে রওনা হলেন।

ইতোমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন বিভাগে ক্লাস শুরু হয়ে গেছে। ছাত্ররা ফিরে আসছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদে ছাত্রদের ‘মাশওয়ারা’ (পরামর্শ) তে চান মোহাম্মদ ভাইয়ের বিষয়টি উত্থাপিত হলো। সবাই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে বললেন যে, এখন যদি পাকিস্তানে চিঠি লিখে তাকে ফিরিয়ে না আনা হয়, তবে তার ক্লাস পড়াশোনার বড় ক্ষতি হয়ে যাবে। সবাই যখন উনাকে ফিরিয়ে আনার পরামর্শ দিচ্ছিলেন, তখন স্যার অত্যন্ত শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বললেন: “চান মোহাম্মদ সময় লাগাক (ওর চার মাস সময় পুরা করেই আসুক)। ও না আসা পর্যন্ত ওর বিভাগে ক্লাস শুরু হবে না।”

ফলাফল হলোও তাই। চান মোহাম্মদ ভাই নির্বিঘ্নে উনার চার মাসের সফর শেষ করে দেশে ফিরলেন। তিনি রাজশাহী পৌঁছানোর আরও ১৫ দিন পর উনার বিভাগে মাস্টার্সের ক্লাস শুরু হয়। যে ক্লাসের ভয়ে অন্যরা পিছিয়ে গিয়েছিলেন, উনার সেই ক্লাসের সময়ই পিছিয়ে যায়, নির্দিষ্ট সময়ে ক্লাস শুরু হয় না, উনার মাস্টার্স এর ক্লাসের কোনো মিস বা ক্ষতি হয় নাই। এটি নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকের ঘটনা।

ভাই বলেন, আমি সফর থেকে ফিরে এসে যখন স্যারের এই কথা শুনলাম যে, “ও না আসা পর্যন্ত ক্লাস শুরু হবে না”- মনে হলো, আল্লাহর প্রিয় বান্দারা সাধারণ যুক্তির বাইরেও ঈমানি নূরের মাধ্যমে অনেক কিছু অনুধাবন করতে পারেন। উনাদের কথা ও দোয়া মুমিনের পথচলাকে সহজ করে দেয়। আমরা মনে করি রুটিন বা নিয়মই সব। কিন্তু এই রুটিন যিনি নিয়ন্ত্রণ করেন, সেই আল্লাহ যদি চান, তবে সময়ের চাকাও থমকে যেতে পারে।

৩৪৬. রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আব্দুল লতিফ হলের সাবেক ছাত্র, ঈশ্বরদীর আব্দুল…

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আব্দুল লতিফ হলের সাবেক ছাত্র, ঈশ্বরদীর আব্দুল আহাদ ভাই, স্যারের সোহবতের একটি ঘটনা স্মরণ করে বলেন: তিনি একবার একটি জামাতকে ইস্তেকবাল করে হলের ভেতরে নিয়ে আসেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তৎকালীন প্রভোস্ট উনার প্রতি অসন্তুষ্ট হন এবং উনার হলের সিট বাতিল করে দেন। প্রভোস্টের রোষানলে পড়ে তিনি আবাসন সিট হারান।

বিষয়টি তিনি স্যারকে জানালে স্যার উনাকে অত্যন্ত সংযত ও সুস্পষ্ট ভাষায় একটি দরখাস্ত লিখতে বলেন। একই সঙ্গে এর একটি কপি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির কাছেও দেওয়ার পরামর্শ দেন।

স্যারের নির্দেশনায় লেখা দরখাস্তের ভাষা ছিল সংক্ষিপ্ত কিন্তু দৃঢ়: “মাননীয় প্রভোস্ট, অত্র হলে কখন কে আসে এবং কে যায়, তা চব্বিশ ঘণ্টা নজরদারি করা আমার দায়িত্ব নয়; কারণ আমি প্রভোস্ট নই। অতএব, আমার প্রতি গৃহীত এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করে হলের সিট পুনর্বহালের জন্য অনুরোধ জানাচ্ছি।”

আব্দুল আহাদ ভাই সেই দরখাস্ত প্রভোস্টের কাছে জমা দেন এবং এর একটি অনুলিপি ভিসির কাছেও পাঠান। দরখাস্তের কপি ভিসি বরাবর দেওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক মহলে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। বিষয়টি জানার পর প্রভোস্ট উনাকে দরখাস্ত প্রত্যাহার করার জন্য বারবার অনুরোধ করেন; কিন্তু তিনি তা প্রত্যাহার করেননি। পরবর্তীতে একটি বৈঠকে প্রভোস্টকে উনার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এর কিছুদিন পর তিনি ইন্তেকাল করেন।

আব্দুল আহাদ ভাই বলেন, স্যারের প্রশাসনিক দূরদর্শিতা এবং হকের ব্যাপারে দৃঢ়তা ও প্রজ্ঞা ছিল অসাধারণ। তিনি কাউকে অন্যায়ভাবে চাপে পড়লে নীরব থাকতে শেখাননি; বরং শালীনতা বজায় রেখে নিজের অধিকার আদায়ের সঠিক পথ দেখিয়েছেন।

স্যারের পদ্ধতি ছিল না উত্তেজনা বা প্রতিক্রিয়াশীলতা; বরং যুক্তি, শালীনতা ও নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে সত্যকে উপস্থাপন করা। তিনি দেখিয়েছেন, হক আদায় করা মানে শুধু প্রতিবাদ করা নয়; বরং সঠিক ভাষায়, সঠিক প্রক্রিয়ায় নিজের অবস্থান তুলে ধরা। অন্যায়ের সামনে নীরব থাকা সমাধান নয়; আবার আবেগপ্রবণ প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে পরিস্থিতি ঘোলাটে করাও সমাধান নয়। স্যার শিখিয়েছেন, দ্বীনদার হওয়া মানে কেবল নতিস্বীকার করা নয়। যেখানে অন্যায়ভাবে দ্বীনি কাজে বাধা দেওয়া হয় বা নিরপরাধ কাউকে হেনস্তা করা হয়, সেখানে শালীনভাবে দাঁড়ানোই মুমিনের পরিচয়।

স্যারের শেখানো দরখাস্তের ভাষা ছিল আত্মমর্যাদাবোধ ও যৌক্তিক প্রতিবাদের এক সুন্দর সমন্বয়। তিনি জানতেন হকের লড়াই কীভাবে লড়তে হয়। তিনি আবেগের বশবর্তী হয়ে গণ্ডগোল করতে বলেননি, বরং নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে (ভিসি বরাবর কপি দেওয়া) অন্যায়ের প্রতিকার চেয়েছিলেন।

স্যার কেবল একজন শিক্ষক বা মুরুব্বি ছিলেন না; তিনি ছিলেন ছাত্রদের জন্য এক বটবৃক্ষ, এক আশ্রয়স্থল। যখন কোনো ছাত্র দ্বীনের পথে চলতে গিয়ে বাধার সম্মুখীন হতো, স্যার উনার অভিজ্ঞতা, দিকনির্দেশনা ও দোয়া নিয়ে ঢাল হয়ে তার পাশে দাঁড়াতেন।

৩৪৭. একবার রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি সেমিনার শেষে স্যার…

একবার রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি সেমিনার শেষে স্যার গণিত বিভাগের নিকটস্থ নামাজকক্ষে যুহরের নামাজের পর উপস্থিত ছাত্র ও শিক্ষকদের মাঝে কিছু মুজাকারা করেন। এটি সম্ভবত ২০১০ সালের কথা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরুর দিকের সময়। স্যার কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের সাথে উনার কথোপকথনের উদ্ধৃতি দিয়ে বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার একটি করুণ বাস্তবতা তুলে ধরেন।

স্যার বলেন, একবার তিনি আরেকজন শিক্ষকসহ কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে এক শিক্ষকের কাছে দাওয়াতের কাজের (গাশতের) উদ্দেশ্যে যান। তখন ওই শিক্ষক পরীক্ষার খাতা দেখায় ব্যস্ত ছিলেন। কথার ফাঁকে তিনি কিছুদিন আগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতির সংঘর্ষে প্রাণহানির একটি ঘটনা উল্লেখ করে আক্ষেপের সাথে বলেন, “এটা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য খুবই দুঃখজনক ঘটনা (বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য এই ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক)।”

ওই শিক্ষকের এই মন্তব্যের পর স্যার একটি সূক্ষ্ম ও যৌক্তিক প্রশ্ন তুললেন। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: “ঘটনাটি দুঃখজনক-এটা ঠিক। কিন্তু এটি বিশেষভাবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য কেন দুঃখজনক হবে?”

ওই শিক্ষক কিছুটা বিস্মিত হয়ে বললেন, “কেন, এটি কি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা নয়?”

তখন স্যার গভীর একটি কথা দিয়ে বিষয়টি পরিষ্কার করেন। তিনি বলেন, অভিভাবকরা সন্তানদের বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ বা স্কুলে পাঠান মূলত দুনিয়াবি দক্ষতা অর্জনের জন্য, ভালো চাকরি পাওয়া বা পেশাজীবী হওয়ার জন্য। দ্বীনদার মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে সাধারণত তাদের পাঠানো হয় না। উপরন্তু, এসব প্রতিষ্ঠানে দ্বীনি শিক্ষা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্তও নয়।

যেখানে নৈতিকতা ও চরিত্র গঠনের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেই, সেখান থেকে একজন শিক্ষার্থী আদর্শ মানুষ বা দ্বীনদার হয়ে বের হবে, এমনটি প্রত্যাশা করা বৃথা। সেখানে নৈতিক স্খলন বা অঘটন ঘটলে সেটিকে প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতা হিসেবে দেখাটা পুরোপুরি যৌক্তিক নয়। স্যারের যুক্তি ছিল, যেখানে নৈতিকতার কোনো পাঠই দেওয়া হয় না, সেখানে নৈতিক স্খলন বা অঘটন ঘটলে প্রতিষ্ঠানের বদনাম হওয়াটা অবান্তর; কারণ প্রতিষ্ঠানটি তো সেই শিক্ষা দেওয়ার বা সেই দায়িত্ব নেওয়ার দাবিই কখনও করেনি।

স্যার এই কথার মাধ্যমে একটি সূক্ষ্ম বাস্তবতা তুলে ধরেন, অভিভাবকরা যখন সন্তানদের কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠান, তখন উনাদের প্রধান উদ্দেশ্য থাকে সন্তানকে একজন ‘দক্ষ কর্মী’ (যেমন: অফিসার, ইঞ্জিনিয়ার বা ডাক্তার) হিসেবে গড়ে তোলা। এই প্রতিষ্ঠানগুলোও তাদের সিলেবাসে কেবল কর্মমুখী বা জাগতিক জ্ঞানই প্রদান করে। এধরণের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা মানুষের চরিত্রকে কিভাবে সুরক্ষিত রাখতে পারে? এজাতীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মূলত জ্ঞান ও দক্ষতা প্রদান করে; কিন্তু চরিত্র গঠন, তাকওয়া সৃষ্টি, আল্লাহভীতি জাগ্রত করা, এসবের জন্য আলাদা মেহনত প্রয়োজন। দুনিয়াবি জ্ঞানের পাশাপাশি দ্বীনের মেহনত, আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর সাথে সম্পর্ক গড়ার চেষ্টা না থাকলে সমাজে অশান্তি ও বিপর্যয় দেখা দিতেই পারে। কেননা শুধু একাডেমিক শিক্ষার মাধ্যমে একজন মানুষকে পূর্ণাঙ্গ মানুষ বানানো সম্ভব নয়।

এই কথার মাধ্যমে স্যার মূলত দ্বীনি মেহনত ও দাওয়াতের অপরিহার্যতা তুলে ধরেছেন। তিনি বুঝিয়েছেন, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি যদি মানুষের অন্তরে দ্বীনি চেতনা ও আল্লাহভীতি সৃষ্টি না হয়, তবে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়েও মানুষ সঠিক পথের দিশা পাবে না। এখানে অভিভাবকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা নজরে পড়ে। আমরা সন্তানদের ‘ক্যারিয়ার’ গড়তে যতটা আগ্রহী, তাদের ‘আখলাক’ বা দ্বীনদারি গড়তে ততটাই উদাসীন। আমরা কেবল সন্তানদের দক্ষ বানাতে চাই, দুনিয়াবি প্রতিযোগিতার জন্য দক্ষ বানাচ্ছি, কিন্তু মানুষ বানানোর দায়িত্বটি প্রায়ই উপেক্ষা করি।

৩৪৮. একবার মান্দায় এক সাথীর সাথে দেখা সাক্ষাতের প্রোগ্রাম শেষে…

একবার মান্দায় এক সাথীর সাথে দেখা সাক্ষাতের প্রোগ্রাম শেষে নওগাঁর নজিপুরে একটি জামাতের নুসরতে যাওয়ার প্রোগ্রাম ছিল। শীতের দিন, সঙ্গে ঝিরঝির বৃষ্টি ও ঠাণ্ডা বাতাস। মান্দার সেই সাথীর কাছ থেকে বিদায় নিতে কিছুটা দেরি হয়ে যাওয়ায় নির্ধারিত সময়ে রওনা হওয়া সম্ভব হয়নি। ওই সাথী পীড়াপীড়ি করছিলেন যে, “আজ আর যাওয়া হবে না, গাড়ি পাওয়া মুশকিল।” কিন্তু স্যার অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে বললেন, “রওনা দেই, ইনশাআল্লাহ কোনো না কোনো ব্যবস্থা হবে।”

এশার সময়ের কাছাকাছি মান্দা বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করার পরও নজিপুরগামী কোনো গাড়ি মিলছিল না। বৃষ্টি পড়ছে, শীত বাড়ছে, চারদিকের নির্জনতা আরও ঘন হয়ে উঠছে। এমন সময় একটি ট্রাকের ড্রাইভার চা নাস্তার জন্য গাড়ি থামিয়েছিল। রওনা হওয়ার সময় তিনি স্যারকে খেয়াল করলেন, দীর্ঘ সময় ধরে অপেক্ষা করছেন। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, “হুজুর, কোথায় যাবেন?” স্যার বললেন, “নজিপুরে।” ড্রাইভার বললেন, “আমি সরাসরি নজিপুরে যাব না, তবে কাছাকাছি পর্যন্ত যাব। আসেন, কিছুটা এগিয়ে দিই। এখন বাস পাওয়া কঠিন হবে।”

ড্রাইভারের এই আন্তরিক প্রস্তাবে স্যার উনার পাশে উঠে বসলেন। সামনে ড্রাইভার, হেল্পার এবং স্যারসহ চারজন গাদাগাদি করে বসে পথ চলা শুরু হলো। যাত্রাপথে স্যার এমন আন্তরিক ও সহজভাবে ড্রাইভারের সাথে কথা বলতে লাগলেন, যেন তিনি বহুদিনের পরিচিত একজন মানুষ। ট্রাকের মডেল, কত বছর চলে, ট্রাক্টরের সাথে ট্রাকের পার্থক্য, ইঞ্জিনের খুঁটিনাটি, ট্রিপের হিসাব, রাতের ড্রাইভিং, রাস্তাঘাট এজাতীয় নানা বিষয়ে কথা বলতে লাগলেন।

কথার ফাঁকে এক পর্যায়ে স্যার অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনি তাবলিগে কখনো সময় লাগিয়েছেন নাকি?” প্রশ্নটি ছিল না কোনো আনুষ্ঠানিক দাওয়াতের ভাষায়; বরং আপন মানুষকে আপনভাবে দ্বীনের দিকে টেনে নেওয়ার মতো আন্তরিক। ড্রাইভারও খুব স্বাভাবিকভাবে নিজের অভিজ্ঞতা ও পরিচিত মানুষের কথা বলতে লাগলেন। স্যারের কথাবার্তায় কোথাও এমন কোনো ভাব ছিল না যে তিনি একজন উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তি বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। বরং মনে হচ্ছিল, তিনি যেন এই শ্রমজীবী সমাজেরই একজন আপন মানুষ। এক পর্যায়ে ড্রাইভার কৌতূহল করে জিজ্ঞাসা করলেন, “হুজুর, আপনি কী করেন? আপনার কথা তো খুব পরিষ্কার বাংলা, কোনো আঞ্চলিক টান নাই।” স্যার অত্যন্ত সহজ ও সাদাসিধে ভঙ্গিতে উত্তর দিলেন: “আমি ছাত্র পড়াই।” তিনি চাইলে বলতে পারতেন তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক; কিন্তু নিজের পরিচয়কে বড় করে তুলে ধরার কোনো প্রয়োজন তিনি অনুভব করেননি।

ড্রাইভার সম্ভবত মনে করেছিলেন, তিনি হয়তো মাদরাসার শিক্ষক বা গৃহশিক্ষক, যিনি বাড়ি বাড়ি গিয়ে আরবি পড়ান। এরপর তিনি উনার এক আত্মীয়ের কথাও বলতে লাগলেন, যিনি কিছুদিন মাদরাসায় পড়েছেন এবং বাড়ি বাড়ি গিয়ে আরবি পড়ান। উনার উসিলায় এলাকার অনেক মানুষ কুরআন পড়া শিখেছেন। স্যার অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে উনার এই কথা শুনছিলেন। নিজের এই সাধারণ পরিচয়টিকেই যেন তিনি উপভোগ করছিলেন; বিশ্ববিদ্যালয়ের পদের কোনো গাম্ভীর্য প্রকাশ হতে দিলেন না। স্যারের জীবনের একটি বড় বৈশিষ্ট্য ছিল, তিনি মানুষের সাথে তাদের স্তরে নেমে মিশে যেতে পারতেন। অপরিচিত কাউকে নিজের সামাজিক অবস্থান বা শিক্ষাগত পরিচয়কে সামনে এনে দূরত্ব সৃষ্টি করতেন না; বরং সহজ আচরণ ও আন্তরিক কথাবার্তার মাধ্যমে মানুষের অন্তরে জায়গা করে নিতেন। সাধারণ মানুষের সাথে এমনভাবে মিশতেন যে, তারা উনাকে নিজেদেরই একজন মনে করত।

আমাদের সমাজে সামান্য উচ্চশিক্ষা বা পদমর্যাদা পেলেই অনেক মানুষের হাঁটা চলা ও কথাবার্তার ধরন বদলে যায়; সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের সাথে দূরত্ব তৈরি হয়। কিন্তু স্যার চাইলে নিজের বড় পরিচয় দিয়ে ড্রাইভারকে চমকে দিতে পারতেন, অথচ তিনি তা করেননি। তিনি দেখিয়েছেন, মানুষের মন জয় করতে হলে আগে তার স্তরে নেমে আসতে হয়, এটাই একজন দ্বীনের দাঈ বা মুবাল্লিগের বড় গুণ। আবার শীত ও বৃষ্টির রাতে একটি ট্রাকের সামনের সিটে গাদাগাদি করে বসা একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের জন্য জাগতিক দৃষ্টিতে কষ্টকর বা মর্যাদাহানিকর মনে হতে পারে। কিন্তু যার অন্তরে দ্বীনের মেহনতের ফিকির থাকে, তার কাছে আরাম আয়েশ বা সামাজিক প্রটোকলের চেয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং গন্তব্যে পৌঁছানোই মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়। স্যার নিজের আমলের মাধ্যমে এই বাস্তবতাই তুলে ধরেছেন।

৩৪৯. স্যারের কাছে কুরআন শরীফের তিলাওয়াত কেবল সওয়াবের বিষয় ছিল…

স্যারের কাছে কুরআন শরীফের তিলাওয়াত কেবল সওয়াবের বিষয় ছিল না; বরং এটি ছিল আল্লাহর কালামের হক আদায়ের বিষয়। তিনি মনে করতেন, মানুষ যদি দুনিয়ার ছোটখাটো দক্ষতা অর্জনের জন্য দীর্ঘ সময় ব্যয় করতে পারে, তাহলে আল্লাহর কিতাব শুদ্ধভাবে পড়ার জন্য আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

স্যার এক মুজাকারায় হযরত হাকীমুল উম্মত আশরাফ আলী থানভী রহমাতুল্লাহি আলাইহির একটি ঘটনা উল্লেখ করে বলেন, হযরত থানভী রহমাতুল্লাহি আলাইহি মক্কা শরীফে, সেখানকার একজন প্রসিদ্ধ কারীর সাক্ষাৎ পান। তিনি উপমহাদেশের অন্যতম বড় আলেম, তাফসির, ফিকহ ও তাসাউফের রাহবার। কিন্তু এত বড় আলেম হওয়া সত্ত্বেও তিনি নিজের কেরাতকে ‘যথেষ্ট’ মনে করেননি। মক্কা শরীফে তিনি ঐ কারীর নিকট দীর্ঘ সময় থেকে কেরাতের মশক করেছিলেন (হয়তো উনার তিলাওয়াত শুনে হযরত থানভী রহমাতুল্লাহি আলাইহি উপলব্ধি করেন যে, নিজের কেরাতকে আরও শুদ্ধ ও সুন্দর করার প্রয়োজন আছে)। স্যার এই ঘটনা দ্বারা বোঝান, কুরআনের তিলাওয়াতের শুদ্ধতার ব্যাপারে বড়দের কত গভীর গুরুত্ব ছিল।

অবসর সময়ে সুযোগ মিললে স্যার নিজে সময় নিয়ে অনেক সময় তিলাওয়াতের মশক করাতেন। একবার ঢাকা থেকে সিরাজগঞ্জে যাওয়ার পথে বাসে বসেই স্যার তিলাওয়াত শুনলেন এবং এক আয়াত এক আয়াত করে মশক করালেন। জামাতে যেমন কুরআনের হালকায় মশক করানো হয়, ঠিক সেভাবে। আবার রাজশাহীতে কাজল ভাইয়ের বাসায় অবস্থানকালেও অবসর সময়ে একাধিকবার এভাবে মশক করিয়েছেন।

স্যার কালামে পাকের তিলাওয়াতকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিতেন। অনেক সময় মানুষ দ্বীনের বড় বড় আলোচনা, বয়ান বা ইলমের দিকে আগ্রহী হয়; কিন্তু কুরআনের মাখরাজ, তাজবীদ ও শুদ্ধ তিলাওয়াতের ব্যাপারে উদাসীন থাকে। স্যার শেখাতেন, কুরআনের সাথে সম্পর্কের প্রথম ধাপই হলো, আল্লাহর কালামকে সঠিকভাবে আদায় (তিলাওয়াত) করা। তিনি বুঝাতেন, শুদ্ধ তিলাওয়াত শুধু কণ্ঠের সৌন্দর্য নয়; বরং এটি কুরআনের প্রতি সম্মান, মুহাব্বত ও আদবের বহিঃপ্রকাশ। কুরআনের ভুল উচ্চারণকে হালকা মনে করা ধীরে ধীরে কুরআনের আদব কমে যাওয়ার লক্ষণ।

মাহফুজ ভাই বলেন, একবার স্যার উনাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমার কুরআন শরীফের তিলাওয়াত কেমন?” তিনি সংক্ষেপে উত্তর দিলেন, “মোটামুটি।” তখন স্যার সাথে সাথে বললেন, “মোটামুটি হলে চলবে না, সম্পূর্ণ শুদ্ধ করতে হবে।” স্যার এই কথা দ্বারা বোঝান, কুরআন তিলাওয়াত এমন একটি বিষয় যেখানে “মোটামুটি” বলে কোনো কথা নেই। কুরআন আল্লাহর কালাম; তাই তা যথাসম্ভব শুদ্ধভাবে আদায় করার চেষ্টা করা মুমিনের দায়িত্ব।

মাহফুজ ভাই আরও বলেন, একবার স্যার উনাকে ফজরের নামাজে ইমামতি করতে দিলেন। তিনি সূরা তাকভীর পড়তে গিয়ে তিলাওয়াতে এমনভাবে উচ্চারণ করছিলেন যে, “যাল” অক্ষরটি “জীম” এর মতো শোনাচ্ছিল। সালাম ফেরানোর সাথে সাথে স্যার একটু কঠোর ভঙ্গিতে বলে উঠলেন, “সব ‘যাল’ ‘জীম’ হয়ে গেল?”

একবার এক সফরে আসরের নামাজে ইমামতি করতে গিয়ে তাকবীরে “আল্লাহু আকবার” এর “কাফ” অক্ষরের উচ্চারণ সঠিকভাবে আদায় হয়নি। সালাম ফেরানোর পর স্যার বিষয়টি খুব গুরুত্বের সাথে ধরলেন। কুরআন তিলাওয়াতের শুদ্ধতা ও কেরাত শেখার গুরুত্ব এভাবে স্যার অনেক বার বুঝিয়েছিলেন।

স্যারের জীবনে একটি বিষয় স্পষ্ট ছিল, তিনি নিজে যেমন কুরআনের ব্যাপারে সংবেদনশীল ছিলেন, তেমনি সাথীদের মাঝেও সেই অনুভূতি সৃষ্টি করতে চাইতেন। উনার কাছে “মোটামুটি” দ্বীনদারি বা “মোটামুটি” তিলাওয়াত যথেষ্ট ছিল না; বরং তিনি চাইতেন, মানুষ নিজের সাধ্য অনুযায়ী সর্বোচ্চ শুদ্ধতা ও ইহসানের সাথে আল্লাহর দ্বীন পালন করার চেষ্টা করুক।

৩৫০. একবার স্যার বলেন, আল্লাহ তাআলা সব মানুষকে একই রকম…

একবার স্যার বলেন, আল্লাহ তাআলা সব মানুষকে একই রকম বানাননি। প্রত্যেক মানুষের মেজাজ, প্রকাশভঙ্গি, প্রভাব এবং চলার ধরণ আলাদা। তাই সবাইকে একই “শিল-পাটায় ডলা” (একই মাপকাঠিতে বিচার করা) সঠিক নয়। দ্বীনের মেহনতেও আল্লাহ তাআলা ভিন্ন ভিন্ন স্বভাবের মানুষ দ্বারা কাজ নেন।

স্যার এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর একটি হাদিসের কথা উল্লেখ করেন, যেখানে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু আনহুকে হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম ও হযরত ইবরাহিম আলাইহিস সালামের সাথে তুলনা করেছেন, আর হযরত উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুকে হযরত নূহ আলাইহিস সালাম ও হযরত মূসা আলাইহিস সালামের সাথে তুলনা করেছেন। একদলের মধ্যে ছিল কোমলতা, দয়া ও নরম স্বভাবের প্রাধান্য; আর অন্যদলের মধ্যে ছিল দৃঢ়তা, জালাল ও কঠোরতার সিফাত।

স্যার বুঝান, হযরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর স্বভাব ছিল অত্যন্ত কোমল ও মায়াময়। শিশুদের প্রতিও উনার আচরণ ছিল এমন স্নেহপূর্ণ যে, তারা নির্ভয়ে উনার কাছে চলে আসত। অন্যদিকে হযরত উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর ব্যক্তিত্ব ছিল অত্যন্ত জালালী ও প্রভাবশালী। উনার উপস্থিতিতেই মানুষের অন্তরে এক ধরনের ভয় ও গাম্ভীর্য তৈরি হতো।

একইভাবে স্যার বলেন, হযরত উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন ধনী; উনার ধন সম্পদ ও দানশীলতা উনাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকটবর্তী করেছে। অন্যদিকে হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন অত্যন্ত দরিদ্র; কিন্তু উনার গরিবি, সবর ও ইখলাসও উনাকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রিয় বানিয়েছে। একজন সম্পদের ভেতরে থেকে আল্লাহর পথে ছিলেন, আরেকজন অভাবের মাঝেও আল্লাহর পথে ছিলেন। আল্লাহ তাআলা উভয়কেই অতি উত্তম ভাবে কবুল করেছেন।

স্যার নিজের উদাহরণ টেনে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে বলতেন, “আমি কোথাও গেলে চারদিকে খবর হয়ে যাবে, আর সানাউল্লাহ কোথাও গেলে পিঁপড়াও জানবে না।” কেউ স্বাভাবিকভাবেই মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন, আবার কেউ নীরবে কাজ করে যান, স্বভাব নিরব ও অপ্রকাশিত। তাই একজনের মেজাজ আরেকজনের সাথে মিলবে না।

স্যার আরও বলেন, একবার নাদের আলী খান সাহেব উনাকে বলেছিলেন, “আমি মাসোয়ারায় সাধারণ কোনো রায় দিই, সাথীরা রেগে যায়। অথচ সানাউল্লাহ অনেক কঠিন কথা বললেও রাগ করে না।” স্যার এই কথা দ্বারা বুঝাতেন, একই কথা ভিন্ন মানুষ ভিন্নভাবে উপস্থাপন করে, এবং মানুষের প্রকৃতি অনুযায়ী তার প্রভাবও ভিন্ন হয়। কেউ “জামালী সিফাত” এর অধিকারী, কেউ “জালালী সিফাত” এর।

তিনি বলেন, হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম ও হযরত ইবরাহিম আলাইহিস সালামের মধ্যে ছিল কোমলতা, মমতা ও দয়ার প্রবল প্রকাশ। স্যার উদাহরণ দিয়ে বলেন, যেন “জয়তুনের তেলের মতো” নরম স্বভাবের ছিলেন। অন্যদিকে হযরত নূহ আলাইহিস সালাম ও হযরত মূসা আলাইহিস সালামের মধ্যে ছিল দৃঢ়তা, শক্ত অবস্থান ও জালালের প্রকাশ।

স্যার এই গুরুত্বপূর্ণ আদবের দিকে ইঙ্গিত করেন যে, আমরা অনেক সময় চাই সবাই আমাদের মতো হবে, আমাদের মেজাজে চলবে, আমাদের মতো কথা বলবে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা মানুষকে ভিন্ন ভিন্ন সিফাত দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। কারো নরম স্বভাব দেখে তাকে দুর্বল ভাবা ঠিক নয়, আবার কারো দৃঢ় স্বভাব দেখে তাকে কঠোর মনে করাও ঠিক নয়। যদি উদ্দেশ্য হক হয়, তাহলে ভিন্ন ভিন্ন মেজাজও আল্লাহর দ্বীনের জন্য রহমত হতে পারে। স্যার বুঝাতেন, দ্বীনের ময়দানে যেমন “জামাল” দরকার, তেমনি “জালাল” ও দরকার। কোথাও কোমলতা মানুষকে কাছে আনে, কোথাও দৃঢ়তা মানুষকে সীমার ভেতরে রাখে। নবীদের জীবন, সাহাবাদের জীবন এবং আল্লাহওয়ালাদের জীবন এই বৈচিত্র্যের এক সুন্দর সমন্বয়।

৩৫১. এক মুজাকারায় স্যার ‘ব্যক্তিগত ফিকির’ এবং ‘উম্মতের ফিকির’ এই…

এক মুজাকারায় স্যার ‘ব্যক্তিগত ফিকির’ এবং ‘উম্মতের ফিকির’ এই দুইয়ের মধ্যকার আকাশ পাতাল ব্যবধানকে সহজভাবে তুলেছিলেন। তিনি উদাহরণ দিয়ে বোঝান যে, সব অভাবের চিন্তা এক ধরনের নয়। কোনো সমস্যার পরিসর যত বড় হয়, তার ফিকিরও তত ভিন্ন ও গভীর হয়। স্যার বলেন, “আমার ঘরে ডাল বা লবণ নেই, আমি চট করে বাজার থেকে তা কিনে আনলাম; সমস্যার সমাধান হয়ে গেল। ঘরের অভাব পূরণ হয়ে গেল। কিন্তু যদি পুরো বাজারেই ডাল বা লবণ না থাকে, তবে সেই সংকট ও চিন্তার পরিধি সম্পূর্ণ ভিন্ন।”

স্যার বুঝাতেন, দ্বীনের ক্ষেত্রেও ’ব্যক্তি পর্যায়ের সংকট’ আর ’উম্মতের সামষ্টিক সংকট’ এক বিষয় নয়। একজন মানুষের নিজের জীবনে দ্বীনের ঘাটতি থাকতে পারে। সে নামাজ শুরু করল, দাড়ি রাখল, চিল্লা দিল, হজ করল, কোনো বুযুর্গের সোহবত নিল, নিজের ইসলাহের চেষ্টা করল। তার ব্যক্তিগত অভাব অনেকটা পূরণ হয়ে গেল। কিন্তু যখন পুরো সমাজেই দ্বীন থাকে না, এমনকি যাদের দ্বীনদার বা দ্বীনের মেহনতকারী মনে করা হয়, তাদের মধ্যেই দ্বীনি উসুল ও আমলের চরম অভাব দেখা দেয়, তখন এই দুই চিন্তা কখনো এক হতে পারে না। সমাজ যখন আমলশূন্য হয়ে পড়ে, তখন শুধু নিজের আমল নিয়ে ঘরে বসে থাকা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদর্শ নয়। স্যার আরো বলেন, যখন পুরো সমাজ থেকেই দ্বীন উঠে যেতে থাকে, যখন দ্বীনের নামে অপব্যাখ্যা শুরু হয়, তখন সেই চিন্তা সম্পূর্ণ আলাদা।

আমি দ্বীনের কোনো ভুল ব্যাখ্যা বুঝেছিলাম, কোনো আলেম আমাকে শুধরে দিলেন, ব্যক্তিগতভাবে আমি ঠিক হয়ে গেলাম। কিন্তু যখন পুরো সমাজজুড়ে দ্বীনের বিকৃতি ঘটে; যখন গাঁজা খাওয়াকে ‘জিকির’ বলা হয়, রাজনীতিকে ‘জিহাদ’ বলা হয়, চাঁদাবাজিকে ‘তাবলিগ’ বলা হয়, তখন সেটা কেবল ব্যক্তির ভুল নয়; বরং পুরো সমাজের দ্বীনি অবক্ষয়। স্যার বোঝান, সেই সামাজিক অবক্ষয় দূর করার ফিকির আর ব্যক্তিগত ভুল শোধরানোর ফিকির কখনো এক নয়।

স্যার এখানে হযরত ইলিয়াস রহমাতুল্লাহি আলাইহির ফিকিরের কথা উল্লেখ করে বলতেন, মাওলানা ইলিয়াস রহমাতুল্লাহি আলাইহির কাছে শুধু নিজের মাদরাসা, নিজের ছাত্র, বা নিজের মুরিদ যথেষ্ট ছিল না। উনার অন্তরে ছিল পুরো উম্মতের ব্যথা, সমাজের সাধারণ মানুষ, যারা মসজিদে আসে না, যাদের জীবনে দ্বীন নেই, তাদের কী হবে? উনার মাদরাসায় ছাত্র ছিল, পীর হিসেবে মুরিদও ছিল; কিন্তু বাকি সমাজের কী হবে, এই চিন্তাই উনাকে দিন রাত ব্যাকুল করে রাখত। খানকায় বসে কিছু মুরিদকে সংশোধন করা আর বেতলব মেহনতহীন উদাসীন মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে, আমজনতার দ্বারে দ্বারে গিয়ে হেদায়েতের আলো পৌঁছানো, এক বিষয় নয়। মাওলানা ইলিয়াস রহমাতুল্লাহি আলাইহি নিজের আরাম, নিজের মাদরাসা ও খানকার গণ্ডি পেরিয়ে গোটা উম্মতের ফিকিরে নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়েছিলেন।

স্যার বলেন, একজন প্রকৃত দাঈর অন্তরে চিন্তার সংকীর্ণতা থাকতে পারে না। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উম্মত হিসেবে আমাদের মেহনত যেন কেবল “নিজের ঘরের অভাব” পূরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। উম্মতের প্রতিটি মুমিনের ফিকির হওয়া উচিত গোটা সমাজের অভাব দূর করার। উম্মতের প্রতিটি মানুষ যেন জাহান্নাম থেকে বেঁচে জান্নাতের রাস্তায় উঠতে পারে, এই বিশাল ক্যানভাসে চিন্তা করাই হলো রাহমাতুল্লিল আলামীন এর প্রকৃত উম্মতের ঈমানি দূরদর্শিতা। ঘরে চালের জোগান নেই কিন্তু চাহিদা আছে, এর ফিকির এক রকম; আর বাজারে চালের বিপুল চাহিদা অথচ যথেষ্ট জোগানই নেই, এর ফিকির সম্পূর্ণ ভিন্ন।

৩৫২. এক মুজাকারায় স্যার বলেন, বয়ান, মুজাকারা ও উপদেশ প্রদান…

এক মুজাকারায় স্যার বলেন, বয়ান, মুজাকারা ও উপদেশ প্রদান নবীদের কাজ ছিল। নবীগণ উম্মতের মধ্যে দীর্ঘ নসীহত করতেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও সাহাবাদের এমন নসীহত করতেন, বয়ান করতেন ও খুতবা প্রদান করতেন, যার প্রভাবে উনাদের অন্তর কেঁপে উঠত। সাহাবায়ে কেরামের মধ্যেও অনেকেই দাওয়াত, খুতবা ও হৃদয়স্পর্শী নসীহতের জন্য প্রসিদ্ধ ছিলেন। বিভিন্ন সাহাবী বিভিন্ন সময় মানুষের অন্তরে ঈমান জাগ্রত করার জন্য বয়ান ও নসীহত করেছেন। মুহাদ্দিসীন, আওলিয়া ও বুযুর্গরাও এই কাজ করেছেন। উনারা মানুষকে নসীহত করেছেন, ওয়াজ করেছেন এবং মানুষের অন্তরকে আল্লাহর দিকে ফেরানোর চেষ্টা করেছেন।

এরপর স্যার বলেন: “সেই ওয়াজ, সেই বয়ান তো আমিও করছি। তারা এই ওয়াজ করে আল্লাহকে পেয়েছেন; কিন্তু আমি এই ওয়াজ করে কী পাচ্ছি?” স্যার বলেন, বয়ান করা নিজে কোনো বড়ত্ব নয়; বরং ভয়ের বিষয় হলো, এই আমল আমাকে আল্লাহর কাছে নিয়ে যাচ্ছে, নাকি আত্মপ্রশংসা, রিয়া, খ্যাতির মোহ ও আত্মগর্বের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। অন্য মানুষকে নসীহত করতে করতে মানুষ নিজেই কখন অহংকারে আক্রান্ত হয়ে যায়, অনেক সময় সে নিজেও তা টের পায় না।

স্যার এ প্রসঙ্গে অন্য এক সময় বলেন, মানুষ যখন দেখে লোকজন তার কথা শুনছে, প্রশংসা করছে, আবেগাপ্লুত হচ্ছে, তখন তার অন্তরে অদৃশ্যভাবে “আমি” জন্ম নিতে শুরু করে। স্যার এ প্রসঙ্গে হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুর একটি অবস্থানের কথা উল্লেখ করেন। হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু জ্ঞানহীন ও অযোগ্য বক্তাদের ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্ক ছিলেন। তিনি “কাসস” বা গল্পভিত্তিক বক্তাদের অপছন্দ করতেন, যারা ইলম ও আমল ছাড়া শুধু মানুষের সামনে কথা বলে বেড়াত, তাদের সতর্ক করতেন। হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহুর একটি ঘটনা উল্লেখ করে বলেন, এক ব্যক্তি উনার কাছে মানুষের সামনে ওয়াজ করার অনুমতি চাইল। হযরত উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে অনুমতি দিলেন না। তিনি বলেন: “আমি আশঙ্কা করি, তুমি যখন মানুষকে নসীহত করা শুরু করবে, তখন তোমার নিজের ভেতরে এমন অনুভূতি জন্ম নেবে যে তুমি নিজেকে সুরাইয়া নক্ষত্র পর্যন্ত পৌঁছে গেছে মনে করবে।”

স্যার বলেন, বয়ান করা যত বড় আমল, এর ফিতনাও তত বড়। মানুষের সামনে কথা বলতে বলতে অন্তরে নিজের মর্যাদার একটি কল্পিত আসন তৈরি হয়ে যেতে পারে। একজন মানুষ ভাবতে শুরু করতে পারে, “আমি মানুষের হাদী”, “আমি মানুষের মুরব্বি”, “আমি না থাকলে মানুষের হেদায়েত হবে না।” অথচ দ্বীনের কর্মী ব্যক্তি যত বেশি মানুষকে নসীহত করবে, তত বেশি নিজের ভেতরে ভয় অনুভব করবে।

অন্য একবার স্যার বলেন, বয়ানের আসল উদ্দেশ্য মানুষকে নিজের দিকে ডাকা নয়; বরং আল্লাহর দিকে ফেরানো। যদি কোনো বয়ানকারী নিজের নাম, জনপ্রিয়তা, প্রভাব, অনুসারী বা পক্ষের লোক বাড়ানোর দিকে ঝুঁকে পড়ে, তবে সেই বয়ান তার জন্য নাজাতের বদলে ধ্বংসের কারণও হতে পারে। তিনি বলেন, আল্লাহওয়ালা ও বুযুর্গদের বয়ানের সাথে বিনয়, আত্মভয় ও আল্লাহর কাছে লুকিয়ে থাকার প্রবণতা জড়িত ছিল। উনাদের অন্তরে সবসময় এই ভয় কাজ করত: “মানুষ আমার কথা শুনছে, কথায় প্রভাবিত হচ্ছে; কিন্তু আমি নিজে আল্লাহর কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছি না তো?”

৩৫৩. মিনার ময়দানে এক তাবুতে বয়ান করতে গিয়ে স্যার এই…

মিনার ময়দানে এক তাবুতে বয়ান করতে গিয়ে স্যার এই প্রসঙ্গ তুলে ধরেন যে, নেক আমল করা যত জরুরি, তার চেয়েও জরুরি সেই আমলকে হেফাজত করা। আমলকে মানুষের প্রশংসা, দুনিয়াবি প্রত্যাশা ও নফসের দাবির হাত থেকে বাঁচিয়ে আল্লাহর কাছে পৌঁছে দিতে পারাই একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় ফিকির হওয়া উচিত।

স্যার এই আয়াতটি তেলাওয়াত করেন:

> مَن جَاءَ بِالْحَسَنَةِ فَلَهُ خَيْرٌ مِّنْهَا وَهُم مِّن فَزَعٍ يَوْمَئِذٍ آمِنُونَ

এরপর স্যার আয়াতের সূক্ষ্ম দিকের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, আল্লাহ তাআলা এখানে শুধু “আমল করা”র কথা বলেননি; বরং বলেছেন, “যে ব্যক্তি নেক আমল নিয়ে আসবে”- مَن جَاءَ بِالْحَسَنَةِ, আমল করাই যথেষ্ট নয়; সেই আমলকে আল্লাহর দরবার পর্যন্ত অক্ষত অবস্থায় পৌঁছিয়ে নিয়ে যাওয়াই আসল বিষয়।

স্যার বলেন, আলহামদুলিল্লাহ, আমরা নামাজ পড়ছি, রোজা রাখছি, দান-সদকা করছি, হজ-উমরা করছি। কিন্তু চিন্তার বিষয় হলো: এই আমলগুলো কি সত্যিই আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে কিনা? কিয়ামতের দিন আমি কি এই আমলগুলো নিয়ে আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে পারব, নাকি পথেই সেগুলো নষ্ট হয়ে যাবে?

এই বিষয়টি বোঝাতে স্যার একটি উদাহরণ দেন। একজন মানুষ বাজারে গেল, অনেক কষ্ট করে বাজার করল, টাকা খরচ করল, ব্যাগভর্তি সদাই নিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিল। কিন্তু বাড়িতে এসে দেখল, ব্যাগে ফুটো ছিল। পথে পথে সব জিনিস পড়ে গেছে। সে বাজার তো করেছে, কষ্টও করেছে, টাকা পয়সাও খরচ করেছে; কিন্তু বাড়িতে পৌঁছে দেখল, গুরুত্বপূর্ণ কিছুই অবশিষ্ট নেই। তার সেই পরিশ্রম শেষ পর্যন্ত কোনো উপকারেই এলো না।

স্যার বলেন, আমলের ক্ষেত্রেও এমনটি হতে পারে। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে অনেক নেক আমল করার তাওফিক দেন; কিন্তু সেই আমলকে হেফাজত করে আল্লাহর কাছে পৌঁছানো আমাদের কাজ। রিয়া, আত্মপ্রশংসা, মানুষের প্রশংসার আশা, প্রতিদানের প্রত্যাশা, অহংকার, কৃতিত্ববোধ, এসব কারণে অনেক সময় আমল ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যায়, আল্লাহ পর্যন্ত আমল আর পৌঁছে না।

স্যার বলেন, একজন মানুষ হয়তো বিশ বছর আগে কাউকে সাহায্য করেছিল, দান-সদকা করেছিল, কোনো উপকার করেছিল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। কিন্তু বিশ বছর পর এসে সে মনে মনে আশা করছে, “আজ সে আমার পক্ষে কথা বলবে, আমার মতকে সমর্থন করবে, আমার জন্য সাক্ষ্য দেবে।” যদি সেই ব্যক্তি তার প্রত্যাশা অনুযায়ী আচরণ না করে, তবে সে কষ্ট পায়, মনঃক্ষুণ্ণ হয়, এমনকি কটু কথাও বলে ফেলে।

স্যার বলেন, এই যে বিশ বছর পর এসে নিজের পুরোনো নেক আমলের বিনিময় প্রত্যাশা করা, এটাই তো সেই আমলের ইখলাসকে ধ্বংস করে দিতে পারে। যে আমল একদিন আল্লাহর জন্য করা হয়েছিল, আজ মানুষের প্রতিদানের আশা এসে সেটাকে নষ্ট করে দিল।

এই প্রসঙ্গে কথা বলতে বলতে স্যার অত্যন্ত আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। সাধারণত স্যার বয়ান বা মুজাকারায় সহজে কাঁদতেন না; এটি উনার স্বভাববিরুদ্ধ ছিল। কিন্তু সেদিন মিনার তাবুতে তিনি একথা বলতে বলতে কেঁদে ফেলেন। “না জানি কোন প্রত্যাশা, কোন গোপন চাওয়া, কোন মানুষের দিকে তাকানো, কোন আত্মতৃপ্তি এসে আমার আমলগুলো নষ্ট করে দেয়! না জানি কিয়ামতের দিন আমি সেই আমলগুলো সঙ্গে নিয়ে আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে পারব কি না!” উনার কণ্ঠ ভারী হয়ে যায়। অনেকক্ষণ পর্যন্ত তিনি আর স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারেননি।

সেদিনের সেই মোজাকারায় স্যার আরো তুলে ধরেন, আল্লাহ তাআলা শুধু আমলের পরিমাণ দেখবেন না; বরং আমলের ওজন দেখবেন। সেই আমল কতটুকু খাঁটি ছিল, কতটুকু শুধু আল্লাহর জন্য ছিল, সেটাই ভাববার বিষয়। বাহ্যিকভাবে ছোট একটি আমলও ইখলাসের কারণে আল্লাহর কাছে পাহাড়সম ভারী হয়ে যেতে পারে। আবার বাহ্যিকভাবে বিশাল আমলও মানুষের প্রশংসা, স্বার্থ বা প্রত্যাশা মিশে যাওয়ার কারণে শূন্য হয়ে যেতে পারে।

৩৫৪. স্যার বলেন, মুমিনের জীবনের লক্ষ্য হওয়া উচিত “আল্লাহ রাজি…

স্যার বলেন, মুমিনের জীবনের লক্ষ্য হওয়া উচিত “আল্লাহ রাজি হচ্ছেন কি না”, এই চিন্তা। একজন মুমিনের ফিকির দুনিয়ার ক্ষতি বা শাস্তি নয়, অনেক বড় প্রাপ্তি নাকি সে বঞ্চিত তা নয়; বরং সকল হালতে আল্লাহ তার উপর রাজি আছেন কি না। মোমেনের তলব হবে, আল্লাহর সামনে এমনভাবে উপস্থিত হওয়া, যেন তিনি তার প্রতি সন্তুষ্ট থাকেন।

এই মুজাকারায় স্যার ভারতের মেওয়াত এলাকার এক সাধারণ গরুর গাড়িওয়ালার ঘটনা উল্লেখ করেন। ওই ব্যক্তি গরুর গাড়ি নিয়ে কোথাও যাচ্ছিলেন। রাস্তার পাশে একটি ছোট শিশু খেলছিল। হঠাৎ করে শিশুটি গাড়ির চাকার নিচে পড়ে যায় এবং ঘটনাস্থলেই মারা যায়। ঘটনাটি নিয়ে মামলা হয়। ধীরে ধীরে বিষয়টি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে, ওই গরুর গাড়িওয়ালার ফাঁসি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়।

আত্মীয় স্বজন তার জন্য একজন উকিল ঠিক করে। উকিল তাকে বললেন, “হাকিমের সামনে এভাবে ঘটনা বলবে, তাহলে তুমি নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে যাবে।” অথচ উকিল যে ভাষা শিখাচ্ছিলেন, তা প্রকৃত ঘটনার সাথে পুরোপুরি মিল ছিল না। গাড়িওয়ালা অত্যন্ত সরলভাবে উকিলকে বললেন, “ঘটনা তো আসলে এমন নয়। বাস্তবে তো বাচ্চাটা আমার গাড়ির নিচে পড়েই মারা গেছে।” উকিল বললেন, “ঘটনা যাই হোক, আমি যেভাবে শিখাচ্ছি আদালতে সেভাবেই বলতে হবে, নয়তো তোমার ফাঁসি হয়ে যেতে পারে।”

তখন সেই সাধারণ, অশিক্ষিত গরুর গাড়িওয়ালা বললেন: “উকিল সাহেব, আমি তো দুনিয়াতে না শুধু বেঁচে থাকার এসেছি, না মরে যাবার জন্য এসেছি, আমি তো আল্লাহকে রাজি করতে এসেছি। সত্য কথা বলার কারণে যদি আমার ফাঁসি হয়ে যায়, আর আল্লাহ আমার উপর খুশি হন; তাতে আমার আপত্তি নেই। কিন্তু মিথ্যা বলে যদি আমি বেঁচে যাই আর আল্লাহ আমার উপর নারাজ হন, তাহলে সেই বাঁচার কোনো মূল্য নেই।”

স্যার বলেন, ঈমানের আসল পরিচয় শুধু আমল বা মুখের কথায় প্রকাশ পায় না; বরং হকের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার সময় একজন মানুষ কী করে, তা দিয়েই তার ঈমানের বাস্তবতা প্রকাশ পায়। মানুষ অনেক সময় নিজের সম্মান, প্রাণ, সম্পদ, দুনিয়াবি ক্ষতির ভয়ে, বা কঠিন অবস্থায় পরীক্ষার সময় সত্য কথা বলা থেকে পিছিয়ে যায়। কিন্তু যার অন্তরে আল্লাহর ভয় থাকে, তার কাছে দুনিয়ার সাময়িক ক্ষতি, কষ্ট বা বিপদ বড় বিষয় নয়; বরং সবচেয়ে বড় বিষয় হলো আল্লাহ তার উপর রাজি আছেন কি না। দুনিয়ার ক্ষতি একদিন শেষ হয়ে যাবে, কিন্তু আল্লাহর নারাজি কোনো ঈমানদার মানুষের জন্য সহ্য করার বিষয় নয়।

৩৫৫. এক বয়ানে স্যার বলেন, এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে খুনের মামলা…

এক বয়ানে স্যার বলেন, এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে খুনের মামলা চলছিল। বিচারকার্য শেষে আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেয়। রায় ঘোষণার পর সেই আসামি বারবার অনুরোধ করতে থাকে যে, “আমি বিচারপতির সাথে একটু কথা বলতে চাই।” সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী রায় হয়ে যাওয়ার পর আর ব্যক্তিগতভাবে কথা বলার সুযোগ থাকে না। কিন্তু তার বারবার অনুরোধের কারণে অবশেষে তাকে অনুমতি দেওয়া হলো।

বিচারকের সামনে লোকটি বলল, “আপনি যে মামলায় আমাকে ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন, আসলে এই খুন আমি করিনি। কিন্তু আপনার বিচার সম্পূর্ণ সঠিক হয়েছে।” বিচারক বিস্মিত হয়ে বললেন, “তুমি খুন করোনি, তাহলে বিচার সঠিক হলো কীভাবে?” তখন লোকটি বলল, “এর আগের আরেকটি খুনের মামলায় আমি নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে খালাস পেয়ে গিয়েছিলাম। অথচ সেই খুনটি আমিই করেছিলাম। আজ আমি যে অপরাধ করিনি, সেই অপরাধে শাস্তি পাচ্ছি; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটা আমার পূর্বের অপরাধেরই প্রতিফল।”

স্যার বলেন, মানুষ অনেক সময় কোনো অপরাধ করে সমাজ বা মানুষের চোখ থেকে বেঁচে যেতে পারে। দুনিয়ার আদালত, বা আইনের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে যেতে পারে, মানুষকে ধোঁকা দিতে পারে, নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতেও সক্ষম হতে পারে। কিন্তু আল্লাহর বিচার থেকে সে পালাবে কিভাবে? স্যার বলেন, অনেক সময় মানুষ মনে করে, “আমি তো বেঁচে গেছি”, “আমার কিছু হয়নি”, “কেউ ধরতে পারেনি”, অথচ সে বুঝতে পারে না যে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে হিসাবের খাতা বন্ধ হয়নি।

স্যার অন্য আরেক প্রসঙ্গে একবার বলেন, গুনাহর প্রভাব কখনো মানুষের অন্তর অন্ধ করে দেয়, কখনো জীবনের বরকত উঠিয়ে নেয়, কখনো অন্য কোনো বিপদ, অপমান বা কষ্টের মাধ্যমে তার সামনে ফিরে আসে। একজন মুমিনের ভয় শুধু তাৎক্ষণিক শাস্তিকে কেন্দ্র করে হওয়া উচিত নয়; বরং আল্লাহর বিচারের প্রতি অন্তরে গভীর সচেতনতা থাকা দরকার। মানুষ যদি দুনিয়ার আদালত থেকে নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে বেঁচেও যায়, কিন্তু আল্লাহর কাছে অপরাধী থাকে, তবে প্রকৃতপক্ষে সে রক্ষা পায়নি।

৩৫৬. সাঘাটার আজাহার ভাই, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের সাবেক ছাত্র…

সাঘাটার আজাহার ভাই, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের সাবেক ছাত্র, দ্বীনের মেহনতের ভাল সাথী ছিলেন। উনার বড় ভাই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের প্রাক্তন ছাত্র, একবার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে জানান যে, আজাহার ভাইয়ের বিয়ের ব্যাপারে স্যার উনাদের অভিভাবকের উদ্দেশ্যে একটি জরুরি চিঠি লিখেছিলেন।

চিঠিতে স্যার অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে জোর দিয়ে পরামর্শ দিয়েছিলেন: ওকে বিয়ে দিয়ে দেওয়া দরকার। যদি এখন বিয়ে না দেওয়া হয়, তাহলে এমন সমস্যা দেখা দিতে পারে, যার আর কোনো সমাধান পাওয়া যাবে না। চিঠিতে স্যার উল্লেখ করেছিলেন,”ওকে বিয়ে দিয়ে দাও, যদি এখন বিয়ে না দাও, হয়তো এমন সমস্যা হবে যার আর কোনো সমাধান খুঁজে পাওয়া যাবে না।”

তৎকালীন পারিবারিক অবস্থা, বাস্তবতা ও নানা কারণে সেই পরামর্শ অনুযায়ী বিয়ের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়নি। অভিভাবকরা তখন স্যারের এই দূরদর্শী পরামর্শটি আমলে নেননি এবং আজাহার ভাইয়ের বিয়ে দেওয়া হয়নি। পরবর্তীতে বাস্তব জীবনে ঠিক তা-ই ঘটেছিল; উনার বিয়ে সংক্রান্ত এমন কিছু জটিল ও অনাকাঙ্ক্ষিত সমস্যার সৃষ্টি হয়েছিল, যার কোনো সমাধান আর মেলেনি। তার পরিবারের সদস্যরা স্যারের সেই পরামর্শের কথা স্মরণ করতেন।

[কিছু বিষয় আছে, যা শুরুতেই প্রতিরোধ করা সম্ভব; কিন্তু একবার জটিল আকার ধারণ করলে পরে তার সমাধান অত্যন্ত কঠিন হয়ে যায়। দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, মানুষের সাথে চলাফেরা এবং উম্মতের হালত সম্পর্কে গভীর উপলব্ধি থেকে স্যার অনেক সময় এমন বিষয় সামনে আনতেন, যা আমাদের মতো সাধারণ মানুষের তাৎক্ষণিক উপলব্ধি অনেক সময় কঠিন হয়ে যেত। আজাহার ভাইয়ের অবচেতনে বা পারিপার্শ্বিক হালোতে কী ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে, তা স্যার আগে থেকেই অনুমান করতে পেরেছিলেন বলেই হয়তো অভিভাবক বড় ভাইকে অমন সতর্কবার্তা পাঠিয়েছিলেন।]

৩৫৭. একবার স্যার মানুষের একটি স্বভাবের কথা উল্লেখ করে বলেন…

একবার স্যার মানুষের একটি স্বভাবের কথা উল্লেখ করে বলেন, মানুষের মধ্যে অনেক সময় এমন প্রবণতা দেখা যায় যে, যা প্রকৃতপক্ষে তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়, সেটিকেই বড় বিষয় বানিয়ে ফেলা হয়; আর যে বিষয়টি সত্যিই জরুরি, সেটি অবহেলিত থেকে যায়। মানুষ কখনো কখনো অপ্রয়োজনীয় বিষয় নিয়ে এত ব্যস্ত হয়ে পড়ে যে, মূল উদ্দেশ্যই আড়ালে চলে যায়।

এই প্রসঙ্গে স্যার রসিকতাপূর্ণ একটি উদাহরণ দেন। তিনি বলেন, মাটির নিচে চল্লিশ হাত খুঁড়ে একটি তার পাওয়া গেল। সঙ্গে সঙ্গে গবেষণা শুরু হলো। তারপর ঘোষণা দেওয়া হলো, “আজ থেকে চারশো বছর আগে মানুষ তারের মাধ্যমে যোগাযোগ করত। এই তারই তার প্রমাণ!”

এরপর আরো চল্লিশ হাত নিচে খনন করা হলো। সেখানে কোনো তার পাওয়া গেল না। তখন আরেকটি ‘বিরাট আবিষ্কার’ সামনে এলো। বলা হলো, “আজ থেকে আটশো বছর আগে মানুষ ওয়্যারলেসে যোগাযোগ করত। কারণ এত নিচে কোনো তার পাওয়া যায়নি!”

স্যারের এই উদাহরণ বা রসিকতা মূলক এই বক্তব্যে একটি গভীর ইঙ্গিত লক্ষ্য করা যায়, অনেক সময় মানুষ পূর্বধারণা নিয়ে এমন সব সিদ্ধান্তে পৌঁছে যায়, যার বাস্তব ভিত্তি খুবই দুর্বল। অথচ সেগুলো নিয়েই দীর্ঘ আলোচনা, গবেষণা ও ব্যস্ততা চলতে থাকে।

একবার দিনাজপুরের হাজী দানেশ বিশ্ববিদ্যালয়ে সফরকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ (স্থাপত্যশৈলী অনেকটা প্রাচীন ধাঁচের) দেখে স্যার মজার ছলে বলেছিলেন, “মসজিদের দেয়ালে যদি কয়েকটা বটগাছের চারা লাগিয়ে দেওয়া যেত, তাহলে হয়তো প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ এটাকে নিয়ে নিত! তারপর গবেষণা করে বের করত, এটি হয়তো দুই হাজার বছরের পুরোনো স্থাপনা!”

বিভিন্ন সময়ে স্যার মানুষের সময়, মেধা ও শক্তির সঠিক ব্যবহার সম্পর্কে গুরুত্বারোপ করতেন। মানুষের সময়, মেধা ও শক্তি সীমিত, তাই একজন মুমিনের উচিত আসল উদ্দেশ্য ও প্রকৃত প্রয়োজনকে সামনে রাখা। এমন অনেক বিষয় আছে, যা জানলে কোনো ক্ষতি নেই; কিন্তু এমনও অনেক বিষয় আছে, যা নিয়ে অতিরিক্ত ব্যস্ত হয়ে গেলে জীবনের মূল দায়িত্বগুলো আড়ালে চলে যায়।

মতিহার হলে ছাত্রদের এক মজমায় স্যার একবার বলেন, বুদ্ধিমত্তা শুধু অনেক কিছু জানার মধ্যে নয়; বরং কোন বিষয়কে কতটুকু গুরুত্ব দিতে হবে, সেই ভারসাম্য বুঝার মধ্যেও নিহিত। যে মানুষ আসল ও গৌণ বিষয়ের পার্থক্য বুঝতে পারে, সে তার সময় ও জীবনকে অধিক ফলপ্রসূভাবে ব্যয় করতে পারে।

৩৫৮. এক মুজাকারায় স্যার আলীগড়ের প্রখ্যাত আলেম ও শিক্ষাবিদ, তাবলীগের…

এক মুজাকারায় স্যার আলীগড়ের প্রখ্যাত আলেম ও শিক্ষাবিদ, তাবলীগের মুরব্বী প্রফেসর নাদের আলী খান সাহেবের একটি কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলতেন:

> “حسد جو ہے نا، وہ کسی کمال کی وجہ سے ہوتا ہے۔”

[হিংসা যে জিনিসটা, ওটা আসলে মানুষের কোনো না কোনো পূর্ণতা বা যোগ্যতার কারণে সৃষ্টি হয়।]

স্যার বলেন, মানুষ সাধারণত এমন কাউকে হিংসা করে না, যার মধ্যে কোনো বিশেষত্ব নেই, একজন অসহায় অন্ধ ফকির তাকে দেখে কেউ হিংসা করে না। বরং কারো জ্ঞান, যোগ্যতা, সৌন্দর্য, প্রভাব, গ্রহণযোগ্যতা, সম্পদ, দ্বীনদারি বা অন্য কোনো উৎকর্ষ যখন মানুষের দৃষ্টিগোচর হয়, তখন অনেকের অন্তরে হিংসার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

সাধারণত আমরা মনে করি হিংসা একটি নেতিবাচক অনুভূতি, যা এমনি এমনিই তৈরি হয়। কিন্তু স্যার এখানে একটি সূক্ষ্ম বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। অনেক ক্ষেত্রে মানুষের কোনো বিশেষ যোগ্যতা, সৌন্দর্য, গুণ, গ্রহণযোগ্যতা বা উৎকর্ষের (কামাল) কারণেই অন্যের অন্তরে তার প্রতি হিংসার জন্ম হয়। সাধারণত মানুষ সেই ব্যক্তিকেই বেশি হিংসা করে, যার মধ্যে সে নিজের তুলনায় কোনো বাড়তি নেয়ামত, বিশেষত্ব বা সফলতা দেখতে পায়।

স্যার বলেন, একজন মানুষের মাঝে যখন কোনো বিষয়ের ‘পূর্ণতা’ বা ‘কামাল’ (অসাধারণ মেধা, চারিত্রিক মাধুর্য, সুন্দর চেহারা, সম্পদ কিংবা দ্বীনি মাকাম) প্রকাশ পায়, তখনই অবচেতনভাবে অন্য মানুষের নফস বা অহংকারে আঘাত লাগে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নিজের চেয়ে অন্যকে শ্রেষ্ঠ দেখার এই অপারগতা থেকেই ‘হাসাদ’ বা হিংসার জন্ম হয়। ​

এই আলোচনায় স্যার ভিন্ন দুটি দিকে আলোকপাত করেছিলেন:

প্রথমত, যদি কেউ আমার প্রতি হিংসা করে, তবে বুঝতে হবে আল্লাহ তাআলা আমাকে কোনো না কোনো বিশেষ যোগ্যতা বা নেয়ামত (কামাল) দ্বারা ভূষিত করেছেন। তাই হিংসুকের আচরণে বিচলিত বা প্রতিশোধপরায়ণ না হয়ে আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করা এবং উনার কাছেই আশ্রয় চাওয়া উচিত।

দ্বিতীয়ত, আমাদের নিজেদের মনকে পরীক্ষা করা উচিত। যখনই কারও কোনো সাফল্যে বা সৌন্দর্যে আমাদের মনে সংকীর্ণতা তৈরি হয়, তখনই বুঝতে হবে আমাদের নফস অসুস্থ। অন্যের যোগ্যতাকে আল্লাহর দান হিসেবে মেনে নিতে না পারাটাই আমাদের আত্মিক ব্যাধি।

স্যার বলেন, যে ব্যক্তি হিংসা করছে, সে মূলত আল্লাহর বণ্টনের ওপর অসন্তুষ্ট হচ্ছে। কারণ ওই ব্যক্তির ‘কামাল’ বা যোগ্যতা তো আল্লাহই তাকে দিয়েছেন। তিনি বলতেন, কোনো ভাইয়ের কল্যাণ, অগ্রগতি বা সফলতা দেখে যদি আমাদের অন্তর আনন্দিত হয়, তবে এটি অন্তরের সুস্থতার একটি আলামত। আর যদি অন্তরে কষ্ট, সংকীর্ণতা বা হিংসার ভাব জেগে ওঠে, তাহলে নিজের দিলের অবস্থা নিয়ে চিন্তা করা দরকার।

৩৫৯. একবার স্যার বলেন, একজন মানুষের মূল্যায়ন শুধু তার বক্তব্যের…

একবার স্যার বলেন, একজন মানুষের মূল্যায়ন শুধু তার বক্তব্যের মাধ্যমে হয় না। তার ঈমান, ইখলাস, সুন্নতের অনুসরণ, আল্লাহর সাথে সম্পর্ক, আমানতদারিতা, আখলাক এবং ব্যক্তিগত জীবন ও আমল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। স্যার বলেন, সুন্দর কথা বলা এবং সুন্দর জীবন যাপন করা এক জিনিস নয়। এই কারণে আল্লাহ ওয়ালারা শুধু কথা নয়, কথার পেছনের মানুষটিকেও দেখতেন। এমন কিছু মানুষ আছে যারা উপদেশ দিতে বসলে এত সুন্দর কথা বলবে যে, শুনলে মনে হবে বড় কোনো বুযুর্গ কথা বলছেন। কিন্তু দ্বীনের ক্ষেত্রে অনুসরণযোগ্যতা নির্ধারিত হয় তার ইলমের সাথে ইখলাস এবং জীবনের মধ্যে তাকওয়া কতটুকু যুক্ত হয়েছে, তার উপর।

প্রসঙ্গক্রমে স্যার একটি ঘটনা উল্লেখ করেন। একবার সরকারি কর্মকর্তাদের একটি পরিদর্শক দল পাবনা মানসিক হাসপাতাল পরিদর্শনে যান। তারা হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগ ঘুরে দেখছিলেন, রোগীদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছিলেন এবং সেবার মান সম্পর্কে খোঁজখবর নিচ্ছিলেন।

এমন সময় পরিপাটিভাবে চুল আচড়ানো এক ব্যক্তি অত্যন্ত ভদ্রোচিতভাবে এগিয়ে এসে পরিদর্শক দলের সাথে কথা বলতে শুরু করে। পরিচ্ছন্ন পোশাক, সুন্দর ব্যবহার, মার্জিত ভাষা এবং অত্যন্ত সুসংগঠিত কথাবার্তা। তিনি পরিদর্শক দলের সদস্যদের সাথে এমনভাবে কথা বলতে শুরু করলেন যে, কিছুক্ষণের মধ্যেই তাদের সাথে উনার বেশ সখ্যতা হয়ে গেল। সে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে, শুদ্ধ ও প্রাঞ্জল ভাষায় কর্মকর্তাদের বোঝাতে সক্ষম হলো যে, সে আসলে কোনো পাগল নয়; বরং পারিবারিক শত্রুতার জেরে তাকে এখানে পাঠানো হয়েছে, আটকে রাখা হয়েছে। সে পরিদর্শক দলকে হাসপাতালের বিভিন্ন অংশ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখাচ্ছিল এবং অন্যান্য রোগীদের অবস্থা এমনভাবে বিশ্লেষণ করছিল যে, তাকে কোনোভাবেই অসুস্থ মনে করার সুযোগ ছিল না। উনার কথাবার্তা, উপস্থাপনা এবং যুক্তি শুনে দলের কয়েকজন সদস্য সত্যিই বিশ্বাস করতে শুরু করলেন যে, লোকটি সম্ভবত সুস্থ এবং তাকে অন্যায়ভাবে এখানে রাখা হয়েছে।

তার চমৎকার কথাবার্তায় মুগ্ধ হয়ে পরিদর্শক দলের একজন সদস্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সাথে সাক্ষাৎ করে বিষয়টি উত্থাপন করলেন। বললেন, “ভদ্রলোককে তো সম্পূর্ণ স্বাভাবিক মানুষ মনে হচ্ছে। এমন একজন সুস্থ মানুষকে কেন আটকে রাখা হয়েছে?” দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক হেসে বললেন, “ওর কথা আমলে নিয়েন না, সে এখানকার সবচেয়ে জটিল রোগীদের একজন।” কর্তৃপক্ষের মুখে এই সত্য প্রকাশ হওয়া মাত্রই ওই ব্যক্তি কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্য করে ক্ষোভের সাথে বিরক্ত হয়ে বলল, ‘আপনাদের পেছনে এতক্ষণ সময় নষ্ট করলাম, এত করে বুঝালাম, তাও আপনারা আমার কথা বিশ্বাস করলেন না!’ এই বলেই সে উপস্থিত সবার সামনে নিচের পরিধেয় বস্ত্র খুলে, নিজের লুঙ্গি খুলে দৌড় দিল; উলঙ্গ হয়ে দৌড়ে সেখান থেকে সরে গেল।

এই ঘটনাটি বলার পর স্যার বলেন: “সমাজে এমন অনেক নেশাখোর মানুষ আছে, তারা যখন কাউকে উপদেশ দেয় বা বক্তৃতা শুরু করে, মনে হয় বড় কোনো ওলি-আল্লাহ; কিন্তু সেতো খায় গাঁজা।” একশ্রেণির মানুষের বক্তব্য, বাগ্মিতা, মাসআলা-মাসায়িলের সূক্ষ্ম ব্যাখ্যা এবং দ্বীনি বিষয়ের উপস্থাপন এত বেশি আকর্ষণীয় ও নিখুঁত হয় যে, সাধারণ মানুষ খুব সহজেই মুগ্ধ হয়ে তাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। তাদের কথা বারবার শুনতে ইচ্ছা করে। কিন্তু স্যারের সেদিনের নসিহত ছিলো, কেবল কথার এই বাহ্যিক জৌলুস দেখে কাউকে দ্বীনি রাহবার বা আদর্শ মেনে নেওয়া মারাত্মক ভুল।

স্যারের ওই কথায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা লক্ষ করা যায়: অনেক সময় ভ্রান্ত বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ব্যক্তিরা নিজেদের ত্রুটি আড়াল করতে দ্বীনের অত্যন্ত সুন্দর ও যৌক্তিক উপস্থাপনা তৈরি করে। সাধারণ মানুষ বাহ্যিক অবয়ব ও বাকপটুতা দেখে অনেক সময় ধোঁকা খায়। দ্বীনের বিবেচনায় কেবল ‘সুন্দর কথা’ যথেষ্ট নয়; বরং সুন্দর চরিত্র, সুন্নতের অনুসরণ, উত্তম আখলাক, ইখলাস, আমানতদারিতা ও তাকওয়াই একজন মানুষকে অনুসরণযোগ্য করে তোলে।

৩৬০. স্যার বলতেন, নেক আমলের পরিমাণের চেয়ে তার উদ্দেশ্য অনেক…

স্যার বলতেন, নেক আমলের পরিমাণের চেয়ে তার উদ্দেশ্য অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ; মুমিনের উচিত বারবার নিজের অন্তরকে যাচাই করা। আমি কেন নামাজ পড়ছি? কেন জিকির করছি? কেন তাবলিগ করছি? কেন হজ্জ্ব করছি? কেন দান করছি? যদি এসব আমল আমাকে আল্লাহর আরও নিকটবর্তী করে, তবে আমি সফলতার রাস্তাতেই আছি। আর এই নেক আমলের মাধ্যমে আমার আত্মপ্রদর্শনের প্রবণতা যদি বেড়ে যায়, নেক আমলের মাধ্যমে অহংকার যদি বাড়তে থাকে, নেক আমলের মাধ্যমে অন্যের প্রতি তাচ্ছিল্য যদি বাড়তে থাকে, তবে সেই নেক আমলই আমার জন্য সতর্কতার বিষয় হয়ে দাঁড়াবে।

স্যার একবার গভীর উপমার মাধ্যমে নেক আমলের প্রকৃত উদ্দেশ্যের গুরুত্ব তুলে ধরেন। ইবাদত বন্দেগি ও দ্বীনি মেহনত কীভাবে মানুষের নাজাতের পরিবর্তে ধ্বংসের কারণ হতে পারে, তা বোঝাতে তিনি আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের অ্যান্টিবায়োটিকের এক উপমা ব্যবহার করেন। তিনি বলেন, চিকিৎসা বিজ্ঞানে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া হয় শরীরের ক্ষতিকর জীবাণু বা রোগ ধ্বংস করার জন্য। কিন্তু শরীর যখন এই ওষুধের ওপর অতিরিক্ত অভ্যস্ত হয়ে পড়ে, তখন কখনো কখনো উল্টো ঘটনা ঘটে। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণে সেই জীবাণুগুলো আর অ্যান্টিবায়োটিক দ্বারা মরে না। কিন্তু যখন জীবাণু দীর্ঘদিন একই অ্যান্টিবায়োটিকের সংস্পর্শে থেকে তার প্রতি প্রতিরোধী হয়ে যায়, তখন যে ওষুধ একসময় রোগ নিরাময়ের মাধ্যম ছিল, সেটিই আর কার্যকর থাকে না। রোগ থেকে যায়, অথচ মানুষ ওষুধ খেয়েই চলতে থাকে। যে ওষুধটি ছিল রোগ নিরাময়ের মাধ্যম, সেটাই একসময় রোগের বেঁচে থাকার আশ্রয়ে যেনো পরিণত হয়।

স্যার বলেন, নামাজ, জিকির, হজ, সদকা, তবলিগ সবকিছুর উদ্দেশ্য তো ভালো হওয়া। কিন্তু মিম্বরে বয়ান করে যদি অহংকার বাড়ে, তবলিগ করতে গিয়ে, জিকির করতে গিয়ে যদি দুনিয়ার লোভ বৃদ্ধি পায় এবং দান সদকা করে যদি মানুষের ওপর নিয়ন্ত্রণ বা বাহাদুরি জাহির করা হয়, তবে তো বুঝতে হবে জীবাণু মারার অ্যান্টিবায়োটিক নিজেই এখন জীবাণুর ‘খাদ্য’ হয়ে গেছে! যে আমল দিয়ে নাজাত পাওয়ার কথা ছিল, সেটাই জাহান্নামে যাওয়ার সহজ রাস্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে।


← আগের পর্ব (৩২১–৩৪০)  |  সূচিপত্র  |  পরের পর্ব (৩৬১–৩৮০) →

সংগ্রহ ও সংকলন: মুশফিক আহমদ (রহঃ)-এর মালফুযাত সংকলন।

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *